ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

২৬তম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

২৮ (সম্পূর্ণ)

সকালের নরম আলোয় দিনটা শুরু হয়েছিল খানিক ব্যস্ততা নিয়ে। রুশদী আজ ভার্সিটিতে যাবে। তাই অলসতা ঝেড়ে ফেলে বেশ সকাল সকালই বিছানা ছাড়ল সে। ঘটনাক্রমে আজ ফারাজের ট্রিপ ছিল না, তাই সে আজকে অফিসেই যাবে। আর শেরেরও সকাল সকাল ক্লাস। সব মিলিয়ে তিনজনেরই তাড়া ছিল। ঝটপট তৈরি হয়ে, গুছিয়ে নিয়ে তারা একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হলো। ফারাজ দুজনকে যার যার গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে অফিসের দিকে গাড়ি ছোটাল।

কিন্তু রুশদীর দিনটা যেমন সতেজভাবে শুরু হয়েছিল, ক্যাম্পাসে পা রাখার পর ঠিক ততটাই মেঘলা হয়ে উঠল। প্রথম ক্লাসটা কোনোমতে শেষ করতেই তার মন মেজাজ পুরোপুরি বিগড়ে গেল। ক্লাসের আর কোনো লেকচার শোনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে রইল না তার।ফোনটা বের করে সে সরাসরি ফারাজকে কল করল।গাড়ি পাঠাতে বলল, নয়তো সে একাই বাসায় চলে যাবে। ওপাশ থেকে ফারাজ তাকে আশ্বস্ত করে বলল, গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে, সে যেন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে।

আসলে রুশদীর মেজাজ খারাপ হওয়ার পেছনে একটা কারণ আছে। ক্লাসের কেযেন রটিয়েছে, রুশদী মন্ত্রী শেহজাদ খানের পরিবারের লোক।এই নিয়ে ক্লাসের স্টুডেন্টদের কানাঘুঁষা এড়িয়ে গেলেও তাদের কৌতূহলী আর আড়চোখের চাহনিগুলো কিছুতেই এড়ানো যাচ্ছিল না।এসবসহ্য করতে না পেরে সে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো।আরেহ ভাই!সে খানের পরিবারের লোক কোনো এলিয়েন না, যে সবাই তার দিকে এভাবে তাকাবে।

ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিংটা থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে এসে বসল রুশদী।গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ঠিক তখনই দমকা হাওয়ার মতো একটা দুরন্ত ছেলে এসে বসল তার পাশের খালি জায়গাটাতে। হঠাৎ এভাবে কেউ পাশে এসে বসায় রুশদী কিছুটা চমকে উঠল। ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে সে ছেলেটার দিকে তাকাল। চেহারাটা চেনা চেনা ঠেকল, সম্ভবত তার ব্যাচমেটই হবে।

ছেলেটি বেশ সাবলীল গলায় বলে উঠল,

"হেই, তুমি রুশদী, রাইট?"

অযাচিত এই আলাপে খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও, ভদ্রতার খাতিরে রুশদী ঠোঁটের কোণে একটা কৃত্রিম, হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল।

"আমি ইয়াশ!"

ছেলেটি চটপটে ভঙ্গিতে নিজের পরিচয় দিয়ে হ্যান্ডশেকের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল।

রুশদী তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ না দিয়ে নির্বিকার মুখে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। ইয়াশ পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরে বিব্রত না হয়ে বেশ স্বাভাবিকভাবেই হাতটা সরিয়ে নিল। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল,

"তুমি ক্লাস না করে এভাবে বের হয়ে আসলে কেন?"

রুশদী নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল, "মুড নেই তাই।"

"ওহ্! দারুণ তো! আমারও মুড নেই। চলো, দুজনে মিলে ক্যাম্পাসটা একটু ঘুরে দেখি," ইয়াশ বেশ উৎসাহ নিয়ে প্রস্তাব দিল।

"সরি ইয়াশ, আমার গাড়ি এখনই চলে আসবে। তোমার যেহেতু ঘোরার মুড হয়েছে, তুমি বরং তোমার বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াও।"

"আমার তো ফ্রেন্ড..."

"আমরা আবার কবে ফ্রেন্ড হলাম? আমি তো তোমাকে ঠিকঠাক চিনিই না!"

"হুম, এতক্ষণ চিনতে না, এখন তো চেনো। আমার নাম ইয়াশ। এখন চলো তো..."

রুশদী দেখল, কালো রঙের চেনা গাড়িটা এসে ডিপার্টমেন্টের সামনে থামল। চট করে দাঁড়িয়ে পড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটিয়ে রুশদী বলল,

"সরি ইয়াশ, আমার গাড়ি চলে এসেছে। তুমি বরং ক্যাম্পাস ঘোরার জন্য অন্য কোনো সঙ্গী খুঁজে নাও। ওকে, টাটা!"

--

আজকাল রুশদীর ভার্সিটিতে আসার অনিচ্ছার পেছনে আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই ইয়াশ ছেলেটা। রুশদীর তো মাঝেমধ্যে মনে হয় ছেলেটার মাথায়কোনো সমস্যা আছে! যেখানেই যায়, ছেলেটা ছায়ার মতো পিছু নেয়, যেচে এসে বন্ধুত্ব করতে চায়। রুশদী হাজার চেষ্টা করেও তাকে এড়িয়ে চলতে পারে না,ইয়াশ কোনো কিছু গায়েই মাখে না। রুশদী যতবারই বিরক্তি প্রকাশ করে, ছেলেটা ততবারই একগাল বেহায়া হাসি নিয়ে ঠিক তার সামনে এসে হাজির হয়। অবশ্য ইয়াশ কখনো রুশদীর সাথে কোনো রকম অভদ্রতা বা খারাপ আচরণ করেনি, তবুও তার এই অতি-উৎসাহ রুশদীর ভীষণ বিরক্ত লাগে।

এদিকে ভার্সিটিতে না এসে যে একটু শান্তিতে বাসায় বসে থাকবে, সেই উপায়ও নেই।ফারাজের বকা শুনতে হয়।তাই রুশদীকে নিয়ম করে ভার্সিটিতে আসতেই হয়। সে একবার ভেবেছিল ইয়াশের ব্যাপারটা ফারাজকে বলবে। কিন্তু আবার ভাবল, ছেলেটা তো আর বেয়াদব নয়,একটু বেশি চঞ্চল আর বাচাল।এই ভেবে আর বলা হয়ে ওঠেনি।

দুপুরের দিকে ভার্সিটির ক্যান্টিনের এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল রুশদী। চারপাশের টেবিলগুলোতে গ্রুপ বেঁধে আড্ডা-হাসাহাসি চললেও, সে একদম একাই। ভার্সিটিতে আসার পর থেকে সে নিজে থেকেই কোনো বন্ধু তৈরি করেনি।ক্লাসের সবাই জানে, সে মন্ত্রী শেহজাদ খানের পরিবারের,তাই অনেকেই যেচে পড়ে তার সাথে খাতির জমাতে চেয়েছিল। কিন্তু রুশদী কাউকেই পাত্তা দেয়নি। স্বার্থপর মানুষের এই সস্তা বন্ধুত্ব তার একদম ভালো লাগে না।

আজ সকালে তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে না খেয়েই চলে এসেছিল রুশদী। আর সেই অপরাধেই একটু আগে ফারাজের কাছ থেকে বকা খেতে হয়েছে। ফারাজ শুধু রুশদীকে কল দিয়ে রাগ দেখিয়ে ক্যান্টিন থেকে খেতে বলেই ক্ষান্ত হয়নি; রুশদী খাচ্ছে কি-না তার তদারকি করার জন্য ভিডিও কল দিয়ে বসে আছে। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে ফারাজ কড়া নজরে তাকিয়ে আছে।

রুশদীর অলসভাবে খাওয়া দেখে ফোনের ওপাশ থেকে ফারাজ হঠাৎ আবার এক ধমক লাগালো, "একটা স্যান্ডউইচ খেতে এতক্ষণ সময় লাগে? জলদি শেষ করো!"

রুশদী এবার বিরক্ত হয়ে স্যান্ডউইচটা প্লেটে রেখে বলল,

"উফ ফারাজ! আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি? আপনি দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছেন!"

ফারাজ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

"কেমন হয়ে যাচ্ছি শুনি?"

"একেবারে একটা খাড়ুস হয়ে যাচ্ছেন আপনি! সবসময় এত ধমক দিয়ে কথা বলেন কেন? আপনার কি মনে হয় আমি আপনার ধমককে ভয় পাই?"

ফারাজ ঠোঁটের কোণে মৃদু হেসে বলল,

"ভয় যেহেতু পাও না, তবে আমি ধমক দিলে তোমার সমস্যাটা কোথায়?"

"আমার হাটবুট বেড়ে যায়! "

ফারাজ কিছুটা না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করল, "কী বেড়ে যায়?"

"আই মিন, আপনার ওই কী যেন বলে..."

ফারাজ নিজেই এবার হেসে হালকা স্বরে শুধরে দিল, "হৃদস্পন্দন?"

"হ্যাঁ, ওই তো! ওইটাই বেড়ে যায়! তাই ভুলেও আমাকে আর ধমক দিতে আসবেন।আমি আপনাকে ভয় টয় পাই না।"

রুশদীর কথা শুনে ফোনের ওপাশ থেকে ফারাজ হেসে উঠল, আর রুশদীও নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ একসঙ্গে হালকা মেজাজে হাসল। কিন্তু রুশদীর ঠোঁটের সেই চওড়া হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল, যখন সে ক্যান্টিনের প্রবেশদ্বারের দিকে তাকাল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে, ইয়াশ হনহন করে তার টেবিলের দিকেই এগিয়ে আসছে।

"আমি পরে কথা বলছি" বলে ফোনটা কেটে দিলো রুশদী।রফোনটা টেবিলের ওপর রাখতেই ইয়াশ এসে কোনো অনুমতি না নিয়েই সামনের খালি চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল। তারপর চোখের চশমাটা ঠিক করতে করতে উৎসুক চোখে জিজ্ঞেস করল,

"এত হাসিমুখে কার সাথে কথা বলছিলে?"

রুশদী প্লেট থেকে স্যান্ডউইচটা তুলে নিয়ে কামড় বসাল। তারপর চিবোতে চিবোতে উদাসীন গলায় বলল, "তোমাকে কেন বলতে যাব শুনি?"

"না মানে, ফোনে কথা বলার সময় তোমার মুখের হাসিটা রহস্যময় ছিল।আমা মনে হয় স্পেশাল কারো সাথে কথা বলছিলে, তাই না?"

"হুম, আমার হাজবেন্ড ছিল।"

"ইশ! মিথ্যা বলো না তো!"

"আরে, আমি সত্যিই বলছি!তোমার কি বিশ্বাস হয় না যে আমি ম্যারিড? শুধু বিয়ে কেন, আমার একটা ছেলেও আছে। বয়স এই ধরো... পাঁচ বছর হবে বোধহয়।"

ইয়াশ এবার হাসতে হাসতে চেয়ারের পিঠে হেলান দিল।রুশদীর কথাগুলো তার কাছে জোকস মনে হচ্ছে।রুশদীকে ওপর-নিচ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে সে বেশ চতুর একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

"আচ্ছা, তোমার নিজের বয়স কত বলো তো?"

"এই তো, বিশ কি একুশ হবে।"

"তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ, তোমার যখন মাত্র চৌদ্দ পনের বছর, তখনই তুমি মা হয়ে গিয়েছিলে? বাহ্! দারুণ তো! আমি জানি তুমি ম্যারিড নও। তাই বাদ দাও তো এবার!"

ইয়াশকে রুশদী কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারল না সে ম্যারিড।ইয়াশ কোন ব্যাপারটা কি মজা হিসেবে নিল।

—০—

ইয়াশের সঙ্গে ইদানীং রুশদীর টুকটাক কথাবার্তা হয়। ভার্সিটির একটা বন্ধু থাকলে দিনটা ভালোমতো কাটে।কিন্তু ইয়াশের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপের কিছুদিনের মধ্যেই রুশদী বুঝতে পারল, এই ছেলের মতিগতি সুবিধার না। ইয়াশ যে রুশদীকে পছন্দ করতে শুরু করেছে,তা বুঝতে বাকি নেই রুশদীর।ন,এই ছেলেকে আর প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।

রুশদী ইয়াশকে আগেভাগেই জানিয়ে রাখল, "আজ ক্লাস শেষে তুমি কিন্তু আমার সঙ্গেই থাকবে, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।"ইয়াশ তো মনে মনে খুশিতে আটখানা! সে মনে মনে কত কী যে কল্পনা করে নিল—না জানি রুশদী তাকে আজ কী সারপ্রাইজ দেবে!

অবশেষে ক্লাস শেষ হলো। ঘড়ির কাঁটা ধরে ফারাজও চলে এলো রুশদীকে নিতে। অফিস থেকে সরাসরি গাড়ি ছুটিয়ে এসেছে সে। আসার পথে শেরের স্কুল পড়ায় ওকেও সাথে করে তুলে নিয়ে এসেছে। রুশদী আর ইয়াশ যখন ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিং থেকে বের হয়ে বাইরের চত্বরে এলো, ঠিক তখনই ফারাজের কালো রঙের গাড়িটা এসে তাদের সামনে থামল। গাড়ি থেকে প্রথমে নামল দীর্ঘদেহী ফারাজ, আর তার পরপরই নামল স্কুলের ফুল ইউনিফর্ম পরা পুচকে শের।

ভার্সিটির সকলের সামনে রুশদী একপ্রকার ছুটে গিয়ে ফারাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল! ফারাজ নিজেও রুশদীর এই আকস্মিক কাণ্ডে বিস্মিত হলো।রুশদী আবার তড়িঘড়ি করে ফারাজকে ছেড়েও দিল। ফারাজকে ছেড়ে দিয়েই সে এক শেরকে কোলে তুলে নিল এবং ওর কচি গালে কয়েকটা চুমু খেলো। রুশদীর ভাবভঙ্গি আর এই অতি-আহ্লাদ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কত শত বছর পর সে ফারাজ আর শেরকে দেখছে!

খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশ বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।হাত ইশারায় তাকে কাছে ডেকে রুশদী বলল, "ইয়াশ, এই নাও তোমার সারপ্রাইজ! এই যে লম্বা লোকটাকে দেখছ,আমার হাজবেন্ড—ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান। আর আমার কোলে এই যে পুংটা ছেলেটা, ও হলো মিস্টার শেহরান খান শের, আমার ছেলে!"

আহা! রুশদী কত সহজ আর স্বাভাবিকভাবেই না কথাগুলো বলে দিল!দেখল প্রেমিক পুরুষ ইয়াশের দিলটা ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে গেল।দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের মনের ভেতর তখন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে একটা করুণ গান বাজছে—"ফাইট্টা যায় ও বুকটা ফাইট্টা যায়... ক্রাশ যখন নিজের হাজবেন্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, তখন ইয়াশের বুকটা ফাইট্টা যায়!"

ইয়াশ শুধু বোকার মতো চেয়ে রইল।

—০—

"আচ্ছা, তুমি হঠাৎ ওভাবে সবার সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরলে কেন বলো তো?"

গাড়ি তখন এসে থেমেছে টিএসসির মোড়ে।গাড়ির ভেতরে বসে ফুচকা খাচ্ছে ওরা।ফারাজ খাচ্ছে না,স্ট্রিট ফুড তার পছন্দ না। রুশদী টকজলে ডুবিয়ে একটা ফুচকা মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল,

"আমার সাথে একটা সুন্দর ছেলেকে দেখলেন না? ওর নাম ইয়াশ। ও মেবি আমাকে একটু-আধটু পছন্দ করতে শুরু করেছিল। তাই সুযোগ বুঝে ওর দিলটা ভেঙে চুরমার করে দিলাম!"

ফারাজ ভুরু কুঁচকে একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, "কত নিষ্ঠুর তুমি! একটা নিষ্পাপ ছেলেটার মন এভাবে ভাঙতে পারলে?ওর মনটা আরো বাজেভাবে ভাঙা উচিত ছিল! কত্ত বড় সাহস, আমার এই খাটো পটলের দিকে নজর দেয়!"

রুশদী ফারাজের 'খাটো পটল' সম্বোধন শুনে চোখ রাঙাল, তবে পরক্ষণেই হেসেই কুটি কুটি হয়ে বলল, "উফ ফারাজ, যেভাবে ওর দিলটা ভেঙেছি না, ও এখন চারটে নাপা এক্সট্রা খেলেও ওর মনের জ্বর কমবে না! একটা সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলের মায়ের প্রেমে পড়েছে ও—এই কথা মনে পড়লে দিনে সাতবার করে ইয়াশের ব্রেইন স্ট্রোক হবে!"

রুশদীর কথা শুনে গাড়ির ভেতর একচোট হাসির রোল পড়ে গেল।শের সবটা বুঝতে না পারলেও পাপা আর রুশদীর হাসি দেখে সে-ও হেসে উঠল।

ফুচকা খাওয়া শেষ হলে ফারাজ বিল মিটিয়ে দেওয়ার জন্য গাড়ি থেকে নামল।গাড়ির জানালা দিয়ে পাশে একটা ফুলের দোকান দেখে রুশদীর মনে হঠাৎ গাজরা কেনার শখ জাগল। সে গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ চোখে রকমারি ফুলের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ফারাজ ফুচকার বিল পরিশোধ করে এসে ঠিক তার পাশে দাঁড়াল।

"কী ফুল নেবে?"

রুশদী ঘাড় ঘুরিয়ে ফারাজের চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করল,

"আমাকে কী ফুলে মানাবে বলুন তো?"

ফারাজ এক মুহূর্ত গভীর চোখে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আলতো হেসে বলল,

"তুমি নিজেই তো একটা ফুল। তুমি হলে জান্নাতের সুবাস ছড়ানো ফুল, রুমাইসা!"

"ওমা! তাই নাকি? আর আপনি বুঝি সেই ফুলের মালি?"

"ফুলের যত্ন নেওয়া, তাকে আগলে রাখা তো মালিরই দায়িত্ব, নাকি?"

"বুঝলাম মালি সাহেব! এবার দয়া করে বলুন তো কোন ফুলটা কিনব? বাসায় গিয়ে আজ একটা সুন্দর শাড়ি পরব ভাবছি। শাড়ির সঙ্গে মানাবে, এমন একটা ফুলের নাম বলুন।"

ফারাজ একটু ভেবে বলল,

"শাড়ির সঙ্গে হয়তো গাজরা মানাবে কিন্তু ... উম, তুমি চন্দ্রমল্লিকা নাও।"

"ঠিক আছে, মালি সাহেব! আপনার পছন্দই সই।"

রুশদী দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাইয়া, আমাকে চন্দ্রমল্লিকা ফুল দিন তো।"

ফারাজের ফোনে কল আসায় সে দু-হাত দূরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কথা বলতে লাগল। কথা শেষ করে সে যখন আবার রুশদীর দিকে ফিরে আসছিল, ঠিক তখনই মাঝপথে একটা হলুদ শাড়ি পরা মেয়ে এসে ফারাজের পথ আগলে দাঁড়াল। অসম্ভব সুন্দরী সেই মেয়েটি মুখের ভেতর এক পৃথিবী কৃত্রিমতা আর মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলে উঠল,

"ভা...ইয়া, অলকানন্দা ফুলটা ঠিক কোথায় পাওয়া যাবে, বলতে পারবেন?"

ঘটনাটি লক্ষ্য করছিল রুশদী। মেয়েটির কথা শোনা মাত্রই তার মাথায় যেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল! এই স্লিভলেস ব্লাউজ পরা মেয়েটি কেন ফারাজের দিকে তাকিয়ে ওমন রসালো ভঙ্গিতে হেসে হেসে 'ভাইয়া' বলে ডাকবে? ফারাজকে অন্য কোনো মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলতে দেখে রুশদীর ভেতরের পজেসিভ রূপটা জেগে উঠল। সে হনহন করে এগিয়ে গিয়ে ঠিক দুজনের মাঝখানে দেয়াল দাঁড়াল।

রুশদী মেয়েটির দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

"জি আপু! ওনাকে কী জিজ্ঞেস করছেন আপনি?"

মেয়েটি কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। সে ঢোক গিলে বলল, "না মানে... ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করছিলাম অলকানন্দা ফুলটা কোথায় পাওয়া যাবে?"

রুশদী এবার কোমরে হাত দিয়ে,বলল,

"চোখের সামনে একটা ফুলের দোকান থাকতে আপনার ওনাকে কেন জিজ্ঞেস করতে হলো? ওনাকে কি এই স্কয়ারের ফুলের দোকানদার মনে হয় আপনার?"

মেয়েটি এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়বে ভাবেনি। আমতা আমতা করে বলল, "না... আসলে ভাইয়া...!"

মেয়েটার মুখে আবারও ফারাজের জন্য 'ভাইয়া' সম্বোধনটা শোনা মাত্রই রুশদীর তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।তার কান দিয়ে যেন গরম ভাপ বের হতে লাগল। সে ফারাজকে দেখিয়ে মেয়েটিকে বলল,

"এই যে শুনুন! এই ত্রিশ বছরের লোকটাকে আপনার কোনো দিক থেকে ভাইয়া মনে হয়? নাকি মনে মনে 'ভাইয়া' থেকে 'সাইয়া' বানানোর ইচ্ছা জাগছে? যদি তাই হয়, তবে চলুন এখনই কাজী অফিসে যাই! কনগ্র্যাচুলেশনস আপু, আজ থেকে আমি আপনার সতিন, আর ওই যে গাড়িতে বসে আছে—ওটা আপনার সৎ ছেলে শের!"

মেয়েটি এমন পরিস্থিতি মোটেও আশা করেনি।ফারাজকে একা দেখে এমনি কথা বলতে এসেছিল।কিন্তু ঘটনা তো....

"আরেহ! আপনি এমন উগ্র আচরণ আর অদ্ভুত সব কথাবার্তা বলছেন কেন? আমি তো জাস্ট একটা ফুলের কথা জিজ্ঞেস করেছি!"

আশেপাশের মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে তার পরোয়া করলো না রুশদী।ফারাজ তাকে আর কিছু বলতে বাধা দিলেও শুনলো না।

"বলব না মানে? একশো বার বলব! আপনি আমার হাজবেন্ডকে কেন ভাইয়া ডাকবেন শুনি? উনি আপনার ভাইয়া? আপনার কোন সম্পর্কের ভাইয়া শুনি? আপনার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তিতে কি ওনার নাম লেখা আছে!"

"আরেহ! আপনি কি পাগল নাকি?"

"পাগল মানে? আপনি ডাকবেন কেন ওনাকে ভাইয়া? আঙ্কেল ডাকবেন! এই ত্রিশ বছর বয়সের একটা ধাড়ি লোক আপনার ভাইয়া হয় কীভাবে? আঙ্কেল হয়, আঙ্কেল! আর সেই হিসেবে আমি হলাম আপনার আন্টি! আ...!"

রফারাজ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রুশদীকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, পেছন থেকে এক হাত দিয়ে ওর মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর অন্য হাতে ওকে একপ্রকার পাঁজাফোলা করে তুলে নিয়ে সোজা গাড়ির পেছনের সিটে চালান করে দিল।এই মেয়েকে আর এক সেকেন্ড কথা বলতে দিলে, মান-সম্মান বলে কিচ্ছু অবশিষ্ট থাকবে না! কী শুরু করে দিয়েছিল সবার সামনে!

--

বিকেলের ঘটনার পর থেকে রুশদী ফারাজের ওপর ভীষণ রেগে আছে। ফারাজ বেচারা কিছুতেই বুঝতে পারছে না এই পুরো ঘটনায় আসলে তার দোষটা কোথায়? সে অপরাধটা কী করেছে? একটা মেয়ে এসে একটা ফুলের কথা জিজ্ঞেস করেছে, এতে তার কী করার ছিল!

সন্ধ্যা নামতেই রুশদী নিজের পড়ার টেবিলে বসে পড়ল। তার এই পড়তে বসাটা অস্বাভাবিক। কারণ, রুশদী ইদানিং পড়তে বসে না।তখনই বই-খাতা বই খাতা নিয়ে বসে যখন সে ফারাজের উপর রাগ করে থাকে।ফারাজের সামনে যাতে তাকে পড়তে না হয়, কিংবা ফারাজের সাথে যাতে কোনো কথা বলতে না হয়,তাই পড়তে বসে।

ফারাজ রুমে এসে একটুক্ষণ রুশদীর কাণ্ড দেখল। তারপর ধীর পায়ে ওর টেবিলের সামনে গিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,

"রেগে আছো কেন?""

রুশদী বই থেকে মুখ না তুলেই চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, "আপনাকে কে বলল আমি রেগে আছি? আমি পড়াশোনা করছি!"

"তোমার কথার এই তেজই বলে দিচ্ছে তুমি রেগে আছো," ফারাজ মুচকি হেসে বলল।

এবার আর রুশদী নিজেকে সামলাতে পারল না। সে খাতা-কলম টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলে, দুই পা চেয়ারের ওপর তুলে ফারাজের দিকে সোজা ঘুরে বসল।

"রাগব না? ওই খাটাশ মেয়েটা আপনাকে ওভাবে হেসে হেসে 'ভাইয়া' ডাকবে কেন শুনি?"

"তাতে কী হয়েছে? একটা মেয়ে ভাইয়া বলতেই পারে।"

"ভাইয়া বলাতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না! সমস্যা ছিল ওই মেয়ের তাকানোর ভঙ্গিতে!মেয়েটা আপনার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন চোখ দিয়ে এক গিলে খাবে! এমন পুরুষ মানুষ বোধহয় ও জীবনে আগে কোনোদিন দেখেনি!"

এই বলে মেয়েটিকে মনে মনে আরও কয়েকটা গালমন্দ করে একটা বিশ্রী ভেংচি কাটল রুশদী।

"তা না দেখাই স্বাভাবিক। তোমার হাজবেন্ড কি দেখতে কম সুন্দর নাকি?"

"সুন্দর তো কী হয়েছে? আপনি ওই মেয়ের থেকে বড়!মেয়েটা তো বোধহয় আমার থেকেও ছোট।ওই মেয়ে আপনার দিকে এভাবে হা করে তাকাবে কেন?"

ফারাজ টেবিলের কোণায় ভর দিয়ে বসল। রুশদীর নাকের ডগায় আলতো একটা টোকা দিয়ে বলল,

"শোনো খাটো পটল, বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী পুরুষদের আসল সৌন্দর্য বাড়ে তিরিশের পরে। পঁয়ত্রিশ ঊর্ধ্ব পুরুষদের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি থাকে। সো, ভবিষ্যতে তোমাকে এমন অনেক মেয়ের চাউনি সহ্য করতে হবে।রেডি থাকো।"

রুশদী ফারাজের মুখের অবয়ব, চওড়া কাঁধ আর গভীর চোখ দুটোর দিকে তাকাল। সত্যিই তো! ফারাজ দিন দিন কেমন যেন বেশি সুন্দর আর আকর্ষণীয় হয়ে যাচ্ছে! দিন দিন সে যদি এভাবে আরও হ্যান্ডসাম হতে থাকে, তবে তো দুনিয়ার যত লুচু আর সস্তা মেয়ে আছে—সবাই ফারাজের দিকেই নজর দেবে! না, এ কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না! ফারাজকে অন্য কারো নজরে পড়তে দেওয়া অসম্ভব!

রুশদী হিংসা মেশানো গলায় বলল,

"পুরুষদেরও পর্দা করা ফরজ করা হোক।"

--

তিন দিন আগে একটা ইমেইল পাঠিয়েছিল সিফাত। মেইলের জবাবটা এলো আজ। সিফাত লিখেছিল, "আই ওয়ান্ট টু টক টু ইউ!"

আজ মিতুর সংক্ষিপ্ত রিপ্লাই এসেছে—

"ওমা! কালো মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে আপনার ইমেজ খারাপ হবে না?"

কয়েক দিন আগে মিতুর সঙ্গে করা রূঢ় আর খারাপ ব্যবহারের জন্য ওইদিন রাতে সিফাতের নিজের ভেতরেই একটা অপরাধবোধ জেগেছিল। বুকটার ভেতর কেমন একটা খচখচে অস্বস্তি হয়েছিল। কিন্তু আজ তিন দিন পর, সেই অপরাধবোধ বা খারাপ লাগা নেই।এখন আর সেসব কিছুই কাজ করছে না সিফাতের ভেতর। আসলে সিফাত মানুষটাই এমন—অদ্ভুত এক সুতোর লাগামছাড়া ঘুড়ি। হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া আর খামখেয়ালি চলায় তার আনন্দ। এই সে কোনো এক আবেগে একটা সিদ্ধান্ত নিল, তো আবার পরের সেকেন্ডেই নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একশো আশি ডিগ্রি কোণে সরে দাঁড়াবে।ছন্নছাড়া একটা চরিত্র।

যেমন ওইদিন রাতে শানের সঙ্গে কথা বলার সময় সিফাতের মনে হচ্ছিল, মিতুকে সে হয়তো ভালোবেসে ফেলেছে বা পছন্দ করতে শুরু করেছে। মিতুর মলিন মুখটার কথা ভেবে তার মনটা হু হু করে উঠেছিল, মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য ভেতরটা ছটফট করছিল। অথচ মাত্র এই তিন দিনের ব্যবধানে সেই অনুভূতিগুলো কোন অতল গহ্বরে ধামাচাপা পড়ে গেল! এখন আর মিতুর জন্য সেই টানটা সে নিজের ভেতর ঠিকঠাক খুঁজে পাচ্ছে না।

সিফাত মেসেজ টাইপ করে সেন্ড করে দিল, "ভালো কথা মনে করিয়েছ। থ্যাংক ইউ, মিতু শেখ।"

মেসেজটা পাঠানো মাত্রই মিতু সেটা সিন করল, কিন্তু কোনো রিপ্লাই দিল না। ফোনের ওপাশের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা এক অষ্টাদশীর প্রথম প্রণয়ের যে বিষাক্ত ও যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি, তার বিন্দুমাত্র আঁচও পেল না সিফাত। মিতুর মনের কোণে হয়তো একটা সুপ্ত আশা জেগেছিল—সিফাত হয়তো তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত। কিন্তু সিফাত তো সিফাতই! তাকে কোনো চেনা অসম্ভব।

তবে সিফাত নিজেও যে খুব শান্তিতে আছে, তা নয়। সে নিজের মনের অস্থিরতার সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠছে না। তার মন ঠিক কার ডাকে সাড়া দিতে চাচ্ছে, কার জন্য এই ব্যাকুলতা—সে নিজেই তা মেলাতে পারছে না। এমনটাও কি হতে পারে? চিরকাল রূপের পেছনে ছুটে বেড়ানো, সুন্দরের পূজারী এই সিফাত কি শেষমেশ এক সাধারণ কৃষ্ণাঙ্গী কন্যার প্রেমে পড়েছে? নিজের এই ভাবনার ওপর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না সিফাতের। মাথার ভেতরের এই অবাধ্য চিন্তাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য সে সোজা ক্লাবের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আজ আর শানকে সঙ্গে নিল না। শান সাথে থাকলে সারাক্ষণ নানারকম নীতিবাক্য শুনিয়ে মাথায় খ্যাচখ্যাচ করবে, সেই বিরক্তি নেওয়ার মতো মানসিকতা আজ তার নেই।

কিন্তু ক্লাবের চেনা আলো-আঁধারিতেও আজ সিফাতের মন টিকল না। ভেতরের অস্থিরতা কমাতে সে গপগপ করে মদ গিলে নিল। কিন্তু আজ যেন নেশাটাও তার সাথে বেইমানি করল।ক্লাবের ফ্লোরে কত শত চটপটে, স্মার্ট আর সুন্দরী মেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সিফাত নিজেও অবলীলায় তাদের কয়েকজনের কোমর জড়িয়ে ধরে ড্যান্স ফ্লোরে নাচলো। কিন্তু আজ কোনো এক অদ্ভুত কারণে একটা মেয়েকেও তার চোখে ধরল না। সবাই অসম্ভব সুন্দরী, ড্রেসআপে আধুনিক—কিন্তু কারো চোখের ভেতর সেই মায়াটা নেই, যেটা মিতুর ওই শান্ত দুটো চোখে লেপ্টে থাকে। এই আধুনিক মেয়েগুলোর হৃদয়ের গভীর থেকে আসা চতুর আর চড়া হাসিগুলো আজ সিফাতের কানে কেমন যেন কৃত্রিম ঠেকল। অথচ মিতুর সেই লাজুক, সাধারণ হাসিটা কতই না মিষ্টি ছিল!

ক্লাবের কোলাহল আর ভালো লাগল না। সিফাত সেখান থেকে বের হয়ে সোজা চলে আসল সিকদার কুঞ্জে। আর মাত্র দু-তিনটে দিন, এর মধ্যেই ওরা ক্লাবে চলে যাবে। সামনে একটা বড় ম্যাচ আছে, তাই প্রস্তুতি নিতে হবে।

রুমে ঢুকে সিফাত দেখল, শান আগে থেকেই এসে তার বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। শানের মন খারাপ।তিথি মেয়েটা দিন দিন কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে কোনো এক অতল গহ্বরে, তাকে যেন কিছুতেই টেনে তোলা যাচ্ছে না।রুমে ঢুকেই সিফাত আর কোনো দিকে না তাকিয়ে শানের পাশে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে মিতুর চ্যাটবক্সটা চেক করল সে। কিন্তু না, মিতু এবার মেসেজটা আর সিনই করেনি।এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে শানের হাত ধরে টেনে তুলল সিফাত সোজা চলে এলো খান বাড়িতে।

ধাই ধাই করে সিঁড়ি ভেঙে হেটে সিফাত গিয়ে দাঁড়াল ফারাজের ঘরের সামনে। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় একটা ছুঁইছুঁই। সিফাত ওসব কোনো ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে দরজায় দুপ দাপ করে কড়া নাড়তে লাগল। এমন অসময়ে দরজায় বিকট শব্দ শুনে রুশদী ধড়ফড় করে উঠে দরজা খুলে দিল। কিন্তু দরজার ওপাশে এত রাতে শান আর সিফাতকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে অবাক হলো।

রুশদীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সিফাত ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। সুইচবোর্ডে হাত দিয়ে ঘরের সব কটি লাইট জ্বালিয়ে দিল সে। তীব্র আলোয় পুচকে শের আর ফারাজ—দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। ফারাজ চোখ ডলতে ডলতে এত রাতে ভাইদের নিজের শোবার ঘরে দেখে বিছানা ছাড়ল। কিছুটা বিরক্ত আর কৌতুহলী হয়ে সে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল যে এত রাতে তাদের এখানে আসার কী প্রয়োজন পড়ল? কিন্তু ফারাজকে মুখ খোলার সুযোগই দিল না সিফাত।

"রুশদী, তোমার নানু যেন চট্টগ্রামের কোথায় থাকেন?" সিফাত সোজা প্রশ্ন করল।

"সীতাকুণ্ডে!"

"সীতাকুণ্ডের ঠিক কোথায়? আমাকে এখনই ফুল ডিটেইলস দাও!"

সিফাতের গলায় এক অদ্ভুত তাড়া।

রুশদী ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু কেন? এত রাতে হঠাৎ নানাবাড়ির ঠিকানা দিয়ে কী করবে?"

"তোর নানাবাড়ি যাব, খুব আর্জেন্ট দরকার আছে,"

ফারাজ বলল,

"তুই কেন রুশদীর নানুবাড়ি যাবি?কি দরকার তোর?"

সিফাত সরাসরি বলে দিল,

"মিতুকে বিয়ে করব আমি! তাই ওকে এখনই ওখান থেকে তুলে আনতে যাচ্ছি।"

সিফাতের মুখের এই বাক্য শুনে ফারাজ, শান আর রুশদী—তিনজনেই হতভম্ব হয়ে গেল।সিফাত যে মিতুকে এতটা পছন্দ করে, এমনকি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছে—এই কথা তো সে তার চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গী শানকেও কোনোদিন বলেনি!

শান সিফাতের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, "সিফাত! তুই কি উল্টাপাল্টা যা তা বলছিস? ক্লাবে গিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু খেয়ে এসেছিস নাকি আজ?"

ওদিকে মিতুর নাম আর সিফাতের মুখে তাকে তুলে আনার কথা শুনে রুশদীর ভেতরের রাগটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।

"তুমি কোন সাহসে এত বড় কথা মুখে আনছ ভাইয়া? তোমার কি মনে হয় আমি এব্যাপারে কিচ্ছু জানি না? কম অপমান তো করোনি ওকে, এখন কি অপমান করা আরও বাকি আছে তোমার? আমার বোনের থেকে একদম দূরে থাকো! খবরদার, তুমি যদি আর কোনোদিন আমার বোনের সাথে কোনো রকম কন্টাক্ট করার চেষ্টা করেছ...!"

সিফাত নিজ ভঙ্গিতে বলল,

"ভাইয়া! রুশদীকে... আই মিন আমার এই প্রাণপ্রিয় ভাবিজিকে আমার প্রেমে ভিলেন হতে মানা করো!"

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন