ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

১ম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

[📍কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

ঘন আঁধারে ঢাকা জঙ্গল। আকারে লম্বা ফার গাছগুলো জঙ্গলটিকে আরো ভূতুড়ে করে তুলেছে। সেই জঙ্গলের বুক চিরে এক রমণী ভারী পেট নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছুটছে। পরনে তার লম্বা আলখাল্লা। পা হতে মাথা পর্যন্ত পুরোটাই আবদ্ধ। মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে বারকয়েক পরতে গিয়েও নিজেকে বাঁচিয়েছে। গোড়ালি গড়িয়ে পরা র*ক্তের ধারা বলে দিচ্ছে অঘটন যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। তবুও সে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে চলেছে। অদূরে কিছু একটা শো শো করে তেড়ে আসছে। অমাবস্যার ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝে আকাশে কিছু সংখ্যক আগুনের উল্কা দেখা যাচ্ছে। যা রমণীর মনে দ্বিগুণ ভীতির সৃষ্টি করছে। আরো কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ কিছু একটার সাথে বেঁধে মুখ থুবড়ে পরলো সে। পেটে আঘাত লাগায় জান বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও মুখে হাত চেপে নিজেকে সামলে নিলো। পেটে আঘাত লাগায় র*ক্তে ভিজে গেলো মাটি। কোন রকম নিজেকে টেনে একটি গাছের সাথে ঠেস দিয়ে বসলো সে। ঝড়ের গতিতে কিছু একটা দূর থেকে তার দিকে তেড়ে আসছে বুঝতে পেরে শব্দবিহীন কেঁদে ফেলল। শেষ রক্ষা বুঝি হলো না। পেটের ওপর হাত রেখে খুবই ধীরে বলল,

" আপনার আমানত আমি রক্ষা করতে পারলাম না।"

ঠিক সে সময় দূরে লণ্ঠনের আলোর দেখা মিলল। একটি অস্পষ্ট অবয়ব। তার হাতের তীব্র লণ্ঠনের আলোয় আঁধারে ছেয়ে থাকা জঙ্গলটি মুহূর্তে জ্বলে উঠল।

ধপ করে চোখ মেলে উঠে বসলো আমালিয়া। বড়বড় নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইলো। আবারও একটি নতুন স্বপ্ন। ভয় আর উত্তেজনায় ঘেমে একাকার মেয়েটি। পিঠসম অগোছালো সোনালী চুলগুলো গলায়, ঘাড়ে লেপ্টে। নিটোল গড়নের চেহারায় তার মায়ার ছড়াছড়ি। নিখুঁত সুন্দর্যের অধিকারী মেয়েটির খুঁত বলতে শুধু ঐ চোখ দুটি। এই অপূর্ব সুন্দর মেয়েটির দুচোখ দু'রকমের। একটি গভীর সমুদ্রের মতো নীল। আর অন্যটি গাঢ় বাদামী রঙের। সে যেন এক রহস্য ঘেরা কোনো উপন্যাস। একটি মায়ার প্রতীক হলে অন্যটি গভীর নিসংস্রতার প্রতীক। আমালিয়া দু'চোখ বন্ধ করে বুকে হাত রেখে গভীর এক নিশ্বাস নিলো। বুঝ হওয়ার পর থেকে এমন স্বপ্ন সে হরহামেশা দেখে এসেছে। সর্বদা নয়, কখনো কখনো এমন অদ্ভুত গায়ে কাঁটা দেয়া স্বপ্ন আসে। এক এক সময় এক এক রকমের স্বপ্ন আসে। যার অর্থ সে বুঝতে পারে না। স্বপ্নগুলো বাস্তব চিত্রের মতো। যেন আমালিয়া নিজে সেই মুহূর্তের সাক্ষী। অথচ সে কিছুই মনে করতে পারে না। কে ঐ রমণী? কেনই বা সে ওভাবে ছুটছিল? আর ওই লণ্ঠন হাতে অবয়বটি? আহ্! কিছুই মাথায় আসছে না। আমালিয়া মাথায় দু'হাত চেপে বসে রইলো। তার নিশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক ভাবে ওঠা-নামা করছে। আমালিয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে জানালা গলিয়ে দূর পাহাড়ে দিলো। ভোরের প্রথম আলো জানালা গলিয়ে আমালিয়া চোখেমুখে পরছে। যার দরুন আলামিয়ার ডান পাশের গাঢ় বাদামী চোখটি জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠল। সাধারণ কেউ দেখলে হয়তো ভয় পাবে কিন্তু আমালিয়ার এসবে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এমন শুধু ভোরের প্রথম রশ্মি ও পূর্ণিমার আলো পরলেই হয়। এ জন্য সে এই দুই সময় লোকালয়ে কারো সামনে যায় না। আমালিয়া তার শরীরে জড়িয়ে থাকা পশমের চাদরটি সরিয়ে চটের বিছানা থেকে উঠে দাড়ালো। ভোর হয়ে গিয়েছে। এখানে সকলের আলো ফোঁটার পূর্বে বিছানা ছেড়ে ক্ষেতে কাজ করতে চলে যায়। আমলিয়া মূলত চামলিহেমশিন নামের একটি পাহাড়ি গ্রামে থাকে। এটি তুরস্কের উত্তর-পূর্ব দিকে, রিজে প্রদেশে অবস্থিত এক অত্যন্ত সবুজ, বরফগলা নদী ও বনভূমিতে ঘেরা পাহাড়ি এলাকা। এবং এটি কারাদেনিজ অঞ্চলের অংশ। দিনের আলোতে এই স্থানটি ঠিক যতটা সুন্দর ও মুগ্ধকর, রাতের আঁধারে ঠিক ততটাই ভয়ানক। এটি এমনই এক পরিত্যক্ত গ্রাম যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া মেলেনি বিশেষ। না শহরের সাথে যোগাযোগের জন্য ভালো রাস্তা, আর নাই বা বিদ্যুতের সুবিধা। কিছুরই দেখা মিলে না এখানে। কম জনসংখ্যা এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ উপজাতি। এখানে শিক্ষার ব্যবস্থা নেই, নেই ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা। তুরস্কের সরকারও কখনো তাদের কোনো খোঁজ নিতে আসেনি। এখানে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চলে। কারো কোনো সমস্যা হলে পঞ্চায়েত সমাধান করে থাকেন। যদিও চামলিহেমশিনের মানুষ খুবই ভাল ও সরল মনের। এরা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অত্যধিক পরিশ্রম করেন। তারা মূলত চা ও কৃষি কাজ করে থাকে। আমালিয়ার মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো পৃথিবীর কেউ জানেই না চামলিহেমশিন নামে কোনো গ্রাম আছে।

- তুমি উঠে গিয়েছো?

প্রায় সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা ঘরে প্রবেশ করতে করতে বললেন কথাটি। আমালিয়া স্বভাবসুলভ হেসে বলল,

- শুভ সকাল দাদী।

বৃদ্ধা মুচকি এসে ঘরের অন্য পাশে রাখা কিছু বাসন পর্যবেক্ষন করতে করতে বললেন,

- শুভ সকাল। আজ তুমি দেরি করে ফেলেছ। এর কারণ কি এগুলো?

হাতের এক আঙুল দিয়ে ইশারায় মাটিতে পরে থাকা কিছু ভেজষ দেখিয়ে বললেন সে। আমালিয়া চোখ খিঁচে বন্ধ করে দাঁতে জ্বিভ কাঁটলো। আবারও সে ধরা পরে গিয়েছে। কাল গভীর রাত পর্যন্ত এগুলো নিয়ে কাজ করে ছিল সে। সে মূলত এক ধরনের ঔষধি বানাতে চেয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে না পেরে হাল ছেড়ে ঘুমিয়ে পরে। ভেবে ছিল দাদী ওঠার পূর্বে সব সরিয়ে ফেলবে কিন্তু তার আগেই ধরা পরে গেল। বৃদ্ধা বড় করে নিশ্বাস ফেললেন। এগিয়ে এসে আমালিয়ার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন মুখোমুখি। আমালিয়া তাঁর মায়াবী চোখের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বৃদ্ধার উদ্দেশ্যে। তাঁর সামনে দাড়িয়ে থাকা বৃদ্ধার কাছে বয়স যেন একটি সংখ্যা মাত্র। চেহারায় বয়সের ছাপ সামান্য লক্ষ্য করা গেলেও শারীরিক শক্তিতে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পরেনি। এখনো যা অল্প বয়সী যুবতী মেয়েরা করতে পারে না তা তিনি অনায়াসে করতে পারেন। উচ্চতায় একজন লম্বা পুরুষকেও হার মানিয়ে দিতে পারেন তিনি। আমালিয়া তার নিকট এক সামান্য বাচ্চা যেন। যদিও আমালিয়ার উচ্চতা ৫'-৫"। তবুও সামনে দাঁড়ানো রমণীর তুলনায় তা নিছক এক মজা বই আর কিছু না। অথচ এই বৃদ্ধাই আমালিয়ার জন্মদাতা পিতার মা। বড়ই আশ্চর্যের বিষয়।

- তোমাকে কতবার করে বলেছি এসব জিনিস মজা করার জন্য নয়। আমার অনুমতি ছাড়া কিংবা আমি সাথে না থাকলে যেকোনো ঔষধি নিজের ওপর প্রয়োগ না করতে। আমার কথা কেন শোনা না তুমি লিয়া?

তার কন্ঠস্বর মিইয়ে এলো। বামহাত উঠে এলো আদুরে ভঙ্গিতে আমালিয়ার ডান গালে। আমালিয়া অসহায় অনুভব করলো। মনে মনে অনুতপ্ত হলো। কিন্তু এরপরও সে আবারও একই কাজ করবে। কারণ সে জানে না। তবে কেন যেন এই ভেজষ উদ্ভিদ, লতা-পাতা, ঔষধি তাকে খুব করে টানে। সে নিজেকে সামলে রাখতে পারে না এগুলো দেখলে। তবুও সে এখন দাদীকে সান্তনা দিতে বলল,

- দুঃখিত দাদী। আমার তোমার কথা শোনা উচিত ছিল। এমন আর কখনো হবে না দেখো।

বৃদ্ধা চোখ ছোট ছোট করে চাইলো ওর দিকে। এমন প্রতিশ্রুতি আমালিয়া অজস্রবার দিয়েছে। এবং পরবর্তীতে একটিও রাখেনি।

- সত্যিই আর হবে না?

সে সন্দিহান প্রশ্নটি করলো। কারণ তাঁর জানা আছে আমালিয়া আজ আবার একই কাজ করবে। আমালিয়ার চুরি ধরা পরে যাওয়ায় সে দাঁত বের করে হেসে দিল। ভোরের আলোয় সেই হাসি এক অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে রইলো।

_______

- আমালিয়া, আমালিয়া।

আমালিয়া নিজেদের ক্ষেতের উদ্দেশ্যে পাহাড়ি কাদামাটির রাস্তা ধরে যাচ্ছিল। পরণে তাঁর গোড়ালির কিছুটা ওপর পর্যন্ত গাউন ও সাথে কারুকাজ করা একটি কোটি। কোমরে ছোট ছোট কয়েন আকৃতির ঝিলড় বেল্ট। মাথা স্কার্ফ দিয়ে অর্ধ বেঁধে রাখা এবং সাথে কয়েন আকৃতির ঝিলড় সৌন্দর্যের জন্য চুলের সাথে বেঁধে রাখা। তাঁর সোনালী চুলগুলো মুক্ত। পিঠে একটি বেতের ঝুড়ি। দূর হতে নিজের নাম শুনে আমালিয়ার পা থেমে গেল। আশপাশ তাকিয়ে খুঁজলো নাম ধরে ডাকা ব্যক্তিকে। কাউকে দেখতে না পেয়ে আমালিয়া আবারও হেলে দুলে হেঁটে চলল। কিছু পথ অতিক্রম করার পর আবারো একই ভাবে তাঁর নাম ধরে ডেকে উঠল।

- আমালিয়া, আরে এই লিয়া। দাড়াও না!

এবার খুব কাছ থেকে ডাকায় স্পষ্ট শুনতে পেলো আমালিয়া। বুঝতে পারল কণ্ঠদাতা কে? এরই মাঝে একটি মেয়ে ছুটে এলো আমালিয়ার নিকট।

- মেলিসা!

মেলিসা। আমালিয়ার সমবয়সী ও তাঁর সব থেকে ঘনিষ্ট বন্ধু। তাঁদের সর্বদা এক সাথেই দেখতে পাওয়া যায়। মেলিসা একজন উপজাতি। সে ছাড়াও আমালিয়ার আরো কয়েকজন বন্ধু রয়েছে কিন্তু তাদের মাঝে সব থেকে প্রিয় মেলিসা। মেয়েটি ভীষণ সরল ও মিষ্টি ভাষী। ওর মনে হিংসা, অহংকারের ছিটে ফোঁটা নেই। সর্বদা হাস্যোজ্বল, বোকাসোকা মেয়েটি তাই আমালিয়ার খুব কাছের বন্ধু হতে সময় নিল না। তাদের বন্ধুত্ব সেই বাল্যকালের। যখন থেকে সে চামলিহেমশিন এসেছে তখন থেকে। মেলিসা নামের মেয়েটি হাঁপাতে হাঁপাতে আমালিয়ার সামনে এসে দুহাতের সাহায্যে হাঁটুতে ভার রেখে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলো। আমালিয়া একটি ভ্রু কিছুটা উপরে তুলে মেলিসাকে পর্যবেক্ষন করে নিল। যদিও তার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে জানার জন্য কি হয়েছে মেলিসার, তবুও সে অপেক্ষা করলো। মেলিসা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

- সেই কখন থেকে ডেকে চলেছি তোমাকে।

আমালিয়া তাঁর ঠোঁটে হাসি টেনে মায়াবী স্বরে বলল,

- দুঃখিত, শুনতে পাইনি।

মেলিসা মুহূর্তে গোলে গেল। আমালিয়া মেয়েটি ছলনাময়ী। মেলিসা জানে এই মেয়ে কি ভীষণ দুষ্টু। ভয়ানক ভয়ানক কর্ম করে তার ছলচাতুরি দিয়ে সকলকে বশ করে নেয়। যদিও আমালিয়া তাঁর এই বিশেষ গুণ মেলিসার ওপর কখনো প্রয়োগ করেনি। করবেই বা কেন? মেলিসা তো পূর্ব থেকেই এই মেয়ের দিওয়ানি। এতটা কষ্ট করানোর পরও তাই মেলিসা আমালিয়াকে কিছু বলতে পারলো না। উল্টো আমালিয়ার কাঁধে হাত রেখে কাছাকাছি গিয়ে সামনে আগাতে আগাতে বলল,

- কোনো ব্যাপার না। ছাড়ো এসব। তোমাকে একটি বিশেষ সংবাদ দেয়ার জন্য ডেকে ছিলাম।

আমালিয়া মেলিসার সাথে হাঁটতে হাঁটতে কৌতূহলী প্রশ্ন করলো,

- বিশেষ সংবাদ?

মেলিসা মুহূর্তে তাঁর হাস্যোজ্বল মুখশ্রী গম্ভীর ও মনোযোগী করে বলল,

- হুম হুম। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ।

- তা কি তোমার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ?

- জানো ইল্মীরার পরিবার ওর বিয়ে ঠিক করেছে।

আমেলিয়া তাঁর চলার গতি কমিয়ে দিল। ইল্মীরার বিয়ে! সে অবাক হয়ে বলল,

- কিহ? কিন্তু ইল্মীরা তো এখনো অনেক ছোট!

মেলিসা ভীষণ দুখি স্বরে বলল,

- কি আসে যায় তাতে? শুনেছি ছেলের বাড়ি চামলিহেমশিনের দক্ষিণ পাহাড়ে। ছেলের অনেক চায়ের জমি।

তাঁদের এখানে যে ব্যক্তির চায়ের জমি থাকে তাকে বিশেষ ধনী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। আমেলিয়া আবারও চলতে চলতে বলল,

- ও এই ব্যাপার। তাই বলে এতো ছোট বয়সে?

- ওহহো আমালিয়া আমাদের গ্রামে এর থেকেও ছোট মেয়েদের বিয়ে দেয়া হয় তুমি ভুলে যাচ্ছো কেন? আমাদের পরিবার ভালো বলে এখনো আমরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছি। নয়তো আমাদের এতদিনে বাচ্চা সামলাতে হতো। তাছাড়া ইল্মীরা নিজে এই বিয়েতে রাজি।

আমালিয়া কথা বাড়ালো না আর। মেলিসা ভুল কিছু বলেনি। তাঁদের গ্রামে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া হয়। সেখানে ইল্মীরার ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হওয়াটা আহামরি কিছুই না। ইল্মীরা তাদেরই বন্ধু। বয়সে তাদের থেকে ৪ বছরের ছোট হলেও মেয়েটি দারুন বুদ্ধিমতি। তাঁদের বন্ধুরা সকলেই তাঁর ও মেলিসার থেকে বয়সে ছোট। এর একটি কারণ হলো তাঁদের গ্রামে অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া। কিন্তু মেলিসা বা তাঁর ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেনি। মেলিসার বাবা গ্রামের চার পঞ্চায়েত প্রধানের মাঝে একজন। তিনি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। আমালিয়া শুনেছে কোন এক সময় মেলিসার বাবা শহরে থাকতেন। শহুরে চিন্তা ধারা বহাল রেখে তাই তিনি মেয়েকে এখনো বিয়ে দেয় নিই। তাছাড়া মেলিসার বাবার থেকে আমালিয়া ও মেলিসা শিক্ষা গ্রহণও করে। আমালিয়ার ক্ষেত্রে ঘটনা কি তা সে জানে না। দাদী কখনো তাঁর বিয়ে নিয়ে কিছু বলেননি। তবে ইল্মীরার বিয়ের কথা শুনে তার ভীষণ খারাপ লাগছে।মেয়েটির মাঝে কিছু শেখার ইচ্ছা শক্তি প্রবল ছিল। অথচ সেই মেয়েটিরই বিয়ে হয়ে যাবে!

- লিয়া আজ নতুন কি শিখলে?

আমালিয়া নিজের চিন্তা থেকে বেরিয়ে মেলিসার পানে তাকালো। সে এখন শুকনো আমচুর খেতে ব্যস্ত। আমালিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

- সফল হয়নি।

মেলিসা মুখে আমচুর রেখে আমালিয়াকে পর্যবেক্ষন করে নিল। পরীক্ষণ যতবার অসফল হয় ততবারই আমালিয়া ভীষণ উদাস হয়ে পরে।

- আরে কোনো ব্যাপার না। যতবার তুমি অসফল হয়েছো ততবার তুমি নতুন কিছু শিখতে পেরেছ। দেখবে দ্রুত এই কাজটিও সফল ভাবে করে ফেলবে। আচ্ছা এই ঔষধিটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?

- হ্যাঁ। গ্রামে বাচ্চাদের মাঝে যে অসুখটা ছড়িয়েছে এটি তার প্রতিষেধক।

- কিন্তু সকলে যে বলছে এটি একটি অভিশাপ।

আমালিয়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো।

- এটি কোনো অভিশাপ না। তুমি তো জানো আমাদের গ্রামের মানুষ কুসংস্কারে বিশ্বাসী। তাই তারা কোনো রোগে আক্রান্ত হলেই মনে করেন এটি একটি অভিশাপ, যতক্ষণে না এর প্রতিকার পাওয়া যায়। শোনো মেলিসা, এটি একটি ভয়াবহ রোগ। দাদী বলেছে সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করা হলে জীবন নাশ হতে পারে।

- তাহলে তো এটি সত্যিই ভয়াবহ ব্যাপার।

- হ্যাঁ। আমি আর দাদী এর জন্যই শ্রতিষেধক বানানোর চেষ্টা করছি। দাদীর কাছে শুনেছি, পুরান লোককথায় আছে উত্তর জঙ্গলের পাহাড়ের শেষ কিনারায় এক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। যার ফুল শুধু সন্ধ্যায় ফোটে। এটি অত্যন্ত অমুল্য ভেজষ। এটি দিয়ে এই রোগের প্রতিষেধক বানানো সম্ভব। কিন্তু আদোও এটি সত্য কিনা তার প্রমান নেই।

মেলিসা তাঁর খাওয়া থামিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,

- উত্তর জঙ্গল? কিন্তু লিয়া সেটি তো...।

আমালিয়া মুচকি হেসে বলল,

- তুমি নিজে কখনো দেখেছো?

- না কিন্তু ওখানে যারা গিয়েছে তারা কখনো ফিরে আসেনি।

আমালিয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। যেন মেলিসা খুব মজার কিছু বলেছে। উত্তর জঙ্গল নিয়ে গ্রামবাসীর মাঝে একটি কুসংস্কারের প্রথা রয়েছে। সকলের মতে ওখানে খারাপ প্রজাতির জ্বিনের বসবাস। যার দরুন সাধারণ মানুষ ওখানে গেলে ফিরে আসে না। যদিও এসব লোককথা, কেউ কখনো স্বচক্ষে দেখেনি। তবুও অন্ধের মতো বিশ্বাস করে যায়।

- আচ্ছা তাই! তাহলে দেখা যাক আমি ফিরে আসতে পারি কি না?

আমালিয়া জ্বিনে বিশ্বাস করে। মানুষ রয়েছে তো জ্বিনও রয়েছে। আল্লাহর সৃষ্টির ওপর অবিশ্বাস করার দুঃসাহস তার নেই। তবুও কেন যেন তাঁর এই কথাটি বিশ্বাস হয় না। মন বলে অন্যকোনো রহস্য রয়েছে, যার দরুন এমন মিথ্যা রটানো হয়েছে।

- তুমি উত্তর জঙ্গলে যাবে? কিন্তু কেন লিয়া?

মেলিসা ভয়ার্ত, চিন্তিত। এই আমালিয়াকে নিয়ে পারা যায় না। মেয়েটি সর্বদা এমন কাজ করে যা সাধারণ মানুষ চিন্তাও করতে ভয় পায়। অথচ মেয়েটি তা নির্দ্বিধায় করে ফেলে। এরপর সে নিজে তো দাদীর কাছে বকা খায়ই মেলিসাকেও বকা খেতে বাধ্য করে। অথচ মেলিসা আমালিয়াকে কখনো কিছু বলতে পারে না। বড্ড ভালবাসে যে।

- হ্যাঁ। সুফিয়ার বাচ্চাটার অবস্থা মুমূর্ষ প্রায়। মাত্র দেখে এলাম নিশ্বাস খুব ধীরে চলছে। সুফিয়া কাঁদছিল খুব। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অঘটন ঘটে যাবে।

- দাদী জানতে পারলে ভীষণ রেগে যাবে। মার পরবে কিন্তু।

আমালিয়া ঠোঁটের হাসি প্রসারিত করে চোখ সরু করে মেলিসাকে শাসিয়ে বলল,

- এখানে আমি আর তুমি ছাড়া কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমি তো দাদীকে বলবো না। তাহলে কি তুমি বলবে?

সে এক ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো মেলিসার কাছে। মেলিসা বুঝতে পারল আমালিয়ার মনোভাব। প্রতিবার এমনই করে মেয়েটি। তাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। সে নিজের দুহাত উপরে তুলে আমালিয়ার থেকে দূরে সরে বারবার মাথা নাড়িয়ে জানালো সে কাউকে কিছু বলব না। আমালিয়া তাঁর হাসি আরো প্রসারিত করে মেলিসাকে সঙ্গে নিয়ে চলল ক্ষেতের দিকে।

_________

- লিয়া, লিয়া।

সূর্যাস্ত হওয়ার পথে প্রায়। আমালিয়া দাদীর চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে এসেছে। তাঁর পিঠে পাটের ঝুড়ি, হাতে একটি মশাল। যে জঙ্গলে মানুষ দিনের বেলা যেতে সাহস করে না, সে সেখানে রাতের আঁধারে যাওয়ার চিন্তা করছে। আমালিয়া লক্ষ্য করলো মেলিসা ছুটে তাঁর দিকেই আসছে।

- আমালিয়া, আমালিয়া। সুফিয়ার বাচ্চাটা আর নেই।

আমালিয়া চমকে উঠলো। এ কি অঘটন ঘটে গেল? মেলিসা কেঁদেকেটে অস্থির। আমালিয়ার চোখের কোণেও পানি। সে ওখানে আর দাড়ালো না। দ্রুত পায়ে ছুটে চলল উত্তর জঙ্গলের দিকে। কাজ দ্রুত না করতে পারলে আরো অনেক শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পরবে। যে করেই হোক তাঁকে ওই ফুল আনতেই হবে। আমালিয়ার জঙ্গলে পৌঁছতে পৌঁছতে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পরলো। ঘন আঁধারে ঘেরা জঙ্গোলটি বাইরে থেকে যেমন ভয়ানক লাগে ভিতর থেকে তার থেকেও বেশি ভয়ানক। আমালিয়া চলতে চলতে লক্ষ্য করলো, এই জঙ্গলের গাছগুলো চামলিহেমশিনের অন্যান্য জায়গার গাছের থেকে অন্যরকম। উচ্চতায় বেশি ও সরু। তাছাড়া জঙ্গলে ঢোকার সাথে তার মনে হচ্ছে এখানকার তাপমাত্রাও বাইরের থেকে কম। তার কেমন শীত শীত করছে এখন। কিন্তু সাথে অতিরিক্ত কোনো কাপড় নিয়ে আসেনি সে। বোকামি করে ফেলল। গা ছমছমে পরিবেশের মাঝে আমালিয়া হাতে একটি মশাল নিয়ে খুব সাবধানে এগোতে লাগলো। নির্দিষ্ট স্থানটি পেতে বেগ পেতে হলেও চোখের সামনে এতোগুলো ভেজষ ফুল দেখে খুশিতে সে আত্মহারা। তার মানে পুরান লোককথা সত্য। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে দ্রুত হাতে ফুলগুলো ঝুড়িতে তুলে নিয়ে আশপাশটা ভালো করে খুঁজে দেখলো আরো যদি কোনো ভেজষ উদ্ভিদ পাওয়া যায় এই উদ্দেশ্যে। তাঁর ধারণা যেখানে এমন দূর্লভ প্রজাতির ভেজষ রয়েছে সেখানে আরো অনেক জরিবুটি থাকবে। তার ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে সেখানে আরো উন্নতমানের ভেজষ পাওয়া গেলো। সেগুলো তুলে নিতে নিতে কতটা দেরি করে ফেলেছে তার ধারণা আমালিয়া নিজেও করতে পারেনি। কিন্তু যখন বুঝলো তখন সে মশাল হাতে যতটা সম্ভব দ্রুত ছুটল। হঠাৎ খুব আকস্মিকভাবে বৃষ্টি শুরু হলো। মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টির তোড়ে আমালিয়ার হাতে থাকা মশালটি নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমালিয়ার পা থেমে গেল। অতর্কিতভাবে তার আজ ভোরের স্বপ্নটি মনে পরে গেল। সেই একইরকম বৃষ্টি, আঁধার জঙ্গল, বড় গাছ। এটা কি শুধুমাত্র একটি কাকতালীয় ঘটনা নাকি অন্যকিছুর ইশারা?

এরপর কি হলো তার জানা নেই। হঠাৎ ক্ষণিকের মাঝে ঝড় হাওয়া শুরু হল। শো শো শব্দ আর এক ভীতিকর শিহরণ আমালিয়াকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিল। কিছু শব্দ আমালিয়ার কানে বিধলো। দূর থেকে কিছু কিছুর গুনগুনিয়ে ডেকে ওঠার শব্দ এলো।

- এসো। কাছে এসো। আমার কাছে এসো। এসো।

সেই শব্দ! আমালিয়ার হঠাৎ খুব ঘুম পেল। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই ডাকের পিছু নিতে নিতে চলল। হাঁটতে হাঁটতে সে একটি ঝোপঝাড়ের মাঝে পঁচা ডোবার কাছে এসে পৌঁছাল। অত্যন্ত দুর্গন্ধ আর মশা, পোকা-মাকড়ের জন্য সাধারণ কোনো মানুষের এখানে দাঁড়িয়ে থাকা দুষ্কর। তবুও আমালিয়া নির্বাক জড়বস্তুর মতো দাড়িয়ে। যেন সে নিজের মধ্যে নেই। পঁচা ডোবার মাঝ থেকে একটি গলিত-স্থবির হাত ধীরে ধীরে আমালিয়ার দিকে এগোতে এগোতে বলল,

- এসো। আমার কাছে এসো।

আমালিয়া প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে তাঁর দানহাতটি এগিয়ে দিতে যাবে ঠিক সে সময় একটি চিৎকারের আওয়াজে তার ঘোর ভাঙ্গলো। সামনে তাকিয়ে একটি পঁচা ডোবা দেখে চমকে উঠলো সে। অত্যধিক দুর্গন্ধের কারণে অমালিয়া দ্রুত সেখান থেকে সরে ছুট লাগালো। তার মাথায় আসছে না সে এখানে কিভাবে এলো। শত চেষ্টা করেও সে মনে করতে পারল না কিছু। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আবারও সেই চিৎকার ভেসে এলো তাঁর কানে। সে এদিক-ওদিক খুঁজলো দীর্ঘক্ষণ।

- কেউ আছেন? দয়া করে সাহায্য করুন। কেউ আছেন?

- কে আপনি?

আমালিয়া দেখলো একটি ছেলে পাহাড়ের কিনারায় ঝুলে আছে। সে সর্বশক্তি দিয়ে পাহাড়ের একটুকরো মাটি আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমালিয়া উত্তরের অপেক্ষা না করে ছেলেটিকে টেনে উপরে তুলে আনলো। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছেলেটিকে টেনে তুলতে তাঁর অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ছেলেটি উপরে উঠে মাটিতে শুয়ে পরে বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলো। নিজেকে সামলে দৃষ্টি আমালিয়ার ওপর স্থির করলো। আলো আঁধারিতে ছেলেটির চেহারা স্পষ্ট দেখা না গেলেও তার ওই গাঢ় নিল বাজপাখির ন্যায় চোখগুলো অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছিল। পূর্ণিমার আলো জঙ্গলে প্রবেশ না করলেও জঙ্গলের বাইরে ঠিকই আলোকিত করছে। ছেলেটির পোশাক বলে দিচ্ছে সে বাহারিয়ান অর্থাৎ শহুরে বসবাসকারী। কিন্তু শহুরে কেউ চামলিহেমশিনে কি করছে?

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

#পর্ব_১

চলবে___

[আসসালামু আলাইকুম। কিছু কারণবশত জ্বিনে সালতানাত উপন্যাসের নামটি পরিবর্তন করে #আফসানায়ে_জ্বিনান রাখা হয়েছে। ‘আফসানায়ে’ মানে ‘কাহিনী/উপকথা’। আর ‘জ্বিনান’ মানে ‘জ্বিনসমূহ’। ‘#আফসানায়ে_জ্বিনান’ মানে ‘জ্বিনদের উপাখ্যান’। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট দৃষ্টিতে রেখে বাস্তব-অবাস্তব অনেক কিছুই দেয়া হবে। অনুগ্রহ করে কেউ ভুল বুঝবেন না। কেমন হয়েছে জানাবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন