ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

৪র্থ পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-৪

[📍কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

- আমালিয়া বইগুলো তুমি ইস্যু করিয়ে নাও, আমি ফোনে কথা বলে আসছি। পারবে তো?

আরদারের ফোনটি দীর্ঘ সময় ধরে বেজে চলেছে। লাইব্রেরির অভ্যন্তরে উচ্চ শব্দে কথা বলা কিংবা ফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ বলে আরদার এতো সময় ফোন ধরতে পারেনি।

আমালিয়া মিষ্টি হেসে সায় দিলো। আরদার তার উত্তর পেয়ে তড়িঘড়ি পায়ে লাইব্রেরি হতে বেরিয়ে গেলো। আমালিয়া তার যাওয়ার পানে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে সামনে পা বাড়িয়ে লিব্রারিয়ানের নিকট গেলো।

- হেলো ম্যাম।

আমালিয়া বিনম্র হেসে হাতের বই গুলো বাড়িয়ে দিয়ে জবাব দিলো,

- হেলো। এইগুলো ইস্যু করাতে চাই।

- নিশ্চই ম্যাম। আপনার কার্ডটি দিবেন দয়া করে?

- জ্বি জ্বি।

আমালিয়া তার সদ্য বানানো লাইব্রেরি কার্ডটি বাড়িয়ে দিলো। সে ভীষন নার্ভাস। কি থেকে কি করবে বুঝতে পারছে না। আরদারকে বলে তো দিয়েছে পারবে কিন্তু এখন ভয় করছে। লাইব্রেরিয়ান মেয়েটি রেজিষ্টার করে কার্ড ও বইগুলো ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল,

- ম্যাম, এই বইটি আপনার।

সেই বইটি যার নাম ‘আফসানায়ে জ্বিনান’। এটা তো তার বই না। তবে লাইব্রেরিয়ান মেয়েটি তার কেন বলছে?

- দুঃখিত আপনার ভুল হচ্ছে কোথাও। এটি আমার বই না। আমি এখানেই পেয়েছি।

- কিন্তু ম্যাম এই নামে কোনো বই আমাদের লাইব্রেরিতে রেজিষ্টার করা নেই।

নেই! তাহলে কি ঐ লোকটার বই? আচ্ছা ঝামেলায় ফেঁসে গেল তো সে এবার। এখন এই বই ওই লোকের কাছে ফিরিয়ে দিবে কিভাবে?

- আমালিয়া তোমার হলো?

আমালিয়া চটপট বইগুলো হাতে নিয়ে বলল,

- হ্যাঁ, হয়ে গিয়েছে।

- তাহলে চলো। তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যেতে হবে।

আমালিয়া মাথা নাড়িয়ে আরদারের সাথে এগিয়ে গেলো। পিছনে থাকা লাইব্রেরিয়ান মেয়েটি ঠান্ডা শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রইলো তার দিকে। হঠাৎ মেয়েটি অদূরে একটি কালো অবয়বের দিকে তাকিয়ে হেসে দিল।

_________

আমলিয়া বাড়ি ফিরেছে অনেকক্ষন। আরদার তাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে জরুরি কাজের জন্য তৎক্ষণাৎ চলে গিয়ে ছিল। বাড়ি ফেরার পর কেউ কোনো প্রশ্ন না করলেও এসমা অন্যরকম চোখে তাকিয়ে তাকে পরখ করছিল তা বুঝতে সমস্যা হয়নি আমালিয়ার। সে লক্ষ্য করেছে আরদারকে এসমা একটু বেশিই মান্য করে। আরদারের সামনে নিজেকে পরিপাটি উপস্থাপন করে। যা ভীষণ দৃষ্টিকটূ। আমালিয়ার অবশ্য এসব দারুন হাস্যকর লাগে। সে উপভোগও করে খুব। ইউসুফ নামক তার বাবার জন্য তখন সহানুভুতি অনুভব করে সে। বেচারা বউয়ের প্রেমে অন্ধ হয়ে ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য করতে ভুলে গিয়েছে। বাড়িতে আসার পর থেকে সে তার কামরার দরজা বন্ধ করে বসে রয়েছে। তারা এখানে আসার পরের দিনই তাকে নতুন একটি কামরা দেয়া হয়। যদিও আমালিয়ার তার দাদীর সাথে কক্ষ ভাগ করে নিতে সমস্যা হচ্ছিল না, তবুও কেন তাকে অন্য কামরা দেয়া হলো সে জানে না। আমালিয়াকে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে দেখে হাদিজাহ চিন্তিত হলো। কয়েকবার দরজা ঢাক্কানোর পরও আমালিয়া দরজা না খুলে শুধু নম্র কন্ঠে বলল,

- দাদী আমি ঠিক আছি। একটু মাথা ব্যাথা করছে। ঘুমাতে চাই।

- সত্যি ঠিক আছো?

- হ্যাঁ।

হাদিজাহ কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,

- কোনো প্রয়োজন হলে ডেকে নিও।

- জ্বি দাদী।

বিছানায় আরাম করে বসে সামনে ‘আফসানায়ে জ্বিনান’ বইটি নিয়ে এক মনে বইটি দেখছিল আমালিয়া। কিছু তো একটা ব্যাপার আছেই এই বইয়ের মাঝে যা তাকে ভীষণ ভাবে টানছে। বইয়ের উপরিভাগ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বইটি অনেক পুরোনো। জায়গায় জায়গায় ময়লা, ছিড়া। শুধু নামটাই যা স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে। এই বইয়ে কি আছে? সে বার কয়েক চেষ্টা করেও বইটি খুলতে পারল না। মনে হচ্ছে সবগুলো পৃষ্ঠা একে অপরের সাথে শক্ত হয়ে লেগে আছে। কি অদ্ভুত! খুলতে না পেরে তার কৌতূহলী মন আরও জানতে মরিয়া হয়ে উঠল বইয়ের ব্যাপারে। সে সামান্য ঝুঁকে বইয়ে লেখা ‘আফসানায়ে জ্বিনান’ এর প্রতিটি হরফের ওপর আঙুল ছুঁয়ে দিলো। আকস্মিক ধুলে ভরা পুরোনো বইটি নিজের রূপ বদলে চকচকে রূপ ধারণ করলো। আমালিয়া অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো পূর্বের কিছুই বইটিতে নেই। এমনকি ‘আফসানায়ে জ্বিনান’ লেখাটিও নেই। তার পরিবর্তে একটি গাছ ক্রমাগত রশ্মি ছড়িয়ে যাচ্ছে। গাছটি নীল-বেগুনী রশ্মি ছড়িয়ে ডাল-পালা জড়িয়ে ছিটিয়ে দিল। যা বইটিকে মুহূর্তে জীবন্ত করে দিল। বইয়ের ছোট্ট জায়গায় নিজের বিস্তারের প্রমাণ দিয়ে কিছু মুহূর্ত পর গাছটি শান্ত হয়ে গেল। আমালিয়া এতটাই আশ্চর্য হলো যে বইটি বিছানার ওপর ফেলে সে ছিটকে দূরে গিয়ে দাড়ালো। মাত্র যা সে দেখেছে তা কি স্বপ্ন না বাস্তব বুঝতে পারছে না। অলৌকিক কিছু সে আজ পর্যন্ত দেখেনি। তাঁদের গ্রামের মানুষ এসব বিশ্বাস করলেও সে বাস্তবে বিশ্বাসী ছিল। যা নিজ চোখে দেখেনি তার ওপর সে কখনো বিশ্বাস করেনি। কিন্তু মাত্র যা দেখলো তা কি করে অস্বীকার করবে সে? এ যে অস্বাভাবিক কিছু বুঝতে দেরি হলো না আমালিয়া। শুরু থেকেই এই বইয়ের ব্যাপারে কাউকে জানাতে কেন যেন মন সায় দেয়নি। যার দরুন সে সবার থেকে লুকিয়েছে। বইটি হাতে নেয়ার পর থেকে মনে হচ্ছিল কেউ তাকে দিয়ে সব কিছু করাচ্ছে। সে নিজের মধ্যে নেই। এখন মনে হচ্ছে এই সবটা এই বইয়ের কোনো কারসাজি। দাদীকে কি একবার বলে দেখব? না থাক। আগে নিজেকে বুঝতে হবে। বইটি জড়বস্তুর মতো পরে আছে বিছানায়। তা দেখে আমালিয়া কিছুটা সাহস করলো কাছে যাওয়ার। ছোট ছোট কদমে বিছানার কাছে গিয়ে বই থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখলো, বইয়ের উপরিভাগে এখনো সেই গাছটি রয়েছে। কিন্তু এখন আর গাছটি নড়ছে না। এমনকি রশ্মিও ছড়াচ্ছে না। আমালিয়া বুকে সাহস নিয়ে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল। নাহ্ কিছু হয়নি। এবার সে আরো একটু সাহস নিয়ে হাতে তুলে নিয়ে পুনরায় বিছানায় গিয়ে বসলো। সে জীবনে অনেক ভয়ানক ভয়ানক কাজ করেছে। ভূত-পেত্নীতে ভয় না পেলেও আজ সে ভীষন ভয় পেয়েছে। এ যে কোনো সাধারণ বই না তা বোঝার মতো বুদ্ধি তার হয়েছে। এই বই যদি ঐ লোকের হয়ে থাকে তাহলে ঐ লোকটিও কোনো সাধারণ কেউ নয় নিশ্চয়ই। আমালিয়া হাতের বইটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভালো করে দেখলো। বইটি এখন চকচক করছে, যেন কোনো গুপ্ত খাজানা। কৌতূহলী সে আবার বইটি খোলার চেষ্টা করলো এবং সফলও হলো। আশ্চর্যের বিষয় এবার কোনো প্রকার শক্তির অপচয় ছাড়াই বইটি খুব সহজে খুলে গিয়েছে। বইয়ের শুরুতেই একটি অস্পষ্ট ছবি দৃশ্যমান হলো আমালিয়ার সম্মুখে। একটি রাজ্যের ছবি খুব সম্ভবত। আমালিয়া বুঝতে পারল না কিন্তু অগাদ মায়া নিয়ে ছবিটির ওপর হাত বুলিয়ে দিল। ছবিটির নিচে পূর্বের ন্যায় আরবী হরফে লেখা ‘আফসানায়ে জ্বিনান’। যার প্রতিটি শব্দে এক একটি রহস্যের গন্ধ পাচ্ছিল আমালিয়া। পরের পৃষ্ঠা উল্টে দেখতে পেলো পরপর পাশাপাশি পৃষ্ঠায় দুটি ছবি। প্রথমটিতে একজন আলখাল্লা পরিহিত পুরুষ, হাতে তলোয়ার। যার শুধু পিছন ভাগটাই দৃশ্যমান। অন্যটিতে একটি চক্রের মাঝে তলোয়ারের ছবি। এতটুকুই আমালিয়াকে ভীষণ আকর্ষণ করলো। সে অপেক্ষা করতে না পেরে পরবর্তী পৃষ্ঠা উল্টালো। এবার আমালিয়ার চোখমুখ কুঁচকে গেল। এখানে সব লেখা। কিন্তু কোন ভাষা সে বুঝতে পারছে না। চোখের সামনে যেন অক্ষরগুলো নেচে বেড়াচ্ছে। বিরক্তিতে মুখ তেতো হয়ে গেল। এর পরের সবগুলো পৃষ্ঠাই একই রকম। কিছুই বুঝতে পারল না আমালিয়া। ছোট থেকে দাদী তাকে আরবী ও তুর্কি ভাষায় পারদর্শী করে তুলেছে। আরবী ও ল্যাটিন লিখতেও পারে। এছাড়া মেলিসার বাবার থেকে অল্প অল্প ইংরেজি ভাষাও রপ্ত করেছে। কিন্তু এই বইয়ের ভাষা সে জানে না। এই অক্ষর গুলো মনে হচ্ছে আরবী। কিন্তু মিলিয়ে পড়তে গেলে কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। চিন্তায় সে অস্থির। মনের মাঝে এই বইয়ের রহস্য উদঘটন করার স্পৃহা। কিন্তু উপায় কি? সারারাত না ঘুমিয়ে আমালিয়া উপায় একটিই পেয়েছে। তা হলো যার বই তার থেকে সবটা জানা। অর্থাৎ ওই লোকটিকে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু কি করে? এই শহর সে চেনে না। অচেনা একটি শহরে অচেনা একটি মানুষকে একা খুঁজে বের করবে কি করে?

সারারাত না ঘুমিয়ে আমালিয়ার চোখমুখ শুকিয়ে বসে গিয়েছে। চোখের নিচে হালকা কালো স্তর ও চোখ লাল হয়ে আছে। হাদিজাহ আমালিয়ার এই অবস্থায় ভীষণ চিন্তিত হয়ে পরলো। ভাবলো হয়তো আরদারের কারণে এমন হচ্ছে। যেহেতু আমালিয়া একজন মানুষ, আর আরদার একজন জ্বিন। সুতরাং জ্বিনের আছড়ে যেকোনো মানুষের বেহাল দশা হবেই। মনে মনে আরদারের প্রতি রাগ হলেও কিছু বলার অধিকার যে তার নেই। হয়তো ক্ষমতার দিক থেকে সে আরদারকে হারাতে পারবে কিন্তু, সে যে কাউকে ওয়াদা করেছে। সেই ওয়াদার কারণে হলেও তাকে সবটা সহ্য করতে হবে। কিন্তু সে মনে মনে প্রকল্পনা করলো আরদারের সাথে এই ব্যাপারে সে কথা বলবে। অথচ তাকে নিরাশা করে দিয়ে পরবর্তী তিনদিন আরদার ফিরল না। সবাইকে জানানো হলো সে ব্যবসার কাজে ইস্তাম্বুলের বাহিরে আছেন। কিন্তু সত্যতা শুধু হাদিজাহ জানতো। আরদার কোনো ব্যবসার কাজে যায়নি। বরং সে এই তিনদিন জ্বিন রাজ্যে ছিল। আকস্মিক সিলা রাজ্যে তাকে প্রয়োজন পরায় সে আগাম বার্তা ছাড়াই সেখানে গিয়ে ছিল। এই তিনদিনে আমালিয়া নিয়ম করে তার বাবার সাথে বেয়াজিদ লাইব্রেরিতে যেতো। শুরুতে হাদিজাহ রাজি না হলেও পরবর্তীতে আমালিয়ার অনুনয়-বিনয়ের কাছে টিকতে না পেরে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু শর্ত ছিল ইউসুফ নিয়ে যাবে আবার নিয়ে আসবে। আমালিয়া মেনে নিয়ে ছিল। সে শুধু একবার ওই ব্যক্তিকে খুঁজে পেলেই হবে। কিন্তু যার খোঁজে সে রোজ নিয়ম করে যেতো তাকে খুঁজে পায়নি। এই একটি স্থানই ছিল তার চেনা-জানা, এখানেই তো সে ওই লোককে পেয়ে ছিল। তাহলে এখন কেন পাচ্ছে না? আমালিয়া আজও এসেছে লাইব্রেরিতে। আজই শেষবার সে এখানে এসেছে। লোকটাকে না পেলে আর খুঁজবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। আমালিয়া একই সময়ে এসেছে আজ। সেদিনও শেষ বিকেল ছিল আজও শেষ বিকেল। ইউসুফ তাকে লাইব্রেরির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমালিয়া ইউসুফের যাওয়ার পানে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে পা বাড়ালো লাইব্রেরির দিকে। সেদিনের সেই লাইব্রেরিয়ান মেয়েটিকে আমালিয়া পরবর্তীতে আর দেখেনি। তার বদলে সেখানে অন্য কাউকে পেয়েছে। আমালিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো লাইব্রেরির শেষ অংশে যেখানে সেদিন ওই লোকটির সাথে দেখা হয়ে ছিল। সেখানে যে জানালাটি ছিল সেটি আজ খোলা ও পরিষ্কার। জানালার নিচের অংশ একটু বাড়ন্ত। চাইলে সেখানে বসা যাবে। আমালিয়া গিয়ে সেখানেই বসলো। হাতে তার ‘আফসানায়ে জ্বিনান’ বইটি। বেশ কিছুক্ষন জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমালিয়ার মনে হলো সে ছাড়াও এখানে অন্য কেউ আছে। তড়াক করে আশপাশ তাকিয়ে দেখলো। কিন্তু পেলো না। হঠাৎ তার থেকে কিছুটা দূরে একটি বুকশেলফের কাছে সেদিনের সেই লোকটির মতো কাউকে দেখে আমালিয়া এক প্রকার ছুটে গেলো তার কাছে।

- এই যে শুনুন।

লোকটি আজ একটি ছাই রঙ্গা হুডি পরে আছে। যার ক্যাপটি মাথায় তোলা। সাথে কালো সোয়েটপ্যান্ট। উচ্চতায় তার থেকে অনেক। শারীরিক গড়ন বলে দিচ্ছে লোকটি প্রতিনিয়ত শরীরচর্চা করে। সে হয়তো কোনো বই নিতে এসেছিল। আমালিয়ার কথায় তার হাত থেমে যায়। আমালিয়া অধৈর্য্যের নয় আবারও বলল,

- এই যে।

লোকটি একবার ধীরে ধীরে আমালিয়ার দিকে ফিরে তাকালো। হুডির ক্যাপের জন্য মুখমণ্ডলের কিছুই দেখা না গেলেও আমালিয়া তার চোখ দুটি দেখে ছিল। সে এক গভীর অগ্নিকুণ্ড যেন। সেই চোখের রং না ছিল বাদামী আর না ছিল লাল। দুটির মাঝামাঝি রঙের। দিনের আলোতেও তা জ্বলজ্বল করছিল। আমালিয়া দ্রুত দুকদম সরে দাঁড়িয়ে মুখে হাত দিলো। তার মনের নানান প্রশ্ন তাকে ব্যাকুল করে দিচ্ছিল। অথচ কেন যেন মুখ ফুটে সে কিছুই বলতে পারছিল না। লোকটি এবার দুহাতে হুডির ক্যাপটি নামিয়ে আমালিয়ার মুখোমুখি দাড়িয়ে বলল,

- হুম।

তার ঘাড় পর্যন্ত লম্বা কালো চুলগুলো তখন বাতাসের তালে হেলে-দুলে চলছিল। অলীক সৌন্দর্যের বর্ণনা কিভাবে দিবে আমালিয়ার জন্য নেই। তবে সে স্তব্ধ হয়ে ছিল সেই সৌন্দর্য দেখে। অতঃপর আমালিয়া নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

- সেদিন আপনি ছিলেন তাই না? ওই লোকটি, যার সাথে ধাক্কা লেগে ছিল। আপনি ছিলেন সে?

লোকটি প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে আমালিয়াকে পর্যবেক্ষন করে বলল,

- হয়তো।

আমালিয়া নিজের উত্তেজনা ধরে রাখতে না পেরে হাতের বইটি সম্মুখে এনে বলল,

- এটি আপনার?

আমালিয়া লক্ষ্য করলো লোকটি একবার বইটি দেখে কেমন করে যেন তাকালো আমালিয়ার দিকে।

- আপনি খুলে ছিলেন?

তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে? ভারী অদ্ভুত তো। আমালিয়ার রাগ হলো ভীষণ কিন্তু মুখে কিছুই বলল না।

- হ্যাঁ।

- জানতেন কিভাবে খুলতে হয়?

- না। কিভাবে যেন খুলে গিয়েছে, বলতে পারব না।

লোকটি আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে চমৎকার একটি হাসি দিল। সেই হাসিতে আমালিয়া গোলে গেল। মুগ্ধ হয়ে দেখলো। লোকটি আমালিয়াকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে বসলো ঠিক সেখানে যেখানে আমালিয়া বসে ছিল। আমালিয়াও নিজের অজান্তে লোকটির পিছু নিয়ে এগিয়ে গেল।

- বইটি আমারই। পড়েছেন?

- উহু। বুঝতে পারছি না কিছু।

লোকটির কপাল কুঁচকে গেল হঠাৎ।

- কোথায় সমস্যা?

আমালিয়া হরবরিয়ে বলল,

- পুরোটাই সমস্যা। দেখুন (সে বই বের করে পৃষ্ঠা উল্টে দেখিয়ে বলল) কোন ভাষায় লিখেছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

লোকটি ভালো করে দেখে বলল,

- সব তো ঠিকই আছে। কোনো সমস্যা তো দেখছি না। এখানে স্পষ্ট সব দেয়া আছে।

- কোথায়? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।

- আপনি আরবী পড়তে পারেন না?

আমালিয়া বইটি কাছে রেখে লোকটির সামনে মুখোমুখি বসে বলল,

- পারি তো। কিন্তু এখানে আরবী হরফগুলো এলোমেলো।

- এলোমেলো?

- হ্যাঁ।

লোকটি গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবলো। অতঃপর আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

- আপনার বয়স কত হয়েছে?

- ১৯ বছর। আর দুই মাস পর ২০ হবে।

লোকটি আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কি যে এতো দেখলো আমালিয়া জানে না।

- আপনি কি আমাকে একটু এটা কিভাবে পড়তে হয় তা শিখিয়ে দিবেন? আমি কিছুতেই পড়তে পারছি না। পড়ার জন্য অস্থির অস্থির লাগছে। আফসানায়ে জ্বিনান কি? ওই তলোয়ার হাতে লোকটিই বা কে? এই বইয়ের রহস্য কি? আপনি কে? এখন দয়া করে বলবেন না আপনি জানেন না। এই বইটি সাধারণ কোনো বই না আমি বুঝতে পেরেছি। আর আপনিও যে সাধারণ কেউ না তাও জানি। এখন দয়া করে ভনিতা না করে খুলে বলুন।

লোকটি আমালিয়ার এতো এতো প্রশ্ন শুনে শব্দহীন হাসলো।

- আপনাকে যতটা ছোট ভেবে ছিলাম আপনি ততটা ছোট নন। যথেষ্ট বুদ্ধিমতি। কিন্তু জানেন তো, নারী ভীষণ নরম মনের হয়। এদের চাইলেই হারানো সম্ভব। কি করে বলতে পারেন?

আমালিয়া বুঝলো না তাকে এসব কেন বলছে এই লোক। সে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

- না।

- ভালোবাসা দিয়ে। আমি হয়তো তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। এটি পড়তে আমি আপনাকে শিখাতে পারবো না। তার জন্য আপনাকে আগে বড় হতে হবে।

- মানে? কিন্তু আমি যথেষ্ট বড়।

আমালিয়া উত্তেজনায় উঠে দাড়িয়ে পরলো। লোকটা তাকে ছোট বলছে কোন দিক দিয়ে? আশ্চর্য, উদ্ভট লোক। লোকটি এবার আমালিয়াকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করে বলল,

- তাই? কিন্তু আমার চোখে তো কিছুই পরছে না।

আমালিয়া লোকটির কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে রেগে বলল,

- অসভ্য।

লোকটি এবার উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। তার সেই হাসি তরঙ্গের মতো লাইব্রেরির প্রতিটি শেলফের সাথে আঘাত হেনে ফিরে ফিরে আসছিল। সে এক অদ্ভুত সুন্দর মুহূর্ত। আমালিয়ার তখন মনে হচ্ছিল সে কোনো রূপ কথার জগতে রয়েছে। অদ্ভুত ভাবে তার এই লোকটির সঙ্গ ভীষণ ভালো লাগছে। লোকটি বিরক্তিকর কথা বললেও তার ভালো লাগছে। ভীষণ ভীষণ ভালো লাগছে।

- আপনার সাহসের তারিফ না করে পারছি না। কার সামনে দাড়িয়ে কি বলছেন জানলে আপনি এই কথা বলতেন না।

আমালিয়া সরল মনে প্রশ্ন করলো,

- কে আপনি?

লোকটি আমালিয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কি যেন ছিল ওই চোখে। কিন্তু আফসোস আমালিয়া বুঝতে পারেনি। হঠাৎ তার সামনের লোকটি অত্যন্ত গম্ভীর গলায় দাম্ভিকতা নিয়ে বলল,

- আমি মেহমেত।

#চলবে___

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন