ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

১৯তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-১৯

[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

কালো ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝে আমালিয়া ধীর কদমে হেটে চলছে। কৌতূহলী দৃষ্টি তার দূরে সোনালী আলো ছড়ানো একটি দরজার দিকে। প্রচন্ড অন্ধকারে আমালিয়া নিজের শরীরের কিছুই স্পষ্ট দেখতে পেলো না, অথচ তার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে থাকা দরজাটি থেকে প্রচন্ড আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যার দরুন আমালিয়া সঠিক ভাবে তাকিয়ে দেখতেও পারছে না। তবুও মনে একরাশ ভয় ও কৌতূহল নিয়ে সে পা আগালো সেই দরজার পানে। কি আছে সেখানে দেখতে তার মনটি বড়ই ব্যাকুল। যত সে দরজারটির কাছে আগাতে লাগলো ততই যেন আলো চোখে সয়ে যাচ্ছে। দরজার অভিমুখে দাঁড়িয়ে আমালিয়া হা করে তাকিয়ে রইলো দীর্ঘ সময়। এত বড় দরজা! আমালিয়া দরজা থেকে চোখ সরিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো। কিছু একটা খুঁজছে তার মন কিন্তু বুঝতে পারছে না কি খুঁজছে। অতঃপর আর না ভেবে দরজার ওপর হাত রাখার সাথে সাথে দরজাটি খুলে গেলো হা করে। আমালিয়া অবাক হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। কি অদ্ভুত সে তো শক্তি প্রয়োগও করলো না তাহলে দরজাটি কিভাবে খুললো? চোখের সামনে তার হাত দুটি এনে বারবার দেখতে লাগলো অবুঝ পাখিটি। কি হচ্ছে বুঝতে না পেরেও মনের ডাকে সাড়া দিয়ে সে দরজার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো। তার ভিতরে প্রবেশের সাথে সাথে দরজাটি শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেলো। সেই শব্দে আমালিয়া ভীষণ রকম চমকে তাকালো দরজার দিকে। বন্ধ দরজা দেখে ভয়ে তার চোখে অশ্রু জমে গেলো। দরজাটির কাছে গিয়ে কয়েকবার হাত দ্বারা আঘাত করলো, খুলতে বললো, কিন্তু দরজা খুললো না। আমালিয়ার তখন নিজেকে বড্ডো বোকা মনে হলো। কেন সে এখানে এলো? আর কেনই বা এসব কিছুতে নিজেকে জড়ালো? কি হচ্ছে সে বুঝতেই পারলো না। কান্নারত চোখ দুটি এবার ঘুরিয়ে অবস্থানরত কক্ষটির দিকে দিলো। সাথে সাথে আমালিয়া কথা বলার ভাষা হারিয়ে স্তব্দ হয়ে গেলো। সে চোখের সামনে যা দেখছে তা কি সত্যি? আমালিয়া চোখ বড় বড় করে দুহাতে মুখ চেপে ধরলো। আমালিয়ার চোখের সামনে বিশাল বড় একটি লাইব্রেরি। এত বড় লাইব্রেরি কি আদোও হয়? আমালিয়ার জানা নেই। সে আজই দেখলো এত বড় লাইব্রেরি। আমালিয়া মুখ হতে হাত সরিয়ে ছোট ছোট পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো। চোখ তার এক স্থানে আটকে নেই। চঞ্চল মন তার লাইব্রেরিটির রহস্য উদ্ধারে নিয়োজিত। আমালিয়া মাথা তুলে উপরের দিকে তাকালো, সাথে সাথে তার পা থেকে গেলো সেই স্থানে। তার মাথার ওপর অগণিত বই। উচ্চতায় লাইব্রেরিটি হয়তো ৫০০টি আমালিয়ার সমান কিংবা তার থেকেও বড়। এত বড় লাইব্রেরি কি মানুষ দ্বারা তৈরি করা হয়েছে? এটা কোথায় এসেছে সে? হঠাৎ আমালিয়ার বুকের মাঝে কেমন যেন করে উঠলো। আমালিয়া হম্বিতবি করে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো। ছুটে সামনের দিকে গেলো এখান হতে বের হওয়ার জন্য। কিন্তু যতো আগাচ্ছে মনে হচ্ছে কোনো এক গোলক ধাঁধায় ফেঁসে গিয়েছে সে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে হাপিয়ে গেলো কিন্তু তবুও বাইরে যাওয়ার কোনো পথ পেলো না। দীর্ঘ কতক্ষন ধরে এভাবে ছুটেছে সে তার জানা নেই। তবে তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমালিয়া পিছু ফিরে চাইলো, বহু দূরে সেই দরজাটি অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সামনে যত দূর দেখা যাচ্ছে সব একই রকম। আমালিয়া এবার খুব ভয় পেলো। বেশ কিছু দিন ধরে তার সাথে যা অশরীরী কর্ম হয়ে যাচ্ছে তাতে যে কেউ ভয়ই পাবে। না পারতে মেঝেতে বসে কেঁদে ফেললো আমালিয়া। তার মাথায় কিছু আসছে না। কোথায় এসেছে আর কেনই বা এসেছে সে এখানে? এখান হতে কিভাবে বের হবে বুঝতে পারলো না। মনে মন সে বারবার মেহমেতকে স্মরণ করে গেলো। অসহায় আমালিয়া কাঁদতে কাঁদতে লক্ষ্য করলো কিছুটা সামনে কিছু একটি হাওয়ায় উড়ছে। চোখে পানি নিয়ে সে ভালো করে দেখতে পেলো না জিনিসটিকে। তাই চোখের পানি মুছে উঠে পা বাড়ালো সেদিকে। কাছাকাছি গিয়ে বুঝতে পারলো এটি একটি বই। যেটি ক্রমাগত হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে এবং তার চারিপাশে হালকা কিছু রশ্নি ছড়াচ্ছে। আমালিয়া কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে ছুটে গিয়েও বইটি ধরতে পারলো না। বইটি তার চঞ্চলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। আমালিয়া চেয়েও তার সাথে পারছে না। রেগে সে দুহাত কোমরে বেঁধে নাক ফুলিয়ে তাকালো বইটার দিকে।

- আচ্ছা পাজি তো। তিড়িং বিড়িং না করে শান্ত হও, আর কাছে আসো।

তার কথায় সত্যিই বইটি শান্ত হয়ে গেলো। এবং নিজ থেকে আমালিয়ার কাছে এসে ধরা দিলো, যেন সে আমালিয়ার আদেশের অপেক্ষাতেই ছিল। হাওয়ায় ভেসে বইটি আমালিয়ার ঠিক নাক বরাবর এসে থামলো। তা দেখে আমালিয়া হা করে কিছুক্ষন তাকিয়ে দেখলো। আমালিয়া বড় একটি নিশ্বাস নিয়ে বইটি হাতে তুলে নিলো। সাথে সাথে বইটি ধপ করে বন্ধ হয়ে একদম নির্জীব হয়ে গেলো। আমালিয়া বইটির উপরিভাগ হাতের সাহায্যে ছুঁয়ে দিলো। কেন যেন তার মনে হলো এর পূর্বেও সে এই বইটি কোথাও দেখেছে, কিন্তু মনে করতে পারছে না। মনে করার খুব চেষ্টা করেও যখন মনে পড়লো না তখন সে বইটি খুলে দেখার সিদ্ধান্ত নিলো। যেই ভাবা সেই কাজ। সে বইটি দুহাতের সাহায্যে খোলার সাথে সাথে বইটি থেকে এক প্রকার অদ্ভুত রশ্নি নির্গত হয়ে তা সরাসরি তার চোখে এসে লাগলো। আচমকা আমালিয়া ধপ করে চোখ খুলে উঠে বসে পরলো। বেচারি ঘেমে অস্থির। নিশ্বাসের বেগতিক অবস্থা। চারিপাশে দৃষ্টি দিয়ে বুঝলো সে এখন নিজেদের কামরায় রয়েছে। তার মানে এতক্ষন যা দেখেছে সবটা স্বপ্ন ছিল? এতটা বাস্তব স্বপ্ন! আমালিয়া চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিশ্বাস নিলো। কি ভয়ানক স্বপ্ন ছিল! তার মনে হয়ে ছিল সে সত্যিই সেখানে রয়েছে। আমালিয়া বিছানার পাশে থাকা ছোট টেবিল থেকে গ্লাস তুলে গলা ভিজিয়ে পা রাখলো মেঝেতে। উদ্দেশ্য মেহমেতকে খুঁজে বের করা। কিন্তু বিছানা থেকে উঠে সে সঠিক ভাবে দাঁড়াতে পারলো না। হঠাৎ তার মাথা ঘুরে উঠলো। আমালিয়া তৎক্ষণাৎ বিছানায় বসে পরলো আবারো। মাথায় এক হাত চেপে ঝিম ধরে দীর্ঘ সময় বসে রইলো সে। অতঃপর দৃষ্টি সরাসরি বেলকনিতে দিলো। নিচ থেকে মেহমেতের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। আমালিয়া এবার শক্ত পায়ে ধীরে হেটে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। প্রথমেই তার দৃষ্টি গেলো অদূরে থাকা সেই ঝর্ণায়। আজ আকাশটিও বড্ডো স্বচ্ছ। রোদও নেই তেমন। কেমন একটা শান্তি শান্তি আবহাওয়া ছড়িয়ে আছে সব জায়গাতে। আমালিয়া এবার দৃষ্টি নিচে দিলো। শুকনো পাতার মাঝে মেহমেত আর টোটো বসে আছে। মেহমেত টোটোকে আদর করে দিচ্ছে। দৃশ্যটি আমালিয়ার ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুললো। টোটোকে সুস্থ, স্বাভাবিক দেখে ভীষণ ভালো লাগলো তার। সে তাদের বিরক্ত না করে গোসল খানায় চলে গেলো।

আমালিয়া বের হলো ভেজা চুল মুছতে মুছতে। পরনে তার কালো একটি গাউন। সফেদ বদনে কালো রংটি জ্বলজ্বল করছিলো তখন। শুরুতে আমালিয়া লক্ষ্য না করলেও পরবর্তীতে সে দেখতে পেলো মেহমেত দাঁড়িয়ে কিছুটা দূরে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে। দৃষ্টি তার আমালিয়ার ওপর। আমালিয়া তাকে দেখে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। তারপর দৃষ্টি গেলো বিছানায় চুপটি করে বসে থাকা টোটোর ওপর। আমালিয়া দ্রুত পা বাড়িয়ে বিছানার কাছাকাছি গিয়ে টোটো শরীরে হাত বুলিয়ে ডাকলো,

- টোটো।

এতক্ষন ঝিমুতে থাকা টোটো যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেয়েছে এমন ভাবে তার ডানা নাড়িয়ে শরীর দুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে আমালিয়ার সাথে একদম মিশে গেলো। আমালিয়াও আদরের সাথে টোটোকে বুকে টেনে নিলো। এই পুরো ব্যাপারটি মেহমেতের ঠিক সহ্য হলো না। সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়েই রইলো। ভেবেছিলো কিছু বলবে না কিন্তু এদের এত ভালোবাসা সহ্য হলো কই তার? মেহমেত বড় বড় পা বাড়িয়ে তাদের দিকে এগিয়ে এসে টোটোর থেকে আমালিয়াকে ছিনিয়ে সরিয়ে নিলো। ঘটনাটি এতটাই দ্রুত হয়ে গেলো যে আমালিয়া প্রতিক্রিয়া করার মতো সুযোগ পেলো না। আমালিয়া যে ভীষণ অবাক হয়েছে তা তার মুখ দেখেই বোঝা গেলো। কিন্তু টোটো ভীষণ নারাজ হলো। তার অঙ্গভঙ্গি বলে দিচ্ছে এই মুহূর্তে আমালিয়ার সামনেই সে কিছু একটা করে বসবে। তাই মেহমেত আমালিয়াকে বললো,

- নিচে গিয়ে খাবার তৈরী করুন। আমরা আসছি।

- কিন্তু……

আমালিয়া কিছু বলতে চাইলো কিন্তু মেহমেত সেই সুযোগ না দিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলবো,

- পরে শুনবো আপনি নিচে যান।

- আচ্ছা।

আমালিয়া আর দাঁড়ালো না। সে ধীর কদমে চলে গেলো। তার যাওয়ার দিকে মেহমেত ও টোটো উভয়ই তাকিয়ে রইলো। অতঃপর আমালিয়াকে সম্পূর্ণরূপে চলে যেতে দেখে মেহমেত নিজের শক্তি প্রয়োগ করে দরজাটি বন্ধ করে দিলো। দরজাটি বন্ধ হতে দেখেই টোটো নিজের রূপ বদলে আমালিয়ার রূপ ধারণ করলো। টোটোকে আমালিয়ার রূপ ধরতে দেখে মেহমেতের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো। কিছু সময় পূর্বেও টোটোকে আদর করা মেহমেত হঠাৎ তার ওপর ক্ষেপে গেলো। রেগে বললো,

- সমস্যা কি তোমার টোটো? এই রূপ ধারণ করেছো কেন? এখনই নিজের রূপে আসো না হয় অন্য কারো রূপ নাও।

টোটো মেহমেতের কথা শুনলো না। বরং সে নিজেও মেহমেতের মতো করে বললো,

- কেন এই রূপে সমস্যা কোথায়?

মেহমেতের টোটোর কথাটি হজম হলো না, সে তেড়ে গেলো টোটোর কাছে।

- অনেক সমস্যা রয়েছে। রূপ বদলাও টোটো। আর আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকবে। একদম কাছ ঘেঁষবে না।

টোটো তখনও আমালিয়ার রূপ নিয়েই ছিল। সে ধীরে বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, যেন মেহমেত যা বলেছে তা টোটো শুনতেই পায়নি। মেহমেত ওর কাজে বড্ডো বিরক্ত। টোটোকে সে শুরু থেকে চেনে। তার মতোই যা ভাববে তাই করবে। এখানেই মেহমেতের যতো ভয়। টোটো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে বললো,

- এখন আমার বউ! অথচ কিছু দিন পূর্বেও তুমি তাকে ব্যবহার করেছো নিজের কার্য হাসিলের জন্য।

টোটো কথাগুলো বলে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে কেমন করে হেসে উঠলো। মেহমেত বড় বড় পায়ে টোটোর কাছে এগিয়ে গিয়ে টোটোর হাত শক্ত করে ধরে বললো,

- একদম বাড়াবাড়ি করবে না। নিজের সীমায় থাকো টোটো। ভুলে যেও না আমি কে?

- আহ মেহমেত লাগছে।

মেহমেত সাথে সাথে ওর হাতটি ছেড়ে দিলো। একমুহূর্তের জন্য মনে হলো আমালিয়াকে কষ্ট দিয়েছে সে। তাকে ছেড়ে দিতে দেখে টোটো খিলখিলিয়ে হেসে দিলো। সে জানতো মেহমেত আমালিয়াকে কষ্ট দিতে পারবে না, তাই তো নিরাপত্তার জন্য আমালিয়ার রূপ ধারণ করেছে। মেহমেত বিরক্ত নিজের ওপর, নিজের কাজের ওপর। চোখে মুখে তার এক ধরণের নারাজি স্পষ্ট।

- কি চাও তুমি টোটো? এমন করছো কেন?

- আমার লিয়াকে চাই।

টোটোর সহজ-সরল উত্তর, মানতে পারলো না মেহমেত।

- অসম্ভব।

- জানি।

মেহমেত কথা বাড়ালো না ওর সাথে। সে কক্ষ হতে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,

- আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকবে এবার থেকে। আর হ্যা, রূপ বদলে তারপর নিচে আসবে।

কথাগুলো বলে মেহমেত বেরিয়ে গেলো। টোটো তখনো একদৃষ্টিতে মেহমেতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে। অতঃপর সে আবারো আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখে বললো,

- তুমি অভাগী নাকি ভাগ্যবতী তা সময় এলেই দেখা যাবে লিয়া। তবে চিন্তা করো না আমি সর্বদা তোমাদের ঢাল হয়ে থাকবো।

—-------------------------

জঙ্গলের মাঝে একটি পরিত্যক্ত ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেহমেত। তার পরনে আজ সফেদ একটি আলখাল্লা। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ ব্যতিক্রম কিছু পরিলক্ষিত। বেগতিক হাওয়ায় আলখাল্লার ওপরের অংশ হওয়ার তালে দুলে চলেছে। চাঁদের আলোয় সেই দৃশ্য বড়ই সুন্দর লাগলো। তার শরীর থেকে ভেসে আসা সুগন্ধি বহু দূর পর্যন্ত পাওয়া গেলো। অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এই পুরুষ এক দর্শনে যে কোনো নারীকে ঘায়েল করতে পারে অনায়াসে।

- দাদুভাই।

মেহমেত ছাদের একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদ দেখায় মগ্ন ছিল। হঠাৎ নারী কণ্ঠে পিছু ফিরে তাকালো। তার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে হাদিজাহ দাঁড়িয়ে। অন্যান্য দিনের তুলনায় হাদিজাহের বেশভূষায় আজ বিস্তর পার্থক্য দেখা গেলো। তার পরনে আজ রাজকীয় পোশাক। তাকে আজ বাস্তবই জ্বিন মাতা লাগছে। মেহমেত খুব মন দিয়ে দেখলো তার দাদিজানকে। ছোট হতে অধিকাংশ সময় সে এই নারীর সাথেই সময় কাটিয়েছে। ভালোবাসা, আদর, আল্লাদ সবটাই তো সে এই নারীর কাছেই পেয়েছে একটু বেশি বেশি। অথচ কিছু ভুল তাদের দুজনকে একে ওপরের থেকে দূরত্বে নিয়ে গেলো। তারপর রাজ্য ছাড়া আর এরপর এতগুলো বছর পর আবারো মুখোমুখি। বহু বছর পর তাকে এই বেশভূষায় দেখে মনে মন তৃপ্তি অনুভূত করলো মেহমেত। যদিও তা বুঝতে দিলো না হাদিজাহকে। সে কয়েক পা এগিয়ে হাদিজাহের দিকে তাকিয়ে হাসলো।

- কেমন আছেন দাদিজান?

হাদিজাহ তাকিয়ে ছিল মেহমেতের দিকে। মেহমেতের মুখে দাদিজান শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না সে। মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে মুখে হাত চেপে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো। মেহমেত দেখলো কিন্তু কাছে গেলো না। সে একইভাবে দাঁড়িয়ে রইলো দূরে।

- আমাকে ক্ষমা করে দিন দাদুভাই।

হাদিজাহ আজ কাঁদছে, প্রচুর কাঁদছে। মেহমেত আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিলো। অতঃপর আকাশের দিকে তাকিয়েই বললো,

- আপনাকে অনেক পূর্বেই ক্ষমা করে দিয়েছি দাদিজান।

তারপর একটু থেমে আবারো বললো,

- কিন্তু আমি আপনাকে আজও ঘৃণা করি দাদিজান। যখন আমার আপনাকে প্রয়োজন ছিল তখন আপনি আমার কথা না ভেবে আমার সাথে ছলনা করে ছিলেন।

হাদিজাহ অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো মেহমেতের দিকে। সে কিভাবে বুঝাবে মেহমেতকে তখন তার যা করা ঠিক মনে হয়ে ছিল সে তাই করেছিল। সেই মুহূর্তে মেহমেতকে থামাতে না পারলে সমগ্র জ্বিন ও ইনসান জাতি হুমকির মুখে পরে যেত। হ্যা সে মানছে শুরুতে তার ভুল ছিল, না না অন্যায় করে ছিল সে। পাপ করে ছিল, কিন্তু তারপর সে নিজের ভুল বুঝে যখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিলো ততক্ষনে মেহমেত তার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে ছিল। চেয়েও আর সে মেহমেতকে সঠিক পথে নিতে পারেনি। তার একটি ভুলে আল্লাহ ভীরু সৎ বাদশাহ মেহমেতকে স্বার্থপর এবং নিষ্ঠুর করে দেয়। হাদিজাহ মেঝেতে বসে একই ভাবে কাঁদছে। বিষয়টি মেহমেতের কাছে মর্মান্তিক লাগলো।

- উঠে দাঁড়ান দাদিজান। জ্বিন মাতাকে এভাবে মানায় না।

হাদিজাহ নাক টেনে উঠে দাঁড়ালো। এই হাদিজাহকে দেখলে হয়তো আমালিয়া চিনতেই পারতো না। ভাবতো তার সেই শক্ত, মজবুত দাদি কোথায় সে? আজ হাদিজাহের সব শক্তি যেন ফুরিয়ে গিয়েছে। সে আর পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে পারছে না। মেহমেত তখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে। এরপর একবারও সে হাদিজাহের দিকে তাকায়নি। হাদিজাহ ছলছল চোখে মেহমেতের দিকে এগিয়ে মেহমেতের গালে পরম মমতায় হাত রাখলো। মেহমেত সাথে সাথে দুচোখ বন্ধ করে নিলো, কিন্তু হাদিজাহকে সরিয়ে দিলো না। তার মনোভাব ঠিক বোঝা গেলো না।

- দাদুভাই অতীত ভুলে যান। সৎ পথে ফিরে আসুন। দেখুন আপনার কাছে যা আছে তা আপনার জন্য যথেষ্ট। লিয়াকে কষ্ট দিবেন না দয়া করে। আপনাদের এখন বিয়ে হয়েছে, দুজন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন। আপনি আমাদের বাদশাহ। লিয়াকে নিয়ে জ্বিন রাজ্যে ফিরে চলুন। পৃথিবী আমাদের কারোরই বাসস্থান নয়। লিয়াকে ব্যবহার করবেন না। সে অনেক কষ্ট পেয়েছে।

মেহমেত এবার চোখ খুলে তাকালো। দৃষ্টি হাদিজাহের দিকে দিয়ে গাল হতে হাদিজাহের হাতটি সরিয়ে দিয়ে তাচ্ছিল্য করে বললো,

- অথচ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আপনি তাকে নিজের কাছে রেখে ছিলেনই আমার বিপরীতে ব্যবহার করার জন্য তাই নয় কি জ্বিন মাতা? আপনি আজও সেই আগের মতোই রয়ে গেলেন জ্বিন মাতা। স্বার্থপরতা ও কপটতায় কেউ আপনাকে হারাতে পারবে না। আমার তো ওই মেয়েটার জন্য দুঃখ হয়, সে যদি জানতো সে যে দাদির ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়েছে, যে মায়া, মমতাকে সত্যি মনে করে বড় হয়েছে তা নিছকই অভিনয় ছাড়া কিছুই না তখন কি হবে? আচ্ছা আরদার কি আপনার অতীত জানে? দাদাজান আপনাকে ভালোবেসে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করলেও আপনি আপনার বংশের নাম ঠিকই বজায় রেখেছেন। আল-শায়াতিন গোত্রের জ্বিনদের থেকে এর থেকে বেশি কিছু আশা করাটাও বোকামি নয় কি?

হাদিজাহ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে শুধু মেহমেতের কথাগুলো শুনে গেলো। কারণ মেহমেতের একটি কথাও মিথ্যে নয়।

- মানছি আমি যা করেছি তা অন্যায়। কিন্তু যা করেছি সকলের ভালোর জন্য করেছি।

হাদিজাহের কথায় মেহমেত শব্দ করে হেসে উঠলো। তাকে বড় অদ্ভুত লাগলো সেই মুহূর্তে।

- সকলের দোহাই দিয়ে নিজের করা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করুন। আপনি অন্যদের যা খুশি বুঝিয়ে বোকা বানাতে পারলেও আমাকে বোকা বানাতে পারবেন না।

- আমাকে একটু বিশ্বাস করুন বাদশাহ। আমি আপনাকে বড় স্নেহ করি।

হাদিজাহের কণ্ঠস্বর অসহায় শুনালো। মেহমেত খুব শান্ত ভাবে বললো,

- হ্যা এটা সত্যি আপনি আমাকে স্নেহ করেন, আমাকে ভালোবাসেন। কিন্তু এর থেকেও বড় সত্য আপনি নিজের স্বার্থের জন্য যে কাজকে ব্যবহার করতে দুবার ভাবেন না। আর এজন্যই আমি আপনাকে ঘৃণা করি জ্বিন মাতা। এবং আমি আপনাকে ঘৃণা করে যাবো।

এতটুকু বলে থেমে মেহমেত দৃঢ় কণ্ঠে বললো,

- আমালিয়াকে নিয়ে আপনাকে আর ভাবতে হবে না। তার ওপর আপনার আর কোনো অধিকার নেই। আমার যা করার আমি তা করবো, তাতে কেউ বাধা দিতে পারবে না। বারবার আমাদের মাঝে আসা বন্ধ করুন।

কথাগুলো বলে মেহমেত চলে যেতে নিলে হাদিজাহ বললো,

- জ্বিন রাজ্যে ফিরবেন কবে বাদশাহ? আমাদের আপনাকে প্রয়োজন।

মেহমেত কয়েক পল থেমে বললো,

- এতগুলো বছর যখন আমাকে দরকার পরেনি তখন এখনো পরবে না আশা করছি। আমার যখন সময় হবে ঠিক সেই মুহূর্তে জ্বিন রাজ্যে ফিরে যাবো।

মেহমেত আর থামলো না, সে হারিয়ে গেলো আঁধারে। তার কোথাও খুব কষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে তার আমালিয়ার কথা খুব স্মরণে আসছে। আমালিয়াকে এই মুহূর্তে তার প্রয়োজন।

আমালিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের ঝর্ণা দেখছিলো। মেহমেত এলো ঝড়ের বেগে। আগাম কোনো বার্তা ছাড়াই সে আমালিয়াকে নিজের দিকে ফিরিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। উচ্চতায় সে আমালিয়ার থেকে অনেক বড় হওয়ায় আমালিয়া ঠিক তার বুকের কাছে পরে রইলো। অবাক আমালিয়া কিছু বলতে চাইলো কিন্তু মেহমেত সেই সময়টুকু তাকে দিলো না। পূর্বের অবস্থান পরবর্তন করে মেহমেত নিজের কোমর বাকিয়ে আমালিয়ার সমান হয়ে নিজের মাথাটা আমালিয়ার কাঁধে এনে চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিশ্বাস নিলো। এবার তার ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে। এতক্ষন সে শান্তি পাচ্ছিলো না। আমালিয়া কি বলবে বা করবে কিছুই বুঝলো না। বেচারিকে সেই সময়ই দেয়া হলো না। মেহমেত নিজের একের পর এক কাজ দিয়ে তাকে অবাক করেই যাচ্ছে। আমালিয়া নিজেকে ধাতস্ত করে মেহমেতের পিঠে হাত রেখে ধীরে প্রশ্ন করলো,

- আপনি ঠিক আছেন মেহমেত?

মেহমেত উত্তর করলো না। বরং ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে বুঝিয়ে দিলো যে সে ঠিক নেই। আমালিয়াও আর কথা বাড়ালো না। মেহমেতকে সময় দিলো নিজেকে সামলে নেয়ার এবং অপেক্ষা করলো মেহমেতের নিজ থেকে সবটা বলার জন্য। দীর্ঘ অনেক্ষন পর মেহমেত মুখ খুললো কিন্তু স্থান পরিবর্তন করলো না। তার বদলে আমালিয়াকে নিজের সাথে আরো কিছুটা আগলে নিয়ে বললো,

- বারবারই করছি আমি? খারাপ লাগছে আপনার?

আমালিয়া হাসলো মেহমেতের এমন বাচ্চামো কথায়। আজ হঠাৎ মেহমেতের কি হলো কে জানে? আমালিয়া মেহমেতের পিঠে ছোট ছোট চাপড় কেটে তাকে অসস্ত করলো। মেহমেত আমালিয়ার উত্তর যেন বুঝে নিলো, তাই আমালিয়ার সাথে আরো একটু গভীর ভাবে মিশে গেলো সে। এবার আমালিয়ার ভয় করলো। মেহমেতকে এরূপ আচরণ করতে কভু দেখেনি সে। সে ভয়ে ভয়ে মেহমেতকে ডেকে উঠলো,

- মেহমেত।

- হুম।

মেহমেতের কন্ঠ মিইয়ে যাওয়া। আমালিয়া মনের ভয় দূরে রেখে বলল,

- কি হয়েছে আপনার?

মেহমেত শুরুতে কিচ্ছুটি বলল না। তারপর আস্তে ধীরে বলল,

- জানি না। ভয় করছে।

আমালিয়া চিন্তিত হয়ে সুধালো,

- কিসের ভয়?

মেহমেত এবার মেয়েটিকে শক্ত করে চেপে ধরলো। মন চাইলো মেয়েটাকে নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে। মেহমেতের মতো শক্ত-সামর্থবান পুরুষ আমালিয়ার মতো নরম মোমের মতো মেয়েকে ওভাবে ধরলে ব্যাথা পাওয়া স্বাভাবিক। হলোও তাই। আমালিয়া ব্যাথায় শব্দ করে উঠলো।

- আহ, মেহমেত ব্যাথা পাচ্ছি।

- আমিও পাচ্ছি।

মেহমেতের একরোখা জেদী কন্ঠ। আমালিয়া বুঝল না সে কি করেছে? মেহমেত এহেন আচরণ কেন করছে তার সাথে।

- কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন? ছাড়ুন আমাকে ব্যাথা পাচ্ছি আমি মেহমেত।

মেহমেত ছাড়লো না। উল্টো আমালিয়ার গলায় খুব আবেশে চুমু খেয়ে বলল,

- কি যেন হয়েছে আমার বউজান। আপনাকে হারানোর ভয় হচ্ছে। আজ একটু ব্যাথা সহ্য করেন।

চলবে____

[ তোমরা রিয়েক্ট দাও না, কমেন্ট করো না। সবাই পঁচা পঁচা। লেখিকার থেকেও পঁচা। মহা পঁচা]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন