#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৩৩
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
-ভালোবাসেন তাকে?
আরদারের দৃষ্টি আমালিয়ার ওপর। মেহমেত দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে আরদারের দিকে তাকালো। আরদারকে আমালিয়ার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেজাজ বিগড়ে গেলো মুহূর্তে। সরে এসে ঠিক আমালিয়াকে আড়াল করে দাঁড়ালো সে। যেন আরদারের দৃষ্টি থেকে আমালিয়াকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে সে। আরদার মেহমেতের কাজে ভীষণ বিরক্ত হলো। চোখমুখ কুঁচকে মেহমেতের দিকে তাকালো। কিন্তু মেহমেত তাকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। উল্টো শক্ত কণ্ঠে বললো,
-ভাইয়ের বউয়ের দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন লজ্জা করা উচিত আপনার।
-আপনি আমার ভাই না বাদশাহে মেহমেত। আর না সে আমার ভাইয়ের বউ। তাছাড়া তাকে আমি ভালোবাসি। আপনারও আগে থেকে।
আরদারও একই সুরে একরোখা উত্তর দিলো। মেহমেত তার উত্তরে মাথা নুইয়ে হাসলো। যদিও রাগে তার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এই সময়টি যে রাগের নয়। সে জানে কখন কি করতে হবে। আরদার মেহমেতের হেয়ালিতে বড্ডো বেশি অবাক হলো। সাথে বিরক্তও ভারী। তাই ভনিতা না করে আবারো প্রশ্ন ছুড়লো,
-তাকে ভালোবাসেন?
-কি মনে হয় আপনার?
-আমার মনে হওয়ার থেকে আপনার জবান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-তাই?
মেহমেত হালকা হাসলো। দৃষ্টি তার পিছনে, আমালিয়ার দিকে। মেয়েটা ভারী সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে। এই মুহূর্তে তাকে সব থেকে বেশি মায়াবী লাগে। মেহমেত প্রায়ই আমালিয়ার ঘুমের সুযোগ নিয়ে তাকে রাতভর দেখে। চোখের শান্তির থেকেও তার মনের শান্তি বেশি অনুভূত হয় তখন। মেহমেত আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি নিয়ে ধিমি আওয়াজে বললো,
-খুব।
আরদার চমকে উঠলো। তার হাত নিজ থেকে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো। চোখে ফুটে উঠলো সীমাহীন আর্তনাদ। সহ্য করতে পারছে না সে মেহমেতকে। আমালিয়ার তো শুধু তার হওয়ার কথা ছিল, তাহলে সৃষ্টিকর্তা কেন তার সাথে এরূপ খেলা খেলছে? কেন আমালিয়া আজ অন্য কারো বউ?
-মজা করছেন তাই না?
আরদারের কণ্ঠ থমথমে। চোখ তার নিষ্প্রাণ। মেহমেত এবার আমালিয়ার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আরদারের পানে তাকালো। আরদারকে দেখে একমুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল। কোথাও একটু খারাপ লাগলো। আরদারকে সে বরাবর নিজের ভাই ভেবে এসেছে। তার সাথে ঘটা সকল কিছুই জানা মেহমেতের। ছোট থেকে অবহেলার সাথে বেড়ে ওঠা আরদারকে আজ চোখের সামনে ভাঙতে দেখে তার খারাপ লাগলেও কিছুই যে করার নেই। আরদারকে বুঝতে হবে আমালিয়া কোনো জেদের বিষয় না। সে এখন মেহমেতের স্ত্রী, মেহমেতের অংশ। মেহমেত তাকে চাইলেই অন্য কাউকে দিতে পারবে না। তার থেকে বড় ব্যাপার মেহমেত মরার পরও আমালিয়াকে অন্য কারো হতে দিবে না। কখনো না। অসম্ভব কিছু চাইলেই তো আর মেহমেত দিয়ে দিবে না। এতটা উদর সে নয়। মেহমেত দুকদম বাড়িয়ে আরদারের মুখোমুখি হয়ে চোয়াল শক্ত করে বললো,
-আমালিয়া কোনো মজার বিষয় নয় আরদার। তার আশা ছেড়ে দিন। আমি যতদিন বেঁচে আছি আপনি তাকে পাবেন না। আর যতদূর আমার বিশ্বাস, আমি না থাকলেও সে অন্য কারো কাছে যাওয়ার সাহস করবে না। তার ব্যবস্থা অবশ্যই আমি করবো।
মেহমেতকে দেখে মোটেও মনে হলো না সে মজা করছে। উল্টো তার সুদর্শন চেহারা গম্ভীর ঠেকলো বড়। আরদার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে। দুজন চোখে চোখে কত কি বললো, কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারণ করলো না।
-আপনি তো তাকে শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাহলে হঠাৎ করে তার প্রতি আপনার এই ভালোবাসার কারণ? আবারো কোন খেলায় মেতেছেন জ্বিনে বাদশাহ?
তাচ্ছিল্য করে বললো আরদার। মেহমেত বুঝেও কথা বাড়ালো না। নিজেদের ব্যাপারে বাইরের কাউকে বলতে সে একদম আগ্রহী নয়। তার এবং আমালিয়ার মাঝে সম্পর্ক যেমনই হোক সে তা কাউকে বলতে চায় না। এটা একান্ত তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
-তা নাহয় আমি আর আমার স্ত্রী বুঝে নিবো। আপনাকে এখানে যে কারণে ডেকে আনা হয়েছে সেই ব্যাপারে না হয় কথা বলা যাক।
সত্যি বলতে মেহমেতের এক একটি বলা শব্দ আরদারের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে তো এমন ছিল না। তাহলে? কি এমন হলো তার? পরিস্থিতি তাকে এমন স্থানে কেন নিয়ে এলো যার কারণে সে মেহমেতকে সহ্য করতে পারছে না? আমালিয়াকে ভালোবাসার কি আদোও কোনো প্রয়োজন ছিল? ভালো যখন বাসলোই তাহলে কেন পেল না? প্রতি নিয়ত অন্য কারো সাথে আমালিয়াকে দেখলে তার ভিতরে যে অগ্নিদগ্ধ হয় তা কি কেউ দেখে? সে যে শান্তিতে নেই। প্রচুর কষ্ট হয়। নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে অন্যের হতে দেখা কি চারটি খানেক কথা? কেউ কি বোঝে তার কষ্ট? কেউ বোঝে না। কেউ না।
-হয়তো বুঝতে পারছেন আপনাকে এখানে নিয়ে আসার কারণ?
মেহমেতের কথায় আরদারের ধ্যান ফিরলো। সে মাথা নাড়িয়ে বুঝালো সে বুঝতে পারছে, তবে সবটা নয়।
-আমালিয়ার কি হয়েছে? টোটো যা বললো আমি তার কিছুই জানি না। আমি কিছুদিন জ্বিনরাজ্যের বাইরে ছিলাম।
-জানি।
-তবে? আপনি দয়া করে খুলে বলুন কি হয়েছে?
আরদার উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। তার সত্যিই আমালিয়ার জন্য চিন্তা হচ্ছে। কি হচ্ছে এখানে বুঝতে পারছে না সে। তাকে সুলেমান কিছু প্রয়োজনীয় কাজের জন্য জ্বিনরাজ্যের বাইরে পাঠিয়ে ছিল। এবং সেখান থেকে আজ ভোরেই রাজ্যে ফিরেছে। সে এমন একটি স্থানে গিয়েছিল যেখান থেকে সে কারো সাথে যোগাযোগও করতে পারছিলো না। তাহলে সে কিভাবে আমালিয়ার সাথে দেখা করলো। মারিদ রাজ্য ছাড়ার পর আজই তার আমালিয়ার সাথে দেখা।
-সে আশ্মিরাজ ছিল।
-কিহ! আবার?
মেহমেত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আরদার চমকে উঠলো। এই আশ্মিরাজ আমালিয়ার পিছু ছাড়ছে না কেন? যদিও আশ্মিজ্বিনদের নজরে একবার কেউ পড়ে গেলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের রক্ষা নেই। কিন্তু স্বয়ং জ্বিনে বাদশাহের সাথে লড়াইয়ে নামার ইচ্ছা পোষণ করার মতো বোকা তো আশ্মিরাজ নয়। তবে কি এর মাঝেও অন্য কোনো ব্যাপার রয়েছে?
-সে এখন কোথায়?
-পালিয়েছে।
মেহমেত লুকিয়ে গেলো সবটা। এখনো সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কে বিশ্বাসের যোগ্য বুঝতে পারছে না। আমালিয়ার শক্তি জাগ্রত হওয়া, আশ্মিরাজের মৃত্যুর কথা তাই সে কেউকে বলতে সাহস পেলো না। মেহমেতের উত্তরটি যেন আরদারের বিশ্বাস হলো না। তাই সে কিছুটা চেঁচিয়েই বললো,
-মানে? কিভাবে?
মেহমেত কপাল কুঁচকে ফিরে আমালিয়ার দিকে তাকালো। নাহ্ জাগেনি।
-ধীরে কথা বলুন।
আরদার মেহমেতের মতো করে আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো,
-আপনি থাকতে সে পালালো কিভাবে?
-তারা নিভালয় গিয়ে ছিল।
খুবই শান্তভাবে বললো মেহমেত, কিন্তু আরদার শান্তভাবে নিতে পারলো না।
-কিহ! আমালিয়া সেখানে কেন গিয়েছিলো? আশ্চর্য আপনি কি করেন? সামান্য একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখে রাখতে পারেন না ভাই?
মেহমেত ভ্রু তুলে আরদারের দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি শীতল। আজ বহুবছর পর আরদার মেহমেতকে পূর্বের ন্যায় ভাই বলে ডেকেছে। উত্তেজিত হয়ে পূর্বের অভ্যাস বহাল রেখে কথাটি বলে আরদার নিজেও থতমত খেয়ে গেলো। মেহমেতের চোখে চোখ রেখে স্থির হলো। মেহমেত পরিবেশের ঘনত্ব বুঝতে পেরে গলা খাঁকিয়ে দৃষ্টি আড়াল করে বললো,
-বুঝতে পারিনি এমন হবে। আর তাছাড়া সে সাধারণ কোনো বাচ্চা না। ২০ বছরের চঞ্চল প্রাণী; যে আমাদের দুজনের শান্তি হারাম করে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে। আশা করবো তাকে সাধারণ বলে বোকামি করবেন না। আর তাছাড়া আমি তাকে যথেষ্ট সুরক্ষার মাঝেই রাখি। অযথা দোষারোপ করবেন না।
আরদার চোরাচোখে মেহমেতকে দেখে দৃষ্টি ঘুরালো। বললো,
-কি মনে হচ্ছে আপনার? আমার ব্যাপারটা সাধারণ লাগছে না। এত জায়গা থাকতে তাকে নিভালয় কেন নিবে? আর তার কাছে আশ্মিরাজ কি চায়?
মেহমেতের মেজাজ খারাপ হলো আরদারের বোকা বোকা প্রশ্নে। এর থেকে আমালিয়া হাজারগুন বুদ্ধিমতী। মাত্র ৫৭ বছরে এর এত অবনতি হবে জানলে কখনোই নিজের সময় নষ্ট করে এর পিছনে শক্তি অপচয় করতো না। গাধা একটা। মনে মনে কথাগুলো ভেবে নিলেও মুখে বললো,
-সুলেমানের ওপর নজর রখবেন।
-বাবা?
-হুম।
-কিছু সন্দেহ করছেন?
-বার্তা সিলারাজ্য থেকে এসেছে। আর সেখানে আপনার বাবা ছাড়া এমন কেউ নেই যার বুকে এতো সাহস আছে।
আরদার প্রতিউত্তর করলো না। সেও জানে তার বাবা ক্ষমতার লোভে কতটা নিচে নামতে পারে। তাছাড়া তারা শুরু থেকেই আমালিয়ার পিছনে লেগে আছে। কিন্তু তাই বলে আরদারকে ফাঁসাবে?
-কিন্তু সে বাবা হয়ে ছেলেকে বিপদে ফেলবে? যেখানে জানে আমালিয়ার কিছু হলে আপনি কাউকে ছাড়বেন না।
মেহমেত ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। গিয়ে আমালিয়ার পাশে বসে আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
-তাদের আসলেই আপনার থাকা, না থাকতে কিছু আসে যায় আরদার?
তিক্ত হলেও যে সত্য আরদার তা জানে। তার মা-বাবা কখনো তার ব্যাপারে ভাবেনি। তাদের শুধু ক্ষমতা চাই। তার জন্য যদি তাকে বলিও দিতে হয় দুবার ভাববে না।
-শুধু বাবা নয় মাও হতে পারে। আমি চেষ্টা করবো। কিছু জানতে পারলে অবশ্যই আপনাকে জানাবো।
অতঃপর আমালিয়ার দিকে ইশারা করে বললো,
-এসব কিছু আমি শুধুমাত্র তার জন্য করছি। ভুলেও ভাববেন না আপনার জন্য কিছু করছি। এই ভুল ধারণায় থাকবেন না। সময় হলে ঠিক আমি তাকে নিজের কাছে নিয়ে যাবো। ততদিন তার খেয়াল রাখবেন।
কথাগুলো বলে আরদার মেহমেতকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো। রাগে মেহমেত চেঁচিয়ে বললো,
-এমন দিন এলে আমি আপনাকে জীবিত ছাড়বো না। দূরে থাকবেন আমার বউয়ের থেকে।
মেহমেত ফোঁস ফোঁস করলো বসে বসে। মেজাজটাই খারাপ করে দিয়েছে তার। তার বউকে তারই সামনে থেকে নিয়ে যাবে আর সে কি বসে বসে তামাশা দেখবে? কখনো না। এই আরদারকে সে টোটোর সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে। তাহলে আর আমালিয়াকে নিয়ে তার দুশ্চিন্তা করতে হবে না। দুটো আপদের একটিও থাকবে না। তখন সে আমালিয়ার সাথে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াবে। মনে মনে সে এমন ভয়ংকর পরিকল্পনা করে নিজেকে শান্ত করলো।
-উম।
আমালিয়া নড়েচড়ে উঠলো। কিন্তু এখনো তার চোখ বন্ধ। মেহমেত আমালিয়ার ওপর এক প্রকার হামলে পড়লো।
-বউজান, বউজান। এইতো আমি। কি হয়েছে বলুন আমাকে?
আমালিয়া ধীরে চোখ খুললো। মুখের সামনে মেহমেতকে ঝুঁকে থাকতে দেখে অবাক হলো। ধীরে ডানহাত তুলে মেহমেতের বামগালে রাখলো। কিছু সময় মেহমেতকে দেখে নিয়ে আচমকা দুহাতে মেহমেতের গলা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। মেহমেত আমালিয়ার মাথার পিছনে ডানহাত রেখে ভারসাম্য দিয়ে বললো,
-কিছু হয়নি, সব ঠিক আছে। এইতো আমি।
-মেহমেত, ওই লোকটা আমাকে….আমি কিছু করিনি বিশ্বাস করুন।
আমালিয়া এখনো সেই মুহূর্ত থেকে বের হতে পারেনি। এটাই ভয় ছিল মেহমেতের। যদিও সে জানে কি করতে হবে, তবুও আমালিয়ার চোখের পানি তাকে বড্ডো পীড়া দিচ্ছে।
-কি হয়েছে? কোন লোকের কথা বলছেন আপনি?
আমালিয়ার কান্না থেমে গেলো এহেন কথায়। মেহমেতের থেকে সরে এসে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। যেন মেহমেতের মুখে এরূপ কথা সে আশা করেনি।
-আশ্মিরাজ, ওই গুহা, আপনি দেখলেন তো তখন।
-কি বলছেন? কোন গুহা? আর আশ্মিরাজ কোথা থেকে আসবে? স্বপ্ন দেখেছেন কোনো?
মেহমেত পুরোপুরি ঘটনাটি এড়িয়ে গেলো। সে চায় না আমালিয়া এটা নিয়ে বেশি ভাবুক। যত ভাববে তত সত্যের মুখোমুখি হবে। তার জন্য তাকে মিথ্যা বলতে হলে, লুকাতে হলে সে তাই করবে।
-স্বপ্ন? আপনি ভুলে গেলেন আমি তো ..
-হ্যা আপনি তো কি? আমি মাত্রই ফিরলাম। তখন থেকেই আপনাকে ঘুমন্ত পেয়েছি।
-আমি ঘুমিয়ে ছিলাম?
-হ্যা।
ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাটি বললো মেহমেত। আমালিয়া এবার মেহমেতকে সরিয়ে উঠে বসলো। কক্ষের এদিক-ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো সেই একই পোশাক পরে আছে সে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সেই ঘটনা সকালে ঘটেছে। সে এতো সময় ঘুমিয়ে ছিল? মেহমেত কি তার সাথে মজা করছে?
-মজা করছেন আপনি তাই না? আশ্মিরাজকে আমি মেরে ফেলেছি মেহমেত।
-কি আবোলতাবোল বকছেন? তাকে আপনি কেন মারবেন? তাকে মারার মতো শক্তি আপনার আছে?
-বিশ্বাস করুন আমি সত্যি বলছি মেহমেত। আমার শরীর থেকে আগুন বের হচ্ছিলো ঠিক সেই স্বপ্নের মতো। আশ্মিরাজ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে ছিল।
আমালিয়া কথাটি বলতে বলতে নিজেকে বারবার দেখালো। সে এখনো কাঁপছে। বিশ্বাস করতে পারছে না কি হয়ে ছিল তার সাথে।
-শান্ত হন আমালিয়া। আপনার শরীরে আগুন থাকলে আপনি বেঁচে থাকতেন?
আমালিয়া বোকা চোখে তাকালো মেহমেতের দিকে। তার চোখ দুটি কত কি বলতে চায় মেহমেতকে, কিন্তু বলতে পারছে কই? মেহমেত তো বিশ্বাসই করছে না তাকে। চোখের কোল ঘেঁষে গড়িয়ে পড়া পানির দিকে তাকিয়ে মেহমেতের বড্ডো অপরাধবোধ হলো। তবুও নিজেকে ভাঙতে দিলো না। বরং যত্নের সাথে আমালিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
-তেমন কিছু হলে কি আমি আপনাকে বলতাম না? কেন লুকাবো বলুন? আর আপনি আমাকে না জানিয়ে কোথাও গেলে আমি কি রেগে থাকতাম না আপনার ওপর?
আমালিয়া নাক টানলো। ভাবলো সত্যিই তো, তেমন কিছু হলে মেহমেত কি তাকে আস্তো রাখতো? হয়তো সে এবারও খারাপ স্বপ্ন দেখেছে প্রতিবারের মতো।
-আচ্ছা স্বপ্নের মতো মানে কি যেন বললেন?
আমালিয়া ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে বললো,
-আমি এর আগেও স্বপ্ন দেখেছি। একটি গাছ; সেটি স্পর্শ করার সাথে সাথে আমার সম্পূর্ণ শরীরে আগুন লেগে গিয়েছিলো।
মেহমেত ঢোক গিললো। তার চোখেমুখে ভয়। আমালিয়া কোন গাছের কথা বলছে মেহমেত জানে। আমালিয়ার চোখেও পানি। সে আবারো নাক টানলো। মেহমেত নিজেকে সামলে নিলো অতিদ্রুত। তখনও সে আমালিয়ার খুব কাছাকাছি বসে। তার ডানহাত আমালিয়ার বাম গালে রাখা। আমালিয়া নিজের হাত তুলে নাক ঘষলো, ফলে চিকন ফর্সা নাকটি লাল বর্ণ ধারণ করলো। দেখতে তখন ভারী সুন্দর লাগলো। মেহমেতের কাছে মনে হলো এটি কোন সুস্বাদু খাবার। অতঃপর সে বিন্দুমাত্র সময় ব্যায় না করে চোখের পলকে আমালিয়ার নাক কামড়ে ধরলো। আকস্মিক ঘটনায় আমালিয়া ভড়কে গেলো। যখন সে বুঝলো ততক্ষনে মেহমেত আবার নিজের স্থানে চলে গিয়েছে। আমালিয়া ব্যাথায় চেঁচাতেও পারেনি এতটাই ভড়কালো। নাকে হাত দিয়ে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেহমেত সুন্দর করে নিজ স্থান ছেড়ে যেতে যেতে বললো,
-দ্রুত আমার সামনে থেকে সরুন নয়তো গতকালের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি?
ব্যাস, কথাটি বলে নিজেই চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেলো আমালিয়াকে বেকুব বানিয়ে। আমালিয়া বেচারা মুখ বানিয়ে ভাবলো হলোটা কি? তাকে সরতে বলে নিজেই সরে গেল? অদ্ভুত মানুষ! না না মানুষ নয় জ্বিন, জ্বিন। আমালিয়া নিজের কপাল চাপড়ে বিছানা ছাড়লো। এই লোকের সাথে থেকে থেকে তার নিজের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
—--------------
আমালিয়া উদাসীন ভঙ্গিতে বাগানের সেই ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে। সে ঘটনার পর আজ দুদিন কেটেছে। সব কিছু একদম স্বাভাবিক, তবুও কেন যেন আমালিয়ার নিকট অস্বাভাবিক লাগে। এই দুদিনে আমালিয়া আজলানকে বহুবার ডেকেছে, কিন্তু আজলানের খোঁজ নেই। তার বিশ্বাস মেহমেত তার থেকে কিছু লুকাচ্ছে, আর তা একমাত্র আজলানের থেকেই সে জানতে পারবে। কিন্তু আজলান কোথায়? সে কি আমালিয়ার সাথে একবারও যোগাযোগ করবে না?
-মহারানী সূর্যাস্তের সময় হয়ে গিয়েছে। বাইরের আবহাওয়া বেশি ভালো নয়। আপনার ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। দয়া করে প্রাসাদের ভিতর চলুন। বাদশাহ জানতে পারলে আমাদের রক্ষে থাকবে না।
আমালিয়া উদাস চোখে চাইলো পাশে দাঁড়ানো সুন্দরী রমণীর পানে। মেয়েটি তার সব থেকে কাছের দাসী। নাম রুবিনা। ভীষণ কোমল ও আন্তরিক সে। রুবিনা উচ্চতায় অধিক বড় তার থেকে। এবং দেখতেও ভারী মিষ্টি। সে লক্ষ্য করেছে এখানে সকল জ্বিন উচ্চতায় লম্বা। রুবিনাকে মেহমেতই তার দাসী হিসেবে এনেছে। আমালিয়ার এসবের কোনো দরকার নেই। তবুও মেহমেত কথা শুনলো না। সারাক্ষন কেউ না কেউ আমালিয়ার সাথে থাকেই। এমন কি তার প্রতিটি নিশ্বাসের হিসাবও নাকি মেহমেতকে দিতে হয় বলে জেনেছে সে। আজকাল মেহমেতকে কেমন ভিন্ন লাগে। রুবিনার ভাষায় তাদের বাদশাহ আমালিয়াকে ভীষণ ভালোবাসে এবং চোখে হারায়। কিন্তু আমালিয়া তো জানে এসব কিছু মেহমেতের আবারো নতুন কোনো চাল। তাছাড়া দুদিন থেকে আমালিয়া টোটো এবং মিগির কোনো খোঁজ জানে না। বারকয়েক মেহমেতকে প্রশ্ন করলে প্রতিবারই সে জানিয়েছে কিছু বিশেষ কাজে তাদের দুজনকে দূরদেশে পাঠিয়েছে। এছাড়া একটি বাক্যও বলেনি। মিগি কখনোই তাকে না জানিয়ে কোথাও যাবে না সে জানে। তাহলে মেহমেত কেনো এমন বলল? সেই থেকে আমালিয়ার মেহমেতের ওপর সন্দেহ আরো গাঢ় হয়েছে।
-মহারানী।
আমালিয়া ফিরে তাকালো রুবিনার দিকে। মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে নেই। দৃষ্টি নিচে রেখে বিনয়ী ভঙ্গিতে তার থেকে দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে। আমালিয়ার ওকে ভীষণ পছন্দ। কি ভীষণ মিষ্টি করে কথা বলে! শুরুতে আমালিয়া মহারানী বলতে বারণ করেছিল কিন্তু মেয়েটা শুনলো কই? তার এক কথা মেহমেত জানতে পারলে তার গর্দান নিবে। আমালিয়াও বিশ্বাস করে কথাটি। মেহমেতের দ্বারা সবই সম্ভব।
-এভাবে ভালো লাগছে রুবিনা।
-কিন্তু মহারানী, বাদশাহ এসে আপনাকে এভাবে দেখলে রাগ হবেন। তাছাড়া আপনি অসুস্থ।
চকিতে আমালিয়া রুবিনার চোখে চোখ রাখলো। রুবিনা হকচকিয়ে উঠলো। বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছে এমন ভাবে চোখ লুকিয়ে বললো,
-আমি আপনার জন্য গরম পোশাক আনছি।
কথাটি বলে রুবিনা হন্তদন্ত পায়ে পালিয়ে গেলো। কিন্তু আমালিয়ার মনে সন্দেহের বীজ ঠিকই বপন হয়ে গিয়েছে ততক্ষনে। সে অসুস্থ মানে? কি বঝাতে চাইলো রুবিনা? আমালিয়া সেদিনের পর লক্ষ্য করেছে প্রাসাদের সকলেই তার চোখে চোখ রাখে না। সে দূরে থাকলে তাকে নিজে আলোচনায় মেতে থাকে। তার সম্মুখে সব স্বাভাবিক হলেও অগোচরে কিছু একটা যেন রয়ে গিয়েছে। যা তাকে শান্তি দিচ্ছে না। সকলের ওই শানিত দৃষ্টি তাকে ঘুমাতে দেয় না। সে হাদিজাহের কাছেও গিয়েছিলো সত্যতা জানার লক্ষে কিন্তু হাদিজাহও কিছু বললো না। এটাই যেন আমালিয়াকে আরো গোলকধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। আমালিয়া ছোট করে নিশ্বাস ফেললো। দূর আকাশে সূর্যের অপরূপ সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে। হালকা শীত শীত লাগায় আমালিয়া ছোট ছোট কদমে এগিয়ে গেলো নিজ কক্ষের দিকে। আশেপাশের দৃশ্য যতই সুন্দর হোক না কেন, আমালিয়ার পৃথিবীতে কাটানো সময়গুলো খুব মনে পরে। যদি আবারো সে পূর্বের জীবন ফিরে পেত? যদি সময়কে পিছনে নেয়া যেত? তাহলে সে মেহমেতকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দিতো।
-লিয়া।
করিডোর পেরিয়ে যাওয়ার সময় দূর হতে একটি পরিচত কণ্ঠ শুনতে পেয়ে আমালিয়া দাঁড়িয়ে পড়লো। পিছু ফিরে দেখল মেলিসা তার দিকেই ছুটে আসছে একহাত নাড়িয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে। আমালিয়া স্থির দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে আবারো কোনো ভ্রম দেখছে। মেলিসা কাছাকাছি এসে আমালিয়াকে জড়িয়ে ধরতে নিলেই আমালিয়া দ্রুত দূরে সরে দাঁড়ালো। সে আতংকিত। মেলিসা থতমত খেয়ে গেলো।
-কি হলো লিয়া?
মেলিসার কণ্ঠ কাঁদো কাঁদো। সে বড্ডো কষ্ট পেয়েছে। কতদিন পর দেখা তাদের, কথায় আমালিয়া তাকে জড়িয়ে ধরবে তা না তার থেকে দূরে সরে গেলো? মেলিসা কেঁদে দিবে দিবে অবস্থা। আমালিয়া নাক কুঁচকালো। বিরক্ত হয়ে বললো,
-আমাকে আর কেউ বোকা বানাতে পারবে না বুঝেছো? টোটো বাড়াবাড়ি করো না। আমি জানি এটা তুমি। মেলিসা এখানে কোথা থেকে আসবে হুম?
মেলিসা যেন আকাশ থেকে পড়েছে। আমালিয়া তাকে চিনতে পারছে না? এই কষ্টে সে সত্যিই কেঁদে দিলো। কিন্তু তবুও আমালিয়া নড়লো না। তার বিশ্বাস এটি মেলিসা নয়। ঠিক সেই মুহূর্তে মেহমেত এগিয়ে এলো। মেলিসাকে কাঁদতে দেখে ভ্রু তুলে তাকালো। আমালিয়া তার দিকে তাকিয়ে বুকে হাত বেঁধে নিলো। প্রস্তুতি নিলো নাটক দেখার। মেহমেত কিছু বুঝলো না। বউয়ের ভাবভঙ্গি তার ঠিক লাগছে না।
-কি হয়েছে?
মেলিসা এই প্রশ্নেরই অপেক্ষায় চাইলো যেন। সে আক্ষেপ করে বললো,
-আমালিয়া আমাকে চিনতে পারছে না।
-মানে?
-মানেটা আপনি ওকেই জিজ্ঞেস করুন।
মেলিসা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললো। আমালিয়া ভীষণ বিরক্ত। রোজ রোজ এসব ভালো লাগছে না। যে পারছে এর ওর রূপ নিয়ে তাকে ঘোল খাওয়াতে চাচ্ছে।
-কি হচ্ছে আমালিয়া?
-কি হবে?
আমালিয়ার তেরা জবাব। মেহমেত বুঝলো আমালিয়ার সাথে কঠিন ভাষায় কথা বলে লাভ নেই। তাই নরম গলায় বললো,
-তিনি মেলিসা আমালিয়া। আপনার বন্ধু।
-বোকা পেয়েছেন আমাকে? টোটো সামনে এসো, ভালো হচ্ছে না কিন্তু। তোমাদের এসব দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত।
মেলিসা এবার আরো কাঁদোকাঁদো মুখ করে মেহমেতের দিকে তাকালো। মেহমেত বুঝতে পারলো আমালিয়ার এরূপ ব্যবহারের কারণ। সাধারণভাবে কারো সাথে বারবার একই ঘটনা ঘটলে তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হবেই। তাই মেহমেত বাক্য বিনিময় না করে জাদুর সাহায্যে একটি ছোট ছুড়ি এনে চোখের পলকে মেলিসার হাত কেটে দিলো। আমালিয়া আঁতকে উঠে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো।
-আআ আমার হাত!
মেলিসা সেখানেই বসে পড়লো। যদিও তার হাত খুব বেশি কাটেনি, তবুও যা কেটেছে তা থেকে ভালোই র*ক্তের স্রোত বের হলো। র*ক্ত দেখে আমালিয়ার মাথা ঘুরে উঠলো। মেলিসা সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। মেহমেত বিরক্তিকর চোখমুখ করে বসে পড়লো মেলিসার সামনে। মেলিসা মেহমেতকে তার কাছে দেখেই দূরে যেতে চাইলো, কিন্তু মেহমেত দিলো না। উল্টো মেলিসার হাত ধরে জাদুর সাহায্যে আগের মতো করে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অতঃপর আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় বললো,
-এবার বিশ্বাস হলো তো তিনি মেলিসা, নাকি এখনো সন্দেহ রয়েছে? তিনি কোনো জ্বিন নয়। সম্পূর্ণ রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। বিশ্বাস না হলে আবার কেটে দিই?
-নাহহ।
আমালিয়া মেলিসা এক সাথে চেঁচিয়ে উঠলো। মেহমেত এমন ভাবে মেলিসার দিকে তাকালো যেন আর একটা শব্দ মুখ হতে বের করলে এর পরের বার ওর মাথা কেটে দিবে। মেলিসা ভয়ে ভয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো।
-এ জন্যই বলে কারো ভালো করতে নেই।
কথাটি বলে মেহমেত যেমন নিঃশব্দে এসেছিলো ঠিক তেমন ভাবেই চলে গেলো আমালিয়াকে স্তব্দ করে দিয়ে। আমালিয়া এখনো ঘোরের মাঝে রয়েছে। মেলিসা নিজের হাত ধরে নাকে কেঁদে বললো,
-তোমার জামাই ভীষণ সাঙ্ঘাতিক লিয়া।
আমালিয়া মেহমেতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মেলিসার সাথে সুর মিলিয়ে বললো,
-আসলেই সাঙ্ঘাতিক।
চলবে___
[কাল গল্প আসবে না। আগেই বলেছি শুক্রবার আমি গল্প দিতে পারব না। কাল এক্সাম আছে দোয়া করবেন সবাই। পেজের রিচ কমে গেছে। যাদের ভালো লাগবে তারা রিকমেন্ড করে দিবেন আর কমেন্ট/রিয়েক্ট করবেন বেশি বেশি প্লীজ। ]