#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৩৫
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
পুরুষ মানুষের নাকি কাঁদতে নেই। সেই কথা রেখে মেহমেত কাঁদলো না। কিন্তু কান্না আটকে রাখার দমকে তার চোখের সাদা অংশটুকু রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। শুধু কি তাই? নাক এবং কান অত্যাধিক লাল হয়ে গিয়েছে। জোর করে কান্না চাপিয়ে রাখার ফলস্বরূপ ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। আমালিয়ার কাছে মেহমেতকে এখন নিতান্তই এক বাচ্চা লাগলো। মেহমেত আকুতি ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমালিয়ার দিকে। আমালিয়ার কানে এখনো মেহমেতের বলা শেষ কথাটি বাঁজছে। সে এবার ঝুঁকে পড়ল মেহমেতের মুখের ওপর। মেহমেতের মুখখানি নিজের নরম হাতের মাঝে নিয়ে প্রথমবারের মতো নিজ ইচ্ছায় মোলায়েম এক স্পর্শ একে দিল মেহমেতের কপালে। মেহমেত সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিলো। ফলে এত সময় আটকে রাখা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল চোখ থেকে। আমালিয়া সাথে সাথে নড়ল না। বরং দীর্ঘ সময় নিজের আধিপত্য জাহির করে ঠোঁট সরালো। আমালিয়া মেহমেতের থেকে সরে আসতেই মেহমেত চোখ খুলে তাকালো। সাথে সাথে দৃষ্টি মিলিত হলো দুজনের। আজ দীর্ঘদিন পর তাদের চোখে চোখে বহু কথা হলো। জমে থাকা রাগ, অভিমান, ব্যাথা প্রকাশ পেলো। সেদিন সেই পূর্ণিমার রাতে আমালিয়া নিজেকে মেহমেতের কাছে ধরা দিলো। বিবাহিত জীবনের অনেকটা সময় রাগ, অভিমানের পর শুরু করলো এক প্রেমময় নতুন অধ্যায়। সে রাতে মেহেমেত উন্মাদ হলো, পাগলামি করলো। আমালিয়ার তাকে সামলাতে হিমশিম খেতে হলো। তার ধারণার বাইরে ছিল মেহমেতের এই রূপ। না পেরে আমালিয়া কতই না আকুতি জানালো। কিন্তু মেহমেত! সেতো তখন নিজের মাঝে নেই। অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছে। আমালিয়ার বলা শত আকুতি তার কানে ভিড়লো না। ফলস্বরূপ, নিজের সাথে সাথে সে আমালিয়াকেও উন্মাদনার এক চরম পর্যায়ে নিয়ে গেল। আমালিয়া ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝতে পারল মেহমেত তার জন্য কতটা পাগল। তার প্রতিটি স্পর্শে তা স্পষ্ট বোঝা গেলো। অদ্ভুত এক সুখ তাকে ঘিরে ধরলো। জীবনে এই প্রথমবার আমালিয়া নিজের সাথে নিজে পরিচিত হলো। অনুভব করলো স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন ও ভালোবাসার গভীরত্ব।
ভোরের প্রথম উষ্ণ রশ্নি এসে আমালিয়ার কাঁধে লুটোপুটি খাচ্ছে। মেহমেত তা নির্নিমেষ চোখে দেখে এগিয়ে গিয়ে সেথায় ঠোঁট ছোয়ালো। ঘুমে বিভোর আমালিয়া একটু নড়ে চড়ে উঠলো সেই আলতো আদ্র স্পর্শে। অতঃপর আদুরে বিড়াল ছানার মতো আরো কিছুটা মেহমেতের বুকের মাঝে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করলো। তা দেখে মেহমেত শব্দহীন হাসলো। আমালিয়ার মুখের ওপর অবিন্যস্ত চুল যত্ন করে সরিয়ে দিয়ে কপালেও ঠোঁট ছোয়ালো। ঘুমন্ত আমালিয়ার সামান্য কপাল কুঁচকে এলো এতে। যা মেহমেতের পছন্দ হলো না। সে পরপর আমালিয়ার সারা মুখে অনেকগুলো চুমু খেয়ে অবশেষে থামলো। ততক্ষনে আমালিয়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। মেহমেতের অত্যাচারে সে শান্তিতে একটু ঘুমাতেও পারলো না। নাকমুখ কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বললো,
-সমস্যা কি আপনার? ঘুমাতে দিচ্ছেন না কেন?
তখনও মেয়েটা পুরোপুরি চোখ খুলতে পারছে না। সারারাত মেহমেত তাকে জ্বালিয়েছে। একফোঁটা ঘুমাতে দেয়নি। ঘুমাতে চাইলেই এ কথা সে কথার জালে ফেলে তাকে ঘুমাতে দেয়নি। যখন ভোরের আলো ফুটেছে ঠিক সেই মুহূর্তে মেহমেতের যত পাগলামি যত জমানো কথা ছিল সব থেমে গেলো। সে নিজেই আমালিয়াকে বুকের মাঝে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। আমালিয়া ভীষণ অবাক হয় এই মেহমেতকে দেখে। এমনকি গতরাতে পুরোটা সময় সে অবাক হয়ে দেখেছে মেহমেতকে। যে ব্যক্তিকে সর্বদা অন্যদের সামনে গম্ভীর হয়ে থাকতে দেখেছে সেই ব্যক্তি কাল তার সামনে কত যে কথা বললো!
মেহমেত আমালিয়ার কথা শুনেও মিষ্টি করে হাসলো। আফসোস এত স্নিগ্ধ হাসি আমালিয়া দেখতে পেলো না ঘুমের কারণে। আমালিয়াকে আরো বিরক্ত করতে সরাসরি আমালিয়ার নাকে জোরে-সোরে কামড় দিয়ে বসলো।
-আহ!
আমালিয়া ব্যাথা পেয়েছে। তার ঘুম পুরোপুরি গায়েব। চোখের কোণে জল জমে গিয়েছে। নাকে হাত দিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে মেহমেতের দিকে তাকালো। মেহমেত মনে মনে ভীষণ মজা পেল। আবারো একই কাজ করতে গেলে এবার আমালিয়া নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছটফট করে দূরে সরে গেলো।
-কি হচ্ছে মেহমেত? সমস্যা কি আপনার? ব্যাথা লাগে না আমার?
-আর একটা দিই?
আমালিয়া আঁতকে উঠে সরে গেলো মেহমেতের থেকে। এমন ভাবে বলছে যেন সামান্য ব্যাপার। অথচ সে তো জানে মেহমেত কামড় দিলে দয়া দেখায় না একদম। ভীষণ ব্যাথা লাগে।
-কখনোই না। দূরে, দূরে সরুন।
মেহমেত স্থির তাকিয়ে আমালিয়ার দিকে। ওকে নিজের দিকে ওভাবে তাকাতে দেখে নিজেও তাকায় মেহমেতের দৃষ্টি কোথায় দেখতে। অতঃপর মেহমেতের দৃষ্টি কোথায় বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে নিজেকে ঢেকে নিতে গেলে মেহমেত আমালিয়ার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। আমালিয়া অস্বস্তিতে পরে মিনমিনিয়ে বললো,
-কি হচ্ছে কি? ছাড়ুন আমাকে।
-এভাবেই সুন্দর লাগছে আপনাকে।
আমালিয়া লজ্জায় হতভম্বের ন্যায় চেঁচিয়ে বললো,
-আল্লাহ! অসভ্য, নির্লজ্জ জ্বিন।
আমালিয়ার কথা শুনে মেহমেত হোহো করে হেসে উঠলো। ভোরের বাতাসে ন্যায় তাদের স্নিগ্ধ ভালোবাসাময় খুনসুটি ছড়িয়ে পড়লো আনাচ-কানাচে।
—------
-তোমাকে আজ অন্যরকম লাগছে লিয়া।
-মানে?
আমালিয়া অবাক হয়ে তাকালো মেলিসার দিকে। মেলিসা তার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে কিছু একটা দেখছে। ওর এমন চাহুনিতে আমালিয়ার বড্ডো অস্বস্তি হলো। মেলিসা এখানে এসেছে প্রায় ২ মাস হতে চললো। এই ২ মাস আমালিয়ার জন্য ভীষণ সুখময় সময় ছিল। বিগত সময়ের সকল দুঃখ ভুলে আমালিয়া আবারো নিজের মতো বাঁচতে শুরু করেছে। মেলিসার সঙ্গ আর মেহমেতের ভালোবাসায় সে রীতিমতো হাওয়ায় ভাসছে। সে যে ঠিক কতটা সুখী তা তার বাহ্যিক পরিবর্তন দেখেই বোঝা যায়। সর্বক্ষণ প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বেড়ায় সে। এখন তো আমালিয়ার মনে হয় তার থেকে সুখী মানুষ এই প্রথিবীতে আর একটিও নেই। যদিও এখনো সুমাইরা আর তার মায়ের জ্বালাতন বহাল রয়েছে, কিন্তু তবুও তা আমালিয়ার খুশিতে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। মেহমেত যতক্ষণ তার সাথে আছে ততক্ষন সে এমন পাঁচ/দশটা সুমাইরাকে নিজেই সামলে নিতে পারবে। তাছাড়া মেলিসা তো রয়েছেই। আমালিয়ার সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে তাকে একদম ছেড়ে দেয় না মেলিসা। নিজে তো কথা শুনাবেই সাথে মেহমেতের কাছেও বিচার দিবে। এই কারণেই মেলিসা সকলের চক্ষুশুলে পরিণত হয়েছে। তার ভাব শুধু রুবিনার সাথে। দুজন যেমন আমালিয়াকে ভালোবাসে, যত্নে রাখে ঠিক তেমনি মেহমেতের প্রতিও তাদের অগাদ নিষ্ঠা। শুরু শুরুতে মেলিসা মেহমেতকে ভয় পেলেও এখন তাদের মাঝে খুবই মিষ্টি খুনসুটিময় এক সম্পর্কের সূচনা হয়েছে। সর্বক্ষণ একে অন্যের পিছু লেগে থাকে। তারা দুজন না বললেও আমালিয়া বোঝে মেহমেত মেলিসাকে ছোট বোনের মতো স্নেহ করে। আবার মেলিসাও মেহমেতকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে। মাঝে মাঝে তাদের খুনসুটি দেখলে আমালিয়ার চোখ জুড়িয়ে যায়। আচ্ছা এত সুখ কি সত্যিই তার ভাগ্যে ছিল? মেহমেত এখন পুরোদমে রাজ্যের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। একজন উত্তম বাদশাহ হওয়ার সকল দায়িত্ব পালন করছে। সকলে আবারো মেহমেতকে পূর্বের ন্যায় সন্মান ও ভালোবাসার নজরে দেখে। মেহমেতও নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সবার মন রেখে চলার। এই তো সেদিনই আমালিয়া মেহমেতকে বললো পূর্বের সব ভুলে নতুন করে শুরু করতে। শত্রুদের পিছু না ছুটে নিজেদের মতো জীবনকে ঘুচিয়ে নেয়ার সময় এসে গিয়েছে। তাদের এখন ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে যে। মেহমেত বাচ্চা নয়, সে বুঝলো আমালিয়া তাকে কিসের ইঙ্গিত দিয়েছে। তারপর থেকেই তার মাঝে বিস্তর পরিবর্তন এসেছে। নিজের জন্য না হোক আমালিয়ার জন্য হলেও সে এই পরিবর্তন এনেছে।
-দারুন সুন্দর লাগছে।
আমালিয়া মেলিসার কথায় লজ্জা পেল ভারী। লাজুক হেসে বলল,
-কি যে বলো না তুমি মেলিসা!
-আহ, আমি সত্যি বলছি।
-আচ্ছা তাই?
-হ্যাঁ।
আমালিয়া তাকে বেশি পাত্তা দিলো না। মেলিসা হরহামেশাই এই কথা বলে থাকে। আমালিয়া নিজের মতো ঔষধি খুঁজতে ব্যস্ত। বাগানের সেই ঝর্ণা সহ সম্পূর্ণ বাগানটি মেহমেত আমালিয়ার অধীনে করে দিয়েছে। এই পুরো মারিদ রাজ্যের মাঝে তার বউয়ের কেন যেন এই স্থানটি খুব প্রিয়। তাইতো এখন এই জায়গাটি আমালিয়ার। আমালিয়া ছাড়া এখানে আসার অনুমতি শুধু মেহমেত, মেলিসা আর রুবিনার রয়েছে। তাছাড়া সম্পূর্ণ বাগান জুড়ে রয়েছে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা। মাঝে মাঝে আমালিয়া অবাক হয়ে এই নিরাপত্তার কারণ খোঁজে। আমালিয়াকে নিজের মতো কাজে মনোযোগী হতে দেখে মেলিসার একদম ভালো লাগলো না। সে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আমালিয়া মেলিসার সাড়া শব্দ না পেয়ে তার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত। মেলিসা আরো কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলল,
-তুমি আমাকে অগ্রাহ্য করছ লিয়া।
-এ কি কথা মেলিসা?
-নয়তো কি? তুমি আমাকে পাত্তাই দিলে না।
আমালিয়া ফোস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে এগিয়ে হাত ধরলো মেলিসার। যদিও আমালিয়ার হাতে মাটি লেগে আছে তবুও সংকোচ করল না।
-রাগ করো না মেলিসা। আমি তোমাকে অগ্রাহ্য কেন করব? আচ্ছা তুমি বলো আমি শুনছি।
মেলিসা জানে আমালিয়া তাকে খুব ভালবাসে তবুও সে ঢং করলো। আমলিয়ার কাছে গুরুত্ব পেতে দারুন লাগে যে। সে অতি উৎসাহের সাথে বলল,
-একটা কথা বলি লিয়া? কিছু মনে করবে না তো?
আমালিয়া মেলিসাকে খুব ভালোভাবে চেনে। মেলিসা কখনো কোনো কথা বলার আগে অনুমতি চায় না। এখন যখন চাচ্ছে মানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে চায়।
-বলো মেলিসা।
মেলিসা কিছু সময় চুপ রইলো অতঃপর আমালিয়াকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
-তুমি নিজের মাঝে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছ না লিয়া?
-পরিবর্তন!
মেলিসা কি বলতে চাচ্ছে আমালিয়া বুঝলো না। সে হতভম্ব মুখ করে তাকিয়ে। মেলিসা আমতা আমতা করলো। কিভাবে যে বলবে বুঝতে পারল না।
-ইয়ে মানে লিয়া তোমার শারীরিক..
-মহারানী জ্বিনমাতা আপনাকে স্মরণ করেছেন। সে আপনাকে অতি দ্রুততার সাথে তার কক্ষে যেতে বলেছেন।
রুবিনার কথায় মেলিসা থেমে গেলো। বাকিটা তার আর বলা হলো না, আমালিয়ারও শোনা হলো না। সে চটজলদি সেখান থেকে প্রস্থান নিয়ে ছুটলো হাদিজাহের কামরার দিকে।
________
-দাদি।
আমালিয়া হাদিজাহের কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলো। হাদিজাহ তখন তার বিলাসবহুল পালঙ্কে শুয়ে। আমালিয়ার ডাক শুনে সে ফিরে তাকালো।
-এসো লিয়া। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
আমালিয়া সামনে আগাতে আগাতে লক্ষ্য করলো হাদিজাহকে রোজকার দিনের মতো লাগছে না।
-ঠিক আছো দাদি?
আমালিয়া কাছে এগিয়ে এলে হাদিজাহ উঠে বসতে চাইলো। তা দেখে আমালিয়া নিজেই হাদিজাহকে বসতে সাহায্য করলো। হাদিজাহ নিজে বসে আমালিয়ার হাত ধরে নিজের পাশে বসতে ইশারা করলো। আমালিয়া চিন্তিত। হঠাৎ হাদিজাহের কি হলো বুঝতে পারছে না। ছোট থেকে সে এই মানুষটির ছায়াতলে বড় হয়েছে। এতগুলো বছরে সে কখনোই এভাবে হাদিজাহকে দুর্বল হতে দেখেনি।
-কি হয়েছে তোমার দাদি?
আমালিয়া তাকে নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। হাদিজাহের চোখ জুড়িয়ে গেলো। মনে প্রশান্তি অনুভব করলো। জীবনে সে অনেক ভুল করেছে। তার মাঝে অন্যতম ছিল আমালিয়াকে ঠকানো। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য মেয়েটিকে কতই না আঘাত করেছে কিন্তু আমালিয়া সেসব মনে না রেখে তার জন্য চিন্তিত হচ্ছে। আজকাল মেয়েটার জন্য তার ভীষণ মায়া হয়। কেন যেন এই নিষ্পাপ, মিষ্টি মুখটা মন ভোরে দেখতে ইচ্ছা করে। মন বলে আর হয়তো বেশি সময় নেই তার হাতে। হাদিজাহ আমালিয়ার গালে একহাত রেখে মুখভরে হাসলো।
-মেহমেতের সাথে সব কিছু ঠিক যাচ্ছে তো?
আমালিয়া কিছুটা থমকে গেলো। উত্তরে কি বলবে বুঝতে পারলো না। দাদির সামনে নিজেদের বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে ইতস্তত করলো। তবুও সংক্ষেপে বললো,
-সব ঠিক আছে দাদি।
-মেহমেত আগের মতো আচরণ করে?
-না দাদি।
হাদিজাহ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,
-ওর ব্যবহারে আজকাল সকলে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। আমি জানি এর কারণ তুমি। আমার ভালো লাগছে তোমাদের সুখে দেখে। মেহমেতের দায়িত্ব তোমার হাতে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত লিয়া। এখন আমি মরেও শান্তি পাবো।
হাদিজাহের মুখে এমন কথা শুনে আমালিয়া আঁতকে উঠলো। চোখে মুখে আঁধার নামিয়ে বললো,
-এভাবে কেন বলছো দাদি? এসব কথা মুখে আনবে না। তোমার এখনো লম্বা একটি সময় আমাদের সাথে কাটাতে হবে।
হাদিজাহ হাসলো আমালিয়ার বাচ্চামো কথায়। জন্ম-মৃত্যু কি আমাদের হাতে আছে? নেই তো। বোকা মেয়ে। সে আমালিয়ার দুহাত নিজের দুহাতের মাঝে নিয়ে নরম গলায় বললো,
-তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি লিয়া। তোমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমাকে আমার সকল কাজের জন্য ক্ষমা করে দিও। যদিও আমার উদ্দেশ্য তোমাকে কষ্ট দেয়া ছিল না তবুও নিজেদের স্বার্থে তোমাকে ব্যবহার করেছি যা ঠিক ছিল না। মনে কষ্ট রেখো না।
-দাদি কি বলছো তুমি এসব? তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছ কেন? তাছাড়া আমি সেসব কিছুই মনে রাখিনি। তাই তুমিও ভুলে যাও।
-মেহমেতকে দেখে রেখো। যেকোনো পরিস্থিতিতে তার সাথ ছাড়বে না, যেকোনো মূল্যে তাকে রক্ষা করবে কথা দাও আমাকে।
-দাদি এসব কি….
-কথা দাও লিয়া।
হাদিজাহ দুর্বল চোখে তাকিয়ে আমালিয়ার দিকে একরাশ আশা নিয়ে। আমালিয়া নিরুপায় হয়ে বললো,
-কথা দিচ্ছি কখনো তার সাথ ছাড়বো না। জীবন দিয়ে হলেও তাকে রক্ষা করবো।
হাদিজাহ নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ছাড়লো।
-আমি একটু ঘুমাবো লিয়া।
যদিও আমালিয়ার অনেক কিছু জানার ছিল কিন্তু সে থেমে গেলো। হাদিজাহের কথায় সে তাকে ধরে শুইয়ে দিয়ে নিশ্চুপে বেরিয়ে এলো।
—--------
হাদিজাহের কাছ থেকে ফিরে আমালিয়া নিজ কামরায় এলো। যেখানে পূর্ব হতেই মেহমেত উপস্থিত ছিল। মেহমেত আমালিয়াকে দেখে জানতে চাইলো,
-কোথায় ছিলেন আপনি?
-দাদির কাছে।
মেহমেত হাত বাড়িয়ে দিলো আমালিয়ার উদ্দেশ্যে। আমালিয়া মেহমেতের সেই বাড়িয়ে দেয়া হাত শক্ত করে ধরে নিয়ে এগিয়ে গেলো মেহমেতের কাছে। মেহমেত ওকে জড়িয়ে ধরে লম্বা একটি চুম্বন আঁকলো কপালে। অতঃপর চোখ বন্ধ করে নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। কিছু সময় পূর্বে তার আরদারের সাথে কথা হয়েছে। সে জানিয়েছে, আশ্মিরাজের সাথে তার বাবা-মা উভয়েই মিলিত ছিল। হয়তো ক্ষমতার লোভে এমন করেছে। ভেবেছে আমালিয়া যদি ফিরে আসে তাহলে সব কিছু হাতের বাইরে চলে যাবে। তাই হয়তো এমনটা করেছে। কিন্তু মেহমেতের মন বলে এর পিছনে গভীর কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। কেউ যে সুলাইমানকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করছে তা আর আরদারকে জানালো না। কিন্তু বুঝতে পারলো আরদারের থেকে বেশি দিন সে সত্যি লুকাতে পারবে না। তাছাড়া কাল সে সিলা রাজ্যে যাবে। তার ধারণা সে সেখানে সত্যের কিছুটা হলেও জানতে পারবে। হয়তো খুব দ্রুত এই সকল কিছুর পিছনে কে রয়েছে তা জানতে পারবে সে। কিন্তু তার জন্য যে তাকে কিছুদিনের জন্য রাজ্য ছেড়ে যেতে হবে! আমালিয়াকে ছেড়ে যেতে তার একদম মন মানছে না। যতবার আমালিয়াকে একা ছেড়েছে ততবার আমালিয়া কোনো না কোনো বিপদে পড়েছে।
-মন খারাপ?
আমালিয়া মেহমেতের বুকের সাথে মিশে থেকেই প্রশ্নটি করলো। মেহমেত ওকে আরো একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে বললো,
-উহু।
-তবে চিন্তিত লাগছে কেন আপনাকে?
মেহমেত ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। না বলতেও মেয়েটা কিভাবে যে সব বুঝে যায়!
-কাল রাজ্যের বাইরে যেতে হবে।
আমালিয়া মাথা তুলে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
-কোথায়?
মেহমেত লুকালো না আবারো সম্পূর্ণ সত্যিও বললো না।
-সিলা রাজ্যে কিছু কাজ রয়েছে।
-আরদার কিছু করেছে?
-নাহ।
আমালিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো। মেহমেতের বুকের সাথে মিশে গিয়ে বললো,
-ভয় পাচ্ছেন?
-হুম।
মেহমেত ধীমী আওয়াজে বললো। আমালিয়া জানে মেহমেতের ভয়ের কারণ।
-নিশ্চিন্তে যেতে পারেন আপনি। আমি আপনার অনুমতি ব্যতীত রাজ্যের বাইরে পা দিবো না। নিজের খেয়াল রাখবো।
আমালিয়ার কথায় মেহমেত নিশ্চিন্ত হলেও তার মন সায় দিচ্ছে না যেতে। কিন্তু কিছু যে করারও নেই।
-টোটো আর মিগি এসেছে চাইলে ওদের সাথে দেখা করতে পারেন। কাল আমার সাথে টোটোও যাবে। কিন্তু মিগি আপনার সাথেই থাকবে।
দীর্ঘ ২ মাস টোটো আর মিগিকে আমালিয়া দেখে না। সে বুঝতে পারে না কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল যে তারা তাকে না জানিয়েই এতদিনের সফরে চলে গেলো? যাই হোক, ফিরছে তাতেই খুশি সে। কিন্তু মেহমেত কালই চলে যাবে শুনে খারাপ লাগলো ওর।
-ফিরবেন কবে?
আমালিয়ার মুখশ্রী কালো আঁধারে ডুবে গিয়েছে। মেহমেত মৃদু হেসে ঠোঁট দাবিয়ে আমালিয়ার বাম গালে চুমু খেলো। তারপর ঠোঁট না সরিয়েই সেভাবেই বললো,
-দ্রুত ফেরার চেষ্টা করবো। এবার ফিরলে আপনাকে নিয়ে পৃথিবী থেকে ঘুরে আসবো কেমন?
আমালিয়া খুশি হলো। চোখে মুখে আনন্দ আবাস ফুটে উঠলো। খুশি হয়ে মেহমেতকে সে শক্ত করে দুহাতে জড়িয়ে নিলো।
—------
মেহমেত গিয়েছে আজ ৩দিন হলো। এই ৩দিন যেন ৩০০ বছর সমান মনে হচ্ছে আমালিয়ার নিকট। শুরুর ২দিন মেহমেতের সাথে যোগাযোগ করতে পারলেও আজ সারাদিনে মেহমেতের কোনো খোঁজ নেই। যদিও মেহমেত যাওয়ার পূর্বে বলে ছিল চিন্তা না করতে এই বিষয়ে। সে যখনি সময় করতে পারবে তখনি তার সাথে যোগাযোগ করবে। কিন্তু তবুও আমালিয়ার মনটা কেমন আনচান আনচান করছে। এরই মাঝে হাদিজাহ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পূর্বের থেকে আজ আরো বেশি অসুস্থ। সজ্জাসয়ী প্রায়। আমালিয়ার মন বলছে কোনো এক দুর্যোগ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
-কি ভাবছো লিয়া?
আমালিয়া মেলিসার দিকে তাকালো। তারা বর্তমানে তার এবং মেহমেতের কামরায় রয়েছে। মেহমেতের অনুপস্থিতিতে মেলিসা এবং রুবিনাকে হুকুম দেয়া হয়েছে যেন সর্বক্ষণ আমালিয়ার সাথে কক্ষেই থাকে। সেই হুকুম বহাল রেখে তারা আমালিয়াকে কক্ষের বাইরে এক পাও ফেলতে দেয়নি। আমালিয়াও অমান্য করেনি। সে চায়নি মেহমেতকে দুশ্চিন্তায় রাখতে। তাছাড়া এখানে আসার পর সে ভালোই বুঝে ফেলেছে এখানে থাকা প্রায় সকলেরই দুটি করে রূপ। সকলে ক্ষমতার পাগল। তাই যতটা দূরত্বে থাকা যায় ততটাই তার জন্য নিরাপদ। তাছাড়া রাজ্যে তাকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য জায়াদ্রাও নেই। মেহমেতের যাওয়ার পর সেও গুরুত্বপূর্ণ কাজের লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়েছে। যাওয়ার পূর্বে তাকে সাবধানে থাকার জন্য বলে গিয়েছে।
মিগি সেই কখন থেকে মেলিসাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে। মেলিসার চুল হয়তো তার খুব প্রিয় খেলার জিনিস, নয়তো সারাক্ষন কেন এটা নিয়ে পরে থাকবে? ওর কাজে ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো আমালিয়ার। বিছানায় শুয়ে পড়তে পড়তে বললো,
-কিছু না। শরীর দুর্বল লাগছে ঘুমাবো একটু।
রুবিনা অস্থির হয়ে এগিয়ে এলো। জানতে চাইলো,
-কি হয়েছে মহারানী? শরীর খারাপ লাগছে কি?
আমালিয়া ওর দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে চোখ বন্ধ করে বললো,
-না। শুধু একটু দুর্বল লাগছে।
এদিকে মেলিসা আর রুবিনার চোখাচুখি হতেই দুজনের মাঝে কি কথা হলো জানা নেই। তবে তাদের দুজনের ঠোঁটেই হাসি ফুটে উঠল। ঘুমাবে বললেও আমালিয়ার আর ঘুম হলো না। ঠিক সে সময়ে আমালিয়ার কামরায় কড়া নাড়লো কেউ। জানান দিলো হাদিজাহ ভীষণ অসুস্থ। অতঃপর মেহমেতের সতর্কতা ভুলে সকলে ছুটলো সে দিকে। গিয়ে দেখা গেলো সত্যিই তার অবস্থা খুব খারাপ। যেকোনো মুহূর্তে খারাপ কিছু ঘটতে পারে। রাজ কবিরাজ জানালো, ভিড় কমাতে। যে কোনো একজন সাথে থাকতে। যদিও আমালিয়া হাদিজাহের সাথে থাকতে চেয়ে ছিল কিন্তু মেলিসা কিংবা রুবিনা কেউই তা মানতে চাইলো না। তারা আমালিয়াকে কক্ষে ফেরার জন্য বললো। ঠিক সেই মুহূর্তে সুমাইরার মা ও কয়েকজন মহিলা মিলে আমালিয়াকে কটু কথা শুনাতে লাগলো। সুমাইরার মা তো বলেই বসলো,
-এ কেমন মেয়েকে আমাদের বাদশাহ বিয়ে করেছে বুঝি না। জ্বিনমাতার এমন খারাপ সময়ে তার সাথে থাকতে পারবে না? আবার শুনেছি এই মেয়েকে নাকি জ্বিনমাতা নিজ হাতে ছোট থেকে লালন-পালন করেছে। এই তার প্রতিদান দিচ্ছে বুঝি?
কথাটি আমালিয়ার ভীষণ খারাপ লাগলো। সত্যিই তো হাদিজাহ তখন আমালিয়ার সাথে ছিল যখন এই দুনিয়াতে তার কেউ ছিল না। অতঃপর এক প্রকার জোর করেই সে রাতে আমালিয়া হাদিজাহের কাছে রয়ে গেলো। যদিও মেলিসা ও রুবিনা চিন্তিত ছিল তার সুরক্ষা নিয়ে কিন্তু আমালিয়া তাদের ভরসা দিলো সে নিজের খেয়াল রাখবে। এমনকি সুরক্ষার জন্য সাথে মিগিকেও সে রেখে দিলো নিজের সাথে। সকলে এক এক করে নিজেদের মতো চলে গেলে রয়ে গেলো কেবল অসুস্থ হাদিজাহ আর আমালিয়া। টোটো আজ ভীষণ রকম নিশ্চুপ। সে কামরার এক পাশে সতর্ক দৃষ্টিতে পাহারা দিতে ব্যস্ত।
রাত তখন গভীর। আমালিয়া হাদিজাহের পাশে হাত ধরে বসে। হাদিজাহের নিশ্বাস খুব ধীরে চলছে। ভয় করছে আমালিয়ার। বারবার মেহমেতের সাথে যোগাযোগ করতে গিয়েও পারছে না। সে কয়েকবার আজলানের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছে কিন্তু ফলাফল শূন্য। সেই থেকে সে হাদিজাহের পাশে বসে আল্লাহের কালাম বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে। মাত্রই একটু তন্দ্রা এলো ঠিক সেই মুহূর্তে হাদিজাহ জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়া শুরু করলো।
-দাদি, দাদি কি হয়েছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে দাদি?
আমালিয়া ব্যস্ত হয়ে জানার চেষ্টা করলো কিন্তু হাদিজাহ কিছু বলতে পারছে না। তার নিশ্বাস আরো ঘনিয়ে এলে আমালিয়া ভয়ে চেঁচিয়ে ডাকলো।
-কে কোথায় আছো, দ্রুত এসো। দাদি, দাদি কেমন যেন করছে।
আশ্চর্যভাবে কেউ এলো না। সব কেমন ভূতুড়ে শূন্যতায় ডুবে আছে। আমালিয়া পথহারা পথিকের মতো কি করবে বুঝতে পারলো না। অতঃপর তার দৃষ্টি পড়লো মিগির ওপর।
-মিগি দ্রুত মেলিসা এবং রুবিনাকে ডেকে আনো।
কিন্তু মিহি নড়ল না একদম। সে আমালিয়াকে একা রেখে যেতে নারাজ। তার একমাত্র কর্তব্য আমালিয়ার সাথে থাকা, আমালিয়াকে সুরক্ষা দেয়া। যেকোনো সময় যেকোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। কিন্তু আমালিয়া বুঝলো না তা। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মিগিকে আদেশ দিয়ে বসলো। নিরুপায় মিগি না চাইতেও হাদিজাহের কামরায় আমালিয়াকে একা ফেলে ছুটলো মেলিসা আর রুবিনাকে ডাকতে। কে জানতো এটাই ছিল তাদের ভুল? কে জানতো এর পরিণতি কতটা ভয়াবহতা ডেকে আনবে? আমালিয়া যদি জানতো তার করা এই এক কাজ তার পুরো জীবনকে বদলে দিবে তাহলে হয়তো সে কখনোই এমনটা করতো না। তার হয়তো মেহমেতের আদেশ মেনে নিজেদের কামরাতেই থাকা উচিত ছিল। কিন্তু হায় নিয়তি! যার ভাগ্য যেখানে যেভাবে লেখা রয়েছে তেমনটাই তো হবে তাই না?
চলবে____