#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৩৭
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
-অবশেষে আমাদের দেখা হয়েই গেল তাই না মামা?
আমালিয়া কান্নারত চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এই মুখ তার বড্ড চেনা লাগছে। কোথাও কি দেখেছে? নাকি কারো সাথে মিল পাচ্ছে? অবয়বটি এবার এগিয়ে এলো শিকের কাছাকাছি। চোখে পানি নিয়েও আমালিয়া তাকিয়ে রইলো। মনে করার চেষ্টা করলো কিছু, কিন্তু বিশেষ লাভ হলো না।
-কি চিনতে পারছ না বুঝি?
তাকে বলছে? তাকে? আমালিয়া কি এই লোককে কখনো দেখেছে? লোকটি এবার মুচকি হাসলো। আমালিয়া সেই হাসি দেখে চমকে উঠলো। আরদার! হ্যাঁ, হ্যাঁ এই লোকের সাথে আরদারের মিল পাওয়া যায়।
-খুব ইচ্ছা ছিল তোমাকে একবার হলেও দেখার। কিন্তু কখনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অবশেষে আমরা মুখোমুখি হলাম, তাই না? একদম মারিয়ামের মতো দেখতে হয়েছো তুমি।
আমালিয়ার চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হলেও তার ধারণা এই লোকটি আরদারের বাবা। অর্থাৎ তার মায়ের আপন ভাই। যার জন্য আজ সে মা-বাবাহীন অনাথ। লোকটি দৃষ্টি ঘুরিয়ে একবার মেলিসাকে দেখে নিলো। মেলিসা তখনো কাঁদছে। কান্নার দরুন, ছোট-খাটো গোলগাল শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে বারে বারে। আহা কি দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। বড় চোখে লাগার মতো। এরপর খুব আফসোস করে বলল,
-কি দরকার ছিল তোমার এখানে আসার বলো তো মেয়ে? না চাইতেও এখন আমাদের আরো একটি প্রাণ নিতে হবে। ইস বড্ড খারাপ লাগছে আমার।
আমালিয়া ও মেলিসা দুজনই চমকে উঠলো। আমালিয়া বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে। আর মেলিসা ভীতু দৃষ্টিতে চোখে একরাশ আকুতি নিয়ে তাকিয়ে।
-কে আপনি?
-নিজের মামাকে চিনতে পারছো না? এটা কিন্তু ঠিক না আমালিয়া। তুমি জানো তোমাকে মারার জন্য কত কিছু করতে হয়েছে আমাকে? তোমার ধারণা রয়েছে তোমার পিছনে কত পরিশ্রম গিয়েছে আমার?
আমালিয়া এমন কিছুই ধারণা করেছিল। তার মানে এসবের পিছনে এর হাত রয়েছে? কিন্তু সে তো অন্য কাউকে দেখে ছিল। ভাবুক আমালিয়াকে আর কিছু ভাবতে না দিয়ে ব্যক্তিটি নিজেই বলল,
-সুলেমান, সিলা গোত্রের একমাত্র ক্ষমতাধর। চিনতে পেরেছো এবার?
-সিলা গোত্রের ক্ষমতাধর? হাহ! কিন্তু আমি তো জানি সিলা গোত্রের ক্ষমতাধর একমাত্র নারীরা হয়। যেমন আমার নানী আর মা ছিল। এবং যার বর্তমান উত্তরাধিকার শুধুমাত্র আমি। আপনি এবং আপনার ছেলে কেবলমাত্র আমার অনুপস্থিতিতে আমার রাজ্যের দেখভাল করছেন। এছাড়া বিশেষ কেউ নন আপনারা যুবরাজ সুলেমান ওরফে মামাআআআআ।
আমালিয়া সুলেমানকে উপহাস করে কথাগুলো বলল। সুলেমান মুহূর্তে নিজের আসল রূপে ফিরে এলো। হিংস্র জানোয়ারের মতো হুংকার দিয়ে বলল,
-ভুল করেছি। বড্ড ভুল করেছি। জন্মের সময়ই তোকে মেরে ফেললে এতকিছু দেখতে হতো না। নিজ হাতে মেরে ফেলা উচিত ছিল। তোর মা-বাবার সাথে তোকেও যদি সেদিন দুনিয়া থেকে মুছে দিতাম তাহলে আজ সব আমার হতো, শুধু আমার।
-কথায় আছে রাখে আল্লাহ মারে কে। চেষ্টা তো কম করেননি মামা। পেরেছিলেন কি? আপনার বিনাশ আমার হাতে লেখা আছে বলেই আজ আমি আপনার সামনে দাড়িয়ে আছি।
-হাহাহা। হ্যাঁ দাঁড়িয়ে তো আছিস কিন্তু বন্দি অবস্থায়। আর এখান থেকে তুই বেঁচে ফিরতে পারবি না। বিশ বছর পূর্বে যে অসম্পূর্ণ কাজটা রেখে দিয়েছিলাম আজ সেই কাজটা সম্পূর্ণ করব আমি।
এতটুকু বলে সুলেমান থামলো। পরপর আবারো বলল,
-তোর স্বামী আর আমার ছেলে আমাকে খুঁজে মরছে। অথচ তারা জানেই না তুই এখন আমার কাছে বন্দি। তোর অধ্যায় আজ এই অন্ধকার কুঠুরিতে শেষ করবো তার পূর্বে তোর সহচারীকে নিজের চোখের সামনে শেষ হতে দেখ।
আমালিয়া হঠাৎ জ্বলে উঠলো। হুংকার দিয়ে বলল,
-খবরদার, ওর শরীরে যদি কেউ হাত দাও তবে আমি তোমাদের কাউকে জীবিত রাখবো না। এমন অবস্থা করবো যে নিজেদের ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাবে না।
-তাই নাকি? হাহাহা, ঠিক আছে তবে দেখি তুই কি করতে পারিস। খালিদ শেষ করে দাও ওকে।
সাথে সাথে একজন একটি ধারালো তলোয়ার এগিয়ে দিলো খালিদের দিকে। চকচকে সেই তলোয়ার দেখে মেলিসা শব্দ করে কেঁদে উঠলো। আমালিয়া ভয়ে ঢোক চিপলো। নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলো। আল্লাহকে হাজার বার স্মরণ করলো যেন কাউকে পাঠিয়ে দেয় মেলিসাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কেউ এলো না। কেউ না। অসহায় মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য একজন ব্যক্তিও এগিয়ে এলো না।
-না না না। দয়া করে ওকে ছেড়ে দিন। ও কিছু করেনি। ও নিষ্পাপ। আপনাদের যা করার আমার সাথে করুন। ওকে ছেড়ে দিন।
-করেছে আমালিয়া, ও অনেক কিছু করেছে। আমাদের পিছু নিয়ে এতটা পথ চলে এসেছে, সকল কিছু জেনে ফেলেছে। ওকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখি বলো তো?
সুলেমানের বলা কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমালিয়া ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-মেলিসা কাউকে কিছু বলবে না। ও এখান থেকে দূরে চলে যাবে। ওকে কেউ খুঁজে পাবে না। আমি কথা দিচ্ছি ও কাউকে কিছু বলবে না। আপনারা ওর বদলে আমাকে মারুন। আপনারা যা বলবেন আমি তাই শুনবো কিন্তু…
বাকি কথা আর বলা হলো না আমালিয়ার। স্থির দৃষ্টি মেলিসার গলায় অবস্থান করলো। নিশ্বাস আটকে দেখলো ফিনকি দিয়ে বের হওয়া র*ক্তের ধারা। মেলিসার দৃষ্টিও আমালিয়াতে স্থির। চোখ গলিয়ে পড়ছে অশ্রুবিন্দু। ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলল কিন্তু বোঝা গেল না। আমালিয়ার চোখের সামনেই বসা থেকে মুখ থুবড়ে পড়ল ময়লাযুক্ত মেঝেতে। গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফটিয়ে উঠলো। সুলেমানের হাতে থাকা তলোয়ার থেকে তখনো একফোঁটা দুফোঁটা করে র*ক্ত ঝরছে। মূলত আমালিয়ার কথার মাঝেই সুলেমান খালিদের হাত থেকে আকস্মিক তলোয়ার নিয়ে মেলিসার গলায় চালিয়ে দেয়। তার এহেন কাজে খালিদ নিজেও হতভম্ব। আমালিয়া পাথরের ন্যায় জমে রইলো। নড়ার একটুও শক্তি পেল না। মেলিসার মুখ তার দিকেই তাকিয়ে। হাত বাড়িয়ে হয়তো ধরতে চাইলো কিন্তু সহসা মেয়েটা থেমে গেল। একদম চুপ হয়ে গেল। চঞ্চল, মিষ্টি মেয়েটা এক বিন্দু নড়ল না আর। আমালিয়া ওকে নিশ্চুপ হতে দেখে ধীরে ফিসফিসিয়ে ডাকলো,
-মেলিসা।
মেলিসা তার দিকেই তাকিয়ে। চোখ খোলা। গলার নিচ থেকে বেরিয়ে আসা লাল তরল মাথার চুল ভিজিয়ে ফেলেছে। এমনকি মেঝেতে মিশে থাকা গালটিও লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আমালিয়া আবারো ঢোক চিপল। গলা ভিজিয়ে কাপা কাপা গলায় ডেকে উঠল,
-এই মেলিসা, মেলিসা! ওঠো।
আহারে, মেলিসা আমালিয়ার কথা আজ শুনল না। সর্বদা আমালিয়ার সাথে কাঁধে কাঁধ রেখে চলা মিষ্টি, বোকা মেয়েটা আজ আমালিয়ার কথা শুনল না। বোকা মেয়েটা অনাথ আমালিয়াকে এতটাই ভালোবাসলো যে নিজের জীবন দিয়ে আমালিয়াকে সুরক্ষা দিয়ে গেল। সে মেহমেতকে দেওয়া কথা রেখেছে। আমালিয়াকে একা ছাড়েনি। নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে। আমালিয়া আর পারল না। চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।
-মেলিসাসাসা। মেলিসা ওঠো। আমি ডাকছি মেলিসা ওঠো। উঠতে বলছি কিন্তু। দেখো আমি রেগে যাচ্ছি। এই মেয়ে ওঠো না। কেন কথা শুনলে না আমার? কেন চলে গেলে না? এখন আমি কই পাবো তোমাকে মেলিসা? ওঠো একটু, ওঠো না! ও মেলিসা, আমি কি জবাব দিবো তোমার বাবাকে? কেন তুমি এত ভালো হলে? কেন? কেন আমাকে বাঁচাতে এলে? ইয়া আল্লাহ এ আপনি কোন পরীক্ষায় ফেললেন আমায়? ফিরিয়ে দিন ওকে। এই পাপিষ্ঠদের ভিড়ে কেন আপনি নিষ্পাপ মেয়েটার জীবন কেড়ে নিলেন আল্লাহ? কেন?
আমালিয়া আজ দিশেহারা হয়ে কাঁদছে। পা ভেঙে আসছে। মেলিসাকে ওভাবে র*ক্তাক্ত হয়ে পরে থাকতে দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল। তারই মাঝে সুলেমান খিক খিক করে হেসে উঠলো। তা দেখে আমালিয়ার শান্ত চোখ দুটি জ্বলে উঠলো হঠাৎ। গাঢ় বাদামি চোখের সাথে আজ হালকা নীল চোখটিও নিজের রূপ বদলে নিলো। পুরোপুরি গাঢ় বাদামি রঙ্গা হয়ে জ্বলে উঠলো আগুনের মতো। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠলো অন্তর। আমালিয়া নিজের শরীরে উত্তাপ ছড়িয়ে অগ্নি রূপ ধারণ করলো। ধীরে ধীরে তার সম্পূর্ণ শরীর জুড়ে আগুন জ্বলে উঠলো। সেই তাপ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আমালিয়ার হাত বেঁধে রাখা লোহার শিকল গুলো গলে গলে পড়তে লাগলো। তার শরীরের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল শিকের বাইরেও। সুলেমান ও খালিদ ঘাবড়ে গেল। তাদের ধারণায় ছিল না এমন কিছু যে হতে পারে। তারা প্রতিরক্ষা করার পূর্বে আমালিয়া ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে তাদের দিকে আগাতে লাগলো। তা দেখে সকলে দিক দিশেহারা হয়ে ছুটতে লাগলো। কিন্তু আমালিয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলো না। একে একে প্রত্যেককে ভয়ানক যন্ত্রণা দিয়ে নিজ হাতে শেষ করে তবেই শান্ত হলো। তার সেই উত্তাপ কেউ সইতে পারল না। কেউ না। আমালিয়া প্রত্যেককে নির্মমভাবে শেষ করলো। দয়ায় পরিপূর্ণ মেয়েটি আজ নিজের স্বভাব বিরোধী কাজ করলো। অতঃপর ঝড় থামলো। আমালিয়া স্থির হলো। দৃষ্টি ঘুরিয়ে অদূরে ডানে পরে থাকা মেলিসার ওপর রাখলো। অগ্নি চোখ দুটো দিয়ে লাগাতার জল বইতে লাগলো। ধীরে ধীরে একদম শান্ত হয়ে গেলো আমালিয়া। দূর আকাশে হয়তো সূর্যাস্ত হচ্ছে। আমালিয়া আর সইতে পারল না। সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে দুহাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে ফেলল। আল্লাহর কি এটাই ইচ্ছা ছিল? আর একটু পূর্বে কেন সূর্যাস্ত হলো না? কেন হলো না?
-আমালিয়া।
আমালিয়া অশ্রুসিক্ত চোখ দুটি মেলে ধরলো। অদূরে মেহমেত, আরদার ও তাদের সাথে থমকে যাওয়া আজলানকে দেখতে পেল। যার দৃষ্টি আমালিয়াকে ছাপিয়ে মেলিসার ওপর স্থির।
-বড্ড বেশি দেরি করে ফেললেন আসতে।
মেহমেতের হাত পা থরথর করে কাঁপছে। মেলিসাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে বুক কেঁপে উঠল। আমালিয়ার চোখে এক সমুদ্র কষ্ট। জল ছলছল করছে। আমালিয়া দৃষ্টি মেলিসার দিকে ফিরিয়ে আঙুল তাক করে বলল,
-বোকা মেয়েটাকে বারবার বলেছিলাম চলে যেতে কিন্তু গেল না। আমাকে ছেড়ে যেতেই চাইল না। এত ভালো হতে কে বলেছিল ওকে? ওদের বারবার বলেছিলাম ছেড়ে দিতে কিন্তু শুনল না। আমার চোখের সামনে একটু একটু করে ছটফটিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল। ওকে আমি বলিনি আমাকে এত ভালবাসতে। তাহলে কেন ভালোবাসলো মেহমেত? আমি তো বলিনি ওকে ভালবাসতে। কেউ যেখানে আমাকে ভালোবাসলো না সেখানে ও কেন ভালোবাসলো? কেন? ভালোই যখন বসলো তাহলে আল্লাহ কেড়ে কেন নিলো? ও নিজের জীবন দিয়ে আমাকে চিরঋণী করে দিয়ে গেল মেহমেত। আমি এখন কোথায় পাবো আমার মেলিসাকে?
আমালিয়া মেঝেতে হাত চাপড়ে আহাজারি করে কাঁদলো। তার সেই কান্না আকাশকেও কাঁদিয়ে ছাড়লো। মেহমেতের পা কেঁপে উঠলো। টলমলে পায়ে পড়ে যেতে নিলে আরদার তাকে ধরে ফেললো। আজলান ছোট ছোট পায়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেলো মেলিসার নিকট। মেঝেতে বসে মেয়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। সফেদ আলখাল্লাটি ময়লা মেঝেতে মেখে একাকার। এত র*ক্ত! তার আজও মনে আছে; একদিন মেলিসার আঙুল একটুখানি কেটেছিল। তা নিয়ে মেয়েটার সে কি কান্না। র*ক্ত দেখে সে কি ভয়! আচ্ছা এখন কি তার মেয়ে ভয় পাচ্ছে না? আজলান ঝুঁকে পড়ে মেলিসার গালে ছোট ছোট চাপড় দিয়ে বলল,
-আম্মা, আম্মা দেখুন আপনার বাবা এসেছে। দেরি করেছি বলে কি রাগ করেছেন আম্মা? আর দেরি করবো না। এবার উঠুন। বাবা ভয় পাচ্ছি আম্মা। আপনি এবার উঠুন। আমরা দূরে কোথাও চলে যাবো। এখানে আর আপনাকে থাকতে হবে না। উঠুন না। উঠবেন না? এত অভিমান বাবার ওপর? আচ্ছা আমার জন্য না হোক ঐ যে দেখুন আমালিয়া আপনার জন্য কিভাবে কাঁদছে। ওনার জন্য উঠুন আম্মা। এই আম্মা।
আজলানের শত ডাকও মেলিসার ঘুম ভাঙাতে পারল না। জ্বিনদের হাজার যাদুবিদ্যা ও মেলিসাকে ফিরিয়ে আনতে পারল না। সেদিন আজলান সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে গেল। সন্তান হারিয়ে ছটফটিয়ে কাঁদলো। মেলিসার হাত জড়িয়ে তার সেই কান্না মেহমেতের ভিতর বাহির নাড়িয়ে দিলো নিমিষে। বারবার নিজেকে এই সকল কিছুর জন্য দায়ী করল। সে যদি মেলিসাকে এখানে না আসতে বলতো তাহলে আজ মেলিসা জীবিত থাকতো।
একের পর এক ধকল আমালিয়া নিতে না পেরে শরীর ছেড়ে দিলো। পরে যাওয়ার পূর্বে মেহমেত যত্ন করে নিজের বুকে আগলে নিয়ে চলল মারিদরাজ্যে। সেদিন সেই রাতে আমালিয়ার অচেতন অবস্থায় মারিদরাজ্যে একসাথে দুটি জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। একই সাথে দুটি খাটিয়ায় করে নিয়ে যাওয়া হলো হাদিজাহ ও মেলিসাকে। সন্তানের খাটিয়ায় ভার এবার বড্ড বেশি ভারী লাগলো আজলানের কাছে। শক্ত সামর্থবান পুরুষটি খাটিয়া ধরে বারবার টলে যাচ্ছিল।
মধ্যরাতের দিকে আমালিয়ার জ্ঞান ফিরলেও তার মাঝে বিশেষ কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলো না মেহমেত। না কাঁদলো আর না দুঃখ প্রকাশ করলো। সবসময়ের মতো শান্ত হয়ে রইলো মেয়েটি। হয়তো একটু বেশিই শান্ত হয়ে আছে। যার জন্য মেহমেত ভীষণভাবে ভয় পেয়ে আছে। চিন্তিতও বটে। আমালিয়া যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল তখন মেহমেত রুবিনা ও মিগির থেকে গতরাতের সকল ঘটনা শুনেছিল। মিগির মতে, সে কামরা থেকে করিডোর ধরে বেশ অনেকটা সময় ধরে আগানোর পরও তার মনে হচ্ছিল সে সেই একই স্থানে রয়েছে। একই স্থানে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল বলে তার মনে হচ্ছিল। এমন করতে করতে কখন যে ভোর থেকে সন্ধ্যা হলো সে জানে না। যখন সে সেসব থেকে রক্ষা পেল তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। রুবিনাও সেই একই কথা জানায়। সে যখন ধ্যানে বসে মেহমেতের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হলো তখন দ্রুততার সাথে কামরা ছেড়ে বের হয়। এরপর সে একই স্থানে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। কোনো ভাবেই সে বের হতে পারেনি। প্রাসাদের বেশ কিছু জ্বিনরাও তেমনটাই জানিয়েছে। মেহমেত বুঝলো সকলের ওপর ভয়ানক জাদু করা হয়েছিল। যা কোনো সাধারণ জ্বিনের দ্বারা সম্ভব না। খুব সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। মেহমেত ফোস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। হাদিজাহের সুরক্ষার জন্য যে প্রহরীরা ছিল তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কি থেকে কি হয়ে গেল মেহমেত এখনো বুঝতে পারছে না। বুকের মাঝে চাপ অনুভূত হচ্ছে তার। আজ সে সম্পূর্ণ রূপে এতিম। আপন বলতে আমালিয়া ছাড়া আর কেউ নেই। সব হারিয়ে মেহমেতের আজ ভয় করছে ভীষণ। মেলিসার সাথে যা হয়েছে তা যদি আমালিয়ার সাথেও হতো? নাহ, আর ভাবতে পারছে না। মাথা ঝিমঝিম করে উঠছে। আকস্মিক কাঁধে কারো হাতের উপস্থিতিতে ঘাড় ঘোরালো। আরদার দাঁড়িয়ে তার নিকটে।
-ঠিক আছেন আপনি?
-হুম।
মুখে হুম বললেও আরদার ঠিকই বুঝলো মেহমেতের মনের অবস্থা। সে দেখেছে মেহমেতের অস্থির, পাগল রূপ। স্ত্রীর জন্য চিন্তিত অবস্থা। আমালিয়া বিপদে আছে জানতে পেরে তার সেই ভয়ানক অস্থিরতা আরদার খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিল। আর করবে নাই বা কেন? সে নিজেও যে একই পথের পথিক। মেহমেত তো তবুও নিজের অনুভূতি সকলের সম্মুখে বয়ান করতে পারে, কিন্তু সে যে হতভাগা! বুকের মাঝে জমিয়ে রাখা অজস্র অনুভূতি সে প্রকাশ করতে পারে না। চাইলেও পারে না। তার যে অধিকার নেই।
মেহমেত নিজ কামরার বারান্দা থেকে তাকিয়ে বাগানে বসে থাকা নিস্তেজ, নিঃশ্চুপ, শান্ত আমালিয়ার দিকে। জ্ঞান ফেরার পর থেকে তার অবস্থান ওখানেই। ভোর হতে চলল অথচ তার মাঝে ফিরে আসার কোনো তাগিদ নেই। আরদার মেহমেতের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো আমালিয়ার দিকে। মেহমেত চোখে মুখে আঁধার নামিয়ে বলল,
-দা…মানে মেলিসার বাবার কি অবস্থা?
-সে কারো সাথে কথা বলছে না। নিশ্চুপ বসে রয়েছে একা। মেয়ের শোক কাটিয়ে উঠতে পারছে না। হয়তো ভীষণ ভালোবাসতো মেয়েকে।
মেহমেত কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে নিজেই তো এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারছে না। অল্প কিছুদিনের মাঝে মেয়েটার প্রতি কেমন মায়া জমে গিয়ে ছিল। নিজেকে বড্ড অপরাধী লাগছে। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। ঝাপসা চোখে আমালিয়াকে দেখে নিলো আরো একবার।
-নিজেকে সামলান ভাই। আমালিয়ার এখন আপনাকে দরকার।
-সবকিছু আমার জন্য হয়েছে আরদার। আমি দায়ী এসবের জন্য। আমি যদি মেলিসাকে এখানে নিয়ে আসতে না বলতাম তাহলে মেয়েটা বেঁচে থাকতো আজ। বাচ্চা মেয়েটার কি দোষ ছিল আরদার? ওতো কারো কোনো ক্ষতি করেনি। আমালিয়ার সামনে যেতে পারি না। আজলানের চোখে চোখ রাখতে পারি না। আমি কাউকে সুরক্ষা দিতে পারিনি আরদার। আমার রাজ্যে থেকে আমারই আপনজনদের ক্ষতি করে গেল, অথচ আমি কিছুই করতে পারলাম না। নিজের লোকদেরই যদি সঠিকভাবে সুরক্ষা না দিতে পারি তাহলে বাদশাহের দায়িত্ব কিভাবে পালন করব? আমি একজন ব্যর্থ বাদশাহ, ব্যর্থ স্বামী।
প্রতিউত্তরে আরদার কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে জানে আজকের এই ঘটনার জন্য একটু হলেও মেহমেতের হেলাফেলা দায়ী। কিন্তু যে নিজে থেকে অনুতপ্ত হয় তাকে বারবার বলে ছোট করার কোনো মানে হয় না।
-আমালিয়ার সাথে আপনার কথা বলা উচিত ভাই। সেখানে কি হয়েছে সেটা আমাদের জানা উচিত।
মেহমেত সামান্য মাথা দুলিয়ে সায় জানালো। আসলেই জানতে হবে। সে একবার প্রশ্নও করেছিল। কিন্তু আমালিয়া কোনো উত্তর করেনি। অতঃপর দৃষ্টি সামনে রেখেই বলল,
-সুলেমানের কোনো খবর?
-তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। জানি না কোথায় রয়েছে। রাজ্যেও ফিরে যায়নি। আম্মার সাথে তো আপনি নিজেই কথা বলেছেন। সে এখনো একই কথা বলছে; তিনি কিছু জানেন না। তবে আশ্মিরাজের দ্বারা আমালিয়ার ক্ষতি তারাই করাতে চেয়েছিল। ব্যাস আগেও এটা বলেছে এখনো এতটুকুই বলছে।
মেহমেত নিজেও জানে আরদারের মা বেশি কিছু জানে না। সুলেমান খুব ধূর্ত প্রকৃতির লোক। বউকে যে সে সবটা জানাবে না শুরু থেকেই মেহমেত এমন কিছু ধারণা করেছিল। যদি একবার সুলেমানকে পাওয়া যেত তাহলে অনেক সত্যি সামনে আসতো। গত কয়েকদিন লাগাতার তারা সুলেমানকে খুঁজে চলেছে কিন্তু পাচ্ছে না। তার বিশ্বাস সুলেমান অনেক কিছু জানে। আহ সুলেমান, সুলেমান! সে যদি সুলেমানকে খুঁজতে না যেতো তাহলে কি খুব ক্ষতি হতো? কিছুই তো পেল না উল্টো অনেক কিছু হারিয়ে ফেললো।
-হুজুর ডেকে ছিলেন?
জায়াদ্রা মেহমেতের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে বিনয়ের সাথে কথাটি বলল। মেহমেত এত সময় পর তার দৃষ্টি সরালো আমালিয়ার ওপর থেকে। যে চোখ দুটি আমালিয়ার দিকে মায়া মায়া শীতলতার সাথে তাকিয়ে ছিল সেই চোখদুটিই এখন অগ্নি রুপ নিলো। জায়াদ্রার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-তোমাকে তার সুরক্ষার জন্য রেখে গিয়েছিলাম জায়াদ্রা। তাহলে তুমি থাকতে এসব কি করে হলো?
মেহমেত হুংকার দিয়ে বলল। জায়াদ্রা ভয়ে তটস্থ। মাথা নিচু করে থরথরিয়ে কাঁপছে। মেহমেত ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। পারছে না শুধু জায়াদ্রকে শেষ করে দিতে।
-ক্ষমা করবেন হুজুর। আমার কোনো দোষ নেই। রাজ্যের পূর্ব জঙ্গল থেকে বার্তা এসেছিল আক্রমণের। আমি ভেবেছিলাম তখনই প্রতিরক্ষা না করলে প্রাসাদ পর্যন্ত এসে যেতে পারে। আপনিও ছিলেন না, জ্বিনমাতাও অসুস্থ ছিল। তাছাড়া মহারানীর সুরক্ষা নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম বলেই ওমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারি সেই সংবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। বুঝতে পারি কোনো চক্রান্তের শিকার হয়েছি। আমি তৎক্ষণাৎ সৈন্যদের নিয়ে প্রাসাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেও প্রাসাদে প্রবেশ করতে পারিনি। ভয়ানক জাদু প্রয়োগ করা হয়েছিল সম্পূর্ণ প্রাসাদ জুড়ে।
জয়াদ্রা এখনো কাঁপছে। মেহমেতের রাগকে সে ভীষণ ভয় পায়। তাছাড়া সে জানে আমালিয়া মেহমেতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই আমালিয়াকে নিয়ে এত বড় চক্রান্তের পরও মেহমেত যে এতটুকু শান্ত রয়েছে এটাই অনেক বড় ব্যাপার। পরিস্থিতি খারাপ বুঝে আরদার কথা ঘুরিয়ে নিলো।
-আক্রমণের কথা কে জানিয়ে ছিল।
-জ্বি খালিদ।
আরদার মেহমেতের দিকে তাকালো। মেহমেতের রাগে হাত-পা জ্বলছে। সব কিছু পূর্ব পরিকল্পিত। শুধু একবার এদের হাতে পেয়ে নিক। মেহমেত ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর তা সে বুঝিয়ে দিবে শীঘ্রই।
—-------
আমালিয়া নিঃশ্চুপ বিছানার একপাশে বসে রয়েছে। মেহমেত বেশ কিছু সময় ধরে তাকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। ওই ঘটনার পর সে আর একটি কথাও বলেনি। ধীর, স্থির, শান্ত তার গতিবিধি। যেন আগাম কোনো ঝড়ের লক্ষণ। তখন ভোরের আলো ফুটে গেলেও আমালিয়ার নড়চড় না দেখে মেহমেত জোর করে তাকে কামরায় নিয়ে আসে। তাদের থেকে কিছুটা দূরে আরদার দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। সে নিজেও মেহমেতের মতো চিন্তিত। আমালিয়াকে এরূপ দেখতে কেউ অভ্যস্ত নয়। মেহমেত আর আরদার নিজেদের মাঝে চোখাচোখি করে নিলো একবার। যদিও আরদারের মনে অনেক প্রশ্ন কিন্তু সেসব সে এখন তুলতে চায় না। পরিস্থিতি এখন এসবের জন্য উপযুক্ত নয়। আপাতত আমালিয়ার দিকে লক্ষ্য রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-বউজান।
-হুম।
খুবই সাধারণ উত্তর, মুখভঙ্গি শিথিল। তবুও মেহমেত মানতে নারাজ। আমালিয়ার এই শান্ত রূপ তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সে আমালিয়ার পায়ের কাছে মেঝেতে গিয়ে বসলো। দুহাতে আমালিয়ার হাত দুটি আঁকড়ে ধরে কাতর কন্ঠে বলল,
-আগের মতো স্বাভাবিক হন বউজান। আমার সাথে কথা বলুন।
-আমি স্বাভাবিকই আছি মেহমেত।
মেহমেত লক্ষ্য করলো অমলিয়ার দৃষ্টি সম্মুখে। একবারও সে ওর দিকে তাকায়নি। পলকহীন ভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়েই রয়েছে।
-আপনি এমন করলে আমার কষ্ট হয় বউজান। আমি জানি আমার দোষ রয়েছে। তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি আগের মতো কথা বলুন আমার সাথে।
আমালিয়া এবার মেহমেতের চোখে চোখ রাখল। কেমন অন্যরকম গলায় ভারী শব্দে বলল,
-মেলিসাকে আপনি নিয়ে এসেছিলেন তাই না? জনাবের সাথে আপনার পূর্ব থেকেই পরিচয় ছিল।
মেহমেত চমকে আমালিয়ার হাত ছেড়ে দিলো। বুক কেঁপে উঠল। এত সময় পর সে আমালিয়ার মাঝে বিস্তর পরিবর্তন লক্ষ্য করলো। আমালিয়ার সেই শান্ত মায়াময় চোখ দুটি আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। চেহারায় রয়েছে এক জ্বলন্ত আভা। খানিক দেরি হলেও মেহমেত বুঝে ফেলল আমালিয়া আর আগের মতো নেই। যে ভয়ের কারণে সে এতোগুলো দিন আমালিয়াকে আগলে রেখেছে তার উন্মোচন হয়েই গেলো অবশেষে। মেহমেত হাত ছেড়ে দেয়ায় আমালিয়ার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। আরদার এসবের আগামাথা কিছুই বুঝল না। তাকে বোঝার নূন্যতম সুযোগটুকুও আমালিয়া দিলো না। মেহমেতকে পায়ের কাছে ওভাবে রেখে উঠে দাড়িয়ে আরদারের দিকে তাকিয়ে দাম্ভিক স্বরে হুকুম দিয়ে বলল,
-আমি সিলা রাজ্যের বর্তমান উত্তরসূরি শেহজাদি আমালিয়া আদেশ দিচ্ছি আপনাকে, আমাকে এই মুহূর্তে আমার রাজ্যে নিয়ে চলুন।
চলবে___
[ মেলিসা ভীষণ ভালো একটি মেয়ে। অনেকেই বলেছিলে মেলিসা খারাপ। ওর পার্টটুকু লিখতে গিয়ে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। বিশেষ করে আমালিয়া আর আজলানের আহাজারি। বাস্তবে এমন নিঃস্বার্থ সরল মানুষ পাওয়া যায় না বলেই আমি এই চরিত্রটাকে লিখেছিলাম।]