#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই
#কলমে_রাহা_ইসলাম
#পর্ব_৩৬
চোখ খোল, বউজান...…
গাড়িতে বসিয়েই চোখে-মুখে পানি ছিটাতে ছিটাতে কোমল স্বরে বলল অভ্র।
রাহা ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই এত কাছে অভ্রকে দেখে চমকে উঠল। স্বতঃস্ফূর্তভাবে পিছিয়ে যেতে চাইলে অভ্র মুহূর্তেই তার বাহু আঁকড়ে ধরে ফেলল।
— "এই,বান্দি! এত পিছানোর কারণ কী, হ্যাঁ?"
রাহা ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনোমতে ফিসফিস করে বলল,
— "বা... বাড়ি যাব... মায়ের কাছে যাব।"
'মায়ের কাছে যাব' কথাটা কানে আসতেই অভ্র গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়েও থেমে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ও গভীর হয়ে স্থির হলো রাহার মুখে।
— "কী বললি তুই?"
— "মায়ের কাছে যাব।"
অভ্র ধীরে ধীরে হাত মুঠো করল। চোখের ভেতর অদ্ভুত এক তীব্রতা খেলে গেল।
— "তাহলে আমি কে?"
রাহা ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
— "ভা...ইয়া..."
অভ্র হালকা বিদ্রূপাত্মক হাসল। সেই হাসির আড়ালেও স্পষ্ট কর্তৃত্বের ছাপ।
— "ওহ্, তাই নাকি? তাহলে একটু আগে কাজীর সামনে তিনবার 'কবুল' বলে ভাইয়া থেকে সাইয়া কে হলো, শুনি?"
সে সামান্য ঝুঁকে রাহার চোখে চোখ রেখে আরও নিচু অথচ দৃঢ় স্বরে বলল,
— "নাকি সেটাও ভুলে গেছিস, বউ?”
অভ্রের কথা শুনে রাহার হেঁচকি উঠে গেল।
তাই তো...! এই লোকটাই এখন তার স্বামী?
রাহা ফট করে বলে উঠল,
— "আমি এই বিয়ে মানি না।"
অভ্র ভ্রু উঁচু করল।
— "তো?"
— "তো মানে?"
ঠোঁটের কোণে রহস্যময়, দুষ্টু হাসি টেনে অভ্র ধীর দৃষ্টিতে রাহাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বলল,
–“তুই মানলেই কি আর না মানলেই কি ।
আমার যেটা দরকার, সেটা পেলেই হবে মাই লেডি।"
অভ্রের এমন চাহনী দেখে রাহা ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠে,
“অসভ্য বেটা ছেলে কোথাকার।”
অভ্র শুনেই সাথে সাথে বলে উঠে,
–”সভ্য হলে তো তোর বাচ্চার বাপ হতে পারব না।
পরে কিন্তু আমায় দোষ দিস না যে তোর স্বামীর ক্যাপাসিটি নাই।”
বাট ট্রাস্ট মি, জান... আইল বি ভেরি জেন্টল।”
অভ্রের কথাগুলো শুনে রাহার যেন কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এমনিতেই তার মেজাজ সপ্তম আকাশে, তার ওপর এই লোকের লাগামহীন খুনসুটি!
দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল—
— “চুপ করুন তো, নির্লজ্জ মানুষ! একদম চুপ! গাড়ি চালান, আমি বাসায় যাব।”
রাহার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে অভ্রের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। হালকা হেসে গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে ‘জামাই ৪২০’ গানটা চালিয়ে দিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল—
— “নিজের বাড়ি যখন হয়ে যায় শ্বশুরবাড়ি আর সেখানে জামাই হয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা কিন্তু বেশ। তবে শুনে রাখ, আমাকে যদি যথাযথ সম্মান-আপ্যায়ন না করা হয়, তাহলে কিন্তু এই ঘটনা সারাজীবন মনে করাতে থাকবো বলে দিলাম।”
রাহা তীক্ষ্ণ, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাতেই অভ্র দু'হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভান করে হেসে বলল—
— “আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে, মিসেস অভ্র। রওনা হচ্ছি। এমনি তুই হট, তার ওপর যখন রাগ দেখাস, তখন তোকে আরও বেশি হট লাগে।”
কথাটা বলেই অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি টেনে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। চোখ রাস্তার ওপর স্থির, অথচ তার মুখের আত্মবিশ্বাসী ভাবটা স্পষ্ট।
রাহা বিরক্তিতে চোখ রাঙিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। যেন অভ্রর একটাও কথা তার ভালো লাগছে না। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে সে।
ড্রাইভ করতে করতেই অভ্র হঠাৎ তার হাতটা টেনে এনে গিয়ারের ওপর রাখল। রাহা সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিতে চাইলে অভ্র আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
— “ছাড়ুন!”
রাহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
অভ্র শুধু মুচকি হাসল।
— “না।”
এক কথার উত্তর।
রাহা আরও একবার চেষ্টা করল, কিন্তু অভ্রর দৃঢ় মুঠোর সামনে সেটা একেবারেই বৃথা গেল। শেষমেশ বিরক্তিতে ঠোঁট ফুলিয়ে চুপ করে বসে রইল।
আর অভ্র? সে যেন নিজের জয় নিশ্চিত জেনে নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল, ঠোঁটের কোণে তখনও সেই তৃপ্ত, দুষ্টু হাসিটা লেগে আছে।
পুরোটা পথ জুড়ে একই গান বারবার বাজিয়ে চলেছে অভ্র। রাহার মাথা যেন গরম হয়ে উঠছে। এই লোকটার মতিগতি সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। এক মুহূর্তে ভালো, তো পরের মুহূর্তেই ভয়ংকর রূপ!আর অভ্র হাসবে না-ই বা কেন? তার নয় বছরের তপস্যা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অবিচল আকাঙ্ক্ষা—যেভাবেই হোক, আজ পূর্ণতা পেয়েছে।
মনে মনে সে মাহাদীকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছে। যে কাজটা আরও এক বছর পর করার পরিকল্পনা ছিল, সেটাই আজ অপ্রত্যাশিতভাবে সম্পন্ন হয়ে গেল।
অভ্র নিজেও কল্পনা করেনি এমন কিছু ঘটবে। কিন্তু এই দুরন্ত ঝড়মেয়ে, একগুঁয়ে আগুনকন্যা তাকে এমনভাবে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল যে নিজের ক্রোধ আর সংযত রাখতে পারেনি। এতটুকু একটা মেয়ে কিনা তার জিনিসের ওপর তার সামনেই অধিকার ফলানো নিয়ে কথা বলবে!সেটা জিহাদ খান অভ্রের অহংকার, কর্তৃত্ববোধ আর দখলদার স্বভাব কখনোই মেনে নেওয়ার নয়।তবে মাহাদীর জন্য যে শাস্তি নির্ধারিত আছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সময়মতো তার হিসাব সে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দেবে।
এক পর্যায়ে বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই রাহাকে নামিয়ে আনতে দরজা খুলল অভ্র। কিন্তু রাহা মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এমন এক দৌড় দিল যে অভ্র কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল,
— আরে! এভাবে প্রাণপণে ছুটছিস কেন? আমি কি তোকে খেয়ে ফেলব নাকি, বেয়াড়া মেয়ে? দাঁড়া... একবার হাতে পাই, তারপর বুঝাবো!
ঠিক তখনই গাড়ি থেকে নেমে অভ্রর পেছনে এসে দাঁড়াল জায়ান আর জারিফ এর শিফা । সাফা ও অবন্তিকাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই তারা এখানে এসেছে।
ওদের দেখে অভ্র গম্ভীর স্বরে বলল,
— ভেতরে আয়।
জায়ান আর জারিফ একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। তারা ভেবেছিল অভ্র হয়তো এবার চলে যেতে বলবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে নিজেই ওদের ভেতরে ডাকছে।
বসের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস তাদের কারোরই নেই। তাই কোনো কথা না বাড়িয়ে অভ্রর পিছু পিছু বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
ড্রয়িংরুমে ঢুকেই অভ্র রাজকীয় ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসল। এক হাত ডিভানের পেছনে ছড়িয়ে দিল, আর দু'পা সামনে থাকা সেন্টার টেবিলের উপর তুলে আরাম করে মেলে দিল।
তার মুখে তখন সেই চিরচেনা কর্তৃত্বময় ভাব।
জারিফকে উদ্দেশ্য করে অভ্র গাঢ় কণ্ঠে বলল,
— “গানটা জোরে দে। ফুল ভলিউমে চালা। বাড়ির বড় থেকে ছোট—সবাইকে এখানে হাজির হতে হবে।”
মুহূর্তের মধ্যেই বোল্টের স্পিকার ফেটে পড়ার মতো করে বেজে উঠল।বাড়ির ভেতর যেন এক ঝটকায় বিশৃঙ্খলা নেমে এলো।ঘুমন্ত মানুষগুলো চমকে উঠে বসে পড়ল। কারও চোখে বিভ্রান্তি, কারও চোখে বিরক্তি, আবার কারও মুখে স্পষ্ট রাগ।
এত গভীর রাতে এমন অদ্ভুত, অশান্তিকর কাণ্ড—কে এমন সাহস দেখাতে পারে?
রাহা তো বাড়িতে নেই, তাহলে এই উন্মাদনা কার কাজ?অর্ধনিদ্রা আর হতবাক অবস্থায় সবাই একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল।
কেউ ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না—ঘটনা আসলে কী হচ্ছে।
ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতেই তাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
সোফায় অতি স্বচ্ছন্দ, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বসে আছে অভ্র।তার উপস্থিতি যেন পুরো ঘরটাকেই চুপ করিয়ে দিল।
বাড়ির সবাইর ভ্রু কুঁচকে গেল, চোখে ফুটে উঠল তীব্র প্রশ্ন—
“এত রাতে এই নাটকের মানে কী?
আর এরা চারজন এই সময় এখানে কেনো..!”
আমান খান ছেলের সামনে আসতেই অভ্র চোখে তীক্ষ্ণ, দৃঢ় কঠোরতা এনে বলল—
— আসসালামুআলাইকুম, জেঠা শ্বশুর।
ঘরভর্তি মানুষের সামনে এমন অভিবাদনে আমান খান যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ— কথা গলায় আটকে, হালকা কাশি উঠে আসে তাঁর।
ঠিক তখনই আফসানা খান এগিয়ে এলে অভ্র আবারও শান্ত কিন্তু অটল কণ্ঠে বলে উঠল—
— আসসালামুআলাইকুম, জেঠি শাশুড়ি।
তিনি এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ান, যেন পা দুটোও ভারী হয়ে গেছে বিস্ময়ে।
রাহার মা, ছোট মা আর ছোট আব্বু— সবাই হতভম্ব, চোখ বড় বড় করে দৃশ্যটা দেখছেন।নিজের বাবা মা কে এসব কি নামে ডাকছে..!
রাহার ছোট আব্বু বলে উঠলেন,
— ভাইজান… অভ্র ঠিক আছে তো? নাকি ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
অভ্র তখন ধীর, স্থির দৃষ্টিতে তাদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল—
— কাকা শ্বশুর আর কাকি শাশুড়ি… আপনাদের দু’জনকেও আসসালামুআলাইকুম। বাড়ির জামাই এসেছে আপ্যায়ন করবেন না??
এইবার অবাক হওয়ার সীমাও পেরিয়ে যায়— সবাই যেন একই সাথে থমকে যায়। ছেলেটার এমন ঠান্ডা অথচ অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসী আচরণে চারপাশে একধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে।
শেষে আমান খান রাগ চেপে না রেখে কঠোর স্বরে বলে উঠলেন—
— এসব কী হচ্ছে, অভ্র? এখনো তো সময়
আসেনি! তাহলে কেন এসব বলছিস তুই?
অভ্র উঠে দাঁড়িয়ে একটু সামনে এগিয়ে এসে কঠোর গলায় বলে উঠল—
“কী সঠিক আর কী ভুল, সেটা আমি ভালো করেই জানি। আমাকে শেখাতে আসবেন না।”
বলেই জায়ানকে ইশারা করল ভিডিওটা অন করতে।জায়ান অভ্রের নির্দেশমতো ভিডিওটি চালু করল।স্ক্রিনে শুধু তাদের দুজনের ‘কবুল’ বলার মুহূর্তটুকুই ফুটে উঠল।
এদিকে আমান খান ধপ করে বসে পড়লেন। পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।অভ্র ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যভরা বাঁকা হাসি টেনে গম্ভীর স্বরে বলল—
“বাড়ির মান-সম্মান আমি ফিরিয়ে এনেছি। আজ এই মুহূর্ত থেকে ঠিক দুই দিনের মধ্যে বিয়ের প্রোগ্রাম শুরু করবেন। এটা আপনাদের সম্মানের স্বার্থে বলছি। নাহলে আমার এসবের কোনো ঠেকা-টেকা পরেনাই।”
অভ্রের কথাগুলো যেন বাতাসে ভারী হয়ে ঝুলে রইল। কেউই সহজে কিছু বলতে পারছে না।
আসান খান একবার আমান খানের দিকে তাকাল, আবার অভ্রের দিকে। পরিবেশটা এমন যে ভুল শব্দও যেন বড় ঝড় ডেকে আনতে পারে।
সবার চোখ রাহাকে খুঁজছে..কিন্তু পেলোনা।
অবশেষে আমান খান ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। কণ্ঠটা ভাঙা ভাঙা, কিন্তু ভেতরে চাপা অসন্তোষ স্পষ্ট—
“তুমি কি মনে করো, এভাবে জোর করে সব কিছু ঠিক করা যায়?”
অভ্র একটুও না নড়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে না রাগ, না আবেগ—শুধু স্থির আত্মবিশ্বাস।
সে শান্ত গলায় বলল—
“আমি জোর করছি না। আমি বাস্তবতা দেখাচ্ছি।
এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। সম্মানের সাথে সব ঠিক করবেন, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল করবেন।”
রাহা দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার চোখে অদ্ভুত দ্বিধা—একদিকে এই কঠোর মানুষটা, অন্যদিকে তার সিদ্ধান্তের ভার।
ঘরের সবাই যেন এক অদৃশ্য চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে।
অবশেষে আমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠে হার মানার ছায়া না থাকলেও বাস্তবতার মেনে নেওয়া স্পষ্ট—
“ঠিক আছে, দুই দিনের মধ্যে যা করার, করা হবে।”
অভ্র এবার ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। ঠোঁটের কোণে সেই আগেরই ঠান্ডা হাসি ফিরে এলো।
“সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
কিন্তু আমাদের কি জানানো যেত না? আমান খান বলে উঠলেন।
আপনারা জানতেন না,সিরিয়াসলি?—অভ্র কানের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল।
সাথে সাথে আমান খান চুপ হয়ে গেলেন। চোখে মুখে একরাশ বিস্ময় জমে উঠেছে। ছেলে তো আগেই বিয়ে করে নিয়েছে, কিন্তু কী এমন হলো যে এভাবে হুট করে আবার বিয়ে করতে হলো? না হলে অভ্রের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা না।
আসান খানও এগিয়ে এসে বললেন, কণ্ঠে চাপা উদ্বেগ—
—অভ্র, এসবের মানে কী? ওরা তো বেড়াতে গিয়েছিল, তাহলে এমন কী হয়ে গেল দুই দিনের মধ্যে?
অভ্র এক পা সামনে এগিয়ে এসে ঠান্ডা গলায় বলল
—কোন সবের মানে কী চাচ্ছু?
চোখ সরু করে আবার বলল—
—রাহাকে এভাবে বিয়ে করার… আমাদের তো জানাতে পারতে।
অভ্র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে শান্ত গলায় জবাব দিল—
—এখন তো জানালাম। সমস্যা কোথায়? আর আমি বিয়ে করেছি, কোনো অন্যায় না!
বলেই সাথী বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে অভ্র দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন—
“মেজো আম্মু, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো?”
তিনি একবার গভীরভাবে অভ্রের দিকে তাকালেন। অভ্র শুধু শুধু এমন কোনো কাজ করবে না—এটা তার অন্তরের বিশ্বাস। আর যাই হোক, ছেলেটা খারাপ না। হয়তো একটু বেশি জেদি, কিন্তু খান বাড়ির ছেলেদের রক্তেই তো জেদ মিশে থাকে।
আর তার মেয়ে এখন তার কাছেই থাকবে—এর চেয়ে বড় স্বস্তি আর কী হতে পারে!চোখে পানি ভরা অবস্থায় তিনি ধীরে ধীরে মাথা ওপর-নিচ নাড়লেন। বুঝিয়ে দিলেন—হ্যাঁ, তার সম্পূর্ণ আস্থা আছে অভ্রের উপর।
এই দৃশ্য দেখে আমান খান আর আফসানা বেগম যেন বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা ছেড়ে দিলেন। এতক্ষণ দম আটকে ছিল—যদি সাথী রাজি না হতেন!
সাথী বেগম তখন কাঁপা গলায় শুধু বললেন—
“বাবা, হিনা মেয়েটাকে এখন থেকে তুমি আগলে রেখো। খুব যত্নে রেখো বাবা। মেয়েটা একসময় সব বুঝে যাবে দেখো।
বলেই তিনি চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলেন না।অভ্রও এক মুহূর্ত থেমে নিজের হাত দিয়ে তার চোখের পানি মুছে দিলেন। তারপর দৃঢ় স্বরে সবাইকে উদ্দেশ্য করে শেষ কথাটা বলে উঠলেন—
“ইউ হ্যাভ ওনলি টু ডেজ লেফট।”
বলেই সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন।
—-----
রাহা আড়াল থেকে সব কথা শুনে চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। দরজাটা বন্ধ করেই সে বিছানায় গিয়ে হুড়মুড় করে উল্টো হয়ে পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে কান্না চেপে রাখতে না পেরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল—চাদরের ভাঁজ ভিজে যাচ্ছে চোখের জলে। বুকের ভেতরটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন বিনা অপরাধেই তার ওপর দোষের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে বারবার শুধু ভাবছে—সে তো কিছুই করেনি, ইচ্ছেও করেনি, তবে কেন এমন অপমান, কেন এমন সন্দেহ? কী থেকে কী হয়ে গেল সবকিছু!
কিছুক্ষণ পরেই ঘরে প্রবেশ করলেন শিফা ও সাথী বেগম। রাহাকে এভাবে ভেঙে পড়ে কাঁদতে দেখে দু’জনেই কেঁপে উঠলেন। মা যখন এগিয়ে গিয়ে রাহার কাঁধে হাত রাখলেন, তখনই রাহা হঠাৎ করে উঠে একেবারে জোরে তাকে জড়িয়ে ধরল, যেন পৃথিবীর একমাত্র আশ্রয়টাই এখন এই বুক।
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সে কাঁপা গলায় বলে উঠল— “মা… তুমি তো আমাকে বিশ্বাস করো, তাই না? বলো… তোমার মেয়ে কি কখনও এমন কিছু করতে পারে, যাতে এই বাড়ির সম্মান নষ্ট হয়? আমি তো কিছুই করিনি মা। আমি সত্যিই কিছুই করিনি…”
সাথী বেগম মেয়েকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দৃঢ় স্বরে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন—
“মা, আমার তোকে নিয়ে পূর্ণ আস্থা আছে। শতভাগ বিশ্বাস আছে আমার মেয়ের ওপর। আমি জানি, আমার মেয়ে কেমন। কী হয়েছে, আর অভ্র কেন এমন করলো—এখনও আমরা কেউই স্পষ্টভাবে কিছু জানি না। তবে যাই ঘটে গিয়ে গেছে, যা হওয়ার হয়ে গেছে।”
তিনি একটু থেমে আরও গম্ভীর, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
“অভ্র ছেলে হিসেবে খারাপ না, বরং খুবই যোগ্য। তোর জন্য একদম উপযুক্ত। এমন ছেলে পাওয়া সত্যিই সহজ কথা না, চারদিকে খুঁজলেও মেলে না।আর সবচেয়ে বড় কথা, তুই আমার চোখের সামনেই থাকবি। আল্লাহ যা করেন, নিশ্চয়ই তার মধ্যে কোনো না কোনো কল্যাণ থাকে। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে—সবই তো তাঁরই ইচ্ছায় হয়, তাই না?"
তখন শিফা হালকা মাথা নেড়ে যোগ করল—
“মেজো আম্মু ঠিকই বলছেন, রাহা ,তুই এসব ভেবে আর কান্না করিস না বোন আমার।”
কিন্তু, বলতেই—
সাথী বেগম থামিয়ে দিলেন,
“আর কোনো কিন্তু নয়। নিজেকে প্রস্তুত কর। আমি চাই আমার মেয়ে শুধু মেয়ে হয়ে না, একজন পরিপূর্ণ যোগ্য স্ত্রী হয়ে উঠুক। ভবিষ্যতে একজন দায়িত্ববান, পরিণত মা হিসেবেও নিজেকে গড়ে তুলবে।”
তিনি একটু থেমে দৃঢ় গলায় আবার বললেন,
“মনে রাখিস রাহা—মেয়েদের জীবনে স্বামীই হলো অলংকার। অভ্র হয়তো একটু কঠিন স্বভাবের, রাগী। কিন্তু তুই যদি ভালোবাসা দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে তাকে বুঝাতে পারিস—সে ঠিকই বুঝবে। এই সম্পর্কটা এখন শুধু সম্পর্ক নয়, এটা পবিত্র বন্ধন। এখানে দু’জনকেই দু’জনকে বুঝতে শিখতে হয়।”
সাথী বেগমের কণ্ঠ আরও নরম হলেও ভেতরের দৃঢ়তা অটুট,
“তুই এখন আর ছোট নেই রাহা। অনেকটাই পরিণত হয়েছিস। আশা করি, আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছিস।”
রাহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ভাঙা গলায় শুধু বলল,
“আমার মাথাটা খুব ব্যথা করছে… আমি একটু ঘুমাবো। তোমরা এখন যাও।”
সাথী বেগম আর শিফা একে অপরের দিকে তাকালেন। রাহার চোখের গভীর ভেতরের কষ্টটা তারা স্পষ্টই টের পেলেন, কিন্তু আর কিছু বললেন না। নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ঠিক তখনই, দরজার আড়ালে এক মুহূর্তে একটি ছায়া সরে গেল।
অভ্র দাঁড়িয়েছিল বাইরে—নীরব, স্থির, অথচ ভেতরে তুমুল ঝড়। সব কথাই সে শুনেছে।
তার চোখে জমে উঠেছে তীব্র আগুন।
যে-ই হোক না কেন, যে তার রাহার চোখে জল এনেছে—সে তাকে কখনোই ছাড়বে না।
_____________
রাহা আগে গিয়ে শাওয়ার নিলো। রাত তিনটার নিস্তব্ধ সময়ে শীতল জলের ধারাগুলো যেন তার ক্লান্ত দেহে বরফের মতো ছুঁয়ে যাচ্ছে, শরীরজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক অব্যক্ত শিহরণ। ঝরনার মতো নেমে আসা পানির স্রোত তার তাপমাত্রাকে স্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছিল, যেন প্রতিটি ফোঁটা তার ভেতরের ভাঙা অনুভূতিকে আরও জাগিয়ে তুলছে।
দীর্ঘ এক নিঃশব্দ শাওয়ার শেষে সে ধীরে ধীরে রুমে ফিরে এলো। এসেই বিছানার পাশে নিঃশক্ত হয়ে বসে পড়ল। মুহূর্তেই শরীরটা যেন আর তাকে ধরে রাখতে পারল না—পিছনের দিকে হেলে পড়ে গেল। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে, নিস্তেজভাবে সে শুয়ে রইল। চোখ স্থির করে তাকিয়ে রইল সিলিংয়ের দিকে, অথচ সেই শূন্য দৃষ্টির ভেতর দিয়েই যেন ভেঙে পড়ছিল পুরো পৃথিবী।
অচেনা এক ভারী নীরবতায় তার চোখের কোণ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল—নির্বাক, অবিরাম, অসহায়।
অস্পষ্ট, ভাঙা গলায় সে ফিসফিস করে বলে
উঠল,
— “বাবা… মিস ইউ।
মিস ইউ এ লট…”
শরীরের চূড়ান্ত ক্লান্তি আর মানসিক ভাঙনের ভার একসাথে চেপে ধরায় ক্রমশ তার চোখ বুজে এলো। মুহূর্তেই সে তলিয়ে গেল ঘুমের গভীর অন্ধকারে—এক নিঃশব্দ, অথচ ভারী ঘুমের জগতে।
_________
নিচে বৈঠক বসেছে—পরিস্থিতি এখন আর আগের মতো নেই, পুরো বাড়িটাই যেন এক অদৃশ্য উত্তেজনায় কাঁপছে।
ইভানের বাসা থেকে ইতিমধ্যে ফোন এসেছে। মুহূর্তের মধ্যেই সব কিছু ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। রাহার বিয়ের খবর শুনে ইভানের মায়ের ক্ষোভ আর রাগে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। তিনি একের পর এক কল দিয়ে সাথী বেগমকে তীব্র ভর্ৎসনা করছেন—
“এটা কেমন কথা? বিয়ে করতে হলো কেন? একবারও কি জানানো যেত না? বাড়ির সবাই কি মারা গিয়েছিল? সরাসরি বিয়ে করে ফেললে?”
তার কণ্ঠে ছিল অপমান, অভিমান আর ভাঙা স্বপ্নের তীব্র আর্তনাদ। তিনি ভেবেছিলেন রাহাকে তিনি নিজের ছেলের বউ হিসেবে দেখবেন—দিন গুনছিলেন, আশা বুনছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
অন্যদিকে সাথী বেগম শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেন—
“আপা, যা হয়ে গেছে তা তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। আমরা সবাই পরিস্থিতির চাপে পরেছি। আর বিয়ে যেহেতু হয়েছে, অভ্রের সাথেই এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ইভান তো আমার কাছে ছেলেরবামতোই, সে আমার ছেলে হয়েই থাকবে।”
এই কথা শুনেই আফরোজা বেগম রাগে ফুঁসে উঠে কল কেটে দিলেন।
সাথী বেগম ফোনটা হাতে ধরে এক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইলেন, তারপর গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিলেন—যেন বুকের ভেতরের ভারটা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছেন।
তখনই আফসানা বেগম এগিয়ে এলেন। কণ্ঠে অনুতাপ আর মমতা—
“সাথী… আমার সত্যিই মুখ নেই তোকে কিছু বলার। শুধু এটুকুই বলি…
সাথী বেগম তাকে থামিয়ে দিলেন শান্ত অথচ শক্ত স্বরে—
“আপা, কিছুই বলতে হবে না। তোমাদের কোনো দোষ নেই। আর অভ্রের ওপর আমার কোনো রাগ নেই। কিন্তু যে আমার মেয়েকে অপমান করতে চেয়েছে, তার পরিণতি আমি দেখে ছাড়ব।"
এই কথা শুনে আফসানা বেগমের চোখে জমে থাকা অশ্রু হঠাৎ করেই আনন্দে ভেঙে পড়ল। তিনি এগিয়ে এসে সাথী বেগমকে জড়িয়ে ধরলেন। দু’জনের চোখেই তখন আবেগের ভিড়, মুখে তবু এক ধরনের স্বস্তির হাসি।
তখন পাশ থেকে ছোটজন একটু অভিমান মিশিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল—
“আমাকে তো সবাই ভুলেই গেছো, তাই না? হুম, আমি চলে যাই তাহলে…”
এক মুহূর্তেই পরিবেশ নরম হয়ে গেল। দু’জনেই হেসে উঠে বললেন,
“আরে না না, ছোট—আয় এখানে আয়।”
মুহূর্তের মধ্যে সে-ও হাসিমুখে তাদের দিকে এগিয়ে গেল।অন্যদিকে আমান খান ও আসান খান তাদের দুজনের মুখেও হাসি ফুটে উঠে। আমান খান বললেন—
“কাল থেকেই অনেক কাজ। সব মেহমানের তালিকা করতে হবে। রাজকীয় আয়োজন হবে—চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে ও তারই ভাইয়ের একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা।”
_______
অভ্র ভাই… অভ্র ভাই… এটাই আমার শেষ সুযোগ। এরপর জীবন কিংবা মৃত্যু—কোনো অবস্থাতেই আপনার কাছ থেকে পালানোর আর কোনো নামও নেব না। এইবারের মতো মাফ করে দিন।হাত জোর ওরে বলছি, আপনার পায়ে পড়ছি।
"কেন রে বান্দি? বাসা থেকে এই পা দিয়ে বের হওয়ার সময় মনে ছিল না? জানের ভয় ছিল না?
তখন তো বুক ভরা সাহস নিয়ে সবকিছু ফেলে চলে এসেছিস। এখন কী হলো? এখন কেন শেষ সুযোগ চাইছিস?
চলবে……