ফন্ট সাইজ:
থিম:
আড়ালে আবডালে শুধুই তুই

৪৯তম পর্ব

লেখক: রাহা ইসলাম

#আড়ালে_আবডালে_শুধুই_তুই 

#কলমে_রাহা_ইসলাম 
#পর্ব_৪৬ (শেষ অংশ)
মাহাদী রাহার ঠিক পাশে বসে আছে। একদৃষ্টিতে, অপলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে ছোট্ট পরিটার দিকে।
আর রাহা...
অপরিচিত মুখটাকে এত কাছে দেখে তার ছোট্ট মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ভয়ে সে একেবারে গুটিয়ে বসে আছে। বড় বড় চোখে মাহদীর দিকে তাকিয়ে আছে, ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছে, আর এক মুহূর্ত পরেই বুক ফেটে কান্নায় ভেঙে পড়বে।
সেই দৃশ্য দেখেই অভ্রের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
মাহাদী ধীরে ধীরে রাহার আরও কাছে এগিয়ে এল। ঠোঁটে মৃদু হাসি রেখে কোমল স্বরে বলল,
— "কী হয়েছে, লাল পরি? আমাকে দেখে মুখটা এমন গোমড়া করে ফেললে কেন?"
সে সামান্য মাথা কাত করে আবার বলল,
— "আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি? কিংবা কোনো কষ্ট দিয়েছি?"
রাহা কোনো উত্তর দিল না। ভয়ে ছোট্ট শরীরটা আরও গুটিয়ে নিল। বড় বড় বিস্মিত চোখে শুধু মাহাদীর দিকেই তাকিয়ে রইল।
মাহাদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মমতামিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
— "জানো, তোমাকে আমি গত দুই বছর ধরে শুধু দূর থেকেই দেখেছি। কতবার ইচ্ছে করেছে তোমাকে একবার কোলে নিই, একটু আদর করি। কিন্তু কখনো পারিনি।"
সে হাত বাড়িয়ে বলল,
— "একবার... শুধু একবার আমার কাছে আসবে, লাল পরি?"
ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অভ্র।
চোখের সামনে মাহাদীর বাড়িয়ে দেওয়া হাত দেখে তার ভেতরের সমস্ত সংযম যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দৃষ্টি আগুনের মতো জ্বলে উঠল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে পাশের টেবিলে রাখা ফুলদানিটি তুলে নিয়ে মাহাদীর দিকে সজোরে ছুড়ে মারল।
মাহাদী আতঙ্কে হাত তুলে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। ফুলদানিটি তার হাতে সজোরে আঘাত করতেই ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
— "আহ...!"
যন্ত্রণায় চিৎকার করে সে নিজের হাত চেপে ধরে কয়েক কদম পিছিয়ে দাঁড়াল।
ঘরের নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই অভ্র ঝড়ের বেগে এগিয়ে এল। ক্রোধে তার চোখ দুটো রক্তিম, চোয়াল শক্ত, শিরাগুলো টানটান।
সে মাহাদীর শার্টের কলার মুঠো করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— "কুত্তার বাচ্চা! এত সাহস হলো কী করে? আমার পরির দিকে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস কোথা থেকে পেলি?"
অভ্রের বজ্রকঠিন কণ্ঠে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠল।
এদিকে হঠাৎ এমন উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য দেখে রাহা ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
সেই কান্না অভ্রের কানে পৌঁছাতেই তার দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে এল। সে সঙ্গে সঙ্গে মাহাদীর কলার ছেড়ে দিয়ে দ্রুত রাহার কাছে এগিয়ে গেল।
কোমল হাতে তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে তুলে নিল। এক হাতে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
তারপর গম্ভীর স্বরে ডাক দিল,
— "শিফা!"
ভাইয়ের কণ্ঠে অস্বাভাবিক কঠোরতা শুনে শিফা দৌড়ে ঘরে ঢুকল।
ঘরে ঢুকেই থমকে গেল সে। চারপাশের থমথমে পরিবেশ, মাহাদীর অবস্থা আর অভ্রের ক্রুদ্ধ মুখ দেখে সে কিছু বলার আগেই অভ্র তীব্র ক্ষোভে তার গালে একটি চড় বসিয়ে দিল।
শিফা হতভম্ব হয়ে গালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ ভরে উঠল অশ্রুতে। কাঁপা কাঁপা চোখে সে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
অভ্র তখনও প্রচণ্ড উত্তেজিত। কঠোর স্বরে বলে উঠল,
— "বেয়াদব মেয়ে! কোথায় ছিলি তুই? রাহাকে তোর কাছেই রেখে গিয়েছিলাম না? একটুখানি দায়িত্বও রাখতে পারলি না?"
তার কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, উদ্বেগ আর রাহাকে হারানোর আতঙ্কের তীব্র প্রতিধ্বনি। আর রাহা তখনও অভ্রের বুকের সঙ্গে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
শিফা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গালে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বলল,
— "ভা... ভাইয়া... মাহাদী ভাইয়া বলেছিলেন, আম্মু নাকি আমাকে নিচে ডাকছেন। তিনি বলেছিলেন, আমি গেলেই তিনি এখানে থাকবেন। তাই... তাই আমি চলে গিয়েছিলাম।"
ভয়ের চাপে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠছিল। চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
অভ্র কয়েক সেকেন্ড নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের রাগ সংযত করে রাহাকে আলতোভাবে শিফার কোলে তুলে দিল।
গম্ভীর, অনড় কণ্ঠে বলল,
— "ওকে এখনই মেজো আম্মুর কাছে নিয়ে যা। বলবি, খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে।"
এক মুহূর্ত থেমে মাহাদীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার বলল,
— "আর আজকের পর থেকে তোদের এই ছেলেটার আশপাশে যেন আর কখনো না দেখি।"
শিফা কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলল,
— "জি... ভাইয়া।"
এরপর রাহাকে শক্ত করে আগলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল।
অভ্র ধীর পায়ে মাহাদীর দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখেমুখে জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান আর অদম্য অধিকারবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হঠাৎ এক প্রবল ধাক্কায় সে মাহাদীকে বিছানার ওপর ফেলে দিল।
মাহাদী সামলে ওঠার আগেই অভ্র মেঝেতে পড়ে থাকা ভারী ফুলদানিটি তুলে নিল। দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সেটি মাথার ওপর তুলল। ক্রোধে তার বুক ওঠানামা করছিল, দৃষ্টি জ্বলছিল দাবানলের মতো।
ঘরের নিস্তব্ধতায় শুধু দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, পরমুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নিতে পারে।
—----
ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে দরজা ঠেলে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করলেন রাহার বাবা। এক ঝটকায় অভ্রকে সরিয়ে দিয়ে তিনি গর্জে উঠলেন,
— "কী করছিস তুই, অভ্র!"
হঠাৎ বাধা পেয়ে অভ্র কয়েক পা পিছিয়ে গেল। ,চোখ দুটো ভয়াবহ রক্তিম। দশ বছরের বাচ্চার এমন রাগ দেখে রাহার বাবা তো আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
— "তো আমি কী করব, মেজো চাচ্চু? এই লোকটা আমার পরির গায়ে হাত দিতে যাচ্ছিল!"
কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে উঠল।
— "আমি আগেই ওকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছিলাম। তারপরও এত বড় দুঃসাহস দেখানোর সাহস পেল কীভাবে?"
অভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
— "বল! আমি তোকে নিষেধ করিনি? বল!"
মাহাদী নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অভ্র আবারও ক্ষোভে ফেটে পড়ল,
— "তাহলে কোন সাহসে এখানে এলি? আমার কথা অমান্য করার সাহস কে দিয়েছে তোকে?"
কথা শেষ করেই সে আবার মাহাদীর দিকে তেড়ে যেতে উদ্যত হলো।
রাহার বাবা বারবার তার পথ রোধ করলেন। দুই হাতে শক্ত করে ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু অভ্র তখন ক্রোধে এতটাই উন্মত্ত যে কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেখে আরমান খান অভ্রের গালে একটি জোরালো চড় বসিয়ে দিলেন।
চড়ের শব্দে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কঠোর, দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন,
— "সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস, অভ্র! রাগ থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাবি? কী করতে যাচ্ছিলি তুই? একটা ভুলের জন্য আরেকটা ভয়ংকর ভুল করে বসবি?"
অভ্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুকটা তখনও দ্রুত ওঠানামা করছে। মুঠো করা হাত দুটো কাঁপছে, আর চোখে এখনো দাউদাউ করে জ্বলছে ক্ষোভের আগুন।
অভ্রের কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাগে তার সমগ্র শরীর কাঁপছিল। হঠাৎই বজ্রনিনাদের মতো সে চিৎকার করে উঠল,
— "হ্যাঁ! প্রয়োজন হলে মেরেই ফেলব!"
তার চোখে তখন একরোখা উন্মত্ততার ছাপ।
— "শুধু ওকেই নয়... যে-ই আমার ফেইরি টেইলের দিকে লোভের দৃষ্টি দেবে, ওর দিকে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে, কাউকেই আমি ছাড়ব না। কাউকেই না!"
কথাগুলো যেন এক অটল প্রতিজ্ঞার মতো উচ্চারিত হলো।
পরমুহূর্তেই সে হাতের ভারী ফুলদানিটি প্রবল শক্তিতে মেঝেতে আছড়ে ফেলল।
ঝনঝন!
বিকট শব্দে ফুলদানিটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়ল। ঘরের নীরবতা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
এরপর আর কারও দিকে একবারও না তাকিয়ে অভ্র দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘরে নেমে এলো এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
আরমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ভাতিজার এমন বিস্ফোরক রাগ দেখে তিনি স্পষ্টতই বিরক্ত ও হতাশ হলেন। তাঁর কাছে বিষয়টি এতটা গুরুতর হয়ে ওঠার কথা ছিল না।
মাহাদী তো তাদের পরিবারের কাছে প্রায় আপনজনের মতোই। দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। উপরন্তু, সে অভ্রের শৈশবের বন্ধু—একসঙ্গে বড় হয়েছে, একই স্কুলে পড়েছে।
ধীরে ধীরে মাহাদীর কাছে এগিয়ে এসে আরমান খান তাঁর কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন।
অনুতপ্ত কণ্ঠে বললেন,
— "বাবা, অভ্রের পক্ষ থেকে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। ওর আচরণ একেবারেই সমীচীন হয়নি।"
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
— "প্লিজ, কিছু মনে কোরো না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব, ওকে বুঝিয়ে বলব। ওকে তো চেনোই—রাগটা খুব দ্রুত মাথায় চড়ে যায়। তবে মনটা খারাপ না। আজ একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।”
আরমান খানের কথাগুলো মাহাদীর কানে গেল ঠিকই, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। তখন তার মাথার ভেতর শুধু ক্ষোভ, অপমান আর আহত আত্মসম্মানের ঝড় চলছিল।
মনে মনে সে একটা কঠিন শপথ নিল।
একদিন রাহা তারই হবে। আর সেদিন অভ্রকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে—যাকে এত আগলে রাখতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাকেই সে নিজের করে নিয়েছে।
তার বুকের ভেতর জমে উঠল তীব্র অভিমান।
“আমি কি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ওর কাছে গিয়েছিলাম?”
“একটু আদর করতে চেয়েছিলাম শুধু। একটা নিষ্পাপ শিশুকে কোলে নিতে চেয়েছিলাম। এর জন্য এত অপমান, এত ঘৃণা, এত অবিশ্বাস?”
অভ্রের প্রতিটা কথাই যেন তার আত্মসম্মানে ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল।
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না মাহাদী। শক্ত মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেদিনই তাদের কয়েক বছরের বন্ধুত্বের শেষটা হয়ে গেল।
প্রথম শ্রেণি থেকে একসঙ্গে বড় হওয়া দুই বন্ধু মুহূর্তেই হয়ে গেল দুই অপরিচিত মানুষ। এরপর আর কখনো কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেনি। অভ্র তো মাহাদীর অস্তিত্বই যেন মেনে নিল না। সামনে পড়লেও চোখ তুলে তাকাত না। 
সময় কিন্তু থেমে থাকেনি।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই হঠাৎ এক দুঃসংবাদ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল।
রাহার বাবা আরমান খান আর বেঁচে নেই।
খবরটা শুনে মাহাদীর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার নেমে এলো। মানুষটার প্রতি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। তাই মৃত্যুর খবরটা তাকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিল।
তবে একটা বিষয় পুরো এলাকাকেই বিস্মিত করেছিল—আরমান খানের লাশ কখনোই পাওয়া যায়নি। তাহলে ঠিক কীভাবে ঘটেছিল তাঁর মৃত্যু?
কিন্তু সেই শোকের সাত দিনের মাথায় আরও একটা খবর তার কানে এলো।
অভ্রকে ইতালিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
খবরটা শুনে মাহাদীর বুকের ভেতর চাপা একটা তৃপ্তি কাজ করল। মনে হলো, তার পথের সবচেয়ে বড় বাধাটাই যেন সরে গেছে। বহুদিন পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু সে জানত না...
ভাগ্য চুপিচুপি তার জন্য আরও কঠিন একটা খেলা সাজিয়ে রেখেছে।
অভ্রের চলে যাওয়ায় যে আনন্দ তার মনে জন্মেছিল, সেটা বেশিদিন টিকল না।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, অভ্রের যাওয়ার কিছুদিন পর মাহাদীকেও একই দেশে—ইতালিতে পাড়ি জমাতে হয়। অথচ দূরদেশেও তাদের বহু বছরের দ্বন্দ্বের ইতি ঘটেনি।
তবে কেন তাকে হঠাৎ ইতালি যেতে হয়েছিল, সেই প্রকৃত কারণ সে জানতে পারে বহু বছর পর।
আর সেই সত্যের পাশাপাশি আরও একটি গভীর গোপন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় সে, যা তার সমগ্র জীবনকে আমূল বদলে দিতে চলেছে।
সেই সত্য তার সামনে একটিই সম্ভাবনা উন্মোচন করে—
রাহাকে আবার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
হয়তো রাহা কখনোই তাকে ক্ষমা করবে না। হয়তো তার দিকে ফিরেও তাকাবে না। তবু মাহাদীর তাতে কোনো আপত্তি নেই।
রাহা যদি তাকে না-ও দেখে...
সে তো দূর থেকেই রাহাকে দেখতে পারবে।
তার কাছে এটুকুই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
___________
বর্তমান….
একটি দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো। মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল মাহাদী। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে নিঃশব্দে একবার শরীর মোচড় দিয়ে উপুড় হয়ে ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে পড়ল।
তার ডান হাতটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপছিল। সেই কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে পাশে পড়ে থাকা মোবাইল ফোনটি নিজের দিকে টেনে নিল।
স্ক্রিন আনলক করতেই গ্যালারির ভেতর থেকে ভেসে উঠল বহু বছর আগের একটি ছবি।
ছবিটিতে ছোট্ট রাহা—টুকটুকে লাল ফ্রক পরা, মুখভরা নিষ্পাপ হাসি, চোখেমুখে একরাশ শিশুসুলভ সারল্য। ছবিটি দূর থেকে তোলা, তাই সে জানতও না, অজান্তেই কেউ তার সেই হাসিটুকু নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি করে রেখে দিচ্ছে।
মাহাদীর কাঁপতে থাকা আঙুল ধীরে ধীরে ছবিটির ওপর বুলিয়ে গেল। যেন ফোনের ঠান্ডা কাঁচ ভেদ করে সে বহু বছর আগের সেই ছোট্ট হাতটিকে একবার ছুঁয়ে দেখতে চাইছে।
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে ঠান্ডা মেঝেতে মিলিয়ে গেল।
তারপর বুকভাঙা, ভারী এক বিষণ্ন কণ্ঠে সে ধীরে ধীরে গুনগুন করে উঠল——
যন্ত্রণা গুলো আমাকে,
ভেতরে পোড়ায়।
ভাবতে ভাবতে তারে আমি,
চোখ বুজিয়া জড়াই ধরি।
চোখ মেলিয়া দেখি আমি,
সে যে বুকে নাই। 
প্রিয়া রে, প্রিয়া রে, প্রিয়া,
শেষ লাইনটি উচ্চারণ করতেই তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে রাহার শৈশবের ছবিটির ওপর। তবুও সে ছবিটিকে বুকে চেপে ধরে রইল, যেন সেটিই রাহাকে ছুঁয়ে থাকার তার শেষ অবলম্বন।
চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন