🖤 তোমার আমার প্রেম
পর্ব — ৬
সেদিন বিকেলের আকাশটা কেমন যেন অস্বাভাবিক ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সবাই যখন ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছে, তখনও মরিয়ম আর নিলিমা ক্যাম্পাসের এক পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
নিলিমা বলল,
—মরিয়ম, একটা কথা বলব?
—হুম, বল।
—তুই কি রাইহানকে ভয় পাস?
মরিয়ম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—জানি না।
—জানি না মানে?
মরিয়ম ধীরে বলল,
—লোকটার মধ্যে এমন কিছু আছে, যেটা আমাকে ভয়ও দেখায়… আবার কেন জানি মনে হয়, বিপদে পড়লে ও-ই হয়তো সাহায্য করবে।
নিলিমা কিছু বলার আগেই—
টিং!
মরিয়মের ফোনে মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
সে মেসেজ খুলতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
> “আজ বাড়ি ফেরার সময় একা যেও না।”
মরিয়মের বুক ধক করে উঠল।
নিলিমা ফোনটা নিয়ে মেসেজটা পড়ল।
—এটা কিন্তু মজা নয়।
মরিয়ম চারপাশে তাকাল।
ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে।
—কিন্তু আমাকে কে দেখছে?
নিলিমা বলল,
—চল, আগে বাসায় যাই।
দুজন দ্রুত হাঁটা শুরু করল।
কিন্তু তারা জানত না—
ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে কালো একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির ভেতর থেকে দুটো চোখ তাদের অনুসরণ করছে।
---
অন্যদিকে
একটি বিশাল অফিসের কাঁচঘেরা ঘরে দাঁড়িয়ে ছিল রাইহান।
তার সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াস।ইয়াসের হাতে একটা ফাইল।
—রাইহান, ব্যাপারটা শুধু মরিয়মকে নিয়ে না।
রাইহান ঘুরে তাকাল।
—কী পেয়েছিস?
ইয়াস ফাইলটা খুলে কয়েকটা ছবি বের করল।
—গত তিনদিন ধরে মরিয়মের আশেপাশে একই গাড়ি দেখা যাচ্ছে।
রাইহান ছবিগুলো হাতে নিল।
তার চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে গেল।
—নম্বর?
—ভুয়া।
—লোক?
—চিহ্নিত করা যায়নি।
রাইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর একটা ছবি টেবিলের ওপর রাখল।
ছবিতে মরিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে বের হচ্ছে।
রাইহানের চোখ আটকে গেল ছবির এক কোণে।
—এক মিনিট…
ইয়াস কাছে এগিয়ে এল।
—কী?
রাইহান ছবিটা জুম করে দেখল।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোকের মুখের অর্ধেক দেখা যাচ্ছে।
রাইহানের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।
—অসম্ভব…
ইয়াস জিজ্ঞেস করল,
—কাকে দেখেছিস?
রাইহান ধীরে বলল,
—লিয়নের লোক।
ইয়াসের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—তাহলে লিয়ন সত্যিই মরিয়মকে টার্গেট করেছে।
রাইহান কিছু বলল না।
কয়েক সেকেন্ড পর শুধু বলল,
—গাড়ি বের কর।
—কোথায় যাবি?
রাইহান দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
—মরিয়মের কাছে।
---
একই সময়
শহরের অন্য প্রান্তে একটি অন্ধকার ঘরে বসে ছিল লিয়ন খান।
তার সামনে টেবিলের ওপর মরিয়মের ছবি।
কিন্তু ছবির পাশে আরেকটি ছবি রাখা।
রাইহানের।
লিয়ন ধীরে ছবিগুলো পাশাপাশি রাখল।
তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
—রাইহান…
কিছুক্ষণ পর সে ছবিতে মরিয়মের দিকে তাকাল।
—তুই জানিস না, তোর জন্য ওর জীবন কতটা বদলে যাবে।
ঠিক তখন একজন লোক এসে বলল,
—স্যার, একটা সমস্যা হয়েছে।
লিয়ন তাকাল।
—কী?
—রাইহান মরিয়মের ব্যাপারে জানতে পেরেছে।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লিয়ন হেসে উঠল।
—আমি সেটাই তো চেয়েছিলাম।
লোকটি অবাক।
—স্যার?
লিয়ন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
—রাইহানকে মরিয়মের কাছ থেকে দূরে সরাতে হলে আগে তাকে মরিয়মের আরও কাছে আনতে হবে।
লোকটি কিছু বুঝতে পারল না।
—কিন্তু কেন?
লিয়নের চোখে এবার অদ্ভুত এক ঝিলিক।
—কারণ…
সে ধীরে বলল,
—যাকে রক্ষা করতে চাইবে, তাকে হারানোর ভয়ও তাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে।
---
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে
মরিয়ম আর নিলিমা গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
নিলিমা বলল,
—আমার ভাইকে ফোন করছি। ও এসে আমাদের নিয়ে যাবে।
মরিয়ম মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই—
একটা কালো গাড়ি তাদের সামনে এসে থামল।
দুজনেই থেমে গেল।
গাড়ির দরজা খুলল।
মরিয়মের বুক ধক করে উঠল।
কিন্তু গাড়ি থেকে রাইহান নামল না।
নামল একজন অচেনা লোক।
সে শুধু বলল,
—মরিয়ম সরকার?
মরিয়ম এক পা পিছিয়ে গেল।
—আপনি কে?
লোকটা মৃদু হাসল।
—আপনাকে একটা জিনিস দিতে বলা হয়েছে।
সে একটা ছোট খাম এগিয়ে দিল।
মরিয়ম খামটা নিল না।
—কে পাঠিয়েছে?
লোকটা বলল,
—আপনি খুললেই বুঝবেন।
এই বলে সে গাড়িতে উঠে চলে গেল।
নিলিমা দ্রুত বলল,
—খুলিস না!
মরিয়ম খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা মাত্র ছবি।
ছবিটা দেখে মরিয়মের মুখ সাদা হয়ে গেল।
ছবিতে—
রাইহান দাঁড়িয়ে আছে।
তার পাশে একজন মানুষ।
আর সেই মানুষটিকে মরিয়ম আগে কখনো দেখেনি।
ছবির পেছনে মাত্র একটি বাক্য লেখা—
> “যাকে তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছ, তার অতীত তুমি জানো না।”
মরিয়মের হাত কাঁপতে লাগল।
নিলিমা ছবিটা দেখে বলল,
—মরিয়ম… এটা কী?
মরিয়ম কোনো উত্তর দিতে পারল না।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে কল ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি ঠান্ডা কণ্ঠ—
—ছবিটা দেখেছ?
মরিয়ম কাঁপা গলায় বলল,
—আপনি কে?
কণ্ঠটা হেসে বলল,
—যে তোমাকে অনেক আগে থেকেই চেনে।
—আপনি আমার কাছে কী চান?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
—আমি কিছু চাই না, মরিয়ম। আমি শুধু চাই তুমি সত্যিটা জানো।
কল কেটে গেল।
মরিয়ম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই দূর থেকে একটা কালো গাড়ি দ্রুত এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
গাড়ি থামতেই দরজা খুলে রাইহান বেরিয়ে এল।
তার চোখ সরাসরি মরিয়মের হাতে থাকা ছবির দিকে।
রাইহান ছবিটা দেখেই থেমে গেল।
তার মুখের সমস্ত কঠোরতা এক মুহূর্তে বদলে গেল।
—এই ছবিটা তুমি কোথায় পেয়েছ?
মরিয়ম ধীরে বলল,
—একজন দিয়ে গেছে।
রাইহান ছবিটা হাতে নিল।
কয়েক সেকেন্ড ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর তার চোখে এমন এক রাগ ফুটে উঠল, যা মরিয়ম আগে কখনো দেখেনি।
সে নিচু গলায় বলল—
—লিয়ন…
দূরে কোথাও বসে থাকা লিয়ন তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে ফোন।
সে শুধু একটি কথাই বলল—
—এবার শুরু হোক আসল খেলা।
চলবে… 🖤🔥