ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক মুঠো শিউলির প্রেম

১ম পর্ব

লেখক: 𐙚_মরিয়াম রিতু~ᥫ᭡

ভোরের আকাশটা তখনও পুরোপুরি আলোয় ভরে ওঠেনি। রাতের শেষ অন্ধকারটুকু ধীরে ধীরে সরে গিয়ে পূর্ব আকাশে সূর্যের আগমনী আভা ছড়িয়ে পড়ছিল। চারপাশে নরম কুয়াশার আস্তরণ। ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে বাতাসে মিশে ছিল শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস। মির্জা বাড়ির পেছনের বিশাল শিউলি গাছটার নিচে রাতভর ঝরে পড়া অসংখ্য সাদা ফুল যেন সাদা চাদর বিছিয়ে রেখেছে। সেই দৃশ্য দেখলে যে কারও মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। আর মেহরিনের কাছে তো এই দৃশ্য ছিল ভীষণ প্রিয়। প্রতিদিনের মতো আজও খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেরুন রঙের শাড়িটা পরেছিল সে। শাড়ির আঁচলটা সুন্দর করে কাঁধে গুছিয়ে নিয়ে লম্বা চুলগুলো খোলা রেখেছিল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ, হাতে কয়েকটি সরু চুড়ি আর পায়ে নূপুরের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে ভোরের নরম আলোয় মেয়েটাকে যেন শিউলি ফুলের মতোই কোমল লাগছিল। হাতে ছোট্ট একটি বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে মেহরিন ধীরে ধীরে শিউলি গাছটার নিচে এসে বসে পড়ল। একে একে ফুল কুড়িয়ে ঝুড়িতে রাখতে লাগল। প্রতিটি ফুল হাতে নেওয়ার সময় তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছিল মায়াবী হাসি। ছোটবেলা থেকেই শিউলি ফুলের প্রতি তার আলাদা এক ভালোবাসা। তার দাদি রওশন আরা মির্জা প্রায়ই বলতেন, “শিউলি ফুলের মতো কিছু মানুষও হয় রে মেহরিন। খুব বেশি সময়ের জন্য জীবনে আসে না, কিন্তু যতক্ষণ থাকে, চারপাশটা সুবাসে ভরে রাখে।” তখন ছোট্ট মেহরিন কথাটার অর্থ বুঝত না। কিন্তু বড় হওয়ার পর দাদির কথাগুলো মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে মনে পড়ত। আজও পড়ল। হঠাৎ পেছন থেকে মিষ্টি একটা কণ্ঠ ভেসে এল, “আপু, আবার এত সকালে শিউলি কুড়াতে চলে এসেছ?” মেহরিন পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখল তার ছোট ভাই আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নীল টি-শার্ট আর কালো পায়জামা, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। ঘুম জড়ানো চোখে তাকিয়ে আছে বোনের দিকে। মেহরিন হেসে বলল, “তুই উঠেছিস কখন?” আয়ান হাই তুলে বলল, “তোমাকে ছাড়া কি আর ঘুম ভাঙে? তুমি ঘুম থেকে উঠলেই পুরো বাড়িতে তোমার নূপুরের শব্দ হয়।” মেহরিন হেসে ফেলল। “বেশি কথা না বলে তুই বরং কয়েকটা ফুল কুড়িয়ে দে।” আয়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আমি ফুল কুড়াব আর তুমি বসে বসে দেখবে?” “ঠিক আছে, আজ তুই ফুল কুড়া, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব।” “না না, সেটা হবে না।” আয়ান দৌড়ে গিয়ে ফুল কুড়াতে শুরু করতেই মেহরিন আবার হাসল। এই বাড়ির সকালগুলো এমনই ছিল। ছোট ছোট হাসি, পরিবারের মানুষের ভালোবাসা আর আপনজনদের ব্যস্ততায় ভরা। মির্জা পরিবারের কর্তা সাইফুল মির্জা ছিলেন গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। ব্যবসার জগতে তার যথেষ্ট পরিচিতি থাকলেও পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল একজন বাবা। স্ত্রী সাবিহা মির্জা ছিলেন শান্ত স্বভাবের, সংসারী একজন নারী। বড় ছেলে আরিশ মির্জা বাবার ব্যবসার অনেকটা দায়িত্ব সামলাত। আর মেহরিন ছিল পরিবারের সবার আদরের মেয়ে। আর ছোট ছেলে আয়ান তো ছিল পুরো বাড়ির দুষ্টুমির কেন্দ্রবিন্দু। দাদি রওশন আরা মির্জা ছিলেন মেহরিনের সবচেয়ে কাছের মানুষ। মেহরিন তার মনের প্রায় সব কথাই দাদির সঙ্গে ভাগ করে নিত। কিছুক্ষণ পর আয়ান ঝুড়ি ভর্তি ফুল নিয়ে মেহরিনের সামনে এসে দাঁড়াল। “এই নাও, তোমার এক মুঠো শিউলি।” মেহরিন ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “এক মুঠো শিউলি নয়, এক মুঠো ভালোবাসা।” আয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, “ফুলের সঙ্গে আবার ভালোবাসা কোথা থেকে এলো?” মেহরিন কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঝুড়িটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। সে জানত না, আজকের এই কথাটাই একদিন তার জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যাবে। অন্যদিকে শহরের ব্যস্ত প্রান্তে তখন আরেকটি সকাল শুরু হয়েছে। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল একজন যুবক। পরনে পরিপাটি সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে স্টেথোস্কোপ আর চোখেমুখে দিনের শুরু থেকেই ব্যস্ততার ছাপ। বয়স ঊনত্রিশ। নাম তার আদনান চৌধুরী। পেশায় একজন ডাক্তার। রোগীদের কাছে শান্ত, ভদ্র এবং দায়িত্বশীল একজন চিকিৎসক হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আদনান ছিল অনেকটাই গম্ভীর। অপ্রয়োজনীয় কথা বলা তার পছন্দ ছিল না। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার অভ্যাসও ছিল না। হাসপাতালের কেবিনে ঢোকার আগে তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে বড় ভাই আরহাম চৌধুরীর নাম দেখে কলটা রিসিভ করল সে। “হ্যালো, ভাইয়া।” ওপাশ থেকে আরহামের কণ্ঠ, “আজকে কখন বাড়ি ফিরবি?” “জানি না। রোগী বেশি।” “তুই প্রতিদিনই এই একই কথা বলিস। আজ কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরবি।” আদনান একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “কেন?” “বাড়িতে দাদার সঙ্গে বসতে হবে। আর মা বলেছে, তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।” আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে, চেষ্টা করব।” ফোনটা কেটে দিতেই তার ছোট বোন ইশরাত এসে সামনে দাঁড়াল। “ভাইয়া!” আদনান তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে?” ইশরাত মুচকি হেসে বলল, “মা কিন্তু আজ তোমাকে ছাড়বে না।” “কেন?” “তুমি জানো না?” “না।” ইশরাত একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “বাড়ি গেলেই জানতে পারবে।” আদনান আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে কেবিনের দিকে চলে গেল। চৌধুরী পরিবারও ছিল যথেষ্ট বড় এবং ঐতিহ্যবাহী। বাবা ফারুক চৌধুরী ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মা নওশীন চৌধুরী ছিলেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা এক স্নেহশীল নারী। বড় ছেলে আরহাম বাবার ব্যবসায় যুক্ত। ছোট বোন ইশরাত ছিল পরিবারের প্রাণচঞ্চল সদস্য। আর পরিবারের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন দাদা আবদুল কাদের চৌধুরী। তার কথাই ছিল পরিবারের শেষ কথা। আদনান ছিল পরিবারের গর্ব। কিন্তু এত কিছু পাওয়ার পরও তার জীবনে যেন কোথাও একটা শূন্যতা ছিল। সে নিজেও জানত না, সেই শূন্যতার নাম কী। সেদিন দুপুরের দিকে হাসপাতালের কাজ শেষ করে আদনান বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি থামাল শহরের পুরোনো একটি মন্দিরের পাশের ফুলের দোকানের সামনে। কেন জানি আজ তার শিউলি ফুল কিনতে ইচ্ছে হলো। দোকানদারকে বলল, “শিউলি আছে?” “আছে বাবা।” এক মুঠো শিউলি ফুল হাতে নিয়ে আদনান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, এই ফুলের সুবাস যেন কোথাও আগে অনুভব করেছে। অথচ কোথায়, কখন—কিছুই মনে পড়ল না। ফুলগুলো হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠল সে। অন্যদিকে বিকেলের আলোয় মেহরিন বাড়ির বারান্দায় বসে শিউলি ফুল দিয়ে ছোট্ট মালা গাঁথছিল। তার মেরুন শাড়ির আঁচল বাতাসে দুলছিল। চুলের কয়েকটি গোছা বারবার মুখের সামনে চলে আসছিল। সে সেগুলো কানের পেছনে সরিয়ে আবার ফুল গাঁথছিল। দাদি রওশন আরা পাশে এসে বসে বললেন, “কী বানাচ্ছিস?” “মালা।” “কার জন্য?” মেহরিন হেসে বলল, “কারও জন্য না।” দাদি মুচকি হেসে বললেন, “সবাই প্রথমে এটাই বলে।” মেহরিন অবাক হয়ে দাদির দিকে তাকাল। “কী?” “কিছু না।” দাদি শুধু মৃদু হাসলেন। মেহরিন বুঝতে পারল না দাদির কথার মানে। সে আবার ফুলের দিকে মন দিল। ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান ফটকের বাইরে একটি গাড়ি এসে থামল। মেহরিন অন্যমনস্কভাবে সেদিকে তাকাল। গাড়ির দরজা খুলে একজন যুবক নামল। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে একটি ছোট্ট কাগজের প্যাকেট। দূরত্বের কারণে মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল না। কিন্তু মেহরিনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কেন যেন মনে হলো, এই মানুষটিকে সে কোথাও দেখেছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আদনানও বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে মাথা তুলে তাকাল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেরুন শাড়ি পরা মেয়েটার সঙ্গে তার চোখ মিলল। এক মুহূর্ত। মাত্র এক মুহূর্ত। কিন্তু সেই এক মুহূর্তেই দুজনের চারপাশ যেন থেমে গেল। বাতাসে ভেসে এল শিউলি ফুলের সুবাস। আদনানের হাতে থাকা এক মুঠো শিউলি ফুল থেকে কয়েকটি ফুল মাটিতে পড়ে গেল। মেহরিনের হাতে থাকা ফুলের মালার সুতোও হঠাৎ ছিঁড়ে গেল। দুজনেই কিছু না বলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা কেউ জানত না, এই দেখা শুধু একটি সাধারণ দেখা নয়। এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হতে চলেছে এমন এক গল্প, যেখানে শিউলি ফুলের সুবাসে ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাবে দুটি অচেনা হৃদয়। আর সেই গল্পের নাম—একমুঠো শিউলির প্রেম।
রানিং.........!
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
#এক_মুঠো_শিউলির_প্রেম
#লেখনীতে_মরিয়াম_রিতু
#সূচনা_পর্ব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন