সাইলেন্ট লাভার
লেখিকা : নূর নাহার
পর্ব — ১ : নতুন শহরের পথে
ঢাকার মজুমদার বাড়িটা আজ সকাল থেকেই অস্বাভাবিক ব্যস্ত।
বসার ঘরের এক পাশে কয়েকটা স্যুটকেস। কারও হাতে কাপড়, কেউ আবার শেষ মুহূর্তের জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে।
আর নিজের ঘরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে রাইসা মজুমদার।
আজ তাকে ঢাকা ছাড়তে হবে।
রাজশাহীর উদ্দেশে।
তার বাবা মেহেদী মজুমদার অনেক দিন ধরেই চাচ্ছিলেন, মেয়েটা যেন রাজশাহীতে পড়াশোনা করে। কারণ তিনি নিজেও রাজশাহীর "রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন"।
এসএসসি পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসায় তাঁর ইচ্ছেটা আরও দৃঢ় হয়েছিল।
কয়েক সপ্তাহ আগে রাতের খাবারের সময় বাবা বলেছিলেন,
— “রাইসা, আমি চাই তুই রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হোস।”
রাইসা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
— “রাজশাহীতে?”
— “হ্যাঁ। তোর এসএসসি সামনে। ওখানকার পড়াশোনার পরিবেশ ভালো। আর তোর নানুর বাড়িও তো রাজশাহীতে।”
রাইসা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল।
— “তোমার এত ইচ্ছে যখন, আমি যাব আব্বু ।”
সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল সেদিনই।
---
দরজায় টোকা পড়তেই রাইসা ঘুরে তাকাল।
তার বড় ভাই রাফসান দাঁড়িয়ে আছে।
রাফসান ঘরে ঢুকে স্যুটকেসের দিকে তাকাল।
— “সব গুছানো?”
রাইসা মাথা নাড়ল।
— “হুম।”
— “কিছু ভুলে যাচ্ছিস না তো?”
— “না।”
রাফসান ব্যাগটা একটু তুলে দেখে বলল,
— “এত ভারী কেন?”
রাইসা গম্ভীর মুখ করে বলল,
— “প্রয়োজনীয় জিনিস আছে।”
— “কী প্রয়োজনীয়?”
রাইসা মুচকি হাসল।
— “সেটা গোপন।”
রাফসান হেসে মাথা নাড়ল।
— “তোর গোপন জিনিসের শেষ নেই।”
রাইসা কিছু বলল না।
তার বিছানার পাশে রাখা বইটার দিকে তাকাল।
সে উপন্যাস পড়তে ভীষণ ভালোবাসে। বিশেষ করে অবসরে একটা ভালো উপন্যাস হাতে নিয়ে বসে থাকতে তার অসম্ভব ভালো লাগে।
রাফসান বইটা তুলে নিয়ে বলল,
— “এটাও নিয়ে যাবি?”
— “অবশ্যই।”
— “রাজশাহী গিয়ে পড়াশোনা করবি, নাকি সারাদিন উপন্যাস পড়বি?”
রাইসা বইটা কেড়ে নিয়ে বলল,
— “দুটোই পারি।”
— “দেখা যাবে।”
---
নিচে নামতেই পুরো পরিবার প্রায় জড়ো হয়ে গেছে।
মা মেহেরিন মজুমদার শেষবারের মতো মেয়ের ব্যাগ দেখে নিচ্ছেন।
— “কাপড় সব আছে?”
— “আছে।”
— “প্রয়োজনীয় জিনিস?”
— “আছে।”
— “কিছু লাগলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবি।”
রাইসা মায়ের হাত ধরে হেসে বলল,
— “মা, আমি তো অন্য দেশে যাচ্ছি না।”
মা একটু হেসে বললেন,
— “মায়ের কাছে দূরত্ব বলে কিছু থাকে না।”
রাইসার হাসিটা এবার একটু থেমে গেল।
সে মাকে জড়িয়ে ধরল।
---
বড় চাচা ইমাম মজুমদার এসে বললেন,
— “দুই দিন নানুর বাড়িতে থেকে তারপর হোস্টেলে উঠবি, তাই তো?”
— “হ্যাঁ চাচা।”
চাচি মারিয়া মজুমদার বললেন,
— “হোস্টেলে গিয়ে নিজের যত্ন নিস।”
ছোট চাচা ইমরান মজুমদার মজা করে বললেন,
— “কেউ যদি বেশি বিরক্ত করে, ফোন দিবি।”
রাইসা ভ্রু তুলে বলল,
— “তারপর?”
— “তারপর কী করবি সেটা তুই নিজেই ঠিক করবি।”
রাইসা মুচকি হাসল।
তার এই হাসিটা দেখে সবাই জানে—
মেয়েটা যতটা শান্ত দেখায়, মাথাটা কিন্তু ততটাই চালু।
---
রাইসার মামা এবং তার পরিবার সিঙ্গাপুরে থাকেন। সেখানে তাদের নিজেদের বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে।
যাওয়ার আগে ভিডিও কলে তাদের সঙ্গেও কথা হলো।
মামা বললেন,
— “রাজশাহীতে গিয়ে আমাদের ভুলে যাস না।”
রাইসা হাসল।
— “আপনারা আগে সিঙ্গাপুর থেকে সময়মতো ফোন করবেন।”
— “ঠিক আছে।”
— “তাহলে আমিও কথা রাখব।”
সবাই হেসে উঠল।
তারপর ;
তার বড় চাচার ছেলে আয়ান,,
আয়ান কল দিছে।
বলল,, ম্যাডাম সেখানে গিয়ে সবাই কে ভুলে যাবেন না তো..?
রাইসা বলল _ না আয়ান ভাই।
---
অবশেষে গাড়ি ছাড়ল।
রাইসা জানালার পাশে বসে রইল।
ঢাকার পরিচিত রাস্তাগুলো একে একে পিছনে চলে যাচ্ছে।
বাড়িটা থেকে দূরে যেতে যেতে তার বুকের ভেতরটা একটু ভারী হয়ে উঠল।
এতদিন যে জীবনটা তার কাছে স্বাভাবিক ছিল, আজ সেটাই যেন পিছনে পড়ে যাচ্ছে।
সে ব্যাগ থেকে বই বের করল।
কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার চেষ্টা করল।
পারল না।
বই বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে বলল,
“নতুন শহর... নতুন স্কুল... নতুন মানুষ।”
তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
“দেখি, নতুন জীবনটা কেমন হয়।”
---
রাজশাহী
বিকেলের দিকে গাড়ি রাজশাহী শহরে ঢুকল।
রাইসা জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল।
হালকা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিল।
শহরটা শান্ত।
কিন্তু তার মনে অদ্ভুত একটা উত্তেজনা।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল একটি পরিচিত বাড়ির সামনে।
এটাই তার নানুর নিজের বাড়ি।
রাইসা গাড়ি থেকে নামতেই নানু ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
— “আমার পাগলী নাতনি!”
রাইসা নানুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “নানু, তোমাকে অনেকদিন পর দেখলাম!”
নানু তার কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
— “দুই দিন আমার কাছে থাকবি, তারপর হোস্টেলে চলে যাবি?”
— “হ্যাঁ।”
— “মন খারাপ করবে না?”
রাইসা হেসে বলল,
— “তোমাকে তো মাসে একবার দেখতে আসব।”
নানু বললেন,
— “দেখি, কত বড় মানুষ হয়ে গেলি!”
ভেতর থেকে নানা হেসে বললেন,
— “আগে মেয়েটাকে ভেতরে আসতে দাও।”
রাইসা হেসে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
---
সন্ধ্যার পর নানুর বাড়িটা গল্প আর হাসিতে ভরে গেল।
রাইসার পড়াশোনা নিয়ে নানা-নানু অনেক কথা বললেন।
কোন স্কুলে ভর্তি হবে, হোস্টেলে কেমন থাকবে, পড়াশোনার চাপ কেমন হবে—সবকিছু নিয়েই আলোচনা হলো।
রাতে খাবার শেষে রাইসা নিজের ঘরে এসে জানালার পাশে বসল।
ব্যাগ থেকে উপন্যাসের বইটা বের করল।
কিন্তু এবারও পড়া হলো না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
নতুন শহরের রাত।
অচেনা আকাশ।
অচেনা আগামীকাল।
রাইসা জানে না, মাত্র দুই দিন পর যখন সে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের হোস্টেলে উঠবে, তখন তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়ের শুরু হবে।
সে জানে না, সেই স্কুলে একজন ছেলে আছে—
যে সবসময় শেষ বেঞ্চে বসে।
রাইসা ধীরে ধীরে বইটা বন্ধ করল।
তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
— “দুই দিন পর... নতুন জীবন।”
বাইরে তখন রাত আরও গভীর হচ্ছে।
আর রাজশাহীর অন্য প্রান্তে, এক স্কুলের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা এক অচেনা ছেলে তখনও জানে না—
তার শান্ত, এলোমেলো জীবনটায় খুব শিগগিরই ঝড় হয়ে ঢুকতে যাচ্ছে একটা মেয়ে।
(চলবে…পর্ব_২)