ফন্ট সাইজ:
থিম:
নীল জোছনা

৫ম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#নীল_জোছনা 🦢 ৫ 🦢

#ইসরাত_জাহান_এশা

রাত নামার আগ মুহূর্তে ঢাকাকে পেছনে ফেলে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে নাহিয়ানরা। হাইওয়ের দুই পাশে ঝাপসা আলো ছড়িয়ে আছে, দূরে দূরে ট্রাকের হেডলাইট রাতের অন্ধকার চিরে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত হাতে ধরে ড্রাইভ করছে নাহিয়ান। তার চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে একরকম শান্ত স্থিরতা। পেছনের সিটে রাখা ব্যাগগুলো হালকা দুলছে গাড়ির গতির সাথে। জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে নীরা বাইরের দৃশ্য দেখছে। মাঝেমধ্যে রাস্তার পাশের ছোট চায়ের দোকান, আলোকিত পেট্রোল পাম্প কিংবা দূরের কোনো গ্রাম চোখে পড়ে যাচ্ছে। বাতাসে মিশে আছে দীর্ঘ ভ্রমণের এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

চট্টগ্রামের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ভোরেই নাহিয়ানরা পৌঁছে গেল Foy's Lake এলাকার রিসোর্টে। পাহাড় ঘেরা লেকের চারপাশে তখন হালকা কুয়াশার মতো আবছা ঠান্ডা ছড়িয়ে আছে। দূরের পানিতে রিসোর্টের আলো পড়ে চিকচিক করছে, যেন কালো জলের বুকে ছোট ছোট তারা ভাসছে।

রিসোর্টের ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগছে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বাতাস আর লেকের স্যাঁতসেঁতে শীতলতা মিলিয়ে পরিবেশটা অন্যরকম শান্ত। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর দূরে কোথাও পানির ঢেউয়ের মৃদু আওয়াজ।

রুমে ঢুকেই সায়ন আর রেহান যেন প্রাণ ফিরে পেল। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে দুজনেই জুতা ছুড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা গভীর ঘুমে ডুবে গেল। আর নাহিয়ান?

সে রুমের বড় কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এক হাত পকেটে ঢোকানো, অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। কালো রাতের মধ্যে পাহাড়ের ছায়াগুলো আরও গভীর লাগছে। কফির গরম ধোঁয়া ঠান্ডা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। নাহিয়ানের চোখে তখন অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন এই নিস্তব্ধ রাতটাই তার সবচেয়ে প্রিয়।

কফি শেষ করে সে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে এলো।

“এই… উঠবি না?” —

বলে প্রথমে রেহানের কাঁধ ঝাঁকালো।

কোনো সাড়া নেই। সায়ন তো বালিশ জড়িয়ে আরও আরামে ঘুমাচ্ছে। নাহিয়ান বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকালো। তারপর হঠাৎ করেই রেহানের পাছায় একটা লাথি বসিয়ে দিল।

“শালা! এখানে কি ঘুমানোর জন্য এসেছিস তোরা?”

লাথি খেয়ে রেহান “ওফফ!” বলে ধপাস করে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেল।

সায়ন ঘুম জড়ানো চোখে উঠে বসে কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারলো না। আর নাহিয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে, যেন পুরো ট্রিপের আসল মজা এখনই শুরু হলো।

রেহান মেঝেতে পড়ে কাতর মুখে কোমর চেপে ধরলো।

“তুই মানুষ নারে? তুই শত্রু” — দাঁত কিঁচিয়ে বলতেই নাহিয়ান হেসে সোফায় গিয়ে বসলো।

সায়ন তখনও আধো ঘুমে চোখ মেলতে মেলতে বললো,

“ভাই… পাঁচ মিনিট ঘুমাইতে দে। আমি আর পারতেছি না…”

“পাঁচ মিনিট করতে করতে সকাল শেষ করে দিবি।” — নাহিয়ান জানালার পর্দা সরিয়ে দিল এক ঝটকায়।

সাথে সাথেই ঠান্ডা বাতাস পুরো রুমে ঢুকে পড়লো। পাহাড়ের গা ঘেঁষে ধূসর কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরে লেকের পানি ভোরের আলোয় রুপালি হয়ে উঠেছে। সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের চূড়ায় পড়ে পুরো পরিবেশটাকে স্বপ্নের মতো লাগছে। নাহিয়ান সোফায় বসে তার আম্মুকে ফোন দিলো। মন্টা আনচান আনচান করছে মায়ের সাথে কথা বলার জন্য। দুইবার রিং হতেই নীরা ফোন রিসিভ করলো। নাহিয়ানের বলার আগেই নীরা বললো,

" বাজান সাবধানে যেতে পেরেছো? "

নাহিয়ান হেসে বললো,

" হুম আম্মু তোমার দোয়ায় সাবধানে এসেছি। রিসোর্টে উঠেছি ভোরের দিকে। "

" একা যাবে না কোথাও। তিনজন একসাথেই যাবে। আর কোনো সমস্য হলে ফোন দিবে কেমন। "

" আচ্ছা আম্মু। "

"রেহ্ন মেঝে থেকে উঠে নাহিয়ানের থেকে ফোন কেরে নিয়ে বললো,

" সুইটিস্ট আন্টি আপনার ছেলে দিন দিন আমার উপর অনেক অত্যাচার করে। "

নীরা হেসে বললো,

" কী করেছে আয়ার ছেলে। "

" সকাল সকা আমায় একটা লাথি দিলো। আমার কোমর শেষ। বউ আসার আগেই আমার ভাঙা কোমর নিয়ে থাকতে হবে আমার। "

নাহিয়ান ভ্রু তুলে তাকালো।

“আরেকটা লাথি খাবি নাকি?”

এই কথা শুনেই সায়ন হো হো করে হেসে উঠলো।

রুমজুড়ে তখন ক্লান্তির বদলে ধীরে ধীরে জমে উঠছে ভ্রমণের উচ্ছ্বাস। বাইরে পাহাড়ি বাতাস বইছে, আর ভেতরে তাদের হাসির শব্দে যেন নিস্তব্ধ সকালটাও প্রাণ ফিরে পেলো।

নীরার সাথে কথা বলার পর ফ্রেশ হয়ে নাস্তা শেষ করতেই তিন বন্ধুর মধ্যে আবার নতুন এনার্জি ফিরে এলো। সকালের নরম রোদ তখন পাহাড়ের গা বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে। লেকের পানিতে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে, আর ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা ঘাসের গন্ধ।

নাহিয়ানের হাতে তার প্রিয় ক্যামেরা — Canon EOS R6। কালো স্ট্র্যাপটা কাঁধে ঝুলিয়ে কখনো লেকের ছবি তুলছে, কখনো পাহাড়ের। মাঝে মাঝে ক্যামেরার স্ক্রিনে ছবিগুলো দেখে নিজের মনেই হালকা হাসছে সে। সায়ন দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো,

“ভাই, তুই মানুষ কম, ফটোগ্রাফার বেশি। আবার ল নিয়েও কতো সুন্দর পড়িস। ”

রেহান সাথে সাথে বলে উঠলো,

“এ বিয়া করতে গেলে কনের আগে ক্যামেরা নিয়াই স্টেজে উঠবো দেখিস। ওর বউয়ের সতিন হইবো ওর ক্যামেরা। ”

তাদের হাসির শব্দ মিশে গেল সকালের নরম বাতাসে।

হাঁটতে হাঁটতে তারা ধীরে ধীরে রউজান অঞ্চলের ভেতরের দিকে চলে এলো। শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের দৃশ্য যেন চোখে শান্তি এনে দিল। কাঁচা রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ হলুদ ধানের ক্ষেত বাতাসে দুলছে। দূরে ছোট ছোট টিনের ঘর, বাঁশঝাড়, আর পুকুরের ধারে কলাগাছ—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন কোনো ছবির মতো সুন্দর। নাহিয়ান থেমে গেল হঠাৎ।

তার চোখ আটকে গেল ধানের ক্ষেতের ওপর।

“এইটা পারফেক্ট শট…” — বিড়বিড় করে বলেই সে ক্যামেরা তুলে নিল।

সকালের রোদে ঝলমল করা হলুদ ধান, বাতাসে ওড়া আঁচল, দূরের কুয়াশা—সব একে একে বন্দি হতে লাগলো তার ক্যামেরায়। ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে হাসতে হাসতে আসছিলো ফারিহা আর মৌ । একজনের হাতে ভ্যানিলা আইসক্রিম, অন্যজন তার পাশে গল্পে মশগুল।

আর পরের মুহূর্তেই— নাহিয়ানের কাঁধের সাথে ধাক্কা লেগে ফারিহার হাত থেকে আইসক্রিমটা মাটিতে পড়ে গেল।

“এই মিস্টার আপনি কী কানা ?” — বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো মেয়েটা।

নাহিয়ানও একটু চমকে গেল। ক্যামেরাটা সামলে নিয়ে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো মেয়েটার রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখ। হালকা গোলাপি কামিজ পরা মেয়েটা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা হাসি চাপার চেষ্টা করছে।

" মুখ সামলিয়ে কথা বলুন ।” — শান্ত গলায় বললো নাহিয়ান।

“আমার আইসক্রিম ফেলে দিয়ে আবার আমার সাথে তর্ক করছেন ?” — মেয়েটা কোমড়ে হাত রেখে তাকালো।

রেহান পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললো,

“ নাহিয়ান কি এখন এই মেয়েটার সাথে ঝগড়া করবে।”

সায়ন রেহানের কাঁধে হাত রেখে বললো,

" মনে হচ্ছেতো তাই। "

" ইশ এখন লাইভ করতে পারলে ভালো হইতো। "

সায়ন ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।

"আপনি কোন দেশের মন্ত্রণালয়ের রাণি যে আপনার সাথে তর্ক করা যাবে না? "

" আমি আমার ভবিষ্যৎ জামাইয়ের রাণি। "

" তো আপনি আমার জামাইয়ের কোলে বসে থাকেন না। মার সাথে লাগছেন কেনো রামছাগল ? "

" আমি রামছাগল! লাইক সিরিয়াসলি! শুনুন তাহলে আমি রামছাগল হলে আপনি মহিষ, গন্ডার, কুমির হুহহহ। "

" বাচাল মেয়ে কোথাকার। "

" আসছে আমার সেল্ফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানুষ "

ফারিহা নিচে পড়ে থাকা আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে কষ্টের সুরে বললো,

“আমার পুরো আইসক্রিমটাই নষ্ট হয়ে গেলো!”

নাহিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওয়ালেট বের করলো।

“আমি আরেকটা কিনে দিচ্ছি চলুন ।”

“দরকার নেই!” — ঝট করে উত্তর দিল ফারিহা ।

মৌ এবার হেসে বললো,

“ফারিহা, এত রাগ করিস না। ভুল তো হতেই পারে।”

ফারিহা বিরক্ত চোখে তাকালো।

“মৌ, তুই চুপ থাক। এরা হচ্ছে শহরের বাদর। বেশি লাই দিলে মাথায় উঠে বসবে। এদের ভালো করেই চিনা আছে আমার। মনে হচ্ছে তো বড় লোক বাবার লাফাঙ্গা ছেলে। এই গ্রামে সবাই আমাকে চিনে কারোর সাহস নেই যে এভাবে আমায় অপমান করবে।”

নাহিয়ান ভ্রু কুচকে বুকে হাত গুজে বললো,

" শুনুন মিস বিহেভিয়ার ইউর সেল্ফ। এতক্ষণ যা যা বলেছেন সব শুনেছি। যদি বড় লোক বাবার লাফাঙ্গা ছেলে হতাম অবশ্যই আপনাকে ছেড়ে দিতাম না। তাই মুখ সামলিয়ে কথা বলবেন। আর এই বিশাল চট্রগ্রাম জেলার মধ্যে এই ক্ষুদ্র রাউজান অঞ্চল অবশ্যই আপনার না। এখানে আসার সবার অধিকার আছে। ফার্দার আমার সামনে আসবেন না। নেক্সট টাইমে এমন বিহেভিয়ার এর জন্য আমার হাত আর আপনার গাল মাইন্ডে সেটআপ করে নিন। এই নাহিয়ান চৌধুরী অতি ভদ্র না। "

নাহিয়ান ওয়ালেট থেকে ৫০০ টাকা আইসক্রিমের বাটির স্মিনে রেখে বললো,

"আই থিংক ইউ ক্যান বায় এ লট অফ আইসক্রিম উইথ দিস মানি। প্লিজ বায় সাম "

নাহিয়ান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে না। গটগট পায়ে চলে যায়। নাহিয়ানের পিছুপিছু সায়ন আর রেহান যায়। এদিকে ফারিহা হা হয়ে আছে। মৌ ফারিহার সামনে এসে কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,

" হয়েছে না এবার। সব সময় তোর বেশি কথা বলতে হবে। একদম ঠিক আছে। আমি যদি ওই ভাইয়ার যায়গায় থাকতাম তাহলে দুটো ঠাটিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিতাম। সে যে হাত না চালিয়ে মুখে বলেছে এটাই অনেক। "

ফারিহা কিছুই বলে চুপ করে থাকে। মাটি থেকে টাকা হাতে নিতে নাহিয়ানের যাওয়া পথে তাকিয়ে থাকে।

চলবে......

🌱🌱🌱 রিচেক দেওয়া হয়নি। ভুল হলে ক্ষমার চোখে দেখবেন। বইয়ের কাজ করছি তাই পর্ব ছোট হচ্ছে। আশা করি বুঝতেই পারছেন। আপনাদের তূর্য আর নীরা সাথে তাদের ছোট নাহিয়ান যে বইয়ের পাতায় আসছে। রেসপন্স দিবেন অবশ্যই। আমি অনেক আশাবাদী আপনাদের কাছে। হতাশ করাবেন না আশা করি। 🌱🌱

#foryoupageシ #fypシ゚viralシ #গল্পফ্যাট #fbpost

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন