ফন্ট সাইজ:
থিম:
নীল জোছনা

৩১তম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা

#নীল___জোছনা___৩১

#ইসরাত__জাহান__এশা

“হ্যাঁ আমি। কেনো তুমি খুশি হও নি? “

রেহান মুচকি হেসে বললো,

“ খুশি হবো না কেনো? অবশ্যই অনেক খুশি হয়েছি । “

বর্ষা এগিয়ে এসে রেহানের চেয়ারে বসে বললো,

“ আচ্ছা এই অফিস টা আমার হতে পারে না? “

রেহান ভ্রু কুচকে বললো,

“ মানে? “

“ আমি যদি এই অফিস্টা আমার বলে দাবি করি তাহলে আমায় দিয়ে দিবে না? “

রেহান বর্ষার পাশের চেয়ারে বসে বললো,

“ নিজের মনটা তো সেই কবে দিয়ে বসে আছি। এই অফিসটা আর কি। চাইলে সেটাও দিয়ে দিবো। “

বর্ষা দাড়িয়ে বললো,

“ আমায় কেমন লাগছে? “

রেহান এবার পূর্ণ দৃষ্টি দিলো বর্ষার দিকে। আকাশি রঙের শাড়ি পড়েছে চুল গুলো বেনি করেছে। ফুল স্লিভসের কলার বোন দিয়ে ব্লাউজ পড়েছে। মুখে হালকা সাজ। রেহান হাসি মুখে বললো,

“ সুন্দর লাগছে। “

“ সত্যি? “

“ হুম তিন সত্যি। “

“ তাহলে আমায় ঘুরতে নিয়ে চলো। “

রেহান অবাক হয়ে বললো,

“ আমার সাথে ঘুরতে যাবে? “

“ তো এখানে আরো অনেকে আছে নাকি? “

এই বলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো কেউ আছে কিনা। বর্ষা রেহানের কাছে এসে বললো,

“ আমি যেহেতু বলেছি আমায় নিয়ে ঘুরতে যাবে মানে ঘুরতেই যাবে। কোনো বারণ আমি বর্ষা মানছি না। “

রেহানকে আর কোনো কথা বলতে না দিয়ে বর্ষা রেহানকে টেনে রুম থেকে বের হলো। বর্ষা রেহানের বাহু ধরে করিডর দিয়ে হেটে যাচ্ছে হাসি মুখে। রেহান সেই হাসির দিকে তাকিয়ে আছে। অফিসের নিচে আসতেই বর্ষা রেহানের দিকে তাকিয়ে বললো,

“ বাইক এনেছো? “

“ হ্যাঁ। “

“ রিক্সশা ডাকো। “

রেহান কপালে ভাজ ফেলে বললো,

“ বাইক আছেই তো। আবার রিক্সশা কেনো? রিক্সাশায় চড়া অভ্যাস নেই তোমার। পড়ে যেতে পারো তুমি। “

বর্ষা রেহানের মুখোমুখি হয়ে বললো,

“ পড়ে গেলো আগলিয়ে নিও। আর তুমি আছো না কিছুই হবে না আমার। “

বর্ষা নিজেই রিক্সশা ডাকলো। গন্তব্যের কথা রিকশাওয়ালাকে বলে তারা উঠে বসলো রিকশাতে। রেহান অবাকের পর অবাক হচ্ছে। এক সপ্তাহের আগের বর্ষা আর আজকের বর্ষার মধ্যে অনেক পার্থক্য। বর্ষা রেহানের উদ্দেশ্যে বললো,

“ রেহান ভাই গান পারো? “

রেহান বাস্তবে ফিরে বললো,

“ হুম একটু আকটু পারি। “

“ আমার জন্য একটা গান গাও এখন। “

রেহান চোখ বড় বড় করে বললো,

“ এখানে গান গাইবো? “

“ হ্যাঁ গাইবে। “

রেহান এবার শুকনো ঢোক গিললো। চোখ বন্ধ করে নিজেকে প্রস্তুত করছে তার চাঁদ পরীর জন্য গান গাওয়ার জন্য। বর্ষা রেহানের কাধে মাথা রাখতেই রেহান চোখ মেলে তাকালো। বুকের হৃদযন্ত্রটা যেনো অস্থির ভাবে কম্পন হচ্ছে। আর সেটা বর্ষা খুব ভালো ভাবে টের পাচ্ছে। মুচকি হাসলো বর্ষা। রেহান গলা পরিষ্কার করে গেয়ে উঠলো ___

হতে পারে কোনো এক রাস্তায়

কোনো হুড তোলা এক রিক্সায়

আমি নীল ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে

তুমি দেখলে না

রোদে পোড়া রোমিও চেহারা

তুমি বুঝলে না আমার ইশারা

মন যদি বলে থামতে

তুমি থামলে না

তোমার জুলিয়েট হাসি হেসে

যদি ডাকতে ভালোবেসে

আমি তোমার চোখ তাকানোর

সাহস পেতাম না

আমার জর সর এই শরীরে

তোমার হাওয়া লাগছে ফুরফুরে

প্রেম নাকি পাগলামি বলতে পারবোনা

লোকে পাগল বলুক মাতাল বলুক

আমি…..

তোমার পিছু ছারবো না

লোকে পাগল বলুক মাতাল বলুক

আমি…….

তোমার পিছু ছাড়বো না।

বর্ষা মন দিয়ে রেহানের গান শুনলো। তারা এক সময় রমনা পার্কে চলে আসে। রেহান ভারা মিটিয়ে পার্কের ভিতরে আসে। মানুষে গমগম পরিবেশ। পা ফেলার জায়গায় নেই এক ফোটাও। রেহান বর্ষাকে আগলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যাতে কোনো লোকের ঢাকা না লাগে। বর্ষা মুগ্ধ দৃষ্টিতে রেহানের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন চোখের পলক ফেলতেও ভয় হচ্ছে—পাছে এই মুহূর্তটুকু হারিয়ে যায়। বুকের ভেতর নিঃশব্দে একটি প্রশ্ন বারবার উঁকি দিল—সে কি এতদিন তবে জোনাকির পেছনেই ছুটে বেড়িয়েছে? যে আলো দূর থেকে অপার্থিব সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে, অথচ হাত বাড়ালেই মিলিয়ে যায় অন্ধকারের গভীরে। আর আজ, সেই ক্ষণস্থায়ী আলোর মোহ ভেঙে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক শান্ত, স্থির, নির্ভরতার মানুষ

••••••••

শীতের বিকেলে রমনা পার্ক যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত জলরঙের ছবি। সারি সারি প্রাচীন রেইনট্রি, কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ আর অশ্বত্থগাছ তাদের বিস্তৃত ডালপালা মেলে নরম রোদকে ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঘাসের ডগায় এখনো শিশিরের কোমল স্পর্শ রয়ে গেছে। উত্তরের হিমেল বাতাস গাছের পাতায় মৃদু শব্দ তুলে বয়ে যাচ্ছে, আর সেই বাতাসে শুকনো পাতাগুলো ধীরে ধীরে লাল ইটের হাঁটার পথে ঝরে পড়ছে। দূরের লেকের জল শান্ত, আয়নার মতো স্থির। সূর্যের সোনালি আলো জলের বুকে পড়ে চিকচিক করছে। চারপাশে হাঁটতে আসা মানুষের কোলাহল থাকলেও প্রকৃতির নিজস্ব নীরবতা সবকিছুকে ছাপিয়ে এক প্রশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কোথাও শিশুর হাসি, কোথাও জোড়া জোড়া মানুষের ধীর পায়ে হাঁটা, আবার কোথাও বেঞ্চে বসে কেউ শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে আপন মনে সময় কাটাচ্ছে।

••••

রেহান ধীর পায়ে হেঁটে বর্ষাকে নিয়ে নদীর কিনারে এসে বসল। বিকেলের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে গাঢ় কমলা রঙ মেখে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা নদীর স্বচ্ছ জলের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন অসংখ্য গলিত সোনার কণা ভেসে বেড়াচ্ছে ঢেউয়ের পর ঢেউয়ে।

বর্ষা শাড়ির আঁচল সামলে নদীর জলে আলতো করে দুটি পা ডুবিয়ে বসে রইল। শীতল স্রোত তার পায়ের পাতায় মৃদু স্পর্শ বুলিয়ে চলে যাচ্ছে। বাতাসে নদীর সোঁদা গন্ধ, দূরে ভেসে চলা নৌকার বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ আর ঘরে ফেরা পাখিদের ডানার মৃদু ঝাপটা—সব মিলিয়ে চারপাশ যেন এক অপার্থিব শান্তিতে ডুবে আছে।

রেহান একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল বর্ষার দিকে। অস্তরাগের রক্তিম আলো তার মুখশ্রীকে আরও কোমল করে তুলেছে। হালকা বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া কেশরাশি বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে, আর বর্ষা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তা কানের পেছনে সরিয়ে নিচ্ছে। সেই সামান্য দৃশ্যটুকুও রেহানের কাছে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত।

তার চোখে বর্ষা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়—সে যেন রূপকথা থেকে নেমে আসা এক চাঁদপরী। নদীর জলে ভেসে ওঠা সূর্যের শেষ আলো আর বর্ষার মুখের মায়াবী হাসি একসঙ্গে মিলেমিশে এমন এক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে, যা হয়তো সময়ের স্রোতও কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। মুহূর্তটি নীরব ছিল, অথচ সেই নীরবতার মাঝেই দুজনের হৃদয় যেন হাজারো না-বলা অনুভূতির ভাষায় কথা বলে চলেছিল।

বর্ষা রেহানের উদ্দেশ্যে বললো,

“ রেহান ভাই একটা সত্য কথা বলবে? “

“ হুম বলো কী কথা? “

বর্ষা রেহানের চোখে চোখ রেখে বললো,

“ আমাকে তোমার জীবনের সাথে জরাতে সত্যি কোনো আপত্তি নেই? আমাকে সারাজীবন ভালোবাসতে পারবা? আদর, যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে আগলিয়ে রাখতে পারবা। অবহেলা করবে নাতো আমায়? “

রেহান এগিয়ে এসে বর্ষার হাতে হাত রেখে বললো,

“ কথা দিচ্ছি কখনো অবহেলা করে দূরে সরিয়ে দিবো না। সারাজীবন তোমাকে আমার বক্ষ-পাঁজরে আগলে রাখব। আমার ছোট্ট বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে থাকবে আমার বুকের মাঝে। তোমার শীতল দিনগুলোর উষ্ণতার চাদর হব আমি, ক্লান্ত বিকেলগুলোর নীরব আশ্রয় হব। তোমার সব দুঃখ নিজের বুকে লুকিয়ে রাখব, আর তোমার প্রতিটি হাসিকে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ করে রাখব।

যখন পৃথিবী তোমাকে ক্লান্ত করে দেবে, তখন আমার বুকে মাথা রেখো। আমার হৃদস্পন্দনের শব্দেই খুঁজে নিও শান্তি। তোমার প্রতিটি ভয় আমি আলতো করে সরিয়ে দেব, প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আমার ভালোবাসায় শুকিয়ে দেব। তোমার হাতটা শক্ত করে ধরে জীবনের শেষ বিকেল পর্যন্ত পাশাপাশি হাঁটতে চাই।

তুমি হবে আমার হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানা, আর আমি হব তোমার নির্ভরতার নীরব আকাশ। যতদিন শ্বাস চলবে, ততদিন তোমাকে ভালোবাসার মায়ায় জড়িয়ে রাখব—একটুও দূরে যেতে দেব না। “

বর্ষা ছলছল নয়নে তাকিয়ে সব কথাই শুনলো। শেষ মুহূর্তে ফুপিয়ে কেদে উঠলো। রেহান মুচকি হেসে বর্ষার মুখ তার হাতের আজলায় নিয়ে বললো,

“ এই চাঁদ পরী কাদছো কেনো? “

বর্ষা ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো,

“ একবার জড়িয়ে ধরবে রেহান ভাই। জানি এটা হারাম তাও একবার জড়িয়ে ধরো না। তু… “

বর্ষার কথা শেষ হওয়ার আগেই রেহান বর্ষাকে জড়িয়ে ধরলো। বর্ষাও রেহানের কোমড় জড়িয়ে ধরলো। রেহান বর্ষার চুলে মুখ গুজে রেখেছে। বর্ষা রেহানের বুকে মুখ গুজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো,

“ জানো রেহান ভাই সেদিনের রাত থেকে আমি একদন্ত শান্তিতে ঘুমোতে পারি নাই। সারা রাত অস্থির লেগেছে এই পাশ থেকে ওই পাশ তাও ঘুমাতে পারি নাই। তোমার কথা গুলো শুধু মনে হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি আমার এই আবেগের জন্য আমার মূল্যবান জিনিসটা হারিয়ে ফেলছি নাতো! “

বর্ষা এই পর্যায় রেহানের বুক থেকে মুখ তুলে বললো,

“ সারাজীবন ভালোবাসবেতো আমায়। ভালোবাসা নিয়ে কোনো কিপ্টামি করবে না কেমন। যদি কিপ্টামি করো তাহলে আমি নর্দমায় ফেলে দিবো বলে দিলাম। “

রেহানের চোখেও আজ পানি। বর্ষার নাক টেনে হাসি মুখে বললো,

“ সারাজীবন ভালোবাসবো আমি কথা দিলাম। “

চলবে……..

#বিঃদ্রঃ আজকে শুধু রেহান আর তার চাঁদ পরীকে লিখেছি। জানিনা কতটা মাধুর্যযুক্ত ভাবে লিখতে পেরেছি। ভালো লাগলে অবশ্যই জানাবেন। আল্লাহ হাফেজ 💖

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন