#প্রণয়ের_ঘ্রাণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্ব_২১
আজকে সকাল থেকেই "আলোককুঞ্জ" বাড়িতে ছুটাছুটি লেগে আছে। একপ্রকার হুলস্থূল কাণ্ড।
এর পিছনের কারণ হচ্ছে গতকাল প্রভার নানু বাসা দিয়ে প্রভার মামা ফোন দিয়েছিলো প্রভাদের বাসার সকলকে নেমন্তন্ন করতে।প্রভার মামাতো বোনের বিয়ে তাই।
বাড়ির সবাই যাবে। প্রথমে ঠিক হয়েছিলো তারা সকালবেলায় গাড়ি করে যাবে কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত হয় লঞ্চে করে যাবে সকলে।
প্রভার নানুবাড়ি বরিশালে। আর বরিশালে যাবে লঞ্চ দিয়ে না গেলে মজা আছে নাকি? তাই রুদ্ধ আর তনয়া টিম বানিয়ে সবাইকে রাজি করিয়েছে।
প্রভারা নানুবাড়ি যায়না বললেই চলে। তাইতো প্রভা প্রথমে রাজিই হয়নি। ওর নানুবাড়ির কাজিনদের সাথে ওতো ভাব নেই বা কথাও হয়না।
এখন এরকম জায়গা আর যাদের সাথে কথা হয়না বললেই চলে তাদের সাথে মিশতে কিছুটা আনইজি তো লাগবেই।
এ কারণে প্রভা যাবে না বলেছিলো। কিন্তু রুদ্ধ আর ওর মা মহোদয়া এমন একটা ভঙ ধরলো শেষে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে রাজি করিয়েছে।
এদিকে আভা প্রভার ও এক কাঠি উপরে। সে যাবে না তো যাবেই না।
অজুহাত হিসেবে পড়ালেখা করে এতদিন থাকতে পারবে না বলে জানালে মাতা মহশয়া এমন ধমক দেন বেচারি একদম চুপসে যায়।
বর্তমানে প্রভা বোনের ঘরেই অবস্থান করছেন তাদের প্রিয় মায়ের সাথে। যে তার বিশ্ব বিখ্যাত ভাষণ গুলো ঝাড়ছেন।
--- উফ মা বললাম তো যাবো না।
--- তোর মত কে চাইছে? আমি বলেছি ব্যাগ গুছিয়ে নিতে তুই নিবি।
--- আমার পড়াশুনা।
--- দুই একদিন না করলে কিছু হবে না।
--- ক্লাস মিস যাবে।
--- যাক।
--- আরে বাবা আমার কথাটা তো বোঝার চেষ্টা করো।
--- আমি কিছু বুঝতেও চাই না আর শুনতেও চাই না। মানুষের ছেলে মেয়েগুলো পড়তে বসতেই চায় না আর আমি এই মেয়েটাকে উঠাতেই পারিনা। এতো পড়লে মাথাটা যাবে।
এরকম চেঁচাতে চেঁচাতে রুম থেকে বের হয়ে যান এলিনা।
এতক্ষণ যাবৎ মা বোনের ঝগড়া দেখছিলো প্রভা বিছনায় বসে। আর আভা বরাবরের মতো টেবিলে বসে আছে।
শরীরের আলসেমি ভেঙে উঠে দাড়ায় প্রভা। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলে,
--- বেস্ট অফ লাক। জলদি ব্যাগ গুছিয়ে নে।
--- আপাই তুইও?
--- হ্যাঁ আমিও।
--- কিন্তু তুই তো জানিস আমি মানুষের সাথে মিশতে পারিনা।
--- আমি আছিনা চিন্তা নেই।
ফোস করে দম নিয়ে আভা জানায়,
--- ঠিক আছে।
*****************
নিজের রুমে বসে ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিল প্রভা। হঠাৎ কাপড় ভাঁজ করতে থাকা হাতটা থামিয়ে দেয়। একটু জোরেই বলে উঠে,
--- বাইরে এমন ঘুর ঘুর করে উঁকি ঝুঁকি না দিয়ে যা বলতে চাস রুমে এসে বলে যা।
অবাক হলেও সেসব পাত্তা না দিয়ে হনহন করে রুমে প্রবেশ করে রুদ্ধ।
ভিতরে ঢুকেই ধপ করে বেডে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। কাত হয়ে এক মাথার নিচে দিয়ে আধশোয়া হয় সঙ্গে সঙ্গে।
প্রভার দিকে তাকিয়ে বলে,
--- তুরাজ ভাইদের কেনো বলেছিস প্রভাত?
--- আশ্চর্য তুই তোর বন্ধুদের বলেছিস আমি বললেই দোষ কোথায়?
--- দোষ নেই তো।
--- তাহলে কানের কাছে এসে ঘ্যান ঘ্যান করেছিস কেনো।
ঠাস উঠে বসে রুদ্ধ। উদগ্রীব হয়ে শুধায়,
--- আরে বাবা তুইও তোর বন্ধুদের বলতেই পারিস কিন্তু তুরাজ ভাইকে কেনো বললি?
ভাঁজ পড়লো প্রভার কপালে। বলল,
--- মাথা গেছে তোর? বাকিরা আসবে তাহলে তুরাজ কি করলো। তাছাড়া ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ওকে কিভাবে বাদ দিবো আমি!
--- ব আকারে ল বা*ল ফ্রেন্ড আমার।
তারপর যেভাবে এসেছিলো ঠিক সেভাবে কিন্তু ধুপধাপ পা ফেলে চলে যায় রুদ্ধ।
ওর এমন অদ্ভুদ আচরণে কিছুক্ষণ চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বুঝতেই হেসে দেয় প্রভা।
অস্ফুটে আওড়ালো,
--- পাগল একটা!
*****************
নিজের রুমে এসে চুল টেনে ডিভানে বসে পড়ে রুদ্ধ। জেদের সাথে নিজেই নিজেকে বলে,
--- এই প্রভাত ও না কিছুই বুঝে না। বলদের মতো ওইটাকেও নিচ্ছে আমাদের সাথে। ধুর কিছু ভালো লাগে না।
তারপর আবার হুট করে উঠে দাড়ায়। ব্যাগ পত্র তো গুছাতে হবে নাকি?
কাভার্ড খুলে দাড়িয়ে রয়। কিছুই মাথায় আসছে না।
--- আরে এতো চিন্তার কি আছে প্রভাত আছে না।
মনে মনে ভেবেই গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকে ,
--- প্রভাততত!! প্রভাত!
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে প্রভা। রুদ্ধের রুমের দরজার সামনে দাড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে,
--- কি হয়েছে কি? এভাবে ভেড়ার মতো চেঁচাচ্ছিস কেনো?
ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আঙুলের ইশারায় রুমে ডাকে রুদ্ধ। তারপর ডিভানে আরাম করে বসে আদেশ ছুঁড়ে,
--- আমার ব্যাগ টা গুছিয়ে নে তো প্রভাত।
থম মেরে দাড়িয়ে রয় প্রভা। মানে এই ছেলে এভাবে ওকে ডেকেছে শুধুমাত্র ওর ব্যাগ গুছিয়ে দেয়ার জন্য!
******************
কপালে বৃদ্ধাআঙ্গুল ধারা ঘষছে রুদ্ধ। দৃষ্টি তার সামনের দিকে তুরাজের হাস্যোজ্জ্বল মুখটার পানে।
তুরাজ যে কিনা তার বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলছে।
৯.০০ টায় লঞ্চ ছাড়বে। কেবিন বুক করাই আগে থেকে। তবুও আগে গিয়ে রিলাক্স হওয়ার জন্য বিকালেই বের হচ্ছে সবাই।
এখান থেকে নিজেদের গাড়ি করে লঞ্চঘাট পর্যন্ত যাবে সবাই। তারপর লঞ্চঘাটের ধারে আদ্রিক রায়ানের বন্ধুর বাসায় গাড়ি গুলো রাখা হবে।
কথা সেটা না কথা হচ্ছে তুরাজ বাইক এনেছে। নিশ্চিত বেটা প্রভাকে নিজের বাইকে বসানোর ধান্দায় আছে।
এদিকে রুদ্ধের বাইকটাও খারাপ হয়ে গেছে। সেই নিয়ে রুদ্ধ পারছে না কিছু করতে আর না কিছু সহ্য করতে।
তার মেজাজ এখানেই খারাপ সবচেয়ে বেশি কেনো বাইকটা এখনই খারাপ হবে?
তার ভাবনার মাঝেই প্রভা আসে। প্রভাকে দেখতেই মাথা ঝাড়া দিয়ে সব ভাবনা ফেলে দেয় রুদ্ধ।
প্রভার হাত চেপে ধরে। হাতে টান পড়তেই থেমে যেতে হয় প্রভাকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রুদ্ধের দিকে তাকালেই রুদ্ধ ভনিতা না করে বলে দেয়,
--- সোজা গাড়িতে গিয়ে উঠবি ডানে বায়ে কোনদিক তাকাবি না।
--- কিন্তু কেনো?
এবারে ধমকে উঠে রুদ্ধ,
--- যেটা বলেছি সেটাই করবি প্রভাত।
তারপর হাত ছেড়ে দিয়ে প্রভাকে যেতে ইশারা দেয়। প্রভাও আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায়।
*****************
প্রভাকে গাড়িতে উঠতে দেখে বাইকে বসা তুরাজ যেইনা ডাকতে যাবে ওমনি ওর কাধে চাপড় মেরে রুদ্ধ বলে,
--- কি ব্যাপার তুরাজ ভাই বাইক স্টার্ট দিন।
রুদ্ধের গলা পেতেই হকচকিয়ে যায় তুরাজ। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
--- একি তুমি এখানে কি করছো রুদ্ধ?
--- ওমা কি করছি কি? আমি আপনার সাথে যাবো তাই এখানে। এখন কথা না বলে তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দিনতো।
--- কিন্তু....
--- আহা কোনো কিন্তু নয় আপনি দিনতো।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ি স্টার্ট দেয় তুরাজ। মনে মনে ভাবে,
--- বউ ও জামাইর সাথে এতো সময় থাকে না যতক্ষণ এই ঝামেলা আমার সাথে থাকে।২৪ ঘন্টাই এটায় আমার সাথে চিপকে থাকে। সুপারগ্লুও তো বোধহয় এতো ভালো কাজ করে না।
এদিকে রুদ্ধ মনে মনে শয়তানি হেসে বলে,
--- উহুম বাছাধন এতো সহজে তো আমি তোমার পিছ ছাড়বো না। এ জন্মে তো নয়ই।
গাড়ির মধ্যে দিয়ে ওদের দুজনকে এক সাথে দেখে তনয়া বলে উঠে,
--- প্রভাপু, আভাপু এই রুদ্ধ ভাই আর তুরাজ ভাই সারাদিন এমন একসাথে থাকে কেনো?
--- বোধহয় একজন আরেকজনকে ছাড়া চলতে পারে না তাই।
আভার কথা শুনেও প্রভা কিছু বলে না। বরং চোখ বন্ধ করে সিটে মাথা এলিয়ে দেয়। আর মিটিমিটি হাসতে থাকে।
বিড়বিড় করে বলে,
--- দুই সতীন! উপস সতান।
হঠাৎ চোখ খুলে ফেলে ভাবতে আরম্ভ করে,
--- মেয়েদের তো সতীন বলে ছেলেদের কি বলে? সতান? ধুর না।
মাথায় যুৎসই কোনো উত্তর না পেলে চিন্তাই ছেড়ে দেয় প্রভা।
চলবে.....
[এটায় রিয়েক্ট ২০৫ করে দিয়েন পাঠকগণ। ধন্যবাদ।]