#প্রণয়ের_ঘ্রাণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্ব_২৪
আজকে গায়েহলুদ। প্রভারা এতোটা পথ জার্নি করে আসায় ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাই সবাই রেস্ট নিচ্ছে।
এলিনারা এক ভাই এক বোন। প্রভার নানা নানু কেউই বেঁচে নেই।
এলিনার ভাইয়ের নাম এলিন। এলিনের স্ত্রী প্রাপ্তি এবং তাঁদের একমাত্র মেয়ে প্রণিতা। কিছু জটিলতার কারণে আর কোনো ছেলেমেয়ে নেই।
মেয়ে বড্ড আদরের। কোনো ইচ্ছেই তারা ফেলে দেয় না। উল্টো মেয়ের পছন্দকে সমর্থন করে তার মনের মানুষের সাথেই তাকে বিয়ে দিচ্ছেন।
প্রণিতা সবে ভার্সিটি উঠেছে। দুই বছর প্রেমের পর এখন মনের মানুষকে বিয়ে করছে। বেজায় খুশি সে।
প্রভাদের আর কোনো আত্মীয় কিংবা কাজিন নেই। প্রাপ্তির নানু বাড়িরও না। প্রণিতার মাও এক মেয়েই ছিলেন।
প্রণিতার নানা নানু বাদে তাই আর কোনো লোক নেই। পারাপর্শীরাই মাতিয়ে আছে বাড়িটা।
******************
রান্নাঘরে বসে পাশের বাসার কিছু চাচী, খালারা বাটাবাটি করছেন। হলুদ, মেহেদী পাতা এসব বাটছেন।
আর কানাঘুষা করছেন। কার বিয়ে কেমন ছিলো, জামাই দেখতে কেমন, কী কী দিয়েছে এসব ইত্যাদি ইত্যাদি কথা।
চুলোতে চা করতে করতে শুধু হুম, হা করছেন প্রাপ্তি। আসলে তিনি খুব নরম গোছের মানুষ। যে যা বলবে তাইই শুনবে।
পাশেই বটিতে তরকারি কাটছেন এলিনা। জায়েদের রেস্ট করতে পাঠিয়ে তিনি ভাবির কাজে সাহায্য করতে বসেছেন।
নাহয় রুহানি আর রিয়ানাও বলেছিলো কাজ করবে। সেইই জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে।
ব্যাপারটা কেমন দেখাবে না যদি তারা কাজ করে তাই।
এ এলাকায় এলিনাদের বাড়িটাই বড় আর নাম দামের বাড়ি। পাশে কলোনির মতো আরো অনেক বাড়িই আছে।
এসবের মাঝেই রান্নাঘরে এসে উপস্থিত হয় প্রভা। প্রভাকে দেখতেই তার মামি প্রাপ্তি তাকে বলে,
--- এই তো দাড়া চা ঢেলে দিচ্ছি।
প্রভাকে উদ্দেশ্য করে সেখানে উপস্থিত এক মহিলা জিজ্ঞেস করে,
--- কিলো এলি এইডা না তোর বড় মাইয়াডা?
এলিনা হেসে মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই মহিলাটা তার মুখের এক্সপ্রেশন কেমন যেনো করে উঠে। বলে,
--- ওহহ! মাইয়া তো দেহন যায় মেলা বড় হইছে।
তখনই পাশ থেকে আরেকজন ফোড়ন কাটে,
--- তা মাইয়ারে বিয়া দিবি না এলি? বড় বইন হইয়া ছোট বইনের বিয়া খাওয়া কি কম শরমের।
পাটাতে বাটতে থাকা মহিলাটা এবার বলে উঠে,
--- কিলো ছেমরি তোর আবার কোনো সমস্যা টমস্যা আছেনি?
প্রভার কিছু বলার আগেই এলিনা জবাব দেয়,
--- আরে কাকি না না সেরকম কিছুই না। বাপ চায় মেয়ে পড়াশুনা করুক।
মহিলাটা নিজের মুখ মোচড় দিয়ে বলে,
--- থো হালাইয়া মাইয়া মানুষ এতো পইড়া হইবো কি। আমি কই হোন জৌলুস থাকতে থাকতেই মাইয়া বিয়া দে।
এলিনা ঝামেলায় জড়াতে চাইছে না। তাই হেসে বলে,
--- জি জি।
তারপর নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
--- প্রভা চা নিয়ে যাও।
প্রভাও এরকমই একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাড়াতাড়ি চা, বিস্কুট, মুড়ি নিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।
যাওয়ার সময় হঠাৎ থেকে গেলো সে। রান্নাঘরে সামনে পিলারের সাথে হেলান দিয়ে বুকে দুই হাত গুঁজে দাড়িয়ে আছে রুদ্ধ।
রুদ্ধের শক্ত মুখায়ব দেখেই ঘাবড়ে গেলো প্রভা। কিছু বলতে নিষেধ করলে প্রভাকে ঠান্ডা গলায় বলে,
--- তুই উপরে যা প্রভাত।
অগত্যা প্রভাকেও চলে যেতে হয়।
*******************
মুখে শয়তানি এক হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে রুদ্ধ।
সবাইর মনোযোগ আকর্ষণ করতে বলে,
--- আসসালামু আলাইকুম আন্টিসগণ।
সবাই তার দিকে তাকালে সে নিজের চকচকে দাঁত গুলো দেখিয়ে বলে,
--- মেয়ের বয়স দেখলেন ছেলের বয়স দেখলেন না? আমারো তো বয়স হয়েছে। বলতে গেলে বিয়ে করার মতো পারফেক্ট বয়স। তাহলে শুধু প্রভার টা দেখলেই হবে?
ওর কথায় একজন পরিচয় জানতে চাইলে প্রাপ্তি বলল,
--- ও রুদ্ধ। এলিনা আপার মেজো জায়ের ছেলে।
প্রাপ্তির কথা শেষ হতেই একজন তার কথা শুরু করে,
--- ছেলে মানুষের আবার বয়স ধরতে আছেনি?
--- কেনো নেই? আমি তো এসব কথা শুনবো না।মেয়ের বিয়ে দিবেন ছেলে রাজি তাড়াতাড়ি এখন আয়োজন শুরু করুন। বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়ি যাবো।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবাই থম মেরে বসে। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
তাই পরিস্থিতি সাবধান করতে এলিনা বলে উঠে,
--- আরে ও মজা করছে।
সবাই মজায় উড়িয়ে নিলেও পিছনে দাড়ানো রুহানি ব্যাপারটা মজায় উড়াতে পারলেন না।
তার চিন্তা বেড়ে গেলো। ছুটলেন স্বামীর নিকট। এর বিহিত না করলে কিছু একটা ঘটে যাবে।
*****************
মেয়ে সবাই গোল হয়ে প্রনিতার বিছনায় বসে আছে। সকলের উদ্দেশ্য প্রথম কথা প্রনিতার বান্ধবী স্রোত রাখে,
--- আচ্ছা তাহলে কোন কালারের শাড়ি পড়া হবে?
--- আমি বলি?
তনয়ার উচ্ছসিত কন্ঠে বলে উঠে।প্রনিতা তার কথায় সায় জানালে সে তার মতামত দেয়,
--- লাল পাড়ের বাসন্তী রঙের শাড়ি সাথে লাল ব্লাউজ কেমন হবে?
--- দারুণ হবে।
তনয়ার কথার জবাবে তৃধা বলে উঠে। তার কথায় বাকি সবাইও সম্মতি প্রকাশ করে।
এরই মাঝে স্নিগ্ধা বলে,
--- এবার আমার কিছু কথা আছে।
--- কি?
স্রোত জানতে চাইলে স্নিগ্ধা বলে,
--- আমরা সবাই গ্রাম্য স্টাইলে শাড়ি পড়বো।
--- আইডিয়া খারাপ না।
তাদের কথার মাঝে ফোড়ন কাটে তৃধা,
--- যেহেতু ঠিক হয়েই গেছে তাই আমাদের উচিত তাড়াতাড়ি মার্কেটে যাওয়া। কিনতে সময় লাগবে সাথে সাজগোজের ব্যাপার।
সবাই সম্মতি প্রকাশ করে। তখনই প্রনিতা বলে উঠে,
--- আমরা সবাই কথা বলছি প্রভা আপু আর আভা তোমরা কিছু বলছো না কেনো?
--- তোমরা ঠিক করো আমি আসলে এগুলো কিছু বুঝি না তো।
--- এটা কেমন কথা আভা। এরকম বললে তো হবে না।
স্রোতের কথায় এবার প্রভা বলে,
--- ওকে কিছু জিজ্ঞেস করো না স্রোত। ও এমনই। এখানে এত সময় আছে এই অনেক। মিশতে পারে না।
--- কেনো পারবে না। সবাইর সাথেই কথা বলতে হবে।
--- ছাড় না স্নিগ্ধা। তোমরা কিছু মনে না করলে আমি কিছু বলতে পারি।
--- হ্যাঁ বলো।
তনয়া জবাব দিলে বাকিরাও বলতে বলে,
--- আমরা অর্নামেন্টস হিসেবে তাজা গাধা ফুল, গোলাপ আর বেলি ইউজ করতে পারি।
প্রভার কথা শুনে তৃধাও বলে,
--- এটা আমিও ভেবেছিলাম।
--- তাহলে তো হয়েই গেলো। সব যেহেতু ঠিক তখন আমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না।
স্রোতের কথায় স্নিগ্ধা বলে,
--- আচ্ছা আমাদের তো হলো এখন ছেলে পার্টির কী খবর? ওদের তো যেতে হবে নাকি।
--- কেউ একজন খোজ নিয়ে আসো ওদের কতদূর।
প্রনিতার কথার পিঠে আভা তনয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,
--- তনু তুই গিয়ে দেখে আয় তো।
তনয়া চলে গেলে স্রোত প্রনিতাকে জিজ্ঞেস করে,
--- মেকআপ আর্টিস্ট আসবে? নাকি আমরাই তোকে সাজাবো।
প্রনিতা উত্তর দেয়,
--- ও বাড়ির থেকে শুধু বিয়ের জন্য মেকআপ আর্টিস্ট ঠিক করেছে। গায়ে হলুদে কিছু বলেনি।
--- তাহলে আমরাই সাজাবো আমাদের ব্রাইডকে। স্নিগ্ধা বলে।
--- আচ্ছা এখন মেইন কথায় আসা যাক।
তৃধার কথায় স্রোত জিজ্ঞেস করে,
--- মেইন কথা কি আবার?
--- ছেলেদের সাথে তো দুজন মেয়েকেও জেতে হবে। ওরা তো সব ঠিক করে আনতে পারবে না।
সব শুনে প্রনিতা বলল,
--- আমি বলিকি প্রভা আপু যাক। সাথে আর একজন কেউ।
তখনই রুমে ডুকতে ডুকতে তনয়া চিল্লিয়ে উঠে,
--- আমি যাবো। আমি যাবো।
ধমক দিয়ে উঠলো আভা,
--- তনু হচ্ছে টাকি ওখানে তোমার গিয়ে কোনো কাজ নেই।
--- না আমি যাবো। ও প্রভাপু আমাকেও নেও।
--- আচ্ছা থাক ও যাবে আনে।
তনয়া খুশি হলেও স্নিগ্ধা বলে,
--- প্রভা ও ছোট কিছু বুঝবে না।
--- সমস্যা নেই। আরেকজন কাউকে নিয়ে গেলেই হবে।। আজকের দিনে ওর মন খারাপ হোক আমি চাইনা।
প্রভার সাথে একমত পোষণ করে প্রনিতা। সে বলে,
--- থাক তনয়া যাক। সাথে স্রোত তুইও যা। ওদের গাইড করতে পারবি। আর প্রভা আপু তো আছেই।
--- হ্যাঁ তাই ঠিক। তৃধা বলে।
*********************
যখনই শুনলো প্রভা যাবে তখনই মার্কেটে যেতে এক পায়ে খাড়া রুদ্ধ।
যাকে এতক্ষণ ধরেও রাজি করানো যাচ্ছিল না। অবশেষে ছেলেদের থেকে রুদ্ধ, স্নিগ্ধ যাবে।
বর্ণ তার গার্লফ্রেন্ডকে ছাড়া নড়তে নারাজ। ধ্রুব অজুহাত হিসেবে দেখিয়েছে সে এদিকের ডেকোরেশনের কাজ দেখবে।
আর তুরাজ সে বান্দার কোনো খবর নেই। সেই যে ঘুম দিয়েছে।
মিটিং করার টাইমে জাগাতে গেলে জানিয়েছে তার কোনো নিজস্ব মতামত নেই। সবাইর পছন্দই তার পছন্দ।
বাইক ঢাকায় রেখে আসায় এখন আফসোস করছে রুদ্ধ। বাইক থাকলে এখন সে তার প্রভাতকে বাইক ভ্রমণ করতে পারতো।
যাকগে কি আর করার। তারা অটো নিয়েছে। পিছনের ব্যাকসিটে প্রভা, তনয়া, স্রোত বসেছে।
আর তাঁদের মুখোমুখি হয়ে রুদ্ধ, স্নিগ্ধ বসেছে। দুজনের শরীর স্বাস্থ্য ভালো হওয়ায় বসতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে।
তার উপর অটো ভ্রমণ রুদ্ধ, স্নিগ্ধ আর তনয়ার জন্য একদম নতুন। ভয় ও পাচ্ছে।
তনয়াকে প্রভা আর স্রোতের মাঝখানে বসানোতে বেশি অসুবিধা না হলেও বাকি দুজনের এভাবে বেকায়দা দেখে না চাইতেও হেসে ফেলছে প্রভা, স্রোত।
প্রভার হাসি দেখে রুদ্ধ ওর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। যার অর্থ " প্রভাত তুইও? তুইও হাসছিস এভাবে!"
___________
চলবে~
"ইরফা মাহনাজ"
[রিচেক দেইনি। রিয়েক্ট ২০০+ চাই। আর কমেন্ট করবেন এতে করে ফিডে যাবে।]