#প্রণয়ের_ঘ্রাণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্ব_২৬
❌ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌
*
*
*
বিয়ে খেয়ে "আলোককুঞ্জ" বাড়ির সকলে ফিরেছে আজ তিনদিন হলো।
এরই মাঝে সেদিনের রুদ্ধের করা প্রভার জন্য প্রতিবাদ দেখে রুহানি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেনি।
রুদ্রকে বলেন। পরে আলোচনা করে ঠিক করা হয় প্রভার বিয়েটা আগে দেয়া হবে। তারপর আভা আর রুদ্ধের।
ঘরোয়া ভাবেই প্রভার বিয়েটা সেরে ফেলা হবে এই কথাই ঠিক হয়। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা অবগত হলেও এই ব্যাপারে ঘুণাক্ষরেও জানেনা বাড়ির ক্ষুদে সদস্যরা।
রুহানি বহুত কষ্ট করে রুদ্ধকে বাসার বাহিরে পাঠিয়েছে। এই ছেলেটা যেতেই চায় না। কীভাবে যে পাঠিয়েছে সেটা কেবল সেইই জানে।
কারণ রুদ্ধ থাকলে জীবনেও প্রভার বিয়ে দেওয়া যেতো না। প্রভা মেয়ে হিসেবে ভালো হলেও একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে বয়সে বড় মেয়েকে রুহানি চায়না।
এসবে তার মন সায় দেয়না। সমাজের তো ব্যাপার আছে। লোকসমাজে কী বলবে। ধূর এতো চিন্তা নেওয়া যায় না।
রুদ্ধকে পাঠিয়ে রুহানি এসেছে এলিনার ঘরে। দরজায় নক করে ভিতরে প্রবেশ করে।
--- আপা প্রভাকে তো সাজাতে হবে।
আলমারি থেকে একটা লাল খয়েরী কাতানের শাড়ি বের করতে করতে এলিনা জবাব দেয়,
--- এই তো শাড়ি বের করছি।
তারপর আবারো বলে,
--- ছোট কোথায় ওকে ডাক। আর আভা, তনু ওদেরও।
--- ওদের জানানো কি ঠিক হবে?
--- একটু পর তো এমনিও জেনে যাবে। এখন জানলে আরো সুবিধা। সাজাতে সাথে আয়েলিনকে সাহস যোগাবে।
--- আচ্ছা।
কথা শেষ করে রুম থেকে বের হতে নিলেই রুমে প্রবেশ করে রিয়ানা। রিয়ানাকে দেখেই রুহানি বলে,
--- ভালোই হয়েছে তুই এসেছিস। আপা তোকে ডেকেছিলো।
--- আচ্ছা। তুমি যাচ্ছ কোথায়?
--- আভা আর তনয়াকে বলতে।
--- ওহ!
রিয়ানার মুখটা পানসে লাগে। কেনো জানি তাকে দেখে মনে হয়ে যা হচ্ছে তাতে তার মত নেই।
রুহানি চলে যেতেই রিয়ানা রুমের ভিতরে যায়। গিয়ে এলিনাকে জিজ্ঞেস করে,
--- বুবু যা হচ্ছে তা কি ঠিক?
বুঝলেও অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করে,
--- কিসের কথা বলছিস তুই ছোট?
--- এই যে বিয়ের ব্যাপারটা।
--- ওহ। মেয়ে বড় হয়েছে বিয়ে তো দিতেই হবে।
--- সে দিতে তো হবেই তাতে সমস্যা নেই। সমস্যা তো অন্য জায়গায়।
--- থেমে যা তুই এখানেই। এ ব্যাপারে কিছু বলিস না।
--- এড়িয়ে যাচ্ছো?
--- বললাম না আমি এ ব্যাপারে কিছু শুনতে চাইনা।
******************
চোয়াল ঝুলে পড়েছে তনয়ার। বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে ও সামনে দাড়ানো মেজ মায়ের দিকে।
কী বলল? প্রভাপুর বিয়ে! তাও আজ একটু পর!
এতো বড় একটা শকিং খবর পেয়েও একটুও ভাবান্তর হয় না আভার। সে নির্বিকার টেবিলে বসে বই পড়ছে।
একটা কাজে আভার কাছে এসেছিলো তনয়া। সেখানেই দুজনকে একসাথে পেয়ে প্রভার বিয়ের কথাটা বলেন রুহানি।
অবাক সুরে প্রশ্ন করে তনয়া,
--- প্রভাপুর বিয়ে কি বলছো কী বড় মা!
--- হ্যাঁ। এখন তাড়াতাড়ি ওকে সাজিয়ে দে তো। চল।
তারপর আভাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
--- আরে আভা আর কত পড়বি তুই? একটু পর তোর বোনের বিয়ে তুই এখন ওঠ বোনের কাছে চল।
ঠাস করে পড়তে থাকা বইটা বন্ধ করে দেয় আভা। সিরিয়াস গলায় জিজ্ঞেস করে,
--- বোনের বিয়ে বোন জানে?
--- না ওকে এখন জানাবো। তুই উঠে আয়তো।
--- বোনের মত নিয়েছ তোমরা?
--- ওর আবার কিসের মত? আমরা কি খারাপ চাই নাকি?
--- পাত্র কে?
আভার প্রশ্ন শুনে এক গাল হেসে রুহানি উত্তর দিলো,
--- তুরাজ দেওয়ান। প্রভার যে বন্ধুটা আছে না ও।
সবে মাত্র পানি মুখে দিয়েছিলো তনয়া। তুরাজের নাম শুনেই ছিটকে বেরিয়ে আসে মুখ নিয়ে। সাথে কাশি উঠে যায়।
ওর কাশি দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন রুহানি। তনয়ার পিঠ বুলিয়ে দিয়ে বলেন,
--- আরে আস্তে খাবি তো।
তনয়া শুধু অস্ফুটে বলে উঠে,
--- তাই বলে তুরাজ ভাই!
***************
প্রভার রুমের দরজায় দাড়িয়ে আছে রুহানি, আভা আর তনয়া।
ভিতর থেকে স্পষ্ট প্রভার উচ্চকণ্ঠের আওয়াজ আসছে। যে এই বিয়ে করবে না বলে জানায়।
এও জানায় তাকে কেনো জানানো হয়নি? তার মতামত কেনো নেয়া হয়নি।
রুহানি, তনয়া ভিতরে ঢুকলেও আভা সেখানেই কিছুক্ষণ স্থির দাড়িয়ে থাকে। এরপর কিছু একটা ভেবে এক ছুটে নিজের ঘরের দিকে যায়।
রুমে এসেই ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করে পরিচিত একটা নম্বর। দুইবার রিং হয়ে বেজে গেলে বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে উঠলো ,
--- ফোনটা ধরো রুদ্ধ ভাই।
বলতে না বলতেই এবার ফোনটা রিসিভ হয়। ওপাশ থেকে রুদ্ধ হ্যালো বলতেই আভা সময় ব্যয় না করে বলে,
--- রুদ্ধ ভাই কোথায় তুমি?
ভরাট গলায় রুদ্ধ জবাব দেয়,
--- কাজে এসেছি কেনো?
--- বাড়ি আসো তাড়াতাড়ি এদিকে অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে।
রুদ্ধের বুকের মধ্যে ধক করে উঠে। মানসপটে ফুটে উঠে প্রভার মুখটা। আজকে কেনো জানি আসতে মন চাইছিলো না। বার বার মন বলছিল প্রভাতকে ছেড়ে না যেতে।
কাপা কণ্ঠে রুদ্ধ জিজ্ঞেস করে,
--- ককি হয়েছে?
--- বাড়ির সবাই আপার বিয়ে ঠিক করেছে তুরাজ ভাইয়ের সাথে।
ব্যস আর কিছু শুনলো না রুদ্ধ। তৎক্ষণাৎ টুট টুট শব্দে ফোনটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এই কারণেই মা আজকে ওকে বাহিরে পাঠিয়েছে। কাজ ফেলে সময় ব্যয় না করে বাইকে উঠে রুদ্ধ।
ফুল স্পিডে চালাতে লাগে। সে বাড়ি থেকে একটু বেশিই দুরে আছে। মিনিমাম ৫ ঘণ্টার রাস্তা।
রুদ্ধের শ্বাস প্রশ্বাস ভারি হয়ে আসছে। শরীর কেমন অসার হয়ে যাচ্ছে। সে কি তবে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা এতোটা বাজে ভাবে হারিয়ে ফেলবে!
একদিকে যেমন বুকচাপা কষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে তেমন মায়ের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে।
রুদ্ধ পারলে এই মুহূর্তে চলে যেতো। তার কাছে মনে হচ্ছে রাস্তা যেনো শেষ হচ্ছে না। সে যদি দেরি করে ফেলে? না না কিচ্ছু ভাবতে পারছে না।
তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। বারবার আসার সময় বলা প্রভার একটা কথাই মাথায় ঘুরছে।
" এসে আমায় পাবি তো?"
কেনো বলল প্রভাত এই কথাটা? পাঁজরের ভিতরে থাকা হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক হারে লাফাচ্ছে। হাসফাঁস লাগছে।
অস্থির, অস্থির অনুভব হচ্ছে। রুদ্ধ বুঝি এবার পাগলই হয়ে যাবে।
*****************
--- আমার মতামত নিয়েছ তোমরা? সেই ছোট থেকে সব কিছু চাপিয়ে দিচ্ছ আমার উপর কখনো কিছু বলিনি কিন্তু আজ আর নয়।
পাগলের মতো কান্না করতে করতে চিৎকার করে কথাগুলো মাকে উদ্দেশ্য করে বলে প্রভা।
সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। এখন কিসের বিয়ে? তার এখনো কত কিছু করা বাকি।
নিজের পায়ে দাড়ানো বাকি। বড় হয়েছে বলেকি সব চাপিয়ে দিবে! কই বাকিদের সাথে তো এমন করে না।
সবসময় প্রভা স্যাক্রিফাইস করবে বলে কি প্রভার সাথেই এমন করবে? আর নয়। এবার প্রভা কথা বলবে। অনেক হয়েছে।
এবারে প্রভা একটা বিরাট কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। সে বলে উঠে এমন একটা কথা যা সে কখনোই চায়নি।
--- আমি এই বিয়ে করতে পারবো না। আমি রুদ্ধকে ভালোবাসি। আর বিয়ে করলে ওকেই করবো।
প্রভার এই একটা কথাই পুরো রুম জুড়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘরে নেমে আসে এক শান্ত নীরবতা।
স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ ঘরে থাকা প্রত্যেকটি মানুষ। নিশ্চুপ এই পরিবেশ ভেদ করে হঠাৎ 'ঠাস' শব্দে সবার সম্ভিত ফিরে।
এলিনা চড় মেরেছে প্রভাকে। গর্জে উঠলেন এলিনা,
--- ছি! লজ্জা করলো না তোর নিজের ছোট ভাইকে ভালোবাসার কথা বলতে?
কেমন পাগলের মতো হাসলো প্রভা। ঘাবড়ে গেলেন এলিনা। প্রভা বলে,
--- কিসের লজ্জা? ভালোবাসায় লজ্জা বলতে কিছু নেই। বয়স শুধুই একটা নম্বর মাত্র এতে কিছু যায় আসে না। আর রুদ্ধ তো আমার আপন ভাই নয়।
--- চুপ! পাগল হয়ে গেছিস তুই? কি বলছিস এসব?
--- পাগল তোমরা বানিয়েছো আমাকে।
এলিনা আর কিছু বলবে তার আগেই বাঁধ সাধে রুহানি। শান্ত গলায় বলে,
--- আপা আপনার যান সবাই আমার প্রভার সাথে কথা আছে।
কিছু বলতে নিয়েও আর বলতে পারলেন না এলিনা। রিয়ানা, তনয়াকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন রুম থেকে।
তারা চলে যেতেই রুহানি এবার দড়জাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দেয়।
নিচে পড়ে থাকা শাড়িটা তুলে নেয় হাতে। যেটা প্রভা ছুঁড়ে মেরেছিলো। শাড়ি নিয়ে এগিয়ে গেলো প্রভার দিকে রুহানি।
___________
চলবে~
"ইরফা মাহনাজ"