#প্রণয়ের_ঘ্রাণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্ব_৩০
❌ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌
*
*
*
কাজি অফিস থেকে বের হয়ে আসে প্রভারা। বর্ণের সাথে কোথায় একটা গিয়েছে রুদ্ধ। তৃধা বাসায় চলে গেছে।
প্রভাকে দাড়াতে বলেছে। প্রভা যথেষ্ট বুঝদার তবে তখন পরিস্থিতির জন্য আর ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার ভয়ে রুদ্ধ এর সাথে বাসা থেকে চলে এসেছে।
এক কাপড়ে বের হয়ে এসেছে। একবারও মাথায় আসেনি বাস্তবতা। এখন চিন্তা হচ্ছে। নিজের থেকে বেশি রুদ্ধকে নিয়ে।
কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে। কি করবে। মাথা ব্ল্যাং হয়ে আছে প্রভার। রুদ্ধ সব জায়গায় মানিয়ে নিতেও জানে না।
এরকম অজানা ভবিষ্যৎ এর কথা এক বারের জন্যও মাথায় আসলো না!
প্রভার ভাবনার মাঝে স্নিগ্ধ বলে,
--- চিন্তা করিস না। ঠিক হয়ে যাবে সব। একটা না একটা কিছু হয়ে যাবে ঠিকই।
মাথায় হাত দিয়ে নিচে বসে পড়ে প্রভা। স্নিগ্ধর দিকে তাকালেও কিছু বলে না। ওকে কিছু না বলতে দেখে এবার স্নিগ্ধা গিয়ে ওর পাশে বসে।
প্রভার কাঁধে হাত দিয়ে ওকে ভরসা দেয়। বলে,
--- তুই চাইলে আমাদের বাসায় থাকতে পারিস। যতদিন না তোরা একটা জায়গা খুঁজে পাস। আমি আর স্নিগ্ধই তো।
স্নিগ্ধ ও সায় জানায়। প্রভা বন্ধুদের দেখে আপ্লুত হয়। ও স্নিগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে। প্রভার চোখে পানি।
--- ধন্যবাদ। আমি সত্যিই ভাগ্যবান তোদের মতো ফ্রেন্ড পেয়ে। তবে তোদের ওখানে উঠতে বলিস না। আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
স্নিগ্ধ আর স্নিগ্ধার বাসা ছোট। ওদের দুজনের থাকার মতো। তাছাড়া প্রভা কখনোই কারো উপর বোঝা হতে চায় না। তাই সুন্দর করেই এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।
তখনই কোথা থেকে ধ্রুব ছুটে আসে। হাতে চকবার আইসক্রিম। সবার হাতে দেওয়ার পর দুটো বেঁচে যায়।
রুদ্ধ আর বর্ণকে না দেখতে পেলে জিজ্ঞেস করে,
--- ওরা কোথায়?
প্রভা একটু হাসলো। তারপর হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে দিলো। ধ্রুব ও হাসি মুখে চলে গেলো।
প্রভা শুধু ভাবে ও বোধহয় জীবনে কিছু ভালো কাজ করেছিল তাই এদের মতো মানুষ পেয়েছে।
গ্রুপ সার্কেলের মধ্যে ধ্রুবই একটু সমস্যায় আছে আর্থিক ভাবে। বাবা মারা যাওয়ার পর ফ্যামেলি ও আর ওর মায়ের উপর চলে।
তবে ছেলেটা অমায়িক। সব সময় হাসি খুশি থাকবে। সবাইকে হাসাবে। এই যে আজকে যে এত গুলো আইসক্রিম কিনলো সবার জন্য এটাও এক প্রকার ওর জন্য বাড়তি।
এটা নিজের টিউশনি দিয়েই কিনেছে তাও জানা আছে প্রভার। চিন্তার মাঝেও এই যে ছোটো খাটো সুন্দর মুহূর্ত গুলো এগুলো ও ভীষণ ভালো লাগছে প্রভার নিকট।
[ধ্রুবর ব্যাপারে আগে কিছু বলেছি কিনা আমার খেয়াল নেই। এখন যেই তথ্য দিয়েছি সেই অনুযায়ী চলবে]
*******************
বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই এক সেকেন্ড ও আর সেখানে রয় না তুরাজ। নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে হাটা দেয়।
তুরাজের সেই বড় বড় কদমের সাথে আভা তাল মিলাতে ব্যর্থ হয়। শাড়ি পড়ে ঠিক মতো হাঁটতেও পারছে না।
উপায় না পেয়ে থেমে যায় সে। আর আভার থেমে যাওয়ায় তুরাজ ও থেমে যায়। ভ্রু কুচকে আভার দিকে তাকালে মিনমিনে গলায় আভা জানায়,
--- তাল মিলাতে পারছি না।
কিছুপল আভার সেই কাচুমাচু মুখটার দিকে তাকায়। তারপর চারদিক নজর বুলিয়ে হুট করেই আভাকে কোলে তুলে নিয়ে হাটা দেয় তুরাজ।
অকস্মাৎ এমন কাণ্ডে হকচকিয়ে উঠে আভা। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। আগের বার যখন লঞ্চে ওকে কোলে নিয়েছিল তখন তো বাবা মা বড়রা ছিলো না।
কিন্ত এখন! এখন তো সবাই আছে। আভার এতো লজ্জা করছে কি যে করবে সে। উপায়ন্তর না পেয়ে তুরাজের বুকেই মুখ গুঁজে।
সেভাবেই বিড়বিড় করে বলে উঠে,
--- এই লোকের কী কোলে নেয়ার ব্যামো আছে নাকি! যখন তখন কোলে নিবে। আশ্চর্য!
তুরাজ বোধহয় আভার কথাটা শুনলো। ওর গম্ভির মুখে এক চিলতে হাসি দেখা দিলো। যা সঙ্গে সঙ্গে আবার মিলিয়ে গেলো।
মুখ টা নিচু করে আভার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
--- থাকলেও কি সুবিধা তো তোমারই। ছোট বেলায় বাবা মা কোলে নিয়েছে এখন স্বামী কোলে নিবে। সারাজীবন কোলে কোলেই থাকতে পারছো। কি ভাগ্য তোমার। কয়জন এভাবে ছোট বেলার স্বাদ নিতে পারে।
--- কি বললেন আপনি?
--- বলেছি এখন থেকে সারাজীবন আমার সাথেই থাকতে হবে। তাল মিলাতে শিখে নেও মেয়ে।
আভার শরীরে শিরশির করে উঠল। বলল,
--- আপনি কিন্তু কথা ঘুরাচ্ছেন। আমি কিন্তু শুনেছি।
--- ভালো করেছেন মিসেস।
********************
রাস্তার উপর পড়ে থাকা খালি ক্যানে লাথি দেয় রুদ্ধ। ওর পাশেই দাড়িয়ে আছে বর্ণ।
--- বের হয়ে তো আসলি এখন কী করবি?
বর্ণের কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো রুদ্ধ। আবারো ক্যানে লাথি বসিয়ে বলল,
--- জানি না। আমি জানিনা কি করবো। প্রভাতের সেফটি আমার কাছে আগে। ওর একটা ব্যবস্থা করতে পারলেই শান্তি। নিজের কথা ভাবছি না।
--- তা কেনো ভাববি। তোর কথা ভাবার জন্য তো আরেকজন আছে। যার তোর কথা ভেবে টেনশনে পাগল হওয়ার উপক্রম।
পিছন থেকে আসা কথার উৎস দেখতেই নজরে আসে প্রেয়সীর। প্রভা আসছে। প্রভা আসতেই ওকে এক পাশ করে নিজের সাথে আগলে নিলো রুদ্ধ।
তারপর হো হো করে শব্দ তুলে হাসলো। এই হাসি তৃপ্তির, এই হাসি প্রশান্তির। হঠাৎ রুদ্ধকে মারতে শুরু করে প্রভা।
সেভাবেই রেগে বলে,
--- হাসছিস কেনো পাগলের মতো করে?
প্রভার গালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো ওর কানের পাশে গুঁজে দিয়ে ওর খুব নিকটে চলে যায় রুদ্ধ।
একদম কাছে গিয়ে ওর চোখের দিকে চোখ রেখে বলে,
--- হ্যাঁ। আমি জানিতো আমার জন্য চিন্তা করতে আমার প্রভাত আছে। তাই তো নিজেকে নিয়ে ভাবিনা। তবে আমার প্রভাতকে নিয়ে চিন্তা করতে তো আমি ছাড়া কেউ নেই। অতএব তোকে নিয়ে আমাকেই ভাবতে হবে।
******************
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে আভা। আর ওর কান্না করা পাশে বসে দেখছে তুরাজ। বোধহয় ভাবছে এই মেয়ের এটা চোখ নাকি অন্য কিছু!
কান্না করছে তো করছেই। এতো কান্না, এতো পানি কোথা থেকে যে আসছে সেটাই ভাবছে বসে বসে।
অধৈর্য্য হয়ে এবার গলা খাঁকারি দেয় তুরাজ। কিন্তু তবুও কোনো পরিবর্তন হয় না দেখে এবারে কিছুটা টিটকিরি মেরেই বলে,
--- চোখে যদি আরো পানি থাকে বলো ড্রাইভারকে বলে কোনো পুকুরের ধারে দাড় করাবো।
অশ্রুসিক্ত নয়নেই কিছুটা রাগি লুক নিয়ে তাকালো আভা তুরাজের দিকে।
ওর সেই তাকানো দেখে নাটকীয় ভঙ্গিমায় দুই হাত উপরে তুলে তুরাজ বলে,
--- ওরে বাবারে আমি তো ভয়ই পেয়ে গেলাম।
কথা এ পর্যন্তই বলতে পারে। হুট করে গাড়ির ব্রেক কষলে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে আভা। কিন্তু ও ব্যাথা পাওয়ার আগেই একটা বলিষ্ঠ হাত ওকে টেনে শক্ত পোক্ত এক বাঁধনে আবদ্ধ করে।
কারো অস্থির ঋদপিণ্ডের ধক ধক করা আওয়াজ খুব কাছ থেকে ভালো করে শুনতে পাচ্ছে আভা। আর এই আওয়াজটা যে তুরাজ নামের যুবকের হৃদয়ের তাও জানে।
তুরাজ ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে রেগে চেঁচিয়ে উঠে,
--- হোয়াট হ্যাপেন্ড রিজভী। কি করছো কি? এভাবে কেউ গাড়ি চালায়? এখনই তো ও ব্যথা পেতো যদি ঠিক সময়ে আমি না ধরতাম। ধ্যান কোথায় তোমার? ঠিক করে গাড়ি চালাও।
তুরাজের বজ্র ধমক খেয়ে রিজভীর মুখ টা ছোট হয়ে যায়। নিচু স্বরে বলে,
--- সরি স্যার।
--- ও ব্যাথা পেলে তোমার সরি ধুয়ে কী আমি পানি খেতাম ইডিয়েট?
তুরাজের এতো হম্বিতম্বি আর অস্থিরতা কিছুই মাথায় ঢুকছে না আভার। ও তো অন্য খেয়াল আর অন্য জগতে চলে গেছে।
একে এতো কাছাকাছি এক পুরুষের তারউপর পুরুষটি হলো তার একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষ। তার স্বামী।
তুরাজের গা থেকে আসা ম্যানলি পারফিউমের ঘ্রাণ পাগল করে দিচ্ছে আভার সত্তাকে। চিত্তটা কেমন কেমন করছে।
এই অনুভূতি একদম নতুন। কই আগেও তো তুরাজের কাছে সে গিয়েছে। হয়তো এতো কাছে নয় তবে গিয়েছে তো।
তখন তো এমন মন উথাল পাথাল করা অনুভূতি হয়নি। তবে আজ কেনো। এ কি শুধু এমনিই নাকি কবুলের শক্তি!
*********************
উদ্দেশ্য হীন গন্তব্য রুদ্ধ প্রভার। ভবিষ্যৎ জানা নেই। বর্তমানে জানতেও ইচ্ছুক নয় তারা।
নিজ নিজ বন্ধুদের বিদায় জানিয়েছে। ওরা সঙ্গে থাকতে চাইলেও আপত্তি করেছে রুদ্ধ প্রভা।
কারণ এর পরের লড়াইটা তাদের নিজেদের। ওরা চায় নিজেরাই এই ঝড় ঝাপটা সামলাতে। তবে ওদের নাছোড় বান্দা বন্ধু মহল কথা দিয়ে নেওয়ায়।
যে বিপদে পড়লেই জনাতে আর ভালো মন্দ সব খবর দিতে । ওরাও আর এতে দ্বিমত করেনি। রাজি হয়ে গেছে।
এখন রুদ্ধের বাইকে করে শহর টহল দিচ্ছে কোথাও বাসা ভাড়া পায় কিনা। বুদ্ধিটা প্রভার। ওই বলেছে আগে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে পড়ে দেখা যাবে।
রুদ্ধ টাকার কথা জানতে চাইলে প্রভা রিয়ানার টাকা দেওয়ার ব্যাপারটা আড়ালে রেখে ওর কাছে আছে জানায়।
পাছে না আবার রুদ্ধ কোনো ঝামেলা করে। এমনিতেই মাথা গরম। উপরন্তু বাড়ির কথা শুনলেও পাগল ক্ষেপে যাবে।
দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল। রুদ্ধরা কোথাও বাসা পায়নি। হয় বাসা পছন্দ হচ্ছে না। নাহয় বাড়িআলারাই দিতে যাচ্ছে না কোনো এক অজানা কারণে। আর নাহয় টাকায় মিলছে না।
এরপর একটু পরেই ধরণীতে সন্ধ্যা নামবে। আর রাতের ঢাকা শহর যে কতোটা খারাপ তা আর জানতে বাকি থাকে না।
রুদ্ধের চিন্তা দ্বিগুন বাড়ছে। ও একলা থাকলে রাস্তায় কাটিয়ে দিতো যদিও পারতো কিনা সন্দেহ। তবুও প্রভা থাকায় যতোটা ভয় হচ্ছে তাতো হতো না।
প্রভার জন্য রাতের শহর নিরাপদ নয়। রুদ্ধ নিজের জীবন দিয়ে প্রোটেক্ট করবে ঠিক আছে তাও একটা অনিশ্চিয়তা আর ভয় থেকেই যায়।
হুর হুর করে সময় যাচ্ছে। কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা হলো না। কি করবে এখন রুদ্ধ? প্রভাকে নিয়ে কোথায় যাবে।
___________
চলবে~
"ইরফা মাহনাজ"
[এই গল্পটা লিখতে গেলে আলাদাই একটা মানসিক শান্তি পাই আমি। এই গল্পটা আমার ভীষণ পছন্দের। ভালোই লাগে। তবে গল্পটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিবো। পরের পর্ব গুলো বড় বড় করে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করবো।]