#কোথাও_কেউ_নেই
লেখক~ হুমায়ুন আহমেদ
১৭.
বকুলের বিয়ে হয়েছে এক সপ্তাহ হয়ে গেলো। এক সপ্তাহ অনেক লম্বা সময় নয়। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে সে বৌ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতে ঘুমুতে যাচ্ছে একজন পুরুষ মানুষের সঙ্গে। মানুষটিও যেন তার সঙ্গে অনন্তকাল ধরেই ঘুমুচ্ছে! গায়ে ঘামের গন্ধ। সে বলে উঁচু গলায়। রেগে ওঠে অল্পতে। বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই সে বললো, ' পিঠটা একটু চুলকে দাও তো বকুল। '
কী অদ্ভুত কথা! ঘর ভর্তি মানুষজন। সে বসে আছে টানা বারান্দায়। লোকজন আসা-যাওয়া করছে এর মধ্যে পিঠ চুলকে দেবে কী? কিন্তু জহির শার্ট তুলে খালি গায়ে বসে আছে।
অসহিষ্ণু গলায় বললো, ' আহ! দেরি করছো কেন?'
নতুন বৌকে কেউ এমন কড়া গলায় কিছু বলে।
বকুলের চোখে পানি এসে যাচ্ছিলো সে বহু কষ্টে পানি সামলালো এবং হাত রাখলো জহিরের পিঠে।
জহির বিরক্তমুখে বললো, ' এ রকম শান্তিনিকেতনী কায়দায় সুড়সুড়ি দিচ্ছি কেন? ভালমত চুলকাও। '
কি বিশ্ৰী কথা বলার ভিঙ্গি! বিয়ের পর মানুষটিকে বকুলের মোটেও ভালো লাগছে না। দুপুরের পর থেকেই তার শুধু মনে হতে থাকে সন্ধ্যা এসে পড়ছে। এক সময় সন্ধ্যা মিলাবে এবং জহির সবার সামনেই দরজা বন্ধ করে ঝাপটা-ঝাপটি করতে করতে বলবে তুমি এমন মাছের মতো পড়ে থাকো কেন? তোমার অসুবিধাটা কি?
বকুল শুধু মনে মনে বলবে, আহ! আজকের রাতটা পার হোক। এক সময় সেই রাত পার হয়। কিন্তু আবার নতুন একটি রাত আসতে শুরু করে। একটি বিবাহিত মেয়ের জীবন মানেই কী একের পর এক গ্লানিময় ক্লান্তির দীর্ঘ রজনী?
কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কাকে করবে? টিনা ভাবী নেই। তাকে চিঠি লেখা যায়। কিন্তু চিঠি লিখতে ইচ্ছা করে না। ইদানীং তার বারবার মনে হয় সবাই ইচ্ছা করে তাকে জলে ফেলে দিয়েছে। সবাই জানতো তার এই অবস্থা হবে কিন্তু কেউ তাকে বলেনি।
বিশাল এই বাড়িতে তার শুধু হাঁফ ধরে। প্রায়ই মনে হয় নিঃশ্বাস নেবার মতো বাতাস নেই কোথাও। অথচ কি খোলামেলা বাড়ি। তাদের শোবার ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালা খুলে দিলে বাতাসে বিছানার চাদর সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। টানা বারান্দা এত প্রশস্ত যে নেট টানিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা যায়।
একতলার বেশির ভাগ ঘরই তালাবদ্ধ। থাকার লোক নেই ব্যবহার হয় না। তার শাশুড়ি প্রথম দিনেই সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন।
সারাক্ষণই কথা বললেন–
' এই যে দেখ মা। পাশাপাশি দুই ঘর। তোমার শ্বশুর বলতেন অতিথি ঘর। অতিথি এলে থাকবে। কত বড় ঘর দেখলে? ইচ্ছা করলে বাইজী নাচানো যায়। তোমার শ্বশুর সাহেবের মাথাটা ছিল খারাপ। টাকা-পয়সা যা ছিল সব ঢেলেছে এই বাড়িতে। তা না করে যদি জমি-জমা করত তাহলে আজ তোমরা পায়ের ওপর পা তুলে থাকতে পারতো। বুঝলে মা এই বংশই হচ্ছে পাগলের। আমার ছেলেও পাগল। এখন বুঝতে পারছি না, কয়েক’দিন যাক বুঝবে। এই যে দেখ এটা দেখ। লাইব্রেরি ঘর। রাজ্যের বই আছে এখানে। পোকায় কেটে সব শেষ করেছে। একটা বই আস্ত নেই। বই পড়ার অভ্যাস আছে? থাকলে আমার কাছ থেকে চাবি নিয়ে যেও। তবে মা রাতের বেলা একা একা এ ঘরে আসবে না। সবাই বলে কী সব নাকি দেখে। আমি নিজে কোনোদিন দেখি নাই। তোমার শ্বশুর সাহেবকে নাকি দেখে ইজিচেয়ারে শুয়ে বই পড়ছে। যত বানানো কথা, শুনলে রাগে গা জ্বলে যায়।
জহির নিজেও বাড়ি প্রসঙ্গে অনেক কথা-টথা বললো।
বকুলকে খানিক ঘুরিয়ে দেখালো, ছাদে নিয়ে গেলো।
হৃষ্টচিত্তে বললো, ' বাড়ি কেমন দেখলে? '
' ভালো। '
একুশটা ঘর আছে। অথচ দু’টা মাত্র বাথরুম, তাও একতলায়। বাবার একটা নেশাই ছিল ঘর বানানো। কি করে রুমের সংখ্যা বাড়ানো যায়। অথচ মানুষ মাত্র তিনজন।
এ রকম অদ্ভুত সখা হল কেন? কে জানে কেন। গৌরীপুরের মহারাজার বাড়ি দেখে বোধ হয় এই নেশা চেপেছিল। লোকজনের বাড়ির সামনে পেছনে খোলা জায়গা-টায়গা থাকে, বাগান-টাগান করে। এইসব কিছু নেই। সবটা জায়গা জুড়ে বাড়ি। কিছুদিন পর এটা হবে ভূতের বাড়ি। কেউ থাকবে না।
বকুল ক্ষীণ স্বরে বললো, ' মা আমাকে লাইব্রেরি ঘরে একা একা যেতে নিষেধ করেছেন। '
জহির বিরক্তমুখে বললো, ' যত ফালতু ব্যাপার। যেখানে যেতে ইচ্ছা হয় যাবে। ভূত-প্রেত গল্পের বই ছাড়া অন্য কোথাও নেই। তুমি আবার ভূত বিশ্বাস করো না তো?'
'অল্প অল্প করি।'
' এখন থেকে আর করবে না। তবে শোন, রাতের বেলা বাথরুমে যেতে হলে আমাকে ডেকে তুলবে। একা একা যাবার দরকার নেই। আমি দোতলায় বাথরুমের ব্যবস্থা করছি। কালই রাজমিস্ত্রী লাগাবো!'
সত্যি সত্যি ভোর হতেই রাজমিস্ত্রী চলে এলো। বকুলের শাশুড়ি মুখ কালো করে ফেললেন। এত টাকা খরচ করে বাথরুম বানানোর তার কোনো ইচ্ছা নেই। দিন তো চলে যাচ্ছে না। ওদের দোতলায় অসুবিধা হলে একতলায় চলে এলেই পারে। ঘর তো সব খালিই পড়ে থাকে।
মা এবং পুত্রের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা লড়াই হয়ে গেলো।
এ জাতীয় লড়াই বকুল আগে দেখেনি। সে কী করবে। বুঝতে পারলো না। শাশুড়ি তার ঘরে শুয়ে কাঁদছেন। জহির চায়ের কাপ হাতে রাজমিস্ত্রীদের কাজের তদারকি করছে হাসিমুখে। বকুল শুকনো মুখে একবার যাচ্ছে শাশুড়ির কাছে একবার আসছে জহিরের কাছে।
বাড়িতে আর লোকজন বলতে দু’টি কাজের মেয়ে এবং শমসের নামের একজন গোমস্তা ধরনের মানুষ। যার একমাত্র কাজ হচ্ছে বাজার করে এনে রোদে পিঠ মেলে বসে থাকা। বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন যা এসেছিল তারা এক’দিন পরই বিদেয় হয়েছে। বকুলের শাশুড়ির তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ঝ'গড়া হয়েছে। ঝগড়ার কারণ হচ্ছে, বিয়েতে দেয়া উপহার।
তিনি বকুলের চাচি শাশুড়িকে সবার সামনেই বললেন, ' দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র ছেলে আমার। তার বৌয়ের জন্যে যে শাড়ি আনলেন সেই শাড়ি তো আমার কাজের মেয়েও পরে না। আমার একটা ইজ্জত নেই। ছেলের বৌয়ের কাছে আমার মুখ ছোট হলো না? আপনি দু' মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এদের প্রত্যেকের বিয়েতে আমি সোনা দিয়েছি। দেইনি? আমার ছেলে কী নদীর পানিতে ভেসে এসেছে? '
কঠিন কঠিন কথা খুব সহজ মুখে বলে যাচ্ছেন। রোগা ফর্সা ও সুন্দর মহিলাটি কাঁদতে লাগলেন। কী অস্বস্তিকর অবস্থা!
পাঁচ দিনের মাথায় বাবু এসে উপস্থিত। একা একা চলে এসেছে। হাতে নতুন কেনা সুটকেস। বকুলের বিস্ময়ের সীমা রইল না। বিস্ময় এবং আনন্দ! তার ইচ্ছা করছিলো ছুটে গিয়ে বাবুকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ খুব কাঁদতে, কিন্তু তা সম্ভব নয়। শাশুড়ি বাবুর সঙ্গে কথা বলছেন। জহির দোতলা থেকে নেমে এসেছে।
বাবুর শোবার জায়গা হলো একতলায়। বকুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, বাবুর ঘর গোছগাছ করে দেবার জন্যে জহির নিজেই উদ্যোগী হয়েছে। বকুল এটা ঠিক আশা করেনি। তার কেন জানি মনে হচ্ছিল জহিরের এখন আর তার বা তার পরিবারের কারোর প্রতি কোন আগ্রহ নেই। রাতের বেলা বকুলকে খানিকক্ষণ কাছে পেলেই তার হবে। সমস্ত ভালবাসাবাসি রাতের খানিকক্ষণ সময়ের জন্যে। সে ভেবে পাচ্ছে না। এই ব্যাপারটি শুধু কী তার ক্ষেত্রেই সত্যি না পৃথিবীর সব মেয়েদের বেলাতেও সত্যি।
বকুলের আনন্দের সীমা রইল না।
যখন জহির বললো, তুমি বরং আজ তোমার ভাইয়ের সঙ্গে ঘুমাও। বকুল তাকিয়ে রইলো।
জহির বললো, " বেচারা একা একা ভ'য়টয় পেতে পারে। তাছাড়া তোমার নিজেরও ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা করছে নিশ্চয়ই। রাত জেগে গল্প করো।'
আনন্দে বকুলের চোখে পানি এসে গেলো। সে কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার ইচ্ছা করছে এমন কিছু বলতে যাতে জহির খুব খুশি হয়। কিন্তু তেমন কোনো কথা তার মনে আসছে না।
সে শুধু বললো, 'তোমার অসুবিধা হবে না তো?'
'অসুবিধা? অসুবিধা হবে কেন?'
'ঠিকই তো তার অসুবিধা হবে কেন? '
বকুল কথাটা বলেছে খুব বোকার মতো।
জহির বললো, ' এক কাজ করলে কেমন হয়? বাবুকে এখানে রেখে দেয়া যায় না?'
'এখানে রেখে দেব?'
'হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে থাকবে। পড়াশোনা করবে। বিরাট বাড়ি খালি পড়ে আছে। তাছাড়া ও থাকলে তোমার একজন সঙ্গী হবে।'
'সত্যি বলছো?'
'সত্যি বলছো, মানে?'
'না মানে তুমি চাও ও এখানে থাকুক?'
'না চাইলে শুধু শুধু বলবো কেন? চাই বলেই তো বলছি। তাছাড়া আমি যখন এখানে থাকবো না তুমি তখন খুবই লোনলি হয়ে পড়বে।'
বকুল অবাক হয়ে বললো, ' তুমি এখানে থাকবে না। ' 'মানে? মা যে বলল, তুমি এখানেই থাকবে।'
'আমি কি এই মফস্বলে পড়ে থাকবো নাকি? কি যে তুমি বলো। ঢাকা ছাড়া আমি থাকতে পারি না।'
'তুমি ঢাকা থাকলে আমিও ঢাকা থাকবো।'
জহির নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বললো, ' পাগল হয়েছো। মা যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন তোমার এখানেই থাকতে হবে।'
'কেন?'
'এই শর্তেই মা তোমাকে বিয়ে করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন।'
বকুল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
জহির হাসতে হাসতে বললো, ' মা বড় কঠিন জিনিস। যত দিন যাবে ততই বুঝবে। তুমি শোবার আগে এক জগ পানি এবং একটা গ্লাস দিয়ে যাবে।'
জহির ঘুমুবার আয়োজন করলো।
রাতে বাবুর সঙ্গে তেমন কোন কথাবার্তা হলো না। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। তাছাড়া এমনিতেও তার বোধ হয় কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।
সে ঘাঁড় বাকিয়ে বললো, 'এই ঘরে ঘুমাতে হবে না।'
বকুল বললো, 'ঘুমালে কি অসুবিধা?'
বাবু তার জবাবে মুখ অন্ধকার করে বসে রইলো।
'বাসার খবর কি?'
'একবার তো বললাম। বাসার খবর।'
'মুনা আপা কোন চিঠি দেয়নি?'
'না দেয়নি। দিলে তো তোমার কাছেই দিতাম। লুকিয়ে রাখতাম নাকি?'
'চিঠি দিল না কেন?'
'আমি কী জানি কেন দেয়নি।'
বকুল ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললো, ' আমার কথা বোধ হয় সবাই ভুলেটুলে গেছে। বাবু চুপ করে রইলো। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে বকুলের এই কথা সমর্থন করছে। '
বকুল বললো, 'তোর মাথাব্যথা এখনো হয়?'
'হয়।'
'এখন হচ্ছে?'
'না।'
'হলে বলিস। তোর দুলাভাইয়ের কাছ থেকে ওষুধ এনে দেব।'
'আমার কোন অষুধ-টুষুদ লাগবে না।'
বাবু চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে ফেললো।
বকুল নরম গলায় বললো, ' তুই আমার সঙ্গে কথা বল বাবু। এর রকম করছিস কেন? তুই এসেছিস আমার এত ভালো লাগছে।'
বাবু মুখের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে ফেললো।
বকুল হঠাৎ বলে ফেললো, ' আমি এখানে খুব কষ্টে আছি রে বাবু। আমার কিছু ভালো লাগে না; ম'রে যেতে ইচ্ছা করে।'
'কেন?'
'তাও জানি না।'
'বিয়ে করার জন্যে তুমি তো পা'গল হয়েছিলে।'
বকুল চুপ করে রইলো। অনেক রাত পর্যন্ত তার ঘুম এলে না। একবার ইচ্ছে করলো জহিরের কাছে ফিরে যেতে। এই ইচ্ছেটা কেন হল তাও সে ঠিক ধরতে পারলো না। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অর্থহীন সব চিন্তা-ভাবনা আসছে মাথায়। বাইরে কাক ডাকছে। কাকের ডাকের সঙ্গে নানান রকম পাখ-পাখালির ডাকও কানে আসছে। ভোর হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। ঘুমহীন রাত একটি কেটে গেল। তার কেন যেন মনে হল এ রকম নিদ্রাহীন রজনী আরো অনেক আসবে তার জীবনে। সে খানিকক্ষণ কাঁদলো। এই কান্নাও কেমন অন্য রকম। আগে কাঁদলে মন হালকা হয়ে যেত। ভালো লাগতো। এখন লাগছে না।
মন ভারী হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে কি মানুষকে এমন ভাবে বদলে দেয়?
টিনা ভাবী বিয়ে নিয়ে কত গল্প করেছে। এ রকমও যে হয় তা তো কখনো বলেনি। এটি সে লুকিয়ে রাখলো কেন? নাকি সবার জীবনে এ রকম হয় না? বেছে বেছে বকুলদের মতো মেয়েদের বেলাতেই এ রকম হয়?
বকুলের ধারণা হল সে নিশ্চয়ই খুব খারাপ মেয়ে। খারাপ মেয়েদের এ রকম শাস্তি হয়। হওয়াই উচিত।
ভোরবেলা এক কাণ্ড হলো।
জহির এসে বললো, 'এই বাবু ঘোড়ায় চড়বে?'
বাবু অবাক হয়ে বললো, 'ঘোড়া পাবেন কোথায়?'
'কোথায় পাবো সেটা আমি দেখবো। তুমি চড়বে কি না বলো?'
'না, চড়বো না।'
' দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। আমরা ছোটবেলায় চড়তাম। একটা বেতো ঘোড়া আছে নড়েচড়ে না।'
বাবু হাসিমুখে বললো, ' আপনার ছোটবেলার ঘোড়া সেটা কি আর এখনো আছে? ম'রে ভূ'ত হয়ে গেছে।'
' তাও তো কথা। দাঁড়াও খোঁজ নিয়ে দেখি। এসব জায়গায় ঘোড়া পাওয়া যায়। শীতের সময় ঘোড়ার পিঠে করে ভাটী অঞ্চলে মাল যায়। আধমরা ঘোড়া। চড়তে খুব আরাম। লাফ-বাপ নেই।'.
বকুল অবাক হয়ে দেখলো, সত্যি সত্যি দুপুর নাগাদ এক ঘোড়া উপস্থিত। দাড়িওয়ালা এক বুড়ো ঘোড়ার দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাবু ঘোড়ার পিঠে বসে আছে। মুখ ভর্তি হাসি। বাবুর মুখে এমন হাসি বকুল আগে দেখেনি। বকুলের মনে হলো, জহির বাবুকে মুগ্ধ করতে চেষ্টা করছে। মাকড়সার সূক্ষ্ম জালের মতো জাল। চোখে দেখা যায় না। কিন্তু আটকা পড়ে যেতে হয়। একবার আটকা পড়ে গেলে বেরুবার পথ থাকে না।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পুলিশের হাঙ্গামায় বাকের এর আগেও দুবার পড়েছে। প্রথমবার ভ'য় ভ'য় করছিল। জিপে করে থানায় যাবার সময় তার বুক কাঁপ'ছিলো এবং প্রচণ্ড রকম পিপাসা বোধ হচ্ছিলো। থানায় পৌঁছে অবশ্য ভ'য়টা কেটে গেলো। ওসি সাহেব চমৎকার ব্যবহার করলেন। এমন ভাবে কথাবার্তা বলতে লাগলেন যেন বাকের তার দীর্ঘদিনের চেনা মানুষ। চা-সিগারেট খাওয়ালেন। ঘণ্টা দু’এক পর বললেন, 'আচ্ছা ভাই যান।'
কেনই বা তাকে এনেছিল কেনই বা ছেড়ে দিয়েছিলো তা বাকের জানতে পারেনি। জানার চেষ্টাও করেনি।
ইয়াদ অবিশ্ খুব ছোটাছুটি করেছে। নানান জায়গায় টেলিফোন করেছে। সেই সব টেলিফোনের একটি ভূমিকাও হয়তো আছে। থানার সেকেন্ড অফিসার বাকেরকে নামিয়ে দিতে জিপ নিয়ে এলেন। লোকটির বয়স অল্প। বয়সের তুলনায় চেহারা বেশ কঠিন। কথা বলে খ্যাসখ্যাসে গলায়। কিন্তু লোকটিকে বাকেরের পছন্দ হয়েছিলো।
সে জিপে আসতে আসতে বললো, ' সব সময় মাস্তানরা কি করে জানেন? ক্ষমতায় যে দল থাকে তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। তাদের টিকে থাকার স্বা'র্থেই তারা তা করে। ক্ষম'তাসীন দ'লে'র ওদের দরকার। ওদেরও সরকা'রি সা'পোর্ট দরকার। মাঝখান থেকে আমরা বসে বসে কলা চু'ষি।'
বাকের বললো, ' সর'কারি দ'লের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। '
সেকেন্ড অফিসার সেই কথার তেমন কোন গুরুত্ব দিলো না।
বিরসমুখে সিগা'রেট টানতে লাগলো। সস্তা সি'গারেট। গন্ধে মাথা ধরে গেল বাকেরের। পুলিশের অফিসারও যে সস্তা সিগা'রেট খায় তা বাকেরের জানা ছিল না। সে সেপাইদের হাতেও ফাইভ ফাইভের প্যাকেট দেখেছে।
দ্বিতীয়বার, পুলিশ হাঙ্গামা হল মইনুদ্দীন বেপারী নামের এক লোকের জন্যে। সে বাকের এবং ইয়াদের নামে কেইস করে দিলো। দোকানের ক্ষতিসাধন ও লুণ্ঠন- অভিযোগও গুরুতর। মইনুদ্দীনের কোমরে জোর ছিলো। তার এক খালাতো ভাই প্রতিমন্ত্রী। কাজেই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেলো বাকের এবং ইয়াদকে। সেবার পাঁচ ঘণ্টার মতো থাকতে হলো থানায়।
এই পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে কে বা কারা যেন মইনুদ্দীন বেপারীর দোকানে আগুন লাগিয়ে দিলো। পাঁচ, ছ লাখ টাকার জিনিস নিমিষে উধাও। দিনদুপুরে তিনটা বোমা ফাটল মইনুদ্দীন সাহেবের বাড়ির সামনে।
বাকের ছাড়া পেয়ে আসা মাত্র মইনুদ্দীন সাহেব কাঁদো কাঁদো মুখে দেখা করতে এলেন। জড়িত গলায় বললেন,
– 'একটা মিস আন্ডারস্টেনডিং হয়ে গেছে। অন্যের পরামর্শে পড়ে এই ব্যাপার। এখন আপনি যদি জিনিসটা ক্ষমার চোখে না দেখেন তাহলে তো মুশকিল। আপনি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। বড় ভাই যদি না বুঝে একটা কাজ করে…'
জিপে করে পুলিশের কাছে যাওয়াটাই এক সময় একটি আনন্দের ব্যাপার ছিলো। লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। নেতা নেতা একটি ভাব হচ্ছে মনে।
কিন্তু আজ সে রকম মনে হচ্ছে না। বাকেরের মনে হলো এবারের ব্যাপারটা অন্যরকম। কারণ, থানার ওসি এক পর্যায়ে তাকে বললো, এইবার আপনার তেল কমাবো।
একটা থানার ওসি তার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলবে কেন? রহস্যটা কোথায়? এই লোকই তো আগের দু'বার তাকে ভাই বলেছে। চা এবং গরম ডালপুরী এনে খাইয়েছে। ফেরত পাঠিয়েছে পুলিশের জিপে।
আজ সে তিন ঘণ্টা যাবত কাঠের একটা বেঞ্চিতে বসে আছে। ওসির ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে তাকে চিনতেই পারছে না। একটা লোককে ধরে নিয়ে এসেছে। এ নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যাথা নেই। ওসি সাহেব বিয়ে বাড়ির এক লম্বা-চওড়া গল্প ফেঁদেছেন। সবাই আগ্রহ করে গল্প শুনছে। সেতাবগঞ্জে বরযাত্রী যাবে ভুলে গিয়ে উঠেছে নবীগঞ্জে। সেখানেও এক মেয়ের বিয়ে। সাজানো বাড়ি দেখে সবাই গিয়ে বর নিয়ে উঠলো। মাইকে গান-টান বাজছে। কনে পরীয়রে মধ্যে কানাঘুষা হচ্ছে। সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। অচেনা বর, অচেনা লোকজন। দীর্ঘ গল্প শেষই হতে চায় না। যারা শুনছে তারা হেসে গড়িয়ে পড়ছে। উৎসাহ পেয়ে ওসি সাহেব রসালো জায়গাগুলি দ্বিতীয়বার করে বলতে লাগলেন। বাকেরের মনে হলো, এই গল্প শেষ হবা মাত্র দ্বিতীয় একটি গল্প শুরু হবে। সে শুকনো মুখে বলল, এক গ্লাস পানি খাবো।
ওসি সাহেব বললেন, ' পানি খেলেই পেচ্ছাব পেয়ে যাবে। চুপচাপ বসে থাকেন। ঠাণ্ডার দিনের এত কিসের পানি খাওয়া-খাওয়ি?'
এতেই হাসির স্রোত বয়ে গেলো! বাকেরের বিস্ময়ের সীমা রইলো না। দুপুর একটা পর্যন্ত বাকের একই জায়গায় বসে রইলো।
একটা সময় ওসি সাহেব বললেন, ' ওকে হাজতে ঢুকিয়ে দিন। '
বাকের বললো, ' কী ব্যাপার আমাকে বলুন?'
' ওসি সাহেব বললেন, সময় হলে সবই শুনবেন। সময় হয় নাই। এখনো বাকি আছে। '
এই কথাতেও একটি হাসির স্রোত বইলো! এ থানার ওসি সাহেব যে একজন রসিক ব্যক্তি সে পচিয় বাকের এর আগে পায়নি। বিভিন্ন পরিবেশে মানুষের বিভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়।
হাজতে ছোট্ট ঘরটায় ন'জন হাজতি। এর মধ্যে একজন অসুস্থ। সে বিকট শব্দে বমি করছে। বমির চাপে চোখ উল্টে আসছে। কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। সবার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের উদাস ভাব।
দরজার পাশে সেন্ট্রি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে রাজ্যের নির্লিপ্ততা! বমি করার ব্যাপারটি সে দেখছে কিন্তু সে দৃশ্য তার মনে কোনো ছাপ ফেলছে না।
বাকের বললো, ' ভাই এসব পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন। লোকটাকে একটা ডাক্তার দেখান! '
পুলিশটি কোনো শব্দ করলো না।
বাকের দ্বিতীয়বার বললো, ' কি ব্যাপার ভাই? কিছু করুন। '
' সন্ধ্যাবেলা জমাদার আসবে তখন পরিষ্কার হবে।'
'লোকটাকে এক গ্লাস পানি এনে দিন।'
পুলিশটি বড় একটি টিনের মাগে এক মগ পানি এনে দিলো। বাকেরের ধারণা ছিলো সন্ধ্যার আগেই অনেকে আসবে তার কাছে।
তার ভাই হয়তো আসবে না। কিন্তু লোক পাঠাবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হবে কষ্ট করে।
ঘরে বমির কুৎসিত গন্ধ। সবাই নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বসে আছে।
টাক মাথার গোঁফ ওয়ালা একটি লোক বললো,
' বড় ভাই আপনার কাছে সি'গারে'ট আছে? '
বাকের বললো, ' না।'
'টাকা তো আছে। সেন্ট্রিকে দেন সিগা'রে'ট এনে দিবে।' 'ওকে পাঁচটা টাকা দিতে হবে। আমার কাছে দেন ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'
বাকের একটা কুড়ি টাকার নোট বের করে দিলো।
টাক মাথার লোকটি বললো, ' আরো পাঁচটা টাকা দেন তাহলে ভালো কম্বল পাবেন। নয়, এমন কম্বল দিবে ঘুমাতে পারবেন না।'
'আপনি কতদিন ধরে আছেন এখানে?'
'তের মাস।'
'তের মাস? বলেন কি?'
'এতদিন হাজতে রাখার কোনো নিয়ম নাই। কোর্টে নিতে হয়। জামিন দিতে হয়, জামিন না হলে জোলখানায় হাজত আছে। কিন্তু–'
'কিন্তু কি?'
'না কিছু না।'
'দুইটা খুন করেছি। টাকা খেয়ে করেছি। যাদের টাকা খেয়ে করেছি। তারাই ধরিয়ে দিয়েছে। বড় ভাই, গোটা দশেক টাকা ধার দিতে পারেন? আমার ছেলে টাকা নিয়ে এলেই পেয়ে যাবেন।'
'আপনার নাম কি?'
'আমার নাম কবীর উদ্দিন। বাড়ি হচ্ছে গিয়ে মুন্সিগঞ্জ।' 'মুন্সিগঞ্জ গিয়েছেন কখনো?'
'না।'
'ভালোই করেছেন না গিয়ে। যাওয়ার মতো জায়গা না। আমি নিজেই যাই না।'
বাকের মানিব্যাগ খুলে দশটি টাকা দিলো। ব্যাগে আরো ত্ৰিশ টাকার মতো আছে। তার জন্য যথেষ্ট। সন্ধ্যার আগেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
সন্ধ্যার আগে কোন ব্যবস্থা হলো না। কেউ এলো না বাকেরের কাছে। অসুস্থ লোকটি বিকট শব্দে বমি করতে লাগলো মাঝরাতে।
বাকের ভেবেছিলো, এখানেই ম'রে পড়ে থাকবে। তা অবশ্য হলো না। ওসি সাহেব এসে তাকে হাসপাতালে পাঠালেন। হাজতঘরে কোনো বাতি নেই। বাতির দরকারও নেই। বারান্দার আলো এসে পড়ছে। এতেই দেখা যাচ্ছে। তবু ওসি সাহেব কি মনে করে যেন পাঁচ ব্যাটারির টর্চলাইট সবার মুখের ওপর কিছুক্ষণ করে ধরতে লাগলেন। বাকেরের মুখের ওপর তাও অনেকক্ষণ ধরা রইলো।
এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে হাসান সাহেব বাকেরের গ্রেফতার হবার খবর পেলেন দেড় দিন পর। তাও পত্রিকার মাধ্যমে। ছবি ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। কোন খবরই তিনি দুবার পড়েন না। এটিও পড়লেন না। যদিও তার মন বলতে লাগলো এ খবরটা আবার পড়া উচিত। এবং কিছু করলেন না। এগারটা বাজার আগেই বাসায় চলে এলেন। অফিসে তার কিছুই করার ছিলো না।
সেলিনা অসময়ে তাকে ফিরতে দেখে মোটেই অবাক হলেন না। যেন তিনি জানতেন হাসান সাহেব অসময়ে ফিরবেন। এবং এ জন্যেই যেন সেজোগুজে অপেক্ষা করছিলেন।
সেলিনা বললেন, ' তুমি কি আট ঘণ্টার নোটিসে চিটাগাং যেতে পারবে?'
'কেন?'
'পারবে কিনা আগে বলো।'
'না পারার তো কোনো কারণ দেখি না।'
'তানিয়ার বিয়ে। এখন আবার বলে বসো না যে তুমি তানিয়াকে চেনো না। চেন তো?'
'হ্যাঁ, চিনি। তোমার খালাতো বোন।'
না, হয়নি। আমার ফুফাতো বোন। হঠাৎ বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমাকে টেলিফোনে বললো। আমি বলে দিয়েছি যে ভাবেই হোক তোমাকে নিয়ে আমি কাল সকালে চিটাগাং উপস্থিত হবো।'
হাসান সাহেব কিছু বললেন না।
সেলিনা বললেন, 'কথা বলছো না কেন?'
'কি বলবো?'
'যেতে পারবে কিনা? বিয়েটা সেরে সেই রাতেই না হয় ফিরে আসবো। রাত দশটায় ট্রেন আছে। আমি টিকিট কাটতে পাঠিয়েছি। অনেক দিন ট্রেনে চড়া হয় না?' 'তোমার ট্রেনে চড়তে ইচ্ছা করে না?'
করে।'
'তুমি যে প্রায়টা একটা কবিতা বলতে কামরায় গাড়ি ভরা ঘুম। রজনী নিঝুম।'
'হা, বলতাম।'
'রাতের ট্রেনে জাস্ট আমরা দু’জন। ইন্টারেস্টিং হবে না? আমার তো মনে হয় খুব ফান হবে। '
'হবে হয়তো।'
'আমি তোমার সুটকেস গুছিয়ে রেখেছি।'
'কাজ তো তাহলে অনেক দূর এগিয়ে রেখেছো।'
'হ্যাঁ, তা রেখেছি।'
ট্রেন ছাড়লো রাত দশটায়। হাসান সাহেবের বেশ ভালোই লাগছে। কামরায় গাড়ি ভরা ঘুম রজনী নিঝুম। কবিতাটি বাববার মাথায় ঘুরছে। দু’জন মাত্র প্রাণী এ কামরায়। তাদের কেউ ঘুমুচ্ছে না। তবু এই কবিতার চরণটিই মাথায় আটকে গেলো কেন? সেলিনা কি সব যেন বলছে। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কিন্তু শুনতে ভালো লাগছে। সেলিনার গলার স্বর চমৎকার।
' এ্যাই তুমি কথা বলছো না কেন?'
'শুনছি। দুজনে কথা বললে কে শুনবে?'
'বাকেরের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু করেছো?'
হাসান সাহেব বললেন, 'তুমি জানতে?'
'জানবো না কেন?'
'কবে জানলে?'
'যেদিন ধরে নিয়ে গেল সেদিনই। তুমি অফিসে চলে গেলে। একটা ছেলে এসে আমাকে বললো।'
' আমাকে তো কিছু বলোনি, আমি জানলাম খবরের কাগজ পড়ে।'
সেলিনা চুপ করে রইলেন।
হাসান সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, ' আমাকে জানানো উচিত ছিলো। '
'আমার জানাতে ইচ্ছা করেনি।'
হাসান সাহেব আবার চুপ করে গেলেন। ট্রেন চলছে দ্রুতগতিতে। ঝিকঝিক শব্দ হচ্ছে। ছোটবেলায় এই শব্দে কত রকম গান মিশে যেতো। এখন যাচ্ছে না। শুধু রজনী নিঝুম কথাটা এসে মিশেছে।
সেলিনা বললেন, 'ঘুমিয়ে পড়েছো?'
"না।"
"বাকেরকে নিয়ে চিন্তা ক"রতে হবে না। ওর বন্ধু-বন্ধাবরা ওকে ছাড়িয়ে আনবে।
'আমি বাকেরকে নিয়ে ভাবছি না।'
'কি ভাবছো তাহলে?'
'নিজের কথা ভাবছি।'
কোর্টে বাকেরের জামিন হলো না। তার বিরুদ্ধে চারশত আটচল্লিশ এবং উনিশ অবলিকের এফ ধারায় দু’টি অভিযোগ। এই দু’টি অভিযোগই জামিনযোগ্য নয়। কোর্টে থেকে পুলিশ রিমান্ডে উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা। তার সহয়োগী অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্যাদি নেয়া। কিন্তু কাৰ্যক্ষেত্রে সে রকম কিছু হল না। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার ব্যাপারার পুলিশের কোন রকম আগ্রহ দেখা গেলো না। এরমধ্যে ইয়াদ এলো তাকে দেখতে। সুন্ট-টুট পরা ভদ্রলোক। চুলের স্টাইল বদলে ফেলেছে কিংবা কিছু একটা করেছে। তাকে চেনা যাচ্ছে না।
সে চোখ কপালে তুলে বললো, ' অবস্থা কি?'
'অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছিস।'
'হেভি পিটন দিয়েছে মনে হয়। মুখ ফোলা।'
'মারধর করেনি। মশার কামড়ে মুখ ফুলেছে।'
'মশারি দেয় না।'
বাকের উত্তর দিলো না তার প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে গারদের ফাঁক দিয়ে হাত বের করে প্রচণ্ড একটি চড় কষিয়ে দিতে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বললো, ' হা'রামজাদা!'
'আমি খবর পেয়েছি পরশু বুঝলি। খবর শুনে আমার মাথায় থান্ডার এসে পড়লো। বিনামেঘে বজ্রাঘাত। আমি ভাবলাম ব্যাপারটা কি! কোন ঝা'মেলায় জড়ালি। নে সিগা'রেট নে। '
বাকের সিগা'রেট নিলো।
টাক মাথার কবীর উদ্দিন বললো, ' স্যার আমারে একটা দেন। আমি বাকের সাহেবের খোঁজখবর করছি।'
ইয়াদ সিগা'রেটের প্যাকেট বাকেরের দিকে এগিয়ে দিলো।
রাজা মহারাজাদের মতো ভঙ্গি করে বললো, ' রেখে দে তোর কাছে। আর শোন কোনরকম চিন্তা করবি না। আমি, আমার শ্বশুর সাহেবকে বলছি। সে কানেকশনওয়ালা আদমি। দুই তিনটা টেলিফোন করলেই দেখষি জামিন হয়ে গেছে। তোর ভাই কিছু করছে?'
' জানি না। বোধ হয় কিছু করছে না। শুনলাম তার চাকরি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। '
'কি সমস্যা?'
'তা জানি না। বাংলাদেশে কি সমস্যার শেষ আছে নাকি? হা হা হা।'
বাকের পেট কাঁপিয়ে হাসতে লাগলো। এর মধ্যে তার একটা নাদুস নুদুস ভুড়িও হয়েছে। দেখলেই হাত বুলাতে ইচ্ছা করে।
'বাকের।'
'বল।'
'আমার একটা নিউজ আছে। শ্ৰীলংকা যাচ্ছি।'
'তাই নাকি?'
'হুঁ, আমার এক মামাশ্বশুর ম্যানেজ করে দিলেন। ব্যবসার ব্যাপার। ওখান থেকে নারকেল তেল আনবো।'
'ভালো।'
' আমার বউও সঙ্গে যেতে চাচ্ছে বুঝলি। দিনরাত ঘ্যান ঘ্যান করছে।'
'নিয়ে যা।'
'মেয়ে-ছেলে কোথাও সঙ্গে নিতে আছে? ঐ যে কি যেন বলে–পথে নারী বিবর্জিতা। আমিও চেষ্টা করছি। কিছু লাভ হবে না। এঁটেল মাটির মতো লেগে গেছে।'
বাকের চুপ করে রইলো। ইয়াদ তার সি'গারে'ট শেষ করে উঠে থু করে একদলা থুথু ফেললো।
চোখ মুখ কুঁচকে বললো, 'বড় গাধা জায়গা, বমি এসে যাচ্ছে। তুই কোন চিন্তা করিস না। চিকোবশ ঘণ্টার মধ্যে ছুটিয়ে নিয়ে যাবো। কাউকে কোন খবর -টবর দিতে হবে?'
'না। তুই যাচ্ছিস?'
'হুঁ।'
কবীর উদ্দীন বললো, 'স্যার আপনি বাকের সাহেবকে কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে যান। উনার হাতে একটা পয়সা নাই।'
ইয়াদ আশ্চর্য হয়ে মানিব্যাগ বের করলো। দুইটি একশ টাকার নোট এবং কিছু খুচরা ছিলো। একশ টাকার দু’টি নোটিই এগিয়ে দিলো। বাকের টাকা নেবার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখালো না।
হাত বাড়ালো কবীর উদ্দীন।
মুখ তৰ্তি হাসি দিয়ে বললো,' যাবার আগে ওসি সাহেবকে একটু স্যার বলবেন আমাদের দেখাশোনার জন্যে। একটা এক্সট্রা কম্বল পেলে স্যার খুব ভালো হয়।'
সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডের সময়সীমা শেষ। কিন্তু পুলিশ আরো সাত দিনের সময় চাইলো। কোর্ট সময় মঞ্জর করলো। বাকের পুরনো হাজতঘরে ফিরে এলো। কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে এলো না। প্রথম সাতদিন পার করতে যতটা খারাপ লাগছিলো। দ্বিতীয় সাতদিনে ততটা খারাপ লাগলো না। কারণ কবীর উদ্দীন কী ভাবে যেন গাজার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। গা'জাটা বেশ ভালো জিনিস। টানার জন্যে কলকে লাগে না। সিগা'রেটের তা'মাক ফেলে দিয়ে তার ভেতর গা'জা ভরে চমৎকার টানা যায়। ভালোই লাগে।
প্রথম খানিকক্ষণ মন খুব কোমল হয়ে যায়।
কাঁদতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে খুব ভালো ভালো কাজ করতে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিতে। সেই কোমল ভাবটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। খানিকক্ষণের মধ্যেই জগৎ-সংসার সম্পর্কে একটি বৈরাগ্য এসে পড়ে। এই বৈরাগ্যের ভাব সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। সবচেয়ে বড় কথা রাতের ঘুমটা ভাল হয়। এক ঘুমে রাত কাভার। ঢং ঢেং করে এরা যে ঘণ্টা পিটে সেই শব্দও কানো যায় না।
অন্যান্য হাজতিদের সম্পর্কে প্রথমদিকে তাক খানিকটা বিতৃষ্ণার ভাব ছিলো। এখন সেটা নেই। সবার সঙ্গেই তার এখন ভালো সম্পর্ক।
মতিলাল নামে একজন হাজতি ছাড়া পেয়ে চলে যাবার দিন বাকেরের বুক হুঁ-হু করতে লাগলো।
আর মতিলাল হারামজাদাও এমন গরু, ছাড়া পেয়েছিস বগল বাজাতে বাজাতে চলে যা, তা না। সবাইকে জড়িয়ে ধরে আকাশ-পাতাল কান্না।
এই ভাবে কাঁদলে অন্যদের চোখে পানি আসবেই।
বাকেরের গাল ভার হয়ে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো।
বহু চেষ্টায় গলার স্বর কর্কশ করে সে বললো, ' কী এত দেরি করছেন? বাড়ি চলে যান। আর এত কাঁদছেন কেন? মেয়েছেলে নাকি? চোখ মুছেন রে ভাই! '
চলবে..