ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

৯ম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

সিলেটের আকাশটা আজ বড্ড খেয়ালী। এই তপ্ত রোদ, তো এই এক চিলতে মেঘের ছায়া। তবে ক্যাম্পাসের পহেলা বৈশাখের উন্মাদনার কাছে প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আজ যেন তুচ্ছ।

আজ অনুর জন্য দিনটি একেবারেই আলাদা। জীবনের প্রথমবার সে শাড়ি পরেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই যেন নতুন করে আবিষ্কার করছিল। লাজুক দৃষ্টিতে একবার নিজেকে দেখে আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল।এহসানের দেওয়া সেই ধবধবে সাদা পিওর মসলিন শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নেওয়ার সময় অনুর হাত দুটো থরথর করে কেঁপে উঠছিল। লাল পাড়ের সূক্ষ্ম নকশা করা শাড়িটা তার তন্বী দেহে নিখুঁতভাবে জড়িয়ে যেতেই আয়নায় যেন এক অপরূপ রূপসীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল। শুভ্র মসলিনের কোমল আবরণে অনুকে আজ ঠিক শরতের ভোরে ঝরে পড়া স্নিগ্ধ শিউলি ফুলের মতোই নির্মল আর মায়াবী লাগছে।
অনামিকা রুমে ঢুকেই দরজার কাছে থমকে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড বিস্ময়ে অনুর দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ দু'হাত মাথায় দিয়ে চিৎকার করে উঠল,"ওরে বাবা! অনু! তোকে তো দেখে চেনারই উপায় নেই রে!"অনু চমকে তাকাল। তারপর লজ্জায় মুখটা নিচু করে ফেলল। তার দু'গাল টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। মৃদু হেসে আঁচলটা আরেকটু গুছিয়ে কাঁধে টেনে নিল সে।
অনামিকা ধীরে ধীরে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার ভালো করে দেখে ঠোঁট কামড়ে বলল,"সত্যি করে বল, তুই কি আমার সেই অনু? নাকি রাতারাতি কোনো সিনেমার নায়িকা হয়ে গেছিস?"
—ধুর! কী যে বলিস!"
—"আমি কিন্তু একদম সিরিয়াস। তোকে তো প্রতিদিনই দেখি। কিন্তু আজ... আজ তোকে দেখে আমারই চোখ আটকে যাচ্ছে।"
অনু লাজুক গলায় বলল,"এত বাড়িয়ে বলিস না তো। অস্বস্তি লাগছে।"
অনামিকা মুচকি হেসে ওর গাল টিপে দিল।"আচ্ছা, একটা কথা বল। আজ এভাবে সাজলি কেন? কার জন্য এত আয়োজন?"
প্রশ্নটা শুনে অনুর বুকটা ধক করে উঠল। এহসানের কথাটা মনে পড়তেই চোখের পাতা কেঁপে উঠল। তবে সেটা প্রকাশ না করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।"আজ তো পহেলা বৈশাখ। তাই একটু সাজলাম।"
অনামিকা ভ্রু নাচিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,"শুধু বৈশাখের জন্য? নাকি কেউ বিশেষ করে বলেছে শাড়িটা পরতে?" অনামিকা জানত না যে শাড়িটা এহসান অনুকে দিয়েছে। সে শুধু অনুকে জ্বালানোর চেষ্টা করছিল।
অনামিকার কথায় অনু একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে সে কপাল কুঁচকে অনামিকার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু বিরক্তির সুরে বলল,
 "বাজে বকিস না তো, অনামিকা। তুই তো জানিস, এমন কেউ নেই..."
অনামিকা আর খোঁচাল না। "যাই হোক, আজকে কিন্তু ক্যাম্পাসে তুই সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবি। বিশেষ করে ছেলেদের অবস্থা দেখার মতো হবে।"
—"চুপ কর তো! কেউ শুনে ফেলবে।"
—"শুনুক না। সত্যি কথাই তো বলছি।"
অনু অসহায়ের মতো মাথা নেড়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।"চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"হ্যাঁ, চল। না হলে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে।"কথাটা বলে দু'জনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হলো।
 সকালের নরম রোদে চারপাশটা ঝলমল করছে। ক্যাম্পাসমুখী রাস্তায় ইতোমধ্যেই লাল-সাদা পোশাকে সেজে ওঠা শিক্ষার্থীদের ভিড়। হাসি, আড্ডা আর বৈশাখের উচ্ছ্বাসে চারপাশ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।ক্যাম্পাসে পৌঁছে করিডোর দিয়ে হেঁটে আসতেই আশপাশে থাকা সবার দৃষ্টি যেন এক মুহূর্তে অনুর ওপর স্থির হয়ে গেল। যে-ই একবার তাকাচ্ছিল, সে-ই কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ ফেরাতে ভুলে যাচ্ছিল। সাদা মসলিনে মোড়া লাজুক মেয়েটি আজ অজান্তেই ক্যাম্পাসের অসংখ্য দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল।
ক্যাম্পাসের মেইন বিল্ডিংয়ের ওপরতলার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এহসান, সাজিদ, জেড, আহিয়ান আর নীল। পাঁচ বন্ধুর পরনেই ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, যেন একসূত্রে গাঁথা এক দল। গত চার বছর ধরে পহেলা বৈশাখে একই রঙের পাঞ্জাবি পরা তাদের অলিখিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। 
আহিয়ান নিজের সানগ্লাসটা নাকের ডগায় নামিয়ে নিচের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"দোস্ত... আজকের বৈশাখটা বড্ড বিপজ্জনক! গরমে না, ওই যে লাল শাড়ি পরে মেয়েটা হাঁটছে, ওকে দেখলেই মনে হচ্ছে আমার হার্টবিট বৈশাখী ঢাকের তালে বাজতে শুরু করেছে "
কথা শেষ করেই আহিয়ান পাঞ্জাবির কলারটা ঝটকা মেরে ঠিক করল। চুলে একবার হাত বুলিয়ে বুক সোজা করে দাঁড়াল। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে এমন এক মোহময় হাসি ছুড়ে দিল, যেন তার দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটি যদি একবারও সেই হাসিটা দেখে, তবে প্রেমে পড়তে বাধ্য।
আহিয়ানের এসব কাণ্ড দেখে সাজিদের মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,"মান-ইজ্জত বলে কিছু রাখবি, নাকি সব বৈশাখের মেলায় বিলিয়ে দিবি? যেখানে যে মেয়েই দেখিস, সে মেয়ে তোর ভালো লাগে ! দুই মিনিটের মধ্যে প্রেমে পড়ে যাস, তারপর আবার ভাবিস মেয়েটাও তোর প্রেমে পড়ে যাবে! আল্লাহ জানে, তোর এই রোগের চিকিৎসা আদৌ আছে কি না "
সাজিদ এতক্ষণ ধরে একনাগাড়ে বকবক করেই যাচ্ছিল। অথচ আহিয়ানের কানে যেন একটা কথাও ঢুকছিল না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিক থেকেই চোখ সরাতে পারছিল না সে। আহিয়ানের এই অবস্থা দেখে সাজিদ বিরক্ত-হাসি হেসে ওর মাথার পেছনে হালকা একটা চাপড় মেরে বলল,"আল্লাহর ওয়াস্তে, আর কত? লাস্ট সেমিস্টারে এসেও তোর এই ফ্লার্ট করার রোগটা গেল না! জুনিয়র দেখলেই তোর ভেতরের রোমিও জেগে ওঠে। এমনি এমনি কি আর সবাই তোকে 'ফ্লার্টিং মাস্টার' বলে?
সিনিয়র জুনিয়র কাউকে তো বাকি রাখিস নি...দেখিস আবার না 'প্রিন্স মামুন' হয়ে যাস। পরে তোর ব্লু -ফেরি লায়লা তোকে একেবারে মজনু বানিয়ে কেটে পড়বে "
আহিয়ান গম্ভীর মুখ করার ভান করে বুক ফুলিয়ে বলল,"ভাই, এটা ট্যালেন্ট... সবার কপালে থাকে না, ই হাদারাম, মেয়ে পটাতে পারিস না। এটা তোর দোষ, বুঝলি।"
নীল এতক্ষণ দূর থেকে দু'জনের কথাবার্তা শুনছিল। পাঞ্জাবির হাতা একটু গুটিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, "শুইটিয়ে লাল করে দেব। নোংরামি বের করে দেব। মেয়ে দেখে এগুলো করছিস যে, বাড়িতে জানে?"
নীলের কথা বলার ভঙ্গি দেখে এহসানও অজান্তেই হো হো করে হেসে উঠল। ওকে হাসতে দেখে বাকিরাও অবাক হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কারণ এহসান সাধারণত খুব কম কথা বলে, আর স্বভাবে ভীষণ গম্ভীর। ওর মুখে এমন প্রাণখোলা হাসি দেখা সত্যিই বিরল।তবে এই হাসি-ঠাট্টার ভিড়ে জেডের যেন কোনো আগ্রহই নেই। ওর সমস্ত মনোযোগ নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একটিমাত্র মানুষের দিকে......
—"অনামিকা"
অনামিকা তখন অনুর পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে হাতে ধরা চিপসের প্যাকেটটা খুলতে ব্যস্ত। ঠিক সেই দৃশ্যটা চোখে পড়তেই জেডের চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
—"চিপস!"এক সেকেন্ডও দেরি করল না সে।
"এই, কোথায় যাচ্ছিস?"—নীলের প্রশ্নটা শেষ হওয়ার আগেই জেড ভোঁ দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটল।মুহূর্তের মধ্যে নিচে নেমে এসে একেবারে চিলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনামিকা প্যাকেটটা খুলে প্রথম চিপসটা মুখে দেওয়ার আগেই জেড এক টানে পুরো প্যাকেটটাই ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। তারপর প্যাকেটটা হাতে নিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। 
মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে একটা চিপস মুখে পুরে বলল,"ধন্যবাদ! মানুষের উপকার করলে সওয়াব হয়। আমি দোয়া করে দিলাম, ভবিষ্যতে হ্যান্ডসাম হাজবেন্ড পাবে "
অনামিকা অবাক হয়ে হাত বাড়িয়েই রইল। দেখল জেড বেশ আয়েশ করে একটা চিপস মুখে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
"এই যে জেড ভাইয়া! এটা আমার খাবার! বাচ্চাদের মতো অন্যের খাবার কেড়ে নিতে আপনার লজ্জা করে না?" অনামিকা রাগে ফেটে পড়ল।জেড নির্বিকার ভঙ্গিতে চিবোতে চিবোতে বলল, "বাচ্চা ? আমি?আমি তো তোমার 'সিনিয়র'। সিনিয়ররা জুনিয়রদের খাবার আগে চেক করে দেখবে না? যদি বিষ -টিষ কিছু থাকে? আমরা থাকতে তোমাদের কোনো বিপদ হতে দেব না কি? আশ্চর্য "
অনামিকা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, "আপনি সবার সামনে আমার প্যাকেট কেড়ে নিলেন, এটা কোনো ভদ্রতা হলো? আজকের দিনটা আমার মাটি করে দিলেন আপনি,,আপনার কি আর কোনো কাজ নেই নাকি? যখনই দেখেন, আমার চিপসের পেছনে পড়ে থাকেন।"
 
"জেড চিপসের প্যাকেটটা উঁচুতে ধরে অনামিকার নাগালের বাইরে নিয়ে গেল। অনামিকা লাফিয়েও সেটা ধরতে পারল না। জেড একটা চিপস মুখে পুরে আয়েশ করে চিবিয়ে বলল, " প্যাকেটটা ফেরত চাও? তাহলে এক কাজ কর, সবার সামনে বলো জেড ভাইয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সিনিয়র, তবেই পাবে, বলো বলো "
অনামিকা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, "স্বপ্নেও না! আপনার মতো চোর সিনিয়রের প্রশংসা করার চেয়ে আমি না খেয়ে থাকব, তবু করব না "
মনে মনে আবার দাঁত চেপে বলল,"এই লোকটার আস্পর্ধা দেখো! সুযোগ পেলেই আমার জিনিস চুরি করে, আবার ভাব যেন দুনিয়ার সবচেয়ে ভদ্র মানুষ! দাঁড়ান... একদিন আপনার ওই লম্বা চুলে এমনভাবে চুইংগাম লাগাব, তিন ঘণ্টা ধরে টানাটানি করলেও খুলতে পারবেন না। তখন বুঝবেন অনামিকার সঙ্গে লাগার ফল কী!"
জেড এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ইয়া মারহাবা,ধরতে পারলে চিপস নিয়ে যায়। এই বলে জেড আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হাতে চিপসের প্যাকেটটা শক্ত করে ধরে দৌড় দিল। 
সময় গড়াতে গড়াতে সকাল পেরিয়ে দুপুরের কাছাকাছি, ঘড়ির কাঁটায় তখন ১২টা ৩৯ মিনিট।
তামরিন লাল-সাদা শাড়িতে সেজেছে, নীলের জন্য বললে ভুল হবে না। আজকের সাজে যেন তার সবটুকু যত্ন, সবটুকু অপেক্ষা লুকিয়ে আছে। খোঁপায় গোঁজা বেলী ফুলের মালাটা বারবার ঠিক করে দিচ্ছিল সে, যেন ছোট্ট কোনো ভুলও নীলের চোখ এড়িয়ে না যায়।
 কিন্তু নীল আজ অন্য এক জনের মায়ায় আটকে গেছে।এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অনুর শুভ্রতা যেন তার চোখ সরতেই দিচ্ছে না। চারপাশের এত মানুষের ভিড়েও নীলের দৃষ্টি বারবার গিয়ে থামছে অনুর কাছেই।
আহিয়ান তামরিনের পাশে দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করছিল।ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই বুঝতে পারে, তামরিন নীলকে পছন্দ করে। তার চোখের চাহনি, নীলের প্রতি আলাদা যত্ন আর ছোট ছোট আচরণগুলো কারো চোখ এড়ায় না। কিন্তু কেউই কখনো সরাসরি তামরিনকে জিজ্ঞেস করেনি। হয়তো বন্ধুত্বের মাঝে অস্বস্তি তৈরি করতে চায়নি কেউ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,"তামু, নীল আজ একটু বেশিই বৈশাখী হাওয়া গিলে ফেলেছে তো... তাই মনে হয় চোখ আর কাজ করছে না। সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে, আর কে দূরে—সেটাই বুঝতে পারছে না।"
তামরিন কথাটা শুনে একটু ম্লান হাসল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা চোখ এড়াল না আহিয়ানের ।নীলের চোখেমুখে তখনো অনুর প্রতি সেই মুগ্ধতা স্পষ্ট।ঠিক তখনই এহসান নীলের দিকে তাকাল।  
এহসান স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিল, নীল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অনুর দিকে বারবার তাকাচ্ছে। নীলের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হালকা হাসিটাও এহসানের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে গেল না।দৃষ্টিতে ফুটে উঠল কঠোরতা। সে কিছুক্ষণ নীরবে নীলের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওর মনের ভেতরের কথাগুলোও পড়ে ফেলতে চাইছে।তারপর বেশ শক্ত গলায় নীলকে উদ্দেশ্য করে বলল—
"নীল, অন্যের বাগান সুন্দর হলেই সেখানে হাত বাড়াতে নেই। কাঁটায় হাত কেটে যাওয়ার ভয় থাকে। তার চেয়ে বরং নিজের সামনের বেলী ফুলের গন্ধ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি?"
কিন্তু নীল এহসানের কথার গভীরতা বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারল না। নীল হোহো করে হেসে উঠল, "এহসান সাহেব ,আপনিও দেখি আজ মারাত্মক সব ডায়ালগ মারছেন! ঠিক বলেছেন, বাগান তো সুন্দর হবেই! আর সুন্দর জিনিস উপভোগ করা তো আমাদের মতো ব্যাচেলরদের কাজই" নীলের এই বোকামি আহিয়ান হাসিতে ফেটে পড়ল। সে হাসতে হাসতে বলল, "দেখলি এহসান? একেই বলে 'হাঁদারাম'! তোর কথা ওর মাথার ৩ ফিট ওপর দিয়ে গেছে!"
এহসান নিজেও একটু হাসল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল এক অদ্ভুত দহন। সে দেখল নিচ থেকে অনু একবার ওপরের দিকে তাকিয়েই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। এহসানের বুকের ভেতরটা তখন দাউদাউ করে জ্বলছে...
এহসানের এই লুকোচুরি খেলাটা আর ভালো লাগছিল না। ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিরক্ত লাগছিল তার। অনুকে শাড়ি পরতে বলাটাই এখন তার কাছে নিজের সবচেয়ে বড় ভুল মনে হচ্ছে।কেন যে বলতে গেল সে! এখন এতগুলো মানুষ অনুকে দেখছে... কারো চোখে মুগ্ধতা, কারো চোখে প্রশংসা। আর সেই প্রতিটা দৃষ্টি এহসানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি তৈরি করছে।
এহসান মনে মনে বিরক্ত হয়ে —নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল, "এই ছয় মাসের চুক্তিতে আমি কি নিজেই ফেঁসে যাচ্ছি রূপকথা? না... আমি ফেঁসে গেছি। অনেক আগেই ফেঁসে গেছি। যেদিন ইউনিভার্সিটিতে প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, সেদিনই তোমার মায়ায় আটকে গিয়েছিলাম। নতুন করে আর তোমার মায়ায় জড়ানোর কিছু নেই...তোমাকে আমার অনেক কিছু বলার আছে, রূপকথা... অনেক না বলা কথা, অনেক অনুভূতি জমে আছে।"
........
সিলেটের আকাশটা যেন এতক্ষণ ওত পেতে ছিল। হঠাৎ করেই কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। মুহূর্তেই ক্যাম্পাসজুড়ে হুল্লোড় পড়ে গেল। ছাত্র-ছাত্রীরা যে যেদিকে পারছে, দৌড়ে আশ্রয় নিচ্ছে বিভিন্ন ভবনের বারান্দা আর করিডোরে।
কিন্তু অনুর মনটা অদ্ভুতভাবে বৃষ্টির দিকে টানল। কেন সে নিজের মনের কথা শুনবে না? অবশ্যই শুনবে।সবার অলক্ষ্যে সে পা বাড়াল ক্যাম্পাসের পেছনের নির্জন বাগানটার দিকে। জায়গাটা এমনিতেই খুব একটা কেউ আসে না। এখন তো চারপাশ একেবারেই জনশূন্য। টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে যেন পুরো পরিবেশটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বদলে গেল। ।
এদিকে বৃষ্টির কারণে পুরো করিডোরটাই যেন আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। যে যার বন্ধুদের নিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বসে আছে। কোথাও গল্প, কোথাও হাসাহাসি, আবার কোথাও তুমুল খুনসুটি চলছে।ঠিক তখনই অন্য এক সার্কেল থেকে জেডদের ক্লাসেরই একজন জোরে বলে উঠল, ওই জেড! বাইরে এমন বৃষ্টি হচ্ছে, একটা গান ধর না!কথাটা শুনে আশপাশের আরও কয়েকজন সায় দিল। হ্যাঁ, মামা! একটা গান হোক! এই আবহাওয়ায় তোর গান না হলে জমছেই না!সবার উৎসাহ দেখে আহিয়ান বেঞ্চ থেকে উঠে টেবিলের ওপর রাখা গিটারটা এনে জেডের হাতে ধরিয়ে দিল।চল, মামা। চল মামা, শুরু কর...
চারপাশের সবার আগ্রহ দেখে জেডের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। গিটারটা হাতে নিয়ে তারের ওপর আলতো করে আঙুল বুলিয়ে গলা ছাড়ল। বৃষ্টির ঝাপটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার ভরাট কণ্ঠ ভেসে আসতে লাগল—
"আগে কত বৃষ্টি যে দেখেছি শ্রাবণে।
জাগেনি তো এতো আশা ভালোবাসা এ মনে...
সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী।
আজ ভিজতে ভালো লাগে শূন্য মনে জাগে প্রেমের কাহিনী...।
বাগানের সেই নির্জন কোণাটায় যেন পৃথিবীর সব কোলাহল এসে থেমে গেছে। বিশাল কামিনী গাছটার ডালপালা মাথার ওপর ছাতার মতো ছড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু আজকের উন্মত্ত বর্ষার কাছে সেই আশ্রয়ও অসহায়। পাতার ফাঁক গলে একটানা বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। কখনো বড় বড় ফোঁটা টুপ করে কাঁধে পড়ছে, কখনো ঝিরঝিরে জলকণা বাতাসে ভেসে এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে।অনু দু'হাত দিয়ে নিজের শরীর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শাড়িটা পুরোপুরি ভিজে গায়ের সঙ্গে লেগে গেছে। ঠান্ডা বাতাসে ওর কাঁধ কেঁপে উঠছে বারবার। কপাল বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে চোখের পাপড়িতে এসে জমছে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে সে পানি সরানোর চেষ্টা করছে।ঠিক তখনই...মচ...মচমচ... করে ভেজা পাতার ওপর কারও পায়ের চাপা শব্দ শোনা গেল।
অনু চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠতেই সে দ্রুত পেছন ফিরে তাকাল।সামনে দাঁড়িয়ে আছে এহসান।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে কেউ যেন হেঁটে চলে এসেছে। সাদা পাঞ্জাবিটা পুরোপুরি ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। প্রশস্ত কাঁধ, ভেজা কাপড়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কপালের ওপর এলোমেলো চুলগুলো থেকে টুপটাপ করে জল ঝরছে। বাম হাতের কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটাও ভিজে চকচক করছে।
কিন্তু এসবের চেয়েও বেশি দৃষ্টি আটকে যায় ওর চোখে। আজ সেই চোখে নেই কোনো কঠোরতা, নেই কোনো আদেশ। বরং এমন এক গভীর দৃষ্টি, যেন বহু দিন ধরে জমে থাকা হাজারো অব্যক্ত কথা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।এহসান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন খুব হিসেব করে ফেলা। যেন ভয় পাচ্ছে, একটু তাড়াহুড়ো করলেই এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে।
অনু অকারণে অস্থির হয়ে উঠল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এত জোরে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে, এই বৃষ্টির শব্দও তাকে ঢাকতে পারছে না। অস্বস্তিতে সে নিজের শাড়ির আঁচলটা আরও শক্ত করে বুকের কাছে টেনে নিল। মাথা নিচু করে ভাবল, " উনি এখানে কেন? যদি কিছু বলেন? আমি তো কিছুই করিনি..."
অনু পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইতেই এহসান খুব আলতো করে ওর বাঁ হাতটা ধরে ফেলল। শক্ত নয়, জোরও নয়; কেবল এমন এক স্পর্শ, যাতে থামিয়ে দেওয়ার অনুরোধ আছে। অনুর আঙুলগুলো ঠান্ডায় একেবারে বরফ হয়ে আছে। এহসান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে খুব যত্ন করে বের করল এক ছড়া তাজা বেলী ফুলের মালা। সাদা ছোট ছোট ফুলগুলো বৃষ্টিতে ভিজেও আশ্চর্যরকম সতেজ। 
এহসান কোনো কথা বলল না। মনোযোগ নিয়ে অনুর কব্জিতে বেলী ফুলের মালাটা পেঁচিয়ে দিল। ওর আঙুলের ছোঁয়া খুব সামান্য, তবু সেই সামান্য স্পর্শেই অনুর পুরো শরীর কেঁপে উঠল। 
মালাটা পরিয়ে দেওয়ার পরও এহসান হাত ছাড়ল না। দুজনের মাঝখানে নেমে আসা বৃষ্টির সরু জলরেখাগুলো যেন এক অদৃশ্য পর্দা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এহসান একটু ঝুঁকে এল। অনুর কানের খুব কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "বলেছিলাম না... এই শাড়িটায় একজনকে খুব মায়াবী লাগবে? " অনু নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল। এহসান মৃদু হেসে আবার বলল, "আজ আয়নায় নিজেকে দেখেছ? ঠিক যেন বর্ষার ভেজা সকালে ফুটে থাকা কোনো নাম না জানা সাদা ফুল।"
কথাগুলো শেষ হতেই অনুর চোখের পাপড়ি কেঁপে উঠল। এই মানুষটাকে সে চেনে, এই কণ্ঠস্বরকেও চেনে। কিন্তু আজকের এহসান যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন। যে মানুষটা অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে জানে, সে-ই আজ কয়েকটি সাধারণ বাক্যে নিজের হৃদয়ের অনেকটা খুলে দিল।অনু ধীরে ধীরে মুখ তুলল। ভেজা চোখদুটো সোজা গিয়ে আটকে গেল এহসানের চোখে। কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল। তারপর প্রায় হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, "আপনি... সত্যিই শাড়িটা আমার জন্য কিনেছিলেন? কিন্তু সেদিন তো বলেছিলেন... অন্য কারও জন্য..."
এহসান কোনো উত্তর দিল না। তার চোখের গভীরতা এক পলকে অনুর সব দ্বিধাকে শুষে নিল। সে নিজের হাত বাড়িয়ে অনুর ভেজা গালে লেগে থাকা জলটুকু বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব আলতো করে মুছে দিল। ওর আঙুলের এই উষ্ণ ছোঁয়াটা লাগতেই অনুর বুকের ভেতরটা ধড়াম করে কেঁপে উঠল, ঠিক যেন মরুভূমির বুকে হুট করে এক ফোঁটা ঠান্ডা বৃষ্টি এসে পড়ল।
এহসান আরও এক কদম এগিয়ে এল। দুজনের মাঝখানের দূরত্বটুকু এবার বাতাসে মিলিয়ে গেল। এহসান অনুর চোখের দিকে তাকিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে বলল, "কখনো কখনো সত্যিটা আড়াল করতে হয়, রূপকথা। না হলে তো তোমার ওই লাজুক চোখ দুটোর মায়া আমি সহ্য করতে পারব না। তুমি জানো না, এই সাদা মসলিনে তোমাকে দেখার জন্য আমি কতটা অধীর ছিলাম।"
অনু অবাক হয়ে এহসানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো ঘৃণা নেই, কোনো রাগ নেই। আছে শুধু এক গভীর, অতলান্ত অধিকারবোধ আর অব্যক্ত প্রেমের আকুতি। বৃষ্টির শব্দ যেন তাদের চারপাশ থেকে আড়াল করে এক মায়াবী বৃত্ত তৈরি করেছে।
এহসান অনুর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে, নিজের মুখের খুব কাছে এনে, বৃষ্টির তোড়জোড় ছাপিয়ে চিৎকার করে "শোনো রূপকথা! আজ এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সাক্ষী থাকছে, আজ থেকে এই রূপকথা শুধুই এহসানের! অন্য কারো নয়! আমি জানি না কাল কী হবে, আমি জানি না আমরা কোথায় যাব, কিন্তু আজ... আজ আমি আর কোনো চুক্তি বা কোনো দেয়াল মানি না!"
এহসানের গলার স্বর এবার আবেগে বুজে এল। সে অনুর কপালে আলতো করে নিজের কপাল ছোঁয়াল। দুজনের নিশ্বাসের তপ্ত হাওয়া বৃষ্টির শীতলতাকে হার মানিয়ে দিল।অনু তখন বলে উঠলো, ভালবাসেন আমাকে?? 
"সময় হলে বলব রূপকথা। সময় সব বলে দেবে।"
অনুর ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। এই জেদি আর গম্ভীর মানুষটা হয়তো মুখে চট করে ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে না, কিন্তু তার এই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরা আর পাগলামিই হলো তার প্রেমের ভাষা। অনু আর নিজের মনকে আটকে রাখল না। এতদিনের সব দ্বিধা, সব ভয় আর ছয় মাসের চুক্তির সেই কঠিন দেয়াল একদম বালির প্রাচীরের মতো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল। সে সম্পূর্ণ সমর্পণের অঙ্গীকার নিয়ে নিজেকে এহসানের বুকে সঁপে দিল।
বৃষ্টির তোড় আরও বাড়ল। দূর থেকে ভেসে আসছিল জেডের সেই গানের সুর— 
শ্রাবণের বুকে প্রেম
কবিতা যে লিখে যায়
হৃদয়ের মরু পথে
জলছবি থেকে যায়
জানি সেই তো ছিল আগে
ঘুমে অনুভবে
স্বপ্নচারিনী
আজ রাগে অনুরাগে
লেখে বৃষ্টি দাগে
প্রেমের কাহিনী
রিমঝিম এ ধারাতে
চায় মন হারাতে...
 সেই শূন্য বাগানে, বৃষ্টির অঝোর ধারায় এহসান আর অনু একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল। এ যেন এক নতুন গল্পের শুরু, যেখানে ঘৃণা আর চুক্তির দেয়াল টপকে ভালোবাসা চুপিচুপি উঁকি দিচ্ছে।
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল।
 "কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ "
পর্ব : ৪(২)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন