বিগত দুই দিন ধরে অনবরত কল কেটে দেওয়ার পর, আজ বিকেল গড়িয়ে যখন ধূসর সন্ধ্যা নামল, তখন অনুর ফোনটা আর জ্বলে উঠল না। কাচের স্ক্রিনটা এক গভীর, মৌন এবং নির্মম অন্ধকারে ডুবে রইল। যেন ওপাশ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার একটা অলিখিত ঘোষণা চলে এসেছে।
বিছানা ছেড়ে ধীর, ক্লান্ত পায়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল অনু। জানালার লোহার গ্রিলটা শক্ত করে চেপে ধরে ও বাইরের জমাট বাঁধা কালচে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে জল শুকিয়ে যাওয়া ফ্যাকাসে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদসিন্ধু মেশানো বিদ্রূপ আর তাচ্ছিল্যের হাসি। মনের ভেতর বিষাক্ত এক অনুভূতি তীরের মতো বিঁধে রইল—
‘এতক্ষণে হয়তো ওনার হবু বউ নাইসা সবটা বলে দিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে যে অনু ওনাদের সম্পর্কের সব নোংরা সত্যি জেনে গেছে। আর তাই হয়তো ওনার আর এই মিথ্যে ভালোবাসার নাটক করার বা কল দেওয়ার প্রয়োজন মনে হয়নি। ছয় বছরের পুরোনো ভালোবাসার কাছে আমার এই মাত্র দুই দিনের জোর করে হওয়া ভালোবাসার দামই বা কতটুকু?’
ঘরের এই দমবন্ধ করা, থমথমে পরিবেশ আর এক মুহূর্তও সহ্য হচ্ছিল না অনুর। নিজেকে একটু হালকা করতে, এই যন্ত্রণার খাঁচা থেকে নিশ্বাস বাঁচানোর তাগিদে ও ধীর পায়ে দরজা খুলে ড্রইংরুমের দিকে এলো। সেখানে সোফায় বসে আপনমনে গল্প করছিলেন ওর মা শিরিন সিদ্দিকী এবং ওর ফুফু। ফুফু এসেছেন অনেক দূর থেকে, সেই চট্টগ্রাম থেকে। সিলেট থেকে দূরত্বের কারণে সচরাচর ওনাদের এ বাড়িতে খুব একটা আসা হয় না। এবার যখন এসেছেন, বেশ কয়েকটা দিন অনুদের সাথেই থেকে গেছেন।
অনু ড্রইংরুমে পা রাখতেই শিরিন সিদ্দিকী মেয়ের মলিন, ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের নিচের গাঢ় কালো দাগের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন, ওনার বুকটা ধক করে উঠল। চিন্তিত ও ব্যাকুল গলায় বললেন,
“কী রে অনু? শরীরটা কেমন লাগছে এখন তোর? আয়, এখানে এসে একটু বোস আমাদের সাথে। কদিন ধরে তো তুই ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করছিস না।পড়াশোনার চাপ নিচ্ছিস ... বুঝতে পারছি বুঝি, পড়াশোনা জরুরি। কিন্তু তাই বলে নিজের শরীরের এই অবস্থা করবি? পড়ালেখার পাশাপাশি খাওয়া-দাওয়া, ঘুম আর নিজের যত্নের দিকেও নজর দে । তোর চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, মা।
অনু যথাসম্ভব নিজের ভেতরের ওলটপালট হওয়া ঝড়টাকে আড়াল করার চেষ্টা করল। চোখ নামিয়ে এড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, “না মা, আমি ঠিক আছি।”
তখনই ফুফু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলতো হেসে বললেন, “ভাবি, কাল সকালে তো আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে। দেখতে দেখতে দিনগুলো কেমন কেটে গেল। এবার বাড়ি ফিরতে হবে।রিদের পরীক্ষা আছে। এখানে থাকলে হবে না, সারাদিন শুধু গেম নিয়েই পড়ে থাকে, দেখছো না? ”
ফুফুর চলে যাওয়ার কথা শুনতেই অনু হঠাৎ চমকে মুখ তুলে ওনার দিকে তাকাল। ওর মনের ভেতর তীব্র এক পলায়নপর মানসিকতা, এক অদ্ভুত জেদ জেগে উঠল। এই বাড়ি, এই চেনা শহর, এহসানের দেওয়া প্রতিটা স্মৃতি আর নাইসার সেই বিষাক্ত কথা...সবকিছু থেকে ও বহুদূরে কোথাও পালিয়ে যেতে চাইল। অনু এক মুহূর্ত চিন্তা না করে ফুফুর হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকুল গলায় বলে উঠল, “ফুপি... তুমি আমাকে তোমার বাড়ি নিয়ে যাবে? আমি তোমার সাথে চট্টগ্রাম যাব।”
ফুফু প্রথমে অনুর এই আকস্মিক কথায় বেশ অবাক হলেন, তারপর অনুর মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে হেসে উঠে বললেন,
“ওমা! যাব না কেন? তোদের তো কতবার ডাকলাম, তোরাই তো যাস না। সত্যি যাবি আমার সাথে?”
শিরিন সিদ্দিকী কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, “কিন্তু অনু, আর মাত্র কয়েকদিন পরেই তো তোমার পরীক্ষা শুরু হবে। এই অসময়ে পরীক্ষার চাপ মাথায় নিয়ে বাইরে যাওয়া কি ঠিক হবে? পরীক্ষাটা শেষ হোক, তারপর যেয়ো।”
অনু এবার ছোট বাচ্চাদের মতো জেদ ধরার সুরে, চোখ দুটো ছলছল করে আবদার মাখা মুখে বলল, “বেশি দিনের জন্য তো যাব না, মা। মাত্র দুই দিন থাকব। প্লিজ মা, আমাকে যেতে দাও না? আমি একটু যাই?”
অনুর চোখের কোণে জমে থাকা জল আর মুখের এই আকুল আকুতি দেখে ফুফুর মনটা এক নিমেষে গলে গেল। তিনি শিরিন সিদ্দিকীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাবি, মেয়েটা তো কখনো নিজে থেকে কোথাও যেতে চায় না। দুই দিনের কথাই তো বলছে, যখন যেতে চাইছে—তাহলে ঘুরে আসুক না একটু। কদিন ধরে ঘরে কেমন মনমরা হয়ে আছে, বাইরে গেলে মনটাও ভালো হবে।”
শিরিন সিদ্দিকী তাও হয়তো ‘না’ করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই প্রধান দরজা দিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকলেন অনুর বাবা মাহবুব তালুকদার। তিনি কোটের বোতাম খুলতে খুলতে সব কথা শুনে গম্ভীর কিন্তু স্নেহশীল গলায় বললেন, “হ্যাঁ, নিয়ে যাও, ও একটু ঘুরে আসুক। কদিন ধরে ঘরে আটকে থেকে মেয়ের চেহারাটা কেমন শুকিয়ে গেছে। ঘুরাঘুরি করে আসলে মন ভালো থাকবে, পরীক্ষাও ভালো হবে। পড়ালেখায় আরও মন বসবে।”
স্বামীর এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর শিরিন সিদ্দিকী আর কোনো কথা বাড়ালেন না। যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা হলো ঠিকই, কিন্তু অনুর বুকের ভেতরের হাহাকার আর শূন্যতাটা তিলমাত্র কমল না।
অন্য দিকে, আজকেই এহসান, জেদ, নীল আর সাজিদদের সবার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তি আর পরীক্ষা শেষের একরাশ হালকা অনুভূতি নিয়ে সন্ধ্যার সময় সবাই মিলে এক জায়গায় আড্ডা দেওয়ার কথা ঠিক করল।
সাধারণত সন্ধ্যার পর খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তামরিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বাইরে বের হয় না। কিন্তু আজ হঠাৎ ওর ফোনে একটা কল আসতেই ও যেন আকাশ থেকে পড়ল। ফোনের ওপাশের কথা শুনে ওর পুরো শরীর কাঁপতে লাগল, হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হন্তদন্ত হয়ে ও যখন জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে একপ্রকার দৌড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছন থেকে ওর মা কড়া গলায় ডাকলেন, “তামু! এই সন্ধ্যার সময় জ্যাকেট গায়ে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
তামরিন মায়ের কথা যেন শুনতেই পেল না, ওর কান তখন ঝাঁ ঝাঁ করছিল। ও দরজার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে শুধু কোনোমতে বলল,
“মা, আসছি... রাতে ফিরতেও পারি, নাও পারি। আমি কলে জানিয়ে দেব পরে!”
বাসার নিচে নেমে এসে তামরিন দেখল চারদিকের রাস্তা একদম ফাঁকা। একটা রিকশাও দাঁড়িয়ে নেই, কোনো সিএনজিও চোখে পড়ছে না। বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কায় দম আটকে আসছিল ওর। ও নিজের ওড়নাটা শক্ত করে চেপে ধরে মনে মনে বলল, ‘এভাবে বিপদের সময়ে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না।’ ও আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে মেইন রোডের দিকে একপ্রকার পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল।
মাঝরাস্তায় হঠাৎ একটা গাড়ি টায়ার পোড়ার তীব্র শব্দ করে ব্রেক চেপে তামরিনের ঠিক সামনে এসে থামল। জানালার কাচ নামিয়ে জেড অত্যন্ত অবাক এবং অস্থির হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “তামু....এই অবস্থায় তুই মাঝরাস্তায় এভাবে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
তামরিন হাঁপাতে হাঁপাতে, চোখের জল সামলে বলল, “কোথায় যাচ্ছি মানে? হসপিটালে... সিটি হসপিটালে! তুই জানিস না কী হয়েছে?”
জেড তাড়াহুড়োর ভঙ্গিতে বলল,
“আমিও ওখানেই যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি আয়, গাড়িতে ওঠ!”
তামরিন গাড়িতে উঠতেই জেড এক্সিলারেটরে সজোরে চাপ দিল। তীব্র গতিতে গাড়ি গিয়ে থামল সিটি হসপিটালের জরুরি বিভাগের সামনে। করিডোর দিয়ে জুতো খটখট শব্দে ছুটে গিয়ে ওরা দেখল অপারেশন থিয়েটারের বাইরে নীল আর সাজিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীলের চুলগুলো উসকোখুসকো, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, সারা মুখে তীব্র আতঙ্ক আর কান্নার ছাপ স্পষ্ট।
“কখন হলো এটা? কীভাবে হলো সব?” জেড ছুটে গিয়ে সাজিদের দুই কাঁধ শক্ত করে খামচে ধরল।
সাজিদ জেডকে দেখামাত্রই আর নিজের ভেতরের পাথরচাপা কষ্টটা ধরে রাখতে পারল না। ও জেডকে জড়িয়ে ধরে হসপিটালের করিডোরেই ডুকরে কেঁদে উঠল, “আমরা ক্যাফের দিকে যাচ্ছিলাম রে... জেড, আহিয়ান আর এহসান একই বাইকে ছিল। আর ওদের ঠিক পেছন পেছন আমি আর নীল আসছিলাম একটা সিএনজিতে। হঠাৎ...হঠাৎ একটা বিকট, কান ফাটানো শব্দ শুনলাম। বুকটা ধক করে উঠেছিল। সামনে তাকিয়ে দেখি—আহিয়ান আর এহসানের বাইকটাকে একটা কার এসে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পিষে দিয়ে চলে গেছে! রক্তে ভেসে যাচ্ছিল রাস্তাটা...”
তামরিন নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
“বল না! ডাক্তার কী বলেছেন? আহিয়ান ঠিক আছে তো? আর এহসান...?”
“ওদের ফ্যামিলিতে জানিয়েছিস?” জেড ভাঙা, কাঁপতি গলায় জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, জানিয়েছি,” নীল করিডোরের এক কোণে চেয়ারে বসা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করল। ওটা ছিল আহিয়ানের বাবা। তিনি মাথায় দুই হাত দিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন, চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। পাশে আহিয়ানের মা আর ভাইও ততক্ষণে এসে পৌঁছেছেন। আহিয়ানের মা বারবার নিজের বুকের কাপড় খামচে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন, “আমার ছেলেকে এনে দাও তোমরা! ও তো পরীক্ষা দিয়ে হাসিমুখে ফিরছিল! ও আল্লাহ, আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে দাও। ”
তামরিন চারদিকে চোখ বুলিয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর এহসানের বাবা-মা? ওনারা এখনো আসেননি?”
বলতে বলতেই করিডোরের ওপার থেকে জুতোর তাড়াহুড়ো শব্দ পাওয়া গেল। এহসানের বাবা রশীদ সিদ্দিকী এবং ওর রুনা সিদ্দিকী মা দুজনে প্রায় দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এলেন। ওনারদের পেছনে একে একে জড়ো হতে লাগল ওদের কলেজের আরও অনেক বন্ধুবান্ধব। পুরো হসপিটালের করিডোরটা বন্ধুদের চাপা শোরগোল, দীর্ঘশ্বাস আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠল। একটা উৎসবের দিন যেন নিমেষেই মহাশ্মশানে পরিণত হলো।
ঠিক তখনই ওটির ভারী, হাইড্রোলিক দরজাটা শব্দ করে খুলে গেল। প্রথম ডাক্তার বেরিয়ে এলেন মুখ থেকে মাস্কটা সরাতে সরাতে। আহিয়ানের ওটি শেষ হয়েছে। সব বন্ধুরা একঝাঁক তৃষ্ণার্ত পাখির মতো ডাক্তারকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। নীল সবার আগে এগিয়ে গিয়ে জামার হাতা চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, “ডক্টর, আমার বন্ধুর কী অবস্থা? ও ঠিক আছে তো? কথা বলছে না কেন?”
ডাক্তার সবার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, “হি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার। ফরচুনেটলি ইন্টারনাল কোনো মেজর ইনজুরি বা ব্লিডিং নেই। ওনাকে প্রয়োজনীয় মেডিসিন দেওয়া হয়েছে। তবে ওর একটা পা বেশ বাজেভাবে ভেঙে গেছে, ওটা প্লাস্টার করা হয়েছে এবং পুরোপুরি ঠিক হতে কয়েক মাস সময় লাগবে। চিন্তার কিছু নেই, আপাতত ব্যথার কারণে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। পায়ের হাড়ে আর হাতেও কিছুটা চোট পেয়েছেন।”
আহিয়ানের বাবা-মা আল্লাহর দরবারে হাত তুলে শুকরিয়া আদায় করলেন। কিন্তু বাকি চার বন্ধুর বুকটা তখনো কামারের হাতুড়ির মতো কাঁপছিল। কারণ , এহসানের খবর এখনো মেলেনি।
“আর এহসান...?” সাজিদ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
ডাক্তার এবার একটু গম্ভীর হলেন, ওনার মুখের স্বস্তি নিমেষেই মিলিয়ে গেল, “দেখুন, অন্য যে পেশেন্ট, মানে এহসান...”
এহসানের কথা শুনতেই এহসানের বাবা রশীদ সিদ্দিকী পাগলের মতো এগিয়ে এলেন, “ডক্টর, আমার ছেলে! আমার একমাত্র ছেলে এহসান ঠিক আছে তো? বলুন না, ও বাঁচবে তো?”
ডাক্তার ওনার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মৃদু কিন্তু অত্যন্ত আশঙ্কাজনক গলায় বললেন, “দেখুন, আমি আপনাদের একটাই কথা বলব—আপনারা সবাই মিলে ওর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করুন। ওর মাথায় আর বুকের পাশে খুব মারাত্মক চোট লেগেছে, যার কারণে ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে। আমরা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছি না, আগামী ৭২ ঘণ্টার আগে কোনো আশার বাণী দেওয়া সম্ভব নয়। ওর কন্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল।”
কথাটা শোনামাত্রই এহসানের মা একটা তীব্র চিৎকার দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন এবং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। সেই অসহায় মায়ের দশা দেখে তামরিন নিজের চোখের জল মুছে ওনার দিকে সান্ত্বনার হাত বাড়িয়ে দিল। ওনার কাঁধটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলল, “আন্টি, ভেঙে পড়বেন না। আমরা সবাই আছি তো। আপনি শক্ত হোন, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।” কিন্তু মুখে সান্ত্বনা দিলেও তামরিনের নিজের ভেতরের ভয়ের বাঁধও তখন মানছিল না।
ঠিক এই চরম মানসিক যন্ত্রণার মুহূর্তের মাঝে, ওটির ভারী হাইড্রোলিক দরজাটা আচমকা এক ঝটকায় খুলে গেল। ভেতর থেকে একজন জুনিয়র ডাক্তার হন্তদন্ত হয়ে, প্রায় দিশেহারা মুখে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত আতঙ্ক। তিনি সিনিয়র ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত ও ত্রস্ত গলায় বললেন,
“স্যার! ১০৮ নম্বর বেডের পেশেন্টের কন্ডিশন সাডেনলি খুব ডিটেরিওরেট করছে। পালস মারাত্মকভাবে ড্রপ করছে, বিপি কোনোভাবেই ট্রেস করা যাচ্ছে না। প্লিজ স্যার, আপনি একটু ইমিডিয়েটলি আসুন!”
সাজিদ চমকে উঠে নিজের চুল খামচে ধরে তোতলানো গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “১০৮... ১০৮ নম্বর বেডে তো আমাদের এহসান আছে! ও আল্লাহ! কী হচ্ছে এসব?”
করিডোরে উপস্থিত সবার পায়ের তলা থেকে যেন এক নিমেষে তপ্ত মাটি সরে গেল। পুরো পৃথিবীটা এক ঝটকায় থমকে গেল ওদের সামনে। এ কী নির্মম নিয়তির খেলা। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও তো চারদিকের সবকিছু কত স্বাভাবিক, কত সুন্দর ছিল। সবাই পরীক্ষা শেষ করে হাসিমুখে আড্ডা দেওয়ার, এক রাশ আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল; আর এখন—প্রিয় বন্ধুটা এক অতল অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে!
সিনিয়র ডাক্তার আর একটা সেকেন্ডও নষ্ট না করে জুনিয়র ডাক্তারের সাথে ওটির ভেতর প্রায় ছুটে চলে গেলেন। ওটির দরজার ছোট আয়তকার কাচটার ওপাশে তখন মৃত্যুর এক আদিম, শীতল খেলা চলছে। কাচের ওপাশের আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—ভেতরে নার্স আর ডাক্তাররা ডিফিব্রিলেটর (শক দেওয়ার মেশিন) আর অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে এহসানের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ফুসফুসকে সচল রাখার এক আপ্রাণ, মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। মনিটরের লাল-সবুজ রেখাগুলো ক্রমাগত বিপজ্জনক সংকেত দিচ্ছে। ডাক্তাররা একে অপরের দিকে ইশারা করছেন, আর অতি দ্রুত এহসানের বুকে দুই হাত রেখে একের পর এক কম্প্রেস দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি যুগের চেয়েও ভারী।
নীল ওটির দরজার সেই হিমশীতল কাচটার ওপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে ভেতরের এই বিভীষিকাময়, অতিপ্রাকৃত দৃশ্যটা দেখছিল। এহসানের সেই পজেসিভ, একরোখা অথচ মায়াবী হাসিখুশি মুখটা আজ রক্তাক্ত, নিথর, অক্সিজেনের কৃত্রিম পাইপের নিচে ঢাকা। চেনার কোনো উপায় নেই যে এই ছেলেই পুরো আড্ডার প্রাণ ছিল। এই রূপ দেখে নীল আর নিজের ভেতরের কান্নার বাঁধ চেপে রাখতে পারল না। ও ওখানেই জীর্ণ দেয়ালটা ঘেঁষে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল,
“এই এহসান! ফিরে আয় না ভাই! প্লিজ এমন করিস না! তুই না বললি আজকে আড্ডায় আমাদের একটা টপ সিক্রেট কথা বলবি? তুই সবসময় এরকম নাটক করিস কেন রে? কী পেয়েছিস তুই নিজেকে? কোনো থ্রিলার মুভির হিরো ভাবিস? তোর এই ড্রামার জন্য শুধু শুধু আমরা এভাবে করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করব? এই এহসান... কথা বল, একবার চোখ খোল!”
সাজিদ এসে কাঁপতে কাঁপতে নিজের বরফশীতল হাতটা রাখল নীলের কাঁপতে থাকা কাঁধে। ও নীলকে মেঝে থেকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে নিজে কেঁদে আকুল হয়ে বলল,
“আমি আমাদের গ্রুপ থেকে কাউকে হারাতে পারব না, নীল। ও ফিরে আসবে, তুই বল না ও ফিরে আসতে? ও আমাদের এভাবে একা ফেলে মাঝপথে চলে যেতে পারে না”
জেদ ওপাশ থেকে ছুটে এসে শক্ত করে নিজের দুই বাহু দিয়ে জাপটে ধরল ওদের দুজনকে। ওর নিজের চোখ দিয়েও তখন তপ্ত অশ্রুধারা অঝোরে ঝরে পড়ছে, কিন্তু ও নিজের ভাঙা চোয়াল শক্ত করে, কাঁপা গলায় অথচ এক অদ্ভুত, অলৌকিক দৃঢ়তায় বলল,
“আসবে... ও ফিরে আসবেই। আমাদের এই বন্ধুদের পথচলা এত সহজে, এত ছোট একটা দুর্ঘটনায় শেষ হতে পারে না। আমাদের ভাই, ও আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না। ও আমাদের কতটা ভালোবাসে তোরা জানিস না?”
তামরিনও ওনাদের এই কান্নার স্রোতে এসে শামিল হলো, ওদের পাশে এসে একপ্রকার ভেঙে পড়ল। ওদের জীবন কোনো এক অভিশপ্ত কালবৈশাখী ঝড় এসে সব ওলটপালট করে দিয়ে গেছে। আজ দুজন বন্ধু ওটির ভেতরে মরণ যন্ত্রণার সাথে লড়াই করছে—একজন কোনোমতে পার পেলেও অন্যজনের প্রাণপ্রদীপ তখন এক ফুঁয়ে নিভে যাওয়ার উপক্রম। আর বাকি চারজন বন্ধু বাইরে দাঁড়িয়ে জীবন্ত নরকবাস করছে, তিল তিল করে মরছে। নিজেদের বন্ধুর এই মরণাপন্ন দশা দেখে এই চারজন বন্ধু কি কখনো শান্তিতে থাকতে পারে? চারজন বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হসপিটালের সেই সাদা, গন্ধহীন শীতল করিডোরেই ডুকরে কেঁদে উঠল। লোকে বলে পুরুষ
নাকি সহজে কাঁদে না, পুরুষদের নাকি কাঁদতে নেই। কিন্তু আজ এই হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে সেই প্রবাদটা যেন কাচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওরা তো আজ সাধারণ কোনো কান্না কাঁদছে না, ওদের বুক চিরে আজ রক্তের ক্ষরণ হচ্ছে। ওদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় বন্ধুটা যে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে জীবনের শেষ লড়াইটা লড়ছে .....
ঠিক তখনই ওটির ভেতরের মনিটরের বিরামহীন ‘বিপ... বিপ...’ শব্দটা হঠাৎ এক দীর্ঘ, একটানা ‘পিপ—’ শব্দে রূপ নিল। ইসিজি স্ক্রিনের ঢেউ খেলানো রেখাটা সোজা হয়ে যেতে লাগল। ভেতরের ডাক্তারদের ব্যস্ততা এক নিমেষে দ্বিগুণ হয়ে উঠল। বাইরে থাকা প্রতিটা বন্ধুর হৃদস্পন্দন যেন সেই শব্দে থমকে গেল। করিডোরের আলোটা যেন এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল
চলবে।
#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব :২৩