বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে চুকে সোজা ওপরে উঠে যাওয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু পরিকল্পনাটা যতটা সহজ, আনিয়ারের কাছে বাস্তবটা যেন তার চেয়ে কয়েকগুণ কঠিন। ভয়ে বুক ধুকপুক করছে তার। মুখে কিছু না বললেও মনে মনে অনবরত দোয়া ইউনুস পড়ে চলছে, যেন কোনোভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পায়।
অনদিকে, ভেতরের সিঁড়ির কাছে...
আনিয়াকে সিঁড়ির কাছে পেয়ে জেড ফিসফিস করে বলল, “আনামিকা...”
আনামিকা আকস্মিক জেডের উপস্থিতিতে থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “জেড! তুমি এখানে? আমি ভাবলাম, শুধু হাসান ভাইয়া এসেছেন। এখন থেকে এখানেই চলে যাও, কেউ দেখে ফেলবে!”
জেডও নাছোড়বান্দা। সে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “না, তার আগে আমাকে কিছু একটা দাও...”
আনামিকা বুঝতে পারল জেডের মতলব মোটেই সুবিধাজনক নয়। সে সতর্ক চোখে চারপাশ দেখে নিয়ে বলল, “দেখো, এটা বাড়ি না! চুপচাপ চলে যাও। যদি মাহবুব আঙ্কেল বা অন্য কেউ চলে আসে?”
“আসলে দেখা যাবে, আসতে দাও...” বলেই জেড নিজের মুখটা একটু উঁচিয়ে আনামিকার দিকে বাড়িয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির ওপর থেকে কারো ধীর পায়ের শব্দ শোনা গেল!
আনামিকা আতঙ্কে উঠে ফিসফিসাল, “জেড যাও যাও! প্লিজ যাও...”
“আগে দাও...”
আনামিকা লজ্জায় হাসফাস করে অস্ফুটে বলল, “নির্লজ্জ লোক একটা! দিচ্ছি দিচ্ছি...”
অনামিকা ধীর পায়ে জেডের দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশের নীরবতা যেন মুহূর্তটাকে আরও গভীর করে তুলেছে। জেডের একেবারে কাছে গিয়ে অনামিকা একটু ইতস্তত করে থামল। তারপর আলতো করে তার গালে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আচমকাই পুরো বাড়ির লাইট নিভে গেল। মুহূর্তেই চারপাশ ডুবে গেল ঘুটঘুটে অন্ধকারে। বিদ্যুৎ চলে গেছে!হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় অনামিকা ভয়ে তাড়াহুড়ো করে জেডের কাছ থেকে পিছিয়ে এলো, "যাও যাও! কেউ চলে আসবে এখন...."ঠিক তখনই আবার আবারও খুব কাছ থেকে কারো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। রিদ আর রাফিদ এই দিকেই আসছে বলে মনে হচ্ছে। অনামিকা পরিস্থিতি বুঝে জেডকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে গেটের দিকে পাঠিয়ে দিল। জেড চরম হতাশ হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।অনামিকাকে অন্ধকারে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদ আর রাফিদ ফোনের ফ্ল্যাশ অন করল। আলোটা অনামিকার মুখে পড়তেই রিদ বলল, "অনামিকা আপু! তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"অনামিকা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কী বলবে তা বুঝতে না পেরে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "আমি... আমি..."রিদ ভুরু কুঁচকে বলল, "তুমি কী?"অনামিকা নিজেকে সামলে নিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে বানিয়ে বলল, "আমার... আমার মনে হয় বাড়িতে চোর এসেছে!"রাফিদ আর রিদ নিমেষে সতর্ক হয়ে গেল, "চোর? বাড়িতে চোর এসেছে?!""হ্যাঁ হ্যাঁ! ওই দিকটায় খোঁজ...."রিদ আর রাফিদের মাথায় চট করে বুদ্ধি খেলে গেল। বাড়িতে এমনিতেও তাদের কোনো দাম নেই, চোর ধরে যদি সবাইকে দেখানো যায় তবে অন্তত একটু সম্মান বাড়বে! রিদ উৎফুল্ল হয়ে বলল, "তুমি অনুর কাছে যাও আপু! আমরা আছি, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কী বলিস রাফিদ, পারবি না?"আমি কি আপনাকে এই গল্পের পরবর্তী অংশ খুঁজে পেতে অথবা এর কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে সাহায্য করতে পারি?
রাফিও শক্ত মুখে সায় দিল। অনামিকা আমতা আমতা করে বলল, "আচ্ছা..."—বলেই সে দ্রুত পায়ে ওপরের দিকে চলে গেল। যাক, এবারের মতো বেঁচে গেছে সে!হঠাৎ ঘরের আলো নিভে যাওয়ায় অনু কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার ঘরে কেবল জানালার বাইরে থেকে আসা মৃদু জোত্স্না আর রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো এসে পড়েছে।হঠাৎ দরজার দিকে হালকা শব্দের আওয়াজ হতেই অনু ভাবল অনামিকা বুঝি ফিরে এসেছে। সে দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে উৎফুল্ল আর ব্যস্ত গলায় বলল, "কী রে অনামিকা, দেখলি ওদেরকে? আর এই ইলেকট্রিসিটিটা হঠাৎ করে চলে গেল কেন"কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অনু মাঝপথে থমকে গেল।ঘরের ভেতরের পুরো আবহাওয়ায় কেমন যেন এক বিদ্যুৎগতিতে অদ্ভুত পরিবর্তন নেমে এসেছে। অনু স্পষ্ট অনুধাবন করল, দরজার ওপাশে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে অনামিকা নয়। বাতাসে ভেসে এলো সেই অতি পরিচিত, তীব্র আর মাতাল করা 'ব্ল্যাক কোড' পারফিউমের চেনা ঘ্রাণ। ঘরের ভেতরের এই আকস্মিক ও অভাবনীয় উপস্থিতি অনুকে এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ আর বাকরুদ্ধ করে দিল।ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা পিঠ দিয়ে নিঃশব্দে আটকে গেল। নিকষ আঁধারের ঘেরাটোপে অনু আবছা দেখতে পেল এক দীর্ঘদেহী ও চওড়া পুরুষ-অবয়ব ধীর স্থির পায়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।অনু ভয়ে, উত্তেজনায় আর চরম এক অজানা লজ্জায় এক পা পিছিয়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "কে... কে ওখানে?"অন্ধকারের মধ্য থেকেই ভেসে এলো এহসানের গম্ভীর অথচ অদ্ভুত এক মাদকতাময় নিচু স্বর, "নিজের স্বামীজানকে এত সহজে ভুলে গেলে চলবে, বিবিজান?"অনু যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না! চমকে উঠে দ্রুত বুকের ওপর হাত রাখল সে। এহসান... এহসান সত্যি সত্যি ওপরে চলে এসেছে? তা-ও আবার এই গভীর রাতে!আপনি... আপনি কীভাবে এলেন? অনামিকা কোথায়?" – অনুর গলার স্বর কাঁপছিল, বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা অসম্ভব দ্রুতগতিতে ওঠানামা করছে।এহসান কোনো উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে একদম অনুর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ঘরের ভেতরের ঘন আঁধারেও জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আবছা চাঁদের আলোয় অনুর চোখের কোণে জমে থাকা ভয়, লজ্জা আর চরম বিস্ময় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।এহসান বেশ খানিকটা নিচু হয়ে অনুর মুখের খুব কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে বলল, "তুমি তো বেশ জোর গলায় চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলে, তাই না? ভেবেছিলে প্রফেসর এহসান সিদ্দিকী কোনো চ্যালেঞ্জে হেরে যাবে?"অনুদেহের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে গাল আর কানের লতিতে এসে জমল। সে দেয়ালের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত পেছনে চেপে ধরে বলল,"আপনি... আপনি কিন্তু একদম কাছে আসবেন না! বাইরে অনেকে জেগে আছে, কেউ দেখে ফেললে ভীষণ কেলেঙ্কারি হবে কিন্তু..."এহসান ঠোঁটের কোণে একটা হালকা, চোখা হাসি হাসল। সে কোনো বারণের তোয়াক্কা না করে আরেক পা এগিয়ে অনুর একদম ঘেঁষে দাঁড়াল। তার পরনে থাকা শার্টের বোতামের হালকা ছোঁয়া অনুর পাতলা ওড়নায় বিঁধছে। এহসান তার লম্বা হাত দুটি বাড়িয়ে অনুর দেয়ালঘেঁষা দুটি হাত নিজের শক্ত, উষ্ণ হাতের মুঠোয় পুরে নিল। এহসানের হাতের সেই তপ্ত স্পর্শ অনুর পুরো শরীরে যেন এক তীব্র বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলিয়ে দিল।এহসান অন্য হাতটি পকেট থেকে বের করে আনল। তার আঙুলে লেগে আছে বেশ খানিকটা সুবাসিত কাঁচা হলুদ।অনু আঁতকে উঠে মুখটা সরাতে চাইল, "এহসান, না... প্লিজ...""চুপ!" এহসানের হুকুমের সুরে বলা একটিমাত্র শব্দেই অনু একদম থমকে গেল।এহসান আলতো করে তার হলুদমাখা আঙুল অনুর গালে ছুঁইয়ে দিল। ধীর গতিতে সেই আঙুলটা অনুর নরম গাল থেকে নামিয়ে থুতনি হয়ে তার উন্মুক্ত সুডৌল গলার ভাজে বুলিয়ে আনল। অনুর শ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো, চোখ দুটি তীব্র লজ্জায় নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে এলো।আহিয়ান নিচ তলায় গাছপালার আড়ালে দাঁড়িয়ে অনবরত কাঁপছিল আর মনে মনে সব ধরনের দোয়া-দরুদ পড়ছিল। হঠাৎ অন্ধকারে দুই ছায়ামূর্তি – রিদ আর রাফিদের ধুপধাপ পায়ের শব্দ আর হাঁসফাঁস গলার আওয়াজ শুনতে পেল সে।রিদ হাতে একটা মোটাসোটা কাঠের ডাল নিয়ে আর রাফিদ একটা প্লাস্টিকের পাইপ উঁচিয়ে অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছিল।রাফিদ ফিসফিস করে বলল, "ভাইয়া, চোরটা মনে হয় ওই ঝোপের পেছনেই লুকিয়ে আছে!"রিদ ডালটা উঁচিয়ে গর্জে উঠল, "রুক তোর চোরগিরি দেখাচ্ছি! আজকে চোর ধরে মামাকে দেখিয়ে দেব আমরাও কাজের বান্দা! সাহসী বীরপুরুষ।"ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা আহিয়ান দূর থেকে কাঠের ডাল আর পাইপ হাতে দুজন ছায়ামূর্তিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয়ে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার মনে হলো, নিশ্চয়ই বাড়ির লোকজন তাকে ডাকাত ভেবে সন্দেহ করেছে, আর এখন তাকে ধরে পিটিয়ে ছাতু বানাতেই এগিয়ে আসছে!আহিয়ান আর এক মুহূর্তও না ভেবে পেছনের গেটের দিকে উল্টো দৌড় লাগাল।রিদ অন্ধকারের মধ্যে ছায়ামূর্তি দৌড়াতে দেখেই চিৎকার করে উঠল, "ঐ যে চোর! চোর পালায়! ধর ধর! শালা চোর, আজকে তোর খবর আছে!""চোর! চোর! ধররে!" রাফিদও বিকট শব্দে চিল চিৎকার দিয়ে আহিয়ানের পেছনে দৌড় লাগাল।আহিয়ান ভয়ে চোখ-মুখ বুজে দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচাতে লাগল, "আরে ভাই আমি চোর না! আমি জামাইয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড! ওরে বাবা গো, মেরো না।"কিন্তু রিদ আর রাফিদ তখন বীরপুরুষের মতো চোর ধরার আনন্দে মশগুল, তারা আহিয়ানের কথা কানেই তুলল না। তিনজনের এই তুলকালাম দৌড়াদৌড়ি আর চোর-চোর চিৎকারে পেছনের উঠোন এক নিমেষে গরম হয়ে উঠল!ঘরের ভেতর...বাইরের সেই বিকট "চোর চোর" চিৎকার শুনে এহসান ও অনু দুজনই এক মুহূর্তে চমকে উঠল।এহসান বিরক্তি আর হাসির মিশেলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, "গাধাটা নির্ঘাত ধরা খেয়েছে!"বলেই এহসান ঘরের ছিটকিনি খুলে যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনই আঁধারের সাথে মিশে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নিচে বন্ধুকে উদ্ধার করতে।অনু ঘরের দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা তখন অসম্ভব দ্রুতগতিতে হাতুড়ি পিটছে। সারা গালে, গলায় আর কপালে এহসানের দেওয়া হলুদের সেই সুবাসিত তপ্ত আমেজ আর কানের কাছে রেখে যাওয়া ষোলো আনা অধিকারের ফিসফিসানিটা তখনও অনুর পুরো শরীরে এক মিষ্টি শিহরণ জাগিয়ে রাখল...।
#লেখিকা মারিয়াম ফুল
#নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা