ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা

৪৪তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

📌wedding special episode 🌷

#নিভৃতে_যত্নে_রাখা_প্রিয়তমা
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব- ৪৪
এহসান ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরের নরম, স্নিগ্ধ আলোর আবহে তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে রইল শান্ত,স্নিগ্ধ এক হাসির সূক্ষ্ম রেখা। ঘরের আবহাওয়া তখন থমথমে আর নিস্তব্ধ। প্রিয়তমাকে নিজের একান্ত করে পাওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে কিছুটা গম্ভীর ও সংযত রাখার এক নিষ্ফল চেষ্টা করল সাতাশ বছরের গম্ভীর প্রফেসর। সে নিজের প্রতিটা পদক্ষেপে মেপে মেপে ভার বজায় রাখার চেষ্টা করছিল, যেন মনের ভেতরের তোলপাড়টুকু কোনোভাবেই বাইরে প্রকাশ না পায়।
অন্যদিকে, এহসানের সুদৃঢ় উপস্থিতি টের পেতেই অনুর ভেতরের প্রতিটি স্নায়ু যেন নিমেষে টানটান হয়ে উঠল। ঘরের বাতাসে এহসানের সুবাস ছড়িয়ে পড়তেই বুকটা দরফর করে উঠল তার। লাল জামদানি শাড়ির ভারী ঘোমটা আর গা ভর্তি গহনার আড়ালে ভয়ে ও তীব্র সংকোচে সে বিছানার এক কোণে আরও কিছুটা গুটিসুটি মেরে বসল। কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলল অনু, তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো শাড়ির আঁচলকে খামচে ধরেছিল। বুকের ভেতরে প্রবল এক ঝড় তোলপাড় করছে...একবার সেই অস্থির মনকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তো পরমুহূর্তেই অজানা আশঙ্কায় সেই ব্যাকুলতা বাঁধ ভাঙছে।
হঠাৎ ঘরের থমথমে নীরবতা ভেঙে এহসানের ভারী, গম্ভীর কণ্ঠস্বর বেজে উঠল,
"উঠো, ওখানে বসে আছ কেন?"
অনুর বুদ্ধিগম্য হলো না কথাটি। সে এক মুহূর্ত থমকে গেল। এহসান তাকে এভাবে ধমক দিয়ে কথা বলছে কেন? তা-ও আবার আজকের মতো একটি বিশেষ রাতে! অনু বিস্ময়ে ও তীব্র ভয়ে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে মেঝের দিকে তাকিয়ে আরও একটু শক্ত হয়ে বসে রইল।
এহসানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর দ্বিতীয়বার ভেসে এলো, যার ভেতরে এবার স্পষ্ট আদেশের সুর, "বললাম না উঠে আসতে? কথা শুনছ না কেন?"
অনু এবার সাহস সঞ্চয় করে চোখ তুলে এহসানের দিকে তাকাল। এহসানের চোখে-মুখে এক কঠিন ও অচেনা গম্ভীর প্রলেপ। অনুর মনে হলো, হয়তো কোথাও একটা কিছু অস্বাভাবিক ঘটে গেছে ,তা না হলে এহসান তার সাথে এমন আচরণ করছে কেন? কোনো নারী কি তার বিয়ের প্রথম রাতে স্বামীর এমন ধমক মেনে নিতে পারে? না, পারে না। 
অনুর বুকের গহীন কোণে তীব্র এক বিষাদ ও অভিমান দানা বাঁধল। তার টানা দুটি চোখ মুহূর্তেই নোনা জলে ছলছল করে উঠল। বুক চিরে আসা কান্নাটাকে কোনোমতে চেপে ধরে, শাড়ির ভারী আঁচলটা হাতে সামলে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল অনু।
"এদিকে আসো।"
এহসানের পরবর্তী নির্দেশে অনু যন্ত্রের মতো ধীর পদক্ষেপে তার দিকে এগিয়ে এলো। কিন্তু তার সেই অশ্রুসজল, হতভম্ব চোখে ছিল অজস্র না-বলা প্রশ্নের ভিড়। কাঁপানো ,অভিমানী কণ্ঠে সে বলে উঠল,
"আপনি আমাকে এভাবে ধমকাচ্ছেন কেন? আমি কিন্তু একবারে সহ্য করব না... একদম না! আপনি কি আমাকে শুধু ধমকানোর জন্য বিয়ে করেছেন? আজকের রাতেও আপনি এভাবে ধমকাচ্ছেন?"
এহসানের গলার ঠান্ডা, ভাবলেশহীন সুর আবার ভেসে এলো,
"মুখে মুখে তর্ক করছ? কার সাথে তর্ক করছ জানো? সাহস কী করে হয় এহসান সিদ্দিকীর সাথে মুখে মুখে তর্ক করার..."
এহসানের এমন অপমানজনক কথা শুনে অনু চোখ দুটো বড় বড় করে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ঘরের ঝলমলে রোশনাইয়ের রমণীর ফর্সা গাল বেয়ে দুটি চোখ থেকে মুক্তোর দানা হয়ে গড়িয়ে পড়ল অঝোর অশ্রুধারা। তার স্পষ্ট মনে পড়ে গেল অতীতের সেই বিষাদময় স্মৃতিগুলো —
ঠিক এভাবেই তো এহসান তাকে একসময় ভার্সিটি ক্যাম্পাসে অপদস্থ করত! কিন্তু এহসান নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার পর থেকে তো কোনোদিন তার দিকে উঁচু গলায় কথা বলেনি! তবে আজ, কেন এমন নির্মম ব্যবহার?
অনুর ভেতরে এক অচেনা ভয় আঁকড়ে ধরল। সে কাঁপতে থাকা কণ্ঠে বলল,
"আপনি... আপনি আমার সাথে এমন করে কেন কথা বলছেন? আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী! আপনার পছন্দ না হলে বলুন, আমি এখনই আমার বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছি।"
অনুর মুখ থেকে 'বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছি' কথাটা বের হতেই এহসানের বুকের ভেতরটাতে যেন তীব্র এক বিষাক্ত তীর এসে বিঁধল। অনুর হেজেল রঙের চোখে আঁকা কাজলের ঝাপসা চাউনি এবং অশ্রুসিক্ত গাল এহসানকে প্রতি মুহূর্তে উন্মাদ করে তুলছিল। ওই মায়াবী চোখে জলের ফোঁটা দেখে নিজের ভেতরের কঠিন ছদ্মবেশ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠছিল।তাই এহসান দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ঘরের এক কোণে রাখা সোফাটার দিকে তাকাল। নিজের মুখশ্রী আড়াল করে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কঠোর ও গম্ভীর রেখে গমগম সুরে বলল,
"তোমাকে আমি বউ হিসেবে মানি না। আমার বাবাকে তোমার বাবা-মা অনেক কষ্ট দিয়েছে। ভেবেছ কীভাবে তোমাকে নিয়ে সংসার করব? ভালোবাসি না তোমাকে! এই বিয়েটা কেবল প্রতিশোধের একটা অংশ... তোমাকে জব্দ করার জন্যই বিয়ে করেছি।"
কথাগুলো শোনামাত্র অনু পুরোপুরি হতবিহ্বল হয়ে ধপাস করে ভেঙে পড়ল যেন! এক মুহূর্তের মাথায় তার মনে হলো...এ তো তার চেনা এহসান সিদ্দিকী নয়! এ যেন অন্য কোনো অচেনা দানব! যে পুরুষটি কেবল তার সম্মান আর মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজের বাড়ি পর্যন্ত ত্যাগ করে এসেছে, সে কীভাবে আজ এমন কথা উচ্চারণ করতে পারে?
অনুর ভেতরের তীব্র অপমান ও কষ্ট এক মুহূর্তে প্রচণ্ড রাগে পরিণত হলো। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক মুহূর্তের মাথায় সে যেন ধেয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এহসানের দিকে। এহসানের পরনের পাঞ্জাবির হাতা দুটো নিজের দুই মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
"ছেলেখেলা পেয়েছেন বিয়েটাকে? যখন ইচ্ছে হলো অংশগ্রহণ করলাম, আর যখন ইচ্ছে হলো ছুঁড়ে ফেলে দিলাম? আপনি... আপনি সেই আগের এহসান সিদ্দিকীই রয়ে গেছেন! একজন নার্সিসিস্ট! আপনি শুধু নিজের স্বার্থ বুঝে গেলেন! দুই দুইবার কেন এলেন আমার জীবনে?"
এহসান অবশ্য পুরো সময়টাই পাথরের মতো শক্ত হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তবে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অমানবিক, কুটিল হাসির ভান।অনু এহসানের পাঞ্জাবি আরও শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
"আপনি... আপনি আমাকে এখনই তালাক দেবেন! এখনই আমাকে তালাক দিন!"
এহসান কোনো কথা না বলে আলতো, ধীরগতিতে অনুর আঁকড়ে ধরা মুঠো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।অনুর ফর্সা নাক-মুখ ততক্ষণে তীব্র রাগ, অভিমান আর কান্নায় একদম রক্তিম হয়ে উঠেছে। সে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
"আপনি মিথ্যাবাদী, এহসান সিদ্দিকী! আপনি একটা মিথ্যাবাদী! আমার বাবা আপনার হাতে আমাকে বিশ্বাস করে তুলে দিয়েছিলেন... আর আপনি তার এই প্রতিদান দিলেন? আমাকে এই মুহূর্তে তালাক দিন, আমি বাড়ি চলে যাব...."
পরিস্থিতি এভাবে হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখে এহসান আর নিজের ভেতরের নাটকীয়তা ধরে রাখতে পারল না। সে মনে মনে শিউরে উঠল—সে কি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? মেয়েটা যেভাবে আতঙ্কে আর কষ্টে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে, এহসান স্বপ্নেও ভাবেনি তার এই ছোট প্র্যাঙ্কটা এতটা সিরিয়াস রূপ নেবে... অনুর এমন ক্রন্দনরত ,নিষ্পাপ মুখ দেখে এহসানের বুকের গহীন কোণে তীব্র এক চিনচিনে অপরাধবোধ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হলো।
অনু এহসানের পাঞ্জাবির কলার ছেড়ে দিল। নিজের মনেই অসাড়ের মতো বিড়বিড় করে বলতে লাগল,"এই লোক তোকে ডিভোর্স দেবে না অনু... কোনোদিন দেবে না! শত্রুতা মেটানোর জন্যই বিয়ে করেছে।"
তারপর এহসানের দিকে অশ্রুসজল কিন্তু তীব্র রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,"দিতে হবে না আপনাকে, আমিই আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব"
চোখের পানি একহাতে মুছে নিয়ে অনু শাড়ির কুঁচি সামলে দ্রুত গতিতে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো।ঠিক সেই মুহূর্তে এহসান আর এক সেকেন্ডও বিলম্ব করল না। সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে অনুর নরম কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
অনু এক ঝটকায় চমকে উঠে নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে বলল,
"ছাড়ুন আমাকে! হাত ধরেছেন কেন? করব না আমি আপনার সংসার! আপনি মিথ্যাবাদী, ভীষণ মিথ্যাবাদী! আমার সাথে আপনি এমন করতে পারলেন?"
এহসান এবার কোনো সুযোগ না দিয়ে অনুকে এক হেঁচকা টানে নিজের চওড়া বুকের একদম কাছে এনে শক্ত বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল।
অনু তার শক্ত বুকের স্পর্শ পেয়ে আর আবেগ ধরে রাখতে পারল না; সে এহসানের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে আরও তীব্রভাবে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। মনে মনে ভাবল, এত ভালোবাসার পর এই হয়তো এহসানের বুকে তার শেষবারের মতো মাথা রাখা! কাল থেকে আর এই প্রিয় বুকে মাথা রাখা হবে না, অন্য কারও অধিকার হবে। তার এহসানের সাথে আর সুখী সংসার গড়ে তোলা হলো না! এসব ভেবে অনু এহসানের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ধস্তাধস্তি আর মোচড়ামোচড়ি শুরু করল।
এহসান বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে অনুকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে রাখল। অনুর গায়ের সুবাস আর কান্নার ব্যাকুলতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। তারপর সে নীরবতা ভেঙে বলল,
"চুপ! একদম চুপ! কোথাও যাচ্ছ না তুমি।"
"আমি আমার বাড়ি যাব!" অনু কান্নাভেজা ভারী কণ্ঠে জেদ করে উঠল।
"নাহ, এখন একদম না। নড়াচড়া কোরো না... স্বামীর বুকে থাকলে এভাবে নড়াচড়া করে না।"
এহসানের এমন অকপট ও অধিকারপূর্ণ কথায় অনু আবারও হেঁচকি তুলে অঝোরে কান্না শুরু করল,
"ছাড়ুন... ছাড়ুন আমাকে! তালাক দিন আমাকে!"
এহসান এবার নিজের অনুভূতির সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বউকে বুকের সাথে আরও একটু আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। মাথার চুলে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিচু স্বরে বলল,"সরি বউ... সরি, ভীষণ সরি! আর এমন হবে না, কোনোদিন হবে না... আমি তোমার সাথে প্র্যাঙ্ক করছিলাম.."
অনুর কান্নার হেঁচকির রেশ আস্তে আস্তে কমে এলো। কিন্তু এহসানের হঠাৎ এমন পরিবর্তন তার ধাক্কা খাওয়া মস্তিষ্কে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছিল না। সে এহসানের বুক থেকে নিজেকে কিছুটা আলগা করে বিস্ময় ভরা চোখে তার দিকে তাকাল।
এহসান আবারও অনুকে আলতো করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে অনুনয়ের সুর ঢেলে বলল,
"আমার দিকে তাকাও... আমার চোখে কি একবারও মনে হচ্ছে আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব? আর কখনও এমন কথা বলো না, বউ... প্লিজ। মরে যাব বলো, রাগ করো, চিৎকার করো... কিন্তু 'ডিভোর্স' দিয়ে দেবে বলো না। এই একটা শব্দই আমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলে।"
এহসানের চোখে তখন স্পষ্ট ব্যাকুলতা । সে আরও কাছে এসে মৃদুস্বরে বলল,"আমি সত্যি বলছি... এটা প্র্যাঙ্ক ছিল! আমি ভাবিনি এটা এত দূর যাবে। আই অ্যাম সরি রূপ... রিয়েলি সরি..."
অনু আবারও বিষম স্তব্ধ চোখে এহসানের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তাহলে এতক্ষণ যা যা এহসান বলল, তার সব মিথ্যে ছিল?
“সত্যি বলছেন?”
"হুম..." এহসান ধীরগতিতে মাথা নেড়ে সায় দিল।
অনু তখন থমকে গিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
"তাহলে বলুন, আপনি আবার বলবেন না তো যে এখনকারটাও প্র্যাঙ্ক?"
এহসান অনুর এই নিষ্পাপ ,বিচলিত প্রশ্ন শুনে না হেসে পারল না। সে মৃদু হেসে নিজের হাতের তর্জনী দিয়ে অনুর গাল বেয়ে নামা ভিজা অশ্রুটুকু মুছে দিতে দিতে বলল,
"আর কোনো প্র্যাঙ্ক না... বউ। ঘরে একটা পুতুল তুলেছি, তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নাকি? যাকে পেতে এত কাঠখড় পোড়ালাম, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি কীভাবে?"
এহসানের মুখে স্বীকারোক্তি শুনে অনুর উত্তাল ভেঙে পড়া মন এবার ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। সে বুঝতে পারল এতক্ষণ যা ঘটছিল তা শুধুই এহসানের দুষ্টুমি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, মনের গহীনে পাওয়া আঘাত আর অপমানের অনুভূতি তো এক নিমেষে মুছে যাওয়ার নয়!
সে মুখ ভার করে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
"এখন করছেন না, পরে তো করবেন! আপনার কত রাগ... আপনি কথা বলার আগেই রেগে ওঠেন!"
"আর রাগব না... কোনোদিন রাগব না। তোমার ওপর তো একদমই না..." এহসান একদম বাধ্য ও অনুগত ছেলের মতো অনুকে আশ্বস্ত করল।
"কথা দিচ্ছেন আমাকে আপনি?" ফুঁপিয়ে ওঠার শেষ রেশটুকু সামলে অনু নিচু স্বরে জানতে চাইল।
"কথা দিচ্ছি! এহসান সিদ্দিকী তার বেগমের ওপর কোনোদিন রাগবে না, কোনোদিন না। আর যদি কোনোদিন খুব বেশি রাগ উঠেও যায়, তাহলে একটা কাজ করবেন বেগম সাহেবা... আমাকে ঠিক একটু আগে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিলেন, সেভাবে জড়িয়ে ধরবেন, হু? দেখবেন কোনোদিন আপনার ওপর রাগ করতে পারব না। আপনার এক পলকের তাকানো আমার যাবতীয় রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, বেগম সাহেবা।"
এহসানের ভালোবাসা মাখা কথায় অনুর ফোলা গাল আর ভেজা ঠোঁটের কোণে না চাইতেও একচিলতে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
সে এহসানের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় বিকট শব্দ হলো—'ঠক ঠক'!
ঘরের এই একান্ত আবহ এক নিমেষে ভেঙে গেল। এহসান চরম বিরক্তি মাখানো চোখে দরজার দিকে তাকাল। এই রাতে আবার কোন হতচ্ছাড়া এসে ডিস্টার্ব করছে!
অনু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বলল,
"খুলে দিন দরজা... কারো হয়তো কিছু প্রয়োজন।"
এহসান অত্যন্ত বিরক্তি ও অসন্তোষ নিয়ে দরজার দিকে হেঁটে গেল। লকটা খুলে দরজা সামান্য সরাতেই দেখল সামনে তামরিন দাঁড়িয়ে আছে। এহসান চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে বলল,
"তোর কিছু লাগবে?"
তামরিন ভেতরে উঁকি মেরে একগাল বোকা বোকা হাসি হেসে বলল,
"কই, না তো!"
"তাহলে এখানে এলি কেন?" এহসানের দুটি ভুরু গভীরভাবে কুঁচকে গেল।
"ইয়ে মানে... রূপকে দেখতে এসেছিলাম, মেয়েটা ঠিক আছে তো?" কথাটি বলেই তামরিন এহসানের পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিল এবং অনুকে উদ্দেশ্য করে ইশারায় বলল,
"রূপ, তুমি ঠিক আছ?"
অনু দরজার দিকে তাকিয়ে এহসানের বিরক্তি আর তামরিনের অবস্থা দেখে একটা হালকা বোকা হাসি দিল,
"জি আপু, ঠিক আছি। আপনার কিছু লাগবে?"
তামরিন আবারও মাথা নেড়ে বোকা হাসি হেসে বলল,
"না না, কিছু লাগবে না।"
এহসান তামরিনের দিকে লাল চোখ কটমট করে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,"কিছু লাগবে না.... তোরও না, ওরও না! এখন চুপচাপ যা তো এখান থেকে!"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, যাচ্ছি" বলে তামরিন আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত সটান একটা দৌড় দিল।
এহসান দরজার কাছ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বউয়ের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় আবারও শব্দ হলো—'ঠক ঠক'!
এহসান থেমে গিয়ে আরেকটা তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল। সে ভালো করেই বুঝতে পারছে, বন্ধুরা আজ রাতে তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। বাধ্য হয়ে সে আবার দরজার দিকে গেল এবং কপাট খুলে দিল; কারণ সে জানে দরজা না খুললে এরা সারা রাত কড়া নেড়েই যাবে...
দরজাটা মেলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আহিয়ান হাঁফাতে হাঁফাতে চেঁচিয়ে উঠল,"ওই মামা, দরজা খোল! বাইরে মারামারি লেগে গেছে!"
এহসান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে প্রশ্ন করল,
"কী হয়েছে?"
ঠিক তখনই জেড পেছন থেকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে আহিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
"মাত্র ৪০ হাজার টাকা দিলি? দেখ, আমাদের পোষাচ্ছে না! এত কমে আমরা মানব না। তুই এখন আমাদের আরও ১০ হাজার টাকা দে!"
এহসান দাঁত কটমট করে বলল,
"টাকা কি গাছে ধরে? পারব না দিতে, যা এখান থেকে"
আহিয়ান এহসানের কথা পাত্তা না দিয়ে তার পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে বসা অনুকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে হাঁক দিল,"ও ভাবি! আপনার কিপ্টে স্বামী আমাদের পাওনা টাকা দিচ্ছে না.."
এহসানের চোখ-মুখ মুহূর্তেই দ্বিগুণ শক্ত ও রাগে একদম অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল,"ইচ্ছে করছে হাতের কাছে কিছু পেলে বাড়ি মেরে তোদের মাথা ফাটিয়ে দিতে! যাবি এখান থেকে?"
জেডও নাছোড়বান্দা, সে বুক ফুলিয়ে বলল,
"বললেই হলো নাকি? টাকা চাই, টাকা! ক্যাশ দে... চুপচাপ চলে যাব।"
এহসান কিছুক্ষণের জন্য চুপচাপ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের মুখের দিকে তাকাল। তারপর সুর নরম করার ভান করে বলল,
"টাকা চাই, তাই না?"
আহিয়ান আর জেড ভাবল এহসান হয়তো তাদের চড়া সুর দেখে ভয়ে পকেট থেকে টাকা বের করে দেবে। দুজনই নিমেষে নিজেদের ৩২ পাটি দাঁত বের করে একগাল হেসে উঠল,
"হ্যাঁ হ্যাঁ, টাকা দে!"
এহসান আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সোজা ঘরের এক কোণে আড়ালে রাখা একটা মোটাসোটা শক্তকাঠের ব্যাট হাতে তুলে নিয়ে তাদের দিকে তেড়ে এলো.....
আহিয়ান আর জেড দুজনই ব্যাট উঁচানো দেখে মুহূর্তের মধ্যে চোখ কপালে তুলে হকচকিয়ে গেল! এহসান যে কোনো ঠাট্টা করছে না, সত্যি সত্যি আজ তোদের পিঠ লাল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাট তুলেছে, তা বুঝতে আর এক সেকেন্ডও বাকি রইল না।
জেড দ্রুত পেছন দিকে হাঁটতে হাঁটতে আত্মরক্ষার সুরে বলল,
"টাকা লাগবে না ভাই! আমার বউ কল দিচ্ছে... পরে... পরে আসব!"
আহিয়ান ভয়ে জেডের পাঞ্জাবি শক্ত করে ধরে টেনে পেছাতে পেছাতে বলল,
"হিহি, মজা করছিলাম এহসান বাবু! বিশ্বাস করুন... মজা করছিলাম ! দেখুন না, ৪০ হাজার টাকা দিয়েছেন, ওতেই খুব ভালো রকম হয়ে যাবে..."
কথা দুটি শেষ করেই দুজন পেছনে না তাকিয়ে উল্টো দিকে দেয়াল ঘেঁষে ঝড়ের গতিতে দৌড় দিল! দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে অনু নিজের মুখের হাসি আর কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারল না।সে-ও খুব বুঝতে পারছে, এহসানকে তার বন্ধুমহল ইচ্ছে করে জ্বালাচ্ছে।
এহসান চরম বিরক্তি নিয়ে আবার দরজা লাগাতে যাবে, এমন সময় তাদের দলের শেষমেশ বাকি থাকা সহজ-সরল সাজিদ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে সামনে হাজির হলো।
এহসান তাকে দেখেই ব্যাটটা শক্ত করে ধরে প্রশ্ন করল,
"এখন তোর কী সমস্যা?"
সাজিদ চোখ দুটো ছোট ছোট করে আমতা আমতা করে বলল,
"আমি... আমি না আমার চশমাটা খুঁজে পাচ্ছি না....!"
এহসান এক দৃষ্টিতে সাজিদের মুখের দিকে তাকাল। তারপর হাতের ব্যাটটা একটু উঁচিয়ে ধরে বলল,
"তোর আসলে চোখে সমস্যা না রে শালা, মাথায় সমস্যা! মাথায় একটা বাড়ি দিলে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।"
সাজিদ চুল চুলকে অবাক হয়ে বলল,
"ইয়ে মানে এহসান, এসব কী বলছিস?"
এহসান হিসহিসিয়ে উঠে রাগ সামলে বলল,
"তোর চশমা তোর চোখেই তো লাগানো!"
অমনি সাজিদ নিজের গালে আর চোখে হাত দিয়ে চশমার ফ্রেমে আঙুল স্পর্শ করল। তারপর একদম ভেবাচেকা খেয়ে লজ্জা পেয়ে বলল,
"ওহো! সরি সরি এহসান ভাই... পেয়ে গেছি!"
এহসান কঠোর স্বরে ধমকে উঠল,
"চুপচাপ ভাগ এবার"
সাজিদ আমতা আমতা করে একবার এহসানের উঁচানো ব্যাটটার দিকে তাকাল। তারপর ভয়ে ভয়ে বলল,
"হাঁ... চলে যাচ্ছি!" বলেই সে আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে সটান এক দৌড়ে চলে গেল।
এহসান দরজার লকটা এবার ভালো করে আটকে দিয়ে একটা দীর্ঘ তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। যাক, অবশেষে বিদায় হলো সবাই! সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরের কোণে টেবিলের ওপর রাখা ব্যাগটার কাছে দাঁড়াল,ব্যাগটা খুলে ভেতর থেকে একে একে জিনিস বের করতে শুরু করল।
অনু বিছানা থেকে উৎসুক নয়নে তাকিয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করল,
"ওটা কী?"
এহসান অনুর প্রশ্নের কোনো উত্তর সরাসরি দিল না। বলল,
"এখানে বসো।"
অনু লক্ষ্মী মেয়ের মতো সোজা হয়ে বসল। এহসান দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে এলো। তারপর সেই ব্যাগ থেকে বের করল ধোঁয়া ওঠা গরম বিরিয়ানির প্যাকেট।
অনুর চোখ দুটি নিমেষে আশ্চর্য হয়ে উঠল, সে মৃদুস্বরে বলল,
"আপনি এটা কবে আনলেন?"
এহসান বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে প্লেটে ঢেলে অনুর একদম কাছে এসে বসল। প্লেটটা এক হাতে নিয়ে পরম যত্নে প্রথম লোকমাটা তৈরি করে আলতো করে বলল,
"নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছি... হাঁ করো।"
অনু অপলক ও অবাক নয়নে এহসানের চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে মুখ হাঁ করল। এহসান নিজের হাতে প্রথম লোকমাটা অনুর মুখে তুলে দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
"চুপচাপ খেয়ে নাও... সারাদিন কিছু খাওনি, তাই না?"
অনু মুখে খাবার নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
"বুঝলেন কীভাবে?"
"তোমার এই শুকনো চোখ-মুখই সব বলে দিচ্ছে।" বলে এহসান নিজের হাতে অনুকে যত্ন করে খাওয়াতে লাগল।
অনু কিছুক্ষণ নিরব থেকে এহসানের এই যত্ন আর ভালোবাসা অনুভব করল। তারপর নরম কণ্ঠে বলল,"আপনি আমাকে এত কেয়ার করবেন, আমি বুঝিনি... আমি প্রতিবারই আপনাকে ভুল বুঝেছি, প্রফেসর সাহেব"
এহসান এক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে অনুর দিকে তাকাল,
"তোমার জন্য সাতখুন মাফ, বেগম।"
এহসান অনুকে পুরোটা খাইয়ে দিল এবং নিজের হাতে তার মুখে পানি তুলে দিল। তারপর নিজে গিয়ে হাত ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে ফিরে এলো। অনুর সামনে দাঁড়িয়ে কোমল স্বরে বলল,
"যাও, অজু করে আসো... জীবনের নতুন সূচনাটা নামাজ দিয়ে শুরু করি।"
অনু আর দেরি না করে ওয়াশরুমে গিয়ে অজু শেষ করে বের হলো। বাইরে এসে সে দেখল এহসান সামনের কাতারে জায়নামাজ বিছিয়ে একাগ্র মনে দাঁড়িয়ে আছে। আর ঠিক তার পেছনের কাতারে অনুর জন্য আগে থেকেই একটা জায়নামাজ বিছিয়ে রাখা হয়েছে। অনু ধীরপায়ে গিয়ে এহসানের ঠিক পেছনে দাঁড়াল এবং দুজন একসাথে নিজেদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম সালাত আদায় করতে শুরু করল।
বেশ কিছুক্ষণ পর.. 
সকল ক্লান্তি, আর অভিমানের ঝড়ের পর ঘরের চারপাশের পরিবেশ শান্ত হয়ে এলো। মাথার ওপর ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের হালকা বাতাসের একটানা শব্দ আর ঘরের বাইরে চৈত্রের বাতাসে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই। পরম এক পবিত্র প্রশান্তি আর ভালোবাসার চাদর যেন তাদের পুরো ঘরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়ে রাখল।
 নামাজের সালাম ফেরানোর পর অনু বেশ কিছুক্ষণ জায়নামাজেই থমকে বসে রইল। তার চোখ দুটি সামনের দিকে নিবদ্ধ, যেখানে এহসান স্থির হয়ে বসে আছে। স্নিগ্ধ আলোর আবহে জায়নামাজে বসা এহসানের পিঠের দিকে তাকিয়ে অনুর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, অচেনা প্রশান্তি খেলা করছিল। কিন্তু এহসান ঠিক কী করছে, তা অনু পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছিল না। সে কি নিথর হয়ে শূন্যতায় তাকিয়ে আছে, নাকি মনে মনে কোনো ইবাদতে মগ্ন? 
ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা চিরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার এক রুদ্ধ, মৃদু শব্দ ভেসে এলো। পেছনের কাতারে বসে থাকা অনুর বুঝতে আর এক সেকেন্ডও বাকি রইল না যে, লোকটা কাঁদছে! যে মানুষটির কাঠিন্য আর গাম্ভীর্য ক্যাম্পাসের দেয়ালগুলোকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিত, সেই রুক্ষ, শক্ত-পোক্ত প্রফেসর এহসান সিদ্দিকী আজ বিয়ের রাতে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ?
অনুর বুকের ভেতরটা তীব্র আশঙ্কায় আর কৌতূহলে ঢিপঢিপ করে উঠল। এহসান হঠাৎ কেন কাঁদছে? কোনো গভীর কষ্ট কি চেপে রেখেছিল সে এতদিন?
সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা এহসান তখন দুই হাত তুলে বিড়বিড় করে মোনাজাতে লীন হয়ে ছিল। তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট থেকে নিচু স্বরে ঝরে পড়ছিল হৃদয়ের গভীরতম আকুতি.....
"ইয়া রব্বুল আলামিন... তুমি তাকে আমার করেছ! যাকে ভুলে যাওয়ার জন্য আমি প্রতিটা রাতে তোমার কাছে ব্যাকুল হয়ে দোয়া করেছি, তুমি আজ তাকেই আমার করে দিয়েছ। আমার ঘরে রহমত পাঠিয়ছ... যার প্রাপ্য হয়তো আমি ছিলাম না। তুমি আমাকে পৃথিবীতে জান্নাতের খুশি দান করেছ... আমি কীভাবে তোমার শুকরিয়া আদায় করব, রব্ব? আমাকে তুমি পূর্ণ করেছ তোমার সৃষ্টির সেরা নিয়ামত দিয়ে... আমাদের ভালো রেখো। আমিন।"
এহসানের মোনাজাত অনুর কান স্পর্শ করতেই তার বুকের ভেতরটা এক অনাস্বাদিত আবেগে মোচড় দিয়ে উঠল। টানা দুটি চোখ মুহূর্তেই নোনা জলে কানায় কানায় ঝাপসা হয়ে এলো। সে আর জায়নামাজে স্থির থাকতে পারল না। ধীর পায়ে এহসানের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর এহসানের চওড়া কাঁধে নিজের হাত রাখল।
এরপর ধীরেসুস্থে নিজের শরীরটাকে ঘুরিয়ে এসে বসল এহসানের একদম সামনে, মুখোমুখি। বেশ কিছুক্ষণ অনু কোনো কথা বলল না ,কেবল নিঃশব্দে সামনে বসে থাকা অশ্রুসিক্ত লোকটার নিষ্পাপ মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার কোমল হাতের আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিল এহসানের ফর্সা গাল । চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে মাথা নেড়ে ইশারায় বলল,আর না কাঁদার জন্য।
এহসান অনুর এই আলতো স্পর্শে যেন এক নিমেষে কেঁপে উঠল। সে নিজের দুটি হাত বাড়িয়ে অনুর নরম হাত দুটোকে নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় পুরে নিল। গভীর অনুশোচনা আর ভালোবাসায় বিড়বিড় করে বলল,
"কথা দিচ্ছি তোমাকে, আমার সাধ্যমতো সুখে রাখব। কোনোদিন জ্বালাতন করব না।"
অনু নিজের কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো সামলে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
"আপনি কাঁদছেন?"
এহসান চোখের কোণে জমে থাকা জলের রেশ সামলে এক চিলতে হেসে বলল,
"এটা সুখের কান্না... তুমি বুঝবে না।"
অনু তার চোখের গভীরে চোখ রেখে আবারও ফিসফিস করে বিড়বিড় করে উঠল,
"আপনি আমার জন্য কাঁদছেন...?"
এহসান এবার এক তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
"অনেক কেঁদেছি রূপ... প্রতিটি রাত অঝোরে কেঁদেছি, ঘুমাইনি... দীর্ঘ ৯টা মাস! এখন থেকে একটু শান্তিতে ঘুমাব..."
অনুর চোখ দুটো এবার আশ্চর্যে আর কান্নায় আরও বড় হয়ে গেল। তার অক্ষিপট বেয়ে দুটি টলটলে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল নিমেষেই। না, এটি কোনো বিষাদ বা কষ্টের কান্না নয়,এ হলো বহু প্রতিক্ষার পর প্রাপ্ত এক পূর্ণতার আনন্দাশ্রু! ক্যাম্পাসের সেই দাপুটে কঠোর প্রফেসর এহসান সিদ্দিকী তাকে পাওয়ার জন্য দীর্ঘ নয়টি মাস রাতে না ঘুমিয়ে অঝোরে কেঁদেছে — এই উপলব্ধি অনুর হৃদয়কে ভালোবাসায় কানায় কানায় ভরিয়ে দিল।
অনু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সব দ্বিধা আর লজ্জা দূরে ঠেলে সে নিজ থেকেই এগিয়ে গিয়ে এহসানকে দুই বাহু দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।এহসানও অনুকে নিজের বুকের গহীনে লেপ্টে নিল। 
অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে রাপ... তোমাকে ছাড়া আমি নিঃস্ব, ভাঙা নিঃস্ব! তোমাকে ছাড়া আমি একটা ভাঙা খেলনা পুতুলের মতো... তুমি শুধু কথা দাও, আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।"
অনু দেরি করল না। এহসানের শক্ত বুকের ওম বুকে মেখে সে বলল,
"কথা দিলাম, যাব না... একদম কোথাও যাব না।"
ঠিক তখনই জানালার বাইরে প্রবীণ নিস্তব্ধতা চিরে ঝমঝম করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমে এলো। রাতের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, বরষার বৃষ্টির শব্দকে সাক্ষী রেখে দুটি তপ্ত ,ব্যাকুল প্রাণ অবশেষে চিরদিনের জন্য এক হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময়ে...
এই আলো আর ভালোবাসার সমীকরণ থেকে বহু দূরে, অন্য একটি নিভৃত ঘরের এক কোণে রাখা কাঠের পড়ার টেবিলটার কাছে কেউ একজন ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে বসল। বুকচাপা কষ্ট আর একতরফা ভালোবাসা না পাওয়ার তীব্র বেদনায় তার হাত ধীরগতিতে টেবিলের ওপর রাখা কলমটার দিকে প্রসারিত হলো।
মানুষের স্বভাবজাত একটা অদ্ভুত প্রক্রিয়া আছে, মনের ভেতরে যখন অব্যক্ত অনুভূতির পাহাড় জমে ওঠে আর তা কাউকে প্রকাশ করা যায় না, তখন একখণ্ড সাদা কাগজ আর কালো কলমই হয়ে ওঠে তার একমাত্র নিঃশব্দ আশ্রয়। নীলও ঠিক তা-ই করল। আজকের এই রাতে তার দুটি চোখে ঘুম এলো না, বিছানায় কেবল ছটফট করে আর তপ্ত নিশ্বাস ফেলে কাটাল সে। শেষমেশ একখণ্ড সাদা পাতা আর কালো কালির কলমের আশ্রয় নিয়ে সে নিজের মনের বিষাদ ঢেলে লিখতে শুরু করল –
"দুনিয়ার এই বিশাল জনসমুদ্রে নাকি ৯.৯% মানুষই ভালোবাসার পূর্ণতা পায় না। সংখ্যাটা হয়তো নিছক পরিসংখ্যান, কিন্তু যখন নিজেকে ওই দলেই খুঁজে পাই, তখন এক গভীর শূন্যতা বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে। কেন সেই ভাগ্যবান ১% মানুষের ভেতর আমার নামটা লেখা হলো না?
আমি যখন কোনো বই পড়ি বা নাটক দেখি, আমার সমস্ত মায়া গিয়ে থমকে যায় ওই 'সাইড ক্যারেক্টার'দের ওপর। ওদের মাঝেই আমি নিজের ছায়া দেখি। বাস্তবতা আমাকে কখনো সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতো উজ্জ্বল কোনো অনুভূতি দেয়নি। মাঝে মাঝে মাথার ভেতর ঘোরপাক খায় এক অদ্ভুত সংশয় ,আমি কি তবে আমার স্রষ্টার প্রিয় নই? কেন আমার ভাগ্যেও কেবল ওই পার্শ্বচরিত্রদের মতো একতরফা মায়া আর অপেক্ষা?"
এই নাও পুরাটা লিখে দিলাম 👇
---
*মারিয়াম ফুল*
পার্শ্বচরিত্রদের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। কাউকে জোর করে আঁকড়ে ধরা তাদের স্বভাবে নেই, অথচ তারা মন উজাড় করে ভালোবাসতে জানে। কিন্তু বিনিময়ে তারা কি পায়? শুধু কিছু চেনা সান্ত্বনা..
'তোমাকে আরও কেউ বেশি ভালোবাসবে। তুমি আরও বেটার কিছু ডিজার্ভ করো। আমাদের না হলেও চলবে!'
এই 'বেটার' বা 'পারফেক্ট' অপশন কি সবাই খোঁজে? না। কেউ কেউ কেবল তাকেই চায়, যাকে সে একবার নিজের মনে জায়গা দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু পার্শ্বচরিত্রদের ক্ষেত্রে সমীকরণটা বড় নিষ্ঠুর। তাদেরও কোমল মন থাকে, গভীর আবেগ থাকে; কিন্তু তার মূল্য না থাকে বন্ধুদের আড্ডায়, না থাকে পরিবারের ভিড়ে।
তারপর একদিন তারা নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। কারণ তাদের হারিয়ে ফেলাটা পৃথিবীর কাছে তেমন বড় কিছু নয়। তাদের হারিয়ে গেলে খুঁজে বের করার মতো কেউ থাকে না। তারা কেবল এক নীল বিষাদ বুকে নিয়ে নিভৃতে পড়ে থাকে, প্রিয়তমার গল্পের এক কোণে, নামহীন কোনো এক ছায়া হয়ে।"
লেখাটি শেষ করে হাতের কলমটা ধীরপায়ে নামিয়ে রাখল নীল। চোখের চশমাটা খুলে টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখতেই তার চোখের কোণ বেয়ে দুটি তপ্ত অশ্রুবিন্দু সোজা গড়িয়ে পড়ল সদ্য লেখা ডায়েরির পৃষ্ঠাটিতে। নোনা জলের ছোঁয়ায় কাঁচা কালির বর্ণগুলো খানিকটা ঝাপসা, এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। নীল এক দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস ফেলে ডায়েরির পাতাটি আলতো করে বন্ধ করল। তারপর সে কাঠের শক্ত টেবিলটা তেই মাথা গুঁজে দিল। কখন যে ক্লান্ত শরীরে সে এক গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, বিষাদময় মানব নীল তা নিজেও জানতে পারল না।
চলবে.....
*নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা*
---

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন