ফন্ট সাইজ:
থিম:
ক্যাপ্টেন সাহেব

১ম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

ক্যাপ্টেন_সাহেব

#লিখনিতে_মারিয়াম_ফুল 
পর্ব : ১
আটলান্টিকের ওপর দিয়ে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর বিমানটি তখন ৩৬ হাজার ফুট উচ্চতায় ডানা মেলেছে। নিউইয়র্ক অনেক আগেই দিগন্তে মিলিয়ে গেছে, সামনে অন্তহীন নীল জলরাশি। কেবিনের ভেতরে ম্লান নীল আলো। যাত্রীদের কেউ ঘুমে বিভোর, কেউ বা হেডফোনে গান শুনছে। সব মিলিয়ে এক থমথমে প্রশান্তি।

ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ফালাফালা করে দিয়ে কেবিনের শেষ প্রান্ত থেকে ধাতব কিছু আছড়ে পড়ার কর্কশ শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই বাতাসের বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার! একজন এয়ার হোস্টেস দৌড়ে পেছনের দিকে যেতেই হ্যাঁচকা টানে তাকে পাশের সিটের ওপর ফেলে দেওয়া হলো।
মুহূর্তের মধ্যে কেবিনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাতজন লোক সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারা সাধারণ যাত্রী সেজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিল। সবার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা, চোখের মণি দুটো বন্য জানোয়ারের মতো অস্থির। একজনের হাতে ধারালো কিছুর ঝিলিক, অন্যজন একটি ইলেকট্রনিক জ্যামার উঁচিয়ে ধরল।
“কেউ নড়বেন না! যে নড়বে, তার খুলি আর ঘাড়ে থাকবে না!”
কর্কশ কণ্ঠের সেই হুঙ্কারে পুরো কেবিনে মুহূর্তের মধ্যে হিমাঙ্ক নেমে এলো। হাইজ্যাকারদের তিনজন ককপিটের দিকে পা বাড়ালো। সিসিটিভি স্ক্রিনে কেবিনের বিশৃঙ্খলা ধরা পড়তেই ককপিটের ভেতর কো-পাইলটের হাত কেঁপে উঠল।
প্রধান চালকের আসনে বসা মানুষটি কিন্তু নির্বিকার। তার দীর্ঘ বলিষ্ঠ আঙুলগুলো একবার কন্ট্রোল প্যানেল ছুঁয়ে গেল। সে কোনো আর্তনাদ করল না, কোনো প্রশ্নও করল না। শুধু একবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সে জানে, এই মুহূর্তে সে কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, সে এই বিমানের শেষ রক্ষাকর্তা।
ইন্টারকম অন হলো। পুরো বিমানে একটা ভরাট, গম্ভীর কিন্তু অসম্ভব শান্ত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো:
“সবাই নিজের জায়গায় স্থির থাকুন। মাথা নিচু করুন এবং সিটবেল্ট শক্ত করে বাঁধুন। শান্ত থাকুন।”
সেই কণ্ঠে এমন এক সম্মোহনী শক্তি ছিল যে, আতঙ্কিত যাত্রীরা অবচেতনে মাথা নিচু করে ফেলল। ঠিক তখন মাঝের সারি থেকে একজন অফ-ডিউটি সিকিউরিটি অফিসার রুখে দাঁড়ালেন। শুরু হলো ধস্তাধস্তি,ককপিটে বসা সেই মানুষটি বুঝল, ভেতরে বসে থেকে এই লড়াই জেতা যাবে না। সাতজন প্রশিক্ষিত হাইজ্যাকারকে দমানো কঠিন। সে অটোপাইলট সিস্টেম রি-চেক করে ধীরপদে উঠে দাঁড়ালো।
ককপিটের আর্মার্ড ডোর যখন খুলল, তখন হাইজ্যাকাররা ভাবেনি ভেতর থেকে স্বয়ং "যমদূত" বেরিয়ে আসবে। সাদা ধবধবে ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে গোল্ডেন স্ট্রাইপ। দীর্ঘকায় শরীরটা দরজায় দাঁড়াতেই কেবিনের আলো যেন তার ওপর এসে পড়ল। ক্যাপের ছায়ায় তার মুখটা তখনো অস্পষ্ট।
হাইজ্যাকারদের লিডার দাঁত কিড়মিড় করে চিৎকার করল, “পিছনে যা ক্যাপ্টেন! নাহলে এই অফিসারকে শেষ করে দেব!”
ক্যাপ্টেন এক পা এগিয়ে এলো। তার ঠাণ্ডা গলার স্বর পুরো কেবিনে গমগম করে উঠল:
“এই ফ্লাইটে কোনো নির্দেশ দিলে সেটা আমি দিই। আর তোমাদের জন্য আজকের শেষ নির্দেশ হলো—অস্ত্র নামাও। কারণ আর এক পা যদি এগোও, তবে এই প্লেনটা যেমন গন্তব্যে পৌঁছাবে না, তোমরাও জীবিত মাটিতে নামবে না।”
 হাইজ্যাকারের দ্বিধাগ্রস্ত মুহূর্তটাকেই ক্যাপ্টেন কাজে লাগাল। চোখের পলকে সে বাম দিকে এক দুর্দান্ত স্লাইড নিয়ে সামনের হাইজ্যাকারের কবজিতে একটা ব্লান্ট ফোর্স আঘাত করল। প্রচণ্ড শব্দে লোকটার হাত থেকে অস্ত্রটা ছিটকে পড়ল।
ক্যাপ্টেনের লড়াই ছিল দেখার মতো। সে একা তিনজনকে সামলাচ্ছিল। একের পর এক নিখুঁত পাঞ্চ আর কিকে হাইজ্যাকাররা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ল। সিটের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক হাইজ্যাকার ছিটকে গিয়ে পড়ল পাশের ফুড-ট্রলির ওপর। ক্যাপ্টেনের এই রণমূর্তি দেখে সাধারণ যাত্রীরাও সাহস ফিরে পেল। আরও চার-পাঁচজন সুঠামদেহী যাত্রী মিলে বাকি হাইজ্যাকারদের জাপটে ধরল।
কয়েক মিনিটের রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের পর সাতজন হাইজ্যাকারকেই সিটবেল্ট আর হাতের কাছে পাওয়া দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হলো। পরিস্থিতি সামলে সেই ক্যাপ্টেন দ্রুত ককপিটে ফিরে গিয়ে কন্ট্রোল নিল।
প্লেনটা মসৃণভাবে চট্টগ্রামের রানওয়েতে অবতরণ করল।চাকা স্পর্শ করল মাটিতে।কেবিনে ধীরে ধীরে স্বস্তির নিঃশ্বাস আবারো ফিরে এলো ।যাত্রীরা হাসি দিয়ে একে অপরকে দেখছে, ধন্যবাদ জানাচ্ছে।রানওয়ের পাশে বিশেষ একটি প্রভাতের মতো আলো জ্বলছে।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে যখন ফ্লাইটটা ল্যান্ড করল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু ঘটনা ততক্ষণে ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিমানে থাকা এক তরুণীর তোলা ভিডিও এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি। সোশ্যাল মিডিয়া ততক্ষণে তোলপাড়।
ফেসবুক, টুইটার (X), আর টিকটকে একটাই হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং— #HeroInTheSky। নিউজ পোর্টালগুলোর হেডলাইন:
আকাশে মৃত্যুঝুঁকি, শত যাত্রীকে বাঁচিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন বাঙালি ক্যাপ্টেন
সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্টের বন্যা বয়ে যাচ্ছে:
“কে এই ক্যাপ্টেন? উনার নাম কি! নিউ ক্রাশ আনলকড!”
বিমান থেকে যখন সেই মানুষটি ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো, তখন চারদিকে হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। ডজনখানেক নিউজ চ্যানেলের মাইক তার সামনে। ডিসি সাহেব একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন। চারদিকে তখন শোরগোল—কে এই বীর?
ডিসি সাহেব হাত বাড়িয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে বললেন, “আপনার মতো সাহসী মানুষ আমাদের গর্ব। আপনার সম্মাননা গ্রহণ করুন...”
ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষটি তার ক্যাপটা খুলল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে প্রথমবার পরিষ্কার ফুটে উঠল তার তীক্ষ্ণ নাক, উজ্জ্বল গায়ের রঙ আর গভীর শান্ত চোখজোড়া। সে মৃদু হেসে নিজের পরিচয় দিল:
“ধন্যবাদ। আমি ক্যাপ্টেন রাইহাম চৌধুরী রুদ্র।”
মুহূর্তের মধ্যে মিডিয়ার সব ক্যামেরা আর শত শত মানুষের নজর গিয়ে স্থির হলো তার ওপর। দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টার এই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর অবশেষে দুনিয়া চিনল তাদের নতুন হিরোকে— যার নাম এখন সবার মুখে মুখে, রাইহাম চৌধুরী রুদ্র  "
এয়ারপোর্টে নামতেই রুদ্রের ফোনে কল এল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আদিল মির্জার কাছ থেকে।
“সামনের ক্যাফেতে আয়। লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি, হোয়াটসঅ্যাপ চেক কর।”
আদিলের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামে। কাজের সূত্রে মাঝেমধ্যেই সে এখানে আসে। বর্তমানে সে ঢাকাতেই থাকে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসে যুক্ত থাকার কারণে প্রায়ই বিদেশে যেতে হয় তাকে—কখনো ব্যবসার কাজে, কখনো ওয়ার্কশপ বা মিটিংয়ের জন্য। ভাগ্যক্রমে দীর্ঘদিন পর আবার মুখোমুখি হলো দুই বন্ধু। সময়ের আর দূরত্বের কারণে আগের মতো আর দেখা করার সুযোগ হয়ে ওঠে না তাদের। এবার যেন কাকতালীয়ভাবে দু’জনই একসাথে দেশে এসেছে। আদিলের
বেশিরভাগ সময় দেশেই কাটলেও, রুদ্র দেশের বাইরেই বেশি থাকে।
ক্যাফে শপে বসতেই আদিল সরাসরি বলল ,“তুই সিরিয়াস- হ।”
“কোন বিষয়ে?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।
আদিল একটু থেমে বলল,
“তুই নিজেই জানিস আমি কী নিয়ে কথা বলছি। মানুষের জীবনে ভুল হতেই পারে। তার মানে এই না যে সেই ভুল আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। ওই দিন যা হয়েছিল, সেটা শুধু একটা অ্যাক্সিডেন্ট।”
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হাতে থাকা কফির মগে হালকা চুমুক দিয়ে বলল,
“আর কিছু?”
আদিল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল।“আমরা শুধু তোকে হাসিখুশি দেখতে চাই।আর কবে ফিরছিস?”
রুদ্র পাল্টা বলল,
আমাকে দেখে অসুখী মনে হচ্ছে তোর?
“নেক্সট ফ্লাইটে,”
আদিল একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলল।
— তোকে বলাই ভুল...
রুদ্ররের তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং সে আরও আয়েশ করে গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। ধীর ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক বসাতেই আদিল আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রুদ্রর ফোনের রিংটোন বেজে উঠল চারপাশে।
"মা" এই সময়? 
ওপাশ থেকে রেহানা চৌধুরীর কণ্ঠ শোনা গেল,
বাবা, তুই ঠিক আছিস?টিভিতে দেখলাম... তোকে। এই বিষয়ে আমরা পরে কথা বলব বাবা, আগে তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।
রুদ্র খানিকটা ঘাবড়ে গেল। সে দ্রুত রেহানা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করল,
— হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি । কিন্তু কী হয়েছে মা?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রেহানা আবার বললেন,
“তোর দাদি…”হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। উনি তোকে দেখতে চান।”
“আমি এখনই আসছি,” বলেই ফোন কেটে দিল রুদ্র।
ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে চারটা।
কেউ একজন তাড়াহুড়ো করে প্লেনের উইন্ডো সিটে এসে বসল। পাশের সিটে হেলান দিয়ে থাকা আগন্তুকের দিকে তাকানোরও সময় পেল না সে।
প্লেন টেক-অফ করার সময় হঠাৎ রুদ্র অনুভব করল কেউ তার হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে।
ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠে কেউ বলে উঠল,
“Sorry, sorry… I have aerophobia. আমি প্লেনে উঠলে খুব ভয় পাই।”
রুদ্র নিচে তাকিয়ে দেখল, তার হাতে চারটি নখের দাগ বসে গেছে।তার মুখে কালো মাস্ক, চোখে Cutler and Gross-এর কালো সানগ্লাস। গত কয়েক ঘণ্টার মিডিয়া হাইপ আর মানুষের ভিড় এড়াতে সে নিজেকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছিল যেন কেউ সহজে চিনতে না পারে। বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি, কিন্তু বিজনেস ক্লাসের কোনো টিকিট পাওয়া যায়নি।
রুদ্র বিরক্ত চোখে পাশে বসা সাদা ড্রেস আর বাদামি হিজাব পরা মেয়েটির দিকে তাকাল।
“Stupid।”
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“Excuse me, I am not stupid. Sorry বললাম তো।”
এই বলে নিজের ব্যাগ থেকে একটি ব্যান্ডেজ বের করে রুদ্রের হাতে লাগিয়ে দিল। তার ললাটের রগ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না, দু’জনই দু’দিকে ফিরে বসল। পঞ্চাশ মিনিটের ফ্লাইটে আর কেউ কারও দিকে ফিরে তাকাল না।
পঞ্চাশ মিনিটে প্লেন চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে
পৌঁছাল। ল্যান্ড করার সময় পাশের মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে সিটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সরাসরি রুদ্রের কোলের ওপর এসে পড়ল। ভয় পেয়ে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
রুদ্র হতবাক হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই মেয়েটি দৌড়ে প্লেন থেকে নেমে গেল।তারপর রুদ্রও বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। এয়ারপোর্ট কাছেই হলেও ট্রাফিকের কারণে সময় লাগল। তিন মাস পর সে বাড়ি ফিরল। কাজের প্রয়োজনে দেশে আসলে সে বেশিরভাগ সময় ঢাকার নিজের ফ্ল্যাটে থাকে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতের কারণে ফ্ল্যাটেও ঠিকমতো থাকা হয় না।বাড়ির দারোয়ান গেট খুলে দিল। ড্রাইভিং সিট থেকে রুদ্র তাকাল তিনতলা বিশিষ্ট আলিশান চৌধুরী নিবাসের দিকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়,বাড়িতে ঢুকে বাড়ির ভেতরে কাউকে দেখা গেল না।সবাই কোথায়?
ভেতরের এক সার্ভেন্টকে সে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ির সবাই কোথায়?”
“ছোট সাহেব, সবাই দোতলায়। বড় ম্যাডামের কাছে।”
রুদ্র চোখের ইশারায় সার্ভেন্টকে বুঝিয়ে দিল, তাকে আর প্রয়োজন নেই। সে যেন আবার নিজের কাজে ফিরে যায়।রুদ্র দোতলায় উঠে দাদির ঘরে ঢুকল। দেখল সবাই সেখানে জড়ো হয়ে বসে আছে।
এই বাড়ির বড় কর্তা সুলতানা চৌধুরী, রুদ্রের দাদি। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে হামজা চৌধুরী পেশায় একজন রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমান সংসদের একজন এমপি। তার স্ত্রী রেহানা চৌধুরী এবং তাদের দুই সন্তান। তাদের বড় ছেলে রেদওয়ান চৌধুরী, যিনি আট বছর আগে মারা গেছেন।রাইহাম চৌধুরী রুদ্র তাদের ছোট ছেলে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলা চলে, এখন সেই-ই তাদের একমাত্র ছেলে।
 রুদ্রের কাছে পৃথিবী মানে কখনোই শুধু নিয়ম আর বাঁধাধরা জীবন নয়। তার বিশ্বাস, জীবনটা একটা অ্যাডভেঞ্চার যেখানে ঝুঁকি নেই, প্রশ্ন নেই, সেখানে জীবনেরও কোনো দাম নেই।
 আগামীকাল, পরকাল কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা....এসব তার কাছে গৌণ। আজকের মুহূর্তটাই আসল। যে মানুষ যত দূর যেতে পারে, যত ভয়কে জয় করতে পারে, তার জীবন ততটাই অর্থপূর্ণ। আর এই বিশ্বাসই তাকে সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে।
দাদার দ্বিতীয় ছেলে হানিফ চৌধুরী, যিনি যুক্তরাজ্যে থাকেন। তার স্ত্রী মিলা চৌধুরী এবং তাদের তিন সন্তানও সেখানে থাকেন। মেয়ে সালমা চৌধুরী তার দুই সন্তানসহ আমেরিকায় থাকেন। 
রুদ্র ঘরে ঢুকতেই দেখল নিস্তব্ধতা। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অসুস্থ সুলতানা চৌধুরীকে দেখে সে কাঁপা গলায় বলল,
“দাদা…”
কিন্তু সুলতানা চৌধুরী তার দিকে তাকালেন না।সুলতানা চৌধুরীর চোখেমুখে অভিমানের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। 
রুদ্রের রাগ চেপে বসল।
“যদি কিছু বলবে না, তাহলে ডাকলে কেন? আমি চলে যাচ্ছি।”
সুলতানা চৌধুরী অভিমানভরা গলায় বললেন,
“চলে যা। মরলেও দেখতে আসবি না। আমরা যদি তোর কেউ হতাম, তাহলে মাসের পর মাস আমাদের থেকে দূরে থাকতিস না।”
রুদ্র দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল,পাশে থাকা চেয়ারটা টেনে দাদির বিছানার পাশে এনে বসল রুদ্র। রেহানা চৌধুরী তখনও নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে রুদ্র ভ্রু তুলে ইশারায় জানতে চাইল, কী হয়েছে?
তার মা ধীর স্বরে বললেন,
— তুই কথা বল।
রুদ্র দাদির হাতটা আলতো করে নিজের মুঠোয় নিয়ে নিল, যেন আশ্বাস দিল তাকে। 
— এবার বলো, কী হয়েছে?কি চাও, দাদা?
দাদি দুর্বল কণ্ঠে বললেন,
দাদু, ভাই—কথা দে, এবার কথা রাখবি।
রুদ্র মাথা নেড়ে হ্যাঁসূচক সম্মতি জানালো।
দাদি আবার বলতে শুরু করলেন,
 এই বাড়িতে কোনো বাচ্চার হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ নেই। কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আগের মতো আবার হৈ-হুল্লোড় করে উঠুক না এই বাড়ি। আমি চাই, তুই একটা বিয়ে কর । আমি আর বাঁচবই বা কয়দিন দাদুভাই... বড়জোর এক-দুই বছর। তার আগে অন্তত এই বাড়িটাকে আবার প্রাণ ফিরে পেতে দেখতে চাই।
রুদ্রের মা পাশে থেকে বললেন,
“দুইবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তোর দাদার। আমি আর কিছু বলব না তোকে।”
এমন না যে এর আগে তাকে বিয়ের জন্য জোর করা হয়নি,বরং এসবের চাপে একসময় সে ঠিকমতো বাড়িতে আসাই বন্ধ করে দিয়েছিল।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতিটা অন্যরকম। দাদিকে সত্যিই খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে। বাড়িতেই তার সবরকম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।রুদ্রের দাদি আজ পর্যন্ত তার কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেননি। ছোটবেলা থেকেই এই মানুষটার কাছে সে ছিল ভীষণ আদরের। তাই মাঝেমধ্যে মজা করেই রুদ্র হামজা চৌধুরীকে বলত,
“বাবা, দেখেছ? তোমার মা কিন্তু তোমার থেকেও আমাকে বেশি ভালোবাসে।”
রুদ্র অতীতের কথা মনে করে চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রুদ্র তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর হঠাৎই বলে উঠল—
“শর্ত আছে।”
“কি শর্ত?” দাদি জিজ্ঞেস করলেন।
“বিয়ে করব। কিন্তু দশ দিনের মধ্যে। শুধু ফ্যামিলির ভেতর। বাইরে কেউ জানবে না।”
দাদি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। রুদ্র রাজি হয়েছে, এটাই অনেক। “কিন্তু এত কম সময়ে কীভাবে সম্ভব?”
আমি জানি না, বলে রুদ্র দাদির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অন্যদিকে, বাড়ির পেছনের গেটটা নিঃশব্দে ঠেলে ভেতরে ঢুকল কেউ একজন। চারপাশ একবার সতর্ক চোখে দেখে ধীরে ধীরে একটা মই বেয়ে ওপরে উঠল সে। তারপর অন্ধকারে ঢাকা বারান্দা পেরিয়ে নিঃশব্দেই নিজের রুমে প্রবেশ করল। ঘরে ঢুকতেই একটি কণ্ঠ ভেসে এল,
“মেহের—”
সে ভয় পেয়ে গেল। তবে পরিচিত কণ্ঠ শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল । নিজের পরনের ব্রাউন হিজাবটা ছুড়ে মারল বিছানার ওপর।
তখন রাগে ফুঁসতে থাকা মেঘলা জিজ্ঞেস করল...
“মেহের, তুই কোথায় ছিলি? তোর ইউনিভার্সিটিতে কল দিয়েছি, সবাই বলেছে তুই ক্লাসে যাসনি।”
“এই হইচই করিস না,আস্তে কথা বলো… হুশ.. কেউ শুনে ফেললে বিপদ হয়ে যাবে।মেহের বলল।"
“কিন্তু কোথায় গিয়েছিলি? বড় আম্মু রেগে
আছে।”
—“কি বলেছিস! আমি ইউনিভার্সিটিতে যাইনি"
—"তাহলে"? 
— "সকালে চট্টগ্রামের ফ্লাইটে গিয়ে বিকেলে ফিরে এসেছি?"
“এ্যা,” অবাক স্বরে বলল মেঘলা। এ্যা না, হ্যা—যা শুনেছিস, ঠিক শুনেছিস।
মেঘলা চোখ বড় করে বলল,“বড় আব্বু বা বড় আম্মু জানলে?”
— “না, জানবে না। যদি তুই না বলিস।”
“ঠিক আছে। এখন চল, খেতে আয়। রাতে কথা বলব এই বিষয়ে।”
সায়েদ ইমরান সাহেবের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে সায়েদ মির্জার বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। মেজো ছেলে সায়েদ মাশফি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অনার্স পড়ছে। ছোট মেয়ে সাওয়াজ সায়েদ মেহের, সদ্য সাস্টে কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে।
সায়েদ ইমরানের ছোট ভাইয়ের সায়েদ শফিকের দুই মেয়ে। একজন সায়েদ মেঘলা, কাজিন হওয়ার পাশাপাশি মেহেরের ক্লাসমেট ও বেস্ট ফ্রেন্ড। আরেকজন সায়েদ মিনহা, সে এবার এসএসসি দেবে। 
সায়েদ ইমরান একজন প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। দেশের ভেতর ও বাইরে তার বিস্তৃত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক রয়েছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন হিসেবে পরিচিত।
তার বড় ছেলে সায়েদ মির্জা পারিবারিক ব্যবসার সাথে যুক্ত এবং বাবার কাজে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে। ধীরে ধীরে সে দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
সায়েদ ইমরানের স্ত্রী সায়েদ কামিনী একজন আত্মপ্রত্যয়ী নারী। তিনি পরিবার ও সামাজিক পরিসরে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে চান এবং প্রায়ই নিজের ক্ষমতা প্রকাশের চেষ্টা করেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন