ফন্ট সাইজ:
থিম:
ক্যাপ্টেন সাহেব

৭ম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

#ক্যাপ্টেন_সাহেব 
#লিখনিতে_মারিয়াম_ফুল 
"অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ "
পর্ব :৭
সকাল ৭টা। ড্রয়িংরুমের দিক থেকে আসা খটখট শব্দে মেহেরের ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ কচলে ড্রয়িংরুমে আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। রুদ্র শুধু একটা শর্টস পরে খালি গায়ে হাতে কফির মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেজা চুল আর সুঠাম দেহটা সকালের আবছা আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মেহের অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল।
রুদ্র মেহেরকে দেখে বাঁকা হাসল। “গুড মর্নিং সুইটহার্ট! ওহ স্যরি... বিটারহার্ট! আমি খুব একটা জেন্টলম্যান টাইপ লোক নই, সেটা তো জানোই। কফি নিজে বানিয়ে খেয়ে নিও। একটু পরে নতুন সার্ভেন্ট আসবে, সেই রান্নাবান্না সামলাবে।”
মেহের কোনো উত্তর দিল না। কিচেনে ঢুকে দেখল সবকিছু একদম অগোছালো, একটা ব্যাচেলর ছেলের কিচেন যেমন হয়। তবুও নিজের জন্য কফি বানিয়ে সে বারান্দায় গিয়ে বসল। এই ফ্ল্যাটের মধ্যে এই বারান্দাটাই হয়তো মেহেরের কাছে সবথেকে বেশি পছন্দ হলো।
ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটা অদ্ভুত খসখস শব্দ ভেসে এল। মনে হলো কেউ ভারী কিছু একটা মেঝেতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই বিকট কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো.... মেহের চমকে উঠল। 
পরক্ষণেই রুদ্র এসে দাঁড়াল বারান্দার দরজায়। পরনে এখন একটা টি-শার্ট। মেহের কফির মগে চুমুক দিয়ে নির্লিপ্তভাবে বলল, “ আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।”
রুদ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে মেহেরের খুব কাছে এগিয়ে এসে বলল, “ট্রাস্ট মি, আমিও তোমাকে নিয়ে যেতাম না। দাদির কথা ফেলি না বলেই যাচ্ছি। সো, জাস্ট মেক শিওর ইউ আর রেডি ইন ফাইভ মিনিটস।”
গাড়িতে বসে রুদ্র বারবার চুলে হাত বোলাচ্ছে, কখনো হাতের দামি ঘড়িটা ঠিক করছে। মেহের পাশে এসে বসল পরনে লং ড্রেস আর মাথায় নিখুঁত হিজাব। রুদ্রর মনে পড়ে গেল প্রথম দিনের সেই প্লেনের দৃশ্যটা। মেহের বসতেই রুদ্র লাউড মিউজিক ছেড়ে দিল। মেহের সাথে সাথে সেটা অফ করে দিল। রুদ্র আবার অন করল, মেহের আবার অফ। রুদ্র এবার দাঁত কিড়মিড় করে মিউজিক সিস্টেম বন্ধ করে দিল।
শপিং মলে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই দেখা হলো রুদ্রর দুই পুরনো বান্ধবী নিশা আর রুমাইশার সাথে। তারা জনসমক্ষেই রুদ্রকে জড়িয়ে ধরল। নিশা মেহেরের দিকে ইঙ্গিত করে রুদ্রকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার সাথে যে এসেছে, ও কে হয় তোমার?”
রুদ্রর বিয়ের কথা তার কোনো ফ্রেন্ড বা কলিগ জানত না। সে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে খুব সাবলীলভাবে বলল, “রুমমেট!”
রুমাইশা উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, “আউউ! বাংলাদেশে বিয়ে ছাড়া রুমমেট? দ্যাটস সো এক্সাইটিং রুদ্র!” নিশা একগাল হেসে মেহেরের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে অবজ্ঞার সুরে বলল, “টেস্ট তো বদলে গেছে তোমার রুদ্র! আগে তো এই টাইপ পছন্দ ছিল না তোমার। তা... রুমমেট যখন, তখন নিশ্চয়ই খুব ‘অ্যাকোমোডেটিং’, তাই না?”
নিশার বাঁকা কথায় মেহেরের কানের লতি পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। ‘রুমমেট’ শব্দটা এই মেয়েগুলোর কাছে খুব স্বাভাবিক শোনালেও মেহেরের কানে তা বিষের মতো লাগল। তার আত্মসম্মানে যেন কেউ সজোরে থাপ্পড় মারল। মেহের পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে অপমানে। রুদ্র একবারও প্রতিবাদ করল না, বরং বন্ধুদের সাথে এই সস্তা মজাটা উপভোগ করতে লাগল। মেহেরের মনে হলো, সে যেন একটা জীবন্ত পণ্য, যাকে রুদ্র তার বন্ধুদের সামনে সাজিয়ে রেখেছে শুধু বিদ্রূপ করার জন্য।
অ্যাপার্টমেন্টের লিভিং রুমে তখন এক থমথমে নীরবতা। বৃষ্টির ঝাপটা কাঁচের জানলায় আছড়ে পড়ছে, যেন বাইরের আকাশটাও মেহেরের মনের ভেতরের কান্নার সুর ধরেছে। শপিং মল থেকে ফেরার পর মেহেরের বুকের ভেতরটা অপমানে দাউদাউ করে জ্বলছিল। রুদ্রর বন্ধুদের সামনে সেই 'রুমমেট' পরিচয়টা তার আত্মসম্মানে এক মরণকামড় বসিয়েছে।
রুদ্র সোফায় হেলান দিয়ে বসে পায়ের জুতো খুলছিল। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং এক ধরণের বিজয়ীর তৃপ্তি। মেহের কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে লাল হয়ে আছে। মেহের ভাঙা গলায় বলল 
“আপনি আমাকে সবার সামনে ‘রুমমেট’ বলে পরিচয় দিলেন? আপনি কি জানেন আপনি আমাকে কতটা নিচে নামিয়েছেন? আপনার ওই বন্ধুদের কাছে আমার চরিত্রটা এখন কী দাঁড়িয়েছে সেটা কি একবারও ভেবেছেন?”
রুদ্র জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে মাথা তুলল। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিদ্রুপাত্মক হাসি। সে মেহেরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মেহেরের খুব কাছে এসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত স্বরে বলল 
“কেন? রুমমেট বললে কি তোমার ওই ‘পবিত্র’ ইমেজে দাগ পড়ে গেল? রিয়েলিটি চেক সুইটহার্ট! তোমার মতো এই বোরকাওয়ালী ব্যাকডেটেড মেয়েকে আমার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়াটা আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে কতটা এমব্যারাসিং সেটা কি তোমার কোনো ধারণা আছে? তার চেয়ে ‘রুমমেট’ পরিচয়টাই তোমার জন্য একটা লাক্সারি। অন্তত লোকে ভাববে ক্যাপ্টেনের সাথে থাকার মতো কোনো গুণ তোমার আছে।” 
মেহেরের সারা শরীর রাগে রি রি করে উঠল। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত কিড়মিড় করে বলল 
“ক্যাপ্টেন রাইহাম চৌধুরী রুদ্র, ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট! নিজের আভিজাত্য জাহির করতে গিয়ে অন্যের চরিত্র নিয়ে ...... ”
রুদ্র এবার খিলখিল করে হেসে উঠল।সে মেহেরের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“লিমিট? লিমিট তো তুমি ক্রস করেছ সাওয়াজ সায়েদ মেহের! আই জাস্ট সেড দ্য ট্রুথ। তোমার এত লাগছে কেন? বিয়ের আগে প্রেগন্যান্ট হতে পারো, অথচ একটা ‘রুমমেট’ পরিচয় দিলে তোমার সতীত্বে আঘাত লাগে? ওয়াও! আপনাদের মতো হিজাবওয়ালী মেয়েদের এই ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ দেখেই তো আমার হাসি পায়। পেটে পাপের বোঝা নিয়ে ঘুরছো, আবার বড় বড় নীতিবাক্য শোনাচ্ছো?”
রুদ্রর এই শেষ কথাটা মেহেরের মস্তিষ্কে যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। নিজের পবিত্রতা নিয়ে এমন জঘন্য অপবাদ সে তার অতি বড় শত্রুর কাছ থেকেও আশা করেনি। মেহেরের মনে হলো চারপাশের বাতাস ফুরিয়ে আসছে। রুদ্রর সেই দীর্ঘকায় শরীর আর ডার্ক লিভিং রুমটা যেন গোলকধাঁধার মতো ঘুরছে।
মেহেরের মুখটা মুহূর্তে ছোট হয়ে এল। সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হয়ে গেছে। এক অসহ্য যন্ত্রণায় তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে শুধু বলল, “আল্লাহ...!”
পরক্ষণেই মেহেরের শরীরটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে এক হাত দিয়ে সোফার কোণাটা ধরার শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চোখের পাতা বুজে আসার আগেই সে দেখল রুদ্রর সেই অবজ্ঞাময় চেহারাটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মেহের নিথর হয়ে শক্ত ফ্লোরের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
রুদ্রর সেই পৈশাচিক হাসিটা মুহূর্তেই উবে গেল। তার হাতের চাবিটা হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল। সে চিৎকার করে মেহেরের দিকে এগিয়ে এল—
“মেহের! মেহের! ওপেন ইয়োর আইজ! হেয়... দিস ইজ নট ফানি!”
“আমার বাচ্চা ঠিক আছে? কথা বলুন না। কেউ নেই আমার এই দুনিয়াতে। ওর বাবাও নেই। ওর বাবার বাবাকে আমি কী জবাব দেব যদি ওর কিছু হয়? ওর বাবা তো জানতেও পারল না…”
রুদ্রর সেই পৈশাচিক হাসিটা মুহূর্তেই উবে গেল। তার হাতের চাবিটা হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল। সে চিৎকার করে মেহেরের দিকে এগিয়ে এল
“মেহের... মেহের! ওপেন ইয়োর আইজ হেই… দিস ইজ নট ফানি”
রুদ্র ধপ করে হাঁটু গেড়ে মেহেরের পাশে বসল। তার যে হাত দুটো হাজার ফিট উপরে প্লেনের কন্ট্রোল ধরে, সেই হাত দুটো আজ কাঁপছে। মেহেরের গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে ফিসফিস করে ডাকল, 
“মেহের… মেহের! ওঠো বলছি, এসব নাটকের কোনো মানে হয় না”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। মেহেরের শ্বাস-প্রশ্বাস বড্ড ক্ষীণ। রুদ্রর হঠাৎ মনে হলো, সে কি তবে বড্ড বেশি বলে ফেলেছে? ‘পাপের বোঝা’ শব্দটা বলার সময় একবারও কি তার বুক কাঁপল না? অথচ এই মেয়েটা তারই পরিবারের পছন্দে তার জীবনে এসেছে।
মিনিট কয়েকের ঘোর কাটিয়ে রুদ্র মেহেরকে পাঁজাকোলা করে তুলে লিফটের দিকে ছুটল। কোনোমতে তাকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে। মাঝেমধ্যে রুদ্রর চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল।
এমার্জেন্সিতে নেওয়ার পর রুদ্র বাইরে পাথরের মতো বসে রইল। হাসপাতালের করিডোরের সেই ধবধবে সাদা আলো আর ওষুধের কড়া গন্ধ তাকে যেন পিষ্ট করছিল। নার্স দুবার ডাকার পর সে সম্বিত ফিরে পেল।
ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকা মাত্রই টেবিলের ওপাশে বসা ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, “আপনি উনার কী হন?”
রুদ্র কিছুটা ইতস্তত করে অস্ফুট স্বরে বলল, “হাজব্যান্ড।”
ডাক্তার তাকে বসতে ইশারা করে নিজের নেমপ্লেটটা ঠিক করতে করতে বললেন, 
"আমি ডাক্তার মৃদুলা। আপনি রুদ্র? আমি কি ঠিক বলছি? আপনাকে টিভিতে দেখেছি, তাই চিনতে সমস্যা হয়নি। তবে এখন পরিস্থিতিএকটু জটিল।"
রুদ্র শুধু “হুম” বলে উত্তর দিল।
ডাক্তার মৃদুলা একটি ফাইল এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন
“দেখুন মিস্টার রুদ্র, আপনার ওয়াইফের প্রেগন্যান্সিতে অনেক কমপ্লিকেশন আছে। রিপোর্ট বলছে বাচ্চাটা জরায়ুতে নেই, এটি একটি ‘একটোপিক প্রেগন্যান্সি’। ৪ সপ্তাহের মাথায় এমন হওয়া মানেই জীবন-মরণের ঝুঁকি। দেরি করলে ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হতে পারে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাচ্চাকে বাঁচানো অসম্ভব হতে পারে, অন্তত মাকে তো বাঁচাতে হবে।
রুদ্রর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার নিজের কোনো সুপ্ত অতীত স্মৃতি যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। এই অনাগত সন্তানটি তার নয়, তবুও কেন এক অদ্ভুত টান অনুভব করছে সে? কেন মনে হচ্ছে এই নিস্পাপ প্রাণটাকে হারানো মানে তার নিজের কোনো পুরনো ক্ষত আবার তাজা হওয়া? সে কেবল বিড়বিড় করে বলল, “বাচ্চাটা কি আসলেই… কোনো আশা নেই?”
ডাক্তার মৃদুলা একটু থেমে বললেন, “২৪ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখব আমরা, আপনি ধৈর্য ধরুন। তবে ওনার হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার কারণ কী? উনি কি অন্য কোনো বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন? এই অবস্থায় কোনো রকম মেন্টাল টেনশন দেওয়া যাবে না।”
রুদ্র অপরাধবোধের এক বিশাল বোঝা নিয়ে মেহেরের কেবিনে ঢুকল। হাসপাতালের সাদা বিছানায় মেহের তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। কেবিনের এক কোণে রাখা সোফাটায় বসে ছিল রুদ্র। বারবার না চাইতেও তার চোখজোড়া অবাধ্য হয়ে মেহেরের শান্ত মুখটার দিকে চলে যাচ্ছিল। অসুস্থতার ফ্যাকাশে ভাব সত্ত্বেও মেহেরের চেহারায় এক অদ্ভুত মায়া লেগে আছে।
কিছুক্ষণ পর মেহেরের চোখের পাতা নড়ে উঠল। সে চোখ মেলছে দেখে রুদ্র দ্রুত সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলতো পায়ে মেহেরের বেডের কাছে গিয়ে পাশের একটা টুলে বসে পড়ল সে।
মেহের পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাতেই দেখল রুদ্র খুব কাছে বসে আছে। মেহের যখন চোখ মেলল, তার ক্ষীণ কণ্ঠে ঝরে পড়ল কেবল হাহাকার
 “আমি এখানে কী করছি?”
রুদ্র ছোট করে উত্তর দিল, “তুমি অসুস্থ।”
মেহের হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল,
 “আমার বাচ্চা ঠিক আছে? কথা বলুন না! কেউ নেই আমার এই দুনিয়াতে। ওর বাবাও নেই। ওর বাবার বাবাকে আমি কী জবাব দেব যদি ওর কিছু হয়? ওর বাবা তো জানতেও পারল না…”
নিস্তব্ধ কেবিনে মেহেরের কান্নার শব্দটা যেন দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে রুদ্রর বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছিল। মেহেরের দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে এক হাত দিয়ে নিজের পেটটা আঁকড়ে ধরে আছে, যেন পৃথিবীর সব শক্তি দিয়ে সে তার অনাগত সন্তানকে আগলে রাখতে চায়।
রুদ্র যখন শান্ত স্বরে ডাক্তার মৃদুলার বলা সেই ভয়ংকর আশঙ্কার কথাগুলো বলল “বাচ্চাটা জরায়ুতে নেই…” মেহেরের পৃথিবীটা যেন এক লহমায় ধসে পড়ল। সে পাথর হয়ে কয়েক সেকেন্ড রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই তার ভেতর থেকে এক বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
সব জড়তা, সব ঘৃণা ভুলে মেহের দুহাতে রুদ্রর কলার আঁকড়ে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। সে রুদ্রর বুকের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল
“আপনি… আপনি বলেছিলেন না ও পাপ? ও কোনো পাপ নয় রুদ্র! ও আমাদের ‘বৈধ’ সন্তান! আমার বয়স যখন মাত্র আঠারো, তখন আমি তাকে কবুল বলেছিলাম… আল্লাহর আরশ সাক্ষী রেখে আমি তার অর্ধাঙ্গিনী হয়েছিলাম। ও কোনো অবৈধ ভ্রূণ নয়, ও পবিত্র প্রাণ। ”
মেহেরের প্রতিটি শব্দ রুদ্রর কানে চাবুকের মতো লাগছিল। মেহেরের গলা দিয়ে যেন স্বর বের হতে চাইছিল না, কান্নার তোড়ে কথাগুলো আটকে যাচ্ছিল। সে রুদ্রর শার্টের হাতা খামচে ধরে ভাঙা গলায় বিলাপ করতে লাগল…
❝কেন ও পৃথিবীর আলো দেখবে না? ওর বাবা… ওর বাবা তো জানতেও পারল না যে তার একটা অংশ আমার ভেতরে বড় হচ্ছে।
ওর মায়ের না এই পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই। মা নেই, বাবা নেই… এমনকি বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে এমন একটা ভাইও নেই। কত বড় এই পৃথিবী, অথচ ওর মায়ের মাথার ওপর ছাদ হয়ে থাকার মতো একটা মানুষও নেই। সে আমাকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখালো কেন আবার? এখন এভাবে মাঝপথে আমাকে একা ফেলে ও যেতে পারে না। ওর এই অধিকার নেই…❞
রুদ্রর শরীরের ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। মেহেরের প্রতিটি কান্নার শব্দ যেন তার পঞ্জরাস্থিতে গিয়ে বিঁধছে। মেহেরের হাহাকার তাকে এক ঝটকায় তার অতীতের কোনো এক ধূসর স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। অনেক বছর আগে, এমন এক হাসপাতালের করিডোরে সে কি কাউকে হারিয়েছিল?
মেহেরের গর্ভের এই সন্তানটি রুদ্রর নয়, তবুও মেহের যখন তার হাত আঁকড়ে ধরল, রুদ্রর মনে হলো তার পুরো অস্তিত্ব যেন দুলে উঠছে। একটা অজানা মায়া, এক তীব্র টান সে অনুভব করতে লাগল এই অনাগত প্রাণটার প্রতি। রুদ্রর মনের কোণে প্রশ্ন জাগল কেন সে এত অস্থির হচ্ছে?
মেহের যখন বুঝতে পারল যে সে রুদ্রকে জড়িয়ে আছে, তখন এক ধাক্কায় রুদ্রকে ঠেলে দিল। রুদ্র তাল সামলাতে না পেরে এক পা পিছলে গেল। রুদ্রর ঘোরের অবসান ঘটল।
চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন