ফন্ট সাইজ:
থিম:
ক্যাপ্টেন সাহেব

৪২তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম ফুল

মেহেরের হঠাৎ ঘুমটা পাতলা হয়ে এলো। বুজে আসা, ঘুম-জড়ানো চোখে হাত বাড়িয়ে সে বিছানার পাশটা হাতড়ালো। তন্দ্রাচ্ছন্ন মনেও সে অনুধাবন করল....তার কোল জুড়ে থাকা ছোট প্রাণটা পাশে নেই। মুহূর্তের মধ্যে মেহের এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোখের ঘুম উবে গিয়ে সেখানে বাসা বাঁধল এক অজানা আতঙ্ক। বিছানার চারদিকে ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, সত্যিই ছেলে নেই।

"হে আল্লাহ, আমার ছেলে কোথায়?"
মেহের বিছানা থেকে তড়িঘড়ি করে নামল। ঘরের দরজা পেরিয়ে লিভিং এরিয়ার দিকে এগোতে এগোতে বুকভাঙা আকুলতায় ডাক দিল, "বেবি... বেবি! লিটল চার্ম, কোথায় তুমি? পাখি..."
মেহেরের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ভাবনার জগতে কত শত দুঃস্বপ্ন এসে ভর করতে লাগল। ভয়ে সে ঢোক গিলল; গলার ভেতরটা যেন এক লহমায় কাঠ হয়ে শুকিয়ে এসেছে। বুক খালি করা এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করতে চাইছে।
"না, এসব ফালতু চিন্তা করা যাবে না মেহের। তোমার ছেলের কিচ্ছু হবে না," নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বিড়বিড় করতে লাগল সে। "বাবাই, তোমার কিচ্ছু হবে না... তুমি কোথায় পাখি? মা তোমাকে খুঁজছে..."
একপ্রকার উন্মাদিনীর মতো মেহের রান্নাঘর, লিভিং এরিয়া এবং আশপাশের প্রতিটি রুম খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও তার ছেলের কোনো অস্তিত্ব মিলল না। মেহেরের নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে আসতে লাগল।
সে আবার লিভিং এরিয়াতে ফিরে এলো। না, এখানে খুঁজে লাভ নেই, ছেলেকে নিশ্চয়ই বাইরে খুঁজতে হবে। কেউ কি ওকে চুরি করে নিয়ে গেল? না না, মেহের, এসব একদম ভাববি না......
মনে মনে নিজেকে শক্ত করে লিভিং এরিয়ার মূল দরজা খুলে বাইরে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই পাশের রুদ্রর বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট, আদুরে শব্দ ভেসে এলো—
"বুউউউ..."
মেহেরের পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। মনকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, সে কি সত্যি কোনো ছোট বাচ্চার গলার আওয়াজ শুনল, নাকি এটা তার মনের ভুল? ঠিক তখনই আরেকটা মৃদু, গম্ভীর স্বর তার কানে ঠেকলো....
"চাঁদ ওই দেখো... চাঁদ..."
তার পরপরই আবার সেই অবুঝ শিশুর আধো-কণ্ঠের সাড়া ভেসে এলো—"বুউউজ... উম্মম্ম..."
রুদ্রর ঘরের ভেতর থেকে নিশ্চিত শব্দ পেয়ে মেহের আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সোজা দৌড়ে রুদ্রর ঘরের দিকে গেল। কিন্তু ঘরের বিছানা ফাঁকা, ভেতরে কেউ নেই। মেহেরের ব্যাকুল চোখ দুটো নিমেষেই ঘরের সাথে সংলগ্ন বারান্দার দিকে চলে গেল।
সেখানে ঝুলতে থাকা হালকা সাদা পাতলা পর্দার পেছনে এক দীর্ঘ, পুরুষালী অবয়ব দাঁড়িয়ে রয়েছে। বারান্দার হাওয়ায় পর্দাটা বারবার দুলছে, আর তার পেছন থেকে শব্দ দুটো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মেহের ধীরপায়ে, এক পা এক পা করে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। চোখের কোণে তখনো আতঙ্কের জল জমে আছে। 
হালকা হাতে ঝুলন্ত পর্দাটা সরাতেই দৃশ্যটা তার চোখে ধরা পড়ল। রুদ্র তার ছেলেকে বুকের সাথে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মেহের স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
পায়ের সামান্য শব্দ পেয়ে রুদ্র পেছনের দিকে তাকাল। সে কেবল বুঝতে পেরেছিল কেউ একজন এসেছে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেহের রুদ্রর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মূলত কোল থেকে নিজের ছেলেকে জড়িয়ে ধরার উদ্দেশ্যেই তার এই আকস্মিক আগমন। সে ক্ষণিকের জন্য ভুলেই গিয়েছিল, তার নিষ্পাপ শিশুটি তো এই মুহূর্তে রুদ্রর নিরাপদ আশ্রয়েই রয়েছে। ছেলেকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে সে অবচেতনভাবেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রুদ্রকে। 
রুদ্র চমকে উঠলেও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিল। মেহেরের এই ব্যাকুলতায় ছোট মানুষটা যেন ব্যথা না পায়, তাই ছেলেকে বুক থেকে খানিকটা সরিয়ে এনে আলতো করে আগলে ধরল।
"মেহের... মেহের! হে অ্যারোফোবিয়া... কী হয়েছে তোমার?"
মেহের কোনো কথা বলতে পারছিল না। রুদ্রর চওড়া বুকের জামাটা শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরে সে আরও কিছুটা লেপ্টে গেল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, "আমার... আমার... ছে... ছেলেকে... আমি ভেবেছিলাম... হারিয়ে ফেলেছি..."
রুদ্র শান্ত কণ্ঠে বলল, "মেহের, কিচ্ছু হয়নি ওর। দ্যাখো, ও তো আমার কাছেই আছে। মেহের, তাকাও... দেখো..."
রুদ্রর আশ্বস্ত করা কণ্ঠে মেহের ধীরে ধীরে তার বুক থেকে মুখটা তুলে আনল। মুহূর্তেই তার ঘোর ভাঙল। সে এতক্ষণ রুদ্রর বুকে এভাবে মিশে ছিল? মেহেরের হঠাৎ এই কান্না আর ব্যাকুলতা দেখে রুদ্র সম্পূর্ণ কারণটা অনুধাবন করতে পারছিল না।
মেহের তখনও থমথমে, ছলছল চোখে রুদ্রর দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে।
"মেহের? ভয় পেয়েছিলে? দ্যাখো, ও একদম নিরাপদ, আমার কাছে আছে।"
মেহের ছেলের দিকে একবার তাকাল। তারপর ফুঁপাতে ফুঁপাতে বিড়বিড় করে বলল, "আমাকে বললেন না কেন? ওকে যে নিয়ে এলেন... আপনি আমার কষ্ট বোঝেন না? আমার মনে হচ্ছিল আমি মারা যাব! আমি... আমি ভেবেছিলাম ওকে কেউ কেড়ে নিয়ে গেছে..."
কথা বলতে বলতে মেহেরের বুকটা কান্নার তোড়ে ওঠা-নামা করছিল। রুদ্র হঠাৎ নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। আঙুলের ডগা দিয়ে মেহেরের গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের জলটুকু মুছে দিল।
রুদ্রর এই স্পর্শ মেহেরের কাছে কেমন যেন অদ্ভুত, এক পরম অনুভূতির মতো ঠেকলো।
"কান্না করার মতো কিচ্ছু হয়নি। আর কেঁদো না," রুদ্র নিচু স্বরে বলল।
মেহের এক পা রুদ্রর থেকে সরে হাত বাড়িয়ে বলল, "ওকে দিন... আমার কাছে..."
রুদ্র আর কথা বাড়াল না। পরম যত্নে ছেলেকে মেহেরের প্রসারিত হাতে তুলে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কোল বদল হওয়ার সময় ছোট প্রাণটা আচমকা বলে উঠল, "বাআআ..."
রুদ্র স্থবির হয়ে নিষ্পাপ শিশুটির দিকে তাকাল। মনটা এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভরে গেল মনে হলো, অবুঝ শিশুটি যেন এইমাত্র তাকে 'বাবা' বলে ডাকল!
রুদ্র ছেলেকে মেহেরের কোলে তুলে দিয়ে মেহেরের মুখের দিকে তাকাল। ছেলেকে বুকে ফিরে পেয়ে মেহেরের মনে হলো সে যেন পুরো পৃথিবীটাকেই হাতের মুঠোয় ফিরে পেয়েছে। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না; ছেলের কপালে, গালে, মাথায়, মুখে আর ছোট ছোট হাতে পর পর অসংখ্য চুমু আঁকতে লাগল।
"বাবাই... বাবাই! আমার পাখি... এভাবে না বলে চলে আসতে হয়? জানো মায়ের কী অবস্থা হয়েছিল? মা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল পাখি... মায়ের তুমি ছাড়া আর কে আছে, বলো? হুম?"
নিষ্পাপ শিশুটি মায়ের ওমে গা মুচড়ে উঠে আধো গলায় সাড়া দিল, "উম্মম্ম..."
রুদ্র একদৃষ্টিতে মেহেরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার ভীষণ ইচ্ছে করল মেহেরের খুব কাছে গিয়ে বলতে—
'তুমি একা নও মিস অ্যারোফোবিয়া। দ্যাখো, আমি.... আছি তো তোমার কাছে... খুব কাছে।' কিন্তু শেষ পর্যন্ত রুদ্র নিজের ভেতরের আবেগ চেপে রেখে মুখ ফুটে তা বলতে পারল না।
কেবল শান্ত স্বরে সাফাই দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, "আসলে... তুমি ঘুমাচ্ছিলে, আর ও ভীষণ কাঁদছিল। আমি... আমি বিশ্বাস করো তোমার ঘরে ঢুকতে চাইনি। কিন্তু ও এত বেশি কাঁদছিল যে বাধ্য হয়ে ওকে রুম থেকে তুলে নিয়ে এসেছি। এনে বাইরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম..."
কথাগুলো বলতে বলতে রুদ্রর মনে একপ্রকার অপরাধবোধ জেগে উঠল। সে মেহেরকে সেই বারান্দায় রেখেই ধীরপায়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে একদম বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসল।
নিজের মনের গহীনে বিড়বিড় করে বলল, 'আমি কি সত্যি ওর কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছি? ও যদি সত্যিটা জানতে পারে, কোনো দিন কি আমাকে ক্ষমা করবে? যদি আমাকে ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যেতে চায়?'
রুদ্র ঠোঁট কামড়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত তখন সাড় তিনটে বাজে।
কিছুক্ষণ পর মেহের ছেলেকে কোলে নিয়ে রুদ্রর ঘরের দিক থেকে বের হয়ে এলো। ঘরের চারপাশের নীরবতা আর থমথমে পরিবেশটা যেন কেমন এক বিশৃঙ্খলা আর অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে। মেহের ধীরপায়ে রুদ্রর কাছে এসে দাঁড়াল, তারপর সোফার অপর কোণে কিছুটা দূরত্ব রেখে বসল।
ছোট্ট প্রাণটা তখনো মেহেরের কোল জুড়ে শুয়ে আছে, ছোট্ট আঙুল মুখে পুরে চুষছে আর শান্ত চোখে চারদিক দেখছে।
রুদ্র বিশ্বাস করতে পারছিল না যে মেহের নিজে থেকে এসে তার পাশে বসল! সে সোফায় খানিকটা সোজা হয়ে বসল, তারপর নিজের দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ করল। মেহের যদি ভেবে বসে যে রুদ্র অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে তার ঘরে গিয়েছিল, সেই ভয়ে সে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না।
মেহের রুদ্রর এই অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলল, "আপনাকে কোনো সাফাই দিতে হবে না। আপনার যেখানে খুশি আপনি যেতে পারেন, এই পুরো অ্যাপার্টমেন্টটাই তো আপনার। আর রইল কথা বেবির... আপনার কি মনে হয় না আপনি আমাকে নিজের কাছে চিরকালের জন্য ঋণী করে রেখেছেন? আপনার যখন খুশি ওকে কোলে নিতে পারেন, আদর করতে পারেন, চুমু খেতে পারেন..."
মেহেরের চোখ দুটো জলে ছলোছলো করছিল। সে নিজেও জানে না এত সাধারণ কথার মাঝে কেন তার চোখের জল উপচে আসতে চাইছে। রুদ্র চমকে গিয়ে আবার মেহেরের দিকে মুখ তুলে তাকাল। মনে হলো মেহের যেন নিজের বুকের ওপর চেপে থাকা এক বিশাল বড় পাথরের ভার হালকা করার চেষ্টা করছে।
ছেলেকে বুকের সাথে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মেহের হালকা হেসে বলল, "আমি ওকে আপনার সব কথা বলব... নিশ্চয়ই বলব। বলব কীভাবে তার মা-কে আপনি খুনির তকমা থেকে নির্দোষ প্রমাণ করেছিলেন। বলব কীভাবে তার মা... আপনার গায়ের ওপর বমি করে একাকার করে দিয়েছিল, অথচ আপনি তার মাকে কিচ্ছু বলেননি... বলব। কীভাবে তার মায়ের জন্য... মাঝরাতে পুরো শহর খুঁজে এনে আইসক্রিম খেয়েছিল... বলব... কীভাবে শান্তিনীড়ের মতো অত সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন..."
ছলছলে চোখে মেহেরের ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
"এটাও বলব যে শান্তিনীড়ে যখন নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন একটা কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন... আমি কিন্তু কিচ্ছু ভুলিনি।"
মেহেরের কথা শুনে রুদ্রর ঠোঁটের কোণেও এক অতি সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা মেহেরের খেয়াল এড়িয়ে গেল।
মেহের আবার বলতে শুরু করল, "কীভাবে তার মা এই দুনিয়ায় ওকে আনার আগে প্রসববেদনায় প্রায় মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, আর তার বা..."
কথাটা মাঝপথেই আটকে গেল। মেহের নিজেকে সামলে নিল। সে কি বলতে যাচ্ছিল? 'বাবা'? না, কেন সে রুদ্রকে 'বাবা' বলতে যাবে? তার বাচ্চার বাবা তো... অন্তু। শুধুই অন্তু।
মেহের একটু ঢোক গিলে গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, "আপনি... আপনি আমাকে আর ওকে বাঁচিয়েছিলেন।"
রুদ্র আবার পূর্ণ দৃষ্টিতে মেহের আর কোলের শিশুটির দিকে তাকাল। তার চোখের সামনে বসে থাকা মেহের আর তার কোলের এই ছোট্ট প্রাণকে দেখে মনে হলো—
এ যেন এক অনাবিল স্বর্গের খনি! যা সে সারা জীবন পরম যত্নে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, নিজের বুকের বাঁ পাশে লুকিয়ে রাখতে চায়। এত সুন্দর দৃশ্য সে আগে কখনো দেখেনি। না, ভুল ভাবছে সে... দেখেছে তো! ঠিক দুই দিন আগে, যখন হাসপাতালের বেডে মেহের এই ছোট্ট প্রাণটাকে নিজের বুকের ভেতর আগলে রেখেছিল। রুদ্র তো সেদিনই বুঝে গিয়েছিল 
 তার সামনে বসে থাকা মেয়েটাকে সে চায়, খুব চায়।
এই মেয়েটা ছাড়া তার একটা পূর্ণাঙ্গ নিখুঁত সংসার কোনো দিন সম্ভব নয় !
হঠাৎ মাহাদ হালকা করে কেঁদে উঠল।
মেহের ছেলেকে হালকা দোল দিতে দিতে রুদ্রর দিকে তাকাল। রুদ্র শান্ত কণ্ঠে বলল, "Feed him. He is hungry."
কথাটা বলেই রুদ্র সোফা ছেড়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। মেহেরও ছেলেকে খাওয়ানোর জন্য নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
রুদ্র ঘরে ঢুকে খট করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর টেবিলের কাছে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা সেই কাগজটা নিজের হাতে তুলে নিল।
সেখানে গুটাগুটা অক্ষরে লেখা—তাদের দুজনের বিয়ের কাবিননামা।
কাগজের পাতা দুটো উল্টে দেখল, সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে: 'মেহেরের সন্তানের যাবতীয় আইনগত অভিভাবক বা লিগ্যাল গার্ডিয়ান এখন থেকে রাইহাম চৌধুরী রুদ্র।' আর ঠিক তার নিচে মেহেরের নিজস্ব স্বাক্ষর শোভা পাচ্ছে।
রুদ্রর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। 'যদি মেহের এটা মেনে না নেয়? যদি সব জেনে শুনে ও দূরে চলে যেতে চায়?' সে তো মিথ্যা বলে মেহেরকে এখানে সই করিয়েছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই রুদ্রর ঠোঁটের কোণে এক দৃঢ়, প্রচ্ছন্ন হাসি ফুটে উঠল।
'যেতে দেব না... মোটেও যেতে দেব না। আমার অসীম সুখের একমাত্র ঠিকানা তুমি, সাওয়াজ সায়েদ মেহের। এই জন্মে তো অন্তত আমার কাছ থেকে তুমি কোনো ছাড় পাচ্ছ না... একদমই না! তোমার আমি কে হলাম বা না হলাম তাতে কিছু যায় আসে না, তবে তুমি আমার... শুধুই আমার! তোমার অতীতে কী হয়েছিল, তুমি কী করেছ না করেছ... তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি তোমাকে চাই মেহের, খুব করে চাই...'
রুদ্র তাদের কাবিননামার কাগজটা চোখের সামনে উঁচিয়ে ধরে মেহেরের স্বাক্ষরের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বলল —
"কবুল তোমাকে, কবুল তোমার অতীতকে...
গ্রহণ করলাম তোমাকে, বরণ করলাম তোমার পুরনো গল্পকে,
আর লিখে নিলাম নাম, তোমার আগামীর প্রতিটি অধ্যায়ের নিঃশব্দ লড়াইয়ে।
স্বীকার করলাম তোমাকে, ঠাঁই দিলাম তোমার ফেলে আসা ছায়াকে,
আর সঁপে দিলাম এই অস্তিত্ব, তোমার সাথে অনাগত ঝড়ের মুখোমুখি হতে।
অঙ্গীকার করলাম তোমাকে, সম্মান জানালাম তোমার অতীত ক্ষতকে,
আর বাঁধলাম নিজেকে, তোমার ভবিষ্যতের প্রতিটি কঠিন প্রহরে।"
সে দিনের পর দেখতে দেখতে চার-চারটে দিন পার হয়ে গেল।
তিন দিনের রাজপথ অবরোধ তোলার কথা থাকলেও দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল ও ভয়াবহ রূপ নিল। গোটা দেশ যেন এক অনিশ্চিত স্তব্ধতায় থমকে গেছে। আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সায়েদ পরিবার কিংবা চৌধুরী পরিবার কারও পক্ষেই ঢাকার দিকে আসা সম্ভব হলো না। অবশ্য এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সায়েদ পরিবারের কেউ চাইলেও আসতে পারত না।
মেঘলা ফোন করে মেহেরকে কদিন আগেই জানিয়েছিল যে সায়েদ ইমরান সাহেবের অবস্থা মোটেও ভালো নয়। মাশফি আর মির্জা সবকিছুর দেখাশোনা করছে, দিনরাত এক করে হাসপাতাল আর চিকিৎসকদের দ্বারে দৌড়াচ্ছে। মেহের মুখে হাজারো কঠোরতা দেখালেও প্রতিটা ঘণ্টায় ফোনের ওপাশে বড় বাবার খবরাখবর নিয়েছে। নিজের মনকে সে শতবার বুঝিয়েছিল—
যে মানুষগুলো তার সাথে অন্যায় করেছে, তাদের খবরাখবর রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে মানুষটা যে বড় বেশি দুর্বল। সায়েদ ইমরান সাহেব তার প্রতি যে অন্যায্য আচরণই করে থাকুন না কেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো একজন মানুষের প্রতি মেহের অন্তত অবহেলা বা ঘৃণা ধরে রাখতে পারল না।
 ভেবেছিল নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেবে, নির্মম হয়ে যাবে, কিন্তু পারল না। সারাটা দিন তার মনটা এক অজানা আশঙ্কায়, বাবার ফ্যাকাশে মুখটার কথা ভেবে আকুপাকু করত। নিজের এই ব্যাকুলতাকে মেহের বুকচাপা দিয়ে দমিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। 
ঘরের থমথমে নীরবতার মাঝে ছোট প্রাণটার একটুখানি যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। ছেলের গায়ের নরম ত্বকের কথা ভেবে বাথটাব ছাড়া একটা প্লাস্টিকের বোলে হালকা কুসুম গরম পানি তৈরি করে রাখল মেহের। এত অবরোধের মাঝে বাইরে যাওয়া অসম্ভব, তাই ঘরে থাকা সরঞ্জাম দিয়েই কাজ চালাতে হবে। বিছানায় ছোট্ট মাহাদকে শুইয়ে রেখে মেহের পানির উষ্ণতা পরখ করল নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে। পানি একদম সঠিক তাপমাত্রায় আছে। বোলটা সাবধানে ধরে এনে লিভিং এরিয়ার নিচু টেবিলে রাখল সে। তারপর নিজের ঘর থেকে ছেলে কোলে নিয়ে এলো।
ঠিক সেই সময়েই অফিসিয়াল কিছু কাজের বাহানায় নিজের ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে লিভিং এরিয়াতে এসে বসেছিল রুদ্র। 
তার ভেতরের মনটা মেহেরের কাছাকাছি থাকার জন্য উসখুস করছিল। অন্তত একপলক মেয়েটাকে দেখার অদম্য তৃষ্ণা তাকে কাজের ছুঁতো ধরে ড্রয়িংরুমে টেনে এনেছে।
সোফায় বসে চোখ ঘুরাতেই রুদ্র লক্ষ্য করল, মেহের বাচ্চাটাকে সেই গরম পানির বোলে নামানোর তোড়জোড় করছে! আর তার চেয়েও বড় কথা, সে একগাদা বেবি বডি ওয়াশ ঢেলে পুরো পানিটাকে ফেনার সাগরে পরিণত করে ফেলেছে।
প্রথমবার দৃশ্যটা দেখেই রুদ্র অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মাথায় যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল! এই ফেনা মাখা ঘন পানির ভেতর আস্ত একটা বাচ্চাকে চুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
"এই অ্যারোফোবিয়া গার্ল!" 
ল্যাপটপটা একপ্রকার টি-টেবিলের ওপর রেখেই রুদ্র এক লাফে সোফা ছেড়ে মেহেরের একদম কাছে চলে এলো। মেহের এই আকস্মিক চিৎকারে থমকে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে অবাক গলায় বলল, "কী হয়েছে আপনার? ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছেন কেন?"
রুদ্র নিজের এক হাত বুকে দিয়ে মেজাজ সামলানোর ভঙ্গি করে বলল, "আমি ষাঁড়?
---"মনে কোনো সন্দেহ আছে নাকি? তা না হলে তো এভাবে চিল্লাতাম না! শান্তভাবে বলতেন" 
----এখন শান্তভাবেই বলছি, মেডাম কী হচ্ছে এসব? তুমি কি ওকে দারাজ থেকে স্পেশাল ডিসকাউন্টে অর্ডার করেছ নাকি?"
মেহের কিছুই বুঝতে না পেরে মাথা নেড়ে নিরপরাধ ভঙ্গিতে বলল, "না তো..."
"তাহলে সাবানের ফেনার সমুদ্রের মধ্যে এতটুকু একটা বাচ্চাকে চুবিয়ে মারার প্ল্যান করছ কেন?"
মেহের নাকের ডগা খানিকটা কুঁচকে, চোখ ছোট করে জবাব দিল, "ওটা সাবান না, ওটা বডি ওয়াশ!"
রুদ্র মেহেরের কোল থেকে আলতো কিন্তু শক্ত হাতে ছেলেকে নিজের দিকে টেনে নিল। তারপর মেহেরের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, "আমি চিনি না মনে করেছ? আমি অশিক্ষিত?"
মেহের ঠোঁট টিপে হালকা হেসে মাথাটা একটু দুলিয়ে ইঙ্গিত করল—হাঁ, তাই তো!
----"কী! আমি অশিক্ষিত?"
ঠিক সেই মুহূর্তে রুদ্রর কোলে থাকা ছোট প্রাণটা নিজ থেকেই সুর তুলে আধো-আমতা গলায় হেসে উঠল, "এমম্মম... আআআআ..."
যেন সে খুব নিখুঁতভাবে মায়ের পক্ষ নিয়ে বাপের কথায় সায় দিল!
মেহের তা দেখে আর নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, "দেখুন, আমি কিন্তু মুখে কিছু বলিনি! ও বলছে আপনি অশিক্ষিত।"
-----"ওহ, তাই?"
রুদ্র বাচ্চার দিকে তাকিয়ে তড়িৎ গতিতে তাকে আরেকটু শক্ত করে কোলে আগলে নিল যাতে পড়ে না যায়। মেহের ততক্ষণে চোখের মণি গোল গোল করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে।
রুদ্র গম্ভীর মুখ করে বলল, "প্রথমত, ওকে এই ফেনার সমুদ্রে গোসল করানো হবে না। ওর জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা চাই।"
মেহের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলল, "এখন এই রাজনৈতিক গণ্ডগোলে বাইরে কে যাবে? আমি তো যেতে পারব না।"
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না। পকেট থেকে ধীরেসুছে ফোনটা বের করে কাকে যেন দ্রুত একটা টেক্সট পাঠাল। তারপর ফোনটা আবার পকেটে রেখে মেহেরের দিকে তাকাল, "একদম ওকে এই পানিতে নামাবে না। সব চেঞ্জ করো।"
"কিছু হবে না, ওকে দিন আমার কাছে। এটা বেবি বডি ওয়াশ, ক্ষতি হয় না।"
-----"থাকুক। তুমি আমার কথা শুনবে না, তাই তো?"
"না, শুনব না!"
মেহের কিছুটা জেদ দেখিয়ে বোলের পানিতে হাত ডুবিয়ে একটুখানি পানি রুদ্রর দিকে ছিটিয়ে দিল। রুদ্র তড়িৎ গতিতে একটু পিছিয়ে গেলেও পানির কয়েক ফোটা ছিটকে তার গায়ে লাগল।
"আপনি সরলেন কেন? এদিকে আসুন, আমি আপনাকে প্র্যাকটিক্যালি দেখাতে চাই যে পানিতে কিছুই হবে না।"
রুদ্র আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। মেহেরকে ফাঁকি দিয়ে একছুটে রুমে চলে গেল। সেখানে ছেলেকে আলতো করে দোলনায় শুইয়ে রেখে আবার সোজা লিভিং এরিয়ায় ফিরে এলো।
মেহের বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাচ্চাকে ভেতরে রেখে এসে আবার এখানে আসার মানে কী? সে কি এবার মেহেরের ওপর প্রতিশোধ নেবে? মেহেরের বুকের ভেতর ভয়ের এক অচেনা কাঁপন ছড়ালো।
রুদ্র ঠোঁটের কোণে বাঁকা,প্রলোভনময় একচিলতে হাসি ঝুলিয়ে বলল, "শুধু তুমিই আমাকে পানি ছিটিয়ে দেখাতে পারবে, আর আমি পারব না? এমন তো হতে পারে না, মিস অ্যারোফোবিয়া।"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্র প্লাস্টিকের বোল থেকে এক আঁজলা পানি মেহেরের দিকে ছিটিয়ে দিল!
"একেবারে না! একদম না! সরুন আপনি!" মেহের চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু রুদ্র থামল না, উল্টো হালকা হেসে আবারও পানি ছিটাতে লাগল। মেহের নিজেকে সামলাতে না পেরে রুদ্রর হাত থেকে বোলটা একপ্রকার কেড়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে রুদ্রর ওপরও পানি ছিটাতে শুরু করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো লিভিং রুমের মেঝেতে পানির ফোটা ছড়িয়ে পড়ল, আর তারা দুজন ভিজে জবুথবু হয়ে গেল। মেহেরের জামাটা ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে গেছে, আর রুদ্রর পরনের শার্টটা ভিজে পুরো ভিজে গিয়ে তার সুগঠিত বুকের পেশির সাথে একদম লেপ্টে রয়েছে।
অকস্মাৎ রুদ্রর শুভ্র, সুগঠিত ভেজা বুকের দিকে চোখ পড়তেই মেহেরের বুকের ভেতরের স্পন্দন হঠাৎ অস্বাভাবিক তীব্র হয়ে উঠল। সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে গেল তার। লজ্জায় ও অস্বস্তিতে মেহের দ্রুত নিজের চোখ সরিয়ে নিল। তার নিজের গালের ওপর তখন রক্তিম আভা খেলে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই অ্যাপার্টমেন্টের মেইন কলিং বেলটা বেজে উঠল। 
মেহের একটু অপ্রস্তুত হয়ে ভিজে যাওয়া কাপড় সামলাতে সামলাতে বলল, "কে এলো আবার?" সে দরজার দিকে পা বাড়াতে চাইল।
"থামো, তোমাকে যেতে হবে না," রুদ্র মেহেরের হাতটা আলতো করে ধরে তাকে আটকে দিয়ে নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক ডেলিভারিম্যান। তার হাতে একটা সুদৃশ্য বেবি বাথটাব এবং সাথে কয়েকটা শপিং ব্যাগ। রুদ্র জিনিসগুলো তার হাত থেকে নিয়ে নিঃশব্দে ক্যাশ মিটিয়ে দিয়ে দরজা আটকে দিল।
মেহের অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। "এগুলো এত তাড়াতাড়ি কখন অর্ডার করলেন?"
রুদ্র কোনো উত্তর না দিয়ে গম্ভীর মুখে প্যাকেটগুলো টেবিলের ওপর রাখল। তারপর ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্যাকেট বের করে মেহেরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "ছেলের জন্মের আগে জামাকাপড় কেনার সময় সব মেয়েদের পোশাক কিনে রেখেছ। ও কি মেয়েদের জামা পরবে নাকি?"
মেহের ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। রুদ্র গলার স্বর কিছুটা নরম করে আবার বলল, "যাও, ওকে নিয়ে এসো। ওর গোসলের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।"
মেহের ধীরপায়ে নিজের ঘর থেকে ছেলেকে কোলে নিয়ে এলো। ততক্ষণে রুদ্র বাথটাবে সঠিক মাত্রার হালকা কুসুম গরম পানি একদম প্রস্তুত করে রেখেছে। পানির তাপমাত্রা ঠিক করার পর রুদ্র বলল, "বাচ্চাদের চামড়া খুব নরম হয়, এখন এত কেমিক্যালযুক্ত বডি ওয়াশ ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন নেই।"
মেহের একমনে শুধু রুদ্রর কথা শুনছিল আর তার যত্ন নেওয়ার ভঙ্গি লক্ষ্য করছিল। রুদ্র হাত বাড়িয়ে বলল, "আমাকে দাও।"
মেহের তখনও হা করে রুদ্রর চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। ভিজে যাওয়া চুলে রুদ্রকে কেমন এক অদ্ভুত আকর্ষণীয় লাগছে।
রুদ্র হঠাৎ হালকা একটা গলা খাঁকারি দিয়ে বাঁকা হেসে বলল, "এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছ কেন? মেয়েমানুষের এই এক স্বভাব... সুন্দর পুরুষ দেখলেই অমনি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে!"
মেহের চট করে সচেতন হয়ে উঠে নিজের ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা আড়াল করার চেষ্টা করল। সে রুদ্রর কোলে ছেলেকে দিয়ে বলল, "কে বলেছে? আপনাকে দেখে কে গিলে খাচ্ছে? আমি তো আপনার কাণ্ড দেখে অবাক হচ্ছি..."
কথাটা শেষ করার আগেই মেহেরের ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। সে কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে রুদ্রকে বলল, "আপনি ধরুন ওকে, আমি দেখে আসছি কে ফোন করল।"
রুদ্র কিছু না বলে ছেলেকে পরম যত্নে নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। সে মেহের ফিরে আসার অপেক্ষা না করে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে ছেলেকে বাথটাবের পানিতে নামিয়ে দিল।
পানিতে নামানোর আগে রুদ্রর বুকের ভেতর অজানা ভয় কাজ করছিল—যদি কেঁদে ওঠে? কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, উষ্ণ পানির ছোঁয়া পেতেই ছোট প্রাণটার মুখে এক অনাবিল, স্বস্তির মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে হাত-পা ছিটকে আধো বোলে আওয়াজ তুলল, "আমম্মম..."
"পাকা বুড়ো একটা! বেশি পানিতে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে কিন্তু," রুদ্র পরম মমতায় হালকা হাতে বাচ্চার শরীরে পানি ছিটিয়ে তাকে গোসল করিয়ে নিল। কিন্তু পানি থেকে তুলে নিতেই ছোট্ট প্রাণটা ঠোঁট দুটো উল্টে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভাবখানা এমন, যেন সে পানিতে আরও কিছুক্ষণ খেলা করতে চায়! 
"না বাবা, একদম না। বাইরে অনেক ঠান্ডা পড়েছে, ঠান্ডা লেগে যাবে তো," রুদ্র বাচ্চার এমন কান্না দেখে কিছুটা বিব্রত হলো। 
শিশুটি অবুঝের মতো ঠোঁট উল্টে কান্না আরও বাড়িয়ে দিতে চাইল।
রুদ্র তখন নিজের সেই পুরোনো ট্রিক খাটাল। বাচ্চার কানের কাছে নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলল, "বউ এনে দেব বাবা! বললাম না কাঁদে না? এত কাঁদে নাকি কেউ?"
কিন্তু এবার আর এই ট্রিক কাজ করল না। ছেলে কান্না থামার নাম নেই, হেঁচকি তুলে কাঁদতে শুরু করল সে। রুদ্র বাধ্য হয়ে তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে মৃদু দোলা দিতে দিতে বলতে লাগল, "এই কুদ্দুস বয়েরাতি! বললাম না কাঁদতে নেই? শুধু নিজের মাকে জ্বালবি, বাবাকে জ্বালাচ্ছ কেন? হুশশশ... একদম না..." 
"উম্মম্মম..."
রুদ্রর বুকের ওমে আর ছন্দময় দোলনিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট প্রাণটার কান্না থেমে এলো। সে বাবার শার্টের ভিজে থাকা অংশটা মুঠো করে ধরে শান্ত হয়ে গেল।
টেবিলে রাখা কাপড়ের ব্যাগটা এক হাতে ধরে, অন্য হাতে ছেলেকে কে বুকে সামলে জামা বের করল রুদ্র। ধবধবে সাদা সুতি বেবি স্যুটটার ভেতরে ছোট ছোট হাত-পা গলিয়ে দেওয়ার পর শিশুটিকে অবিকল একটা পুতুলের মতো দেখাতে লাগল।
রুদ্র নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ছেলের নরম গালে পর পর দুটো উষ্ণ চুমু এঁকে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
 
"দেখেছিস? তোর মা একেবারে পুরুষ-বিদ্বেষী টাইপ নারী! তাই তো তোকে সব মেয়েদের জামা কিনে পরাতে চেয়েছিল। আর তোর বাবাকে দেখ... কেমন সুন্দর জামা এনেছে! কোনো মেয়ে দেখলে তো এক দেখাতেই পাগল হয়ে সোজা ঘরে চলে আসতে চাইবে।"
ছোট্ট প্রাণটা যেন মায়ের পক্ষ নিয়ে বাবার কথাটার ঘোর প্রতিবাদ জানিয়ে আধো-স্পষ্ট আওয়াজে সুর তুলল, "হামম্মম্ম..."
রুদ্র বাচ্চার নাকের ডগাটা একটু আঙুল দিয়ে টেনে হেসে বলল, "একদম মায়ের চামচা হবি না, বলে দিলাম!"
ছেলে আবারও নিজের অবুঝ ভাষায় সাড়া দিল, "এমম্ম..."
ঠিক তখনই নিজের ঘর থেকে ধীরপায়ে বের হয়ে এলো মেহের।
কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি স্বাভাবিক নেই। মনে হচ্ছে পায়ের সংযোগ যেন শরীরের সাথে আলগা হয়ে গেছে, হাত-পায়ের আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও তার দেহে অবশিষ্ট নেই।
মেহের মৃদু, কাঁপানো গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলল, "সিলেট... বা... বাবা... ওই..."
যেন মেহেরের ভেতরের বাঁধটা এবার ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
রুদ্র সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত চোখে মেহেরের দিকে তাকাল, "কী হয়েছে, মেহের? এভরিথিং ইজ ফাইন? মেহের?"
মেহের আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার গলা বুজে এলো। কেবল দু-চোখ বেয়ে নোনা জলের তোড় নেমে এলো, আর ভেঙে পড়া গলায় শব্দ বের হলো – "বাবার... বাবা আর নেই..."
বলার সাথে সাথেই মেহেরের শরীরটা একপাশে ঢলে পড়ল, আর সে মেঝের ওপর অঝোর ধারায় কান্নায় ভেঙে পড়ল।
#মারিয়াম ফুল 
#নিভৃতে যত্নে রাখা প্রিয়তমা 
পর্ব: ৪২

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন