মেহের ধীর, নিঃশব্দ পায়ে সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ বেয়ে নিচে নেমে এল। নামার প্রতিটি পদক্ষেপে তার ভাবনায়, মস্তিস্কের কোণে কোণে একটা নামই অনবরত দোলা দিয়ে যাচ্ছিল
‘রাঈদ চৌধুরী মাহাদ’।
নামটা মনের অজান্তেই নিজের ঠোঁটের ভেতর কয়েকবার বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল সে। কেমন যেন এক তীব্র, অজানা অস্বস্তি তার পুরো শরীর-মনকে বিষণ্ণতায় ঢেকে ফেলল। এখন সে কী বলবে? না, নামটা খারাপ না, মোটেও খারাপ না।বরং বেশ সুন্দর, রুচিশীল একটা নাম। কিন্তু আসল গলদ তো ওই ‘চৌধুরী’ পদবিটার মাঝে!
ওই নিষ্পাপ, অবুঝ প্রাণটির সাথে তো এই চৌধুরী বংশের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কেন তাকে অযথা এই মিথ্যে পরিচয়ের সীমানায় বাঁধানো হচ্ছে? এই পরিচয়টা কি ভবিষ্যতে কোনো এক নতুন জটিলতার জন্ম দেবে না?
চিন্তার অগাধ সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে মেহের খেয়ালই করেনি যে সে কখন ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়েছে।
হামজা চৌধুরী হঠাৎ সোফা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে মেহেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ স্বাভাবিক, স্নেহমাখা ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, "মেহের মা...কখন উঠলে?"
মেহের কিছুটা থতমতো খেয়ে গেল। নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু আড়াল করে আমতা আমতা করে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
"জি বাবা... এই তো... একটু আগে। আসলে কাল রাতে ক্লান্তিতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল ...রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে। "
কথা শেষ করেই মেহেরের চোখ গিয়ে পড়ল এক পাশে বসা সুলতানা চৌধুরীর ওপর। দুজনের দৃষ্টি এক হতেই সুলতানা চৌধুরীর মুখে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। মেহের বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে তাঁকে সালাম দিল।
সুলতানা চৌধুরী চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "নাতিবউ, এসে বোন, বোসো এখানে। ওই যে বাড়ি ছেড়ে গেলে দুজন হয়ে, আর এখন তোমরা তিনজন হয়ে ফিরেছ! এবার আর আমি তোমাদের কোথাও যেতে দেব না, বলে রাখলাম। বউ এনেছি বাড়িতেই তো থাকবে! কত বারণ করলাম, তাও রুদ্র তোমাকে ওই অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে গিয়ে রাখল... তারপর কত কী ঘটে গেল "
কথাটা শেষ হতেই মেহেরের মুখটা মুহূর্তে ছোট হয়ে এল। তার বিষাদগ্রস্ত চোখের কোণে নিমেষেই ভেসে উঠল সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর স্মৃতি—সেই চার দেয়ালের মাঝে কড়া নজরদারি, মানসিক বন্দিদশা আর দমবন্ধ করা একাকিত্বের স্মৃতি। মেহেরের চিবুক সামান্য কেঁপে উঠল।
সুলতানা চৌধুরী অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি মেহেরের মনের এই আকস্মিক ভাঙন ধরে ফেললেন। চট করে কথার মোড় ঘুরিয়ে নিয়ে কিছুটা হাল্কা সুরে বললেন, "আহা, ওসব পুরোনো দিনের কথা বাদ। কী না কী বলছি আমি। জানও মেহের, আমরা এতক্ষণ কী নিয়ে কথা বলছিলাম?"
মেহের বিষাদের আবহ কাটিয়ে আলতো করে মাথা দুলিয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করল।
সুলতানা চৌধুরী তাঁর কুঞ্চিত ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন, "বাচ্চাটার নাম তো এখনো তোমরা রাখনি। আমি তোমাকে না বলেই একটা নাম ভেবে ফেলেছি। অবশ্য তোমার যদি পছন্দ না হয় ,তাহলে ওই নাম বাদ, ওটা রাখব না।"
পাশে বসে রেহানা চৌধুরী নাতিকে দোলাতে দোলাতে বললেন...
"আমরা ওর নাম নিয়েই কথা বলছিলাম। রুদ্র, রেদওয়ান — সবার নামই তো মা রেখেছিলেন।রুদ্রর ছেলের নামও ভেবে ফেলেছেন মা... রাঈদ চৌধুরী মাহাদ। তোমাদের দুজনের নাম মিলিয়ে। মেহের, তোমার যদি এই নামটা মনে না ধরে, তুমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বদলে ফেলতে পারো। আজকালকার মা-বাবারা তো কত রকম বিদেশি নাম রাখে"
মেহের এখন কী করবে? সে কি এই মুহূর্তে এই গুরুজনদের মুখ ফুটে বলতে পারবে... আপনারা আমার ছেলের নাম রাখবেন না, কারণ সে এই বাড়ির সন্তানই নয়?
কিন্তু এই মুহূর্তে এই মানুষগুলোর চোখে-মুখে উপচে পড়া যে অনাবিল আনন্দ, তৃপ্তি আর আগলে রাখার ভালোবাসা ফুটে উঠেছে, তা এক ঝটকায় কেড়ে নেওয়ার নিষ্ঠুরতা মেহেরের সাধ্যে নেই। সে একটু ভেবে নিল—
ইউকে-তে ফিরে যাওয়ার পর না হয় সব আইনি কাগজপত্র বদলে নিজের মতো নাম রেখে নেবে! এখন তো অন্তত এই মানুষগুলোর মুখের নিষ্পাপ আনন্দটুকু নষ্ট করা ঠিক হবে না।
মেহের নিজের যাবতীয় সংশয় , দ্বিধা চেপে রেখে ঠোঁটে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি এনে বলল, "না না, আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতেই আমার সম্মতি। আপনাদের ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা।আর নামটা ভীষণ সুন্দর হয়েছে, মা।"
হামজা চৌধুরী আনন্দের আতিশয্যে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন, "দেখেছ মা? আমি বলি না—আমাদের রুদ্রর চেয়ে মেহের অনেক বেশি বুঝদার! দেখো, কেমন এক কথায় মেনে নিল..."
সুলতানা চৌধুরীও স্মিত হেসে সায় দিয়ে বললেন, "তা তো বটেই... মেহের তো বরাবরই লক্ষ্মী মেয়ে, ওর তুলনা ও নিজেই।"
এবার রেহানা চৌধুরী কোলজুড়ে হাত-পা ছোঁড়া ঘুমন্ত নাতিকে আগলে রেখে মেহেরকে বললেন, "মা, তুমি ডাইনিং টেবিলে গিয়ে কিছু খেয়ে নাও। টেবিলে সব খাবার ঢেকে রাখা আছে। তুমি নিশ্চিন্তে খাও, যতক্ষণ না খাওয়া হয় আমি ওকে আমার কোলেই রাখছি।"
ঠিক সেই মুহূর্তে হামজা চৌধুরীর পরনের পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। নির্বাচনের আর মাত্র এক দিন বাকি, তাই নির্বাচনী প্রচারণামূলক কার্যালয় থেকে বারবার ফোন আসছিল। তিনি লিভিং রুম ছেড়ে ফোনে কথা বলতে বলতে দ্রুত ব্যস্ত পায়ে অন্যদিকে হেঁটে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে রেহানা চৌধুরীকে ইশারা করে বলে গেলেন, “আমি আসছি। তোমরা গল্প করো।”
সুলতানা চৌধুরী বললেন, " পুঁওয়াতি মানুষ, আগে খেয়ে নাও মেহের ...কিছু, তোমার ওপর আরেকটা ছোট মানুষ চলছে। রুদ্র তো সকালে উঠেই মর্নিং ওয়াক করতে বাইরে চলে গেল। মাহাদ ঘুম থেকে উঠে কাঁদছিল বলে তোমাকে না ডেকে রেহানার কোলে দিয়ে গেছে।"
মেহের বলল, “আপনারা কেউ কিছু খাবেন না?”
সুলতানা চৌধুরী খানিকটা হেসে বললেন, “তুমি আবার কিছু মনে কোরো না, আমি আর রেহানা নাশতা করে ফেলেছি। জানোই তো, আমাদের দুজনেরই ডায়াবেটিসের সমস্যা। সময়মতো না খেলে সুগার লেভেল ড্রপ করে। তাই .....?”
রেহানা চৌধুরীও শান্ত হেসে সায় দিয়ে বললেন, "হ্যাঁ মা, টেবিলে রাখা আছে। গিয়ে খেয়ে নাও তো।"
মেহের আর কথা বাড়াল না ,মাথা নেড়ে সে ধীর পায়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
ডাইনিং রুমে এসে চেয়ারটা টেনে বসতেই মেহেরের মনে হলো তার পেটে সত্যিসত্যিই তীব্র খিদে চাড়া দিয়ে উঠেছে। কাল রাতে তো রুদ্র জবরদস্তি করে তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছিল। মেহের অবশ্য তখন মুখ বাঁকিয়ে খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করেছিল ঠিকই, কিন্তু সত্য বলতে সে মনে মনে মোটেও বিরক্ত হয়নি! আর কেন সে সেই মুহূর্তগুলোতে বিরক্ত হতে পারল না...ঠিক সেই চিন্তাটা ভেবেই সে পরে নিজের ওপর নিজে বেশ বিরক্ত হয়েছিল!
রাতের সেই অদ্ভুত,নিবিড় মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়তেই মেহেরের না চাইতেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লজ্জা মেশানো মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে আর সাত-পাঁচ না ভেবে প্লেটে নিয়ে রুটি ছিঁড়ে বাটিতে রাখা গরুর মাংসের মাখোমাখো ঝোলে ডুবিয়ে মুখে পুরতে লাগল।
ঠিক তখনই সে খেয়াল করল, পাশের চেয়ারটা নিঃশব্দে টেনে কেউ একজন তার ঠিক গা ঘেঁষে এসে বসেছে। মেহের সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে তাকাল না। কিন্তু আগন্তুকের ভারী, তীব্র ও মারাত্মক পুরুষালি ‘উদ’ পারফিউমের চেনা সুবাস এক মুহূর্তে তার নাসারন্ধ্রে এসে তীব্র আঘাত করল। চোখ না তুলেই মেহের শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত হয়ে গেল যে তার পাশে কে বসেছে।
কেন যেন কাল রাতের নিভৃত স্মৃতিগুলো নতুন করে মনে পড়ে যাওয়ায় মেহেরের গাল দুটি লজ্জায় সামান্য রাঙা হয়ে উঠল। সে নিজের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অস্বস্তি আর বুকের ধুকপুকানি ঢাকতে প্লেটে রুটি থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে আরও একটা রুটি ছিঁড়ে বেশ গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল।
তবে সেই পুরুষ অবয়বটি একদম নিথর, শান্ত হয়ে বসে রইল। মেহের আড়চোখে একবার রুদ্রর দিকে তাকাতেই দেখল, লোকটা গভীর দৃষ্টিতে তার দিকেই একদৃষ্টে চেয়ে আছে। মেহের এক মুহূর্তের জন্য সংকুচিত হয়ে চোখ সরিয়ে নিল এবং নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করতে আরও দ্রুত রুটি মুখে পুরতে লাগল।
কিন্তু অত তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়েই বাঁধল বিপত্তি! অসাবধানতাবশত খাবারের একটা বড় লোকমা মেহেরের শ্বাসনালীর কাছাকাছি আটকে গেল। সে তীব্র বিষম খেয়ে বিকট শব্দে কেশে উঠল। খাবারের কণা যেন এক লহমায় তার মাথায় গিয়ে ধাক্কা দিল!
"পানি... পানি...!" মেহের খসখসে, রুদ্ধ গলায় হাঁসফাঁস করতে করতেই আকুতি জানিয়ে উঠল।
রুদ্র বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে টেবিলে রাখা কানায় কানায় ভরা ঠাণ্ডা পানির গ্লাসটা মেহেরের মুখের সামনে বাড়িয়ে দিল। মেহের একের পর এক দম আটকানো হেঁচকি তুলতে তুলতে এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাস পানি খেলো।
পানি খাওয়া শেষ করে মেহের নিজের জলছাপ লাগা, গোলগোল ডাগর চোখে রুদ্রর দিকে এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
সামনে বসা মানুষটার পরনে কালো জিম শর্টস আর টি-শার্ট, সুগঠিত শরীর থেকে যেন ঝরে পড়ছে পৌরুষের স্পষ্ট ছাপ। সবেমাত্র শাওয়ার নিয়ে আসা ছোট চুলগুলো থেকে এখনো দু-এক ফোঁটা জল গড়িয়ে কানের পাশ দিয়ে নিচে নামছে। চওড়া, শক্তিশালী গড়নের এই লোকটাকে এই মুহূর্তে অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর লাগছে।
না, মেহের আর বেশিক্ষণ এই মোহনীয় রূপের দিকে চেয়ে থাকতে পারল না। নিজের বুকের ভেতর অনবরত দোলা দেওয়া অদ্ভুত অনুভূতিটাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সে ঝটপট চোখ নামিয়ে থালার দিকে নজর দিল।
রুদ্র অবশ্য পুরো সময়টাই একদম ভাবলেশহীন ছিল। মেহেরের চোখের এই পরিবর্তন ও সংকোচ সে খেয়াল করলেও বাহ্যিকভাবে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ডাইনিং চেয়ারের পেছনে একটু হেলান দিয়ে বসল। তারপর আড়চোখে মেহেরের দিকে তাকালো।রুদ্র মেহেরের অবস্থা দেখে হাসি পাচ্ছে, ভীষণ হাসি পাচ্ছে। তবুও নিজের মুখাবয়ব কঠোর রেখে, হাতের ডান পাশ থেকে একটা ব্রেড জ্যাম তুলে নিল। ধীরে, স্বস্তিতে ব্রেডে কামড় দিল।
ঠিক তখনই মেহের মাথা নেড়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল, "আমি একটু বাইরে যাব।"
রুদ্র নিজের একজোড়া চওড়া ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে বলল, "হুঁ, যাও। কেউ কি না করেছে তোমাকে?"
মেহের কপাল কুঁচকাল। না, এই লোকটার সাথে জেদ ধরে বা খিটখিট করে কথা বললে কাজের কাজ কিছুই হবে না, মাঝখান থেকে সব ভেস্তে যাবে! সে এবার নিজের গলার স্বর একদম নিচু করে বলল, "আপনিও যাবেন...আমার সাথে ।মানে যেতে হবে আপনাকে।"
কথাটা শোনামাত্রই রুদ্র নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট করে মেহেরের দিকে অতি সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাল।
মেহের আরও একটু ইতস্তত করে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "আমাকে একটু বাইরে নিয়ে যান না "
ওপাশ থেকে উত্তর এল সংক্ষিপ্ত, সটান ও রাশভারী, "কেন?"
মেহের চোখ দুটো গোল গোল করে বলল, "কেন আবার? আমি যেতে চাই তাই । এখানে সবাই ব্যস্ত, কাকে বলব বলুন? "
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে হালকা, বাঁকা এক চিলতে কৌতুক মেশানো হাসি ফুটে উঠল। সে কিছুটা উপহাসের সুর মিশিয়ে বলল, "আপনাকে নিয়ে যেতে হবে? তা কোথায় যেতে চান আপনি? চীন, উগান্ডা, থাইল্যান্ড নাকি একবারে আফ্রিকায়?"
মেহের এক মুহূর্তে নিজের মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে ফেলল। মনে মনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল, ‘এই লোকটা আসলেই একটা অ্যাবনরমাল কোনো সোজা কথা সোজাভাবে ওর মুখ দিয়ে বের হয় না!’
তারপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, " ওসব লাগবে না আপাতত আমাকে কি একটু কারাগারে নিয়ে যাবেন?"
কথাটা শোনামাত্রই এবার রুদ্র বিষম খেয়ে খকখক করে কেশে উঠল! পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি উল্টে যেতে দেখে এবার মেহের নিজেই পানির গ্লাসটা পূরণ করে এগিয়ে দিল রুদ্রর দিকে।
রুদ্র এক ঢোক পানি খেয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে চোখ সরু করে মেহেরের দিকে তাকাল। "শ্বশুরবাড়ি যেতে চাও বললেই তো পারতে! তা আবার নতুন করে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে কেন? একবার গিয়ে বুঝি মন ভরেনি, তাই আবার সাধ জেগেছে?"
মেহের এবার আর রাগ বা ক্ষোভ দেখাল না, বরং কাতর সুর ফুটিয়ে বলল, "নিয়ে যান না প্লিজ... আপনি ছাড়া আমাকে আর কে নিয়ে যাবে বলুন? আপনি না আমার হাসব্যান্ড হন? আমার বাচ্চার বাবা হন?"
মেহেরের মুখ থেকে বলা শেষ দুটো কথা রুদ্রকে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দিল। ‘হাজব্যান্ড’ আর ‘বাচ্চার বাবা’ শব্দ দুটো মেহের এতটা স্বাভাবিকভাবে বলেছে যে, অদ্ভুত এক অনুভূতি ছুঁয়ে গেল রুদ্রকে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। সে কিছুক্ষণ মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কথাগুলোকে নিজের মধ্যে ঠিকমতো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে রেহানা চৌধুরীর কণ্ঠ ভেসে এল, "মেয়েটা হয়তো তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে চাইছে রুদ্র, তুই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যা না...তোর বাবাও এখন ভীষণ ব্যস্ত।"
মায়ের গলা কানে পেতেই রুদ্র চট করে পেছনে ফিরে তাকাল। মেহেরের এই আকস্মিক মিষ্টভাষিতা, অতি-নম্র আচরণ আর 'স্বামী' ডাকার পেছনে যে আসল রহস্যটা কী, তা বুঝতে রুদ্রর আর এক সেকেন্ডও বিলম্ব হলো না! রেহানা চৌধুরী যেন তাদের সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েন নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করেন, সেজন্যই মেহের রুদ্রকে 'স্বামী' আর 'বাচ্চার বাবা বলেছে।
রেহানা চৌধুরী কোলজুড়ে থাকা শিশুটির দিকে তাকিয়ে পরম মায়ায় বললেন, "মাহাদ তো আমার কোলেই আছে। কোনো সমস্যা হবে না, বাড়ির সবাই ওকে দেখে রাখবে।। তুই ওকে একটু বাইরে থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আয় না, রুদ্র।"
রুদ্র নিঃশব্দে নিজের ছেলের দিকে একবার তাকাল। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, "মাহাদ? ওর নাম মাহাদ কে রাখল?"
রেহানা চৌধুরী হেসে বললেন,
"তোর দাদি রেখেছেন রাঈদ চৌধুরী মাহাদ! তুই বাড়িতে ছিলি না, তাই জানতে পারিসনি। যা এখন, ফ্রেশ হয়ে মেহেরকে নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয়।"
রেহানা চৌধুরী একবারও রুদ্রর কাছে জানতে চাওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না যে নামটা তার নিজের পছন্দ হয়েছে কি না।
রুদ্র ঘুরে মেহেরের দিকে তাকাল। মেহেরের চেহারার ভাবভঙ্গি তখন ভীষণ নিষ্পাপ, স্বাভাবিক !মেহেরকে প্রশ্ন করল,
“নাম রাখা হয়েছে, তুমি জানো?”
মেহের নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“জি,দাদি রেখেছেন। সুন্দর না? আমাদের ছেলের নাম।দাদির দেওয়া নাম আপনার পছন্দ হয়নি, ক্যাপ্টেন সাহেব?”
রুদ্র মনে মনে দাঁত কিটমিট করে বিড়বিড় করে উঠল, ড্রামা কুইন একটা! সবার সামনে কেমন দেখো, ভালো বউ হওয়ার অভিনয় করছে। বাড়ির লোকজন নাম রেখেছে, এখানে কিছু বলছে না, ঘরে গিয়ে আমার রক্ত চুষে খাবে ”
শুধু মুখে বলল ,”হুম, হয়েছে। যাও গিয়ে এখন রেডি হও।”
মেহের আর এক মুহূর্তও ডাইনিং টেবিলে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। সে দ্রুত হাত ধুয়ে এসে ধীর পায়ে রেহানা চৌধুরীর কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নিল। তারপর পাকা গিন্নির মতো রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, "এরে হুনো, তোমার পুয়া রে লইয়া আমি উপরে যাইয়ার। খাওয়াইয়া আমি রেডি অইয়া আইয়ার।"
(এই যে, শুনুন! আপনার ছেলেকে নিয়ে আমি উপরে যাচ্ছি। তারপর ওকে খাইয়ে রেডি হয়ে নিচে আসছি।)
মেহের বেশ কয়েক মাস পর সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করল। যদিও চৌধুরী বাড়ির কেউ সাধারণত এই ভাষায় কথা বলেন না, তবে মেহেরের ভেতর অতিরিক্ত আনন্দ বা আবেগ কাজ করলে হঠাৎ হঠাৎ এই আঞ্চলিক টানটা ঝরঝর করে বেরিয়ে পড়ে। আজকে ইচ্ছে করেই সিলেটি ভাষায় বলল।
রেহানা চৌধুরীর কাছ থেকে ছেলেকে কোলজুড়ে আঁকড়ে নিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে এল মেহের। বাইরে বের হওয়ার আগে ছেলেকে একবার ভালো করে খাইয়ে, ডায়াপার বদলে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
রুদ্র আর ডাইনিংয়ে একা বসে না থেকে কিছুক্ষণ পর ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল। রুমে ঢুকতেই সে দেখল মেহের রেডি হয়ে বসে আছে। আর ছেলে একপাশে দোলনায় ঘুমিয়ে আছে।
মেহেরের সুসজ্জিত, নিখুঁত রূপটার দিকে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল রুদ্র। ঘরের চার দেয়ালের নীরবতা ভেঙে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, "রেডি?"
মেহের দৃষ্টি না সরিয়েই ধীরেসুস্থে মাথা দুলিয়ে উত্তর দিল, "জি, রেডি।"
"ঠিক আছে, তাহলে তুমি নিচে গিয়ে গাড়িতে বসো। আমি রেডি হয়েই আসছি।"
মেহের আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করল না। কাঠের দোলনার কাছে গিয়ে শান্তভাবে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটাকে দু’হাতে তুলে নিল। ঘুমন্ত শিশুটার মুখটা এতটাই নিষ্পাপ, এতটাই মায়াময় যে, মেহেরের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। ইচ্ছে করছিল, এই ছোট্ট পুতুলটাকে সারাজীবন নিজের বুকের সঙ্গে আগলে রাখে।
কিন্তু সে জানে, আজ সে যেখানে যাচ্ছে, সেখানকার অন্ধকার আর হিংসায় ভরা পরিবেশ এই অবুঝ শিশুটার জন্য মোটেও নয়। কোনোভাবেই সে তার নিষ্পাপ সন্তানটাকে সেই গুমোট পরিবেশের মুখোমুখি করতে চায় না।
মেহের ধীর, নিঃশব্দ পায়ে ছেলেটাকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। রেহানা চৌধুরী তখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে চশমা পরিষ্কার করছিলেন। মেহের তাঁর কাছে গিয়ে সাবধানে ছেলেটাকে তাঁর কোলে নামিয়ে দিল। সঙ্গে আনা ফিডারে কুসুম গরম ফর্মুলা দুধ তাঁর হাতে আলতো করে এগিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল,"মা, কষ্ট করে কিছুক্ষণ পর পর ওকে একটু খাইয়ে দেবেন। আর এখন ডায়াপার পাল্টানোর একদম দরকার নেই, আমি নিজ হাতে সব ঠিকঠাক করে তবেই নিচে নিয়ে এসেছি।"
রেহানা চৌধুরী নাতিকে নিজের বুকের উত্তাপে টেনে নিয়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে একচিলতে মাতৃসুলভ হাসি দিলেন। নাতির প্রতিদিনের নিয়ম-কানুন আর খুচরো অভ্যাসের পুরো বিবরণটুকু তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে মেহেরের কাছ থেকে বুঝে নিলেন।
মেহের গাড়িতে ওঠার আগে শেষবারের মতো ছেলের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকাল। মাতৃস্নেহে চুরমার হয়ে যাওয়া হৃদয়ে ঝুঁকে পড়ে সে শিশুর তুলতুলে গালে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে কয়েকটি চুমু একে দিল। অনুচ্চ ফিসফিসানি কণ্ঠে বলল, "মা আসছি, সোনা? একদম জ্বালানো যাবে না কাউকে, কেমন? দাদু আর দাদার কোলেই লক্ষ্মীটি হয়ে থাকবে।"
ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন অবুঝ শিশুটি মায়ের এই আকুল আকুতি কিংবা সাময়িক বিচ্ছেদের বার্তা কিছুই অনুভব করতে পারল না; সে কেবল ছোট্ট দুটো হাত-পা নেড়ে একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে আবার নিবিড় ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল।
এর কয়েক মিনিটের মাথায় রুদ্র ওপর থেকে সিঁড়ির ধাপে সশব্দে নিচে নেমে এল। তার পরনে মার্জিত পরিপাটি পোশাক, পায়ে চকচকে শুট-বুট। তার পুরো অবয়বে কেমন যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত জাঁকজমক ভাব! মনে হচ্ছে কোনো বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছে সে...মেহের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক ঝলক তার দিকে তাকিয়েই চকিতে দৃষ্টি নামিয়ে নিল। তারপর আড়চোখে নিজের পরা সাদামাটা পোশাকটার দিকে একবার চোখ বোলাল। মেহের তো কোনো আনন্দ-উৎসব জমাতে যাচ্ছে না, তবে এই লোকটার হঠাৎ এমন সাজগোজের রহস্য কী?
রুদ্র ধীরপায়ে হেঁটে রেহানা চৌধুরীর কাছে এসে দাঁড়াল। মায়ের কোলজুড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট মাহাদের দিকে একপলক তাকাল সে। তারপর আচমকাই মেহেরের দিকে নিজের তক্ষুণের গভীর চোখ দুটো সোজাসুজি নিবদ্ধ রেখে নিচু হয়ে ঝুঁকে পড়ল। বাচ্চার নরম, তুলতুলে গালে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ পরশ ছুঁইয়ে দিল।
রুদ্রর এই হঠাৎ, প্রকাশ্য ও অপ্রতিরোধ্য আচরণে মেহেরের বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল! তার পুরো শরীরটা মুহূর্তেই কাঠ হয়ে জমে উঠল। পুরো চৌধুরী পরিবারের সামনে রুদ্রর এমন নিঃসঙ্কোচ, অধিকারবোধের আস্ফালন মেহেরের কাছে কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঠেকলো না।
রুদ্র অবশ্য মেহেরের এই জমে যাওয়া বরফ-শীতল ভাব লক্ষ্য করেও মুখে কোনো ভাবান্তর প্রকাশ করল না। সে স্বাচ্ছন্দ্যে মায়ের দিকে মুখ ফেরাল, "মা, আমার ছেলেকে খুব সাবধানে রেখো। আর শোনো..." সে একটু থেমে ঠিক মেহেরের ভঙ্গিতে বলে উঠল, "খানিক পর পর ও কিন্তু অকারণে কেঁদে উঠতে পারে, তখন ওকে ফিডার দিও... প্রথমে খেতে চাইবে না, চোখ-মুখ কুঁচকাবে, তাও দিও। ওর আবার অতিরিক্ত গরম একদম সহ্য হয় না... তাই নিচের ড্রয়িংরুমের এসিটা ছেড়ে ওকে কাছে রেখো। আর খুব বেশি কান্না করলে কোলে তুলে নিয়ে একটু হেঁটে হেঁটে দোলা দিয়ো। আমরা তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি।"
রেহানা চৌধুরী ছেলের কণ্ঠের এই অভাবনীয় পরিবর্তন ,দায়িত্বশীলতা দেখে বেশ খানিকটা তটস্থ ও অবাক চোখে তাকালেন। নিজের কাঠখোট্টা ছেলে যে এত অল্প সময়ে নিজের বাচ্চার সূক্ষ্ম সব অভ্যাসের এত পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখে, তা তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করেননি!
তিনি মেহের ও রুদ্রকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে সহাস্যে বললেন, "হয়েছে, তোকে আর মায়ের মতো এত ভাবতে হবে না। আমি সব সামলে নেব, তোরা নিশ্চিন্তে যা তো!"
রেহানা চৌধুরীর চেয়েও বহুগুণ বেশি স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মেহের। তার চোখ দুটো তীব্র বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে উঠল। মাত্র এই কটা দিনের ব্যবধানে, একটা লোক কীভাবে মাহাদের সব স্বভাব চিনে ফেলল?
ভেতরের তোলপাড় সামলাতে সামলাতেই মেহের দ্রুত পা বাড়াল। বাইরে গাড়িতে গিয়ে সামনের সিটে নিঃশব্দে উঠে বসল সে। রুদ্র ড্রাইভারে সিটে নিজের চওড়া শরীরটা গুছিয়ে এসে বসার পর মেহের তার দিকে সরাসরি না তাকিয়েই দ্বিধান্বিত গলায় শুধাল, "আপনি... সত্যি এভাবে যাবেন?"
রুদ্র স্টিয়ারিংয়ে নিজের শক্ত দুটি হাত রেখে পরনের পোশাকের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নিরুদ্বেগ কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“কীভাবে?”
"না মানে...আমরা তো কোনো বিয়েবাড়িতে যাচ্ছি না,তাহলে আপনি স্যুট-বুট পরে কোথায়
যাচ্ছেন? "
রুদ্রর পুরুষালি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করতে করতে গম্ভীর মুখে বলল, "তোমাকে কে বলল বিয়ে খেতে যাচ্ছি না? তুমি তোমার সতীনকে ঘরে তুলতে যাচ্ছ।"
কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই মেহের তীব্র চমক নিয়ে রুদ্রর তীক্ষ্ণ মুখের দিকে তাকাল। তবে পর মুহূর্তেই নিজের ভেতরের অপ্রস্তুত ভাবটুকু আড়ালে চেপে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় করল। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে শীতল গলায় বলল, ফালতু বকবেন না।
"ফালতু বকতে যাব কেন?"রুদ্র গাড়ি গিয়ারে ফেলে মুচকি হেসে বলল, "আমি কি দেখতে কোনো অংশে কম হ্যান্ডসাম? চওড়া কাঁধ, শার্প জাও-লাইন, সিল্কি হেয়ার ... এসব নিয়ে অযথা ঠাট্টা করব কেন বলো? এমনিতেও তো তুমি কিছুদিন পর ইউকে-তে উড়াল দেবে, তাই ভাবলাম..."
বলতে বলতেই গাড়িটা মূল শহরের ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ রাস্তায় গিয়ে নামল। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই এক দমবন্ধ করা যানজটে পড়ে ধীরগতিতে থমকে গেল গাড়ির চাকা।
মেহের আর কোনো কথা বাড়াল না। রুদ্রর এই ধরনের যুক্তিহীন অনর্থক কথার কোনো জবাব দেওয়া মানেই তাকে মানসিক প্রশ্রয় দেওয়া। সে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়ে জানালার বাইরে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
যানজটে গাড়ি অলসভাবে আটকে থাকা অবস্থায় আচমকা গাড়ির কাঁচের ওপর টুকটুক করে একটা মৃদু শব্দ হলো। মেহের আর রুদ্র—
দুজনেই একসাথে নিজের নিজের দৃষ্টি সরালো। রুদ্র ডানপাশের জানালার কাঁচটা সামান্য নিচে নামাতেই চোখে পড়ল সাত-আট বছরের একটি ছোট পথশিশু। ছেঁড়া জামা পরা ছেলেটার দুই হাতে মুঠো ভরা তাজা বেলি ফুলের মালা।
ছেলেটা উৎসুক দৃষ্টিতে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "ও ভাই! ফুলের মালা নেন না একটা? এত সুন্দর আপা, ফুল পাইলে খুশি হইয়া আপনাকে আরও বেশি বেশি ভালোবাসব।"
এক মুহূর্তের জন্য গাড়ির ভেতরের আবহে যেন থমথমে স্তব্ধতা নেমে এল। মেহের আর রুদ্র—দুজনের হৃদস্পন্দনই যেন থমকে গেল।
মেহের চট করে কাঁচের দিকে সামান্য ঝুঁকে ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে খানিকটা কড়া গলায় বলে উঠল, "আমি ওনার কেউ না।ভুল বলছ তুমি, যাও এখান থেকে।"
ছেলেটি অবশ্য দমার পাত্র নয়। সে মেহেরের কথা পাত্তাই দিল না, বরং রুদ্রর দিকেই আরও একটু এগিয়ে গিয়ে আবদারের সুরে বলল, "ভাই, এই আপা যদি আপনার কেউ না-ও হয়, তবে যে আপা আপনার আসল মনের মানুষ, তার জন্য নিয়া যান।যার জন্যই নেবেন, সে-ই আপনারে খুব ভালোবাসবে।"
রুদ্র হালকা করে গলা পরিষ্কার করার ভঙ্গি করল। তারপর কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে প্রশ্ন করল, "তোমাকে কে বলল মালা দিলেই ভালোবাসবে?"
ছেলেটা একটা আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বলল, "আমি রাস্তায় প্রতিদিন দেখি তো ভাই! আমার কাছ থেকে যারা ফুল নিছে, তারা সবাই ভালোবাসা পাইছে। আপনি একটা নিয়ে দেখেন না একবার।"
রুদ্র আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। দুটো চকচকে এক হাজার টাকার নোট বের করে ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "তোমার হাতের সবগুলো মালা আমাকে দিয়ে দাও।"
ছেলেটি হাজার টাকার নোট দুটো দেখে একটু থমকে গিয়ে মাথা নাড়ল, "না ভাই, আমার কাছে এত টাকা ভাঙতি নাই। আপনি টাকা রেখে দেন, এত বেশি দেওয়া লাগবে না।"
রুদ্র হালকা হেসে টাকা দুটো জোর করেই ছেলেটার ছোট্ট হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। তারপর ছেলেটা মহা আনন্দে তার হাতের সবকটি সুবাসিত বেলি ফুলের মালা রুদ্রর কোলে তুলে দিল।
গাড়ির ছোট্ট বন্ধ কক্ষে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল তাজা বেলির মাতাল করা ঘ্রাণ। মেহের খানিকটা অবাক, অস্বস্তি ও বিরক্তি নিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "এতগুলো ফুল কার জন্য নিচ্ছেন?"
রুদ্র বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার সন্তানের মায়ের জন্য।"
কথাটা মেহেরের বুকে এসে কেমন এক অদৃশ্য, তীব্র আঘাত হানল। সে নিজের নিচের ঠোঁটে দাঁত দিয়ে হালকা কামড় বসাল, ভেতরের সমস্ত মানসিক তোলপাড় ও অনুভূতির লড়াইটুকু ঢেকে রাখার জন্য।
রুদ্র এবার মেহেরের কোনো মৌখিক অনুমতির তোয়াক্কা করল না। সে আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে মেহের ডান হাতটা নিজের শক্ত ও উষ্ণ হাতের মুঠোয় টেনে নিল। মেহের আকস্মিক এই পুরুষালি স্পর্শে ভেতর থেকে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। সে হাতটা ছাড়িয়ে সিটের পেছনের দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু গাড়ির সঙ্কীর্ণ সিটে সে আর কতটা পেছাবে?
রুদ্র মেহেরের কবজিতে একটি সাদা তাজা বেলি ফুলের মালা পরিয়ে দিল। তারপর তার চোখের দিকে গভীর, মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনুচ্চ ফিসফিসানি স্বরে বলল,
"মনে করো... কিছুক্ষণের জন্য আমার সন্তানদের মা তুমি... মানে, যে তোমার সতীন হবে সে তুমি। আমি শুধু ট্রাই করে দেখলাম, ওর হাতে হবে কি না – তোমার মতোই তো দেখতে।"
রুদ্রের কথা শুনে মেহেরের ফর্সা গাল আর কানের লতি মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে শ্বাস আটকে চুপচাপ বসে রইল। রুদ্র ধীরে ধীরে মালাটা গুছিয়ে জড়িয়ে দিয়ে হাত সরিয়ে নিল। তারপর আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে স্বাভাবিকভাবেই গাড়ি চালাতে লাগল।
মেহের এক দীর্ঘ বুকভাঙা নিঃশ্বাস ফেলল। নিজের ডান হাতের পেঁচানো বেলি ফুলের মালাটার দিকে সে অপলকে তাকিয়ে রইল। তার মন বলছিল, এক চরম আক্রোশে মালাটা ছিঁড়ে সিটের নিচে ফেলে দেয়। কিন্তু এক অজানা অনুভূতি আর সুপ্ত অধিকারের টানে তার আঙুলগুলো যেন অবশ হয়ে এল। সে কিছুই করতে পারল না কেবল নীরব, থমথমে ও নিথর হয়ে গাড়ির সিটে বসে রইল।
চলবে.... 🎀
#ক্যাপ্টেন_সাহেব
#মারিয়াম_ফুল
পর্ব: ৪৭