🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫
খুব স্পিডের সাথে একটি গাড়ি শুটিং স্পটে এসে থামলো। ভিতর থেকে দরজা খুলে তড়িঘড়ি পায়ে বেরিয়ে এলো হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিত একটি মেয়ে। মেয়েটি কোন রকমে এক হাতে শাড়ির কুচি সামলে ছুট লাগালো। গাড়ির ওপর পাশ হতে ক্যামেরা হাতে আরেকটি মেয়ে বেরিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
- ঝুমি আস্তে পরে যাবি।
কিন্তু ঝুমি নামের মেয়েটির তা শোনার ধৈর্য কোথায়? সে আপন গতিতে ছুটে চলল। ছোটার তালে তার মস্ত বড় খোঁপাটি খুলে লম্বা চুলগুলো বেয়ে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত গিয়ে পরলো। ক্যামেরা হাতে অন্য মেয়েটি কোন রকমে গাড়ির ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে নিজেও পিছু নিল শাড়ি পরিহিত মেয়েটির। অদূরে একটি ছাতার নিচে কয়েকজন বসে কথা বলছে। শাড়ি পরিহিত মেয়েটি বুকে হাত রেখে বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করলো। সামনেই একজন লোককে দেখে বলল,
- এক্সকিউজ মি।
- ইয়েস।
- আমি দেশ বেতার(কাল্পনিক) সংবাদ মাধ্যম থেকে রিপোর্টার আরীবা ঝুম বলছি।
লোকটি এবার চোখ দুটো সরু করে ঝুমকে পা হতে মাথা পর্যন্ত দেখে নিলো। হয়তো তার বিশ্বাস হচ্ছে না কোনো রিপোর্টার শাড়ি পরে আসতে পারে। ততক্ষনে ক্যামেরা হাতে মেয়েটিও এসে ঝুমের পাশে দাঁড়িয়েছে। তা দেখে লোকটি এবার চোখ দুটো আরো ছোট ছোট করে তাকালো। ঝুম অপ্রস্তুত হেসে বলল,
- ও আমার ক্যামেরাম্যান শ্রাবণী আহসান।
- একটা মেয়ে?
লোকটি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো। যেন এই পেশার সাথে একটি মেয়েকে বড্ড বেমানান লাগছে। তার প্রশ্নে শ্রাবণী ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু বলতে নিলে ঝুম তাকে থামিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
- আসলে অভিনেতা আহানের সাথে দেখা করার ছিল।
- অ্যাপয়েনমেন্ট?
- জ্বি নিয়েছি। উনিই এই সময় আসতে বলেছিল।
লোকটি বিরক্ত হয়ে বলল,
- অপেক্ষা করুন স্যারকে বলে দেখছি।
কথাটি বলে সে তাদের অবজ্ঞা করে চলে গেল। শ্রাবণী রাগে গজগজ করতে করতে দু-চারটা গালি ছুঁড়ে বলল,
- দেখেছিস এদের ভাব? অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না যেন। যত্তসব আজাইরা লোকজন।
ঝুম তার কথায় হেসে পুনরায় খোঁপা করতে করতে বলল,
- বাদ দাও আপু। এতোগুলো বছর চাকরি করছো, এদের এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত হওয়ার কথা তোমার।
উত্তপ্ত রোদের মাঝে দাড়িয়ে শ্রাবণীর ফর্সা মুখটি মুহূর্তে লাল হয়ে গিয়েছে। সে একহাতে ক্যামেরা ধরে অন্য হাতে ঘাম মুছতে মুছতে বলল,
- কেন যেন আজকাল বিরক্ত লাগে এসব নাটক দেখতে ঝুমি।
ঝুম এক পলক শ্রাবণীকে দেখে নিল। মেয়েটা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যধিক সুন্দরী ও স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষ। কিন্তু তার একটাই সমস্যা, সে অত্যন্ত রাগী এবং পুরুষ মানুষ সহ্য করতে পারে না। তারও অবশ্য কারণ রয়েছে। স্কুল জীবন থেকে শ্রাবণীর একটি ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘ আট বছরের প্রেম ছিল তাদের। সেই ছেলেটি শ্রাবণীকে খুব বাজে ভাবে ঠকিয়ে ছেড়ে গিয়েছে। এরপর থেকে শ্রাবণী ছেলেদের সহ্য করতে পারে না। উদ্ভট ছেলেদের মতো পোশাক পরে সারাক্ষন ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে।
শ্রাবণী আর ঝুম বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর লোকটি এসে বলল,
- স্যার এখন সময় দিতে পারবে না।
দীর্ঘক্ষণ রোদের মাঝে দাঁড় করিয়ে রেখে এখন জানানো হচ্ছে সময় দিতে পারবে না? তাহলে আসতে বলল কেন? শ্রাবণী বেজায় চটলো ওদের ওপর। রেগে অস্থির হয়ে কিছু বলতে গেলে ঝুম চোখের ইশারায় থামতে বলল,
- আমি কি ওনার সাথে একবার কথা বলতে পারি? শুধু দুই মিনিট? এরপর উনি না চাইলে আমরা চলে যাবো। দয়া করে দেখা করতে দিন।
লোকটি কিছু একটা ভাবলো। হয়তো ঝুমের কথা তার ভালো লেগেছে। তাই সে দেখা করার অনুমতি দিলো কিন্তু ক্যামেরা চালাতে সাফ সাফ বারণ করে দিলো। ঝুম তার কথা মেনে নিয়ে শ্রাবণীকে নিয়ে চলল দূরে ছাতার নিচে বসে থাকা অভিনেতা আহানের দিকে। কিছুটা কাছে এসেই তারা বুঝতে পারল কেন নায়ক মহাশয় সময় দিতে চাইছে না। বিরক্তিতে শ্রাবণীর মুখ তেতো হয়ে উঠল। বমি করার ভাব নিয়ে ঝুমের দিকে হেলে পরে বলল,
- শা*লার চরিত্র দেখ ঝুমি। নাউজুবিল্লাহ মার্কা একদম। নায়িকার সাথে ইটিস পিটিস করবে বলে আমাদের এতদূর টেনে এনে চলে যেতে বলছে।( সে মুখের কাছে হাত নিয়ে বমি করার মতো করে বলল ) ইয়াক, বমি পাচ্ছে ঝুমি।
ঝুম এই মেয়ের কান্ডে না হেসে পারল না। এক দিকে যেমন হাসি পাচ্ছে অন্য দিকে এর কথা শুনে হতাশ হচ্ছে। শ্রাবণীর মুখে একদম লাগাম নেই। বয়সে তার থেকে দুবছরের বড় হয়েও যে সব কাণ্ড করে মেয়েটি তাতে তাকে যে কেউ ঝুমের ছোট বলতে বাধ্য হবে। শ্রাবণীকে যারা চেনে তাদের অধিকাংশই তাকে ভীষণ ভয় পায়। এই ভয়ানক চরিত্রের মেয়েটি সবার সাথে কেমন ঝুম জানে না কিন্তু তার কাছে একজন আদর্শ বড় বোনের থেকে কম কিছু না। সম্পূর্ণ রূপে একা অনাথ ঝুমের আপন বলতে এক শ্রাবণীই তো আছে। ঝুম সামনে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
- বিনোদন জগতে এসব নতুন না আপু। চলো আজব দুনিয়ার আরো একটি নমুনার সাথে কথা বলে দেখি।
শ্রাবণী মাথা নাড়িয়ে পা বাড়ালো ঝুমের সাথে।
- হ্যালো স্যার।
ঝুমের বলা কথাটি হয়তো একটু বেশিই জোরে ছিল, নয়তো নায়িকা এনি কেন ওভাবে ছিটকে সরে গেলো? তাদের একান্ত সময় বিরক্ত করায় নায়ক আহান বেজায় নাখোশ। চোখ মুখ কুঁচকে ঝুমের দিকে তাকালে ঝুম মিষ্টি এক হাসি দিয়ে বলল,
- স্যার আমি দেশ বেতার সংবাদ মাধ্যম থেকে রিপোর্টার আরীবা ঝুম। এবং ( শ্রাবণীকে দেখিয়ে বলল ) উনি আমার ক্যামেরাম্যান শ্রাবণী আহসান।
নায়ক আহানের মাঝে তখনো বিশেষ ভাব লক্ষ্য করা গেল না। সে একবার শ্রাবণীকে দেখে নিয়ে পূর্বের তুলনায় আরো বিরক্ত হয়ে বলল,
- তো?
ঝুম কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। মনে মনে ভাবলো মানুষের সাথে ঠিকঠাক আচরণ করতে পারে না এদের নায়ক কে বানায়? কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে বলল,
- স্যার আপনার সামনে আমার কথা হয়ে ছিল ইন্টারভিউ এর ব্যাপারে। আপনি আজ আসতে বলেছিলেন। দয়া করে যদি কিছুটা সময় দিতেন স্যার।
নায়ক আহান ঝুমের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নায়িকা এনির দিকে তাকিয়ে কিলার হাসি দিয়ে বলল,
- আমাকে ক্ষমা করবে এনি। এদের একটু বিদায় করে তোমার সাথে কথা বলব কেমন? তুমি রাগ করো না।
নায়িকা এনি লজ্জাতুর ভাব করে কিছুটা নেকি সুরে বলল,
- এই না না কোনো সমস্যা নেই। তুমি যখন বলবে আমি তখনই তোমাকে সময় দিতে পারবো।
এই বলে সে ঝুমদের দিকে বিরক্তি ভরা মুখে তাকিয়ে উঠে চলে গেল। শ্রাবণী ঝুমের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
- ঝুমি রে, এতো মুখে মধু অন্তরে বিষ টাইপ ব্যাপার।
ঝুম এই মেয়ের অত্যাচারে অতিষ্ট। চোখের ইশারায় সে শ্রাবণীকে চুপ করতে বলে নায়ক আহানের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যমূলক হাসলো।
- হ্যাঁ কি যেন বলছিলেন আপনি মিস..
- আরীবা ঝুম।
- হ্যাঁ হ্যাঁ। এই তোরা কে আছিস ওনাদের বসার জন্য চেয়ার দিয়ে যা।
তার বলতে দেরি হলেও চেয়ার দিতে দেরি হলো না। ঝুম আলতো হেসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল,
- ধন্যবাদ। এবার তাহলে ইন্টারভিউ শুরু করি?
- ইয়াহ।
ঝুম শ্রাবণীকে ইশারা করতেই শ্রাবণী ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে পরলো। সে এই ব্যাপারে ভীষণ পারদর্শী। দক্ষ হাতে ক্যামেরা সেট করে দাঁড়িয়ে রইলো ঝুমের ইশারা পাওয়ার অপেক্ষায়। ঝুম অভিনেতা আহানের ঠিক সামনে বসে। ডান হাতে তার ছোট একটি লাইভল মাইক এবং বাম হাতে ফোন। ঝুম গত রাতে ফোনের নোটপ্যাডে লিখে রাখা প্রশ্ন গুলো বের করে নিজের প্রফেশনাল রূপে ফিরে এলো।
- আপু শুরু করো।
শ্রাবণী ক্যামেরা চালু করে বলল,
- রেডি।
- হ্যালো মি. আহান। কেমন আছেন?
অভিনেতা আহান সামান্য চমকে গেলো ঝুমের রাতারাতি বদলে যাওয়া রূপ দেখে। কিছুক্ষণ পূর্বের নরম মেয়েটিকে এখন একদমই নরম লাগছে না। উল্টো খুবই আত্মনির্ভরশীল, ব্যক্তিত্ববান লাগছে। আহান ঝুমকে ভালো ভাবে দেখে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,
- গুড। আপনি কেমন আছেন?
- আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। এখানে আপনার নতুন ছবির শুটিং চলছে নিশ্চয়ই?
- হ্যাঁ।
- ছবির নাম?
- দুঃখিত ছবির নাম প্রকাশ করার অনুমতি প্রডাকশন থেকে দেওয়া হয়নি।
- আচ্ছা। তা আপাতত কতগুলো ছবিতে হাত দিয়েছেন?
- রিসেন্ট বেশ কয়েকটি ছবির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি। তবে আপাতত একটি ছবির শুটিং চলছে।
- বেশ ভালো। নায়িকা নিশ্চয়ই এনি ম্যাম?
আহান হাত নাড়িয়ে হেসে বলল,
- আরে নাহ।
- কিন্তু তাকে এখানে দেখলাম যে!
- ও এমনিই দেখা করতে এসেছে।
ঝুম মুচকি হেসে বলল,
- ওহ। তাহলে নায়িকা?
- নায়িকা নতুন মুখ। সারপ্রাইজ সকলের জন্য।
- তাই নাকি! রিউমার রয়েছে আপনাকে নাকি প্রায়ই নতুন মুখের নায়িকাদের সাথে ছবি করতে দেখা যায়।
- হ্যাঁ তা বলতে পারেন। আমি সকলকে সুযোগ দিতে পছন্দ করি।
অভিনেতা আহানের এই কথাটিতে ঝুম একটু কেমন করে যেন হাসলো। তারপর মুখটা হঠাৎ গম্ভীর করে প্রশ্ন ছুড়লো,
- সম্প্রতি আপনাকে নিয়ে একটি গুঞ্জন উঠেছিল অভিনেত্রী ফারিয়ার সাথে প্রেম, বিয়ে ও বাচ্চা এবরশন নিয়ে। এই ব্যাপারে আপনার কি মতামত?
শ্রাবণী শুট করতে করতে একটু থমকে গেলো। তারা যখনই কোনো ইন্টারভিউতে আসে তার পূর্বে প্রশ্ন তৈরি করে নেয়। এবং তা অবশ্যই তাদের ডিপার্টমেন্ট হেডকে দেখাতে হয়। সে যে প্রশ্নগুলোকে অ্যাপ্রুভ করে শুধু সেগুলোই তারা করতে পারে। তেমনই এবার যখন ঝুম প্রশ্ন দেখায় তখন হেড এই প্রশ্নটি বিনা বাক্য ব্যয়ে বাতিল করে দেয়। তাহলে ঝুম সেই প্রশ্নই কেন করলো? যদিও সে মনে মনে খুশিই হয়েছে। এই বেটা আহান এক নাম্বারের চরিত্রহীন, লুচ্চা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হিরোইনদের সাথে তার নাম বেশ চর্চায় থাকে। তেমনই একটি ঘটনা কিছুদিন পূর্বে দেখা যায়। অভিনেত্রী ফারিয়া অত্যন্ত প্রতিভাবান ছিলেন। ধূমকেতুর মতো হঠাৎ মিডিয়া জগতে এসে রাতারাতি সাফল্যের পর বেশ কিছু বছর সে ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব চালিয়ে আবারও হঠাৎ করে হারিয়ে যান। এরপর কেউ আর তার খোঁজ পায়নি। কিছুদিন পূর্বে সে নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানান অভিনয় জগতে আসার পর অভিনেতা আহানের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়। এরপর বিয়ে। বেশ ভালই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু হঠাৎ সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে আহানের কাছে অধিকার চেয়ে বসেন। যার ফলে আহান ভীষণ হিংস্র হয়ে ওঠেন। এবং এক পর্যায়ে তাকে এবরশন করাতে বললে সে বারণ করে দেয়। অতঃপর আহান তাকে জোরপূর্বক এবরশন করিয়ে তার ক্যারিয়ার নষ্ট করে তাকে হুমকি দেন, কেউ জানতে পারলে তাহলে তার পরিবারকে শেষ করে দিবেন। তিনিও প্রতারণা কষ্ট, বাচ্চা হারানোর শোক ও ভয়ের কারণে রাতারাতি লুকিয়ে পরেন। অভিনেত্রী ফারিয়া কিছু প্রমাণ সকলের সামনে তুলে ধরেন। এই বিষয় নিয়ে অনেক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হলেও অভিনেতা আহান বিশেষ কিছু কখনোই বলেননি। আহান যে ঠিক কেমন প্রকৃতির মানুষ তা সকলেরই জানা। তবুও সব জেনেও ক্ষমতা আর টাকার কাছে সকলে নিজেদের বিকিয়ে বসে রয়েছে। ঝুমের প্রশ্নে এতক্ষন খোশমেজাজে থাকা আহানের মুখয়োব গম্ভীর হয়ে উঠল। হয়তো ক্যামেরা রয়েছে বলে বিশেষ কিছু বলতে পারলেন না। নিজের রাগ দমিয়ে জোরপূর্বক হেসে বললেন,
- কতজনই তো আমাকে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে। সে সব তো আর আপনাদের অজানা নয়।
- কিন্তু অভিনেত্রী ফারিয়া আপনাদের কিছু একান্ত মুহূর্তের ছবি ও আপনাদের বিয়ের ডকুমেন্ট এমনকি প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট ও এবরশন রিপোর্ট দেখিয়েছেন। যেখানে স্পষ্ট আপনার নাম ও স্বাক্ষর ছিল মি. আহান।
আহান রাগে দাঁত কিড়মিড় করলেও, ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
- সেসব কথা না হয় ছাড়ুন। আপনিও কিন্তু ফারিয়ার থেকে কম কিছু না। অভিনয় জগতে এলে কিন্তু ভালই ফায়দা পেতেন। আর আমি তো রয়েছিই সাহায্যের জন্য।
তার দৃষ্টি বলে দিচ্ছে সে কতটা জঘন্য প্রকৃতির মানুষ। ঝুম নিজেকে বহু কষ্টে ধরে রেখে হাসি দিয়ে বলল,
- ধন্যবাদ, কিন্তু আমি আমার প্রফেশনে ভালো আছি। আপনি বলুন, শোনা যাচ্ছে অভিনেত্রী এনির সাথে নাকি আপনি নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন?
আহান হা হা করে হেসে উঠলো। শুটিংয়ে থাকা আশেপাশের কয়েকজন তাদের দিকে তাকালো সেই হাসির শব্দে। আহান নিজের হাসি থামিয়ে বলল,
- আপনি চাইলে আপনার সাথেও কোনো সম্পর্ক হতে পারে মিস ঝুম।
ঝুম মারাত্মক মিষ্টি এক মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
- তাই! কিন্তু মিস্টার আহান আমি অভিনেতাদের প্রতি আগ্রহী নই।
ঝুমটি যতটা মিষ্টি ভাবে কথাটি বলেছে, ততটাই অপমানিত ঠেকল আহানের কাছে । আহান চোখ মুখ ভীষণ থমথমে ভাব করে বলল,
- ভেবে দেখুন আরও একবার। এতে আপনারই লাভ হতো।
ঝুম হঠাৎ উঠে দাড়ালো। এবং খুবই আত্মবিশ্বাসের সাথে আহানের চোখে চোখ রেখে বলল,
- আমার দিন এতটাও খারাপ আসেনি যে আপনার মত যার তার সাথে সম্পর্কে জড়াতে হবে। আর হ্যাঁ, এতটুকুই যথেষ্ট। আশা করি আপনি কিছুদিনের জন্য লোক চর্চায় থাকবেন। ধন্যবাদ।
ভদ্র ভাষায় খুব নিপুণ ভাবে অপমান করে ঝুম তার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে সেখান থেকে চলে এলো। পুরো রাস্তা শ্রাবণী ঝুমকে প্রশ্ন বানে বিদ্ধ করলো। সে এতটাই খুশি হয়েছে ঝুমের কাজে যে এর মাঝে ঝুমকে কয়েক শতবার জড়িয়ে ধরে তার প্রশংসা করেছে। শ্রাবণীর এই মেয়েটাকে এত বেশি ভালো লাগে যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। শান্ত-শিষ্ট মেয়েটি অন্যায় দেখলে চুপ থাকে না কখনো। অযথা কারো সাথে ঝামেলা না করলেও এমন এমন কাজ করবে যে সামনের মানুষ তাকে সম্মান করতে বাধ্য হবে। তারা দেশ বেতার সংবাদ মাধ্যমের অফিসে গিয়ে প্রথমেই ভিডিও ফুটেজ গুলো এডিটরের কাছে দিলো। অবশ্যই হেডকে এড়িয়ে। এজন্য অফিসের বেশ কিছু বন্ধু তাদের সহায়তা করেছে। সব কাজ করার পর ঝুম গিয়ে তার ডেস্কে বসলো। বাহিরে যা গরম! সে দ্রুত বোতল থেকে পানি খেয়ে তার গলা ভিজিয়ে নিলো। হেড অফিসে নেই। সে কোনো এক মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়েছে। যার কারণে ঝুম জোর বাঁচা বেঁচেছে। না জানি এই সংবাদ হেডের কাছে পৌঁছালে তার কি হবে? আকাশ-কুসুম ভাবনার মাঝে শ্রাবণী এসে হাজির। সে ঝুমকে জোর করে তুলে ক্যান্টিনে নিয়ে এলো। কারন সে ক্ষুধার্ত। ঝুম নিজেও ক্ষুধার্ত ছিল, তাই সে বিশেষ আপত্তি না জানিয়ে শ্রাবণীর সাথে এসেছে। ক্যান্টিনের এক পাশে বেশ ভালই জটলা পেকে রয়েছে। ঝুম একটু কৌতূহলী মন নিয়ে এগিয়ে গেলে শুনতে পেল টিভিতে ক্রিকেট খেলা চলছে। খেলার কথা শুনেই ঝুম তার চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। ওহ, এই কারণে তাহলে এতো জটলা! ঝুম আর সেদিকে না গিয়ে ক্যান্টিন থেকে কিছু খাবার নিয়ে বসলো একটু দূরে একটি চেয়ারে। শ্রাবণী তখনো খেলার ওখানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে। এটা নতুন কিছু নয়। তাদের ক্যান্টিনে বিনোদনের জন্য টিভি দেয়া রয়েছে। যেহেতু এটি একটি সংবাদ মাধ্যম অফিস অবশ্যই এখানে অনেকগুলো টিভি থাকা অসম্ভব কিছু নয়। এখন কিসের খেলা চলে ঝুমের জানা নেই। কিন্তু প্রায় সময়ই এই বিরক্তিকর খেলা টিভিতে চলতে থাকে এখন। শ্রাবণীটাও হয়েছে এক খেলা পাগল মেয়ে।
- ঝুমি ঝুমি।
ঝুম খেতে খেতে উত্তর দিল,
- হুম।
শ্রাবণী খাবার নিয়ে বসতে বসতে বলল,
- আজও পাকিস্তান জিতেছে।
- ওহ।
ঝুমের মাঝে ভাবাবেগ নেই। সে আদোও শ্রাবণীর কথা শুনছে কিনা সেই ভালো জানে। শ্রাবণী যদিও জানে ঝুম তার কথা মন দিয়ে শুনবে না তবুও তার বলা চাই-ই চাই। সে বড্ড আফসোস নিয়ে বলল,
- ওই রাজাকারের বাচ্চাদের কাছে নিউজিল্যান্ডও হেরে গিয়েছে। কি যে হচ্ছে? হঠাৎ করে ওরা এতো ভালো কিভাবে খেলা শুরু করলো কে জানে?
ঝুম উত্তর দিল না। শ্রাবণী কিছু সময় একা একা হাহুতাশ করে খাওয়ায় মন দিল। তা দেখে ঝুম নীরবে হাসলো। কেন যেন পাকিস্তানকে শ্রাবণী পছন্দ করে না। সর্বদা সে তাদের রাজাকারের বাচ্চা বলেই প্রকাশ করে থাকে। আজ পাকিস্তান হেরে গেলে হয়তো শ্রাবণী খুশিতে সকলকে ট্রিট দিয়ে বসত। এই মেয়ের দ্বারা অসম্ভব বলে কিছু নেই। হঠাৎ ঝুমের কানে খুবই অসতর্কতাবশত টিভিতে প্রচারিত একটি কথা পৌঁছালো।
- ম্যান অব দ্যা ম্যাচ শাইয়ান রেহমান আনসারী।
এক মুহূর্তের জন্য নামটি শুনে ঝুমের হাত থেমে গেলেও পরমুহূর্তে তা ভুলে সে শ্রাবণীর সাথে কথায় মেতে উঠলো সে।
চলবে—-
[কেমন হয়েছে কমেন্ট করে না জানালে খবর আছে।]
#তুমি_কিন্তু_আমি
মীরা_রায়াদ
পর্ব–০১