#তুমি_কিন্তু_আমি
মীরা_রায়াদ
পর্ব–০৩
🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫
ঝুম, শ্রাবণী দুজনই চোখ বড়বড় করে তাকালো। পাকিস্তানের টপ টেন সংবাদ মাধ্যমের মাঝে হাম নিউজ অন্যতম। ঝুম বিভিন্ন নিউজ ও আর্টিক্যাল থেকে জেনেছে হাম নিউজের মালিক একজন নারী এবং সে এই বছর বেশ কিছু আওয়ার্ড ও পেয়েছে তার সফলতার জন্য। কিন্তু কখনো সে নিজের আত্মপ্রকাশ গণমাধ্যমের সামনে করেনি। অর্থাৎ কেউ তাকে কখনোই দেখিনি। ঝুম সর্বদা তাকে আইডল মেনে এসেছে। সৎ ও নিজের মনমারজি মতো কাজ করার জন্য তার শত্রুরও অভাব নেই। কিন্তু সে কখনো থেমে যায়নি। ঝুম তাকে দেখেই তো শিখে এসেছে এতদিন। অথচ আজ যখন সে সামনে থেকে মানুষটিকে দেখছে তখন একটি কথাও বলতে পারছে না।
মেহেরুন্নেসা হয়তো কাউকে ফোন লাগালো। ফোনটি স্পিকারে দিয়ে একহাতে এগিয়ে সামনে ধরলো সে। কিছুক্ষন রিং হওয়ার পর ওপর পাশ থেকে পুরুষালি গলায় ইংরেজিতে ভেসে এলো,
- হ্যালো মিসেস মেহেরুন্নেসা ফায়সাল।
- হ্যালো মি.রাহমান। তারা এখন আমার সামনে। আপনি চাইলে কথা বলতে পারেন?
মেহেরুন্নেসা কথাটি বলে ঝুম ও শ্রাবণীকে ইশারা করলো। ঝুম তখনো চোখ বড়বড় করে অবাক হয়ে মেহেরুন্নেসাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। এভাবে একজন নারী হয়ে অন্য একজন নারীকে অপলক দেখতে দেখে শ্রাবণী অপ্রস্তুত হেসে ঝুমের বাহুতে ধাক্কা দিলো। কিন্তু ঝুমের মাঝে বিশেষ ভাবাবেগ দেখা গেলো না। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না তার সামনে হাম নিউজের মালিক দাঁড়িয়ে। তার একমাত্র নারী আইডল তার সামনে? অবিশ্বাসনীয়! এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি?
- হ্যালো।
ফোনের অপর পাশ থেকে একটি ভারী থমথমে কণ্ঠ ভেসে এলো। সেই কন্ঠের শব্দে ঝুমের ঘোর ভাঙ্গলো। শ্রাবণী উত্তর দিল,
- স্যার আমি শ্রাবণী।
- হ্যাঁ শ্রাবণী। ঝুম কোথায়?
শ্রাবণী ঝুম এর দিকে আড় চোখে তাকিয়ে বলল,
- আমার সাথেই রয়েছে।
- ঝুম।
ঝুম একবার মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে এরপর পুনরায় ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
- জি স্যার।
- তোমাদের দুজনকেই বলছি মন দিয়ে শুনবে। পাকিস্তানে যতদিন থাকবে তোমরা মিসেস মেহেরুন্নেসা ফায়সালের আন্ডারে কাজ করবে এবং তার অর্ডার ফলো করবে। তোমাদের হোটেল বুকিং ক্যানসেল করা হয়েছে। তোমরা তার কাছে সুরক্ষিত থাকবে। এবার অন্তত উল্টাপাল্টা কিছু করে আমার নাক কাটিও না। চেষ্টা করবে প্রজেক্টের কাজ সম্পূর্ণ শেষ করে দেশে ফেরার।
কথা গুলো বলে সে একটু থামল। তারপর তার কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম করে বলল,
- ঝুম।
- জি স্যার।
- নিজের এবং শ্রাবণী খেয়াল রাখবে। অপরিচিত দেশে আছো তোমরা, নিজেদের ক্ষতি হবে এমন কোন কাজ করবে না। দ্রুত কাজ শেষ করে সুস্থ ভাবে দেশে ফিরে এসো, কেমন?
মাহফুজুর রহমানের কথা শুনে ঝুমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতি হাসি উঁকি দিল। লোকটা বাহিরে বাহিরে যতই কড়া কথা বলুক না কেন, তার মনটা যে ভীষণ নরম ঝুমের তা জানা আছে। তাছাড়া মৃত বন্ধুর একমাত্র কন্যা বলে সে সর্বদাই ঝুমকে ভীষণ স্নেহ করে। ঝুমের জন্য তার চিন্তা ঝুম বুঝতে পারে। অথচ লোকটা উপরে উপরে তার সাথে সর্বদাই বকাঝকা দিয়ে কথা বলে। এসব কথা ভেবে ঝুমের আবারো হাসি পেল। সে মুচকি হেসে মাহফুজুর রহমানকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
- চিন্তা করবেন না স্যার যে কাজের জন্য এখানে এসেছি তা সম্পন্ন করেই আসবো। দোয়া করবেন।
- শুধু কাজের কথা নয়, নিজেদেরও খেয়াল রেখ। আর হ্যাঁ, মিসেস মেহেরুন্নেসা ফায়সালকে বেশি জ্বালাতন করবে না। শ্রাবণী তোমাকে বলছি একদম জ্বালাতন করবে না।
কথাটি শুনে শ্রাবণীর চোখ মুখ কুঁচকে গেল। এভাবে সকলের সামনে বলার কি দরকার ছিল? নিজেরা নিজেরাও তো বলা যেত। এই লোকের আর কোন কাণ্ডজ্ঞান হলো না। অদ্ভুত, এমন ভাবে বলছে যেন সে বাচ্চা। তার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে এই শক্ত ধাঁচের রোবটের মতো মহিলার পিছু লাগবে! মাথা খারাপ নাকি! মনে মনে শ্রাবণী কথাগুলো ভাবলেও মুখে তা প্রকাশ করো না। বরং মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
- কি যে বলেন না স্যার! আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা ঠিকঠাক ভাবে থাকবো।
মাহফুজুর রহমান হতাশ কণ্ঠে বললো,
- যখনই তুমি অতিমাত্রায় ভদ্রতা দেখাও তখনই আমার প্রেসার বেড়ে যায়, চিন্তা হয়।
তার এমন কথায় শ্রাবণীর চোখ মুখের রং বদলে গেলেও ঝুমের ঠোঁটে হালকা চাপা হাসি দেখা গেল। শ্রাবণী তা দেখে নিজ মনে বিরবিরিয়ে কি সব বলল তা বোঝা না গেলেও ঝুম বুঝতে পারল তাকে আচ্ছা মতো ধুয়ে দিচ্ছে মেয়েটা। মেহেরুন্নেসা ফোনটি নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল,
- ওকে মিস্টার রহমান, আপনাকে পরবর্তী আপডেট আমি শেয়ার করে দেবো। ভাল থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।
- জ্বি জ্বি ম্যাডাম, আপনিও ভালো থাকবেন। আর বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রাখবেন। আল্লাহ হাফেজ।
মেহেরুন্নেসা কলটি কেটে দিয়ে দৃষ্টি ঝুম এবং শ্রাবণীর দিকে স্থির করল।
- আশা করি আপনাদের আর কোন কনফিউশন নেই। যদি থেকে থাকে তাহলে আপনারা আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন। আর না থাকলে আমি আপনাদের কিছু কথা বলব এখন।
ঝুম অপলক চোখে তাকিয়ে রইল মেহেরুন্নেসার দিকে। মেহেরুন্নেসাও তখন তার দিকেই তাকিয়ে। ঝুমের কেন যেন মনে হলো মেহেরুন্নেসা কথাটি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে। সে এই প্রথম মেহেরুন্নেসার সাথে কথা বলল,
- জ্বি আপনি বলতে পারেন। আমাদের কোন প্রশ্ন নেই।
ঝুমের বুকের মাঝে অদ্ভুত অনুভূতি হলেও সে তা বুঝতে দিলো না। বরং খুব শান্তভাবে কথাগুলি বলে মেহেরুন্নেসার চোখের দিকে তাকালো। মেহেরুন্নেসা কি একটু হাসলো? ঠিক বোঝা গেল না। সে দাম্ভিক পায়ে হেঁটে গিয়ে সোফায় বসলো। তার বসার ভঙ্গিও ছিল বড়ই আকর্ষণীয়।
- বসে কথা বলি?
- জ্বি।
ঝুম শ্রাবণীকে ইশারা করে গিয়ে বসলো ঠিক মেহেরুন্নেসার সামনাসামনি।
- আমার হয়তো আপনারা চিনতে পেরেছেন। তবুও বলে রাখি, হাম নিউজ নামে আমার একটি ছোটখাটো সংবাদ মাধ্যম রয়েছে।
- ছোটখাটো নয়। পাকিস্তানের টপ টেন নিউজ চ্যানেলের মাঝে বড় চাচীআম্মার নিউজ চ্যানেলটি একটি।
ঈশাল মেহেরুন্নেসার কথার মাঝে ফোড়ন কেটে বলল। মেহেরুন্নেসা তার দিকে শান্ত নজরে তাকিয়ে বলল,
- ঈশাল কতবার বলেছি যখন বড়রা কথা বলবে তখন কথা বলবেন না। আপনাকে যখন বলতে বলা হবে তখনই বলবেন।
মেহেরুন্নেসা কথাগুলো শান্তভাবে বললেও তার কথায় স্পষ্ট শাসন ছিল। ঈশাল চোখ নামিয়ে ভদ্রভাবে বলল,
- দুঃখিত বড় চাচীআম্মা।
মেহেরুন্নেসা নরম চোখে ঈশালের দিকে তাকিয়ে তাকে আশ্বস্ত করল। অতঃপর পুনরায় ঝুমদের দিকে তাকিয়ে বলল,
- আপনারা এখানে যতদিন থাকবেন আমার অফিসের মাধ্যমে কাজ করবেন। কাল থেকে অফিসে জয়েন করবেন। আমি আমার পিএ কে বলে রেখেছি আপনাদের দুজনকে টেম্পোরারি আইডি কার্ড দিয়ে দেবে। আপনাদের কিছু ডকুমেন্ট আমার কাছে মি.মাহফুজুর রাহমান পাঠিয়ে দিয়ে ছিল। তার মাধ্যমেই আইডি কার্ড বানানো হয়েছে। এছাড়া কোনো প্রয়োজন হলে ঈশালকে বলবেন সে আপনাদের সাহায্য করবে। ঈশালের সাথে পরিচিত হয়েছেন?
ঝুম এবং শ্রাবণী একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ঈশালের দিকে তাকালো। পরিচয় বলতে নাম ছাড়া তেমন কিছুই তারা জানে না এই মেয়েটির ব্যাপারে। কিন্তু বলা কি ঠিক হবে? মেহেরুন্নেসা হয়তো বুঝতে পারলো। সে ঈশালকে যতটা চেনে তাতে এতক্ষনে সে তার নাড়ি-নক্ষত্র বলে দেয়ার মতো মেয়ে। কিন্তু এখনো যে সে কিছু বলেনি সেটা আসলেই চমকে যাওয়ার মতো ব্যাপার।
- ঈশাল আপনি এখনো তাদের সাথে পরিচিত হননি?
ঈশাল বোকা হেসে বলল,
- দুঃখিত বড় চাচীআম্মা। এখনই হচ্ছি।
ঈশাল কিছুটা থেমে স্বভাব সুলভ আচরণ বদলে পুরোপুরি প্রফেশনাল রূপে নিজেকে উপস্থাপন করে বলল,
- হ্যালো আমি ঈশাল রেহমান আনসারী। ইন্টার্ন রিপোর্টার অভ হাম নিউজ। এবং আনসারী বংশের আদরের মেজ মেয়ে। এটা আমাদের বাড়ি। আমার বাবা এবাড়ির মেজ ছেলে। (ঈশাল নিজের মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল) আর এই হলো আমার মিষ্টি মা ফাতিমা। আমার ছোট একটা বোন রয়েছে। তার নাম মিশাল। সে এবার কলেজ শেষ করলো। ভার্সিটির জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে। (মেহেরুন্নেসাকে দেখিয়ে বলল)
এই হলো আমাদের সকলের বড় চাচীআম্মা। তার ব্যাপারে তো জানোই। বড় চাচাজান মিলিটারিতে চাকরিরত অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে সে রিটায়ার্ড অবস্থায় রয়েছে। তাদের দুই ছেলেমেয়ে। তাঁদের বড় ছেলে মানে আমাদের বাড়ির বড় ছেলে হলো বড় ভাইজান। মজার ব্যাপার কি জানো! বড় ভাইজান একজন ক্রিকেটার। সে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের হয়ে খেলে। আমার ভাইজান অনেক বড় খেলোয়াড়। বড় চাচী আম্মা আর বড় চাচাজানের আর একজন সন্তান হল সারাপি। আপি বিবাহিত। তার একটি ছেলে বাবু রয়েছে। এখন তাকে তোমরা দেখতে পাবে না, কারণ সে এখন তার শ্বশুরবাড়িতে রয়েছে। কিন্তু কিছুদিনের মাঝে আপি আবার আমাদের বাড়িতে আসবে, তখন তার সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেবো। আমার সারাপি বেস্ট। সে অনেক মিষ্টি আর ভালো মেয়ে। আপির হাজবেন্ড একজন কর্পোরেট অফিসার। এই হল বড় চাচার পরিবার। আমার পরিবার সম্পর্কে তো জানলেই। এবার আসি ছোট চাচার পরিবারের কথায়। আমার ছোট চাচা একজন ব্যবসায়ী। সে আমাদের পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসা দেখাশোনা করে। বলতে পারো করাচিতে আনসারী ট্রেডার্স একটি নামিদামি ব্র্যান্ড।
এ পর্যায়ে মেহেরুন্নেসা ঈশালের কথায় চোখ বড় বড় করে বললো,
- কি হচ্ছে কি ঈশাল?
ঈশাল হেসে দিয়ে বললো,
- দুঃখিত একটু মজা করেছি। আসলে আমাদের নামিদামি কোন ব্রান্ড নেই। এটা মজা করে বলেছি। তবে মার্কেটে আমাদের বেশ কয়েকটা দোকান রয়েছে। আমার-বাবা চাচারা মূলত পারিবারিক সেই ব্যবসা সামলায় এখন। আর ছোট চাচী আম্মার কথা কি বা বলবো তোমাদের! তার মতো হাস্যজ্জল চাচি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সে আমাদের সকলের বন্ধু| তাদের দুটি ছেলে। ছোট ভাইজান আর আয়ান। ছোট ভাইজান একজন কার্ডিওলজিস্ট। সে আর বড় ভাইজান একই বয়সী। হয়ত কয়েক মাসের পার্থক্য রয়েছে তাদের জন্মের। তাইনা বড় চাচিআম্মা?(সে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটি করল ঈশাল। বিপরীতে মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো) দেখেছ বললাম না! আর আমাদের আয়ান এবার অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। এছাড়া আমার এক ফুপি রয়েছে। তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তারা অবশ্য আমাদের সাথে থাকে না। তারা ইসলামাবাদে থাকে। মাঝে মাঝে কোন অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধে এখানে বেড়াতে আসে। আর আমাদের পরিবারের প্রধান হল আমার দাদাজান আর দাদিজান। এই হল আমার ছোটখাটো পরিবার।
দীর্ঘ পরিচয় পর্বের পর ঈশাল বড় এক নিঃশ্বাস নিল। ঝুম এবং শ্রাবণী অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা এত কথা বলে! ঈশাল এতকিছু বললেও তারা কিছুই বুঝতে পারেনি ঠিকভাবে। ঈশাল তাদের অবাক চাহনির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
- কি হলো? বুঝতে পারোনি?
ঝুম তার মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বোঝালো সে বুঝতে পারেনি। তার বোঝার কথাও না। ছোট থেকে সে ছোট পরিবারে বড় হয়েছে। তাই তার বড় পরিবার নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। আর বেশ কিছু বছর ধরে সে একাই জীবন কাটাচ্ছে। সুতরাং ঈশালের কথাগুলো তার মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছে। ঈশাল অসহায় ভাবে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো। সে বুঝতে পারছে না তার ভুলটা কোথায় হয়েছে? সে তো ঠিকঠাক ভাবেই সব বলল, তাহলে বুঝতে পারল না কেন? মেহেরুন্নেসা অসন্তুষ্ট চোখ মুখ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সে জানতো ঈশাল গন্ডগোল করবে। মেয়েটা ছোট থেকেই চঞ্চল বেশি। এমন ভাবে কথা বলে যার অর্ধেকটাই কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু তারা অভ্যস্ত এসবে। ছোট থেকে দেখে এসেছে যে। ঈশাল যতই চঞ্চল হোক না কেন, তার মনটা ঠিক কাদা মাটির মতো নরম। সেজন্যই মেহেরুন্নেসার তাকে নিয়ে চিন্তা হয়। তাদের যে প্রফেশন, সে প্রফেশনে নরম ও সরল মনের মানুষ বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকতে দেয়া হয় না। দুনিয়া যে বড় কঠিন।
- সমস্যা নেই ধীরে ধীরে আপনারা সব বুঝতে পারবেন। সকলের সাথে পরিচয় হলে তখন আর কনফিউশন থাকবে না। আপাতত আপনারা বিশ্রাম নিন। ঈশাল তাদের কামরাটা দেখিয়ে দিন। আপনাদের কোন সমস্যা হলে বাড়ির যে কাউকে বললেই হবে। আর হ্যাঁ কাল সকাল দশটার মধ্যে আপনাদের অফিসে দেখতে চাই। লেট করা আমার পছন্দ নয়, তাই সময় মতো পৌঁছে যাবেন। ঈশাল তাদের দিকে খেয়াল রাখবেন।
কথাগুলো বলে মেহেরুন্নেসা আর দাঁড়ালো না। সে তার দাম্ভিক পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। শ্রাবণী আতঙ্কিত চোখে মুখে এক হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল মেহেরুন্নেসার চলে যাওয়া। সে ঝুমের দিকে হেলে ভয়ার্ত কন্ঠে ফিস ফিসিয়ে বলল,
- ঝুমি রে, এ তো দেখছি আমাদের বসের থেকেও ভয়ানক। এবার আমার কি হবে? আমি দেশে যেতে চাই ঝুমি।
ঝুম বড় করে একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
- আমিও যেতে চাই আপু, কিন্তু দেশে যেতে হলে তো প্রজেক্ট এর কাজ আগে সম্পন্ন করতে হবে। যত দ্রুত আমরা এই কাজ শেষ করতে পারবো তত দ্রুত দেশে ফিরতে পারবো। সুতরাং কাল থেকে পুরোদমে কাজে মনোনিবেশ করতে হবে।
শ্রাবণী ঝুমের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। তার বোঝা হয়ে গিয়েছে এখানে থাকা বড় কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়াবে। আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝে ঈশাল তাদের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললো,
- চলো তোমাদের রুম দেখিয়ে দিই। স্পেশালি তোমাদের জন্য সাজানো হয়েছে।
তার কথার মাঝে একটি লোক শ্রাবণী এবং ঝুমের লাগেজ নিয়ে ঢুকলো। ঈশাল লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
- কাকা আপনি একটু কষ্ট করে লাগেজ গুলো দোতলার ডান পাশের একদম শেষের রুমটার আগের রুমে রেখে আসতে পারবেন?
লোকটি ঈশালের কথায় মাথা নাড়িয়ে লাগেজ গুলো নিয়ে উপরে চলে গেল। ঈশাল তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
- আম্মা তাদের খাবারের ব্যবস্থা করুন ততক্ষণে না হয় তারা ফ্রেশ হয়ে নিবে।
- হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তাই করি না হয়। যাওয়ার পথে আপনার ছোট চাচীকে একবার নিচে আসতে বলবেন আমাকে সাহায্য করার জন্য।
- আচ্ছা।
ঈশালের মা ঝুম এবং শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে হালকা একটু হেসে কিচেনের দিকে চলে গেল। ঈশাল তাদের তারা দিয়ে বলল,
- চল চল তোমরা ফ্রেশ হয়ে নেবে তারপর খেয়ে আমরা অনেক আড্ডা দিব।
কথাটি বলে ঈশাল চঞ্চল পায়ে আগে আগে চলল। শ্রাবণী আর ঝুম তাকে অনুসরণ করে তার পিছনে পিছনে যেতে লাগলো। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে একটি লম্বা করিডোর পাওয়া যায়। করিডোরের মাঝ বরাবর সিঁড়ির অবস্থান। ঈশাল তাদের সেই করিডোরের ডান দিকে নিয়ে চলল। করিডোরের একদম মাথায় একটি বড় খোলা জায়গা। হয়তো এটি একটি ছোট ছাদের মতো কিছু, ঝুম বুঝতে পারলো না। তবে এক দেখায় তার সেরকমই মনে হল। তাদের জন্য যে রুমটা বরাদ্দ ছিল ঈশাল তাদের সেই রুমটাতে এনে বললো,
- আজ থেকে তোমরা যতদিন এখানে থাকবে এই রুমটাকে নিজেদের মনে করে থাকবে।
ঝুম মাথা হেসে মাথা নাড়ালো। সে এক নজরে রুমটি ভালোভাবে দেখে নিল। দুজন মানুষ থাকার জন্য একদম ঠিকঠাক। না অত্যাধিক বড় না একেবারে ছোট। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গোছানো একটি রুম। প্রয়োজনীয় সকল কিছুই এখানে রয়েছে। ঝুম পা বাড়িয়ে দক্ষিণের জানালাটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে জানালার পাল্লা গুলো খুলে দিতেই দমকা হাওয়া এসে তার চোখে মুখে লাগলো। দীর্ঘ জার্নির পর মাত্র তার মনে হল সে একটু নিঃশ্বাস নিতে পারছে। ঈশাল এগিয়ে ঝুমের কাছাকাছি দাঁড়ালো।
- ভালো লেগেছে?
ঝুম ঈশালের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে বলল,
- খুব ভালো লেগেছে।
তার উচ্ছ্বল হাসি বলে দিচ্ছে তার ঠিক কতটা ভালো লেগেছে। ঝুমকে খুশি হতে দেখে ঈশালেরও ভালো লাগছে।
- তোমরা ফ্রেশ হয়ে নাও খাবার শেষে আমরা জমিয়ে আড্ডা দিব কেমন?
- আচ্ছা।
ঈশাল হাসিমুখে বেরিয়ে গেল। শ্রাবণী ঈশালকে বেরিয়ে যেতে দেখে হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
- ঝুমি রে এদের বিছানাগুলো তো ভীষণ নরম। ভালই টাকাওয়ালা মাল দেখছি এরা। ঝুম নিজের লাগেজ থেকে একটি শাড়ি বের করতে করতে চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
- ছি আপু ভাষা ঠিক কর।
ঝুম কথাটি বলে আর দাঁড়ালো না ওয়াশরুমে চলে গেল। তার এখন লম্বা একটি গোসলের দরকার। শ্রাবণী তার কথায় আপন মনে বিড়বিড়িয়ে বলল,
- বা রে কি এমন বললাম যে ছি বলল?
—------------
সকাল সকাল শ্রাবণী ও ঝুম তৈরি হয়ে নিচে নামলো। তখন প্রায় সকাল ৯ টা। নিচে নেমে ঈশাল ও তার মাকে ছাড়া কাউকেই দেখতে পেল না ঝুম। নিচে নামতে নামতে ঝুমের মনে পড়ল গতকাল রাতের কথা। যদিও তারা বলেছিল খাবারের পর জমিয়ে আড্ডা দিবে, কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি পরবর্তীতে। যেহেতু তারা দীর্ঘ জার্নির পর ভীষণ ক্লান্ত ছিল তাই মেহেরুন্নেসা তাদের ঘুমাতে আদেশ দিয়ে ছিল। তাছাড়া ঝুম এবং শ্রাবণীও ভীষণ ঘুম পেয়ে ছিল, তাই তাদের আড্ডা গতকালের মতো সেখানেই সমাপ্তি ঘটে।
- শুভ সকাল ঝুমঝুমি, শ্রাবণী।
- শুভ সকাল ঈশাল।
- আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
শ্রাবণী ঈশালের কথার উত্তর দিলেও ঝুম হেসে তার মাকে সালাম জানাবে।
- ওয়ালাইকুমুস সালাম। বসুন আপনাদের খাবার দিচ্ছি।
ফাতিমা কথাটি বলতে বলতে ব্যস্ত পায়ে কিচেনের দিকে চলে গেল। ঝুম এবং শ্রাবণী দুটি চেয়ার টেনে নিজেদের মতো বসে পড়লো। আপন মনে আশপাশ তাকিয়ে ঈশালের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো,
- আর কাউকে যে দেখতে পাচ্ছি না। কাল রাতেও তোমার মাকে ছাড়া তোমার পরিবারের কাউকেই তো দেখা গেল না।
ঈশাল মুখে পরোটা গুজে বলল,
-আসলে বাড়িতে বর্তমানে বিশেষ কেউ নেই। ছোট চাচী আম্মা, বড় চাচি আম্মা, আমার আম্মা, আমি, মিশাল মানে আমার ছোট বোন, আয়ান ছাড়া কেউই নেই। বাবা-চাচারা ব্যবসার কাজের জন্য করাচির বাইরে রয়েছে। বড় ভাইজান ক্যাম্পে রয়েছে, ছোট ভাইজান ইমারজেন্সি একটি কেসের জন্য ইসলামাবাদে গিয়েছেন। আর দাদাজান-দাদিজান আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে। তারা আজই চলে আসবেন ইনশাআল্লাহ।
- ও।
ঝুম এত সময় তাদের দুজনার কথা মনোযোগ সহকারে শুনছিল। তাদের কথার মাঝে ঈশালের মা হাতে খাবার নিয়ে প্রবেশ করল। ঝুম লক্ষ্য করল তার পিছু পিছু একজন অত্যন্ত সুন্দরী মহিলা হাতে খাবারের ট্রে সমেত তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কৌতুহলী ঝুম তার দিকেও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার বুঝে আসে না এরা এত সুন্দর কি খেয়ে হয়? এই বাড়িতে আসার পর থেকে যতগুলো নারীর সাথে তাদের পরিচয় হয়েছে সকলেই ভীষণ সুন্দরী। ভদ্রমহিলা তাদের নিকট এগিয়ে এসে ভীষণ সুন্দর একটি হাসি দিয়ে বলল,
- আসসালামু আলাইকুম। আমি রুবাইতা। এ বাড়ির ছোট বউ। গতকাল আপনাদের সাথে দেখা করতে পারিনি বলে আমাকে ভুল বুঝবেন না।
যতটা সুন্দর দেখতে তিনি তার থেকেও বেশি সুন্দর তার ব্যবহার। ঝুম মুগ্ধ না হয়ে পারলো না। রুবাইতা নামক সুন্দরী মহিলার স্নিগ্ধ হাসিতে সে হারিয়ে গেলো।
- না না কোনো ব্যাপার না। আমরা আসতেই তো অনেক দেরি করে ফেলেছিলাম। এতে আপনার কোনো দোষ নেই। আমি শ্রাবনী।
শ্রাবনী খুব সুন্দর ভাবে পরিবেশ সামলে নিলো। রুবাইতা হেসে তাদের খাবার এগিয়ে দিয়ে ঝুমকে উদ্দেশ্য করে বললো,
- আর আপনি বুঝি ঝুম?
ঝুম মাথা নাড়িয়ে ছোট করে হেসে সায় জানালো।
- আপনাদের কথা সেই ভোর থেকে ঈশাল বলে যাচ্ছে আমাদের সকলের কাছে। তার আপনাদের দুজনকে দারুন লেগেছে। আশা করি পাকিস্তানে আপনাদের সময় সুন্দর কাটবে। মন দিয়ে কাজ করবেন। কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে জানাতে দ্বিধা করবেন না।
বাড়ির প্রত্যেকটি মানুষই কি এত ভালো? এরা এত মিষ্টি করে কথা কিভাবে বলে? এভাবে আপন করে নেয় কিভাবে?
- উফফ ছোট চাচিআম্মা, কথা বাড়িয়ো না। দ্রুত খাওয়া শেষ করে অফিসের জন্য বের হতে হবে। নাহলে তোমার বড় ঝা আমাদের ঢুকতে দিবে না ভুলে যাচ্ছ কেন?
ঈশালের কথায় তার মা এগিয়ে এসে ঈশালের বাহুতে ধীরে একটি চড় লাগিয়ে বললো,
- সে তোমার বড় হয় ঈশাল। এভাবে বলতে হয় না।
ঈশাল অবশ্য বিশেষ পাত্তা দিলো না সেই কথার। সে যাই বলুক মেহেরুন্নেসাকে সে নিজেও খুব মান্য করে। তাছাড়া যখন তাদের পরিবারের পাশে কেউ ছিল না তখন এক মেহেরুন্নেসাই পুরো পরিবারকে একা হাতে আগলে রেখেছিলো। ঝুম এবং শ্রাবনী নীরব হয়ে তাদের পারিবারিক খুনসুঁটি উপভোগ করলো। যদিও শ্রাবনীর তাদের কথার থেকে খাবারের প্রতি মনোযোগ বেশি ছিল। সে পাকিস্তানিদের এখনো বিশেষ পছন্দ করে না কিন্তু এদের খাবার খুব সুস্বাদু হয় মানতেই হবে। তারা খেয়ে দ্রুত অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলো। ঢাকার মতো অনেক জ্যাম না হলেও এখানে কম জ্যাম নেই। ঈশাল আজও নিজে ড্রাইভ করছে। তার পাশে শ্রাবনী বসে ফোনে কিছু একটা করে যাচ্ছে। ঝুম তাদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকালো। সকলে ব্যস্ত। যে যার কাজের উদ্দেশ্যে ছুঁটছে। কিছুক্ষন পরপর জ্যামের কারণে গাড়ি থামাতে হচ্ছে বলে ঈশাল ভীষণ বিরক্ত। গরমে অবশ্য শ্রাবনীও বিরক্ত কিন্তু ঝুমের অদ্ভুত ভাবে ভালো লাগছে। সে জানালার ওপর হাত রেখে তার ওপর মাথা রেখে নির্নিমেষ মানুষের ব্যস্ততা দেখছে। নতুন একটি দেশ, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ তাকে প্রভাবিত করছে খুব। দীর্ঘ ৩০ মিনিটের বেশি সময় জ্যামে বসে থাকার পর তাদের গাড়িটি একটি সুউচ্চ দালানের আঙিনায় প্রবেশ করে। ঈশাল তার অভ্যস্ত পায়ে গাড়ি থেকে নেমে শ্রাবনী ও ঝুমের উদ্দেশ্যে বললো,
- চলে এসেছি। নেমে এসো।
ঈশালের বলতে দেরি হলেও শ্রাবনীর নামতে দেরি হলো না। ঝুম অবশ্য ধীরে-সুস্থে নামলো। তারা বর্তমানে পার্কিং এরিয়াতে রয়েছে। ঝুম গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালে ঈশাল তাকে এবং শ্রাবনীকে টেনে অফিসের দিকে পা বাড়ালো। যেতে যেতে ঝুম আশপাশটা নিখুঁত নজরে পর্যবেক্ষণ করতে ভুলল না। ১৫ তলার বিশাল বড় দালানটির সামনে দাঁড়িয়ে ঝুম হা করে তাকিয়ে। ঈশালের ভাষ্য মতে এই সম্পূর্ণটা জুড়ে হাম নিউসের নিজস্ব অফিস। প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা আলাদা ফ্লোর রয়েছে এখানে। তারা সরাসরি ৮ তলায় গেলো। দালানটির ৭ এবং ৮ তলা মিলে স্পোর্টস ইউনিট। অর্থাৎ এখানে যত মানুষ কাজ করে সকলে খেলাধুলা বিষয়ক সংবাদ নিয়ে কাজ করে। এত বড় বিল্ডিংএর পুরোটা জুড়ে অফিস শুনে ঝুম, শ্রাবনী ভীষণ অবাক হয়ে ছিল। অবাক হয়ে ঝুম ঈশালকে প্রশ্ন করে বসে ছিল,
- পুরোটা অফিস?
ঈশাল তখন হেসে উত্তর দিয়ে ছিল,
- বলতে পারো। কয়েকটি ফ্লোরে এমপ্লয়িরা কাজ করে আর একটি ফ্লোরে ক্যান্টিন, একটিতে ফ্রি টাইম কাটানোর জন্য ইনডোর গেমিং ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে। আর কিছু ফ্লোর অফিসের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়।
শ্রাবনী ওদের কথা মন দিয়ে শুনছিলো এতক্ষন। কিন্তু ইনডোর গেমিং এর কথা শুনে নিজের কৌতূহল সামলে রাখতে পারলো না। কোনো অফিস যে এতটা সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে তার জানা ছিল না।
- অফিসে গেম খেলার ব্যবস্থা?
- হ্যা। চাচীআম্মার মতে কাজ করতেও মানসিক শান্তির দরকার হয়। একটানা কাজ করা কখনোই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। তাছাড়া কাজ করতে আনন্দ না পেলে সেই কাজ সুন্দর ও হয় না। আর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতে কিছু ইউনিটকে রাত-ভোর অফিসে থাকতে হয়। তার জন্য ও বলতে পারো।
ঈশাল সামনে আগাতে আগাতে কথা গুলো বলছিল।
- বাহ্ দারুন তো। কোনো কোম্পানি বুঝি এমপ্লয়িদের ব্যাপারে এত ভাবে? আমাদের বস তো পারলে ২৪ ঘন্টা গাঁধার মতো খাটিয়ে নেয়।
ঈশাল শ্রাবনীর কোথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ঝুম, শ্রাবনী তার পিছু পিছু ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। শ্রাবনী ঈশালের কথা মনোযোগের সাথে শুনলেও ঝুমের নজর আশেপাশে। সকলে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। এদিকে তাদের কোনো মনোযোগ নেই। বিষয়টি আসলেই প্রশংসনীয়।
- হাই ঈশাল।
- হেই জারা।
দূর থেকে একটি মেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে ঈশালকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বললো।
- ম্যাম যাদের কথা বলছিলো এরা কি তারা? ফ্রম বাংলাদেশ?
ঈশাল একবার ঝুম ও শ্রাবনীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে জারাকে বললো,
- হ্যা। ও ঝুমঝুমি আর ও শ্রাবনী। আইডি কার্ড গুলো নাকি তোমার কাছে?
- হ্যা।
কথাটি বলে জারা নামের মেয়েটি ছুঁটে নিজের ডেস্কে গিয়ে মুহূর্তে আবার ফিরেও এলো। হাতে তার দুটি আইডি কার্ড। সে ভীষণ আন্তরিকতার সাথে ঝুম ও শ্রাবনীকে তাদের আইডি কার্ড ও ওদের কাজ বুঝিয়ে দিল। প্রয়োজনীয় টুকটাক কথার মাধ্যমে ঝুম জানতে পারল, ঈশাল শোবিজ ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। তার মানে ঝুম ধরেই নিয়েছিল ঈশালের সাথে তাদের জার্নি এখানেই হয়তো সমাপ্ত। মেয়েটাকে তার ভালো লাগা শুরু করেছিল। মনে মনে একটু দুঃখও পেল বটে। কিন্তু তাই সেই দুঃখ বেশিক্ষণ টিকলো না। কারণ ঈশাল নিজ উদ্যোগে জানালো, ঝুমরা এখানে যতদিন রয়েছে ঈশাল ততদিন তাদের সাথে থাকবে। এটা সে বিশেষ ভাবে মেহেরুন্নেসাকে বলে অনুমতি নিয়েছে। তার এই বক্তব্যে ঝুম, শ্রাবনী দুজনই ভীষণ খুশি হলো। পুরোটা দিন কেটে গেল অফিস ঘুরে, কাজ বুঝতে বুঝতে। নতুন জায়গা, নতুন কাজ বুঝে নিতে কেন যেন ঝুমের একটু বেশিই সময় লেগে গেল।
এর ঠিক দুদিন পরের কথা। ঝুম, শ্রাবনী ও ঈশাল বসে আছে ন্যাশনাল ব্যাংক ক্রিকেট আরেনা স্টেডিয়ামের দর্শক সারিতে। গত দুদিন চেষ্টা করেও কোনো ভাবে পাকিস্তান টিমের সাথে দেখা করতে পারেনি ঝুম। টাইমের কোচ কোনো ভাবেই অনুমতি দেয়নি। সে চায় না ম্যাচের পূর্বে কোনো রিপোর্টারের সাথে প্রশ্নের সম্মুখীন হোক খেলোয়াড়রা। যদিও ঝুম চাইলেই মেহেরুন্নেসার সাহায্য নিতে পারত, কিন্তু সে কাজগুলো একান্ত নিজস্ব ভাবে করতে চায়। যেমনটা সে দেশে থাকতে করত ঠিক তেমনভাবে। মাঠে পাকিস্তান বনাম ইংল্যান্ডের খেলা চলছে। এক কথায় হাড্ডা হাড্ডি লড়াই যাকে বলে। ইংল্যান্ড শুরুতে ব্যাটিং করে ২০৩ রান করে পাকিস্তানকে ২০৪ রানের টার্গেট দিয়ে বসে আছে। এত সময় ঝুম মাথায় হাত দিয়ে বিরক্তের সাথে চোখ মুখ কুঁচকে বসে ছিল। তার রীতিমত ঘুম পাচ্ছিল। একবার সে অদ্ভুত ভাবে ঘুমিয়েও পরে ছিল। তার ঘুম ভাঙ্গে শ্রাবণীর বাজখাঁই গলার চিৎকারে। ঝুম তখন ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠেছিল। সম্ভবত পাকিস্তানের কোনো খেলোয়াড় আউট হয়েছিল বলে শ্রাবনী এত খুশি ছিল। তার সেই হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে ঈশাল ভয়ানক রেগে গিয়ে ছিল তখন। শ্রাবনী ইংল্যান্ডের সাপোর্টার, আর ঈশাল পাকিস্তানের। এদের দুজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতে বেচারি ঝুমের আর ঘুম হলো না। এখন খেলার শেষ সময় চলছে। দু বলে ১০ রান। খেলায় টানটান উত্তেজনা। ঝুম নিজেও এখন নড়েচড়ে বসেছে। অদ্ভুত ভাবে সে দেখতে চায় কে যেতে। স্টেডিয়াম জুড়ে থমথমে ভাব। নিঃশ্বাসও যেন সকল বন্ধ করে বসে আছে। সকলের মুখে মুখে প্রার্থনার বুলি। ঝুম নিজেও নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে। যদিও তারা খেলার মাঠে বসে আছে, তবুও দৃষ্টি সামনের বড় মনিটরে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ইংল্যান্ডের একজন খেলোয়াড় বল হাতে দৌঁড়ে আসছে। বিপরীতে হেলমেট পরা পাকিস্তানের একজন খেলোয়াড় শক্ত হাতে বাজপাখির দৃষ্টিতে বলের দিকে তাকিয়ে। বলটি যেই না ব্যাটের কাছে পৌঁছালো ওমনি তা উড়ে বিশাল আকাশের বুকে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়াম জুড়ে উল্লাসের ধ্বনি শুনল ঝুম। মাইকে শোনা গেল মাত্র ৬ রান অর্জন করেছে পাকিস্তান টিম। মনিটরে দেখা মিলল শাইয়ান রেহমান আনসারী নামের পাশে ৬ রান যোগ হয়ে সংখ্যা দাঁড়ালো ৬৭ রানে। ঝুম বুঝলো এই লোকই তাহলে পাকিস্তান টিমের ক্যাপ্টেন। তার ভাবনার মাঝে আবারো দেখা গেল বল হাতে ছুটে আসছে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়। পাশে ঈশাল বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে যাচ্ছে। ঝুম নিজেও চিন্তিত। কি হবে তার ধারণা নেই। এই প্রথম সে খেলা নিয়ে এতটা উত্তোজিত হলো। পাকিস্তান টিমকে জিততে হলে আর মাত্র ৪ রানের প্রয়োজন। ১ বলে ৪ রান, আদোও কি পারবে পাকিস্তান জিততে?
চলবে____