ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

৭ম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–০৭

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

আজ সপ্তাহের ছুটির দিন। বাড়িতে মোটামুটি সবাই রয়েছে। গত এক সপ্তাহে আশ্চর্যজনক ভাবে একবারও শাইয়ানের সাথে আর ঝুমের দেখা হয়নি। ছেলেটা লুকিয়ে আছে সেই থেকে। অন্যদিকে আহিরের সাথে প্রায়ই ঝুমের দেখা হয়। ছেলেটা ঝুমকে অযথাই বিরক্ত করে। ঝুম কিছুই বলে না। নিশ্চুপে সহ্য করে যায়। এতেই যেন আহির আরো পেয়ে বসে। যখন যখন দেখা হবে মেয়েটাকে এটা-সেটা বলে হয়রান করে ছাড়বে। এইতো সেদিনের কথা। বিকেলের দিকে ক্লান্ত হয়ে ঝুম, শ্রাবণী বাড়ি ফিরে ছিল। ঈশাল তখনো অফিসে কিছু কাজের জন্য রয়ে গিয়েছিল। তার ফিরতে সন্ধ্যা হবে বলে ঝুমরা আগেই চলে আসে। ঠিক সেই মুহূর্তে বসার ঘরে ওদের সাথে আহিরের দেখা হয়। এই ছেলে আজকাল প্রায়ই বাড়িতে থাকে। কারণ কি? ঝুম শুনেছে সে নাকি ডাক্তার। তার জানা মতে ডাক্তারদের নিঃশ্বাস নেয়ার সময় হয় না। তবে এই ছেলে এত ফ্রি সময় কোথায় পায়? হাসপাতালের থেকে একে বাড়িতেই তো বেশি সময় দেখা যায়। মুখে না বললেও ঝুম আহিরের ওপর ভীষণ বিরক্ত। বখাটেদের মতো তাকে জ্বালাতন করে বলে মাঝে মাঝে সে আপন মনে আহিরকে প্রায়ই বখাটে বলে থাকে। ঝুম ওর সাথে কথা বলতে চাইলো না। যত দ্রুত সম্ভব আহিরের দৃষ্টির বাইরে যেতে চাইলো। কিন্তু আহিরের তা সহ্য হলো না। আহিরের ভীষণই খারাপ স্বভাব সে সকলের পিছনে লাগে। আন্ডা-বাচ্চাদের রাগাতে, বিরক্ত করতে তার মন আনন্দ পায়। সে বাড়ির সকল ছোট সদস্যদের বিরক্ত করেই দিন কাটায়। এদের মাঝে তার সব থেকে মজা লাগে ঝুমকে বিরক্ত করতে। মেয়েটা এত শান্ত! ভীষণ ভীষণ শান্ত মেয়েটাকে আহির যাই বলুক না কেন বিপরীতে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া করে না। বেশি হলে একটু ভ্রু তুলে নাক ফুলায়। কিন্তু আহিরের সাথে কথা বলে না। যত দিন যাচ্ছে তত আহির বুঝতে পারছে কেন শাইয়ান এই মেয়েকে এত পছন্দ করে। আহির হাসি হাসি মুখে ঝুমের থেকে চোখ সরিয়ে ওর পাশে দাঁড়ানো শ্রাবণীর দিকে তাকালো। এই মেয়েকে আহিরের শুরু থেকেই পছন্দ না। বড্ড অগোছালো জংলী লাগে। সর্বদা শার্ট, প্যান্ট পরে থাকে। চুলের শ্রীও বড় করুন। মেয়ে সুলভ কোনো আচরণ তার মাঝে এখনো আহির লক্ষ্য করেনি। উল্টো দেখা হওয়ার পর থেকে আহিরের সাথে এই মেয়ের তিনবার ঝগড়া হয়ে গিয়েছে। ভয়ানক মেয়েটা। আহিরের মতো ছেলে নাজেহাল হয়ে পড়ে ওর সামনে। শ্রাবনী যে বিশেষ পছন্দ করে ওকে তেমনও না। তার ঝুমিকে বিরক্ত করে এই ছেলে কত বড় সাহস! একে তো পাকিস্তানি বলে শ্রাবনী সর্বদা চেতে থাকে তারওপর ঝুমকে জ্বালায় বলে আরও দেখতে পারে না। আদায়-কাঁচকলায় লেগে থাকে দুজনের। আহির শ্রাবণীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল ভীষণ অবজ্ঞার সাথে। মাথার লম্বা বাবরি চুলগুলো দুহাতে ঠেলে পিছনে নিয়ে ঝুমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-কি অবস্থা ঝুম?

ঝুম ওকে না দেখার মতো করে চলেই যাচ্ছিল। পথিমধ্যে আহিরের কথায় থেমে গেল। মেয়েটা মুখ ভার করে নিল সাথে সাথে। এখন আবার এই ছেলে তার পিছু লাগবে। উফ, কী যে অসহ্য! ও চোখমুখ কুঁচকে উত্তর দেয়ার পূর্বে শ্রাবনী নিজ উদ্যোগে বলল,

-চোখে কম দেখেন? দেখতেই তো পাচ্ছেন অফিস থেকে ফিরছি আমরা। কোন আক্কেলে আবার প্রশ্ন করেন?

আহির চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে। এই মেয়ের কথার মাঝে বাম হাত ঢুকানোর মহা সমস্যা রয়েছে। তাছাড়া কথার টোন মাশাআল্লাহ। ঝুমকে কিছু বললেই তার উত্তর শ্রাবণী দিয়ে দেয়। শ্রাবণী ঝুমের আশেপাশে থাকলে আহির শান্তি পায় না। এত সময় আহির সোফায় বসে ছিল। ছাই রঙ্গা ট্রাউজারের সাথে নেভি ব্লু টি-শার্টে তাকে দারুণ মানিয়েছে। ছেলেটা অত্যধিক ফর্সা কি না! গাঢ় রংগুলো বেশি ফুটে ওঠে শরীরে।

-তোমাকে প্রশ্ন করেছি? যাকে করেছি তার কি মুখ নেই?

টেরা চোখে ঝুমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল আহির। তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। এই মেয়ে অতিরিক্ত করে খুব। সে সবাইকে জ্বালাতন করবে, তাকে কেন কেউ জ্বালাতন করবে হুম? শ্রাবণী ওর থমথমে মুখকে পাত্তাই দিলো না। উল্টো ঝুমেকে নিজের পিছনে আড়াল করে দাঁড়িয়ে পরে বললো,

-অবশ্যই আছে। থাকবে না কেন আজব? চোখ কি খুলে পকেটে রেখেছেন? দেখতে পান না? আর তাছাড়া আমার ঝুমি যার-তার সাথে কথা বলে না বুঝেছেন?

আহির হতম্ভব। তাকে যার-তার বলল? তাকে? কত বড় সাহস এই মেয়ের! সে কি জানে সে ঝুমের কি হয়? হাহ, অবুঝ মেয়ে মানুষ। একবার শুধু ঝুমকে তারা স্থায়ীভাবে তাদের কাছে রেখে দিক, তারপর দেখবে আহির এই মেয়ে কত বড় বড় কথা বলতে পারে। ঝুম সেই থেকে এদের ঝগড়া দেখছে। সে বড্ড ক্লান্ত। অথচ ওদের দেখে মনে হচ্ছে না আজ আর ওদের ঝগড়া থামবে। তাছাড়া ঝুম একটা জিনিস খেয়াল করেছে। আহির তাকে আপনি করে বললেও শ্রাবনীকে সেই শুরু থেকে তুমি করে বলে। তাছাড়া শ্রাবণীর সামনে আহির কথায়ও পারে না। বেচারা নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে তখন। আহির রেগে গিয়েছে। সে আঙুল তুলে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু তার পূর্বে ঝুমের ক্লান্তিতে ভরা মিনমিনে কন্ঠ শুনতে পারল।

-আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। বাকি ঝগড়া কি নেক্সট টাইমের জন্য তুলে রাখা যায়?

শ্রাবনী আহিরের দিকে রাগ রাগ চোখে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে রাজাকারের বাচ্চা উচ্চারণ করল। এরপর আহিরকে কিছু না বলেই ঝুমকে নিয়ে চলে গেল। এদিকে আহির ভীষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। ঝগড়া আবার নেক্সট টাইমের জন্য তুলে রাখা যায়? কি আশ্চর্য! সে আগে তো কখনো এমন কথা শোনেনি। সে তার অবাকতা লুকিয়ে রাখতে না পেরে সেই মুহূর্তে উপস্থিত হয় শাইয়ানের কাছে। একে একে সকল কিছু খুলে বলার পর শাইয়ান ভারী আওয়াজে তার সাথে বেইমানি করে বলল,

-নেক্সট টাইম ওনাকে বিরক্ত করলে আমি তোমাকে বল ভেবে ব্যাট দিয়ে পেটাবো আহির।

এত বড় কথাটি বলার পরও শাইয়ান ছিল নির্বিকার। অথচ আহির ভাঙ্গা মন নিয়ে করুন কন্ঠে বলল,

-বাহ রে, আজ আমি পর হয়ে গেলাম? বউ পেয়ে ভাইকে ভুলে গেলে?

শাইয়ান ওর কথায় কপাল কুঁচকে থমথমে গলায় বলল,

-কে বউ?

-কেন ঝুম।

-আমার?

শাইয়ান যেন বুঝতে পারছে না কি বলছে আহির। তাদের বিয়েটা হলো কবে আবার? আহির ওর কথায় ভারী বিরক্ত। একে তো যে কারণে এলো তার কিছুই হলো না। আবার শাইয়ানের অবুঝ অবুঝ কথায় তার মাথা ধরে যাচ্ছে। সে অনেকটা বিরক্ত হয়েই বলল,

-না আমার।

আহির যদিও এত কিছু ভেবে বলেনি। সে এমনিই কথার কথা বলে দিয়েছে। কিন্তু শাইয়ান মুহূর্তে ক্ষেপে গেল। ভয়ানক এক ঝাড়ি মেরে বলল,

-আহির, হাড়গোড় ভেঙে প্যাকেট করে রাখবো তোমাকে, পাজি ছেলে। আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও এখনই। নয়তো আমি তোমাকে কি করবো নিজেও জানি না।

আহির থতমত খেয়ে গিয়েছে। কি বলেছে এখন বুঝতে পারল বেচারা। মাথা চুলকে থেমে থেমে বলল,

-সরি, আসলে ওভাবে বলতে চায়নি।

শাইয়ান মানতে নারাজ। তার অসহ্য লাগছে বর্তমানে আহিরকে। কয়েকটা শক্ত ঘুষি মারতে পারলে কি শান্তি পাবে? এমন এক কথা কিভাবে বলল তার সামনে? শরীর জ্বলে যাচ্ছে পুরো। সে কপাল কুঁচকে বিকট শব্দে বলল,

-আউট।

আহির কথা বাড়ালো না। বর্তমানে এখানে থাকা মানে রিস্ক। চুপচাপ কেটে পড়তে পারলেই যেন বাঁচে। দরজা পর্যন্ত যাওয়ার পর ভেসে এলো শাইয়ানের হুমকি।

-নেক্সট টাইম তার সামনে গেলেও মায়ের পেটের আপন বোনের নজরে তাকাবে। আমি আমার ওয়ার্ড রিপিট করবো না আহির। মনে থাকে যেন।

আহির একবার বলতে চাইল তার তো আপন বোন নেই। কিন্তু শাইয়ানের রাগের ভয়ে বলা হলো না। এই শাইয়ান মোটেও সুবিধার না। এমনিতে ঠিকঠাক কিন্তু রেগে গেলে তখন কি করে বসে ঠিক নেই। নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। সেখানে আহির তো সুস্থ-সবল ছেলে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে আহির নিচে নেমে আসছিল। বসার ঘরে মেয়েদের মজলিস বসেছে। আজ এখানে সবাই রয়েছে। গতকাল শাইয়ানের দাদা-দাদি ফিরেছে। আহির লক্ষ্য করলো ঝুম ঠিক মেহেরুন্নেসার পায়ের কাছে বসে। ভীষণ মনোযোগের সাথে কিছু একটা শুনে যাচ্ছে ফাতিমার কাছ থেকে। আহির আরো কিছুটা কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো। শুনতে পারলো সকলে খুব রসিয়ে রসিয়ে মেহেরুন্নেসার জীবন কাহিনী বলছে।

-তার মানে বড় আন্টি বাংলাদেশী?

ঝুমের বিশ্বাস হচ্ছে না। সে মাত্রই জানতে পারলো মেহেরুন্নেসার জন্ম বাংলাদেশে। ঝুম মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো। মেহেরুন্নেসার ঠোঁটের কোনে সামান্য হাসি। ঈশাল, মিশাল, ঝুম, শ্রাবনী সকলেই মেঝেতে বসে। আর বড়রা সোফায় বসে আছে। সামনে টিভিতে একটি পাকিস্তানি ড্রামা চলছে কিন্তু বর্তমানে সেসবে কারো ,মনোযোগ নেই। ঝুমের প্রশ্নে ফাতিমা হেসে মাথা নাড়ালো। ঈশাল ছটফটিয়ে উঠলো নিজ স্থান থেকে। হড়বড়িয়ে নিজে থেকে বলল,

-দেশ বিভাগের পর পর বড় চাচিআম্মারা পাকিস্তানে চলে আসে। তখন বড় চাচিআম্মা বেশ ছোট ছিল। তাই না বড় চাচিআম্মা।

ঈশাল মেহেরুন্নেসাকে প্রশ্ন করে বসলো। মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি ঝুমের ওপর। মেয়েটা ক্ষনে ক্ষনে অবাক হচ্ছে। সেই দৃষ্টি, অবাক হওয়া মেহেরুন্নেসার কাছে দারুন লাগছে। সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই ঝুমের চোখ বড় হয়ে গেল। কৌতূহলী সে আরো কিছু জানতে চাইছে। একমুহূর্তের জন্য আহিরের মনে হলো শাইয়ান এবং তার মা উভয়ই ঝুমের দিকে একই দৃষ্টিতে তাকায়।

-আপনি কি বাংলা বলতে পারেন?

শ্রাবনীর করা প্রশ্নে মেহেরুন্নেসা মৃদু আওয়াজে বলল,

-হুম।

-সত্যি?

ঝুম অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে। মেহেরুন্নেসা সামান্য হেসে মাথা নাড়ালো। ঝুম সবাইকে অবাক করে দিয়ে আস্তে করে বললো,

-আল্লাহ! তার মানে আমি আর আপু বাংলায় যা বলতাম আপনি সব বুঝতে পারতেন?

মেহেরুন্নেসা মাথা দুলিয়ে হাসলো। সাথে সাথে শ্রাবনী মুখে হাত দিয়ে বসলো। সে মেহেরুন্নেসাকে নিয়ে অনেক কিছু বলেছে। মহিলা কি সবটাই বুঝেছে নাকি? এই যাহ, কেস খেয়ে গেল তো। ঝুমও মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। ওদের প্রতিক্রিয়া দেখে বাকিরা একচোট হাসাহাসি করে ফেলল। দূর থেকে আহিরও মুখ লুকিয়ে হাসলো। অতঃপর হঠাৎ তার মাথায় দারুন এক দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে গেল। ছাদের দিকে তাকিয়ে মিচকে হেসে সকলের সামনে ঝুমকে বললো,

-ঝুম, আমার সাথে একটু আসুন তো। কাজ কথা আছে আপনার সাথে।

ঝুম ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আহিরকে দেখেই নাকমুখ কুচকালো। এই ছেলের আবার তার সাথে কিসের কাজের কথা?

-কি হলো আসুন দ্রুত।

শ্রাবনী প্রতিরোধ করতে চাইলো কিন্তু তার মাঝে মেহেরুন্নেসা নিজেই ঝুমকে বললো,

-যান, গিয়ে শুনে আসুন হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু। নয়তো সে এভাবে ডাকতো না।

ঝুম মুখটা লটকে নিলো। তার মোটেও যেতে ইচ্ছা করছে না। এই ছেলে সুযোগ পেলেই তাকে পচানি দেয়। যদিও আহির আর যাই করুক না কেন তাকে কখনো অসম্মান করেনি। এদিক থেকে সে নিশ্চিন্ত, তবুও ঝুম নিশ্চিত এই ছেলে কোনো কাজের কথা নিশ্চয়ই বলবে না। মন মরা হয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো আহিরের দিকে। আহির ওকে আগাতে দেখে নরম গলায় বলল,

-ফলো মি।

এরপর সে দাঁড়ায়নি। ঝুম ছোট ছোট পায়ে আহিরকে অনুসরণ করতে লাগলো। ঈশালদের এই বাড়িটি দোতলা ডুপ্লেক্স হাউস। তিনতলায় একটি ছাদ রয়েছে যার সম্পর্কে ঝুমের কোনো ধারণাই ছিল না। ছাদের দরজার কাছে এসে হঠাৎ আহির দাঁড়িয়ে পড়লো। ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝুমকে পা থেকে পর্যন্ত দেখে নিয়ে বললো,

-আপনি ছাদে যান আমি গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস নিয়ে আসতে ভুলে গিয়েছি।

ঝুম একবার জানতে চাইলো কি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এবং তাকে কেন এখানে নিয়ে আসার কারণ কি? কিন্তু স্বল্পভাষী হওয়ার দরুন মেয়েটা মুখ ফুটে জানতে পারলো না। মাথা নাড়িয়ে শুধু সম্মতি জানালো। যদিও আহির নিশ্চিত ছিল ঝুম বাড়তি কোনো প্রশ্ন করবে না, তবুও মনে মনে সে খুশিই হলো। আজকাল এমন মেয়ে পাওয়া বড় দুস্কর। সে দাঁড়ালো না ওখানে। বড় বড় পায়ে ঝুমের সামনে থেকে নিচে চলে গেল। আহির যাওয়ার পরও ঝুম একই জায়গাতে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে রইলো। নড়লো না এক পাও কোথাও। অনবরত মেঝের সাথে পায়ের নখ লাগিয়ে খুঁটতে লাগলো। এখন সন্ধ্যা রাত। প্রায় সাতটার বেশি বাজে। এই সময়ে একা মেয়ে ছাদে যেতে তার একটু ভয় করছে। যতই সে আধুনিক যুগের মেয়ে হোক না কেন জ্বীনের প্রতি বিশ্বাস নেই। বেশ কিছুক্ষণ দোনামোনা করে অবশেষে ছাদের দরজা থেকে পা রাখলো ছাদের মেঝেতে। সাথে সাথে মৃদু ঠান্ডা হাওয়া এসে ধাক্কা দিলো ঝুমকে। ঝুম চোখ বন্ধ করে নিলো। অদ্ভুত এক শান্তি লাগছে। এই একাকিত্ব, শান্তি, হাওয়া তার বড্ড বেশি ভালো লাগছে। ঝুম ধীরে ধীরে চোখ খুলে চাইলো। হালকা আলোতে ছাদে থাকা কয়েকটি ছোট গাছ চোখে পড়লো। ঝুম পা বাড়িয়ে ছাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো। এখান থেকে করাচি শহরের ব্যস্ততা স্পষ্ট দেখা যায়। রাতের আঁধারে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা আলোগুলো দেখতে বড় মনোমুগ্ধকর লাগছে। হালকা শীত শীত অনুভব হওয়ায় হঠাৎ করেই শান্তিতে ঝুমের ঘুম পেল। মন চাচ্ছে একটা পাটি, কথা ও বালিশ নিয়ে এখানে ঘুমিয়ে পড়তে। ইশ ভাবলেই তার ঘুম গাঢ় হচ্ছে যেন। আকস্মিক ঝুমের কানে কিছু শব্দ ভেসে এলো। সম্ভবত কিছু একটাতে বাড়ে বাড়ে আঘাতের শব্দ। কথা থেকে আসছে? আগে থেকেই ছিল নাকি এখন হচ্ছে? আহির কি চলে এসেছে? শব্দটা কি সে করছে? একটু ভয় পেল ঝুম। শব্দটা ছাদের অপর পাশে হতে আসছে। সেখান থেকে আলোও ভেসে আসছে। ঝুম তার শরীরে জড়ানো হালকা গোলাপি রঙের শাড়ির আঁচলটা কাঁধে জড়িয়ে নিলো ভালো ভাবে। অতঃপর সাহস করে পা বাড়ালো সেই শব্দের দিকে। কাছাকাছি গিয়ে দেখতে পেল সেই ক্রিকেটের একটি দড়িতে ঝুলানো বলকে ব্যাট দ্বারা অনবরত পিটিয়ে যাচ্ছে। এক একটি আঘাত শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে দিচ্ছে। কালো ট্রাউজার, কালো টি- শার্ট পরনে ঘেমে অস্থির সে। তবুও থামছে না। যতবার সে ব্যাট দিয়ে বলটিকে হিট করছে ততবার বাহুর রগগুলো ফুলে ফুলে উঠছে, যেন একটু হলেই ছিঁড়ে যাবে। মুখের শক্ত, কঠিন চোয়াল দেখে মনে হচ্ছে কোনো বিষয় নিয়ে রেগে আছে। যে দড়ি দিয়ে বলটি বাধা, সেটি প্রায় ছিঁড়ে এসেছে। না জানি কত সময় ধরে এভাবে মেরে যাচ্ছে! ঝুম মিনিট পাঁচেক সেখানে দাঁড়িয়ে শাইয়ানের কাজ দেখলো। নিজের অজান্তে মেয়েটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শাইয়ানকে দেখে গেল। বুঝলো শাইয়ান দেখতে তার মায়ের মতো হয়েছে। লম্বা, ফর্সা, বলিষ্ট দেহ বিবেচনায় তাকে এক দেখায় সুপুরুষের কাতারে ফেলা যায়। হঠাৎ ঝুমের খেয়াল হলো সে একজনকে তার অনুমতি ব্যাতিত লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে যা একদম ঠিক না। সে নিজেকে ধমকে সেখান থেকে সরতে চাইলো। কিন্তু আকস্মিক সাইয়ানের বলটা ছুটে এসে ঝুমের বাহুতে আঘাত করলো। অন্যান্য সাধারণ বলের থেকে এই বল হয়তো অনেক বেশি শক্ত, এবং শাইয়ানের প্রয়োগকৃত শক্তির কারণে ভীষণ গতিতে এসে লেগেছে। যার ফলে ব্যথায় ঝুম সাথে সাথে কেঁদে ফেলল। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ব্যথাতুর শব্দ। সে বাহুতে হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো। শাইয়ান অবাক। এতটাই অবাক যে ব্যাপারটা কি হলো বুঝতে ওর কয়েক মুহূর্ত লেগে গেল। ব্যাট হাতে মুখ হা করে ঝুমের কান্না দেখতে লাগলো। ঝুম ভালোই ব্যথা পেয়েছে। কেঁদে মুখ লাল করে ফেলেছে একদম। নরম তুলতুলে শরীরে অমন শক্ত বলের আঘাত পেলে যে কেউ কাঁদবে।শাইয়ান যখন বুঝতে পারলো ব্যাপারটা তখন সে ব্যাট ফেলে ছুটে ঝুমের কাছে চলে এলো। তার চোখেমুখে আতঙ্ক, ব্যথা। ঝুমকে ধরতে চেয়েও হাত সরিয়ে নিলো। কোনো এক বাধা, সংকোচবোধ তাকে বারবার ঝুমকে ছুঁতে বাধা দেয়।

-ঠিক…আপনি ঠিক আছেন আরীবা।

শাইয়ানের কণ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। মাত্র কয়েক পলকের মাঠে ছেলেটার নাক লাল হয়ে এসেছে। ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। বারবার ঢোক গেলার ফলে গলার উঁচু হাড়টা ওঠা-নামা করছে বারে বারে। শাইয়ান দিশেহারা। কি করবে, কোথায় ছোঁবে বুঝতেই পারছে না। এমনভাবে কাঁদছে তাতে বোঝাই যাচ্ছে অনেক ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু শাইয়ান দেখতে পারছে না কতখানি ব্যথা পেয়েছে মেয়েটা। কনুই পর্যন্ত হাতা লম্বা হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে না। ঝুম কাঁদছে। ব্যথায় মুখটা নীল হয়ে এসেছে। সে কথা বলছে না। শাইয়ানের এবার মারাত্মক বুকে ব্যথা শুরু হলো। সে ওভাবেই ঝুমের সামনে হাত-পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে পড়লো। বুকে হাত চেপে অস্থির হয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ঝুম ওর অবস্থা দেখে নিজের ব্যথা ভুলে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো,

-কি হলো আপনার?

শাইয়ান একদৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে। নাকে ছোট সোনার নাকফুল। কানে খুবই ছোট একটি সোনার দুল। বামহাতে একটি সোনার ব্রেসলেট, খোঁপা করা চুল। কান্নার ফলে ফুলে ওঠা মায়াবী চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে। ভেজা ভেজা পাপড়িগুলো বার বার ঝামটে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মাঝে মাঝে নাক টানার ফলে ছোট বোঁচা নাকটা কুঁচকে ফেলছে। অল্প আলোতেও কি স্নিগ্ধ, মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে। শাইয়ান পলক ফেলল না। মোহাবিষ্টের মতো করে বলল,

-বুকে ব্যথা করছে আরীবা।

ঝুম আবার খেয়াল করলো লোকটা তাকে আরীবা বলে সম্মোধন করছে। এই নাম মা-বাবা ছাড়া কেউ তাকে কখনো ডাকেনি। সকলে ঝুম বলেই ডাকে। অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো বুকের মাঝে। কিন্তু ঝুম তা পাত্তা দিলো না। সে আপাতত শাইয়ানের বুকে ব্যাথার কারণ বুঝতে পারছে না। অবুঝ সে বোকার মতো জানতে চাইলো,

-এখন? কেন?

শাইয়ান ভনিতা করলো না। রাখঢাক না রেখে মুখের ওপর বলল,

-আপনার জন্য।

ঝুম থতমত খেলো। তার জন্য মানে?

-আমার জন্য? আমি কি করলাম?

-আপনি কাঁদছেন কেন? তাই তো ব্যথা হচ্ছে।

শাইয়ান মুখটা একদম বাচ্চাদের মতো করে বলল। ঝুমের চোখে তখন পানি। ব্যথার কথা সে ভুলে গেলেও শরীর জানে কতটা লেগেছে! এদিকে ঝুম শাইয়ানের কোথায় বোকার মতো বসে। সে এতটাই অবাক হলো যে কথা ভুলতে বলে গেল। ব্যথা পেলে মানুষ কাঁদে না তো কি করে? তাছাড়া সে কাঁদলে এই লোকের কেন বুকে ব্যথা হবে? ওকে চুল করে থাকতে দেখে শাইয়ান বুকে রাখা হাতটি বার বার বুকের ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিয়ে ঝুমের চোখে চোখ রেখে সম্মোহনী গলায় বলল,

-আপনি কাঁদবেন না। আপনি কাঁদবে আমার বুকে ব্যথা হয় আরীবা।

চলবে__

[আজ শব্দ সাজাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। কিছুতেই আগাতে পারছিলাম না। তাই দেরি হয়েছে। রিচেক দিতে পারিনিইইইইইইই।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন