ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

১৪তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–১৪

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

পাকিস্তান ক্রিকেট টিম বর্তমানে আল্লামা ইকবাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবস্থান করছে। মাত্র কিছু মুহূর্ত পূর্বে তাদের ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে। তারা এখানে মূলত লাগেজ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। শাইয়ান ভীষণ অস্থির। ছেলেটা এক মুহূর্ত স্থির নেই। আজ পর্যন্ত তাকে এতটা অস্থির কখনো দেখা যায়নি। যেখানে সকলে নিজেদের লাগেজ দেখে নিচ্ছে সেখানে ছেলেটা পায়চারি করছে। আশেপাশে কড়া সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। অদূরে কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে নিজেদের মাঝে ফুসুরফুসুর করছে। শাইয়ান হঠাৎ লক্ষ্য করলো, প্রতিবারের থেকে এবার একটু বেশিই সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এর কারণ কি? কাছেই তাদের টিমের সকলে দাঁড়িয়ে। সেখানে খেলোয়াড়রা ছাড়াও হেড কোচ, ট্রেইনার, এনালিস্ট সকলেই রয়েছে। শাইয়ান এগিয়ে গেল হেড কোচের নিকট। যখন থেকে শাইয়ান পাকিস্তান টিমের সাথে রয়েছে তখন থেকে আবু সুফিয়ানকে কোচ হিসাবে পেয়েছে। লোকটিকে শুরুতে শাইয়ানের মোটেও পছন্দ ছিল না। সর্বক্ষণ বকা ও ঝাড়ির ওপর রাখতো। তার ওপর জোর করতো। কিন্তু ঘাড়তেড়া শাইয়ান মোটেও আবু সুফিয়ানের কথা শুনে চলতে চাইতো না। ফলস্বরূপ শাস্তিও পেয়েছে অগণিত। তবুও আবু সুফিয়ান এই ছেলের রাগ, জেদ একটুও কমাতে পারেনি। অতঃপর নিজেই হার স্বীকার করে শাইয়ানকে শাইয়ানের মতো ছেড়ে দিয়েছে। এখন অবশ্য দুজন দুজনকে বেশ ভালোভাবেই বোঝে। শাইয়ানকে সে প্রতৃস্নেহে আগলে রাখে।

-কিছু কি হয়েছে কোচ? এবার একটু বেশিই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে যে? তাছাড়া আমাদের তো এই ম্যাচ শেষে নিজেরদের বাসায় ফেরার কথা ছিল। তাহলে হঠাৎ হেড কোয়াটারে কেন নিয়ে যাচ্ছেন?

আবু সুফিয়ান সম্ভবত কোনো বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। তার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শাইয়ান অনেক আগে থেকেই খেয়াল করেছে কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয় ভেবে জিজ্ঞেস করেনি। শাইয়ানের প্রশ্নে আবু সুফিয়ান জোর করে হাসার চেষ্টা করলো। কাছে-পিঠে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন খেলোয়ারকেও দেখা গেলো থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে। ঘটনা কি শাইয়ান বুঝতে পারছে না। তার আজ করাচি যাওয়ার কথা ছিল। শুধু তার না, বাকিদেরও যার যার বাসায় ফেরার কথা ছিল। অথচ হঠাৎ তাদের জানানো হলো তারা সকলে সরাসরি লাহোরে অবস্থিত পিসিবি অর্থাৎ পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের হেড কোয়ার্টারে যাবে। সাধারণত তাদের কোনো মিটিং বা সিরিয়াস প্রেস কনফারেন্স থাকলে হেড কোয়াটারে যাওয়া হয়। তার জানামতে এখন তো এমন কিছু নেই। থাকলে তাদের পূর্বেই জানানো হতো।

-দিস ভিক্টরি মিন্স আ লট টু আস। সো উই ডিসাইডেড টু হ্যাভ আ স্মল মিট-আপ। নাথিং সিরিয়াস।

আবু সুফিয়ান যথাসাধ্য চেষ্টা করলো নিজের দুশ্চিন্তা লুকানোর। কিন্তু কতটা পারলো বোঝা যাচ্ছে না। শাইয়ান যদিও তার কথা বিশ্বাস করেনি, তবুও আর কথা বাড়ালো না। তার মাথায় ঘোর দুশ্চিন্তা। ঝুমের সাথে কথা হয় না, দেখা হয় না অনেকগুলো দিন হলো। মনটা তার অস্থির হয়ে আছে এক নজর দেখার জন্য। তাছাড়া আহিরকে যখন থেকে জানিয়েছে সে দেশে ফিরছে তখন থেকে ছেলেটার আর খোঁজ নেই। না নিজে কল দিচ্ছে আর না শাইয়ান কল দিলে ধরছে।

দীর্ঘ অনেকটা সময় পর অবশেষে শাইয়ানরা এয়ারপোর্টের অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে এলো। তাদের এক নজর দেখার সাথে সাথে এয়ারপোর্টের সম্মুখে সাংবাদিকরা ভিড় জমিয়ে ফেললো মুহূর্তে। এত এত সাংবাদিক ও ক্যামেরা দেখে পূর্বে শাইয়ান বিরক্ত হলেও এবার হলো না। উল্টো নিজ মনে ঝুমের কথা স্মরণ করে হাসলো। কিন্তু তার সেই হাসি বেশিক্ষন স্থায়ী হলো না। একের পর এক অতর্কিত প্রশ্ন বাণে শাইয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেলো। নিরাপত্তারক্ষীরা যথা সম্ভব চেষ্টা করলো সাংবাদিকদের সরানোর কিন্তু কাজে দিলো না। সকলে ঠেলে এগিয়ে আসতে চাইছে শাইয়ানদের দিকে। শাইয়ানের মুখের বেহাল দশা। শক্ত চোয়াল ও কপালের ভাঁজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার রাগ হচ্ছে। আবু সুফিয়ান খুব সাবধানে শাইয়ানকে বললো,

-আপাতত ঝামেলায় না জড়িয়ে শান্ত থাকুন শাইয়ান। আমরা এব্যাপারে পরে কথা বলবো। ঝামেলায় জড়িয়ে নিজের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে ফেলবেন না।

আবু সুফিয়ান কি বললো সেদিকে শাইয়ানের বিন্দুমাত্র ধ্যান নেই। তার কানে দেখো বাজছে একের পর এক করা প্রশ্নগুলো।

-শাইয়ান রেহমান আনসারী, আপনাকে একটি মেয়ের সাথে কোলাচি রেস্টুরেন্টে দেখা গিয়ে ছিল। আসলে বিষয়টা কী ছিল একটু ক্লিয়ার করবেন?

-ভাইরাল যে ছবি ছড়িয়েছে, এ নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

-অনেকে আপনাকে সেই রমণীর সাথে জড়িয়ে নানান কথা বলছে, এটা নিয়ে আপনি কী বলবেন?

-আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে এত এত গুজব ছড়াচ্ছে, এটা কি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লিয়ার করছেন না?

-আপনাদের যেসব ছবি ভাইরাল হয়েছে, সেখানে আপনার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এনিয়ে আপনি কি বলতে চান?

-কিসের ছবি?

এতক্ষন পর শাইয়ান মুখ খুললো। কিসের ছবির কথা বলছে শাইয়ান বুঝতে পারছে না। কিন্তু এরা যে ঝুমকে উদ্দেশ্য করে বলছে তা ঠিকই বুঝতে পারছে। কারণ শাইয়ান ঝুম ছাড়া কখনো কোনো মেয়ের সাথে অযাচিত মেলামেশা করেনি। শাইয়ান প্ৰশ্ন করলেও তার উত্তর এলো না। উল্টো আরো বাজে প্রশ্ন তার দিকে ছুড়ে দেয়া হলো।

-কে সেই রমণী? যার সাথে আপনাকে দেখা গিয়েছে? আপনাদের সম্পর্ক কি?

-আপনাদের যে ছবিগুলো ভাইরাল হয়েছে তাতে আপনাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতা স্পষ্ট ছিল। আমাদের এর ব্যাখ্যা দিন।

-দিন-দুপুরে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন পাবলিক প্লেসে একটি মেয়ের সাথে অশালীন ভাবে ঘনিষ্ট আচরণ করবে বিষয়টি আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। কে সে? আপনাদের সম্পর্কের সত্যতা কি? এভাবে পাবলিক প্লেসে ক্লোজ না হয়ে কোনো হোটেল রুমে নিয়ে গেলেও তো পারতেন।

এতক্ষনের প্রশ্নগুলো শাইয়ান সহ্য করতে পারলেও, এবারেরটা পারলো না। আগপিছ বাছবিচার ছাড়াই এগিয়ে গিয়ে দাবাং এক থাবা বসালো উক্ত প্রশ্ন করা ব্যক্তিটিকে। শাইয়ানের রুষ্টপুষ্ট হাতের থাবা খেয়ে লোকটা উল্টে পড়লো ভিড়ের মাঝে। হাতের মাইক ছিটকে পড়লো দূরে রাস্তায়। এতটুকুতেই শাইয়ান থেমে গেলো না। সে এগিয়ে গিয়ে লোকটার কলার চেপে টেনে ধরে মুখ বরাবর পরপর দুটি ঘুষি বসলো। সাথে সাথে লোকটার নাক, ঠোঁট ফেটে র*ক্ত বেরিয়ে এলো।

-ইয়্যু বা*স্টার্ড কি বললি? আবার বল কি বললি? কাকে নিয়ে কি বললি হ্যাঁ? এই মুখ খোল। মুখ খোল তুই। বউ হয় সে আমার, বউ। তুই আমাকে হোটেল রুম চিনাচ্ছিস? তার স্থান জানিস কোথায়? তার স্থান আমার মাথার ওপর। শুনেছিস?

পাশের রিপোর্টাররা শাইয়ানকে থামানোর বদলে এই চমকদার খবর রেকর্ড করতে ব্যস্ত। শাইয়ান আজ কোনো কিছুর ধারধারল না। একের পর এক আঘাত করে গেলো লোকটাকে। পরিস্থিতি বেগতিক। শাইয়ানকে অন্য খেলোয়াড়রা টেনেও সরাতে পারছে না। হিংস্র সিংহের মতো লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কোনো মতে অন্যরা টেনে শাইয়ানকে সরিয়ে আনলো। ততক্ষনে লোকটার আধ-ম*রা অবস্থা। শাইয়ান রাগে ফোঁসফোঁস করছে। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে এখন একে একে সবটা বুঝতে পারছে। কেন ঝুম তার কল ধরেনি। কেন আহির তাকে এড়িয়ে গেছে, সবটা এখন স্পষ্ট। মাথার মধ্যে ধপাধপ করছে। রাগে শরীরের র*ক্ত ছলকে উঠছে। মনে মনে ভেবেই নিলো, ঝুমকে সে বাড়িতে না পেলে এর ফল সবাইকে পেতে হবে। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একে তো মানুষের সামনে শাইয়ান একজন রিপোর্টারের গায়ে হাত তুলেছে, তারওপর এটি এয়ারপোর্ট এরিয়া। মুহূর্তে শাইয়ান আইনি জটিলতায় জড়িয়ে গেলো। ঘটনা চক্রে সেখানে পুলিশ উপস্থিত হলো এবং শাইয়ানকে আটক করে এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরে তদন্তের জন্য নেয়া হলো। এতেও ছেলেটার মাঝে বিশেষ ভাবাবেগ নেই। উল্টো সে রিপোর্টারদের সামনে সকলকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট গলায় বলল,

-শাইয়ান রেহমান আনসারীর জান সে। তার ব্যাপারে নেক্সট টাইম কিছু বলার পূর্বে হাজার বার ভেবে বলবেন। নয়তো, (রাস্তায় পরে কাতরাতে থাকা লোকটিকে দেখিয়ে বললো) এর থেকেও বাজে অবস্থা করবো। রিমেম্বার, শি ইজ মাইন। শি অনলি বিলংস টু মি।

এরপরের চারঘন্টা শাইয়ানের কাটলো ইন্টারোগেশন রুমের থমথমে পরিবেশে। আবু সুফিয়ান যথা সম্ভব চেষ্টা করছে শাইয়ানকে প্রটেক্ট করার। সে এই ভয়টাই পেয়ে ছিল শুরু থেকে। তাই তো যখনই তার কাছে খবর এলো সাথে সাথে সে শাইয়ানের ফোন সরিয়ে ফেললো। তার উদ্দেশ্য মোটেও খারাপ ছিল না। সে শুধু চেয়ে ছিল ম্যাচটা ঠিকঠাক ভাবে শেষ করতে। তখন শাইয়ান খবরটা পেলে কখনো কি সেখানে পরে থাকতো? তাছাড়া মেয়েটা কে এটা নিয়ে তার মনেও প্রশ্ন উঠেছে। শাইয়ানকে সে কখনোই কোনো মেয়ের সাথে দেখেনি। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে তার যা ভালো মনে হয়েছে তাই করেছে। সে দ্রুততার সাথে সকলকে ছবি ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করে দিল। কোনো ভাবেই যেন এই ব্যাপারটা শাইয়ানের কানে না যায় সেদিকেও লক্ষ্য রেখেছে। ছবিগুলোও ছিল ভীষণ আপত্তিকর। যার কারণে হেড কোয়ার্টারে এই বিষয়ে আজ একটা মিটিংও রাখা হয়ে ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, সত্যতা জেনে পদক্ষেপ নেয়া। নয়তো শাইয়ান যে ছেলে ভয়ানক কিছু করতে দুবার ভাববে না। সে সেই ভয়েই পরবর্তী সময়ে শাইয়ানকে কিছু জানায়নি। এরপূর্বেও একবার শাইয়ানের এই রিপোর্টারের সাথে হাতাহাতি হয়ে ছিল। লোকটা যে উদ্দেশ্য পূর্বক ভাবে শাইয়ানকে উস্কে দিচ্ছিলো এটা বুঝতে তার সমস্যা হলো না। তবুও শাইয়ানকে বেশ ভুগতে হবে। কারণ ওই রিপোর্টারের অবস্থা খারাপ। তাকে ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। বাইরে সব নিউজ রিপোর্টাররা ভিড় জমিয়েছে। ভিতরের অবস্থায় বেশ জটিল। কিন্তু শাইয়ান স্থির, শান্ত। আবু সুফিয়ান যতদূর ছেলেটাকে চেনে তাতে এই শান্ত ভাব ঝড় আসার পূর্বাবাস। তাই তো সে দ্রুততার সাথে শাইয়ানের মাবাবাকে সংবাদ দিয়েছে। এই বিপদে তাদের মতো বড় মাপের মানুষ পাশে থাকলে সুবিধাই হবে। হলোও তাই। মেহেরুন্নেসা ও ইব্রাহিম যখনই এসব জানতে পেরেছে একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিল। তারা ফিরেছে মাত্র কয়েক মিনিট। এরই মাঝে সব শান্ত। ইউসুফ রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। তার জানা, পরিচিতের অভাব নেই। মেহেরুন্নেসাও বেশ নামি ব্যক্তি। ফলস্বরূপ শাইয়ানকে কেউ কিছুই করতে পারলো না। উল্টো শাইয়ানকে ট্রিগার করে অযাচিত পরিস্থিতি তৈরী করার দরুন দেখা গেলো রিপোর্টারদের মাঝে কয়েকজন ফেঁসে গেলো। মেহেরুন্নেসা অত্যন্ত শক্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী। ছেলের সাথে করা কাজের ক্ষোভ তার মাঝে অবশ্যই রয়েছে। এই তিন সপ্তাহে অনেক কিছুই হয়ে গেলো। সে যথা সম্ভব সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। প্রমান দেখিয়েছে ছবিগুলো যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তেমন কিছুই ঘটেনি। তবুও শাইয়ানকে বাজে প্রশ্ন করায় সে নিজের পাওয়ার ব্যবহার করতেও দুবার ভাবেনি। শাইয়ান মা-বাবাকে দেখেও নিজের মাথা তোলেনি। তার হাতে ছোট কালো ভেলভেটের একটি জুয়েলারি বাক্স। যা অনবরত নাড়িয়েই যাচ্ছে। দৃষ্টি সেই শুরু থেকে শুধু ওটার ওপরই স্থির। মেহেরুন্নেসা এই প্রথম ছেলের সাথে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। তারা তৎক্ষণাৎ আবারো টিকিট কেটে করাচি ফিরে গেলো। পুরোটা পথ শাইয়ান না কারো সাথে কথা বলেছে আর না কারো দিকে ফিরে তাকিয়েছে। আনসারী ভিলায় এখনো বিয়ের আমেজ বিদ্যমান। যদিও ঈশালের বিয়ে হয়ে গিয়েছে আজ প্রায় দুই সপ্তাহ। এবং বর্তমানে ঈশাল তার স্বামীকে নিয়ে বাবার বাসায় বেড়াতে এসেছে। তাই এখনো বিয়ে বাড়ির চাকচিক্য ভাব রয়ে গিয়েছে। বাড়ির পরিবেশ গুমোট। আহির মাত্র কিছু মুহূর্ত পূর্বে বাড়িতে ফিরেছে। শাইয়ান যখন ওসব কান্ড ঘটিয়েছে তখন সে গুরুত্বপূর্ব সার্জারিতে ব্যস্ত ছিল। যখনই তার কানে গিয়েছে তখনই সে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু আসার পর থেকে সে ভুলেও শাইয়ানের ধারে কাছে যায়নি। বাড়ির অন্যরা অবশ্য বুঝতে পারছে না পরিস্থিতির গম্ভীরতা।

-আরীবা কোথায়?

দীর্ঘ প্রায় ৬/৭ ঘন্টা পর শাইয়ান কথা বললো। মেহেরুন্নেসা অবশ্য জানতো ওর মুখ থেকে এটাই বের হবে সর্বপ্রথম। সে ভয়ে আছে এরপরের সময়টা শাইয়ানকে কিভাবে সামাল দেবে তাই ভেবে। বাড়ির অন্যরা বুঝতে পারলো না শাইয়ান কেন ঝুমের কথা জিজ্ঞেস করছে। এমনকি ঈশাল কিংবা ইব্রাহিম নিজেও বুঝতে পারলো না। কিন্তু মেহেরুন্নেসা ও আহির ঠিকই বুঝতে পারলো। তবুও কেউ সাহস করলো না কিছু বলার। মেহেরুন্নেসা কথা না রাখতে পাড়ার গ্লানিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোন মুখে ছেলেকে বলবে, সে নিজের কথা রাখতে পারেনি? আগলে রাখতে পারেনি মেয়েটাকে।

-আরীবা কোথায়?

ভয়ঙ্কর থমথমে ভারী গলা শাইয়ানের। কেউ টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না। ঈশালের চোখমুখের অবস্থা শোচনীয়। মেয়েটা সেই কবে থেকে হাসে না আগের মতো। বিগত দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে এবার মুখ খুললো। মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল,

-ঝুমঝুমিরা বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছে।

সাথে সাথে শাইয়ান চোখ বন্ধ করে নিলো। হাতে তার তখনও সেই জুয়েলারি বাক্স। সেটিকে শক্ত করে দুহাতের সাহায্যে একত্রে মুঠো করে ধরলো। এমন কিছুরই ভয় পেয়ে ছিল। যতটুকু সে বুঝেছে তার ভিত্তিতে ঝুমের এমন স্টেপ নেয়া কি বাড়াবাড়ি ছিল না? অবশ্যই। সে যাওয়ার পূর্বে বারবার করে বারন করলো, কিন্তু মেয়েটা তার কথার একটুও দাম দিলো না? অথচ শাইয়ান কি জানে ঝুমের মতো মেয়ে এত সহজে হারতে শেখেনি। মেয়েটা কত অপমান নিয়ে এই দেশ ছেড়েছে সে কি জানে?

-কবে গিয়েছে?

শাইয়ানের চোখ বন্ধ মাথা নিচু করা। শক্ত চোয়াল দেখে ঈশালের এবার ভয় করলো। মনে মনে কিছু একটা আঁচ করে ফেললো মুহূর্তেই। সাথে সাথে ভাসা ভাসা চোখ দুটি নিয়ে তাকালো আহিরের দিকে। আহির এদিকেই তাকিয়ে তবে নিশ্চুপ। ঈশালের যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। ওই ছবিগুলোর সত্যতা তার জানা নেই, তবে কিছুটা যে সত্য সে ভালোই বুঝতে পারলো।

-আপনি যাওয়ার দুদিন পর।

একারণেই কি ঝুমের ফোন অফ ছিল? অথচ তাকে কেউ জানালো না। এতগুলো দিন বিশ্বাস করে কতটাই না নিশ্চিন্তে ছিল সে।

-গিম্মি দ্যাট পিকচার।

আদেশটি ঈশালের জন্যই ছিল। ইব্রাহিম ছেলের কাজ কিছুই বুঝতে পারছে না। এমন ব্যবহারের মানে কি? তবে কি ওই ছবির ঘটনা সত্যি? সে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু মেহেরুন্নেসা চোখের ইশারায় থামিয়ে দিলো। ঈশাল উপায়ন্তর না পেয়ে নিজের ফোন থেকে ছবিটি বের করে শাইয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিলো। ফোন হাতে নিয়ে শাইয়ান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেদিন কোলাচি রেস্টুরেন্টে যখন শাইয়ান ঝুমের কাছাকাছি গিয়ে ঝুমকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করে ছিল সেই ছবিটা। তবে অন্য এঙ্গেল দিয়ে তোলার কারণে দেখতে মনে হচ্ছে শাইয়ান ঝুমের খুব কাছে। বিষয়টি যে ইচ্ছাকৃত বাজেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা শাইয়ান খুব ভালো করে বুঝতে পারলো।

-এটা কবে পাবলিশ হয়েছে?

-আপনি যাওয়ার পরদিনই।

-কি হয়েছিল? ফাস্ট টু লাস্ট ইন ডিটেলস এভেরিথিং জানতে চাই।

ঈশাল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলা শুরু করলো,

-সেদিন আমরা সকলে আমার বিয়ের গয়না আর পোশাক দেখছিলাম। এরই মাঝে বড় চাচিআম্মার সাথে ঝুমঝুমিকে ফিরতে দেখে আমি আর শ্রাবনী ব্যস্ত হয়ে ওদের কাছে যাই। ঝুমঝুমি ফিরছিল না বলে আমরা ভীষণ চিন্তিত ছিলাম। তাছাড়া ঝুমঝুমিকে দেখে মনে হচ্ছিলো ও অসুস্থ। কিন্তু আমরা তখনই কোনো প্রশ্ন করি নিই। কারণ বাড়ি ভর্তি মেহমান ছিল। সেদিন রাতে ঝুমঝুমি কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পরে। আমরা ভাবলাম অসুস্থ হয়তো তাই। পরদিন দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়রা আসা শুরু করে, আমরাও আর এই ব্যাপারে গুরুত্ব দিই নিই। সব ভালোই চলছিল। হাসি, মজার সাথে বিয়ের কাজ শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো আমার হলুদের দিন।

এতটুকু বলে ঈশাল থামলো। সবসময় অতিরিক্ত কথা বলা মেয়েটার গলা কাঁপছে আজ। বাকি কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। শাইয়ান যদিও শব্দ করেনি। চুপচাপ অপেক্ষা করতে রইলো।

-বড় চাচিআম্মার বড় বোন অর্থাৎ আমিরুন্নেসা খালাজান আসার পর থেকে ঝুমঝুমি আর শ্রাবনীর সাথে অকারণেই দুর্ব্যবহার করছিলো। বিশেষ করে ঝুমঝুমির সাথে সে অযথাই কোনো কারণ ছাড়া লাগাতার ওকে অপমান করে কথা বলতো, সকলের সামনে ছোট করতো। এমনকি তার পরিহিত পোশাকও সে ঝুমঝুমিকে দিয়ে ধুইয়েছেন।

শাইয়ান এবার মুখ তুলে ঠিক মেহেরুন্নেসার চোখের দিকে তাকালো। ছেলেটার চোখ, নাক লাল। যথা সম্ভব নিজের কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। শাইয়ান মেহেরুন্নেসার চোখে চোখ রেখেই বলল,

-আর?

ঈশাল দুহাতে মুখ চেপে হঠাৎ কেঁদে ফেললো। সাদ অর্থাৎ ঈশালের স্বামী ওর পাশেই ছিল। ছেলেটা বউকে নিজের সাথে আগলে নেয় দ্রুত। যদিও বড়দের সামনে তার লজ্জা করছিলো কিন্তু বউয়ের এই কষ্ট সে সইতে পারছে না। ঝুমের জন্য কিছু করতে না পাড়ার পীড়া মেয়েটাকে একটু একটু করে কষ্টের সাগরে ঠেলে দিচ্ছে।

-ঝুমঝুমিকে উনি অনেক কষ্ট দিয়েছে বড় ভাইজান। মেয়েটা কিছু বলেনি, মুখ বুঝে সহ্য করার চেষ্টা করেছে। আমরা প্রতিবাদ করতাম বলে সকলের আড়ালে ঝুমঝুমিকে বাজে কথা বলতো। জানেন মেয়েটাকে খাবারের খোটাও দিয়েছে। বলেছে ও নাকি উটকো ঝামেলা।

-আর?

শাইয়ান মেহেরুন্নেসার চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি সরায়নি। মেহেরুন্নেসার হঠাৎ করে মনে হলো বড় কোন ঝড় আসবে। শাইয়ানের ওই দৃষ্টি তাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

-ঝুমঝুমি কেন সব চুপ করে সহ্য করেছে আমি জানি না। শ্রাবনীকে কিছু বলা হলে মেয়েটা মুখের ওপর বলে দিতো কিন্তু ঝুমঝুমি কখনো তাকে অসম্মান করেনি। হয়তো বড় চাচিআম্মার বোন বলে। শুধু যে খালাজান একা মেয়েটাকে জ্বালিয়েছে এমন নয়। মাহিরা আপাও ঝুমঝুমিকে খুব যন্ত্রনা দিয়েছে। মেয়েটার হাতে গরম কফি ফেলে হাতটা কি বিশ্রী ভাবে ঝলসে দিলো। তখনও ঝুমঝুমি কিছু বলেনি ওদের। বরং চেষ্টা করেছে ওর জন্য যেন কোনো ঝামেলা না হয়। কিন্তু শেষমেশ আর তা হলো কি? গায়ে হলুদের দিন আমরা সকলে যখন প্রোগ্রামে ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে মাহিরা আপা সকলের সামনে এই ছবিগুলো তুলে ধরে। তখন ছবিগুলো অলরেডি ভাইরাল। ঝুমঝুমির চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো সে নিজেও এসব দেখে অবাক। একঘর মানুষের মাঝে সেদিন মাহিরা আপা ঝুমঝুমির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। ঝুমঝুমি সকলকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে যে ছবিগুলো যেমন দেখানো হয়েছে তেমন কিছুই হয়নি। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি। এমনকি বাড়ির মানুষেরাও না। ঝুমের পরনের পোশাক দেখে তারা ধরেই নেয় সবটা সত্যি। আপনার সাথে জড়িয়ে ঝুমঝুমিকে সকলে খুব বাজে কথা বলেছিল ভাইজান। আমি আর শ্রাবনী ঝুমঝুমিকে প্রটেক্ট করার চেষ্টা করেছি কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি। ঝুমঝুমি কেমন মেয়ে সেটা তো আমরা সবাই জানি তাই না? অথচ তখন আমার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। বড় চাচিআম্মা তখন জরুরি একটি কাজে অফিসে গিয়ে ছিল। ঝুমঝুমি বারবার বলছিলো আপনার সাথে ওর ইন্টারভিউ ছিল। বড় চাচিআম্মা এব্যাপারে জানে। তাকে ঝুমঝুমি ফোন দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু ওকে ইচ্ছাকৃত নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে দেয়া হয়নি। যখন ঝুমঝুমি কারো কথা শুনতে রাজি হয়নি, বরং চাচিআম্মাকে সব জানাতে চাইলো তখন খালাজান ওর ওপর হাত উঠাতেও….

শাইয়ানের চোখ থেকে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। মেহেরুন্নেসার চোখেও পানি। অপরাধবোধের দরুন সে মাথা তুলতে পারলো না। ঝুম শেষ পর্যন্ত লড়েছে নিজের জন্য, নিজের চরিত্রের জন্য। অথচ নির্দোষ মেয়েটার ওপর জোর করে চরিত্রহীন ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া

হলো। আশ্চর্যজনকভাবে এই কাজগুলো অন্য নারীরাই করেছে তার সাথে। এজন্যই বোধ হয় বলা হয়, নারীরাই নারীদের বড় শত্রু। সেদিন আমিরুন্নেসা ঝুমের গায়ে হাত তুলতে চাইলেও ঝুম অন্যায় মুখ বুঝে সহ্য করেনি। বরং নিজের হয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। আমিরুন্নেসার তেড়ে আসা হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিয়ে ওভাবেই নিজের জিনিস নিয়ে এই বাড়ি, এই দেশ, এমনকি শাইয়ানের জীবন থেকেও চলে গিয়ে ছিল। অথচ শাইয়ান সেসব কিছুই জানতে পারলো না। তাকে জানানো হলো না। বরং তাকে ধোঁকা দেয়া হলো।

-তুমি কথা দিয়েছিলে আমার অবর্তমানে তুমি তাকে সুরক্ষিত রাখবে আহির।

শাইয়ানের চোখে এখন পানি নেই। কিন্তু চোখ দুটো লাল। নাকের পাটা কাঁপছে। কণ্ঠ অস্বাভাবিক শীতল। আহির তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলো। নিজের হয়ে সাফাই দিয়ে বলল,

-বিশ্বাস করো শাইয়ান আমি করাচি ছিলাম না। ইমার্জেন্সি সার্জারির জন্য ইসলামাবাদ গিয়ে ছিলাম। আমি থাকলে কখনই ভাবিকে এসব ফেস করতে হতো না।

ভাবি ডাকটা যেন মুহূর্তে বাসরঘরে বাজ ফেললো। ইব্রাহিম এবার চুপ রইলো না। অবাক হয়ে জানতে চাইলো,

-কে ভাবি?

মেহেরুন্নেসা দৃষ্টি তুললো না। নিস্তেজ গলায় বললো,

-শাইয়ান ঝুমকে ভালোবাসে।

এমন কিছু কারোরই ধারণায় ছিল না। সকলেই যেন বড়সড় ঝটকা খেলো। শাইয়ান এবার উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বড় বড় পা ফেলে দরজা পর্যন্ত গেলো। মেহেরুন্নেসার যেন পুরো দুনিয়া উল্টে এলো। শাইয়ান তাকে ভুল বুঝছে। ওর ভুল ভাঙানোরও কি সময় পাবে না? আহির শাইয়ানের পিছু নিয়ে ওকে ধরতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই শাইয়ান এক ঝটকায় ওকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বজ্র কণ্ঠে শাসিয়ে বলল,

-দূরে, দূরে থাকবে তুমি। কথা দিয়ে ছিলে দেখে রাখবে। কথা রাখোনি। দিনের পর দিন আমাকে মিথ্যা বলেছো। তোমাকে বিশ্বাস করে ছিলাম আহির। তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছো। ভুলে যাও শাইয়ান নামে তোমার কোনো ভাই ছিল। আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।

চলবে—

[বেশি প্যাচ লাগাইনি। আগামী পর্বে লাগাবো। গুড নাইট।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন