ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কিন্ত আমি

২৫তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#তুমি_কিন্তু_আমি

মীরা_রায়াদ

পর্ব–২৫

🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫

-পাখি, পাখি?

শাইয়ান ঝুমের শাড়ির আঁচল ধরে পিছু পিছু সারা ঘর ঘুরছে আর ডাকছে। ঠিক ছোট্ট বাচ্চাদের মতো তার কাজ। ঝুম স্থির নেই। রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। কিছুক্ষন আগের কথা মাথায় এলেই তার ভয়ানক রাগ হচ্ছে। এই লোক বহুরূপী। না আছে কথার ঠিক, আর নাই বা আছে রূপের ঠিক। হাজারটা রূপ দেখিয়ে ঝুমকে পাগল করে ছাড়ছে। তখন চুমু খাওয়ার আবদার করার সাথে সাথে ঝুম ফনা তোলা সাপের মতো ফোঁশ করে উঠেছিল। এরপর থেকেই শাইয়ান ওর আঁচল ধরে ঘুরছে।

-পাখিইইইই!

এবার কিছুটা টেনে আওয়াজ তুলে ডাকলো শাইয়ান। সাথে সাথে ঝুম ঘুরে দাঁড়ালো ওর দিকে। ডান হাতের তর্জনী তুলে শাসিয়ে বলল,

-আপনি আমার সাথে একদম কথা বলবেন না।

কথা বলবে না? শাইয়ান তার বউয়ের সাথে কথা না বললে কে বলবে? আদৌও এটা সম্ভব? ছিঃ! বউ তার কি সব কথা যে বলে! তার কপালে ভাঁজ পড়ল। চিন্তিত গলায় জানতে চেয়ে বলল,

-আরে কি আজব! কেন? কি করেছি আমি?

ওর এই প্রশ্নে ঝুম দ্বিগুণ রেগে গেল। রেগে শাইয়ানের দিকে এগিয়ে যেতেই শাইয়ান ভয়ে পিছিয়ে গেল দ্রুত। বউটা কি ওলোট-পালোট হয়ে গেলো কোনো ভাবে? তার শান্তশিষ্ট বউ কোথায়? সামনে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলা তার বউ হতেই পারে না।

-কি করেছেন তা আবার জানতে চান? কি বলেছিলেন হ্যাঁ? কি বলেছিলেন?

-কি বলেছিলাম?

শাইয়ান ভয়ার্ত চোখে ঝুমের দিকে তাকিয়ে। ঝুমের চোখের আকৃতি বড়। তাতে আবার রাগ ভরপুর। শাইয়ান কি করবে বা বলবে বুঝতেই পারছে না। এদিকে ঝুম শাইয়ানের এমন সরল কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল।

-ভুলে গিয়েছেন? বাহ! দারুণ! অসাধারণ! মনে নেই কি বলেছিলেন? খুব তো বড় গলায় বলেছিলেন সময় দিবেন ভালোবাসার, মানিয়ে নেওয়ার। দিচ্ছেন? এখনই কি সব পচা কাজ করতে চাচ্ছেন। ছিঃ!

বলতে বলতে ঝুম এমন ভাবে নাকমুখ কুঁচকালো যেন শাইয়ান চুমু নয় কোনো অখাদ্য খেতে চেয়েছে।

-ছিঃ! এর কি আছে? আর এটা মোটেও পচা কাজ না। বরং সওয়াবের কাজ। আপনি মেয়ে কিছুই জানেন না। আর তাছাড়া চুমু খেতে চেয়েছি, খাই নি তো।

আবারো বেলাজ কথাবার্তা। এই লোকের মুখটা কেউ বন্ধ করে দেয় না কেন? আগে তো এত কথা বলতো না। ঝুম লাজে হতভম্ব। নিজের দুহাত একত্রিত করে শাইয়ানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো করে বলল,

-আল্লাহর দোহাই লাগে চুপ করুন আপনি। মুখ তো না, এটম বোম্ব। এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন সর্বদা; কথা বলার সময়ও আর ওসব পচা কাজ করার কথা মাথায় আনার সময়ও।

-আপনি আবার পচা কাজ বলছেন?

-আপনি চুপ করুন।

-কেনো চুপ করবো? চুমু খাওয়া পচা কাজ না। আমি এর বিরোধিতা করছি। দরকার হয় প্রোটেস্ট করবো তাও মেনে নেবো না।

শাইয়ানের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী সত্তা বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঝুম অতিষ্ঠ। অতঃপর হেরে যাওয়া গলায় জানতে চাইল,

-আচ্ছা ক্রিকেটাররা বুঝি এমন নির্লজ্জ হয়, ঠিক আপনার মতো?

শাইয়ান লক্ষ্য করেছে, বিয়ের পর থেকে সুযোগ পেলেই তার লিলিপুট বউ তাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে পচিয়ে দেয়। যা মানা যায় না। একদম মানা যায় না। নেহাতই শাইয়ান বউকে ভীষণ ভালোবাসে, মান্য করে, নয়তো এসব সে মেনে নিতো বুঝি?

-আমি মোটেও নির্লজ্জ না পাখি। শুধু আপনাকে একটু বেশিই ভালোবাসি। নয়তো আপনার স্বামী ভীষণ ভদ্র ছেলে।

শাইয়ান গাল ফুলিয়ে বলল। তার এক হাতের মুঠোয় এখনো ঝুমের শাড়ির আঁচল। অন্য হাতের কব্জিতে ঝুমের হেয়ার ব্যান্ড। সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই ঝুমের চোখ হাসল। শাইয়ান যে ঝুমকে ভালোবাসে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ভদ্র? এটা মানার মতো কথা?

-হ্যাঁ, ভদ্র ছেলের নমুনা আপনার সাথে একা ঘরে থাকলেই পাওয়া যায়।

_______

শাইয়ান ঝুমের রুমে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। রুম জুড়ে ঘুটঘুটে আঁধার। এর মাঝে আচমকা কেউ শাইয়ানকে দেখলে নির্ঘাত ভয় পাবে। আহিরও পেল। ছেলেটা শ্রাবনীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরেছে বেশ অনেক্ষন। কিন্তু আসার পর থেকে শাইয়ানের দর্শন পায়নি একমুহূর্তের জন্যও। তখন বিশেষ মন ভালো ছিল না বলে আগ বাড়িয়ে খোঁজ নিতেও আসেনি। কিন্তু দিনের আলো নিভে সন্ধ্যে নামার পরও যখন শাইয়ানের দেখা পাওয়া গেলো না কোথাও, উল্টো ঝুমকে একা সকলের সাথে দেখেই আহির বুঝতে পারলো কিছু একটা হয়েছে। এরপর পরই কাউকে কিছু না বলে ঝুমের রুমে এসে হাজির হলো সে। কিন্তু এখানে এসে ভারী অবাক হল। সারা রুম জুড়ে অন্ধকার বিরাজ করছে। আদৌও এখানে কোনো মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। আহির রুমের মাঝে পা বাড়িয়ে ডাকল,

-শাইয়ান?

কিন্তু বিপরীত পাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। আহির আবারো ডাকল,

-শাইয়ান, তুমি এখানে?

আহির ভিতরে যেতে ইতস্ততবোধ করছে। যতই হোক এটা তার ভাবির রুম। ঝুমের অনুপস্থিতে শাইয়ান উপস্থিত থাকা অবস্থায় সে অবাদে চলাচল করতে পারলেও শাইয়ান বিহীন লজ্জা ও সংকোচ কাজ করছে। সে এক পা এগিয়ে দুপা পিছিয়ে যাচ্ছে তড়িৎ। অতঃপর দেয়াল হাতড়ে আলো জ্বালাতে জ্বালাতে আবারো ডেকে উঠল,

-শাইয়ান, তুমি কী এখানে রয়েছো?

বলতে বলতে আলো জ্বালিয়ে দিল এবং পিছু ফিরে ভয়ে চমকে উঠল। আঁধারের মাঝে কেমন অশরীরীদের মতো বসে আছে দেখো! ডাকের সাড়াও দিচ্ছে না। ভয়ে আহিরের আত্মা লটকে আছে কোনো রকমে। এমন ভয় সে বহুদিন পায়নি। মেজাজ খিঁচে গেলো মুহূর্তে। তপ্ত মেজাজে চিড়বিড়িয়ে উঠে বলল,

-সমস্যা কী? এভাবে এখানে ভূতের মতো বসে আছো কেন? কখন থেকে ডাকছি শুনছো না?

আহিরের ঝাঁজালো কণ্ঠের তেজ দেখেও আজ শাইয়ান শান্ত। কেবল মুখ তুলে একবার চাইলো আহিরের দিকে। এছাড়া বিশেষ ভাব প্রকাশ করলো না। শাইয়ানের মুখের হাল দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো আহিরের। হলো কী এর আবার? এত শান্ত কেন? মাত্র কিছু সময়ের মাঝে আবার কি মিস হয়ে গেল?

-কী? এভাবে ফুলে ফেঁপে আছো কেন?

আহির পা বাড়িয়ে শাইয়ানের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দৃষ্টি তার তীক্ষ্ণ। নিশ্চয়ই ঝুমের সাথে কিছু হয়েছে। নয়তো এই বান্দার তেজ কমানোর সাধ্যি কার? শাইয়ান উত্তর দিলো না। শুধু মন মরা হয়ে বসে রইল। আহির এবার কোমর বাকিয়ে ঝুঁকলো। জহুরি নজরে শাইয়ানকে দেখে নিয়ে ধৈর্য ধরে বলল,

-কী হয়েছে না বললে বুঝবো কীভাবে?

-আমাকে দেখে নির্লজ্জ মনে হয়?

সাবলীল প্রশ্ন, অথচ আহিরের চোয়াল ঝুলে পড়েছে প্রায়।

-মানে? কী হয়েছে?

শাইয়ান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে দুঃখী দুঃখী কণ্ঠে বলল,

-তোমার ভাবি আমাকে নির্লজ্জ বলেছে।

আহির এতক্ষনে বুঝলো শাইয়ানের এই শোক পালনের কারণ কি। সে এবার শিরদাঁড়া সোজা করে ভাবলেশহীন ভাবে বলল,

-ভাবি যখন বলেছে তখন হয়তো ঠিকই বলেছে।

আহিরের এমন কথায় শাইয়ান অবাক হলো না। উল্টো এমন উত্তরই আশা করেছিল। ভাবির চামচা বলে কথা।

-শ্রাবনী তোমাকে পারফেক্ট একটা নাম দিয়েছে আহির।

-কী?

-তুমি আসলেই রাজাকার। রাজাকারদের মতো চামচামি শুরু করেছো। বেঈমান।

আহির সাথে সাথে তেতে উঠল। তাকে বেঈমান বলে? সে রাজাকার? এত বড় অপবাদ? তাহলে শাইয়ান নিজে কী?

-ওহ আচ্ছা? আমি রাজাকার, বেঈমান? তাহলে তুমি কী শুনি? তখন যে তুমি দল সুইচ করলে তার বেলা? তুমি শ্রাবণীর দলে যেতে পারলে আমিও ভাবির দলে যেতে পারি।

শাইয়ান সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল। এব্যাপারে কথা না আগানোই তার জন্য ভালো মনে হচ্ছে।

আহির কথা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল,

-তা কী করেছিলে যে ভাবি তোমাকে নির্লজ্জ বলেছে? নিশ্চয়ই উল্টা-পাল্টা কিছু করেছো?

শাইয়ানের মেজাজ পূর্ব থেকেই খারাপ ছিল, এখন আরো হচ্ছে। তার ভুল হয়েছে। এই ছেলেকে বলে সে চরম ভুল করেছে।

-বের হও তুমি। চোখের সামনে থেকে যাও। তোমাকে দেখলে আরো মেজাজ খারাপ হচ্ছে।

-সারাক্ষণ এমন চিড়চিড় করো বলেই ভাবি তোমাকে পছন্দ করে না।

কথাটি বলতে বলতে আহির পিছিয়ে গেল। তার জানা আছে এখন সে কেটে না পড়লে শাইয়ান যেকোনো সময় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। হলোও তাই। শাইয়ান হুঙ্কার দিয়ে উঠে পড়ল। উদ্দেশ্য আহিরকে ধরা। কিন্তু তার পূর্বেই আহির এক ছুটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। শাইয়ান রাগে, ক্ষোভে চেঁচিয়ে বলল,

-তোমাকে একবার হাতের কাছে পেলে দেখো কি হাল করি তোমার। ফাজিল, বজ্জাত ছেলে।

________

ঝুম চুপটি করে বসে আছে বসার ঘরের সোফায়। মেয়েটার দুই হাত একত্রিত করে কোলের ওপর রাখা। কিছুটা কাচুমাচু ভঙ্গিতে বসে আছে। দৃষ্টি নিচে, আবার মাঝে মাঝে পাশে বসে থাকা আহিরের উপরও দিচ্ছে। আহির অবশ্য এক দৃষ্টিতে গালে হাত দিয়ে ঝুমের হাবভাব দেখতে ব্যস্ত। প্রায় ত্রিশ মিনিট হতে চলল ঝুম এখানে এভাবে বসে আছে। কিছুক্ষণ পূর্বেই বসার ঘরের দেয়ালে লাগানো দেয়াল ঘড়িটি জানান দিয়েছে এখন রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। সবাই যে যার ঘরে ঘুমাতে গেলেও ঝুম নড়ছে না। কারণ, তাকে মিসেস বিথী আজ নিজের ঘরে শুতে বলে গিয়েছে। অর্থাৎ আজ ঝুম ও শাইয়ান দুজন ঝুমের রুমেই থাকবে। সেই থেকে মেয়েটা থম মেরে বসে আছে। নিজের ঘরে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আহিরটাও এই মজা দেখার জন্য ঘুমাতে না গিয়ে ঝুমের পাশে তখন থেকে বসে রয়েছে। না কিছু বলছে আর নাই বা জায়গা থেকে নড়েছে। ধৈর্য ধরে বড় আয়েশ করে সে ঝুমকে দেখছে। তার উদ্দেশ্য শাইয়ানের ধৈর্য পরীক্ষা করা। কেননা, যখন মিসেস বিথী কথাগুলো বলেছিল তখন শাইয়ান নিজেও এখানে উপস্থিত ছিল। তখন সে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও আহির খুব ভালো করেই জানে তার ভাই মনে মনে ভীষণ ব্যাকুল হয়ে আছে ঝুমের জন্য। অথচ ঝুম তার ধৈর্যের নিদারুণ পরীক্ষা নিচ্ছে। এখন দেখার বিষয় শেষ পর্যন্ত শাইয়ান কি করে। তার দৃঢ় বিশ্বাস কিছুক্ষণের মাঝেই শাইয়ান এখানে এসে উপস্থিত হবে।

-শাইয়ান যদি জানতে পারে আমি আপনাকে এভাবে দেখছি তাহলে আমাকে মেয়ে বস্তাবন্দি করে রেখে দেবে।

বিগত ত্রিশ মিনিটে এটাই আহিরের প্রথম কথা। এতক্ষণ ঝুম অবাক হচ্ছিল সবসময় এর ওর পিছে লাগা দুষ্টু ছেলেটিকে চুপ দেখে। এবার একটু স্বস্তি লাগছে। ঝুম আড় চোখে আহিরের দিকে তাকিয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

-কেন?

আহির রয়েসয়ে প্রতিউত্তর করল,

-আপনার স্বামী বড় হিংসুটে। আপনার আশেপাশে আমাকে সহ্য করতে পারে না ভাবি।

আহির নাক ফুলিয়ে নালিশ জানালো ঝুমের কাছে। ঝুমের জন্য এসব নতুন। সে বুঝতে পারলো না আহিরের কথা। কিন্তু কিছু জানার ইচ্ছাও পোষণ করল না। আহির বরাবরের মতো নিরাশ হলো ঝুমের কাজে। মেয়েটা এত কম কথা বলে কেন? তার ভাইও কথা বলতে চায় না, ভাবিও কথা বলতে চায় না। এদের সংসার জীবন তাহলে কীভাবে কাটবে? আচ্ছা তার ভাতিজা, ভাতিজিগুলোও কী মা-বাবার মতো হবে নাকি? অসম্ভব। আহির এই অবিচার মানবে না। দরকার হয় সে নিজে ট্রেনিং দিবে ওদের। তাও এমন রোবট হতে দেবে না।

-ভাবি শুনুন?

আহির নড়েচড়ে বসে ভীষণ সিরিয়াস গলায় ডাকলো ঝুমকে। ঝুম এবার আহিরের দিকে মনোযোগ দিল। তার মনে হলো আহির তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে।

-জ্বি।

-আপনাদের তো এখন বিয়ে হয়েছে তাই না? তার মানে বাবুও হবে। দেখুন ভাবি, আপনি আর শাইয়ান দুজনই অতিমাত্রায় শান্ত, চুপচাপ। বাবুরাও যদি আপনাদের মতো হয়? ওদের নিয়ে আমি ভীষণ চিন্তিত। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ওদের আমি নিজের কাছে রেখে ট্রেনিং দেবো। আপনি কিন্তু অমত করতে পারবেন না আগেই বলে দিচ্ছি।

ঝুম হতভম্ব। লজ্জায় সে নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকলে সে নির্ঘাত লজ্জায় ম*রে যাবে। এরা দুই ভাই-ই নির্লজ্জ, ইতর। ছিঃ!

-আমার বাচ্চাদের নিয়ে তোমার চিন্তা না করলেও চলবে। তোমার মতো অহেতুক আপদের কাছে আমার বাচ্চাদের দেবো? কোনো দরকার নেই। ওদের জন্য আমিই যথেষ্ট। আমার বাচ্চারা আমার কাছে থাকবে, ওদের আব্বার কাছে।

কোত্থেকে শাইয়ান এসে হাজির। তার গলায় স্পষ্ট অধিকার বোধ। শাইয়ান তার লম্বা পায়ের বড় বড় কদম ফেলে একদম ঝুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দৃষ্টি আহিরের পানে। দেখেই মনে হচ্ছে এখনই সে আহিরকে চিবিয়ে খাবে।

শাইয়ানের কথা আহির মানতে নারাজ। সে সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল। শাইয়ানের কথার প্রতিবাদ জানিয়ে বলল,

-তোমার একার বাচ্চা বুঝি। ওরা আমার ভাবিরও। আর ভাবি কার? আমার।

সো টেকনিক্যালি ভাবিও আমার, ভাবির বাবুরাও আমার। তাই না ভাবি?

ঝুম বোকার মতো দুই ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। লম্বায় দুজন সমান। শারীরিক গঠন ও সৌন্দর্যের দিক দিয়ে কেউ কারো থেকে কম নয়। অথচ আল্লাহর দুনিয়ায় এই সুন্দর দুই মানবের ঘটে আল্লাহ পর্যাপ্ত বুদ্ধি দেয়নি বলে ঝুমের বড় আফসোস হল। নয়তো এমন অহেতুক বিষয় নিয়ে দুজন পূর্ণবয়স্ক দামড়া ছেলে এই মাঝে রাতে কথা কাটাকাটিতে মেতে উঠবে কেন? যাদের দুনিয়াতে কোনো অস্তিত্বই নেই তাদের নিয়ে দেখো দুজন কেমন রেগে আগুন হয়ে আছে! ঝুম মাথায় হাত দিল। লজ্জা কখন পাবে সে? তার শান্তশিষ্ট জীবনের সব শান্তি শেষ।

-তোমার ভাবি আমার বউ বুঝলে? বউ, বউ হয় আমার। ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও। বউ আমার, বাচ্চাও আমার। নিজে গিয়ে বিয়ে করে বাচ্চা পয়দা করো। অযথা আমার বউ, বাচ্চা নিয়ে টানাটানি করবে না।

শাইয়ান বেজায় চটেছে। বাচ্চা যেমন তেমন, বউ নিয়ে কেনো টানাটানি করবে? সে তার বউকে মোটেও দেবে না। অসম্ভব।

এদিকে কথাটা আহিরের গায়ে লাগলো প্রচুর। আজ তার বউ নেই বলে এত বড় কথা বলতে পারল শাইয়ান? এই অপমান মানা যায় না। সে ঝুমের দিকে তাকাল। রাগে হিসহিস করতে করতে বলল,

-ভাবি, আপনার জামাই আমাকে অপমান করছে। তাকে কিছু বলুন। তাকে বলে দিন আমি তার মতো বিয়ে করার জন্য হার্ট এ্যাটাক করে হাসপাতালে চলে যাই না। আমার একটা রেপুটেশন আছে তো। যখন তখন তো আর হাসপাতালে হুটহাট বিয়ে করতে পারি না। আপনি এক কাজ করুন, একটা বাংলাদেশি মেয়ে খুঁজে দিন। দিন তারিখ ঠিক করে বিয়ে করে ফেলি। এরপর আপনাদের দুজনকে একসাথেই না হয় নিয়ে যাবো পাকিস্তান।

প্রথম দিকের কথাগুলোতে শাইয়ান ভীষণ রেগে গিয়েছিল। কিন্তু শেষে তিন লাইনে তার চেহারায় শীতলতা নেমে এলো। চোখ দুটো ছোট ছোট করে আহিরের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। অতঃপর কিছুই হয়নি এমন করে ঝুমের দিকে ফিরে ঝুমের বামহাত নিজের ডানহাতের মাঝে ভীষণ যত্নের সাথে নিয়ে টেনে তুলল ঝুমকে।

-চলুন আরীবা, আমার ঘুম পেয়েছে।

কী হলো এটা? শাইয়ান কিছু বলল না কেন? আহিরের মুখ হাঁ হয়ে গেল। তার অবাকতা সীমানা পেরিয়েছে। ঝুমও কিছুটা ইতস্ততাবোধ করল। আহিরের সামনে হাত ধরায় লজ্জা পেল। নিজের হাত ছাড়াতে চাইল, কিন্তু শাইয়ান আরো শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় ঝুমের হাত আঁকড়ে ধরে আহিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-বুড়ো হয়ে যাচ্ছো আহির। বিয়েতে ফোকাস করো। যে কাজে এসেছো সেটা করো। সময় নেই বেশি।

এতটুকুই। আর একটা কথাও বলল না শাইয়ান। ঝুম কিছু বলতে চাইলো হয়তো। কিন্তু মেয়েটাকে অবাক করে দিয়ে শাইয়ান ওকে দুহাতের মাঝে কোলে তুলে নিয়ে পা বাড়ালো রুমের দিকে। এদিকে আহির স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। তার বুঝতে কষ্ট হলো না শাইয়ান সব বুঝে ফেলেছে। এখন কী তার লজ্জা পাওয়া উচিত? হয়তো, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার লজ্জা পাচ্ছে না।

____

-ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! নির্লজ্জ, অসভ্য পুরুষ। নামান আমাকে। আল্লাহ! নামান বলছি। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?

শাইয়ান মাত্রই ঝুমকে কোলে নিয়ে রুমে প্রবেশ করেছে। ঝুম চিংড়ি মাছের মতো শাইয়ানের দুহাতের মাঝে ছটফট করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য। অথচ রুমে ঢুকেও শাইয়ান ওকে ছাড়লো না। উল্টো আরও ভালোভাবে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল,

-এত রাতে বরের কোলে আপনাকে দেখার জন্য কেউ বসে নেই পাখি। আর দেখলেও বা কী? ভাববে বরের আদর খাচ্ছেন?

শাইয়ান ভাবলেশহীন। কথাগুলো বলতে বলতে সে দুই/তিনটা চুমু খেয়ে ফেলেছে ঝুমের কপালে। আজ সে বড় বেপরোয়া। সাহস বেড়েছে। কথায় কথায় ঝুমকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। ঝুম তেঁতে উঠে শাইয়ানের ছোট ছোট চুল নিজের নরম হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে বলল,

-নির্লজ্জ লোক। একটু তো লজ্জা করুন। ভাইয়ার সামনে? ছিঃ! কি লজ্জাজনক ঘটনা!

ঝুম হাতের মুঠোয় চুল আঁকড়ে ধরলেও জোরে ধরেনি। তার খেয়াল রয়েছে যেন শাইয়ান ব্যথা না পায়। শাইয়ান ঝুমের কাজে হেসে ফেলল। শব্দ করে মন খুলে হেসে উঠল। ঝুমের রাগে লাল হয়ে যাওয়া নাকের ডগায় ছোট একটি কামড় দিয়ে বলল,

-আপনি ভীষণ মিষ্টি পাখি। আপনাকে হাসলে মিষ্টি লাগে, কাঁদলে মিষ্টি লাগে, রাগলেও মিষ্টি লাগে। সবসময় মিষ্টি লাগে। আপনাকে আদর আদর লাগে পাখি। এত আদর কেনো আপনি?

ঝুম এতক্ষণ রাগে লাল হয়েছিল, এখন লাজে লাল হচ্ছে। মেয়েটার গাল, নাক, ঠোঁট র*ক্তবর্ন ধারণ করেছে। অথচ এমন রূপ দেখেও শাইয়ান মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ। তার বুক ধড়ফড় করছে। পাগল পাগল লাগছে। মেয়েটার এত রূপ! শাইয়ান ওর সব রূপে প্রেমে পরে। মেয়েটাকে কি সে বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখতে পারে না? এই মুখটা দেখলেও উথাল-পাথাল খুশি লাগে শাইয়ানের। জীবনটা বুঝি এভাবেই পরিপূর্ণ?

-পাখি?

শাইয়ানের চোখ ঘোলা। দৃষ্টি নিভু নিভু। বুকের পাটা দ্রুত গতিতে উঠানামা করছে। ঝুম শাইয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে চট করে চোখ বন্ধ করে নিল। এই লোক কী করবে এখন? পাগল নাকি? চায় কী?

শাইয়ান কি চায় সে নিজেও বুঝি জানে না। ঝুমকে আশেপাশে পেলেই তার দুনিয়া উল্টে যায়। তখন আর তার মাথা কাজ করে না। মন, মস্তিষ্ক জুড়ে তখন শুধু ঝুম বিরাজ করে।

-পাখি, তাকান আমার দিকে।

শাইয়ানের কণ্ঠ কাঁপছে। ছেলেটা ভয় পাচ্ছে কী? ঝুমের শরীর কাঁপছে। দুই হাত এখন শাইয়ানের কাঁধ, ঘাড় আঁকড়ে ধরে আছে। চোখ বন্ধ অবস্থায় বলল,

-নামবো।

মিনমিন করে বলল ঝুম। শাইয়ান শুনেও তা অগ্রাহ্য করল। অতঃপর মুখ নামিয়ে ঝুমের কানের কাছে মুখ নিয়ে থেমে থেমে কাঁপা গলায় বলল,

-একটু আদর করি?

চলবে___

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন