#অতৃপ্তির_মাঝে_তৃপ্তিময়_সে
#লেখিকা- সালসাবিল সারা
পর্ব - ৩০
__________________
৬৬.
--"গাড়ি সোজা বাড়ি যাবে,তন্ময়।"
আদ্রিনের কণ্ঠ বড্ড ঠান্ডা।এই কণ্ঠের সাথে যেনো আদ্রিনের ব্যক্তিত্বের মিল খুঁজে পায় না তৃপ্তি।সে লেপ্টে রইলো আদ্রিনের বুক গহ্বরে।চেয়েও সমান্তরাল হতে পারছে না।আদ্রিন তার কোমর শক্ত হাতে আকড়ে রইলো।সেই স্পর্শে তৃপ্তি তীব্র ক্ষোভের আভাস পাচ্ছে।
--"ওকে স্যার।কিন্তু,একটা কথা বুঝলাম না ম্যাডামের আইডি কার্ড ছাড়া কিভাবে গার্ডরা এন্ট্রি করতে দিলো?"
স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে তন্ময়।তার প্রশ্নে চিন্তার ভাঁজ পড়ে আদ্রিনের কপালে,
--"তারা সবাই একজোট ছিলো। রাঁধুনীর রূপ ধারণ করা সন্ত্রাসীদের সাথেই হাত তাদের।ওদের উদ্দেশ্যই ছিলো একাধারে সবাইকে হত্যা করা বা জিম্মি করা।তাই আইডি কার্ড নাকি অন্যকিছু দেখার তর সয়নি ওদের।ওদের দরকার ছিল মানুষ,যাদের তারা জিম্মি করতে পারবে বা মেরে ফেলতে পারবে।"
--"আমি দেখেছিলাম স্যার,বেরুনোর সময় গেইট ফাঁকা ছিলো।আমার মনে হয়,আপনার কথাটাই সঠিক।"
তন্ময় একমত হয় আদ্রিনের সমেত।
--"একটু সাবধানে চালাও গাড়ি। শর্টকাটের এই রাস্তাটা নড়বড়ে।"
আদ্রিন কথাটা বলে থামে।হৃদ মাঝারে আটকে থাকা প্রেয়সীর দিকে নজর দেয়।মেয়েটা তার বুকেই মুখ গুঁজে আছে।নিশ্চয় আদ্রিনের চোখে চোখ রাখার সাহস বা সুযোগ কিছুই পাচ্ছে না মেয়েটা!
আদ্রিন তার হাতের স্পর্শ দৃঢ় করলে তৃপ্তির সত্তা কাঁপে।সে আরো মিইয়ে যায় আদ্রিনের অভ্যন্তরে।
গাড়িকে তন্ময় দক্ষতার সাথে কন্ট্রোল করার চেষ্টায়। রাস্তাটা সরু এবং গর্তে ভরপুর।গাড়ির ঝাঁকুনির কারণে তৃপ্তির অস্বস্তি হয়।ব্যথা পাওয়া স্থানে আদ্রিনের হাত লাগতেই কুঁকিয়ে উঠে মেয়েটা,
--"আদ্রিন,ব্যথা পাচ্ছি কোমরে। পায়েও ব্যথা হচ্ছে।"
কান গরম হয়ে আসে আদ্রিনের। মুহূর্তেই মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়ে।গাড়ির ভেতরকার অ্যাটাচ লাইট জ্বালায় সে।বুক হতে তৃপ্তির মুখ উঠাতেই দেখে মেয়েটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে।আদ্রিনের রাগ কমলো না বৈকি বাড়লো। আলতো হাতে তৃপ্তিকে তার কোলে উঠিয়ে বসায়।সাবধানে,অতি যত্নে। ব্যথায় তৃপ্তি খাঁমচে ধরে আদ্রিনের বাহু।
--"পা আমার উরুর উপর রেখে বসো।"
আদ্রিনের সুরে তৃপ্তির বেশ কষ্ট হয়।লোকটা রেগে তার সাথে।অথচ তার রাগ ভাঙাতেই এই মেয়ে মধ্যরাতে একাই বাসা থেকে বেরিয়েছিল।আর এটাই তার বড় ভুল।মহৎ ভুল।তৃপ্তি জানতো না হিতের বিপরীত এতটা বাজে হবে।
আদ্রিনের কথা মতো তৃপ্তি পা রাখতে চায়।কিন্তু, পারে না। ডান পা অসাড়।মলিন কণ্ঠে মেয়েটা আওড়ায়,
--"পারছি না।পা ভার লাগছে।"
চোখ বুঁজে আবারও চোখ খুলে আদ্রিন।যে মেয়েকে সে নিজেই কোনোদিন আঘাত করার কথা ভুলেও ভাবেনি,সেই মেয়েকে নিজ দৃষ্টির সম্মুখে আঘাত পেতে দেখার মতো যন্ত্রণা আদ্রিন কখনো অনুভব করতে চায়নি।তবে,তাও সম্ভব হলো কেবল তারই মনের রাণীর জন্যে।এই তৃপ্তি নামের মেয়েটার জন্যে।বাম হাতটা এগিয়ে তৃপ্তির পা আগলে বেশ যত্নসহকারে নিজ উরুর উপর রাখলো আদ্রিন।
তৃপ্তির দৃষ্টি নিরুত্তর।খুব করে দোয়া করছে,আদ্রিন যেনো তাকে বাড়িতে রেখে আসে।যদিও জানে,আদ্রিন আর তাকে এখন বাড়ির কেউ একসাথে দেখলে কেলেঙ্কারি বেঁধে যাবে।তাও,সমস্যা নেই।আদ্রিন যে তার হয়ে যাবে কাল সারাজীবনের জন্যে।
মিনিট তিনেক পরে তৃপ্তির ভ্রম ভাঙ্গে।তার মাথায় খেলে যায় আদ্রিনের সকল কথাবার্তা।ছেলেটা বলেছে তাদের বিয়ে আজ।তাহলে সত্যিই কি আদ্রিন তার কথা রাখবে?বাবা খুব কষ্ট পাবে।কাঁদবেও হয়তো!
নিজ বাড়ির রাস্তার মোড় চিনতে ভুল হয়নি তৃপ্তির।সে সহসা ছটফটিয়ে উঠে,
--"আমি বাড়ি যাবো,আদ্রিন!"
--"বাড়িই যাচ্ছি।তন্ময়,রাফিকে ফোন করেছিলে?"
আদ্রিন কেমন উপেক্ষা করলো তৃপ্তিকে।তাচ্ছিল্যের আভাস স্পষ্ট।
--"তখন নেটওয়ার্ক ছিলো না।ফোন যায়নি।টেক্সট দিয়েছিলাম।রিপ্লাই এসেছে।সবকিছুর এরেঞ্জমেন্ট শেষ।"
তন্ময় হাসে।ছেলেটাকে খুশি মনে হচ্ছে।
তৃপ্তি আদ্রিনের কলার মুচড়ে ধরে।আঁখি ভেসে যাচ্ছে অশ্রুজলে,
--"বাবা কষ্ট পাবে।কালকের দিনটাই তো আদ্রিন।এমন করছেন কেনো?আমি ভুল করছি মানলাম।এর জন্যে এমন শাস্তি দিবেন না প্লিজ।আমার সহ্য হচ্ছে না।"
--"কান্না থামাও।মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে আমার।যে মেয়েকে আজ গভীর রাতে ঘর থেকে বের করতে পেরেছে,সেই মেয়েকে কাল আমি খুঁজে পাবো,এটার গ্যারান্টি আমি পাচ্ছি না।হয় তোমার ফ্যামিলির কেউ বা আমার ফ্যামিলির কেউ তোমাকে ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করার জন্যে বা আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির জন্যেই এমনটা করেছে। ভুল করেছো তুমি,ওদের ফাঁদে পা দিয়ে। সরি টু সে,আমি আমার জানের উপর আর রিস্ক নিতে পারবো না।"
রুঢ় কন্ঠটা তৃপ্তির শরীর অসাড় করে।বাবার কথা মনে আসতেই বুকটা কেমন পীড়া অনুভব করছে। তৃপ্তি ভাবতে পারছে না,আদ্রিনকে দেখার লোভটা অন্য কেউ বাজে ভাবে ব্যবহার করেছে তাদের আলাদা করার জন্যে!
শেষবারের মতো আকুতি করে সে আদ্রিনের গালে হাত রেখে,
--"আপনি এমন করছেন কেনো?আমার ভুল হয়েছে বুঝলাম।আপনি আমাকে বাসায় রেখে আসুন। কাল সব ঠিক হবে।সবাই খুশি আছে।আপনার এমন কাজে হয়তো পরিস্থিতির রূপ অন্যরকম হতে পারে।"
আদ্রিন নিজ গাল হতে তৃপ্তির হাত সরায়।কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিচেল কণ্ঠে শুধায়,
--"সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি করেছো।ছুঁতে নিষেধ করেছো।এমন কষ্ট আমার জীবনে আমি অনুভব করিনি।যারা আমাকে কষ্ট দেয় তাদের আমি দ্বিগুণ কষ্ট দিই।আর তোমার দেওয়া কষ্টটা আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিবো অন্যরকম ভাবে।"
--"বাবা কষ্ট পাবে।"
--"পাক।আমিও পেয়েছি।এখনো পাচ্ছি।ভুলতে পারছি না কিছু।"
--"আদ্রিন!"
--"কি?আরেকবার কথা বললে ভুলে যাবো গাড়িতে তন্ময় আছে।"
নিষিদ্ধ কিছু ইশারা বুঝতে পেয়ে নজর ঝুঁকায় তৃপ্তি।আদ্রিনের দিকে তাকানোর বিন্দুমাত্র সাহস নেই তার।আর কিছুই হাতে নেই তৃপ্তির।কেনো সে ঐ সময়ে অহেতুক কথাটা বললো!ছেলেটার মেজাজ হুটহাট বিগড়ে যায় এটা অজানা ছিলো না তার।
বাকি রাস্তায় আর একটা শব্দ আওড়ায়নি তৃপ্তি।না কিছু বলেছে আদ্রিন।আবাসিক এলাকায় গাড়ি প্রবেশ করতেই আদ্রিন ফোন করে রিয়ানাকে।বলে,ঘরের দরজায় যেনো উপস্থিত থাকে রিয়ানা।
__________
গাড়ি থামলে তৃপ্তিকে সিটে বসিয়ে আদ্রিন নামে।তৃপ্তির নজরে ইনায়া এবং আদ্রিনের দাদী ছাড়া সকল মহিলার অবয়ব দৃশ্যমান।আদ্রিনের হলুদের অনুষ্ঠান কমিউনিটি সেন্টারেই হয়েছিলো এবং শেষও হয়েছিলো অতিদ্রুত।স্বয়ং বর যখন অনুপস্থিত থাকে অনুষ্ঠানে,তাহলে সেই অনুষ্ঠান টেনে নেওয়ার মানে হয় না।তাই সকলে দ্রুত ফিরে এসেছিলো বাড়িতে।তৃপ্তিকে আদ্রিন আলগোছে নামালে,রিয়ানা এবং আদিবা এগিয়ে আসে।বাকি মহিলারা ভেতরে চলে যায়।তৃপ্তি দাঁড়াতে পারছে না।পায়ের গোড়ালি মচকেছে।কেমন অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে তার পায়ে।রিয়ানা আর আদিবা তাকে আগলে নিয়ে সম্মুখে হাঁটতেই আদ্রিন অনুভব করে তৃপ্তির কষ্টটা।হাঁটতে পারছে না মেয়েটা।তার উপর কোমর উন্মুক্ত মেয়েটার।শাড়ির পিন এতো ভেজালে নিশ্চয় টিকে থাকবে না!কোমরেও আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।ক্রোধে আঁখি জোড়া রক্তিম হয়।তৃপ্তির শুভ্র কোমরে কালসিটে চ্যাপ্টা দাগ।
আদ্রিন দ্রুত পায়ে এগোয়।কোমরের উপরে শাড়ি টেনে নিজেই তাকে কোলে তুলে নেয়।
আতঙ্কিত তৃপ্তি বললো না কিছুই।পায়ের গোড়ালিতে বড্ড পীড়া।আর না বললো রিয়ানা এবং আদিবা।আজ কারো মুখে হাসি নেই।সবাই জানে,আদ্রিনের মেজাজ ঠিক কতটা বিগড়ানো।নাহলে ছেলেটা এমন আজগুবি সিদ্ধান্ত নিতো না ইহকালে।
সোফায় তৃপ্তিকে বসানো হয়।রহস্যময়ভাবে তাদের বিয়েটাও হয়ে যায়।কাজী উপস্থিত ছিলেন পূর্ব হতে। ইনায়া বা দাদীও বলেনি কিছু।চুপ করে সবাই সবটা দেখলো কেবল।রাফি চুপিচুপি কিছু মুহূর্ত ফ্রেমবন্ধী করলো ক্যামেরায়।ইসলামী নিয়মে বিয়েটা আজ হলেও সিগনেচার হবে আগামীকাল।
কাজী যেতেই ইনায়া এইবার মুখ খুলে,
--"কি হয়েছে বলবে কিছু?"
আদ্রিনের নজর তৃপ্তিতে আটকে। ঘোমটা টানা তার প্রেয়সীর মুখটা ব্যথায় কাতর।প্রাথমিক চিকিৎসা দরকার।এর জন্যে আদ্রিনই যথেষ্ট।
আদ্রিনের নিরুত্তর থাকায় তার দাদী বলে উঠে,
--"কালই বিয়ে।আর আজ এতো নাটক করতে হলো?সবকিছু মেনে নিয়েছিল দুই পরিবার।তারপরও নাটক করতে হলো কেনো?"
--"নাটক আমি করিনি,না তৃপ্তি করেছে।একটা বড় ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।কালকের দিনটা হয়তো কোনো দিন আসতোই না আমাদের জীবনে!"
আদ্রিন থমথমে কণ্ঠে বলে।
--"মানে কি?"
ইনায়ার কণ্ঠে ভয় স্পষ্ট।
--"ও ব্যথা পেয়েছে।আমি একটু পর আসছি।স্টাডি রুমে থেকো দাদী আর আম্মি দুজনেই।রিয়ানা আপু,তুমি তৃপ্তির বাবাকে ফোন করবে। দুঃখিত বলে বলবে,'তৃপ্তিকে জরুরি কাজে তোমার সাথে এনেছো এই বাড়িতে।আমরা দুইজনই আলাদা থাকছি,দেখা হবে না দুজনের বিয়ের আগে।ওর দিদাকেও চিন্তিত হতে মানা করবে।যদি বলে কাউকে জানায়নি কেনো তবে বলবে.."
থামে আদ্রিন। বাঁকা দৃষ্টিতে তৃপ্তির পানে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
--"বাসায় সবাই ঘুম ছিলো?যখন বেরিয়েছিলে?"
তৃপ্তি উপর নিচ মাথা নাড়ে। যার অর্থ -"হ্যাঁ"।
আদ্রিন আবারও বলতে শুরু করে,
--"বলবে,সবাই ঘুম ছিলো তাই তৃপ্তি কাউকে জাগায়নি।আর বাকি কথা তুমি সামলে নিও।আমার অসহ্য লাগছে সব।"
--"ওকে দেখে মনে হচ্ছে অনেকখানি ব্যথা পেয়েছে।ডাক্তার ডাকবো?"
ইনায়ার বাক্যে স্পষ্ট চিন্তার ভাঁজ।তার কথার পিঠে আদ্রিন জবাব দেয়,
--"প্রয়োজন হলে আমি ফোন করবো।"
কথা শেষে আদ্রিনের যেনো ব্যস্ততা বাড়ে।তৃপ্তির সম্মুখে দাঁড়িয়ে হাত এগিয়ে বলে,
--"দেখি,আসো।"
৬৭.
তৃপ্তি নিশ্চুপ।ডাগর দৃষ্টিতে রুমটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।রুমে এসে তৃপ্তির গোড়ালিতে ব্যথা নিষ্কাশনের স্প্রে করে আদ্রিন বিনা বাক্যে ট্রাউজার আর টিশার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে যায়।
এইদিকে তৃপ্তির কোমরের ব্যথাটা কিছুতেই কমছে না।কোমরের নিচে বালিশ দিয়ে শুতে গেলেও পীড়ায় ঝনঝন করে উঠে শরীর। মাত্রারিক্ত যন্ত্রণায় শরীরটা কেমন নেতিয়ে যাচ্ছে যেনো।একদিক দিয়ে সে চিন্তামুক্ত।তার বাবা এখন আর ভুল বুঝবে না তাকে।
রিয়ানার কথা বাবা নিশ্চয় বিশ্বাস করবে।আদ্রিন তার সাথে যতটা জিদ দেখাতে চায় ততটা সে পূরণ করেনি।ছেলেটা হাজার হলেও সবকিছুতে তৃপ্তির সুখটা আগে চিন্তা করে।এটা ভাবতেই তৃপ্তির মন প্রশান্তিতে ভরে যায়।
ওয়াশরুম হতে আদ্রিন বেরোয় গোমড়া মুখে। হাতে ভেজা টিশার্ট। হয়তো টিশার্ট ওয়াশরুমের মেঝেতে পড়েছে।উদোম শরীরের আদ্রিন এখন তৃপ্তির নিকট হালাল।এই ছেলের উপর অধিকার কেবল তৃপ্তির।বিস্ফোরিত নজরে মেয়েটা তার প্রেমিক পুরুষের অবয়বে চেয়ে রয়।
সুঠামদেহী তার সঙ্গীর সত্তাকে নিজ হাতে ছুঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছাটা হঠাৎই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো তৃপ্তির।
সে হাতের ইশারায় গলা জড়ানো কণ্ঠে ডেকে উঠলো আদ্রিনকে,
--"এইদিকে আসুন।আমার কোমরে যন্ত্রণা হচ্ছে।"
তাওয়ালের সাহায্যে আদ্রিন মাথা মুছে।চুলগুলো এলোমেলো।তাদের আবার নিজ আঙ্গুলের সাহায্যে সঠিক স্থানে বসিয়ে দেয় আদ্রিন। সহসা সে এগিয়ে যায় তৃপ্তির সম্মুখে।বিছানায় পড়ে থাকা তৃপ্তির আঁচল নিজ হাতে পেঁচিয়ে নেয়। এতে কিঞ্চিৎ শঙ্কিত হয় তৃপ্তি। হঠাৎই মনে আসে,আদ্রিনের কঠোর বাক্য।এখন কি ছেলেটা তার সাথে ঘনিষ্ট হবে?মানা করার সাহস নেই তৃপ্তির।আদ্রিন এইভাবেই বড্ড ক্রোধে আক্রান্ত আজকের ঘটনার জন্যে।
বিনা বাক্যে তৃপ্তির পাশে বসলো আদ্রিন। আঁচল টেনে আরো কাছে আনলো তার প্রেয়সীকে। দুইজনাই বেশ কাছাকাছি।পরপর আদ্রিনের অধর ছুঁয়ে দেয় তৃপ্তির গলার ভাঁজে।আবেশে আদ্রিনের পিঠে হাত রেখে,তৃপ্তি কাতর ভঙ্গিতে বলে,
--"শুনুন।"
--"শুনবো না।আমার রাগ কমেনি।"
দৃষ্টি মিলে দুজনের।পরক্ষণে আদ্রিনের অধর নিজ অবস্থান জারি করে তৃপ্তির অধরে।আবেশের নতুন সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে প্রেমিক যুগল।আদ্রিন বেসামাল হতে গিয়েও সামলালো নিজেকে।তৃপ্তিকে নিজ বুক মাঝারে আগলে নেয়,
--"তোমার কিছু হলে,আমার সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতাম জান।তুমি আমার সব।"
তৃপ্তি হাঁপিয়ে উঠলো।লোকটার পুরুষালি অধর তার নরম ফোলা অধরের কিনারা কাটতে সফল। তাও দ্বিধা করছে না তৃপ্তি।সত্যি বিরাট ভুল করেছে আজ সে।দুহাতে পিঠ আঁকড়ে ধরলো সে আদ্রিনের,
--"আপনার সাথে কথা না বলে আমি আর কোথাও যাবো না,আদ্রিন।সরি।অনেক বেশি সরি।"
তৃপ্তির মাথার তালুতে ভালোবাসাময় স্পর্শ দিতে ভুলেনি আদ্রিন,
--"কখনোই যেনো ভুলেও না বলো,তোমাকে টাচ না করতে।মাথায় রক্ত উঠে যায় আমার,মেহেবুবা।"
তৃপ্তি হাসে।আদুরে ভঙ্গিতে দুহাত রাখে লোকটার ট্রিমকরা দাড়ির উপরে,
--"বলবো না।"
আদ্রিনের নেশাক্ত দৃষ্টি আয়ত্বে আসলে তৃপ্তি খানেকটা ঘাবড়িয়ে যায়। আদ্রিন তার আঁচল হতে পিন সরালে আঁচল নেমে যায় সম্পূর্ণ।লজ্জায় নুয়ে পড়ে তৃপ্তি।নিষিদ্ধ সত্তায় আঁখি স্তব্দ হলেও নিজেকে সামলায় বেসামাল আদ্রিন।ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে আর কোনো ক্ষত আছে কিনা!নেই।শুধু কোমরেই চ্যাপ্টা ক্ষত।নির্দেশের সুরে সে তৃপ্তিকে বলে,
--"শুয়ে পড়ো সাবধানে।কোমর দেখি।"
নিজের মনের ভুলে নিজেই আড়ষ্ট হয় তৃপ্তি।আদ্রিন তার ক্ষত দেখতে চায় আর তৃপ্তি কি ভাবলো!আদ্রিন যদি জানে নিশ্চয় হাসবে তার উপর! দৃষ্টি মেলানোর সাহস হয়নি তৃপ্তির। উবু হয়ে শুয়ে পড়ে।ক্ষত দেখে আদ্রিন।মূলত অয়েনমেন্ট লাগালেই সেরে যাবে।আদ্রিন উঠে,ফার্স্ট এইড বক্স হতে অয়েনমেন্ট এনে নিজ কাজ সারে,
--"ঘুমিয়ে পড়ো। কাল বিয়েটা ঠিকভাবে হউক এটাই চাই।"
--"ব্যথা না সারলে?"
--"সারবে জান।আজ ছাড় পাচ্ছো বলে ভেবো না সবসময় দূরে রাখবো আমার থেকে!এইযে তুমি আমার জন্যে হালাল কিন্তু তাও তোমাকে স্পর্শ করতে দ্বিধা।যদি শরীর খারাপ হয় তোমার!এইসব কষ্ট বুঝবে না তুমি।"
আদ্রিনের কণ্ঠে দুষ্টুমি ভরা অসহায়ত্ব।তৃপ্তি আবারও হাসলে আদ্রিন তার পানে চেয়ে রয়।বউ রূপে মেয়েটাকে কি একটু বেশি মনোরম লাগছে?
আদ্রিন বেশ নিকটে আসে তৃপ্তির।তার ঘন নিঃশ্বাসে ঘায়েল হচ্ছে তৃপ্তির ছোট্ট তনু।
--"এমন নেশাক্ত হওয়াটা কি খুব দরকার ছিল? নেশাক্ত হয়েও নেশায় মত্ত হতে দিলে না।পাষাণ মেয়ে।"
--"আমার আপত্তি ন..."
তৃপ্তির অধরে আঙ্গুল ঠেকায় আদ্রিন,
--"একটা শব্দও না।পারবে না সহ্য করতে।ঘুমাও।"
মাথা নাড়ে তৃপ্তি,
--"আপনি ঘুমাবেন না?"
--"আম্মির সাথে কথা বলবো আগে।"
অতঃপর তৃপ্তি তার প্রিয়তমের উদর জড়িয়ে ধরে।ব্যথানাশক ঔষধের জেরে এইভাবেই তার আঁখি ভার।আদ্রিন আলগোছে মাথায় হাত ছুঁয়ে দিতেই মেয়েটা নিদ্রায় শায়িত হয়।
পাতলা কম্বল টেনে ঠিকভাবে তৃপ্তির মাথা বালিশে রাখে আদ্রিন।আরেক নজর তৃপ্তির পানে চায় সে।মেয়েটা এইখানে ঘুমাচ্ছে,তার কাছেই আছে এতে যেনো তার সকল প্রশান্তি নিহীত।
পরক্ষণে আজকের ঘটনা মনে আসতেই গম্ভীরতা ভর করে আদ্রিনের মুখশ্রীতে।
স্টাডি রুমে গেলে তার মা এবং দাদীকে দেখতে পায়।আদ্রিনকে দেখে তার মা প্রশ্ন করে,
--"ঘুমিয়েছে?"
--"কে করেছো তৃপ্তির সাথে এমন?"
আদ্রিনের সরাসরি প্রশ্নে আঁতকে উঠে দুজনেই।
ইনায়া কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
--"মেয়েটা তোমার জীবনে কি,সেটা আমি ভালো জানি।এই মেয়েকে আমি কেনো কষ্ট দিবো?"
আদ্রিন তার দাদীর পানে তাকালে মহিলা আমতা আমতা করে শুধায়,
--"আমার এই বয়সে এইসব ভাববো নাকি আমি?"
আদ্রিন বাঁকা হাসে।দুহাতে টেবিলে ভর দেয়।আক্রোশ ভরা কণ্ঠে গর্জন করে,
--"সে যেই হোক।অবশ্যই সে এই পরিবার নাহলে তৃপ্তির পরিবারের কেউ।বিলিভ মি,যেদিন আমি জানবো আমার মেহেবুবাকে যে আমার থেকে দূরে সরাতে চেয়েছে,তাকে আমি নিঃশেষ করবো।একেবারে নয়।ধীরে ধীরে।"
চলবে.....