#অতৃপ্তির_মাঝে_তৃপ্তিময়_সে
#লেখিকা- সালসাবিল সারা
পর্ব- ৩৩
সিনু ল্যাপটপ চালু করে।গার্ড কাশেমের সকল ফুটেজ ক্লিয়ার। কাল অব্দি যে সিসিটিভি ফুটেজ কেউ উদ্ধার করতে অক্ষম ছিলো সেখানে আজ এমন ফুটেজ দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় আদ্রিনের,
--"সিসিটিভি ফুটেজ!কিভাবে পসিবল এটা?"
--"আমার ফ্রেন্ড জনি, আইসিটিটিতে টপার। ফরেইনে সকল ব্ল্যাংক সিসিটিভি ফুটেজ পাঠিয়েছিলাম।সে আজ সকালে উদ্ধার করে দিলো।এইখানে একটা লিংক ছিলো।মূলত ঐটাই উদ্ধার করার ক্ষমতা সাধারণ এক্সপার্টের চোখেও পড়ে না। জনি,বেশ দুর্দান্ত।"
(কাল্পনিক ব্যাখ্যা)
আদ্রিনের মুখভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি।কিভাবে উদ্ধার হয়েছে সেটা বিষয় নয়।সিসিটিভিতে কি হচ্ছে এটাই তার মুর্দা বিষয়।
কাশেমের পাশাপাশি কবিরকে দেখা যাচ্ছে।দুইজনই লকার থেকে টাকা তুলে।এরপর ছাদের সিসিটিভি সতেজ হয়।এতো এতো টাকা বড় এক পানির ট্যাংকে ঢালে।সাথে মিক্স করে ক্যামিকেল।কিছু সময় বাদে সেখান থেকে কাশেম উদ্ধার করে কাগজের থকথকে অংশ।আবারও বাকি টাকা একই কায়দায় নষ্ট করে।পরে সেই থকথকে টাকার অংশবিশেষ পানি দ্বারা পরিষ্কার করে দুজন।টাকার মান শেষ হয়,পানির লাইন দ্বারা বয়ে,নামে নালায়।আদ্রিনের সকল মেহনতের ফল শেষ নালায় ভেসে।এতো টাকা নষ্টের পাপের ভয়ে কান্না করে কবির। তা দেখে এলোপাথাড়ি কয়েক ঘা মার দেয় কাশেম তাকে। কবিরকে শাসানোর দৃশ্য দেখা যায়। ছাদের সবকিছু পরিষ্কার করে দুজনে।এই ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ স্থগিত হয়।
পরের ঘটনা তন্ময় বলে,
--"সিসিটিভি ফুটেজের এতটুকু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে স্যার।আর পরের ঘটনা তো জানেন।রাতের আঁধারে সিসিটিভির আলোতে তাদের স্পষ্ট দেখা যাবে এটা তারা ভাবেনি।আর সিসিটিভি নষ্ট করার চেষ্টাও করেছে।চেষ্টা নয়, নষ্ট করেছে।বাংলাদেশী এক্সপার্টও উদ্ধারে সক্ষম হয়নি।এখন কাশেমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত।"
আদ্রিনের কপালের রগ ফুলে উঠে।তার কষ্টের ফল নেই। জলে ধুয়ে সমাপ্তি টেনেছে।এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় লস। ঘাড়ে হাত বুলায় আদ্রিন।কিছু বলার পূর্বে তার চাচা পেছন থেকে বলে,
--"ওহ মাই গড,আদ্রিন! তোমার এত টাকা লস হয়েছে?কিভাবে?লোকটাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না।"
আদ্রিন ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে ফিরে।রাফির বাবা দাঁড়িয়ে।মুখভঙ্গি পেরেশানিতে ভরপুর।আদ্রিনের ব্যাপারে উনাকে এতটা চিন্তিত হওয়াটা হজম হচ্ছে না তার।গম্ভীর গলায় সে জবাব দেয়,
--"লস আমার কিছু বাঁকা করতে পারবে না।আমি আমার কাজ সামলে নিবো চাচ্চু।"
রাফির বাবা হেসে স্থান ত্যাগ করে।যেতে যেতে ফোন চাপে।ফোন করে একজনকে।
আদ্রিন নিজ ভাবনায় মশগুল।সে থানায় ফোন দেয়।নিজ পরিচয় দিয়ে পুলিশকে নিজ বাসায় আসতে বলে।সবাই একসাথে যাবে অফিসে।রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে হওয়ায় সুসম্পর্ক আছে তার উপরের স্তরের মানুষের সহিত।আদ্রিন পরিহিত শার্টের কলার ঠিক করে।ভেতরটা অন্যরকম।টাকার ব্যাপারটা মনে আসলে তার অস্থিরতা কাজ করে।অফিসে ট্যাকেল দেওয়াটা খুব রোমাঞ্চকর হবে এখন।ঘুরে তাকে দাঁড়াতে হবেই।পিছুটান রাখবে না কোনো।
বাসা থেকে নাস্তা এনে টেবিলে রাখে সার্ভেন্ট।
--"খেয়ে নাও তোমরা।"
আদ্রিন নিজ কথা শেষে উঠে পড়ে।তন্ময় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
--"স্যার,আপনি?"
--"পরে।"
আদ্রিন হাঁটতে থাকে গার্ডেনে।সিকিউরিটি গার্ডকে ইশারায় ডাকে।বাড়ির ভেতর হতে সিগারেট আনায়।নির্দ্বিধায় ফুঁকতে থাকে।কবিরকে জোর করে সবটা করিয়েছে কাশেম এটা স্পষ্ট।কিন্তু,কাশেম কার সাহসে এতবড় কাজটা করলো!রাতের বেলা কাশেম ছাড়া কেউ অফিসের ভেতরে চেক করে না কিছু।ব্যাবসা শুরু পর হতে কাশেম তার দায়িত্ব নির্দিষ্ট সৎ উদ্দেশ্যে পালন করেছে।তাহলে এবার কি হলো? কার কথায় আদ্রিনের বিশ্বাস ভেঙেছে?
পকেটে এক হাত পুরে অন্যহাতের দু আঙুলের ভাঁজে সিগারেট আটকে রেখে ভাবনায় মশগুল সে।খানিক বাদে গার্ড আসে তার নিকট,
--"পুলিশ এসেছে।"
তন্ময় আর সিনু ততক্ষণে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।পুলিশের সাথে যাওয়ার অপেক্ষা করলো না।কাশেমকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না এই বিষয়ে।
আদ্রিন হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত সিগারেট নিভিয়ে নেয়।প্রধান ফটকের সম্মুখে যায়।পুলিশের সাথে কথা বলে।দুইজন সিভিল ড্রেসে এসেছে।তারাই মূলত আদ্রিনের সাথে অফিসের ভেতরে যাবে। যাতে কাশেম কিছুই টের না পায়।
দূরে অবস্থিত ঘরে আদ্রিনের কক্ষের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তৃপ্তি আড়ালে দেখছিল সবটা।গোসল শেষে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছি সেল।রাত থেকে পেটের নিচ অংশে পীড়া হচ্ছিল,সেটা এখনো বিদ্যমান।উদরে আলতো করে হাত স্পর্শ করে তৃপ্তি।হঠাৎই দৃষ্টি গোলাকার আকৃতি ধারণ করে।পুলিশের একজন আদ্রিনের হাতে হাতকড়া এগিয়ে নিলে তৃপ্তি চিৎকার দিয়ে উঠে আদ্রিনের নাম ধরে। কাঁচে ঘেরাও করা ব্যালকনির বাহিরে শব্দ যায়নি তৃপ্তির।কাঁচটা নামানো যায় এটাও ভুলে বসেছে সে।জানালা দিয়েও সে আদ্রিনের সাথে কথা বলতে পারতো।কিন্তু,মেয়েটার বুদ্ধি লোপ পায়।দ্রুত ছুট লাগায়।পুরো বাড়ি সাফ মনে হলো তার।অবশ্য বাড়ি বেশ বড় আয়তনের। কোনো রুমে কেউ আটকে থাকলেও জানবে না।
সিঁড়ি বেয়ে নেমেও কাউকে দেখেনি তৃপ্তি।মেয়েটা এটাই বুঝেনি সবাই ডাইনিংয়ে আছে।
অশ্রুজলে গাল ছেপে যায় তৃপ্তির।আদ্রিনকে কেনো গ্রেফতার করছে!
সে বাহিরের দিকে যেতে যেতেই ধাক্কা লাগে তার কারো সাথে।বেশ জোরেই দৌড়াচ্ছিল তৃপ্তি।ফলস্বরূপ পড়ে যেতে নেয়।কিন্তু,পড়ে না।আদ্রিন তার পিঠের নিচে হাত দিয়ে সামলে নেয়।অফিসারদের গার্ডেনে বসিয়ে নাস্তা খাওয়ার অনুরোধ করে সে বাসায় ফিরছিলো।
তৃপ্তির এমন ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে অস্থির হয় আদ্রিন,
--"কি হয়েছে?দৌড়াচ্ছিলে কেনো?"
তৃপ্তির দৃষ্টিতে আদ্রিনকে দেখে সুখ পায়।মেয়েটা কেঁদে উঠে শব্দ করে।বিচলিত হয় আদ্রিন।তার দুগালে হাত রেখে শুধায়,
--"কান্না কেনো?"
তৃপ্তি কথা বলেনি একটিও।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আদ্রিনকে।বুঝেনি আদ্রিন কিছু।তৃপ্তির মাথায় হাত বুলিয়ে ফের জিজ্ঞাসা করে,
--"আরে বলবে তো কি হলো? ছুটছিলে কেনো?"
তৃপ্তির কান্না থামেনি।সে ভয় পেয়েছে। লোকটাতে তার জান আটকে।এক মুহূর্তের জন্যে কি ভেবেছে সে!
কয়েকজন সার্ভেন্ট তাদের এমন অবস্থায় অবলোকন করে মুচকি হেসে নিজ রাস্তা মাপে।
--"তৃপ্তি?কাদঁছো কেনো রে বাবা!"
--"আমি ভেবেছি পুলিশ আপনাকে এরেস্ট করবে।ভয় পেয়েছিলাম।"
তৃপ্তির বোকামিতে হাসে আদ্রিন,
--"উপর থেকে লুকিয়ে আমাকে দেখা হচ্ছিলো?"
আদ্রিনের বুক মাঝারে উপর নিচ মাথা নাড়ায় তৃপ্তি।
--"শান্ত হও।"
আদ্রিনের স্নেহের সুর।
--"হাতকড়া কেনো এগিয়ে দিয়েছে উনারা?"
তৃপ্তি মাথা তুলে প্রশ্ন করে।
--"এমনি দেখতে চেয়েছিলাম আমি।"
বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা জলের আস্তরণ মুছে দেয় আদ্রিন।
তৃপ্তি ছোট্ট করে বলে,
--"ওহ।"
--"এমন স্ট্রং মেয়ে,আমার বেলায় কেঁদেকুটে হয়রান হয় ভাবতেই অবাক লাগে।"
আদ্রিনের ঠাট্টার সুর ঠিকই বুঝে তৃপ্তি।মুখ ফুটে বলতে পারলো না,
--"আপনি আমার সব আদ্রিন।আপনাকে হারানোর ভয় আমার সবচেয়ে বড় ভয়।"
নিশ্চুপ থাকায় আদ্রিন তার গাল টেনে বলে,
--"উনারা বাহিরে আছেন,গার্ডেনে।চাচু কথা বলছে।চলো নাস্তা খাবে।"
তৃপ্তি সমর্থন জানায়।এইভাবে হুট করে ব্যথার বিপরীতে দৌড় দেওয়ায় ব্যথা বাড়ে তৃপ্তির।পেটের নিচু অংশে চিনচিন করছে।তার ধীরে হাঁটা, পেটে হাত চেপে রাখা লক্ষ্য করে আদ্রিন।বাহু টেনে দাঁড় করায়,
--"ব্যথা কমেনি?"
--"কমেছে।"
--"হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?স্পষ্ট দেখছি তুমি ধীরে হাঁটছো। মিথ্যে কেনো বলছো?"
আদ্রিনের কণ্ঠে তেজ।
--"ঠিক হবে।আপনি চিন্তা করবেন না।"
--"আমার সব চিন্তা তোকে নিয়েই।রাতে পেইনকিলার খেলে এই অবস্থা হতো?নাস্তা সেরে খাবি।আচ্ছা আমি দেখবো ব্যাপারটা।"
আদ্রিনের কথায় দমে যায় তৃপ্তি।পরক্ষণে নিজ গলায় স্পর্শ অনুভব করে সে।আদ্রিনের চুল টেনে সরাতে চায়।পারে না।আদ্রিন নিজ ইচ্ছা পেশ করে সরে।ভেজা গলা শাড়ি দ্বারা মুছে তৃপ্তি।
আদ্রিন কিছু ব্যক্ত করলো না।লোকটা রেগেছে বুঝতে বেগ পায়নি তৃপ্তি।খাবার টেবিলে তৃপ্তির কান্নারত চেহারা দেখে,ইনায়া এবং রিয়ানা প্রশ্ন করতে গিয়েও করে না আদ্রিনকে লক্ষ্য করে।আদ্রিনের মুখশ্রীতে কঠিন রাগ ছেপে।
৭৩.
নাস্তা শেষ করে আদ্রিন ঝটপট।টেবিলে সকলে উপস্থিত।কয়কজন আত্মীয় আছে।তৃপ্তিকে উদ্দেশ্য করে আদ্রিন বলে উঠে,
--"রুমে আসবে নাস্তা শেষে।"
--"জ্বী।"
তৃপ্তি জবাব দেয়।
সে যেতেই ইনায়া হেসে বলে,
--"একসাথে নাস্তা আমার ছেলেটা খুব কম খায়।আজকে সে একসাথে নাস্তা করবে আশা করিনি।তোমাকে ধন্যবাদ।"
বিনিময়ে তৃপ্তি হাসে,
--"ধন্যবাদ দিবেন না,আম্মি।আপনার ছেলে আপনাকে ভালোবাসে।"
--"জানি।কিন্তু কিছু কারণে দূরত্ব এসেছে।"
ইনায়া দুঃখভরা কণ্ঠে বলে।
তৃপ্তি পাঁচ মিনিটে নাস্তা গিলে।উদরে হাত চেপে সকলের আড়ালে ধীরে হেঁটে কক্ষে যায়।মুহূর্তেই উপলব্ধি করে আদ্রিন দেওয়ালে ঘুষি দেয়।গমগমে সুরে চিল্লিয়ে উঠে,
--"এক্সিডেন্ট হয়েছে!গাড়ির নম্বর সিসিটিভিতে উঠেছে?"
অপর পাশে জবাব দিলে আদ্রিন আরো তেতিয়ে উঠে,
--"এটা জেনে শুনে করানো হয়েছে।যেনো সিসিটিভিতে কিছু না উঠে।আমি আসছি।ছাড়বো না কাউকে। সিনুকে কাজে লাগাও।প্রশাসনিক ভবনের সেই ঘটনাতেও ইনভলব করো ওকে।"
ফোন কাটে আদ্রিন।পূর্ব হতেই তৈরি ছিলো সে।কেবল বাকি ডান হাতের শার্টের বোতাম লাগানো।সেই কাজ সম্পাদন করতে করতে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে।তৃপ্তির হাত টেনে বিছানায় বসায়।পেইনকিলার নিয়ে তার মুখে পুরে দেয়,
--"আমার কথা শুনলে এতো কষ্ট হতো না।"
তৃপ্তি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে আদ্রিনের ভেতরে কিছু চলছে।অন্য কোনো বিষয়ে আদ্রিন পেরেশান।
তৃপ্তি দুহাতে আগলে নেয় আদ্রিনের গাল,
--"কি হয়েছে?বেশি চিন্তিত লাগছে আপনাকে।"
আদ্রিনের মন খারাপ সব উগলে এলো।ছেলেটা নিজ দূর্বলতা দেখায় না। তৃপ্তিকেও দেখাবে না।সব মন খারাপ মাটিতে পিষে সে তৃপ্তির হাতে অধর ছুঁয়ে দেয়।বাকি ভালোবাসার বোঝাপড়া শেষে ছাড়ে সে তৃপ্তিকে।উপদেশের সুরে বলে,
--"ফিরতে দেরী হবে।খেয়ে নিও। ব্যথা হলে আপুকে বলবে।চুপ করে থাকবে না।"
তৃপ্তি হাঁপাচ্ছে।আদ্রিনের কাঁধে তার মাথা ঠেকানো।পরক্ষণে আদ্রিনের ফোন এলে তৃপ্তি উঠে।আদ্রিন ইশারায় বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যায় কক্ষ হতে। খানিক্ষণ আগের ঘটনার জন্যে তৃপ্তির তনু তিরতির করে।আদ্রিনের একেক স্পর্শ যেনো মাদকতায় ঘেরা।
--------
বিকালের দিকে অলস সময় পার করে তৃপ্তি।সাফার জ্বর।রিয়ানা তাই নিষেধ করেছে তার নিকট যেতে।ভাইরাস জ্বর দ্রুত ছড়ায়।তৃপ্তি বার কয়েক চেষ্টা করেছে রুমে যেতে।কিন্তু,রিয়ানা মানেনি। দাদীও বাঁধ সাধে।নতুন বউ এইভাবে অসুস্থ হওয়াটা সুবিধার না।তৃপ্তি দাদীর কক্ষে যায়।দাদী খুশি হয় বেশ।আদ্রিনের নানান কাহিনী বলে।তৃপ্তি মজা পাচ্ছে।কয়েকবার হাসতে হাসতেই কুপোকাত হয়।আদ্রিনের ছোটকালের বর্ণনার সাথে এখনের বর্ণনায় ঘোর অমিল।ইনায়ার সহিত তার মনোমালিন্যের কথাটাও দাদী জানায়।আবারও পরিবেশ থমথমে হয়।
দাদী পরিবেশকে আরো গম্ভীর করে আদ্রিনের ব্যবসায়িক লসের কথা জানিয়ে।বুক ভার হয় তৃপ্তির।এতো চাপ কিভাবে সহ্য করছে তার প্রাণ ভোমরা! তৃপ্তির আঁখি ছলছল দেখে দাদী হাত বুলায় তার মাথায়,
--"কান্না করার কিছু না।আমার নাতি অনেক শক্ত। ওরে ভাঙা সহজ না।"
হঠাৎই তৃপ্তির ফোনে কল আসে।বাড়ি থেকে ফোন।
দুটো রিং পড়তেই রিসিভ করে,
--"হ্যাঁ, লাভি বলো।"
অপর পাশ হতে চামেলী বলে,
--"তোর দিদার শরীর ভালো না।তোকে দেখতে চাচ্ছে।"
--"আসছি আমি।"
হদতন্ত হয় তৃপ্তি।দাদীকে ব্যাপারটা জানায়।দাদী চিন্তিত সুরে বলে,
--"চলো বউমা।আমি যাবো তোমার সাথে।"
--"ঠিকাছে দাদী।"
তৃপ্তি তাড়াহুড়োয় যে কাপড়ে ছিলো তেমনই দাদীর সাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।সাথে যায় মিনাও।
ঐ বাড়ির সবাই অ্যাপায়ন করে আদ্রিনের দাদী এবং চাচীকে।তৃপ্তির দীদা ঘুমানো অব্দি তৃপ্তির হাত ধরেছিলো। প্রবীণ মহিলা নাতনিকে পেয়ে খুশি হয়েছিল বেজায়।যাওয়ার বেলায় আদ্রিনের দাদী তৃপ্তিকে বলে,
--"আজ থেকে যাও। কাল গাড়ি পাঠাবো।"
তৃপ্তির মনে আসে আদ্রিনের কথা।তাকে না জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া তৃপ্তির জন্যে সুখকর হবে না।সে বিনা দ্বিধায় দাদীকে জবাব দেয়,
--"উনাকে জানায়নি দাদী আমি এইখানে।উনি ফোন ধরছেন না।"
--"তন্ময়কে দাও।"
দাদীর কথায় তৃপ্তি বলে,
--"কথা হয়েছে।উনারা ভীষণ ব্যস্ত।"
তাদের কথায় অর্ক বলে উঠে,
--"তুই আরেকটু থাক।কাকা আসছে।"
তৃপ্তির বাবা দোকানের কাজে মেয়েকে দেখতে আসেনি।এখন আসছে।এইদিকে আদ্রিনের দাদীরও শরীর অস্থির লাগছে।
--"বৌমা তুমি ভাইয়ের সাথে এসে যেও।আমি মিনাকে নিয়ে বাড়ি ফিরি।"
তৃপ্তি সম্মতি জানালে উনারা চলে যান।
বসার ঘরে তৃপ্তি প্রিয়কে কোলে নিয়ে বসে।বোনকে কাছে পেয়ে প্রিয়ের সুখের অন্ত নেই।সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিলো গমগমে।আবারও ফোন বাজে তৃপ্তির।আদ্রিন ফোন করেছে।ভিড় থেকে বেরিয়ে পেছনের দিকে যায় মেয়েটা।বাহিরে শীতল পবন।আকাশে বড় চাঁদ।ফোন কানে দিতেই ভেসে আসে আদ্রিনের কণ্ঠ,
--"রেডি হয়ে থেকো।আমি আসছি।"
--"আপনি এতদূর থেকে আসবেন?অর্ক দাদা নিয়ে যাবে আমাকে।"
তৃপ্তির কথার পরোয়া করেনি আদ্রিন,
--"বিশ মিনিটে আসছি।"
--"ডিনার রেডি করবো তাহলে?"
তৃপ্তির কথায় আদ্রিনের কণ্ঠ নরম হয়।কেমন ফিসফিসিয়ে বলে,
--"ডিনার করেছি অফিসে।তবে,অন্য ডিনার এখনো বাকি আছে।"
ফিচেল হাসিটা শ্রবণে এড়িয়ে যায়নি তৃপ্তির।লোকটা ঠোঁটকাটা।লজ্জাহীন।এইদিকে সেই বাক্যে তৃপ্তির গাল রক্তিম হয়।ফোন কাটে মেয়েটা।নির্লজ্জ ছেলেটাকে কি বা উত্তর দিবে?
আদ্রিনের আসার ব্যাপারটা তৃপ্তি বাবাকে জানায়।অরিত্রন একটু বেজার হলেও কিছু বলে না।মেয়েটা যে এখন সম্পূর্ণ আদ্রিনের।
সত্যি মিনিট বিশেক পরে আদ্রিন আসে।ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়েই প্রিয়কে আদর করে। প্রিয়র জন্যে আনা চকলেটের বাক্স হাতে দেয়,
--"তোমার জন্যে প্রিয়।"
প্রিয় খুশি হয়।হাত বাড়িয়ে নেয়,
--"এত্তগুলো চকলেট!ভাইয়া তুমি বেস্ট।"
চামেলী চোখ রাঙায়,
--"আপনি করে বলো,প্রিয়।"
আদ্রিন প্রিয়র মাথায় হাত বুলায়,
--"সমস্যা নেই।"
তৃপ্তি সকল থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায় আদ্রিনের সমেত।তন্ময় ড্রাইভিংয়ে।পেছনের সিটে আদ্রিন এবং তৃপ্তি।তার কাঁধের উপর হাত এলিয়ে আদ্রিন সিটে হেলান দেয়।রাস্তায় আঁধার ঘুটঘুটে।চারিদিকে বৃহৎ গাছের ছায়ার কারণে চাঁদের আলো এই রাস্তায় আসতে বেগ পাচ্ছে।কেবল গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে মিটমিটিয়ে।পেছনের সিটে দুজনের অবয়ব ছাড়া কিছু দৃশ্যমান নয়।অবয়ব দুটিও অস্পষ্ট।তারা মেইন সড়কে না গিয়ে অন্য রাস্তায় যাচ্ছে।প্রধান সড়ক নিরাপদ নয়।কাশেম বেঁচে নেই।কালপ্রিট বের করার তদন্ত চলছে।
আদ্রিন তার পাশে থাকা অর্ধাঙ্গীর উপর কিছুতেই রিস্ক নিতে পারবে না।জানালার ধারে বসা তৃপ্তির নিকট এগিয়ে যায় সে।তার কাঁধে মাথা রাখে।হাত পৌঁছে যায় প্রিয়তমার শাড়ির ভাঁজে।তৃপ্তি চমকালো,হচকালো।বিস্ফোরিত নজরে তাকালো। আঁধারে সবকিছু ধোঁয়াশা। সামনে সিট থাকায় তাদের অবয়ব ঢেকে আছে সন্তর্পনে।তাই তাদের অবলোকন করা অসম্ভব কাজ।আদ্রিনের হাত সরাতে চাইলে আদ্রিন মাথা উঠায়। ফিসফিসিয়ে নিঃশব্দে বলে,
--"মাথায় হাত বুলিয়ে দাও,জান।তোমার ছোঁয়ায় আমার সকল ক্লান্তি শেষ হয়।আমি ফিরে পাই আমার শক্তি।"
চলবে.....