ক্রাশ কনফেশন
লেখাঃ আফিয়া আপ্পিতা
পর্ব- ২৩
'আপি তুমি কোথায়?" আভানের কথা কানে যেতেই দৌড় দিলাম ড্রয়িংরুমে। আভান এসেছে! কতদিন ভাইটাকে দেখি না আমি! যেন ওর মিঃ বিন মার্কা চেহারা ও ভুলে গিয়েছি। ড্রয়িংরুমে গিয়ে চমক পেলাম। শুধু আভান নয় মা, বাবা ও এসেছে। ড্রয়িংরুমে প্রচুর মানুষ। ছোটখাটো সভা বলা যায়। শ্বাশুড়ি মা, শ্বশুর বাবা, দিতিয়া, আমার না হওয়া স্বামীর ছেলে প্রদীপ সবাই আছে। মাছির মতো ভনভন করে আড্ডা জুড়ে দিয়েছে সবাই। আমাকে দেখে সবাই কথা থামিয়ে তাকালো আমার দিকে। আভান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। আমি ঝাপটে ধরে আদর করলাম ওকে। আভান রীতিমতো তার কথার ভাণ্ডার খুলে বসেছে,
"আপি জানো? আমি বাবার সাথে মঙ্গলে গিয়েছি। ওখানে অনেক অ্যানাকোন্ডা দেখেছি। একটা অ্যানাকোন্ডা তো আমার দিকে মা যেমন আমার উপর রেগে গেলে খুন্তি নিয়ে তেড়ে আসছে তেমন করে তেড়ে আসছিল। আমি ভয় পেয়ে এক দৌড়ে মঙ্গল থেকে বাসায় চলে এসেছি। "
আভানের কথায় সবাই আভানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। এরা মঙ্গলে গিয়েছে? এক দৌড়ে আবার বাসায় চলে আসছে! মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে দৌড়ে আসা যায়? এমন প্রশ্ন জাগছে সবার মাথায়।
আমি ও ভাবতে বসে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ও মঙ্গলগ্রহে যাবো। তবে একা নয় সাথে কাউকে নিবো। ওখানে যদি ভূত থাকে তবে আমাকে তো বার্গারের মাঝে চিকেনের মতো রেখে গাপুসগুপুস খেয়ে ফেলবে। ভূত কত কী খায়, কুকুর ভাল্লুক খেয়ে নিলে পেটে আমি থাকবো কীভাবে? ভয়ে মরেই যাবো। আল্লাহ! আর আমার পরে যদি শ্যামবতাকে না খায় তবে আমি ভূতের পেটে একা একা থাকবো কিভাবে! শ্যামবতার উপর 'আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। মরে কাচ্চি কাচ্চি ভূত হয়ে যাবো' টাইপ ভালোবাসা হয়ে গেছে। এখন শ্যামবতাকে ছাড়া আমার চলবে না। আমাকে খেতে হলে ভূতকে অবশ্যই শ্যামবতাকে খেতে হবে। তারপর ভূতের পেটে একটা মাস্টার বেডরুম দিয়ে দিলে আমরা বসবাস করবো সেখানে। এই রে! আমি তো ভুলেই গেছি। শ্যামবতাকে ভূত ও ভয় পায়। কিভাবে খাবে? পরে দেখা যাবে শ্যামবতাকে খেতে আসা ভূতকে শ্যামবতাই পেটে চালান দিয়েছে।আমি ভূতের পেটে, ভূত শ্যামবতার পেটে। সমীকরণ ভিন্ন হয়ে যাবে। তারচেয়ে ভালো আমি আমার সাথে করে জরিনাকে নিয়ে যাবো। জরিনাকে ভাজ করে কাপড়ের ব্যাগে ভরে র্যাপিং পেপার মুড়িয়ে ভূতকে গিফট করবো। তারপর এক দৌড়ে পৃথিবীতে চলে আসব। তখন আমার আর শ্যামবতার মাঝে শ্যামবতার সিংহ মার্কা গর্জন ছাড়া আর কিছু বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। ভাবতেই ভালো লাগছে।
আমার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে প্রদীপ বলল,
"আভান তুমি মঙ্গলে গিয়েছো অথচ তোমার কান গুলো এত ছোট। এলিয়েনদের কান তো বড় থাকে। তোমার কান কী ওখানে ফেলে এসেছো? নাকি এসে কান বিক্রি করে কটকটি খেয়ে ফেলেছো?"
আভান নিজের কান ধরে দেখল। তার মন খারাপ করে বলল,
" কান ফেলে আসি নি। মঙ্গল থেকে ফেরার পর মা কান টানতে টানতে ছোট করে দিয়েছে।"
তারপর উৎফুল্ল হয়ে বলল,
"জানো ওখানে আমাদের মহিলা ও ছিলো। মহিলা বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলো। মহিলা বাবার গালে চুমু খেয়েছে। বাবাও মহিলার গালে চুমু খেয়েছে। আমি দেখিছি সব।"
আভানের কথায় মা রেগে তাকালো বাবার দিকে। বাকি আমরা সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম। বাবা মাথা নিচু করে ফেললেন। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে এসে এসব শোনা যায়! মা তো রেগে মেগে দাউদাউ করা আগুন হয়ে গেলেন। শ্বশুর বাবা, শ্বাশুড়ি মা, দিতিয়া সবাই প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। তাদের চোখে অনেক প্রশ্ন। বাবার নিচু করা মাথা সন্দেহ আর প্রশ্নকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
সবার মাঝে প্রদীপ দ্যা উদ্ভট মানব স্বাভাবিক। সে হেসে বলল,
"আমার শালাবাবুর শ্বশুর মশাই, ঘটনা এতদূর এগিয়ে গেল অথচ আমরা জানতে ও পারলাম না। ব্যাপারটা কেমন না? এই ভয়ানক ঘটনা ফাঁস করার জন্য উপহার হিসেবে দুইটা বেলা বিস্কুট দেয়া উচিত। আভান আই প্রাউড অফ ইউ। নিয়মিত স্টার জলসা দেখো আর সংসারে ঝগড়া লাগিয়ে পপকর্ণ হাতে মজা নাও। "
প্রদীপের এই উদ্ভট জোকে রেগে গেলাম আমি। আমার বাবার সংসারে জাপান ব্রিটিশের যুদ্ধ লাগতে যাচ্ছে আর সে আসছে মজা করতে! আমি রেগে বললাম,
"এই প্রদীপ বেশি কথা বলবেন না। ফুঁ দিয়ে প্রদীপ নিভিয়ে দিবো। আমাদের পারিবারিক বিষয়ে নাক কান মুখ পেট গলাবেন না। "
প্রদীপকে বকায় দিতিয়া রেগে গেল। আমার দিকে তেড়ে এসে কিছু বলতে নিলে আমি চোখ রাঙিয়ে বললাম,
"অন জামাইর লাই সুয়ারিশ কইত্তি আইবি চোবাই কান পাট্টি গরম করি দিমু। "(এখন স্বামীর জন্য দরদ দেখাতে এলে চড় মেরে কান গরম করে দিবো)
আমার ধমকানোতে দিতিয়া ভয় ফেলো। কথা না বুঝলেও সে আন্দাজ করেছে আমি রেগে মন্দ বলেছি তাকে তাই গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে। হুট করেই প্রদীপ এসে আমাকে পা ধরে সালাম করে বলল,
" আসসালামু আলাইকুম মা, ভালা আছেন্নি। এতক্কন আন্নেরে খেয়াল করিনু। হবে দেখলাম। আইচ্ছা অন এক্কান কতা হুইনবেন্নি? কইয়ের যে কেউ নো বুইজলেও আই কিন্তু নোয়াইল্লা ভাসা বুঝি। আন্নে যে অন আঁর বো রে চোবাইবেন কইছেন হিয়ান ও বুইজ্জি। আইজ্জা চিল্লাইছেন আর কনদিন আন্নে আঁর বো রে চিল্লাইতেন হাইতেন্নো। চিল্লাইলে আই আন্নের কেরাশের আর কুত্তা দোয়ানির কাহিনী দিপ্ত আর আন্নের মা বাপেরে কই দিমু। হেসমে বেজ্ঞুনে মিলে আন্নে খালি কিলাইবো। আই খালি আঁসুম।"
( আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন? এতক্ষণ আপনাকে খেয়াল করিনি। মাত্র দেখলাম। আচ্ছা এখন একটা কথা শুনবেন? বলছি যে কেউ না বুঝলেও আমি নোয়াখালীর ভাষা বুঝি। আপনি যে এখন আমার বউকে চড় দিবেন বললেন তাও বুঝেছি। আজ বকা দিয়েছেন। আর কোনদিন আমার বউকে বকা দিতে পারবেন না। বকা দিলে আমি আপনার ক্রাশ আর কুকুর তাড়ানোর ঘটনা দিপ্ত আর আপনার মা বাবাকে বলে দিবো। তখন সবাই আপনাকে মারবে। আমি শুধু হাসবো।)
প্রদীপের মুখে নোয়াখালী ভাষা আর ধমক শুনে আমি ঢোক গিললাম। এবার এই ছেলে না গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়। ফাঁস করলে কী হবে? আমাকে সত্যিই মারবে সবাই। শ্যামবতা তো আরো দূরে সরে যাবে। আমার আর শ্যামবতাকে পাওয়া হবে না। নায়ায়ায়ায়ায়া এ হতে পারে না। শ্যামবতা শুধু আমার। তাকে আমার করেই ছাড়বো। এর জন্য যা করা লাগে করবো। চুপ যাবো দরকার হলে। এই ভেবেই চুপ হয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম দিতিয়া আর বকবো না। সবাই বাবার টপিক বাদ দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। নোয়াখালী ভাষা শ্বশুর শ্বাশুড়ি আর দিতিয়া বুঝেনা। বাকিরা বুঝে সবাই। কী ঘটনা জানতে উৎসুখ তারা। আমি প্রসঙ্গ ঘুরাতে বললাম,
"বাবা আভান এগুলো কী বলছে? ঘটনা কী? মহিলা কে? আর তোমরা মঙ্গলে কেনো গিয়েছো? ওই মহিলার সাথে দেখা করতে! শেষ পর্যন্ত তুমি পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহের মানুষের সাথে পরকীয়া করো! সাক্ষী হিসেবে আবার ছেলেকে নিয়ে যাও। কী দিনকাল আসলো আল্লাহ! "
মা বাবাকে গুতা মেরে বললেন, "আজ বাসায় গিয়ে তোমার এলিয়েন প্রেম বুঝাবো। খালি বাসায় চলো একবার।" বাবা ঢোক গিললেন ভয়ে। সমস্যার সমাধান না হলে আজ বাবার কপালে খুন্তি পেটা আছে। বাবা অপরাধী চেহারায় বললেন,
" আসলে আমরা মঙ্গলে নয় জঙ্গলে গিয়েছি। জঙ্গলে গিয়ে এক শিকারীর সাথে দেখা হয়েছে। শিকারী সাথে তার পাঁচ বছরের মেয়ে ও ছিল। নাম নহিলা। আভান তাকে ডাকে মহিলা। আমি ওকেই আদর করেছি। প্লিজ ভুল বুঝো না আমায়।"
আভান ভুল বলছে। "
বাবার লজ্জিত গলা। মেয়ের শ্বশুর বাড়ি এসে তার মাথা কাটা যাচ্ছে। আজ বাসায় ফিরে আভানকে লবন মরিচ দিয়ে ভর্তা করবেন নিশ্চিত। এত বড় অপবাদ দিলো তাকে। সবসময় ভুল কথা বলে সবাইকে বিপদে ফেলে দেয়। বাবার সমাধানে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। প্রদীপ দুঃখী মনে বলল,
"আমি ভেবেছি এখন আপনারা সবাই ঝগড়া লেগে যাবেন। ঝগড়া দেখতে ভালো লাগে আমার। কত খুশি হয়েছিলাম আমি। আপনারা কী করলেন? সব মিটমাট করে ফেললেন! এটা কী ঠিক বলুন? প্লিজ ঝগড়া করুন। "
প্রদীপের কথায় সবাই রেগে তাকাল প্রদীপের দিকে। বাবা মায়ের রাগের পরিমাণ দেখে দিতিয়া প্রদীপকে টেনে রুমে নিয়ে গেল। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
"কেমন আছো মা?"
মা হেসে বললেন,
"তোর বিয়ের পর থেকে খুব ভালো আছি। তুমি কেমন আছিস? দিপ্তর মার আর ধমক কেমন খাচ্ছিস? কেমন লাগছে?"
"চরম টেস্ট মা। জিহ্বে জ্বল আসার মতো।" আমি টাক মেরে বললাম। মা হেসে বললেন,
"এভাবেই ধমক খেয়ে সুখে থাক।"
*
মা বাবা রাতে খেয়ে চলে গেলেন। প্রদীপ ও দিতিয়াকে নিয়ে চলে গেল। আমি রুমে এলাম ঘুমাতে। শুয়ে যাবার খানিক পরই কুকুরের আওয়াজ কানে এলো। বিল্ডিংয়ের কাছে এসে প্রতিদিন নিয়ম করে ডেকে যাবে। এদিকে আমি ভয়ে মরি। প্রতিদিন তো শ্যামবতা থাকে তাই ভয় লাগে না। আজ ভয়টা বেশিই লাগছে। রীতিমতো কান্না পাচ্ছে। আমি লাইট জ্বালিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি। এরিমাঝে ফোন বেজে উঠলো। ফোনের শব্দে কেঁপে উঠলাম। হাতড়িয়ে ফোন হাতে নিয়ে কোন মতে রিসিভ করে কানে দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম। কে কল করেছে দেখিনি। ফোনের ওপাশে শ্যামবতা ছিলেন। তিনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন,
"অভিহা, মা ঠিক আছে? মা ফোন ধরছে না কেন? সেই সন্ধ্যা থেকে কল দিচ্ছি। "
আমি এবার শব্দ করে কেঁদে দিলাম। শ্যামবতা ফের ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন,
"মা ঠিক আছে?"
"হু।" জবাব দিলাম আমি।
" তাহলে তুই কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে রে অভিহা? বাসায় ডাকাত পড়লো নাকি! ডাকাত কী তোর শাড়ি গয়না সব লুট করে নিয়ে গেছে? " শ্যামবতা হয়তোবা ভ্রু কুঁচকালেন। আমি আন্দাজ করলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
"কুক্কুউউউর....
" কী হয়েছে কুকুরের? কুকুরের বিয়ে হচ্ছে। তোকে দাওয়াত দিয়েছে তুই যেতে পারছিস না, তাই কাঁদছিস?"
"কুক্কুর ডায়ায়াকছে" ভয়ে ভয়ে বললাম। শ্যামবতা হেসে বললেন,
"আরে পাগলি এর জন্য কান্না করা লাগে? তোকে ডাকছে তুই যা। গিয়ে দেখ, ওদের মেক-আপ আর্টিস্ট কম পড়েছে। তাই তোকে সাজিয়ে দিতে ডাকছে। তুই যা, গিয়ে তোর প্রাণের বন্ধুর বিয়ে এটেন্ড কর। আর অজগর মার্কা সাজ দে কুকুরীকে। কুকুর সমাজে তোর সুনাম বাড়বে।"
শ্যামবতা কী সব বলছে! আমি বলছি কী আর সে বলছে কী! আমার রাগ হলো। আমি বললাম,
"কুকুরকে আমি ভয় পাই আপনি জানেন। তাও এমন কথা বলছেন? আমি যাবো কুকুরের কাছে? মরে যাবো তবু ও যাবো না।"
"তোর ইগোতে লাগছে আগ বাড়িয়ে যেতে, তাই না? এক কাজ কর আমি পাড়ার কাউকে দিয়ে কুকুরীকে তোর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুই সাজিয়ে দে কুকুরীকে।"
"কুকুরটা প্রতিদিন ডাকে। তাই বলে প্রতিদিন কুকুরীকে সাজাতে ডাক?" রেগে বললাম।
"প্রতিদিন কুকুর ডাকলে আর সব দিন ও ভয় পাওয়ার কথা। তুমি বিগত দিন ভয় না পেয়ে আজই কেন ভয় পাচ্ছিস?"
" প্রতিদিন তো আপনার বু.....
নিজের মুখ চেপে ধরলাম। এই রে কী বলতে যাচ্ছিলাম! এক্ষুনি ধরা পড়তে যাচ্ছিলাম।
"প্রতিদিন আমার বু কী? বল? কথা শেষ কর।" শ্যামবতার কড়া গলা। আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম,
"মা ভালো আছে। সন্ধ্যায় মা বাবা এসেছিলো। দিতিয়া প্রদীপসহ সবাই আড্ডা দিচ্ছিলো তাই ফোন ধরতে পারেবনি। ফোন রুমে ছিল। "
"কথা শেষ কর অভিহা। না হলে গুনে গুনে সাড়ে পাঁচটা থাপ্পড় দিবো। কান মিউট মুডে চলে যাবে। "
শ্যামবতা আবারো ধমক দিলেন।
"থাপ্পড় দেয়ার জন্য হলেও আসুন। আমার ভয় করছে শ্যামবতা। কুকুরটা কিভাবে ডাকছে।" ভীত কন্ঠে বললাম। কুকুরটা বিকট শব্দে ডেকে উঠছে বারবার। আর আমি কেঁপে উঠছি বারবার।
"সন্ধ্যায় মেহেমান ছিল বাসায়। মানে পড়তে বসিস নি। কদিন বাদে তোর পরীক্ষা সেই খেয়াল আছে তোর? পরীক্ষায় কী দিবি? সেখানেও কী ডিম পেড়ে দিয়ে আসবি? নিচে লেখবি, আমার পাড়া ডিম, ভেজে খেয়ে দেখুন, কেমন টেস্ট। তারপর নাম্বার দিন। " এই শ্যামবতাকে বুঝা আমার পক্ষে সম্ভব না। কখনোই না। কুকুর থেকে টপিকটাকে পড়ালেখায় নিয়ে এলেন! আমি অবাক হয়ে বললাম,
"আপনি এই মাঝরাতে আমার পড়ালেখার পিছনে পড়লেন কেনো!"
"পিছনে নয় সামনে পড়েছি। এখন তুই চুপচাপ পড়তে বসবি। নো মোর ওয়ার্ড। পড়তে বসে আমাকে ভিডিও কল দে। আমি দেখি তোর পড়ালেখার কী হাল। "
কড়া গলায় বললেন শ্যামবতা। আবার পড়ালেখা! এই প্যারা কে সইবে! পড়ালেখা থেকে তো কুকুরের ডাক ভালো ছিলো। কেন যে কল ধরতে গেলাম। বসে বসে কুকুরের ডাক শুনলে আরো ভালো হতো। আমি আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দেখাতে গেলাম। গেলাম ধমক। তার একটাই কথা, আমাকে এখন পড়তে বসতে হবে মানে হবে। কোন কথা নয়। বাধ্য হয়ে বললাম,
"আচ্ছা আমি টেবিলে বসে ইমোতে ভিডিও কল দিচ্ছি।"
উত্তরে শ্যামবতা বললেন,
"তোর স্বামী কে?" হুটহাট শ্যামবতার এই উদ্ভট প্রশ্নে আমি ঘাবড়ে যাই। সব কথা এলোমেলো হয়ে যায়। আমি উত্তর দিই,
"আমার বিয়ে হয়েছে?"
"তুই এখন কোথায় আছিস?"
"আপনার বাসায়।"
"কার রুমে? "
"আপনার?"
"তোর বাসা, তোর রুম ছেড়ে তুই আমার বাসায় আমার রুমে কেন আছিস?"
"কারণ আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর সাথেই থাকে।"
মুখ ফসকে বলে ফেললাম আমি। শ্যামবতা কড়া গলায় বললেন,
"এবার বল তোর স্বামী কে?"
"আপনি।" মিনমিনে উত্তর দিলাম আমি।
"আমি কী করি?"
"আদা ব্যাপারী করেন।"
"কী?" শ্যামবতা আবারো গর্জে উঠলাম।
আমি নিজেকে শুধরিয়ে বললাম,
"আপনি আদম ব্যাপারী আই মিন ট্রাভেল এজেন্সিতে জব করেন।"
"থাকি কোথায়?"
"বাংলাদেশে।" এত প্রশ্ন কেন করছে আল্লাহ জানে।
"তোর মতে তোর স্বামী আমি। আমি থাকি এবং কাজ করি বাংলাদেশে। বিদেশ থাকি না। তাহলে তুই স্বামী বিদেশ ইমো অ্যাপ কেন রেখেছিস ফোনে? "
এতক্ষণে বুঝলাম আসল কাহিনি। এই একটা কথা বুঝাতে প্রশ্নকে জুস করে ফেলেছেন রীতিমতো। সোজা বললে কী হত? আমি ভেংচি কাটলাম। শ্যামবতা আবারো বললেন,
" এক্ষুণি ইমো ডিলিট কর। আর কখনো ওসব স্বামী বিদেশ অ্যাপ ইউজ করবি না। আমি বিদেশ গেলে ভিন্নকথা।এখন প্লে স্টোর গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ ইন্সটল কর। আমাকে। হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল দে।"
স্বামী বিদেশ অ্যাপ! লাইক সিরিয়াসলি! ইমোর উদ্ভাবক শুনলে বউয়ের চুল দিয়ে ফাঁস দিবে। আমার হাসি ফেলো। খিলখিলিয়ে হেসে উঠে কল কেটে দিলাম। ইমো আন ইন্সটল করে হোয়াটসঅ্যাপ ইন্সটল করলাম। টেবিলে বই খুলে বসে শ্যামবতাকে ভিডিও কল দিলাম। একবারে ধরল না। দ্বিতীয়বারে ধরল। হাই হ্যালো ছাড়ালো শুরু করলো পড়ানো। সাথে ধমক তো আছেই। সব ভুলে পড়তে লেগে গেলাম আমি। পড়তে পড়তে টেবিলেই ঘুমিয়ে গেলাম। কুকুরের ভয় আর লাগলো না।
★
পরদিন সকালে দশটা নাগাদ ঘুম ভাঙলো। নিজেকে টেবিলে আবিষ্কার করলাম। হাতড়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখি শ্যামবতা নেই। হয়তো আমি ঘুমানোর পরই কেটেছেন কল। ফোন হাতে থাকতেই ম্যাসেজ এলো। ওপেন করলাম। সাথে সাথেই চোখে পানি চলে এলো। পেত্না দিয়েছে ম্যাসেজ। শ্যামবতার পোল খুলছে সে। আমি কাঁদছি ম্যাসেজটা দেখার পর থেকেই। একই দিন আরো অনেক ম্যাসেজ দিয়েছে পেত্না। সব গুলো ম্যাসেজই আমাকে কান্নার মাত্রা বাড়িয়ে দিলো। আমার সারাটাদিন চলে গেল কান্নায়। সন্ধ্যার পর শ্যামবতা ফিরে এলেন। রুমে আসতেই আমি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। বলে ফেললাম মনের সব কথা।
চলবে।