#তোমাকে_ভাবিনি_কখনও (১১)
#মায়িশা_নুরাইন
" চাচ্চু, পড়িয়ে দাও। সুন্দর করে পড়িয়ে দিবে। আমাকে একদম হ্যান্ডসাম বয় বানিয়ে দিবে। "
সোহান তার জন্য আনা পোশাক নিয়ে কিয়ানের পিছু পিছু ঘুরছে। এদিকে একমাত্র ভাতিজার জন্মদিন উপলক্ষে যে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে, তার গোছানোর দায়িত্বে আছে সে।
" এই ব্যাটা, সর যা। তোর মা'কে গিয়ে বল। আমার পিছনে পরেছিস কেন? আমি কি আরাম করতেছি নাকি? জন্মানোর দিনও আমাকে শান্তি দেস নি। আর তারপর থেকে প্রতি জন্মদিনেও আমাকে কামলা খাটাস। "
সোহান ওসব না বুঝে বলে,
" চাচ্চু, পড়িয়ে দাও নাহ। "
" তোর বাপকে বল গিয়ে৷ "
" পাপা মাম্মামকে নিয়ে রুমে গেছে। আমাকে বললো তোমার কাছে তৈরি হতে। "
কিয়ান কপালে হাত দিয়ে বিরবিরিয়ে বলে,
" যন্ত্রনা একটা। তারা জামাই-বউ সবসময় আমার সাথে এমন বেইমানি করে। নিজেদের যন্ত্রনাকে আমার দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেরা রোমান্স করবে। "
সোহানকে কোলে নিয়ে বিছানার উপর তুলে দিয়ে কিয়ান তাকে তৈরি করাতে থাকে। সোহান তখন কত শত বকবক করছিলো। একসময় সে বলে,
" জানো চাচ্চু, আমি পরিকে অনেক মিস করছি। "
নীলার কথা উঠতেই কিয়ানের হাত থেমে যায়। একটু পরে সে ধাতস্থ হয়ে বলে,
" তো আমি কি করবো? "
" আমার পরিকে নিয়ে আসো। "
" তুই আনতে পারলি নাহ? "
" আমার তো ফোন নেই। আমি কিভাবে বলবো পরিকে? আর আমি তো একা বাহিরে যেতে ভয় পাই। "
" তোর পরিকে বল উড়ে উড়ে চলে আসতে। "
" তুমি বলে দাও নাহ। "
" আমি পারবো নাহ। যা এখন, তোকে তৈরি করে দেওয়া শেষ। সোজা এখন নিজেদের রুমে যাবি। তোর পাপা-মাম্মাম দরজা না খুললে ভেঙে ফেলবি। "
" আমি ব্যাথা পাবো তো। "
" ব্যাথা পেলে ডাক্তার দেখিয়ে আনবো। "
" না, আমি ইনেকশন ভয় পাই। "
" আমার কথা না শুনলে আমি নিজেই তোকে সেই ইনেকশন দিয়ে দিবো। আসছে পরির সেনাপতি। পরির মতোই ইনেকশনে ভয় পায়। "
সোহানকে একটা ব্ল্যক স্যুট পরিয়ে দিয়েছে কিয়ান। স্যুটের বুকপকেটে একটা ছোট্ট গোলাপ সদৃশ ব্রুচ রয়েছে। সোহান নতুন ড্রেস পরে ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখতে থাকে। কিয়ান তাকে বিছানায় রেখেই নিজেও তৈরি হতে যায়। সে সাধারণভাবেই একটা সাদা শার্ট আর ব্ল্যাক প্যান্ট পড়ে তৈরি হয়ে নিয়েছে। ওয়াসরুম থেকে বেরিয়ে এসে আয়নার সামনে গিয়ে যখন যে শার্টের হাতা গোটাচ্ছিলো, তখন আয়নায় নিজের পেছনে দেখে সোহান কেমন রাজকীয় স্টাইল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এক হাত পেছনে গুটিয়ে অপর হাত সামনে বুকে ঠেকিয়ে ঝুঁকে কিছু একটা অভিনয় করছে। কিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে,
" কিরে ব্যাটা, কি করছিস এটা? "
" প্রিন্স বো বলে এটাকে। আমি মুভিতে দেখেছি। "
" তো তুই কার সাথে করবি এটা? "
" পরির সাথে। আমার পরি আজকে আসবে দেখো। পরে আমি আর পরি ডান্স করবো। "
কিয়ান চোখ উল্টে নিজের কাজ করতে থাকে। আজকালকার বাচ্চা ছেলেমেয়েরা কত এডভান্স। এই বয়সেই কত কি শিখে গেছে। তার পরি আসবে আর সে এভাবে অভিবাদন জানাবে। হাহ, কত ফ্যান্টাসি!
মায়ের ডাকে সোহান লাফাতে লাফাতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়৷ আয়নার সামনে সটান দাঁড়ানো কিয়ানের তখন নীলার মুখটাই মনে পরে। তার শেষ দেখা সেই শান্ত মুখটা তাকে শান্তি দিচ্ছে নাহ। ভেবেছিলো ভার্সিটিতে গিয়ে নীলার সাথে আলাদা করে কথা বলবে। অথচ মেয়েটা আর আসলোই নাহ। এসব ভেবে নিজের ভুলের কথা স্বরণ করে কিয়ান আরও অশান্ত হয়ে পরে। একদমই শান্তি হচ্ছে নাহ তার। নীলার সাথে কথা না বলা পর্যন্ত আর শান্তি হবেও নাহ।
***********
" নীলু, আমি এসে গেছি। তুই তৈরি হয়েছিস? "
" হ্যাঁ, ভেতরে আয়। "
নাবিহা রুমে প্রবেশ করেই মুখে হাত দিয়ে অবাক হয়ে যায়। সে যেন চোখের সামনে সাক্ষাৎ কোন পরিকে দেখছে। ব্ল্যাক লং গাউনে নীলাকে অনেক প্রিটি লাগছিলো।
" বেইব, আমি প্রেমে পরে গেছি। "
" কার? "
" একটা প্রিটি পরির। যে এখন আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। "
নীলা খিলখিলিয়ে হেসে ফেলে। সে তার স্ট্রেইট চুলগুলোকে কার্ল করতে করতে বলে,
" ব্ল্যাক টাই সিলেক্ট করলাম। পারফেক্ট লাগছে নাহ? "
নাবিহা মুচকি হেসে বলে,
" শুনেছি প্রতিশোধের রং নাকি কালো। তুইও কি সেই পথটাই অনুসরণ করছিস নাকি? "
নীলা কিছুই বলে নাহ। তার মুখে এক অন্যরকম হাসি ফুটে উঠে। নাবিহা কিছু বলতেই নেয়, তখনই কোথা থেক গলু-মনু এসে লাফিয়ে তার উপর মারামারি করতে থাকে। নাবিহাও কথা ফেলে তাদের সাথে মেতে উঠে।
নীলা তৈরি হয়ে রুমের একপাশে গিয়ে গলু-মনুর খাবার গুছিয়ে রাখে। আসতে আসতে রাত হয়ে যাবে তাদের। এসব অনুষ্ঠানে তো বিড়ালছানা নিয়ে যাওয়া যাবে নাহ৷ তার উপর এরা যা দুষ্টু, নিয়ে গিয়েও শান্তি পাবে নাহ। তাই বাসাতেই সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
সব শেষে বাবার ডাকে তারা দুজন বেরিয়ে আসে। নীলার পায়ের আঘাত সম্পূর্ণ সারে নি। তাই সে কিছুটা ধীরে হাটছিলো। তার পাশে পাশে নাবিহাও এগিয়ে আসে। সাজিদুল সাহেবের বাসায় এর আগে রফিক সাহেব দু-একবার গিয়েছিলেন। তাও সেটা অনেক আগে। এই প্রথমবার মেয়েকে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এর পেছনে আরও বড় কারণও আছে। আজই মেয়েকে জানাবে নিজের ট্রান্সফারের কথা। আরও জানতে পারবে মেয়েকে সেই পরিবার কতটা মেনে নিবে। না জানি তার মেয়েটার ভাগ্যে কি আছে! বাবাকে ছাড়া ভালো থাকবে তো সে!
***********
কিয়ান ভেতরের সাজসজ্জার দিকে খেয়াল রাখছিলো৷ অপরদিকে তার বড় ভাই সামিন ছেলের জন্মদিনের কেকের বন্দোবস্ত করছে। তাদের মা আর সোহানের মা দুজনেই তৈরি হতে গিয়েছে। আর সোহান একপাশে বসে তার চাচ্চুর দেওয়া রিমোট কন্ট্রোল কার দিয়ে খেলছে। তখনই সোহানের কাছে এসে মীমু বলে,
" এই পিচ্চি, তোমার চাচ্চু কোথায়? "
" জানি নাহ। "
" এই বয়সেই মিথ্যে শিখে গেছো? মাত্রই তো দেখলাম তোমার কাছ থেকে গেলো। "
" খুঁজে নেও তুমি। সরো, আমি খেলছি দেখছো নাহ? "
বাচ্চা ছেলের অ্যাটিটিউড দেখে মীমু মুখ বাঁকায়। বিরক্তির ভঙিতে বিরবিরিয়ে বলে,
" হয়েছে একটা বদমাইশ। এখনই যা অ্যাটিটিউড দেখায় রে বাবা! বড় হলে না জানি কি করে! "
মীমু তার ড্রেসটাকে সামলে নিয়ে কিয়ানের খোঁজ করতে থাকে। আশেপাশে সাজসজ্জার লোকের অভাব নেই। সবার মাঝে থেকে কিয়ানকে খুঁজতে দিয়ে তাকে বেগ পেতে হয়। অবশেষে কিয়ানকে খুঁজে পায় বাড়ির পাশের সুইমিংপুলের সামনে। কিয়ান সেখানে চুপচাপ বসে ছিলো।
" কিয়ান ভাই, কি করছো? "
" ঘুমাচ্ছি। "
" কিন্তু তুৃমি তো জেগে আছো। মনে হচ্ছে এখানে একাকী সময় কাটাচ্ছো। "
" তো ডিস্টার্ব করছিস কেন? যা এখান থেকে। "
মীমু না গিয়ে উল্টো কিয়ানের পাশে বসে পরে। কিয়ান তাকে পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।
" অতিথিদের আপ্যায়ন না করে বসে আছো যে? "
" ভাইয়া আছে এখন। "
" তোমার ভাইয়ের ছেলে, তোমার দায়িত্ব আছে নাহ? "
কিয়ান উত্তর দেয় নাহ। তার কেন যেন আজ সব বিষন্ন লাগছে। বারবার নীলা যেন তার কল্পনায় এসে তাকে জ্বালাচ্ছে। নীলার সেই শান্ত মুখ কল্পনা করে কিয়ান বিরবিরিয়ে উঠে,
" এত জ্বালাচ্ছো কেন? সামান্য ভুলই তো করেছি। এইজন্য এভাবে শাস্তি দিবে? দেখা নেই, কথা নেই, একটু ভুল স্বীকার করারও উপায় নেই। সাধারণ একটা স্টুডেন্ট হয়ে এতটা প্রভাব ফেলছো কেন, মিস. নীলা? "
কিয়ানকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে একসময় মীমু তার হাত জড়িয়ে ধরে কাধে মাথা রাখতে গেলে কিয়ান ছিটকে তাকে সরিয়ে দেয়।
" এসব কি করছিস তুই? "
" আমি তো...."
" নিজের সীমা ভুলে যাবি নাহ। আমার পার্সোনাল মোমেন্টে আমি কাউকে এলাউ করি নাহ। সেখানে তুই অনুমতি ব্যাতীত অধিকার ফলাতে আসবি নাহ। "
" কিয়ান ভাই! "
" যা এখান থেকে। নেক্সট যেন আর তোকে আমার কাছে না দেখি। আজকের দিনে আমি কোন সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছি নাহ৷ দ্রুত বিদায় হ।"
মীমু খুবই অপমানিত বোধ করে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে তাদের পেছনটাতেই দুজন লোক বাড়ির সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত ছিলো। তারা নিশ্চয়ই সবটাই দেখেছে। লজ্জায়, অপামনে মীমু সেখান থেকে চলে যায়।
বেশ অনেকক্ষণ ধরে কিয়ান এখানে বসে ছিলো। মূলত ভাইয়ের সামনে থেকে সরে গিয়ে ভাইয়ের উপর সব চাপিয়ে দিয়ে নিজে একাকী সময় কাটাতে এসেছিলো। এখন অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। তাই সে উঠে পরে ভাইয়ের সাথে অতিথিদের আপ্যায়ন করতে। সে গিয়ে সামিনের পাশে দাঁড়াতেই সামিন রেগে তার দিকে তাকায়। দ্রুত হাতে কিয়ানের ঘাড়ে চেপে ধরে বলে,
" আমাকে বিপদে ফেলে পালানোর অভ্যাস তোর আর গেলো নাহ। "
কিয়ান ভাইয়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলে,
" ছেলে তোমার, অনুষ্ঠানও তুমিই করছো। আমাকে ঠেলছো কেন? "
" ভাতিজা তো তোর। তোর দায়িত্ব আছে নাহ? "
" আজকের জন্য ছেলের দায়িত্ব শুধুই তার বাবার। আমি চাচ্চুর দায়িত্ব থেকে আজকের জন্য ছুটি নিলাম। "
তারা কথা বলছিলো। এমন সময় সামনে ঘটা এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় কিয়ান থমকে যায়। বাড়ির গেট পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছে তিনজন মানুষ। মাঝখানে নীলা, দুই পাশে রফিক সাহেব আর নাবিহা।
কালো লং গাউনে মেয়েটাকে আজ যেন অন্যরকম লাগছে। খোলা কার্ল করা চুলগুলো কোমর ছুঁয়ে নেমে এসেছে। কানের ছোট্ট ইয়াররিং চারপাশের আলোয় চিকচিক করছে। মুখে তেমন কোনো সাজ নেই, তবুও তাকে দেখে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।
কিয়ান ভাবছিলো সে বোধহয় হ্যালুসিনেট করছে। নীলা এখানে আসবে কোথা থেকে! তাদের তো অনুষ্ঠানের কথা জানানোই হয় নি। ঠিক তখনই সোহানের কন্ঠ ভেসে আসে।
" পরীইইই...! "
সবার দৃষ্টি একসাথে ঘুরে যায়। ছোট্ট ছেলেটা দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে ভেতর থেকে।
" আমার পরী এসেছে। "
নীলা অবাক হয়ে তাকাতেই সোহান তার সামনে এসে হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর সেই কাঙ্খিত মুহুর্ত সবার সামনে ফুটে উঠে। সোহান সিনেমায় দেখা রাজকীয় ভঙ্গিতে এক হাত পেছনে নিয়ে অন্য হাত বুকে রেখে কোমর ঝুঁকিয়ে বলে উঠল,
" ওয়েলকাম, মাই প্রিন্সেস। "
চারপাশ এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ। নীলা বাচ্চা ছেলেটার এমন অভিবাদন দেখে অবাক হয়। বাকী সবারও একই অবস্হা। সামিন তো অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। নীলা প্রথমে অবাক হলেও পরে মুচকি হেসে সোহানের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। সোহান তার হাত ধরে তাকে নিয়ে ভেতরে আসে। ইশারায় নীলাকে ঝুঁকতে বললে নীলা ঝুঁকে দাঁড়াতেই তার গালে সোহানের নরম, ছোট্ট ঠোঁটের ছোঁয়া পরে।
" আই মিসড ইউ, পরী। "
" আই মিসড ইউ টু, মাই জ্যান্টলম্যান। "
এমন ঘটনায় সবাই তো অবাক হয়ে যায়। বাচ্চা ছেলেটির এমন অচেনা মেয়েটাকে নিজের জন্মদিনে এভাবে অভিবাদন করাটা সবাইকে মুগ্ধ করে। একপাশে দাঁড়ানো কিয়ান তখনও একদৃষ্টিতে সেই স্নিগ্ধ মুহুর্তটার দিকে তাকিয়ে থাকে। নীলার দিকে ফেরানো তার সেই চোখে তখন এক অদ্ভুত ঝিলিক দেখা যায়।
চলবে......
(কিউট একটা মোমেন্ট ছিলো এটা। কেন যেন সোহানকে নিয়ে লিখতে আমার অনেক ভালো লাগে। সবাই কিছু কুট্টু কুট্টু মন্তব্য করে যেও প্লিজ।
আর যারা ফলো দিয়ে ফলো তুলে নে, তাদের "আই হেটু" 😒