ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমাকে ভাবিনি কখনও

১৪তম পর্ব

লেখক: মায়িশা নুরাইন

#তোমাকে_ভাবিনি_কখনও (১৪)

#মায়িশা_নুরাইন

" বাবা, চলো এখন বাসায় চলে যাই আমরা। আমি ঠিক আছি তো এখন। "

" অনেক রাত হয়ে গেছে রে। আজকে এখানেই থাকতে হবে আমাদের। বাহিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। "

নীলা বাহিরে তাকিয়ে দেখে সত্যিই বৃষ্টি পরছে। কিছুক্ষণ পর পর আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। বড়সর এক আলোর ঝলকানি দেখেই নীলা তার বাবার কাছাকাছি চলে আসে।

" এখনই বাজ পরবে বাবা। "

তাড়াতাড়ি কান চেপে ধরতেই সজোরে বাজ পরে। নীলা তো চমকে উঠেই, সাথে রুমের বাহিরে থাকা নাবিহাও ভয়ে দৌড়ে রুমে চলে আসে। নাবিহাকে এভাবে ভয় পেতে দেখে নীলা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। নাবিহা মুখ ফুলিয়ে বলে,

" হাসছিস কেন? আমি দেখি নি তুই কেমন ভয়ে আঙ্কেলের বুকে ঢুকে যাচ্ছিলি? "

" কিন্তু তোর লাফিয়ে ভেতরে আসাটা সেরা ছিলো। "

দু বান্ধবীর হাসাহাসিতে রফিক সাহেব একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। অবশেষে মেয়েকে সবটা বুঝানো গেলো। আজ এখানে ছিলো বলেই তিনি শান্তিতে ছিলেন। নয়তো বাসায় থাকাকালীন নীলার এমন পরিস্হিতি হলে তিনি কিভাবে কি সামলাতেন জানা নেই। তিনি দুজনকে রুমে রেখে বাহিরে চলে আসেন। নীলা হটাৎ খেয়াল করে দেয়ালে টানানো কিয়ানের সেই ছবিটার দিকে। তারপরই সে অবাক হয়ে পুরো রুমে চোখ বুলায়।

" আমরা ওনার রুমে বসে আছি? "

" জ্বি ম্যাম। যা কান্ড দেখালি তুই আজকে। "

" কি করেছি? "

" বাবার বুকে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পরতেই তো সবাই চমকে যায়। সোহানের আম্মু, মানে তানহা আপু নাকি ডাক্তার। তোর চেকাপের পর বললো রেস্ট নিতে হবে। তারপর কি হলো জানিস? স্বয়ং কিয়ান স্যার তোকে কোলে তুলে নিজের রুমে এনে শুইয়েছে। আন্টি নিজে বালিশ ঠিক করে তোকে শুয়ানোর ব্যস্হা করেছে। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত প্রতিটা মানুষ এই রুমে উপস্হিত ছিলো। তুই ভাবতে পারছিস? এই পরিবারের প্রতিটা মানুষকে একটু সময়ের মাঝে নাকানিচুবানি খাইয়ে ফেলেছিস। "

নীলা অবাক হয়ে যায়। কিয়ান তাকে নিয়ে এসেছে? পাশাপাশি তার রাগও হয়। তাকে ওই লোকটা ছুঁবে কেন? কে অনুমতি দিয়েছে তাকে? হুহ, খাটাস লোক।

এমন সময় রুমের দরজায় টোকা পরতেই তার দুজন সেদিকে তাকায়৷ কিয়ান এসে দাঁড়িয়ে আছে। নাবিহা বলে,

" স্যার আপনি? আসুন নাহ। "

কিয়ান নীলার দিকে তাকিয়ে রুমে প্রবেশ করে। নীলা মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, যেন সে কিয়ানকে সহ্যই করতে পারছে নাহ।

" আমার ফোনটা রুমেই রয়ে গেছে। সেটাই নিতে আসলাম। "

" আপনারই তো রুম স্যার। আমরাই বরং দখল করে আপনাকে বিপদে ফেলে দিলাম। "

" সমস্যা নেই নাবিহা। একজন অসুস্থ রোগীর জন্য এতটুকু ছাড় আমি দিতেই পারি। "

নাবিহা মুখ টিপে হাসে। নিজেকে অসুস্হ বলায় নীলা রেগে গিয়ে তাকায়। তখনই আবারও বাজ পরতেই নীলা একটু চিৎকার করে পাশে থাকা নাবিহাকে খামচে ধরে৷ নাবিহাও ভয়ে চমকে গিয়েছিলো। তাদের এমন ভয় পাওয়া দেখে কিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। নাবিহার ফোনে কল আসতেই বলে,

" বাসা থেকে আম্মু কল দিয়েছে। আমি একটু কথা বলে আসছি। "

কিয়ান মাথা নাড়াতেই নাবিহা বেরিয়ে যায়। নীলা গাল ফুলিয়ে চুপচাপ বিছানায় বসে ছিলো। কালো গাউন তার সর্বাঙ্গ জড়িয়ে আছে। দু হাঁটু উঁচিয়ে তাতে হাতে ভর করে নীলা বসে ছিলো। তার খেয়ালে আসে সেদিনের রাতটার কথা, যখন কিয়ান তার খুব নিকটে ছিলো। সেদিন রাতের কথা মাথায় আসলেই তার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠে। লোকটার উপর তার রাগ থাকা স্বত্বেও সে কোনমতে সেই রাতের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারে নাহ৷ বরং সময়ে, অসময়ে সেই মুহুর্তটা তাকে তাড়া করতে থাকে। কি হতো সেদিন যদি সে নিজের হুশ না ফিরে পেতো!

এদিকে কিয়ান একটু এগিয়ে যায় তার দিকে। নীলা টের পেতেই পাশে তাকাতেই কিয়ানকে নিকটে দেখে চমকে গিয়ে বিছানায় পরে যায়। ভয়ে, আতঙ্কে চোখ খিঁচে নিয়ে বলে উঠে,

" ক-কি করছেন আপনি? আপনার রুম দেখে সাহস পেয়ে গেছেন নাকি? আমি মোটেও আপনাকে সেই রাতের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে দিবো নাহ। স-রে যান, নয়তো আমি চিৎকার করবো। "

কিয়ানের কন্ঠ না শুনে নীলা তাকিয়ে নিজেদের অবস্হা দেখে চমকে যায়। কিয়ানের কাধের শার্টটা সে খামচে ধরে সরানোর চেষ্টা করছে। অথচ মনে হচ্ছে সে যেন কিয়ানকে আরও কাছে টানছে। আর কিয়ান এমন মুহুর্তে নীলার কথা শুনে আরও থমকে গেছে। আবারও সেই রাতের কথা!

নীলা দ্রুত কিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে উঠে বসে। কিয়ান নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে। সে হাতের ফোন দেখিয়ে বলে,

" ফোনটা বালিশের কাছে ছিলো। সেটাই নিতে গিয়েছিলাম। "

" আ-আমাকে বললেই হতো৷ "

" ডেকেছিলাম বার কয়েক। তুমি তো কোন খেয়ালে ডুবে ছিলে। "

দুজনেই একটু চুপ করে থাকে। পরিস্হিতিটা এমনই ছিলো, যে কে কি বলবে বুঝতেই পারছিলো না। পরিস্হিতি সামলাতে কিয়ান বলে উঠে,

" শোয়ার আগে পায়ে আরেকবার ড্রেসিং করে নিও। ফাস্টএইড বক্স কাবার্ডে আছে। "

নীলা মুখ ঘুড়িয়ে বলে,

" কারও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রে হাত দেওয়ার অভ্যাস আমার নেই। "

কিয়ান বিরক্ত হয়ে নিজেই কাবার্ড থেকে বক্সটা এনে দেয়। তা দেখে নীলা বলে,

" আমার কারও জিনিসেরও দরকার নেই। "

কিয়ান এবার রেগে বলে,

" এমন বেয়াদব মেয়ে আমি আর দুটো দেখিনি। কথায় কথায় খালি ত্যাড়ামি করবে। "

" তো একটাই দেখে রাখুন নাহ। আরেকটা খুঁজতে গিয়েছেন কেন? "

" খুঁজলেও পাবো নাহ আমি। "

" তো বুঝে নিন আমি কতটা ইউনিক পার্সন। হাজারে কেন, লাখেও দুটো পাবেন নাহ। "

" বিশ্বাস করলাম কথাটা। নয়তো কেন আমাদের বিদায় দিয়ে

এখন আমাদের বাড়িতেই গেস্ট হয়ে থাকতে হবে! তোৃার ভাগ্য সত্যিই ইউনিক, মিস. ইউনিক পার্সন। "

" থাকবো নাহ আপনাদের বাড়ি। আমার থাকতে বয়েই গেছে। এখন থাকা নিয়েও খোঁটা দিচ্ছেন। "

" আর কোন উপায় নিই তোমার হাতে। এটা তোমার বাবা আর আমার বাবার সিদ্ধান্ত। আর তোমার সেটা মানা ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। "

নীলা এবার চুপ হয়ে যায়। সত্যিই তার হাতে নেই আর কিছু। তাকে শান্ত হতে দেখে কিয়ান হালকা হাসে। অবশেষে মেয়েটা শান্ত হয়েছে। নয়তো সবসময় অ্যাটাকিং মুডে থাকে। হয়তো হাতে, নয়তো কথায়। কিয়ান চলে যেতে নিয়েও পুনরায় থেমে বলে,

" সেদিনের কাজের জন্য আমি নিজের ভুল স্বীকার করছি নীলা। আমার উচিত হয়নি সব না জেনে তোমাকে ইনসাল্ট করা। "

নীলা চোখ মুখ শক্ত করে বলে,

" তো স্বীকার করছেন সেটা ইনসাল্ট ছিলো? তারপরও ভাবছেন আমি শান্ত হয়ে যাবো? এত মানুষের সামনে আমার ইনসাল্ট হওয়ার পরও আমি এটাকে স্বাভাবিক ব্যাপার ভেবে শান্ত থাকবো? আমার জায়গায় আপনি থাকলে পারতেন তো? "

কিয়ান চুপ করে থাকে। কিছু বলার মতো নেই তার। নীলা আর কিছুই বলে নাহ। চুপ করে বসে থাকে। কিয়ানও কিছুক্ষণ পর রুম থেকে বেরিয়ে আসে। তাকে যেতে দেখে নীলা বিরবির করে মুখ বাকিয়ে বলে,

" এহহ, ক্ষমা চাইতে আসছে! এটাকে ক্ষমা চাওয়া বলে? অভিনয় সব, আমি জানি তো। ভাবছে একটু অভিনয় করলেই আমি সব ভুলে যাবো। তবে আমিও নীলা, নিজের অপমান কখনও ভুলি নাহ।

থাকবো তো এ বাড়িতেই। এখন সবাই এক নতুন নীলাকে দেখবে। তবে মি. কিয়ান শিকদার, আপনি আমাকে আগের সেই কঠোর নীলা রুপেই দেখবেন। আপনাকে এত সহজে আমি ছাড়ছি নাহ। "

**********

পরদিন বাসায় ফিরতেই নীলা দেখে তার রুমের অবস্হা খারাপ। তবে রুমে বিড়াল ছানা দুটোর হদিস নেই। নীলা কয়েক জায়গায় খুঁজেও না পেয়ে বাবাকে ডাকতে থাকে।

" ও বাবা, আমার গলু-মনু নেই। হারিয়ে গেছে। আমি বলেছিলাম আমার বাচ্চা দুটো ভয় পাবে। আমাকে রাতে আসতে দিলে নাহ। বাবা, আমার বাচ্চা দুটোকে খুঁজে দাও। "

নীলার কান্নারত চেহারা দেখে রফিক সাহেব অবাক হন। মেয়েকে সামলাতে তিনি নিজেও সারা রুমে ছানা দুটোকে খুঁজতে থাকে। গত রাতে বজ্রবৃষ্টি হওয়ায় বিড়াল ছানা দুটোও ভয় পেয়ে হয়তো কোথাও লুকিয়ে আছে৷ দুজনে মিলে সারা রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজে অবশেষে আলমারির নিচের তাকে কাপড়ের ভাজে গুটিশুটি অবস্হায় তাদের দেখতে পায়।

গত দিন অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হওয়ার পর নীলা আলমারির দরজা আটকাতে ভুলে গিয়েছিলো। এখানে তাদের ঠিকঠাক দেখে নীলা স্বস্তি ফিরে পায়। ছানা দুটোকে কোলে নিয়ে সে ফ্লোরেই বসে পরে। বিড়াল দুটো এখনও ঘাবড়ে আছে। হয়তো সব প্রানীদের মাঝে একমাত্র বিড়ালই এতটা ভীত প্রাণী। বিশেষ করে ঘরে পোষা ছানাগুলো একটু বেশীই ভীত থাকে। নীলাকে পেয়ে যেন বিড়াল দুটোও নিজেদের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।

" বাবা, আমি কিন্তু আর কখনও বাচ্চা দুটোকে একা ছাড়বো নাহ। আমি যেখানে থাকবো, ওরাও সেখানেই থাকবে বলে দিলাম। "

" কিন্তু মা, সাজিদদের অনুমতি থাকতে হবে তো। ওদের অসুবিধা থাকলে ও বাড়িতে সাথে রাখা যাবে নাহ। "

" না বাবা, আমি ওদের ছাড়া কোথাও যাবো নাহ। তুমি আমাকে একা রেখে চলে যাবে, এখন এদেরকে আমাকে একা ছেড়ে যেতে দিবো নাহ। তোমরা খুব খারাপ। আমার থেকে সব কেড়ে নিতে চাচ্ছো। "

নীলাকে এসব বলতে দেখে রফিক সাহেব মেয়েকে শান্ত করতে আসেন।

" আচ্ছা, আমি কথা বলবো ওদের সাথে। তোর সাথে বিড়াল ছানা দুটোরও ব্যবস্হা করে দিয়ে যাবো প্রমিস। "

বিড়াল দুটোকে কোলে আগলে রেখে নীলা বাবার বুকে গুটিশুটি মেরে বসে থাকে। যখন থেকে জানতে পেরেছে বাবা কিছুদিন পর তাকে একা রেখে দুরে চলে যাবে, তখন থেকেই তার বাবাকে ছাড়ডে ইচ্ছে হচ্ছে নাহ৷ ছোট থেকেই বাবার সাথেই তার বড় হয়ে উঠা। বাবার যখন যেখানে ট্রান্সফার হয়েছে, নীলাকেও সেখানেই যেতে হয়েছে। ফলস্বরুপ তার লাইফে স্কুলের সংখ্যা অনেক বেশী। গত চার বছর ধরে তারা এ শহরে স্হির হয়ে আছে৷ ভেবেছিলে বাবার রিটায়ার্ডমেন্ট পর্যন্ত হয়তো এভাবেই একসাথে থাকবে। তবে তাও হলো নাহ। অবশেষে বাবা-মেয়ের এখন ছাড়াছাড়ি হতেই চললো।

****************

কিয়ানের কোলে বসে সোহান তার পরিকে নিয়ে কথা বলছিলো। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে নীলাকে দেখে সে অনেক খুশি হয়েছিলো। তার পরি তাদের বাসায় ছিলো। নিজে আগে ঘুমিয়ে পরায় কষ্টও পায়, কারণ সে তার পরির সাথে থাকতে পারে নি।

ড্রয়িং রুমে সবার সামনে রোজা বেগম বলে উঠেন,

" কাজটা কি ঠিক হচ্ছে ভাবী? এত বড় একটা মেয়েকে বাসায় রাখাটা কেমন দেখাবে? যেখানে তোমার বাসায় এখনও একটা অবিবাহিত ছেলে আছে। "

মমতাজ বেগম ঠাট্টার ছলে বলে উঠেন,

" বাবা রে রোজা, তোমার তো আমার পরিবার নিয়ে কত চিন্তা দেখছি। "

" ভাবী, এটা আমার ভাইয়ের বাড়ি। আর ভাইয়ের সংসার নিয়ে আমার চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। "

তানহা চা-নাস্তা এনে দিলে সামিন একটা পকোড়া হাতে তুলে বলে,

" আসলেই ফুপু, কত চিন্তা তোমার! আমার বিয়ের সময়ও তো আমার বউকে নিয়ে কত ভয় পেয়েছিলে তুমি। আমার জন্য কত ভাবো তুমি। তাই তো তোমাকে এতটা ভালোবাসি আমি। লাভ ইউ ফুপুমনি। "

সামিনের খোঁচা শুনে কিয়ান বাঁকা হাসে। সে কফির কাপ হাতে নিয়ে নিঃশব্দে কফিতে চুমুক দেয়।

সামিন নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলো। তানহার বাবা নেই, তার মা তার ভাইয়ের পরিবারে থাকেন। তানহার সাথে সামিনের পরিচয় একটা ছোট্টো এ'ক্সিডেন্টের মাধ্যমে। সামিন সেদিন বাইক নিয়ে বেরিয়েছিলো। তবে মাঝপথে সামনে একটা সবজির গাড়ি চলে আসতেই সে ব্রেক কষতে দিয়ে উল্টো বাইক নিয়ে পরে যায়। বাইকের স্পীড কম থাকায় আঘাতটা হালকার উপর দিয়েই গিয়েছিলো। পথিমধ্যে সেদিন তানহা তার মেডিক্যাল ক্লাস করে বাড়ি ফিরছিলো। সামিনকে আঘাতপ্রাপ্ত দেখে মানবতা দেখিয়ে সাহায্য করে। তবে সামিন সেদিন শুধু রাস্তাতেই পরে নি। বরং তানহার প্রেমে একদম উল্টে পরেছিলো। এরপর শুরু হয় তানহার পিছু ঘুরা, তাকে প্রপোজ করা। তানহা রাজি না হলে জোর করে রাজি করিয়েছে। সেটা আবার তানহার ভাই জানতে পেরে অনেক বকাবকি করেছিলো। রাগ দেখিয়ে দ্বিগুন বয়সের কারও সাথে বিয়ে দিতে চাইলে সে রাতে সামিন তাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে সোজা বিয়ে করে বাড়িতে আনে। দুর্ভাগ্যবসত সেদিন বাড়িতে রোজা বেগম উপস্হিত ছিলেন। সামিনের এমন কাজে তিনি হায় হায় করে উঠেন। এমনকি তানহার চরিত্র নিয়েও কথা তুলেছিলেন। তবে তানহা নিজের সততা আর গুণ দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই সবার মন জয় করে নিয়েছে। তাই তো সামিন নিজের উপর গর্ববোধ করে। সে সঠিক মানুষকেই ভালোবেসে বিয়ে করে এনেছে। পাশাপাশি পরিবারকে উপহার দিয়েছে একটা মিষ্টি বউমা আর দুষ্টু ছেলে সোহানকে।

এখন সামিন নিজের কথা শেষ করে তানহার দিকে তাকায়। তানহা ইশারায় তাকে শাসাতে থাকে ফুপুকে এভাবে ত্যাড়া কথা শোনানোয়। মেয়েটা বড্ড সহজ-সরল। সামিন সেসব ভেবে মুচকি হাসে। ইশারায় বরং ঠোঁট চোখা করে চুমুও ছুড়ে দেয়। তানহা লজ্জা পেয়ে দ্রুত স্হান ত্যাগ করে। তার স্বামী বড্ড অসভ্য, পরিবারের সবার সামনে তাকে লজ্জা দিতে ছাড়ে নাহ। বিয়ের এত বছর পার হলেও সামিনের স্বভাব আর চেঞ্জ হলো নাহ।

সামিন মুচকি হেসে সামনে তাকাতেই দেখে কিয়ান তার দিকে তাকিয়ে আসে। ইশারায় ভ্রু উঁচু করে তাকাতেই সামিন দাঁত বের করে হেসে দেয়। দুই ভাইকে এমন ইশারা ইঙ্গিতে কথা বলতে দেখে রোজা বেগম আর্তনাদের ভঙিতে বলে,

" দেখছো ভাবী, কি মানুষ করেছো ছেলেদের? সরাসরি কথা না শুনাতে পেরে এখন ইশারা ইঙ্গিতে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। আমার ভাতিজাগুলো এমন হবে কখনও ভাবিই নি। "

" আহহা ফুপু, রাগ করো নাহ তো। তুমি চাইলে আমরা ইশারা-ইঙ্গিত বাদ দিয়ে সরাসরিই কথা বলতে পারি। এভাবে কথা বলতে আমাদেরও একটু কষ্ট হচ্ছে। "

সামিনের কথায় মীমু নিজেও হেসে উঠে। যেন তার মাকে নিয়ে মজা করায় তার কিছুই যায় আসে নাহ। বরং সে প্রতিবাদ না করে ফোন দেখায় ব্যস্ত। মাঝে মাঝেই তার নজর কিয়ানের দিকে যাচ্ছিলো।

সোহান তখন কিয়ানের কফির মগে বিস্কুট ভিজিয়ে খাচ্ছে। আর কিয়ান কিছু না বলে সেই কফিই নিজেও খাচ্ছে। মীমু তা দেখে বলে,

" এই পিচ্চিকে আরেকটা কাপে করে দিতে পারলো নাহ। কিয়ান ভাইয়ের কাপ থেকে নিয়ে খাচ্ছে। খাবারটা নষ্ট করছে শুধু। "

তানহা নিজের ছেলেকে ডাকতেই যায়, তখনই কিয়ান মীমুকে গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,

" তুই নিজের কাজ কর। আমাদের নিয়ে ভাবতে বলি নি। "

" কিন্তু ও তো তোমার কফি...."

কিয়ান তাকাতেই সে থেমে যায়। সোহান একবার মীমুর দিকে তাকিয়ে জিহ্ব বের করে ভেঙিয়ে দেয়। নিজের বাচ্চাসুলভ কন্ঠে বলে উঠে,

" জানো চাচ্চু, আমার পরি কত্ত ভালো। ওদের বাসায় পরি আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছিলো। আমি তো মাছ খাই নাহ, কিন্তু পরি আমাকে খাইয়ে দিয়েছিলো। অনেক মজা লেগেছিলো আমার। "

তানহা বলে উঠে,

" কিরে, তুই তো বলিস নি তুই সে বাসায় গিয়ে মাছ খেয়েছিস। "

" বললে তুমি পরে আমাকে জোর করে মাছ খাওয়াবে। তাই বলি নি। "

" ওরে বজ্জাত, আসছে তোর পরি এ বাসায়। প্রতিদিন মাছ রান্না করেই তোর পরির হাতে ধরিয়ে দিবো। না খেয়ে যাবি কোথায়? "

সোহানের মুখ ফুলানো দেখে সবাই হেসে উঠে। রোজা বেগম বলে উঠেন,

" বাহ! বাহিরের মেয়েটাকে দেখি পরিবারের অংশ বানাতে সবাই উঠে পরে লাগছে। "

সামিন রোজা বেগমের পাশেই বসে ছিলো। সে একটু ফুপুর কাছাকাছি এসে নিচু স্বরে বলে,

" তুমি তো জানোই নাহ ফুপু। সব ঠিকঠাক থাকলে মেয়েটা আজ আমাদের পরিবারের একজন সদস্যই থাকতো। তবে সময় কিন্তু চলে যায় নি। এখনও সব ঠিক থাকলে চান্স আছে বটে। "

বিষয়টা জানতে পেরে রোজা বেগমের চোখ কপালে উঠার জোগার হয়। এর জন্যই তবে সেই নীলা মেয়েটাকে নিয়ে এত নাচানাচি সবার! সে তার ভাবীর দিকে তাকিয়ে দেখে সে কিছুই বলছে নাহ। তার মানে ভাবীর হয়তো আপত্তি আছে বিষয়টাতে। এটাকেই কাজে লাগাতে হবে। ভাবীকে হাত করে দ্রুত তার মেয়েকে এই পরিবারের অংশ করতে হবে। এটাই তো তার স্বপ্ন।

**************

" দোস্ত, একটা খবর আছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র জাহান আপুর বিয়ে হচ্ছে। জাহান আপু বলেছে বিশাল এক অনুষ্ঠান করবে। আমাদের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে। "

" আরে বলিস কি? তাই বলে ডিপার্টমেন্টের সবাইকে? এতই বড়লোক্স? "

" হুম রে। টিচারদেরও আমন্ত্রণ করেছে। শুনলাম ছেলেদের নাকি বিশাল বিজনেস আছে। প্রেমের বিয়ে, তাই এত অনুষ্ঠান। যাবি নাকি? "

" সুযোগের হাতছাড়া করতে নেই বাছা। সুযোগ যখন পেয়েছি, তবে যাবো নাহ কেন? অবশ্যই যাবো। অনুষ্ঠান কবে? "

" এই সপ্তাহর শেষের দিকে। "

নীলা ভেবে দেখে তার বাবা তখনও তার সাথেই থাকবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় বাবা থাকতে একটু মজা করে নিক। পরে তো তাকে আদর্শ কন্যার ভুমিকায় থাকতে হবে। যতদিন বাবার আশ্রয়ে আছে, ততদিন বাবার অনুমতি পেলেই চলবে। তবে

সেই পরিবারে গেস্ট হয়ে গেলে সে এভাবে স্বাধীনতা কাটাতে পারবে নাহ। যাদের আশ্রয়ে থাকবে, তাদের অনুমতি নিয়েই

চলতে হবে। কদিন ধরে বাবা এসব তাকে মুখস্ত করাচ্ছে, যাতে নীলা ভালো মেয়ে হয়ে থাকতে পারে। আর বাবার সম্মান রক্ষার্থে তাকে যে সেসব মেনে চলতেই হবে।

দেখতে দেখতে অনুষ্ঠানের দিন চলে আসে। নীলা তৈরি হয়ে বাবাকে জানিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসে। বাহিরে নাবিহা অপেক্ষা করছে। অনুষ্ঠান সন্ধ্যার পর শুরু হবে। তবে নীলা জানিয়েছে সে দ্রুত ফিরে আসবে। বাবাকে অনুষ্ঠান ভ্যেনুর ঠিকানা জানিয়ে সে বেরিয়ে পরে।

পড়নে তার একটা নীল ড্রেস পড়া। চুলগুলো সামনে থেকে দুপাশে আটকে রেখে ছেড়ে দিয়েছে। মুখে হালকা মেকাপ, আর উজ্জ্বল পোশাকে নীলাকে যেন একটা নীল পরির মতোই লাগছে।

তাটা দুজনে সেন্টারে গিয়ে আগে ডিপার্টমেন্টের সেই সিনিয়র আপুর সাথে দেখা করে। আপুর সাথে তাদের আগে থেকেই পরিচয় ছিলো। আর সেও নীলা, নাবিহা অনেক পছন্দ করে। তাদের দেখেই মেয়েটি খুশী হয়ে বলে,

" আলাদা করে জানাতে পারি নি বলে রাগ করিস নাহ। আমি জানতাম তোরা আসবি। বড্ড মিষ্টি লাগছে তোদের। নীলাকে তো পুরোই নীল পরি লাগছে। "

" দেখলি নীলা, বললাম না তোকে নীল পরি লাগছে৷ আমার কথা তো বিশ্বাস করিস নাহ। "

তারা গল্প করতে থাকে। অনেক পরিচিত মুখ তাদের চোখে পরছে। নীলার বড্ড ভালো লাগছিলো। হটাৎ চারপাশে হইচই শুনে তারা দরজার দিকে তাকায়। সেখানে বিয়ের পোশাকে বরকে দেখে তারা খুশী হয়। জাহান আপুর সাথে অনেক মজাও করছিলো। নীলার চোখ পরে একটু পর দরজার দিকে। যেখানে একটা স্যুট পরে কিয়ান প্রবেশ করেছে। কিয়ানের এই রুপ সবাইকে থামিয়ে দিয়েছে। সবাই অবাক হয়ে কিয়ানের দিকে তাকায়৷ কিয়ানকে হেসে বরের সাথে কথা বলতে দেখে সবাই আরেক দফা অবাক হয়। জানতে পারে কিয়ান বর জাহান আপুর বর সম্পর্কে বন্ধু হয়।

কিয়ানের চোখ একসময় নীলার দিকে এসে পরে। নীলাও তখন তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। দুজনের চোখাচোখি হতেই দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে পরে। কিয়ান চোখ সরিয়ে নিলেও অজান্তেই তার চোখ আবারও নীলার দিকেই চলে আসে। আজকের নীলাকে যেন আগের সব দিনের চেয়ে আলাদা লাগছে। নীল রঙের পোশাকে, খোলা চুলে, মুখে হালকা সাজ মেয়েটাকে সত্যিই নীল পরির মতো লাগছে।

নীলাকেও আড়চোখে তাকাতে দেখে নাবিহা কানের কাছে এসে বলে,

" স্যারকে অনেক হ্যান্ডসাম লাগছে না বল। আমি তো ক্রাশ খেয়ে গেলাম। "

নীলা নিজেও বারবার আড়চোখে কিয়ানকে দেখছিলো। তবুও নিজেকে সামলে মুখ বাকিয়ে বলে,

" পুরো কালো কাকের মতো লাগছে। আমি নীল ড্রেসে নীল পরি হলেও ওনি কালো পোশাকে কালো কাক হয়ে এসেছেন। কাককে দেখে কে ক্রাশ খায়? "

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন