#তোমাকে_ভাবিনি_কখনও (১৮)
#মায়িশা_নুরাইন
" তোমার মতো মেয়ের পক্ষে একজন পুরুষকে ঠেলে সরানো অসম্ভব নীলা। বিপদে পরে সাহসী হওয়ার থেকে বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। নয়তো এখন আমার নিচে যেমন অসহায় হয়ে পরে আছো, তেমনই অবস্হা হবে তোমার।
" স-সরুন স্যার। "
" আমার যায়গায় শান্ত থাকলেও বুঝি এভাবেই অনুনয় করতে? "
" কখনও নাহ। "
" তাহলে শান্তকে যেভাবে সরাতে, আমার সাথেও তাই করো।"
নীলা কিছুক্ষণ থামে। সাহস সঞ্চয় করে একটা বড় শ্বাস ফেলে হটাৎই কিয়ানের গাল বরাবর ঘুষি মেরে দেয়। সাথে সাথেই কিয়ান ছিটকে পরে যায়। নীলা নিজেও ভয় পেয়ে দ্রুত উঠে বসে। কিয়ান মাথা তুলে গালে জিহ্ব ঠেকিয়ে নীলার দিকে তাকায়। তার সেই চাহনী নীলার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। সে ভয়ে কাঁপা স্বরে বলে,
" আ-আপনিই বলেছেন এমনটা করতে। আ-আমার কোন দোষ নেই। "
কিয়ান কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার শান্ত অভিব্যক্তি দেখে নীলা একটু নিজের উপর রাগ করে। তার উচিত হয় নি এত জোড়ে আঘাত করা। কিয়ান তো শুধু কথার কথা বলেছে। আর সেও গায়ের জোড়ে আঘাত করে বসলো। তাই সে এগিয়ে আসে কিয়ানকে সরি বলার জন্য। তবে যখনই সে কিয়ানের নিকট পৌছে, কিয়ান আচমকা তাকে চেপে ধরে। মুখে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
" বড্ড বোকা মেয়ে তুমি। শত্রুকে আঘাত করে আবার পরে সাহায্য করতে আসবে? আর শত্রু তোমায় এত সহজে ছেড়ে দিবে?
নীলা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিয়ান যে এতক্ষণ রাগ করার ভান ধরেছিলো, তা সে বুঝতে পারে। তাই এবার সে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
" হু, বুঝেছি। এখন সরুন। "
" যদি না সরি? তোমাকে না আ্যালকোহল দেওয়া হয়েছিলো৷ এখন এতটা স্বাভাবিক আছো কিভাবে? "
নীলা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে উঠে বসে। কিয়ানও এবার দূরত্ব রেখে ভদ্র হয়ে বসে। নীলা নিজের উপর গর্ব করে বলে,
" হজম করে ফেলেছি। নিজের কত উল্টাপাল্টা রান্না খেয়ে হজম করে ফেলি। আর এটা তো সাধারণ পানীয় মাত্র। বাই দ্য ওয়ে, আপনি কিভাবে জানলেন আমাকে অ্যালকোহল দেওয়া হয়েছিলো? "
" সফট ড্রিংসের পাশাপাশি এসব সার্ভ করা হচ্ছিলো। আমি টের পেয়ে তাদের না করেছিলাম। তবুও শান্তর কথায় তারা তোমাকে....."
" এই ওয়েট, এই শান্ত না ফান্ত, এটাকে আপনি কিভাবে চিনেন? "
" রিপনের বন্ধু। "
" মানে জাহান আপুর হবু স্বামীর বন্ধু? তারমানে আপনারও বন্ধু। আপনার সাথে আবার কোন শত্রুতা নেই তো? "
" আমার সাথে শত্রুতা হলে তোমাকে এট্যাক করবে কেন? তুমি তার সাথে কি করেছো? "
নীলা ফিক করে হেসে বলে,
" থাপ্পড় মেরেছিলাম। "
সে সেদিনের ঘটনাটা কিয়ানকে সবটা শুনায়। কিয়ান সব শুনে বলে,
" বড্ড অহংকারী নাহ তুমি? একটা ছেলে হাত ধরলো আর তুমি তাকে থাপ্পড় মেরে দিলে? "
" এটাকে অহংকার বলে নাহ। আমাকে অসম্মান করা হয়েছে, আর আমি তার শাস্তি দিয়েছি। আপনারা পুরুষরা কি বুঝবেন? আমরা মেয়েরা ঠিকই বুঝতে পারি কার নজর কেমন? কেন ছেলেটা আমাদের দিকে কেমন নজরে তাকিয়ে আছে, তা আমরা ভালোই বুঝতে পারি। "
কিয়ান এবার তার দিকে তাকায়। মৃদু স্বরে বলে,
" তো বলো তো, আমার নজর তোমার কাছে কেমন ঠেকছে।"
এই পর্যায়ে নীলা কিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের খেই হারিয়ে ফেলে। কিয়ানের দৃষ্টি যেন তাকে এফোড় উফোর করে দিচ্ছে। গাঢ় সেই চোখ জোড়ায় যেন অজানা কিছুর উপস্হিতি রয়েছে, যা নীলা আগে কারও চোখে নিজের জন্য দেখে নি। নীলা থমকে যায়। হটাৎ ফোনের শব্দে দুজনের ঘোর ফিরে। কিয়ান নিজেও স্বাভাবিক অবস্হায় আসে। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে নীলার বাবা কল দিচ্ছেন। সে রিসিভ করে নীলার দিকে ঠেলে দেয়।
" কিয়ান বাবা, আমি নীলার সাথে যোগাযোগ করতে পারছি নাহ। আমার মেয়েটার....."
" বাবা, আমি নীলা বলছি। "
" নীলা, তুই...তোর ফোন কোথায়? ফোন বন্ধ কেন? বারবার বলেছিলাম ফোনে চার্জ করে রাখতে৷ ফোন বন্ধ হয়ে গিয়েছে নাহ? "
" ফোনটা হারিয়ে ফেলেছি বাবা। "
রফিক সাহেব থামেন। পরক্ষনেই বলেন,
" আচ্ছা, ব্যপার নাহ। আরেকটা কিনে দিবো। এখন কোথায় আছিস তুই? এত রাত হচ্ছে কেন? "
" বাবা, আমি নাবিহার বাসায়। আসলে....আমি নাহ...এ-একটু ব্যথা পেয়েছি। বেশী ব্যাথা নাহ, অল্প পেয়েছি। পরে গিয়েছিলাম। এখন নাবিহার সাথে তার বাসায় এসেছি। তুমি টেনশন করো নাহ। আমি সকালেই চলে আসবো। "
কন্ঠে জোর দিয়ে নীলা বাবাকে টেনশন করতে মানা করে। তবে বাবার মন তো সায় দেয় নাহ।
" তাহলে কিয়ানের ফোন তোর কাছে কেন? "
নীলা থতমত খেয়ে যায়। তার এমন অভিব্যক্তি দেখে কিয়ানও তাকায়। নীলা আবারও মিথ্যে বলে,
" আমি ব্যাথা পাওয়ায় স্যার আমাদের এগিয়ে দিতে এসেছে। এখমও এখানেই আছে। "
" কিয়ান যখন সাথে ছিলোই, তবে তোরা সোজা বাসায় চলে আসলি নাহ কেন? "
নীলা কি উত্তর করবে বুঝতে না পেরে ফট করে বলে উঠে,
" ওনার...ওনার গাড়ির তেল শেষ হয়ে গিয়েছিলো। অনেক রাত হয়েছে তো, তাই কেন পাম্পও খোলা পায় নি। "
রফিক সাহেবের বিশ্বাস হয় নাহ। তবুও নীলা ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে বাবাকে শান্ত করে। তার কথা শেষ হলে রুমে কিয়ারা প্রবেশ করে। কিয়ারাকে আসতে দেখে কিয়ান উঠে ওয়াসরুমে ফ্রেস হতে চলে যায়। কিয়ারা এসে ক্লান্ত স্বরে বলে,
" সব আবার নতুন করে রান্না করলাম। বড্ড দেরী হয়ে গেলো। আসো তোমরা, খাবার খেয়ে নিবে। "
নীলা মুখ নামিয়ে বলে,
" আমার জন্য আপনার কষ্ট হয়ে গেলো। "
" আরেহ, এসব ব্যাপার নাহ। এমনিতে রান্নাবান্না করতে আমার বেশ ভালোই লাগে। এসব না ভেবে আসো তো। তখন লেবুর জল খাওয়ায় তোমায় এখন একটু ঠিক লাগছে। এসব টুকটাক খাওয়ার অভ্যাস আছে নাকি? "
" আসতাগফিরুল্লাহ আপু, আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারি নি কি খাচ্ছি। আগে তো কখনও খাই নি। তাই তো ভাবলাম হাই সোসাইটির ড্রিংসের হয়তো স্বাদ অন্যরকমই হয়। তারপর আর কি! খেলাম আর চোখে সর্ষে ফুল দেখা শুরু করলাম। "
নীলার কথা বলার ভঙি দেখে কিয়ারা হেসে ফেলে।
" বেশ মজার মেয়ে তো তুমি। আমরা একসাথে থাকলে আমাদের ভালোই জমবে। অবশ্য কদিন পরে আমাকে ওই বাড়িতেই গিয়ে উঠতে হবে। "
নীলা কিছু না বুঝলে কিয়ারা মিষ্টি হেসে নিজের পড়নের জামাটা পেটের সাথে চেপে ধরে। নীলা খেয়াল করে তার পেটটা একটু উঁচু হয়ে আছে। কিয়ারা হাসি মুখে বলে,
" আমার বাবা-মা নেই। আবার শ্বশুর বিদেশ থাকে। শ্বাশুড়ি নেই। এই সময় আমার একমাত্র ভরসার জায়গা ওই বাড়িটাই। একমাত্র এই কারণেই আমরা দেশে ফিরে এসেছি। আয়ান সম্ভবত চলে যাবে আবার। আমি একাই থাকবো। "
" পুচকো আসলে ওর বাবা কাছে থাকবে নাহ? "
" তখন আবার আসবে হয়তো। "
এমন সময় কিয়ান এসে দাঁড়ায়। ভেজা চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলে,
" নিজেদের গল্পের জন্য সারা রাত পরে আছে। আমাকে খাবার দে আগে। আমায় তো বাড়ি ফিরতে হবে। "
" কোন ফিরাফিরি নেই। আজকে এখানেই থাকবে তুমি। আমি পাশের রুম ঠিক করে রেখেছি। তুমি খেয়েদেয়ে সোজা রুমে গিয়ে রেস্ট করবে। "
" তোকে এই অবস্হায় এত পাকনামি করতে কে বলেছে? অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদে পরে এসেছি আমরা। এত ঝামেলার কোন প্রয়োজন ছিলো নাহ। "
" নিজের মানুষের সাহায্য করলে তা ঝামেলা মনে হয় নাহ। আমি খাবার বাড়ছি, আসো তুমি। "
এদিকে নীলা আড়চোখে কিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিলো। ভেজা চুল হতে পানির ফোঁটা গড়িয়ে গাল, গলা বেয়ে বুকে মিশে যাচ্ছে। নীলার কাছে বিষয়টা বেশ আকর্ষণীয় লাগে। তাই তো সে চোখ ফেরাতে পারছে নাহ। হটাৎ পানির ঝটকা চোখে মুখে এসে লাগতেই নীলা চমকে উঠে। কিয়ান তার মাথার চুল হাত দিয়ে ঝাড়া দিয়ে নীলার দিকে তাকায়। কেমন রহস্যময় গলায় বলে,
" সেদিন বেয়াদবীটা না করলে এভাবে দেখার জন্য সারাটা জীবন পেতে। নিজের দোষে এখন সব হারালে। যদিও সুবিধা আমারই হলো। তোমার মতো একটা বেয়াদবকে আমার ঘাড়ে চাপাতে হলো নাহ। বেঁচপ গেলাম। "
কিয়ান চলে যেতেই নীলা সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে,
" আসছে কোথাকার আদবের কারখানা। আমার সাথে শয়তানি করার একটা ওয়েও তো বাদ দেয় নাহ। কি ভেবেছে ছাড় পেয়ে যাবে? আমি ঘাড়ে না চেপেও আপনার জীবন ত্যানা ত্যানা করে ছাড়বো। নয়তো আমিও নীলা নই, মি.কিশান শিকদার। "
**********
" বাড়িতে আসবেন? নাকি চলে যাবেন? "
" এভাবেই অতিথিদের আপ্যায়ন করো তুমি? "
" দেখুন, সাতসকালে আপনার সাথে ঝামেলা করার মুড নেই আমার। "
" আমার এত সময়ও নেই। তুমি ফাঁকিবাজ হতে পারো, আমি নই। ভার্সিটি যেতে হবে আমায়। "
" ওকে,ভালো থাকবেন। পুনরায় দেখা না হোক আমাদের। আল্লাহ হাফেজ। "
নীলা মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে নিলে কিয়ান পিছু ডাকে। নীলা তাকাতেই কিয়ান মুচকি হেসে বলে,
" আবার দেখা হয়ে গেলো আমাদের। ব্যাগটা তো নিয়ে যাও। "
নিজের জামা রাখা ব্যাগটা খপ করে ধরে নিয়ে নীলা মুখ ভেঙচি দেয়। তারপর দ্রুত বাড়িতে চলে যায়। কিয়ান সেদিকে তাকিয়ে নিজের মনে বলে উঠে,
" বয়স অনুযায়ী বড্ড বাচ্চা তুমি। আমাদের পরিবারে কতটা সার্ভাইব করতে পারবে জানি নাহ। তবে তোমাকে সাইজ করতে আমি সবসময় সাথে আছি। দেখবো তোমার এই জেদ, অহংকার কতদিন টিকে থাকে। তোমার বেয়াদবী ছুটাতে না পারলে আমিও কিয়ান নই মিস. নীলা। "
চলবে......
(প্রায় তিন মাস পর আজকে #বসন্তের_স্পর্শ বইয়ের পাণ্ডু ধরেছিলাম। পান্ডু ধরার পর এই গল্পে মন দিতে পারছি নাহ। সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ ঢিলামি করছি এই রানিংটাতে। দোয়া করো পান্ডুটা যেন তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারি। তবেই হয়তো রানিংয়ে মন দিতে পারবো।
আজকের পর্বটা নিয়ে দুটো ভালোমন্দ বলে যেও সবাই)