ফন্ট সাইজ:
থিম:
জানি, আবার দেখা হবে

৩য় পর্ব

লেখক: Mim Akter
পর্ব:৩

চারিদিকে ফজরের আজান ভেসে আসতেই আরোহীর ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসে সে আনিকাকে ডাক দিল।
আনিকা, ওঠ। নামাজ পড়তে হবে।
আর একটু ঘুমাই আপু...
তাড়াতাড়ি ওঠ। নামাজ পড়ে পড়তে বসবি।
ধুর! যাচ্ছি, যাচ্ছি।
দুজনেই উঠে ওযু করে নামাজ পড়ে নিল। নামাজ শেষে আরোহী কোরআন শরিফ পড়তে বসল, আর আনিকা বেলকনিতে বসে পড়াশোনা শুরু করল। ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি—দুই বিষয় মিলিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পড়ল সে।

এরপর আরোহী আনিকাকে গ্রামারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক পড়াতে শুরু করল। কিন্তু আনিকার মাথায় যেন কিছুই ঢুকছিল না।

বিরক্ত হয়ে আনিকা বলল,
আপুরে, তুই ইংরেজিতে পাস করলি কীভাবে বল তো?
আরোহী মুচকি হেসে বলল,
বলব। আগে বল, কীভাবে জানতে চাস?
হুম, বল।
আমার পাশে যে ছেলেটা বসেছিল, ওর দেখে দেখে সব লিখেছি। ও ইংরেজিতে খুব ভালো।

আনিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
দেখাতে চাইনি, কিন্তু...
—কিন্তু কী? কী করেছিলি তুই? আগে বল। আম্মুকে বলব না।

আরোহী একটু ইতস্তত করে বলল,
—আচ্ছা, বলছি। আসলে... আমি ওর সঙ্গে কয়েকদিন রিলেশনের নাটক করেছিলাম। যাতে ইংরেজি পরীক্ষার সময় ওর কাছ থেকে দেখে লিখতে পারি।

আনিকার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
—খুব ভালো করেছিস! এখন এসব বাদ দিয়ে আমাকে একটু ভালো করে পড়া।

—ঠিক আছে, পড়ছি।
কিছুক্ষণ পর পড়া শেষ করে দুজনেই একসঙ্গে নাস্তা  করে বেরিয়ে পড়ল। এবার আরোহীর অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস। তাই সে একদিকে চলে গেল, আর আনিকা ইশার সঙ্গে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

দুজনের পথজুড়েই চলতে লাগল কত গল্প, কত হাসাহাসি। একে অপরকে সারাদিনের ছোট-বড় সব কথা বলতেই যেন তাদের শেষ নেই।

অন্যদিকে, জাভিয়ানও ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো নাস্তা  করতে। নাশতা শেষ করতেই সবাই মিলে গল্প করতে বসে গেল। অবশ্য জাভিয়ানকে প্রায় জোর করেই তাদের মাঝে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর ইনায়া জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
ভাইয়া, তুমি না বলেছিলে আমাদের সঙ্গে ঘুরতে যাবে?
জাভিয়ান হালকা গলায় বলল,
হুম, বলেছিলাম তো। কোথায় যাবি তোরা?
আহরাম বলল,
—তোমরা বলো, কোথায় যাওয়া যায়?
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল। কিছুক্ষণ পর রাফসানা বলল,

মহাস্থান জাদুঘরে যাই। জায়গাটা অনেক সুন্দর।
সবাই আবার একটু ভেবে দেখল। তারপর একসঙ্গে বলে উঠল,
ঠিক আছে, ওখানেই যাব। আর মোমোইন যাব।
জাভিয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
—ঠিক আছে। তাহলে কালকে সবাই সকালে সকালে রেডি হয়ে থাকিস।

আহোরাম জিজ্ঞেস করল,
শুধু আমরাই যাব?
হুম। বড়দের নেব না।
আচ্ছা।
অন্যদিকে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে আনিকা আর ইশা কলেজ থেকে বের হলো। প্রথমে দুজন ফুচকা খেল। তারপর কাছের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।

অন্যদিকে সেই দোকানেরই এক পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছিল জাভিয়ান, রাফায়েল, জারিফ আর তাসকিন। ফারিস আর নিয়াজ তখনও আসেনি।
ইশা দুটো চায়ের অর্ডার দিল।
চা আসার অপেক্ষায় আনিকা হেসে বলল,
—আজকের কলেজ কিন্তু বেশ ভালো কাটল, বল?

ইশা মাথা নাড়িয়ে বলল,
—হুম। ওরা দুজনও কিন্তু বেশ ভালো ছিল।
—হ্যাঁ রে। ফাইজাও বেশ মিশুক ছিল।
দুজন গল্প করতে করতেই চা এসে গেল। কিন্তু চায়ের দাম দেওয়ার সময় আনিকার টাকা কোথায় যেন পড়ে গেল। দুজনেই নিচে তাকিয়ে টাকা খুঁজতে শুরু করল।

হঠাৎ ইশার পায়ের সঙ্গে আনিকার পা লেগে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে ইশা সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আনিকার সঙ্গে ধাক্কা লাগলেও দুজনেই কোনোমতে সামলে নিল।
কিন্তু ইশার হাতের চায়ের কাপটা পড়ে গেল মাটিতে।
আর আনিকার হাতে থাকা কাপের গরম চা ছিটকে গিয়ে পাশেই বসে থাকা জাভিয়ানের গায়ে পড়ল।
গরম চায়ের ছ্যাঁকায় জাভিয়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কেঁপে উঠল।

—আহ!
চারপাশের সবাই চমকে গেল।
জাভিয়ান ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।

সামনেই আনিকা।
গরম চায়ের যন্ত্রণা, তার ওপর আবার আনিকাকে সামনে দেখে জাভিয়ানের রাগ যেন মুহূর্তেই বেড়ে গেল। রাগের মাথায় সে আনিকাকে একটা থাপ্পড় মেরে বসে।
—বেয়াদব মেয়ে! তোমাকে না বলেছি আমার সামনে আসবে না? কথা কি তোমার কানে যায় না?
থাপ্পড় খেয়ে আনিকা গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। পুরো জায়গাটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

লজ্জা আর কষ্টে আনিকার চোখে পানি চলে এলো।
জাভিয়ান কঠিন গলায় বলল,
—লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি। পরেরবার যদি তোমাকে আমার সামনে দেখি, এর চেয়েও খারাপ হবে।
ইশা আর চুপ করে থাকতে পারল না।
—এই ছেলে, ও তো ইচ্ছা করে চা ফালাইনি  ভুল করে পড়ে গেছে! আপনি সবার সামনে ওকে এভাবে মারলেন কেন?
জারিফও বিরক্ত হয়ে বলল,
ও ইচ্ছা করে মারেনি।

আনিকা চোখের পানি মুছতে মুছতে কাঁপা গলায় বলল,
—আমি ইচ্ছা করে ফেলিনি.
কথাটা শেষ করার আগেই জাভিয়ান ধমক দিয়ে উঠল,
—চুপ! দূর হও এখান থেকে। পাগল মেয়ে!
আনিকার চোখ ছলছল করে উঠল।
ইশা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। আনিকার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে রাগে বলল,

—আমি পাগল না, আপনি পাগল! খবিশ লোক, জানোয়ার!
জাভিয়ান কিছু বলার আগেই ইশা আনিকাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ইশা আনিকাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেল।
সায়রা জাহান আর আরোহী তার সামনে বসে আছে।
কান্না করতে করতে আনিকার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।
আরোহী উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
—কী হয়েছে রে? তুই এমন কী করেছিস যে তোকে এভাবে মেরেছে।

সায়রা জাহান মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন,
—কী বলছিস তুই, মা? কে তোকে এভাবে মেরেছে।
তিনি আনিকার গালে হাত রাখতেই আনিকা আবার চোখের পানি মুছে ফেলল।
সায়রা জাহান নরম গলায় বললেন,
“এরপর যদি এমন করে আমাকে কল দিবি, তখন দেখব ওই ছেলের কত সাহস!
“তোরও তো দোষ ছিল। এমনি এমনি কি কেউ কাউকে থাপ্পড় দেয়?”

“চুপ কর! তুই এখন কিন্তু  আমাকে আরও রাগাস না। তোকে ধরে দেব!”
“রুমে যা। মা, ফ্রেশ হয়ে নে—আমি খাবার দিচ্ছি।”
“ঠিক আছে।”
প্রায় ত্রিশ মিনিট পর নিয়াজ আর ফারিস এসে পৌঁছাল। জারিফ তাদের পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। সবকিছু শুনে ফারিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“দোস্ত, এভাবে মারা ঠিক হয়নি। ও তো ইচ্ছে করে কিছু করেনি। তার ওপর আবার পাবলিক প্লেসে... অন্য কিছু হতেও পারত।”
নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক বলছিস।”
জাভিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ বসে শুধু বন্ধুদের কথা শুনছিল।
আফায়েল বলল,
“আচ্ছা, বাদ দে। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন এসব বলে আর কিছু হবে না।”
“হুম।”
জাভিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোরা আড্ডা দে। আমার একটু কাজ আছে, যেতে হবে।”
এই বলে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে,  দোকান থেকে নিজের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো জাভিয়ান।

এদিকে জাভিয়ানদের বাসায় তার দুই ফুফু আর ছোট খালা এসেছেন। আরমান চৌধুরীদের পরিবার ছিল বেশ বড়—তিন ভাই ও তিন বোন।
সবার বড় আরমান চৌধুরী। এরপর মির্জা নওশাত, তারপর নাইরা চৌধুরী, এরপর রাশেদ চৌধুরী। তাদের ছোট বোন রুবা চৌধুরী। নাইরা বেগম—তার এক মেয়ে ও এক ছেলে।
বড় ছেলের নাম সিজান, ছোট মেয়ের নাম সেজুতি।
রুবারও এক ছেলে ও এক মেয়ে—বড় ছেলে রাইহান আর মেয়ে ইশকা।
জাভিয়ান বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করল। এরপর সবাই মিলে বেশ কিছুক্ষণ গল্প-আড্ডায় মেতে উঠল।
ইনায়া বলল,
“ভাইয়া, কালকে তো আমরা ঘুরতে যাব। তাই এখন সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো।”
জাভিয়ান হেসে বলল,
“কাল না, সিজান আসুক। তারপর যাব।”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, ওকে ছাড়া যাবে না!”
হ্যাঁ, ও আসুক। তারপর ঠিক করব।”
“ঠিক আছে ভাইয়া, তাহলে পরেই যাব।”
“হুম।”
আড্ডা শেষ করে সবাই যার যার রুমে চলে গেল ঘুমানোর জন্য।
অন্যদিকে আনিকার যেন কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। বারবার তার মনে পড়ছিল দিনের সেই ঘটনাটা।
ইশা বলল,
“কী রে, তুই কি ঘুমাবি না?”
আনিকা ধীর গলায় বলল,
“তুই ঘুমা। আমি একটু পরে ঘুমাব।”
“ঠিক আছে। কিন্তু তাড়াতাড়ি আসিস।”
“হুম।”
কিছুক্ষণ পর আনিকাও বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল, কিন্তু তবুও যেন ঘুম কিছুতেই ধরা দিতে চাইছিল না।
বারবার শুধু একটা কথাই তার মনে পড়ছিল—

“ওই ছেলেটা এমন করে কেন আমার সাথে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন