#অবাধ্য_প্রনয়ীনি পর্ব |৬| #আনান_রোজ
—কিভাবে লোক টা ৫ বছর পর ফিরে এসে তালাকের কথা বলেও এভাবে অধিকার জাহির করে? সে কোন অধিকারে আমার হাতে চুমু দিল? স্বামীর নাকি সন্তানের বাবার অধিকারে?
এই কথা গুলো ভাবতে ভাবতে, ছলছল চোখে অনন্যা আইনান কে জরিয়ে একপর্যায়ে ঘুমের দেশে হারিয়ে যায়। ওদিকে, ইজানের কালো রঙের জিপটি রাতের অন্ধকার চিরে বাতাসের আগে ছুটে এসে তার আলিশান সরকারি বাসভবনের সামনে কড়া ব্রেক কষল এই বিশেষ ভিলাটি সম্পূর্ণ কাস্টম-মেড এবং কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত, কারণ তারা রাশিয়ান স্পেশাল ফোর্সের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে। ইজান বুটের শব্দ তুলে লক খুলে ভেতরে পা রাখতেই দেখল, লিভিং রুমের সোফায় রাহি বসে আছে। ইজানকে দেখা মাত্রই সে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এল এবং ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল—
—"ইজান! আজ তো তোমার কোনো লেট নাইট ডিউটি ছিল না, তাহলে এত রাতে তুমি..."
রাহির কথা শেষ হওয়ার আগেই ইজান এক ক্ষিপ্র হিংস্রতায় এক হাত বাড়িয়ে রাহির গলাটা শক্ত করে চেপে ধরল এবং তাকে সোজা পেছনের দেয়ালের সাথে লেপ্টে দিল! ইজান দাঁতে দাঁত চেপে, চরম কটমট করে ওঠা গলায় বলল—
—"তোমাকে আমি হাজার বার ওয়ার্নিং দিয়েছি না রাহি, আমার পার্সোনাল লাইফ থেকে একদম দূরে থাকবে? আর ফিয়ন্সে হওয়ার এই নোংরা নাটকটা বিডিতেও করছ? কে তোমার ফিয়ন্সে, হ্যাঁ? লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি, আই এম নট ইন্টারেস্টেড ইন ইউ! আন্ডারস্ট্যান্ড?"
ইজানের এই পাশবিক রূপ আর গলার কড়া চাপে রাহির চোখ জোড়া মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলে ছলছল করে উঠল। ইজান এক ঝটকায় রাহির গলা থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল এবং নিজের বেডরুমের দিকে এগোতে এগোতে বরফশীতল গলায় আদেশ দিল—
—"আগামীকালের মধ্যে নিজের অফিশিয়াল প্লেসে মুভ করো এন্ড লিভ দিস ভিলা।"
রাহি নিজের গলাটা চেপে ধরে ওখানেই দাঁড়িয়ে তীব্র চিৎকারে কেঁদে উঠে বলল—
—"আই লাভ ইউ ইজান! ইউ আর মাইন, অনলি মাইন! তুমি অন্য কারও হতে পারো না!"
কিন্তু ইজান তার এই মরণ-চিৎকারকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নিজের ঘরের দরজাটা দড়াম করে আটকে দিল।
~~~~~~~~~~~~~~🥀
দেখতে দেখতে জীবনের খাতা থেকে প্রায় ১৫টি দীর্ঘ দিন কেটে গেল। এই ১৫ দিনে ইজান আর অনন্যার মধ্যে কোনো যোগাযোগ। হয়নি অনন্যা তার নিজের ছোট ঘরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে, ইউনিতে আনাগোনা কমিয়ে দিয়েছে, আইনান ডে কেয়ারে যেতে চায় না বলে। আর ইজান সোয়াতের কড়া ডিউটির আড়ালে নিজের ভেতরের আগুনটাকে চেপে রেখেছে। ওর কানে শুধু অনন্যার বলা মরে যান কথাটায় বেজে ওঠে বারবার।
আজ সকালে, ইজান তার এক পুরোনো বন্ধুর সাথে বিশেষ কিছু কারণে দেখা করতে এসেছে। তার এই বন্ধু আরকানও পুলিশ ডিপার্টমেন্টেই জব করে, তবে প্রফেশনের বাইরে সে একজন দুর্ধর্ষ প্রফেশনাল বাইকার। বন্ধু রেসিং ট্র্যাকে ছিল বলে ইজান আজ সশরীরে সেই বিশাল স্পোর্টস ট্র্যাকের গ্যালারিতে এসে বসেছে। সে ভিআইপি জোনে বসে বাকি রেসারদের সাথে গল্প করছিল আর মাঠের চাকার গর্জন দেখছিল।
আজ আরকানের একটি হাই-স্পিড রেস ছিল। কিন্তু ইজান লক্ষ্য করল, আরকান ট্র্যাকের প্রতিটা বাঁকে চরম চেষ্টা করেও সামনের একটি নির্দিষ্ট স্পোর্টস বাইকের সাথে কিছুতেই পেরে উঠছে না। ইজান অত্যন্ত উৎসুক ও তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজেও বাইক চালানোয় চরম এক্সপার্ট হলেও, তার পার্সোনাল ইন্টারেস্ট বাইকের চেয়ে সুপার কারের প্রতি একটু বেশি।
সে আর থাকতে না পেরে সামনে বসে থাকা আরকানের ম্যানেজার ফাহিমকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল—
—"আচ্ছা ফাহিম, আরকানের ঠিক সামনে যে ব্ল্যাক বাইকারটা লিড করছে, উনি কে?"
ফাহিম চশমাটা ঠিক করে ট্র্যাকের দিকে তাকিয়ে বলল—
—"স্যার, উনি একজন ফিমেল বাইকার। বয়সটা অনেক কম, কিন্তু রাইডিং স্কিল মারাত্মক দক্ষ! উনি ট্র্যাকে যখনই নামেন, সব সময় প্রথম বা দ্বিতীয় পজিশনেই ফিনিশ করেন। তবে উনার ডিমান্ড অনেক বেশি হলেও উনার হায়ারিং চার্জ অনেক কম।"
লেডি বাইকার শুনে, ইজানের কৌতূহল এবার আরও বেড়ে গেল। ফাহিম আবার বলল—
—"উনার রিয়েল আইডেন্টিটি সবসময় হাইড রাখা হয়। তবে আমি একবার ফেস দেখেছি। কিন্তু উনার নিজস্ব কোনো রেসিং বাইক নেই, উনি অন্য কোনো না কোনো এজেন্সির অধীনে পার রাইড চুক্তিতে রাইডিং করেন।"
ফাহিমের কথাগুলো শুনতে শুনতেই ট্র্যাকের ওপাশ থেকে বাইকগুলোর গগনবিদারী আওয়াজ ধেয়ে এল। আরকানরা ফিনিশ লাইন পার হলো! আরকান হলো দ্বিতীয়, আর সেই রহস্যময় ফিমেল বাইকারটি বিদ্যুৎ গতিতে ফিনিশ লাইন ক্রস করে হলো প্রথম!
সেই মেয়েটি ট্র্যাকের এক কোণে নিজের ভারী স্পোর্টস বাইকটি ব্রেক কষে থামাল এবং এক ঝটকায় নিজের মাথার কালো হেলমেটটা খুলে ফেলল। হেলমেটটা খোলার সাথে সাথেই দুমড়ে থাকা লম্বা কালো কুচকুচে চুলগুলো দুপুরের বাতাসে মায়াবী ঢেউ খেলে চারদিকে উড়ে বেড়াতে লাগল!
গ্যালারিতে বসা সোয়াত কমান্ডার ইজান এক সেকেন্ডের জন্য নিজের জায়গায় স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো মুহূর্তের মধ্যে তীব্র বিষ্ময়ে ছোট হয়ে এল, অনন্যা! ধবধবে ফর্সা মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে, স্পোর্টস গিয়ার পরে ট্র্যাকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং অনন্যা আইমান !
ইজানের ঠোঁটের কোণে এক চরম পজেসিভ মাখানো মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের মনেই ফিসফিস করে আওড়াল—
— "আর কত রূপ দেখাইলি রে মেয়ে! ভাঙা ফোন আর পেত্নির মতো চুল নিয়ে ঘুরে যে মেয়ে, সে রেসিং ট্র্যাকে এসে আগুন জ্বালায়!"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহিম ইজানের এই অদ্ভুত স্বগতলাপে চরম অবাক হয়ে গেল। ইজান এক ঝটকায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ফাহিমের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত কড়া ও রোমাঞ্চকর গলায় অর্ডার দিয়ে বলে—
—"উনার সাথে আজই আমার একটা রেসিংয়ের ব্যবস্থা কর । কিন্তু রেস শুরু হওয়ার আগে আমি কে—সেটা উনাকে বিন্দুমাত্র জানতে দিবে না।"
কথা গুলো শুনে, ফাহিম দ্রুত গ্যালারি থেকে নেমে ট্র্যাকের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্যার দিকে এগিয়ে গেল। সে অনন্যাকে একপাশে ডেকে নিয়ে অত্যন্ত মার্জিত গলায় বলল—
—"অনন্যা, একজন স্পেশাল গেস্ট আপনার সাথে ওয়ান-অন-ওয়ান একটা রেস করতে চান। এটার জন্য আপনাকে রেগুলার রেটের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা পে করা হবে।"
ফাহিমের কথায় অনন্যার চোখে এক চিলতে স্বস্তির আলো খেলে গেল। আইনান বেশ কয়েকদিন যাবত একটা বড় রিমোট কন্ট্রোল কারের জন্য অনবরত বায়না ধরে আছে। তাছাড়া ছেলেটার জন্য কিছু নতুন শপিং করা খুব দরকার, জামা কাপড় কসমেটিকস। সবচেয়ে বড় কথা, ইজানের সাথে আইনি লড়াই লড়তে হলে এবং এই নরক থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে হলে তাকে খুব দ্রুত একজন নামকরা, প্রভাবশালী লয়ার হায়ার করতে হবে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে যে ইজান ডিভোর্সের ব্যাপারে মোটেও সিরিয়াস নয়, বরং সে এক নোংরা মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে।
অনন্যা আর এক সেকেন্ডও না ভেবে মাথা নেড়ে বলল—
—"ঠিক আছে ফাহিম ভাই, আমি রেডি।"
ফাহিম দ্রুত ফিরে এসে ভিআইপি জোনে বসা ইজানকে অনন্যার সম্মতির কথা জানিয়ে দিল।
রেস শুরু হওয়ার আগে অনন্যা সামান্য জিরিয়ে নেওয়ার জন্য ট্র্যাকের পেছনের রেস্ট-রুমে গিয়ে ঢুকল। সেখানে আগে থেকেই আইনানকে কোলে নিয়ে বসে ছিল নেহা। অনন্যাকে দরজায় দেখামাত্রই আইনান নেহার কোল থেকে লাফিয়ে নেমে তার ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে এসে মায়ের পা জড়িয়ে ধরল। সে আধো আধো গলায় বলল—
—"আম্মু! আমলা আজ লিমোট কাল কিনতে যাবু না?"
অনন্যা হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে আইনানকে বুকে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় ওর কপালে একটা চুমু খেল। তার ক্লান্ত মুখটায় এক পৃথিবী মায়া ফুটিয়ে বলল—
—"হ্যাঁ বাবা, আমরা অবশ্যই যাব। তোমার জন্য দামী রিমোট গাড়িও কিনব, আর সুন্দর সুন্দর নতুন জামাও কিনে দেব।"
মায়ের কথা শুনে আইনানের নিষ্পাপ মুখটা খিলখিল হাসিতে ভরে উঠল। অনন্যা নেহার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার সুরে বলল—
—"নেহা, তুই আইনানকে একটু দেখিস, আমি জাস্ট লাস্ট রাইডটা শেষ করেই আসছি।"
নেহা হাসিমুখে সম্মতি দিতেই অনন্যা পানি খেয়ে দ্রুত নিজের স্পোর্টস হেলমেটটা হাতে নিয়ে ট্র্যাকের দিকে ছুটে গেল।
~~~~~~~~~~~~~~~🥀
ট্র্যাকের স্টার্টিং লাইনে পাশাপাশি এসে দাঁড়াল দুটো ভয়ঙ্কর স্পোর্টস বাইক। একটি অনন্যার ব্ল্যাক সুজুকি হায়াবুসা, আর তার ঠিক পাশেই এসে থামল এক দানবীয় কাউয়াসাকি নিনজা, যার চালকের পরনে সম্পূর্ণ কালো রেসিং গিয়ার আর কুচকুচে কালো হেলমেট। অনন্যা জানতই না এই হেলমেটের পেছনের মানুষটি কে।
ফাহিম ফ্ল্যাগ নামানোর সাথে সাথেই ট্র্যাকের বুক চিরে এক গগনবিদারী চাকার গর্জন উঠল! বাতাসের গতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুটো বাইক ফিনিশ লাইনের উদ্দেশ্যে ধেয়ে গেল।
প্রথম দুই ল্যাপে ইজানের বাইকটা অনন্যাকে পাত্তাই দিল না। রাশিয়ার স্পেশাল ফোর্সের দুর্ধর্ষ ট্যাকটিক্যাল ড্রাইভের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ইজান প্রতিটা বাঁকে অনন্যাকে লক করে দিচ্ছিল। গতি এবং ক্ষমতার এক নিখুঁত প্রদর্শন করে ইজান অনন্যার চেয়ে প্রায় তিন বাইক দূরত্বে এগিয়ে গেল। গ্যালারিতে বসা সবাই ধরে নিল—আজ এই মেয়েটির হার নিশ্চিত, কালো হেলমেটের ওই রহস্যময় পুরুষটি অনায়াসে জিতে যাচ্ছে!
কিন্তু তারা অনন্যা আইমানের ভেতরের সেই দাউদাউ করে জ্বলা প্রতিবাদী আগুনটাকে হয়তো চিনতে ভুল করেছিল। ৩য় ল্যাপের শেষ ভয়ঙ্কর বাঁকটায়, যেখানে সাধারণত রেসাররা বাইকের স্পীড কমিয়ে দেয়, অনন্যা সেখানে নিজের জীবনের সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে এক্সিলারেটর আরও কষে ঘুরিয়ে দিল! বাইকটি প্রায় মাটির সাথে লেপ্টে গিয়ে এক অবিশ্বাস্য শটকাট টার্ন নিল।
ফিনিশ লাইনের ঠিক একশো মিটার আগে, ইজান যখন জয়ের কাছাকাছি, অনন্যার বাইকটা বিদ্যুতের গতিতে ইজানকে পাশ কাটিয়ে ইঞ্চি খানেকের ব্যবধানে ফিনিশ লাইন ক্রস করে গেল!
আর....অনন্যা প্রথম হয়েছে!
সোয়াত কমান্ডার ইজান যেন সেকেন্ডের ব্যবধানে হেরে গেল! সে নিজের পুরো জীবনে কোনো অপারেশনে কখনো হারেনি আজ এই সাধারণ মেয়েটার কাছে....নিজের ২০ বছরের স্ত্রীর কাছে এই সেকেন্ডের পরাজয় ইজানের পুরুষালী ইগো আর অহংকারে এক প্রলয়ঙ্করী চপোটাঘাত করল! তার চোয়াল রাগে ও অপমানে শক্ত হয়ে উঠল।
অনন্যা বাইক থামিয়ে এক ঝটকায় নিজের মাথার হেলমেটটা খুলে ফেলল। তার ফর্সা মুখটা তখন রাগে ও খাটুনিতে লাল হয়ে গেছে, সে তীব্র গতিতে বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছিল। ইজানও তার বাইক স্ট্যান্ডে রেখে নিজের হেলমেটটা এক হ্যাঁচকা টানে মাথা থেকে খুলে ফেলল। দূর থেকে ফাহিম আর আরকান চরম উত্তেজিত হয়ে তাদের দিকেই ছুটে আসছিল।
ইজান আর এক মুহূর্ত নষ্ট না করে অনন্যার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার চোখ দিয়ে তখনো পরাজয়ের আগুন ঝরছিল। সে অনন্যার একদম কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত নিচু, বিষাক্ত অথচ স্পষ্ট গলায় বলে উঠল—
—"অবশেষে...ব্রিগেডিয়ার ফারহান আইমানের কড়া শাসন আর নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের সেই পুরনো বাইক রাইডিংয়ের স্বপ্নটা পূরণ করেই ফেললি, মিসেস সালার মুনতাহির?"
ইজানের কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই অনন্যা এক তীব্র শকে চমকে উঠে তাকাল! তার চোখের মণি দুটো বিষ্ময়ে স্থির হয়ে গেল। প্রতিপক্ষ যে স্বয়ং ইজান, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
ততক্ষণে আরকান আর ফাহিম তাদের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে, তবে তারা ইজানের বলা শেষ কথাগুলো কিছুই শুনতে পেল না। আরকান ইজানকে দেখে আকাশ থেকে পড়ে বলল—
—"আরেহ ইজান! তুই আজ হুট করে ট্র্যাকে? বাইক রাইড করলি? আর রেসও হারলি?!"
কিন্তু, অনন্যার বুকের ভেতরটা সেকেন্ডের জন্য আতঙ্কে কেঁপে উঠল। কারণ পেছনের রুমেই আইনান আছে। কিন্তু অনন্যা তার চিরচেনা স্বভাবের কারণে নিজের ভেতরের সেই ভয়টা একটুও মুখে প্রকাশ পেতে দিল না সে নিজের চুলগুলো এক ঝটকায় পিঠের ওপর মেলে দিয়ে, ইজানের সেই চূর্ণ-বিচূর্ণ অহংকারী চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক চরম তাচ্ছিল্যের সুরে উচ্চস্বরে বলে উঠল—
—"হেরে গিয়ে কেমন ফিল হচ্ছে, সালার চাচ্চু? ইগোতে খুব বাজেভাবে হার্ট হয়নি তো?"
অনন্যার মুখে সবার সামনে এই সম্বোধন আর পরাজয়ের উপহাস শুনে সোয়াত কমান্ডার ইজানের সারা শরীরে রাগের এক তীব্র বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল, তার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল। সে আরকান আর ফাহিমের সামনে নিজের কড়া প্রফেশনাল ইমেজটা ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাইল না সে এক ঝটকায় নিজের মুখভঙ্গি স্বাভাবিক করে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কথা ঘুরিয়ে বলল—
—"রাইডিং স্কিলটা মন্দ নয়, তবে ট্র্যাকের শেষ বাঁকটায় যেভাবে ওভারটেক করলি, ওটা কিন্তু কোনো দক্ষ রেসারের লক্ষণ নয়। জাস্ট ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছিস, নয়তো স্পিড কন্ট্রোল করতে না পেরে আজ হসপিটালের বেডে থাকতে হতো।"
অনন্যা ইজানের এই সস্তা খোঁটা শুনে এক চুলও দমে গেল না। সে নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে, ইজানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত বাজেভাবে অপমান করার সুরে বলল—
—"যাঁরা ট্র্যাকে হেরে যায়...তাঁদের মুখে এমন ভাগ্য আর এক্সিডেন্টের গল্পই মানায়। নিজের খামতিটা ভাগ্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে, বরং রাশিয়ার স্পেশাল ফোর্সকে গিয়ে বলুন—তাঁদের কমান্ডিং অফিসারের রাইডিং স্কিলটা রি-চেক করতে।"
অনন্যার এই ধারালো এবং চূড়ান্ত অপমানজনক মন্তব্য শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরকান আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, সে হো হো করে উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠল! ম্যানেজার ফাহিম পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে একদম কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ইজান অনন্যার এই দুঃসাহস দেখে রেগে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ফাহিম কাঁপা কাঁপা হাতে অনন্যার দিকে এগিয়ে এসে দুটো চেক বাড়িয়ে দিয়ে বলল—,
—"এই নিন মিস, আপনার আজকের উইনিং প্রাইজ আর রাইডিং চার্জের চেক গুলো"
অনন্যা এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ফাহিমের হাত থেকে চেক দুটো লুফে নিয়ে, ইজানকে এক তীব্র অবজ্ঞার পলক উপহার দিয়ে নিজের বুটের খটখট শব্দ তুলে রেস্ট-রুমের দিকে চলে গেল। আরকান এদিকে ইজানের রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে সেখান থেকে কেটে পড়ল, কারণ সে জানে এই মুহূর্তে ইজানের সামনে থাকা মানেই মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া !
ইজান একা ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে রাগে ও অপমানে ভেতরে ভেতরে একদম গজগজ করতে লাগল। কিন্তু সে নিজের চওড়া বুকে এক হাত রেখে ফিসফিস করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল—
—"কুল ডাউন ইজান...কুল ডাউন! নিজের বউয়ের কাছে রেস হারার মধ্যে লজ্জার কিচ্ছু নেই। বাট... এই অপমানের পানিশমেন্ট তোকে খুব জলদি পেতে হবে, মিসেস সালার মুনতাহির।"
নিজেকে সামলে নিয়ে সে আরকানের দিকে এগিয়ে গেল এবং তাদের অফিশিয়াল ক্রাইম কেসের জরুরি কাজ নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
এদিকে মিনিট দশেক পর, অনন্যা আগে রেস্ট-রুম থেকে বের হয়ে নেহাকে বলল আইনানকে নিয়ে দ্রুত পার্কিং লটের দিকে আসতে। ইজান তখন আরকানের সাথে কথা বলতে বলতে হুট করেই পার্কিং লটের দিকে তাকাল।
সে দেখল, কিছুটা দূরে একটা মহিলার হাত ধরে একটা ছোট ফুটফুটে ছেলে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে ছেলেটার আধো আধো গলার তীব্র চিৎকার বাতাসে ভেসে ইজানের কান পর্যন্ত পৌঁছাল—
—"কালামুনি! আমি আজ অনেত বল কালো লঙেল লিমোট গালি কিনব!"
ইজান ওদের পেছনে থেকে খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করল। ছেলেটার ওই ছোট্ট অবয়ব আর কালো রিমোট গাড়ির প্রতি তীব্র বায়নার কথাগুলো শুনে ইজানের ঠোঁটের কোণে নিজের অজান্তেই এক অদ্ভুত, মায়াবী মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তার পাথুরে বুকের ভেতর কেমন যেন এক অচেনা, অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি কাজ করতে লাগল। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারল না—রাশিয়ার কনকনে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া তার এই হৃদয়ে আজ একটা অচেনা বাচ্চার কণ্ঠ শুনে কেন এত তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলো! সে জানতই না, ওই বাচ্চাটার শরীরে এই মুহূর্তে তার নিজেরই রক্ত বইছে!
~~~~~~~~~~~~~~~~🥀
বিকেলের দিকে অনন্যা শপিং মল থেকে আইনানের সেই পছন্দের কালো রিমোট গাড়ি এবং নতুন কিছু জামাকাপড় কিনে নিজের ঘরে ফিরে আসে। আইনান নতুন খেলনা পেয়ে সারা ঘর জুড়ে খুশিতে মেতে ছিল। অনন্যা ওকে দুপুরের খাবার খাইয়ে পরম মমতায় বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
ছেলেটা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর অনন্যা তার এক চিলতে ঘরের বারান্দাটায় এসে বসল। বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন সন্ধ্যা নামছিল, তখন সে একা একা বসে ভাবছিল—সামনে সে কীভাবে কী করবে? ইজানের এই ক্রমাগত ফিরে আসা আর ডিভোর্স না দেওয়ার চক্রান্ত থেকে সে কীভাবে নিজেকে ও আইনানকে বাঁচাবে?
ঠিক তখনই বারান্দার দরজায় ছায়া ফেলে এসে দাঁড়াল ইফান। সে অনন্যার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম অথচ ব্যাকুল গলায় বলল—,
—"অনু... তোর সাথে আমার খুব জরুরি একটা কথা আছে।"
অনন্যা আকাশের দিকে তাকিয়েই অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল—
—"হ্যাঁ বলো, ইফান ভাই।"
ইফান আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারল না সে অনন্যার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে এক আকুল কণ্ঠে বলল—
—"আম্মু বিয়ের জন্য ফোর্স করছে...! এক্সেপ্ট করে নে না আমাকে ! আমি তোকে কথা দিচ্ছি আইনানকে আমি নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসব। ওর মনে আমি কোনোদিন কোনো অভাব বুঝতে দেব না, ওকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করব।"
অনন্যা নিজের চোখ দুটো ইফানের দিক থেকে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে নিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—,
—"ইফান ভাই... আমি তোমাকে বহুবার বলেছি, এটা কোনোদিনই সম্ভব না।"
ইফান এবার কিছুটা ক্ষুব্ধ ও অবুঝের মতো বলল—,
—"কেন সম্ভব না অনু? আম্মু-আব্বু মেনে নেবেন, আমি তাঁদের বুঝিয়ে বলব। তুই শুধু একবার হ্যাঁ বল"
অনন্যা এবার ইফানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং বরফশীতল গলায় বলল—
—"আমি এখনো ওই লোকটার বিবাহিতা স্ত্রী এবং ওর সন্তানের মা, ইফান ভাই! তুমি কি সত্যিই পারবে? নিজের সেই শত্রু, ইজানের স্ত্রী আর তার বাচ্চাকে নিজের নামের ছায়া দিতে?"
অনন্যার মুখে 'ইজানের স্ত্রী-বাচ্চা' শোনামাত্রই ইফান এক মুহূর্তে একদম চুপ হয়ে গেল, তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। কিন্তু সে নিজের ভেতরের পুরোনো প্রেমকে দমিয়ে রাখতে না পেরে বলল—,
—"আমি শুধু এটা জানি যে আমি তোকে আজীবন ভালোবেসেছি অনু! ৫ বছর আগে যদি বিডিতে থাকতাম, তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা আমি কোনোদিনও হতে দিতাম না! আর আইনানকে আমি কখনোই ইজানের ছায়ার নিচে যেতে দেব না"
—"ইফান ভাই!"
অনন্যার চোখ জোড়া ছলছল করছে, কিন্তু সে শক্ত গলায় ইফানের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল। সে অত্যন্ত পরিপক্ব ও গম্ভীর গলায় বলল,—
—"আমার অনুভূতিগুলো কোনোদিনও মিথ্যা ছিল না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা, এখন এসব কিচ্ছু সম্ভব না। সালার একটা ভয়ঙ্কর লোক! ওর মা এবং নানা বাড়ি আন্ডারওয়াল্ড থেকে বিলোং করে।আর, সে হয়তো একদিন ফিরে আসবে এবং তোমার সাথে নিজের সন্তানকে সে কোনোদিনও এক ছাদের নিচে শান্তিতে থাকতে দেবে না! আর তুমি ত জানোই ওর ক্ষমতা আর ওর হিংস্রতা কেমন। আমি স্রেফ নিজের জন্য তোমার বা তোমার ক্যারিয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হোক—তা আমি কোনোদিনই চাই না।"
অনন্যার কথায়, ইফান আর কোনো কথা বাড়াল না। অনন্যার দূরদর্শী জবাবের পর তার আর কিছু বলার ছিল না। সে এক বুক নীরব কষ্ট আর ব্যর্থতা নিয়ে বারান্দার গলি বেয়ে নিঃশব্দে চলে গেল। অনন্যা বারান্দার রেলিং ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, এই নীরবতার গভীরতা সে নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারল না। সে আলতো করে নিজের চোখ জোড়া মুছে ঘরের ভেতরের টিমটিমে আলোর নিচে ফিরে এল।
বিছানায় আইনান উপুড় হয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। অনন্যা পরম মমতায় ছেলের কাছে গিয়ে ওকে টেনে ঠিক করে সোজা করে শুইয়ে দিল। নিজেও ওর পাশে শুয়ে পড়ে পলকহীন চোখে আইনানের নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আইনানকে দেখলে দুনিয়ার যেকোনো মানুষ এক পলকেই বলে দিতে পারবে যে এই ছেলের সাথে সালার মুনতাহিরের রক্তের সম্পর্ক আছে। ইজানের সেই চেনা সরু নাক, চোখের ঘন পাপড়ি, কুচকুচে কালো ভ্রুজোড়া—সবকিছু যেন এই ছোট বাচ্চার মাঝে নিখুঁতভাবে খোদাই করা। আইনানের সেই তীব্র জেদ, ওর ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসি ওর চলন ধরন—সবমিলিয়ে ছেলেটা যেন হুবহু বাবার মতোই হয়েছে। সালারের জলজ্যান্ত প্রতিচ্ছবি! অনন্যা বিষাক্ত এক হাসল। পাঁচ বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের তীব্র স্পর্শ আর দাগগুলো আজ অনন্যার শরীরে দৃশ্যমান না থাকলেও, ওগুলোর জীবন্ত প্রমাণ আইনান।
তখনই হটাৎ ওর ফোনটা তীব্র ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠল। অনন্যা দ্রুত স্ক্রিনের দিকে তাকাল—ইজানের নম্বর। তবে এবার কোনো নরমাল কল নয়, ভিডিও কল দিয়েছে। অনন্যা ফোনটা হাত থেকে দূরে সরাতে গিয়ে নিজের অজান্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ স্ক্রিনের সবুজ বাটনে চাপ দিয়ে বসল। কলটা হুট করে রিসিভ হয়ে গেল, যা অনন্যার নিজের ধারণারও বাইরে ছিল।
ওদিকে ইজান ডিউটি শেষে নিজের ঘরে ফিরে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। তার চওড়া উন্মুক্ত ফর্সা বুক বেয়ে তখনো পানির কণা গড়িয়ে পড়ছে। খালি গায়ে, পরনে স্রেফ একটা কালো ট্রাউজার। সে একহাতে টাওয়াল দিয়ে নিজের চুল মুছতে মুছতে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই একদম থমকে গেল।
অনন্যা কল ধরেছে!
ইজান তার ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, ডার্ক হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল—
—"আরেহ! সত্যিই রিসিভ হলো নাকি আমি এবারও স্বপ্ন দেখছি?"
অনন্যা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে রইল। সে কোনো কথা বলল না।
ইজান টাওয়ালটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে অনন্যার এই নীরবতা দেখে আরও এক ধাপ কাছে এগিয়ে এল। ফোনটা নিজের চোখের সামনে তুলে ধরে অত্যন্ত ডোন্ট-কেয়ার ও চড়া গলায় বলল—
—"কী হলো, চুপ কেন? এভাবে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছিস যে? লজ্জা করে না তোর? বেহায়া মেয়ে!"
অনন্যা কিছু টা নরে চরে বসে, ইজান ভাবে হয়তো কল টা কেটে দিবে তাই, সে বলে উঠে—
—"এই না! কাটবি না। আমাকেই ত দেখবি? আমি তোর হালাল পুরুষ। মন ভরে দেখ। যদিও আমার শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি আগেই তোর দেখা হয়ে গেছে।"
ইজানের এই নোংরা, ডার্ক পজেসিভ খোঁচা শুনে অনন্যা নিজের দাঁতে দাঁত চাপল। ঠিক তখনই, ভিডিও কলের ওপাশ থেকে ইজানের ঘরের লিভিং রুমের দিক থেকে রাহির চেনা কণ্ঠস্বর তীব্রভাবে ডেকে উঠল—
—"ইজান! তুমি কি ভেতরে? কফিটা কি তোমার ঘরে দিয়ে যাব?"
ইজান অনন্যার স্ক্রিন থেকে এক সেকেন্ডের জন্য চোখ সরিয়ে বাইরের দরজার দিকে মুখ উঁচিয়ে কড়া গলায় বলল—
—"আসছি আমি! বাইরে রাখো।"
অনন্যার ঠোঁটের কোণে এবার এক চরম তাচ্ছিল্য আর বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে ইজানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ধারালো গলায় জিজ্ঞেস করল—
— "আপনারা একসাথে থাকেন?"
ইজান ফোনটা আবার নিজের মুখের সামনে এনে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—
—"হুম, বাট সে শী...."
—"বেড শেয়ার করেন না?"
অনন্যার এই আচমকা, ধারালো এবং প্রলয়ঙ্করী প্রশ্ন, ইজান মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল! তার মুখের সেই অহংকারী, ডার্ক হাসিটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল, সে সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে অনন্যার চোখের দিকে তাকায়। তবে, তার এই ভাব কাটতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। অনন্যার এই প্রশ্নের জবাবে তার বিষণ্ণ চোখের কোণে আবার সেই পরিচিত, ডার্ক ও শয়তানি হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ফোনটা নিজের মুখের আরও কাছে এনে, তার সেই গভীর ও গম্ভীর কণ্ঠে এক অদ্ভুত মাদকতা মিশিয়ে বলল—
—"হুম... করেছি তো। এই জীবনে মাত্র একবারই একটা দেহের সাথে বেড শেয়ার করেছি! যার প্রতিটা তীব্র মুহূর্ত, আওয়াজ, নিশ্বাসের প্রতিধ্বনি আমি আজও নিখুঁতভাবে অনুভব করি, আজও যার জন্য আমি মাঝরাতে এমন ছটফট করি।"
ইজানের এই নগ্ন এবং গভীর ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটার অর্থ বুঝতে অনন্যার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। সে খুব ভালো করেই বুঝল, ইজান এখানে রাহির কথা বলছে না, বরং পাঁচ বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতে অনন্যার শরীরের ওপর করা তার সেই আদিম অধিকারের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
অনন্যা আর কোনো কথা বলল না, নিজের ভেতরের তোলপাড় করা ক্ষোভ আর অপমানকে আর বাড়তে না দিয়ে সে লাল বাটনটা চেপে ভিডিও কলটা কেটে দিল। সে ফোনটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার আইনানের দিকে তাকাল। ইজানের শেষ কথাগুলো তার কানে বিষাক্ত তীরের মতো অনবরত বিঁধতে লাগল।
যে মানুষটা এক ছাদের নিচে অন্য একটা মেয়েকে রেখে, নিজেকে তার হালাল পুরুষ দাবি করে এমন অবাধ্য অধিকার খাটায়—তার এই নোংরা খেলার শেষ কোথায়?
তা ভেবে অনন্যা ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~🥀
পরদিন সকালে
কড়া রোদে অনন্যা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির করিডোরে এসে দাঁড়াল, তখন তার চোখ-মুখ জুড়ে রাতের ক্লান্তি স্পষ্ট ইজানের সেই অবাধ্য স্বীকারোক্তি তাকে আর শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। সে আর কোনো জুয়া খেলতে রাজি নয়, এবার একটা চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা তাকে নিতেই হবে।
নোটিশ লাইব্রেরির বোর্ডের সামনে রাফিকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনন্যা ধীর পায়ে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে অনন্যা অত্যন্ত নিচু অথচ দৃঢ় গলায় বলল—
— "রাফি... তোর মামা যে লয়ার, উনার সাথে আমার একটু কথা বলিয়ে দিবি?"
রাফি নোটিশ বোর্ড থেকে চোখ সরিয়ে অনন্যার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হওয়ার ভান করে বলল—
—"আচ্ছা বলব। কিন্তু হুট করে লয়ারের কী প্রয়োজন পড়ল, অনু?"
অনন্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাথুরে গলায় বলল —
—"ডিভোর্সের জন্য।"
রাফি এবার পুরোপুরি অনন্যার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
—"মানে? আইনানের বাবা... সে কি তবে দেশে ফিরেছে?"
অনন্যা নিজের চোখ জোড়া মাটির দিকে নামিয়ে ন্যস্ত গলায় বলল—
—"হ্যাঁ, সে ফিরেছে।"
অনন্যা খেয়ালই করল না যে এই সত্যটা শোনার পর রাফির ঠোঁটের কোণে এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম, রহস্যময় মুচকি হাসি খেলে গেছে।
এই গল্পের প্রতিটা পর্বই কিন্তু বেশ বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করি। প্লিজ রেসপন্স করবেন।
আপনারা অনেকে জানতে চাইছেন সালার কবে আইনানের কথা জানবে? শীগ্রই! তবে, আগে গল্পটা অতীতে যাবে, ওদের বিয়ে এবং আরও কিছু মিলিয়ে ৩/৪ পর্ব আসবে...এর বেশি না বলি,অপেক্ষা করুন।
আপনারা ভাবছেন আইনান ই মেইন টুইস্ট?? বাই দ্য ওয়ে অনন্যা কে বাইকার হিসেবে কেমন লাগল?
চলবে।