#হৃদয়াবেগ
#পর্বঃ০৮
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)
একটু একটু করে রাত বাড়তে শুরু করেছে। খাওয়া দাওয়া মাত্রই শেষ করলো তাহমিদ আর নাযীফাহ। ফাহিম আর আমেনা বেগমের জন্য পার্সেল নিয়ে বের হয় রেস্টুরেন্ট থেকে। বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রিক্সায় গিয়ে বসতেই নাযীফাহকে বাঁধা দেয় তাহমিদ। ভ্রু কুঞ্চিত হয় নাযীফাহ'র। তাহমিদ নিজে আগে রিক্সায় উঠে বসলো।
'রিক্সায় মেয়েরা ডানপাশে বসে না। মেয়েদের বামপাশে বসতে হয়। এটা সেইফ জোন।'
নাযীফাহ ঘুরে গিয়ে বামপাশে বসে।নাযীফাহ বসতেই তাহমিদ তার একহাত দিয়ে নাযীফাহকে কটিবন্ধ করে। রিকসাওয়ালা রিক্সার প্যাডেল ঘুরাতেই লোডশেডিং হয়। ক্ষীন আলো আচ্ছাদিত হয়ে যায় প্রগাঢ় তমসাচ্ছন্নে। এই প্রগাঢ় আঁধারে ভয়ে তাহমিদের কটিবন্ধ হাত খামচে ধরে নাযীফাহ। নাযীফাহকে আশ্বস্ত করে তাহমিদ বলে উঠে,
'ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি আছি তো পাশে। এখনই সব দোকানে জেনারেটর চালু করবে।'
কয়েক মিনিটের মাথায় আবারও প্রদীপ্ত হয় চারপাশ। খামচে ধরা হাতের বাঁধন হালকা করে নাযীফাহ। বাসার কাছাকাছি আসতে শীতল হাওয়া বইতে লাগলো। আর উপক্রমণিকা হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির।যে ক্ষুদ্রাকার বারিবিন্দু কায়া স্পর্শক হওয়া মাত্রই অখিল কায়া প্রশান্তিতে ছেয়ে যায়।
'আপনি রিক্সাটা একটু থামান না?' নাযীফাহ'র কথায় রিক্সা থেমে যায়। তাহমিদ নাযীফাহ'র উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে রুঢ় দৃষ্টিপাত করে। নাযীফাহ দেখেও না দেখার ভান করলো। তাহমিদের রুঢ় দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে তাহমিদের হাত সরিয়ে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে।
'বকুনি দিবেন না তাহমিদ ভাই। আজ বহুদিন পরে অভ্রভেদ করা বারিবিন্দু ছুঁয়ে দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। মনে হচ্ছে কত বছর পরে বৃষ্টির ফোঁটা আমাকে আলিঙ্গন করছে।' বলেই এই নিস্তব্ধ, নিঝুম রাতে দু-হাত মেলে বারিবিন্দু নিজের গাত্রে ছোঁয়াতে লাগলো সে।
নাযীফাহ'র এমন উৎফুল্লিত, আনন্দিত, প্রানোচ্ছল মুখশ্রী দেখে কিছু বলার আর সাহস হলো না তাহমিদের। ভাড়া মিটিয়ে নাযীফাহ'র গা ঘেঁষে দাঁড়ালো সে। নাযীফাহ'র কটিদেশ একহাতে স্পর্শ করতে গিয়েও গুটিয়ে নিলো তার হাত। তার মন বলছে, অপেক্ষা কর। অপেক্ষাতেই একপ্রকার শান্তি আছে। সে সামলে নিলো নিজেকে। নাযীফাহ চোখ বন্ধ করে বারিবিন্দু অনুভব করছে।
'মাঝরাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। সামনেই বাসা হাঁটতে হাঁটতে বৃষ্টির ফোঁটাকে অনুভব কর।'
চোখ মেলে তাহমিদের দিকে নেত্রপাত করে নাযীফাহ। সামনের দিকে পা ফেলে সে।তাহমিদ ও দু'কদম দিয়ে নাযীফাহ'র সমান সমান হয়ে হাত আঁকড়ে ধরে। কপালে ভাঁজ পড়ে নাযীফাহ'র
'এখানে হাত ধরেছেন কেন তাহমিদ ভাই? এখন তো হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই।'
উত্তর দিলো না সে। সামনের দিকে তাকিয়ে সোজা হাঁটতে লাগলো।
একজনের মনে এক আকাশ সমান অনুভূতি থাকলেও আরেকজন অনুভূতির 'অ' ও টের পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে না তার করা এক তাগড়া যুবকের বুকের ভেতরের তোলপাড়। কোনো একদিন আসবে যখন হাতে হাত রেখে হাঁটার প্রতিটা কদমে থাকবে অনুভূতির ছড়াছড়ি। হাঁটা থামিয়ে নাযীফাহ খুব শান্ত, সুস্থির, কাতর গলায় বলল,
'তাহমিদ ভাই, ফুপি কে একটা ফোন দিবেন?'
'হঠাৎ মাকে ফোন দিতে বলছিস?'
'খুব ইচ্ছে করছে কথা বলার জন্য।'
'মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে নাকি মামির সাথে।'
নাযীফাহ কপট রাগ দেখিয়ে বলে, 'আপনি কল দেওয়ার হলে দিন। এতো কথা বলবেন না।'
তাহমিদ স্মিত হেসে ফোন লাগায় মায়ের নাম্বারে। দু'বার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ করে ওয়াহিদা।
'তোমার সাথে কথা বলতে চায় নাযীফাহ।'
ঘুমিয়ে পড়েছিল ওয়াহিদা। নাযীফাহ কথা বলতে চায় শুনে তন্দ্রাভাব কেটে গেলো তার। উৎফুল্ল হয়ে বলে,
'দাঁড়া, দাঁড়া আমি তোর মামুর বাড়ি আছি। তোর মামিকে ডেকে নিয়ে আসি। ফাহমিদা সেই কবে থেকে মেয়ের গলার স্বর শুনার জন্য আকুল হয়ে আছে।'
তাহমিদ মোবাইল এগিয়ে দিলো নাযীফাহ'র দিকে। নাযীফাহ কানে ধরেই বলে,
'কেমন আছো ফুপি?'
'এতোদিন পরে ফুপির কথা মনে পড়লো? ঢাকা গিয়ে তো আমাদের ভুলেই গেছিস?'
মলিন হাসলো নাযীফাহ।
'বললে না তো কেমন আছো?'
'আমরা ভালো আছি। তোর মা বাবাও ভালো আছে।'
'তুমি রাতে খাবার খেয়ে ঔষধ খেয়েছো।'
মুখ টিপে হাসে ওয়াহিদা।
'রাতে খাওয়ার পর আমার কোনো ঔষধ নেই। তবে তোর বাপ প্রেশারের ঔষধ আর তোর মা খাওয়ার আগে ইনসুলিন নিয়েছে।'
ওয়াহিদার কাছে বসে থাকা নাযীফাহ'র মা এতোদিন পরে মেয়ের গলা শুনতে পেয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছেন।
'তোমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না?'
'আমারও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তোর বাবা মায়েরও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।'
'তুমি বার বার তাদের কথা বলছো কেন? আমি তাদের কথা জিজ্ঞেস করেছি?'
'না মানে.......
কাঠকাঠ গলায় বললো,
'তাদের কথা আর বলবে না।'
ওয়াহিদা বাধ্য গলায় বলল,
'আচ্ছা।'
'বিচ্ছু বাহিনীর দল আমার খোঁজে আসে?'
ওয়াহিদার বক্ষস্থল থেকে নির্গত হয় দীর্ঘশ্বাস। বড্ড ভারী এই দীর্ঘশ্বাস। কন্ঠে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলে বলে,
'রোজ জিজ্ঞেস করে তোর কথা। তুই কবে আসবি। পুকুর পাড়ের মাঠে এখন আর খেলা জমে না। কারন দলনেত্রী নেই।'
নাযীফাহ'র চক্ষুযুগলে ভির করে অভিমানী অশ্রু। মনে হয় সে কত বছর তার গ্রাম কে দেখে না।গ্রামের বৃষ্টি ভেজা মাটির ঘ্রাণ নেয় না। তারপর দুজনেই চুপ করে কানে মোবাইল ধরে রেখেছে। নিরবতা ঘুচলো ওয়াহিদার কথায়,
'এখন কি ঢাকা বৃষ্টি হচ্ছে?
'হুম, কেন বলো তো?'
'তোরা কি বৃষ্টিতে ভিজছিস?'
'হুম। একটু হাঁটতে বের হয়েছি তাহমিদ ভাইয়ের সাথে। কিন্তু কেন?'
'না কিছু না। এমনি জিজ্ঞেস করলাম।'
অশ্রুসিক্ত নয়ন কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো ফাহমিদা বেগমের। নিশ্চয়ই বৃষ্টি দেখে মায়ের কথা মনে পড়ছিলো। তাই সুকৌশলে মায়ের সব খবরাখবর নিয়ে নিলো মেয়েটা।
কথা শেষ করে আবারও দু'জন হাঁটছে। তাহমিদ মনে মনে হাসছে সে। পুচকি চালাক আছে। কেমন করে কৌশলে মা বাবার খবর জেনে নিলো। মা বাবার খবর জানতে না চাইলে প্রথম কথাতেই বলে দিলে পারতো। কিন্তু না সে রাগ দেখালো সব জানার পরে।
____________________________________________
বাসায় এসে পোশাক বদলেছে দুইজন।তারপর বাহির থেকে আনা খাবার দুই প্লেটে নিয়ে ফাহিম আর আমেনা বেগমকে খাবার দিলো নাযীফাহ। ফাহিম এখনো পড়ছে। তাহমিদ কপালে হাত ঠেকিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ফাহিমের সামনে প্লেট রেখে নাযীফাহ বলল,
'তাহমিদ ভাই?'
নাযীফাহ'র ডাকে কপাল থেকে হাত নামালো সে। তারপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই নাযীফাহ পুনশ্চ বলল,
'একটু চিকেন চাপ নিতুকে দিয়ে আসি? ও আমাকে ছাড়া কিছু খায় না।'
'এখন রাত হয়ে গেছে। এতোরাতে কারো বাসার কলিং বেল বাজানো দৃষ্টিকটু। কাল বরং আবার আমি কিনে আনলে নিতুকে নিয়ে দিস।'
মাথা নেড়ে সায় জানায় নাযীফাহ। পুনরায় ফাহিমের কাছে গিয়ে বলে,
'শুন ফাহিম্মা, যতটুকু দিয়েছি সবটা শেষ করবি। প্লেটে যদি একটুও থাকে তোর খবর আছে। রেস্টুরেন্টে একঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে এই পার্সেল এনেছি।'
ফাহিম বাঁকা হেসে বলে,
'তাইলে চিন্তা কর তুই কি পরিমাণ মুটি। তোরে রেস্টুরেন্টের কর্তৃপক্ষও চেয়ারে বসতে দিলো না। যদি চেয়ার ভেঙে যায় সেই ভয়ে।'
নাযীফাহ দাঁত কটমট করে বলে,
'তুই মুটি, তোর বউ মুটু, তোর চৌদ্দ গোষ্ঠী মুটি।'
ফাহিম মাছি তাড়ানোর ভান করে বলল,
'একে তো শুকনা পাটকাঠি।দ্বিতীয়ত আমার বউ নেই যে মুটি হবে। তবে আমার ভাইয়ের বউ খুব মুটি।'
নাযীফাহ কথায় না পেরে হনহন করে চলে গেলো। নাযীফাহ'র এমন অবান্তর কথা শুনে নৈঃশব্দ্যে হাসলো তাহমিদ।
____________________________________________
গভীর, নিগূঢ়, ঘুটঘুটে আঁধার।এলোমেলো শুয়ে আছে নাযীফাহ। ছোট ছোট অবাধ্য চুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মুখে।আমেনা বেগম একপাশে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছেন। তাহমিদ সতর্কতা অবলম্বন করে শব্দহীন পায়ে হেঁটে রুমে আসলো। নাযীফাহ যেই পাশে শুয়েছে সেই পাশে গিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো। নিমিষহারা তাকিয়ে রইলো তিন 'কবুল' বলে গ্রহন করা স্ত্রীর দিকে। এ যেন এক অন্যরকম মানসিক তৃপ্তি। ঘুমন্ত প্রেয়সী যেন চক্ষু শীতলকারী। এই পবিত্র চেহারার অধিকারী রমনীর দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে বছরের পর বছর। এলোমেলো চুল গুলো মুখ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েও হাত গুটিয়ে নিলো সে। পাছে যদি নাযীফাহ জেগে যায়। ছুঁয়ে দেওয়ার অধিকার আছে কিন্তু বিবেক বাধা দেয়।মায়াবী গড়নের কিশোরীটি তার শুধুই তার। এই কিশোরীকে দেওয়া প্রতিটা স্পর্শে থাকবে পবিত্রতা। কিন্তু ছুঁয়ে দিতে মানা। উঠে দাঁড়ায় সে।এখানে থাকা আর সম্ভব না। অবাধ্য মন বার বার ঘুমন্ত কিশোরীকে ছুঁতে চাইছে। তার শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় বারবার ওই কপালে উষ্ণ স্পর্শ দিতে চাইছে। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য হবে।
সামনে দিকে পা বাড়াতেই থমকে যায় তাহমিদ। তাহলে কি ধরা পড়ে গেলো সে?
#চলবে
বানান ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।