ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়াবেগ

১১তম পর্ব

লেখক: রূপন্তি রাহমান

#হৃদয়াবেগ

#পর্বঃ১১

#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)

পড়ন্ত, নিম্নগামী অপরাহ্ন। সূর্য নুয়ে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। দিবসের উচ্চ তাপ ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে। ফুটপাত ধরে ধরে হাঁটছে তাহমিদ আর নাযীফাহ। নাযীফাহ'র এক হাত তাহমিদের হাতের বন্ধনে আবদ্ধ। অপ্রত্যাশিতভাবে থমকে দাঁড়ায় তাহমিদ। পা চলা থেমে যায় নাযীফাহ'রও। কপাল কুঁচকে দৃষ্টিপাত করল তাহমিদের দিকে। তাহমিদ প্রশস্ত হেসে পকেট থেকে টিস্যু বের করে নাযীফাহ'র ললাটে অবক্ষিপ্ত হওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘামের বিন্দু মুছে দিলো পরম ত্তয়াস্তায়, কায়মনোবাক্যে। অধর কোণ প্রসারিত হলো নাযীফাহ'র ও।আজকাল তাহমিদ এমন ছোট বড় সমুদয় বিষয়ে যত্ন, ত্তয়াস্তা, উদ্বিগ্নতায় অন্যরকম সুখানুভূতি হয় নাযীফাহ'র। যা আর কখনো সে অনুভব করেনি সে। তাহমিদ অকস্মাৎ স্পর্শে ধঁক করে উঠে তার অন্তঃস্থল। পুলকিত, বিমুগ্ধ, মোহিত হয় তার হৃদয়। অহর্নিশ তাহমিদের আশেপাশে থাকার আকুলতা, অভিলাষ, স্পৃহা নাযীফাহ'র বক্ষগহ্বরের জাগ্রত হয়। তাই তো তাহমিদ যখন হাঁটতে বের হওয়ার কথা বলে সে তখন বিনাবাক্যে রাজি হয়ে যায় হাজার অসুস্থতা থাকা সত্বেও। তার সুখানুভব হয় তাহমিদের হাতে হাত রেখে হাঁটতে।

'হাওয়াই মিঠাই খাবো ভাইয়া।'

আশেপাশে নজর বুলালো তাহমিদ হাওয়াই মিঠাই খোঁজার উদ্দেশ্যে। এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তার অপর পাশে দেখতে পেল একটা বারো তেরো বছর বয়সী ছেলে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছে। রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য উদ্যত হতেই তাহমিদের কর্ণে এসে। ধাক্কা লাগলো কোনো মেয়েলি কন্ঠস্বর

'কেমন আছেন স্যার?'

কন্ঠস্বর চিনতে ভুল হলো তাহমিদের।নাযীফাহ'র হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। হাত মুষ্টি বদ্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস চালাচ্ছে সে। ভালো মন্দ কোনো উত্তর না পেয়ে সাবিহা পুনশ্চ বলল,

'স্যার কি আমার উপর রেগে আছেন? আসলে স্যার আমি ওইদিন ওভাবে মিন করিনি ট্রাস্ট মি।'

যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে তাহমিদ জবাব দিলো,

'তোমার আর আমার সম্পর্কটা শিক্ষক আর ছাত্রীর। তোমার উপর রেগে থাকার মানেই হয় না।'

হাওয়াই মিঠাই ওয়ালা ছেলেটাকে চলে যেতে দেখেই আকস্মিকভাবে নাযীফাহ তাহমিদের হাত খামঁচে ধরে বলল,

'ভাইয়া হাওয়াই মিঠাই চলে যাচ্ছে। ও ভাইয়া চলে যাচ্ছে তো।তাড়াতাড়ি চলুন না।'

সাবিহা না চিনার ভান ধরে বলল,

'আপনার বোন হয় বুঝি, স্যার? কিউট কিন্তু খুব। চোখেমুখে মায়া উপচে পড়ছে।যে কেউ দেখলে মোহাচ্ছন্ন হয়ে যাবে।'

'আপনার বোন হয় বুঝি, স্যার?' এতটুকুই ছিলো আগুনে ঘি ঢালার মতো। তাহমিদের চোখেমুখে কাঠিন্য, কঠোরতা দেখে দিলো। রাগে হাত চেপে ধরলো নাযীফাহ'র। নাযীফাহ যন্ত্রনায় মৃদু আর্তনাদ করে বলল,

'ভাইয়া আমার লাগছে।'

নাযীফাহ'র কথা কর্ণপাত না করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো থেমে রিক্সার গুলো কাছে। তাহমিদের অকস্মাৎ রেগে যাওয়ায় মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেলো নাযীফাহ'র। তিন মাস কোচিং করা অবস্থায় স্যারকে কখনো রাগতে দেখেনি সে। আজ হঠাৎ হলো যে স্যার রেগে গেলো? সে তো স্যারের বোনের প্রশংসাই করেছে খারাপ কিছু তো বলেনি। পিছু ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো সে। অতর্কিত যদি তাকেও কিছু বলে বসে। তাহলে সহ্য করতে পারবে না সে। তবে স্যারের হঠাৎ রেগে যাওয়াটা সাবিহার কাছে রহস্যই থেকে গেলো।

____________________________________________

রিক্সাগুলো কাছে এসে হাত ছেড়ে দিলো তাহমিদ। নাযীফাহ হাতটা ধরে বলল,

'এভাবে কেউ ধরে? দেখুন হাতটা লাল হয়ে গেছে।'

মন খারাপ করে অভিমানী স্বরে পুনশ্চ বলল,

'আর হাওয়াই মিঠাইও চলে গেলো।'

পরপর কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত, স্থির, নিরূপদ্রব করার প্রয়াস চালাচ্ছে তাহমিদ।

'খেতে হবে না এসব ছাইপাঁশ। বাসায় যাবি এখন।'

'মাত্রই তো এলাম।'

'কথা কানে যায় না? বাসায় যাবি মানে বাসায় যাবি।'

কোনো প্রকার কথা না বলে বাধ্য মেয়ের মতো রিক্সায় চড়ে বসলো সে। তাহমিদও বসলো পাশে।

বাসার নিচে আসতেই কাঠকাঠ গলায় তাহমিদ বলে উঠলো,

'এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা বাসায় যাবি।'

নাযীফাহ শুকনো ঢুক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

'আপনি যাবেন না বাসায়?'

তাহমিদের রসকষহীন কাঠখোট্টা, নিরাবেগ জবাব,

'না, তবে সন্ধ্যার পর তুই কোথাও যাবি না। তোর সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।'

কপালে সূক্ষ্ম রেখার ভাঁজ পড়ে নাযীফাহ'র। কি এমন করলো সে যে তার সাথে বোঝাপড়া আছে? এসব ভাবতে ভাবতে চলল বাসার দিকে।

বাসায় এসে ফাহিমের সাথে খুনসুটিতে মত্ত হলো নাযীফাহ। তাহমিদের বলা শেষোক্ত কথা গুলো তার মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে গেলো।

নিজেকে শান্ত, অক্রোধ, অনুত্তেজিত করার অভিসন্ধিতে নিরিবিলি, নির্জন জায়গায় এসে বসে আছে তাহমিদ। সামান্য একটা কথার জন্য সে এতো কেন রাগান্বিত, রুষ্ট, ক্রোধিত হচ্ছে তার জানা নেই। নাকি তার ক্রোধের কারন সাবিহা তার স্ত্রীকে বোন বলেছে বলে? অবশ্য বলারই কথা, মাঝরাস্তায় রাস্তায় ভাই ডাকলে যে কেউই বোন মনে করবে। মনের সাথে যুদ্ধ করে উঠে দাঁড়ালো সে। আজ কয়েকটা কথা মেয়েটাকে বলতেই হবে। বরকে ভাই ডাকার স্বাদ জন্মের মতো ঘুচিয়ে দেবে সে।

____________________________________________

চোখ মুখে কঠিনতা বজায় রেখে কলিং বেল চাপলো তাহমিদ। গুটিগুটি পায়ে এসে দরজা খুললো আমেনা বেগম। তাহমিদ বাসায় প্রবেশ করেই হাতে থাকা হাওয়াই মিঠাই গুলো ছুড়ে মা'রল। রাগত, ক্রোধান্বিত, রুষ্ট স্বরে চেঁচিয়ে ডাকলো নাযীফাহ কে। তাহমিদ এর এমন ক্রুদ্ধ স্বরে চমকিত হয় নাযীফাহ। তার মনে পড়ে যায় তখনকার কথা। ভয়ার্ত চোখে মুখে রুম থেকে বেরিয়ে আসে সে। বেরিয়ে আসে ফাহিমও। নিচে পড়ে থাকা হাওয়াই মিঠাই গুলো দেখে মুখে হাসি ফুটলেও তাহমিদের রক্তিম বর্ণের চোখ দেখে চুপসে গেলো সে। তাহমিদ শার্টের দু'টো বোতাম খুলে ঢিলে করল শার্ট। হাত দিয়ে কপাল স্লাইড করলো,

'আমি তোর ভাই লাগি?'

নিরুত্তর নাযীফাহ। তাহমিদ হালকা চেঁচিয়ে বলল,

'কথা বলছিস না কেন? আমি তোর ভাই লাগি?'

তাহমিদের চিৎকারে কেঁপে উঠলো নাযীফাহ'র শরীর। আজ পর্যন্ত তাকে কেউ এভাবে ধমক দেয়নি।নাযীফাহ বিস্মিত, আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকিয়ে আছে তাহমিদের দিকে।

'তোকে নিজের স্ত্রী বলে গ্রহণ করেছি মাঝরাস্তায় সবার সামনে আমাকে ভাই ডাকার জন্য? আর মানুষ তোকে আমার বোন বলে জানার জন্য? তুই এখনো বাচ্চা না যে এসব বুঝবি না। তুই গ্রামে বড় হয়েছিস। তোর সমবয়সী অনেকে বিয়ে করে সংসার করছে।আর তুই এখনো দশ বছরে আঁটকে আছিস। এভাবে দিন পাড় করা যায় না,,,,, '

নিজের মতো করে কথা বলে যাচ্ছে তাহমিদ। ফাহিম তাহমিদের অগোচরে সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে নাযীফাহ কে ফিসফিস করে বলে,

'আমি আগেই বলেছি, তাহমিদ ভাই তাহমিদ ভাই করে মাথা না খেয়ে ওগো, হেগো, জানু, কলিজা এসব বলে ডাক শুনলি না তো আমার কথা। গরীবের কথা বাসি হলেও ফলে। এখন আমার ভাইয়ের চোখে রাগ, ক্রোধ আর রোষানল না দেখে ভালোবাসা দেখ তাহলে মন খারাপ হবে না।'

বলেই নাযীফাহ'র দিকে তাকাতেই দেখলো,নাযীফাহ'র চক্ষুদ্বয় নয়নবারিতে টইটম্বুর। নিমেষ ফেললে হবে ভারী বর্ষণ। আর কিছু বলার সাহস করলো না ফাহিম।

যে যার রুমে কিন্তু ড্রয়িং রুমের কোণে অবহেলায়, অবজ্ঞায় পড়ে আছে সেই হাওয়াই মিঠাই গুলো। যা একটু একটু করে চুপসে যাচ্ছে।

____________________________________________

হাই স্পিডে পাখা ছেড়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে নাযীফাহ। যেন সবাই বুঝতে পারে সে ঘুমিয়ে আছে। রাতে খাওয়ার সময় তাহমিদ দেখলো ফাহিম আর আমেনা বেগম থাকলে নাযীফাহ নেই

তাহমিদ বসতেই আমেনা বেগম আর ফাহিম খাওয়া শুরু করলো। তাহমিদের বিপরীতের জায়গাটা খালি দেখে গলা দিয়ে ভাত নামলো না তাহমিদের। ভাত গুলো নড়াচড়া করে পানি ঢেলে উঠে গেলো সে। ফাহিম কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও দীর্ঘশ্বাস ফেলল আমেনা বেগম।

নিগূঢ়, ঘুটঘুটে যামিনী। এলোমেলো হয়ে গভীর তন্দ্রায় নিমগ্ন নাযীফাহ। ধীর, সুস্থির পায়ে হেঁটে নাযীফাহ'র কাছ এসে বসলো তাহমিদ। তন্দ্রাচ্ছন্ন নাযীফাহ'র ফোলা ফোলা আঁখিদ্বয় দেখে অনুশোচনা হতে লাগলো তাহমিদের। খুব সতর্ক ভাবে নাযীফাহ'র মাথায় হাত রাখলো তাহমিদ। জেগে গেলে যাবে। ও কিছু একটা বলে বুঝিয়ে দিবে। নাযীফাহ'র একটা হাত নিজের হাতের মুঠোতে নিলো সে। হাতটা আঁকড়ে ধরে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলো ঘুমন্ত, নিদ্রামগ্ন নাযীফাহ'র দিকে।

নাতির উপস্থিতি টের পেয়েও সাড়াশব্দ করলো না আমেনা বেগম। তবে নাতির করুণ অবস্থা দেখে হাসি পেল তার খুব।

____________________________________________

সকালে নাস্তার টেবিলেও নাযীফাহ কে না দেখে তাহমিদের অন্তঃস্থল থেকে নির্গত হয় তপ্ত শ্বাস। নাস্তা করার ইচ্ছে না থাকলেও বসে সে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো চুপসে যাওয়া হাওয়াই মিঠাই গুলো সোফার উপরে। খারাপ লাগলো তার। হাতের ভাঁজে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে তাহমিদ। আমেনা বেগমের কাঠখোট্টা কথা,

'মেয়েটাকে এভাবে ধমকে ধামকে না বললেও পারতে দাদুভাই। সে জন্মের পর থেকেই তোমাকে ভাই বলে ডেকে এসেছে। তুমি যে তার বর হবে সেটাতো সে জানতো না। বা বিয়ের পরও তাকে তুমি নিষেধ করোনি ভাই ডাকার জন্য। মেয়েটা রাতেও কিছু খায়নি। এখনো এতো টানাটানি করে এলাম আসলো না।তুমি মাঝে মাঝে এমন বোকার মতো কাজ করো কি বলবো।'

কোনো জবাব দিলো না তাহমিদ। সাবিহা তার স্ত্রীকে বোন বলেছে বলেই তার এতো রাগ। এটা তো এখানে বলতে পারবে না। বিবাহিত জানলে হয়তো আর তাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনতো না।

____________________________________________

পরিশ্রান্ত অপরাহ্নে জানালার দিকে মুখ করে বসে আছে নাযীফাহ। মন মস্তিষ্ক তার বিক্ষিপ্ত। তাহমিদের রণমুর্তি যেন সে এখনো তার চোখ থেকে সরাতে পারছে না। তাহমিদের দিক থেকে তাহমিূ যেমন ঠিক তারও খুব খারাপ লাগছে। এভাবে না বললেও তো হতো।

ফাহিম বাসায় নেই। আমেনা বেগম ছাদে গিয়েছে বাইরে থেকে দরজা আটকে। নাযীফাহ'র কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না বলে জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখছে।

শব্দ করে দরজা আটকানোর আওয়াজে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে নাযীফাহ'র। বাসায় তো কেউ যে রুমের দরজা আটকাবে। তাহলে কি,,,

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন