ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়াবেগ

১৭তম পর্ব

লেখক: রূপন্তি রাহমান

#হৃদয়াবেগ

#পর্বঃ১৭

#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)

আচমকা তাহমিদ নাযীফাহ কে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। তাহমিদের বলিষ্ঠ হাতের বাহুডোরে আবদ্ধ নাযীফাহ। তাহমিদের আকস্মিক কান্ডে চমকিত, হতবিহ্বল সে। তাহমিদের সমস্ত গতিবিধি, কার্মকান্ড সবই যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার। নাযীফাহ'র মন মস্তিষ্ক কোনো কিছুই যেন অর্থোদ্ধার করতে পারছে না। তাহমিদের ফুঁপানোর ফলে সমস্ত কায়া কম্পিত হচ্ছে।

নিতুর মা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো। কোনোকিছুই বোধগম্য হচ্ছে না উনার।ইন্দ্রিয় যেন বুঝেও বুঝতে পারছে না কিছু। হাতের ক্যামেরাটা একপাশে রেখে দ্রুত কদম ফেলে অগ্রসর হলো তাহমিদের অভিমুখে। তাহমিদের কাঁধে হাত রাখলেন উনি। নিসাড়া তাহমিদ। নিতুর মায়ের স্পর্শ যেন ষষ্ঠইন্দ্রিয় ধারণ করতে অক্ষম। একটু ধাক্কা দিতেই চেতনা ফিরে পেলো সে। নিতুর মা বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

'কি হয়েছে তাহমিদ? এভাবে বাচ্চাদের মতো কাঁদছো কেন? কিছুক্ষণ আগেও তো ভালো ছিলে। হঠাৎ কি হলো?'

অকস্মাৎ তাহমিদ নাযীফাহ'র সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো পড়লো। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে নিতুর মা। তাহমিদ নাযীফাহ'র হাত দু'টো নিজের আজঁলায় নিয়ে ললাট ঠেকালো। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,

' আজ আর একটু হলে সবকিছুর পরিসমাপ্তি এখানেই ঘটতো। সকল মনের টান, অপ্রকাশিত অনুভূতি, আবেগ, অনুরক্তির ইতি এখানেই টানতে হতো আমার । ভাবি, এই মেয়েটা কেন বুঝে না ওর কিছু হলে আমার পুরো পৃথিবীটাই উলোটপালোট হয়ে যায়। অন্তঃস্থলে বয়ে যায় ভয়ঙ্কর প্রলয়। কেন একটু সবদিক নজর রাখে না? একটু আধটু নিজের খেয়াল রাখলে কি অনর্থ হয়ে যাবে? হারিয়ে ফেলবো মনে করে নিজের কাছে এনেছি এখানে এসেও এমন হলো। সেসময় নিজেকে বড্ড ব্যর্থ মনে হচ্ছিল।'

সকালের সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো নাযীফাহ'র। গলা শুকিয়ে গেলো তার। আজ হয়তো তার জীবনের শেষ দিন হতে পারতো। নিঃশ্বাস নেওয়ার অবসান ঘটলেও ঘটতে পারতো। নাযীফাহ'র কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল এটাই হয়তো তার তাহমিদের সাথে কাটানো শেষ মুহূর্ত।

'সকালে কি হয়েছে একটু খোলাখুলি বলবে?' নিতুর মায়ের আতংকিত, চিন্তিত কন্ঠস্বর।

ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে নিশ্চুপ বসে রইলো তাহমিদ। তাহমিদের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে নিতুর মা নাযীফাহ'র দিকে তাকালো। নাযীফাহ সকালে ঘটনা থেমে থেমে বলতেই আঁতকে উঠলেন তিনি। ভয়ার্ত গলায় বললেন,

'আজ অনেক বড় ফাঁড়া গেছে তোমার উপর দিয়ে। আজ অনেক কিছুই হতো পারতো। হয়তো হায়াত ছিলো বলেই রক্ষা পেয়েছো। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও তাহমিদ হয়তো ট্রমা থেকে বের হতে পারছে না।'

চুপ হয়ে গেলো নিতুর মা। চোখের ইশারায় বললো তাহমিদ বসা থেকে উঠানোর জন্য। ইশারা বুঝতে পেরে তাহমিদ কে টেনে দাঁড় করালো। নত মস্তকে, বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাহমিদ। নিতুর মা পুনশ্চ নাযীফাহ কে ইশারা করলো তাহমিদ কে জড়িয়ে ধরার জন্য। এবার আর লজ্জা গ্রাস করতে পারলো না নাযীফাহ কে। কারণ তাহমিদ এমন নিস্তব্ধতা, বিমূঢ়তা দেখে তার বক্ষঃপিঞ্জরে আকস্মিক ঝড়ে উলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। সম্মুখে দন্ডায়মান যুবকের এমন বিষাদভারাতুর, নির্জীবতা মানায় না। অপ্রত্যাশিতভাবে তাহমিদের বক্ষের ঠিক বা পাশে আলতো করে মাথা রাখলো নাযীফাহ। তাহমিদ দু'হাতে আগলে নিলো নাযীফাহ কে। মৃদুস্বরে হাসলো নাযীফাহ। এই লোকটাকে চক্ষের সামনে দেখলে শান্তি অনুভব হয়। আর যখন বিড়াল ছানার মতো বুকে আগলে নেয় তখন এই প্রশস্ত, চওড়া বুকটাকে নিরাপদ স্থান মনে হয়।

'নাযীফাহ হয়তো ভাগ্যবতী নারীদের মধ্যে একজন। তোমাকে হারানোর ভয়ে, শংকায় কোনো এক পুরুষ বাচ্চাদের ন্যায় কাঁদছে। এর থেকে বড় পাওয়া কি হতে পারে। তোমাকে যেমন আগলে রাখে তুমিও আগলে রেখো। ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখা জন্য বয়স না হৃদয়গহ্বরে ভালোবাসা থাকা লাগে। কি না হওয়া দেবদাস? একটুতে এভাবে ভেঙে পড়লে চলে? বিপদ আপদ যে কোনো সময় আসতে পারে। পুরুষ কে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হয়।'

তাহমিদ প্রাণহীন, নিস্তেজ হাসলো। অক্লিষ্ট গলায় বলল,

'ভাবি, পুরুষ মানুষ নিজের আসন্ন বিপদে ডরায় না। যতটা কাছের মানুষের বিপদ, ঝুঁকির কথা চিন্তা করে ডরায়।'

'আমি জানি তাহমিদ, পুরুষ মানুষ পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করতে পারলেও এরা নারীর কাছে এসে দূর্বল হয়ে যায়।হউক সে মা, বোন, মেয়ে কিংবা বউ। নিতুর জন্মের সময় আমার কিছু কমপ্লিকেশন ছিলো। সেই ভয় থেকে লোকটা আজ পর্যন্ত আমাকে দ্বিতীয় বার মা হওয়ার জন্য কিছু বলে না। আমার শ্বাশুড়ি মা-রা যাওয়ার পর থেকে লোকটা সম্পূর্ণ আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। আমি বাচ্চার কথা বললে লোকটা মাঝে মাঝে কি বলো জানো? ' তুমি আছো, নিতু আছে আমার আর কিছু চাই না। মা মা-রা যাওয়ার পরে তুমি আমাকে সামলে নিয়েছো। তোমাকে হারালে আমি থাকতে পারবো না। আমার এক সন্তানই যথেষ্ট। আর লাগবে না।' আলহামদুলিল্লাহ তাহমিদ নিজেকে মাঝে মাঝে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়। তবে আজ আমি অন্য এক তাহমিদ কে দেখলাম। যার আগের রূপ আর আজকের রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকাশ পাতাল তফাৎ।'

আর দাঁড়ালো এখানে। দ্রুত প্রস্থান করলো কক্ষ থেকে। এরা একটু সময় কাটাক। নাযীফাহ তাহমিদের দিকে তাকিয়ে মৃদু শব্দে বলল,

'ছাদে যাবেন? সুবিশাল আকাশের মধ্যিখানে মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। চাঁদ দেখবেন?'

তাহমিদ প্রশস্ত হেসে বলে উঠলো,

'আয় তবে। এক চাঁদ কে সাথে নিয়ে আরেকটা চাঁদ দেখবো।'

লাজুক হাসলো নাযীফাহ। নিতুর মাকে দরজা বন্ধ করার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে দু'জন।

____________________________________________

ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে দু'জন। তমসাচ্ছন্ন, কৃষ্ণাভ এই রজনীতে আলো ছড়াচ্ছে চন্দ্রমা। চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজমান। শুধু দু'জনের শ্বাস প্রশ্বাসের মৃদু শব্দ শ্রবণগোচর হচ্ছে।

তাহমিদ নাযীফাহ'র আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে বলে,

'চল ওখানে বসে চাঁদ দেখি। তুই দেখ অন্তরীক্ষের চাঁদ আর আমি দেখি মা বাবার আমার জীবনে এনে দেওয়া চাঁদকে।'

তাহমিদের কথা কর্ণগোচর হতেই লজ্জায় মিইয়ে গেলো নাযীফাহ।

দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চন্দ্রসুধা গায়ে মাখছে দু'জন। একটা সময় পর তাহমিদ খেয়াল করলো তার কাঁধে মাথা রেখে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেছে নাযীফাহ। নিদ্রামগ্ন নাযীফাহ'র ভারী নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে চারপাশে। তপ্ত শ্বাস ফেলল সে। তন্দ্রা রাণী তার আঁখি পল্লবেও ভর করেছে। নাযীফাহ'র ঘুমন্ত দেহকে একহাতে আগলে নিয়ে মাথায় ঠোঁট ছুঁয়ালো তাহমিদ। তারপর নাযীফাহ'র মাথাটা কাঁধ হতে ছাড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে কিছু সময়।

'কিছু কিছু অসম্ভব সুন্দর মুহূর্ত তোর অচেতন অবস্থায় কেন তৈরি হয়? একা একা আমিই কেন শুধু সেসব সন্ধিক্ষণ অনুভব করি? কবে দু'জন একসাথে এইসব ছোট ছোট মুহূর্তকে হৃদয়ঙ্গম করবো?' একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দ্বিতীয় বারের মতো কোলে তুলে নিলো নাযীফাহ কে।

ফ্ল্যাটের সামনে এসে কলিংবেল চাপতেই প্রায় মিনিট দশেক পরে ঘুম ঘুম চক্ষু নিয়ে দ্বার খুলে আমেনা বেগম। তাহমিদের কোলে ঘুমন্ত কিশোরীকে দেখে কুটিল হেঁসে ব্যঙ্গ করে বলেন,

'আহারে বউ প্রেম করতে করতে ঘুমিয়ে গেলো? তা প্রেমালাপ শুরু করেছিলি নাকি এর আগেই?'

'তুমি আসলেই দাদি,,,,'

____________________________________________

নাস্তার টেবিলে বসে আছে সবাই। রুটির টুকরোটা মুখে দিয়ে ফাহিম তাহমিদ কে বলল,

'ভাইয়া তুমি না চাকরির জন্য এপ্লাই করেছিলে কি হলো?'

ভাইয়ের কথার জবাবে তাহমিদ বলে,

'এমবিএ কমপ্লিট করার পরে চাকরি নিবো। ছয়মাস পরে এমবিএ পরীক্ষা। এডমিশনের কোচিং তো শেষ। কয়েকদিন পরে একাডেমি কোচিং শুরু হবে। এখানেই আছি এখানেই থাকি। নিজের পড়াশোনাও চলছে পার্ট টাইম জবও হচ্ছে।'

কথা মাঝে ফোঁড়ন কাটে নাযীফাহ।

'আমার ক্লাস শুরু হবে কবে থেকে?'

তাহমিদ নাযীফাহ'র দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

'ভূতের মুখে রামনাম। দ্যা গ্রেট নারীফাহ জিজ্ঞেস করছে পড়াশোনার কথা?

নাযীফাহ চোখ মুখ কালো করে তাকিয়ে রইলো তাহমিদের দিকে। নাযীফাহ'র মুখের ভাবভঙ্গি দেখে শব্দযোগে হাসল তাহমিদ। ফাহিম বিদ্রুপ করে বলে,

'তোকে পুরো হূলো বিড়ালের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ তোর সামনে মাছের কাঁটা নিয়ে গেছে।'

ফাহিমের কথায় রাগে ফোঁসছে নাযীফাহ। নাযীফাহ'র রাগ দেখে মুচকি মুচকি হাসছে তাহমিদ।

'সপ্তাহ খানেক পরে তোর ক্লাস শুরু হবে। তার আগে কলেজ ড্রেস বানাতে হবে। আজ বিকেলে হাঁটতে বের হলে টেইলর্সের দোকানে যাবো।'

তাহমিদ আর ফাহিম বাসা থেকে বেরিয়ে যেতেই নাযীফাহ আমেনা বেগমকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী গলায় আবদারের স্বরে বলল,

'ও দাদি আমাকে রান্না করা শিখাবে? ফুপি বলেছে তোমার হাতের রান্না নাকি খুব মজা।'

আমেনা বেগম বিস্ফোরিত চোখ নাযীফাহ'র দিকে তাকিয়ে রইলেন।

'ও দাদি না বলবে না কিন্তু।'

আমেনা বেগম মুচকি হেসে বলেন, 'আচ্ছা ঠিক আছে।'

____________________________________________

রাত পোহালে নতুন সপ্তাহ। আজ শুক্রবার বিধেয় সবাই বাসায়। তাহমিদ দুপুরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে এখনো ওঠেনি। ফাহিম মাত্রই বাসা থেকে তড়িঘড়ি করে বের হলো। মনে হয় খুব তাড়া তার। ফাহিমের যাওয়ার পানে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো নাযীফাহ। ঠিক বিশ মিনিটের মাথায় কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে সামনে তাকিয়ে আঁতকে উঠল সে।

#চলবে

বানান ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন