#হৃদয়াবেগ
#পর্বঃ১৯
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)
রান্নাঘরে এসে আর ভাত খেতে ইচ্ছে করলো না নাযীফাহ'র। মা আর ফুপিকে বিরক্ত না করে নিজেই নুডলস রান্না করতে এলো। যেহেতু নুডলস রান্না করতে সে পারে সেহেতু তাদের বিরক্ত করার আর মানেই হয় না। সেদ্ধ নুডলস এর পাতিল চুলা থেকে নামাতে গিয়ে হাত ফসকে বাম পায়ের উপর পড়ে যায়। গরম পানি পায়ে পড়ার সাথে সাথেই নাযীফাহ, 'ওমাগো ' বলে চিৎকার করে ওঠে। মাত্রই চোখ লেগে এসেছিলো তাহমিদের। নাযীফাহ'র চিৎকারে ধড়ফড়িয়ে উঠে সে। দিক বেদিক দিশা না পেয়ে একছুটে রান্নাঘরে আসে। তার পিছু পিছু বাকি সবাইও এলো। রান্নাঘরের চিত্র দেখে তার মুখে কাঠিন্যভাব দেখা দিলো। পাতিল একপাশে, নুডলস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে। অন্যপাশে নাযীফাহ পা ধরে বসে কান্না করছে। তাহমিদ সাবধানে নাযীফাহ'র কাছে গিয়ে এক প্রকার টেনেই তুলল তাকে। ওয়াশরুমে এনে পায়ে পানি দিতেই তাহমিদের শার্ট খামচে ধরলো সে।প্রচুর জ্বালাপোড়া করছে পা। বাকি সবাই নিঃশব্দে প্রস্থান করলো সেখান থেকে। ড্রয়িং রুমে নাযীফাহ কে বসিয়ে তাহমিদ ফাস্টএইড বক্স থেকে অয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসলো। চোখ মুখ তার আগুন লাল হলেও সে সযত্নে নাযীফাহ'র পায়ে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিচ্ছে। দেওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালো সে।রক্তিমবর্ণ চোখে নাযীফাহ'র দিকে তাকিয়ে বলে,
'বড্ড রান্নার শখ না তোর? ভবিষ্যতে আমি তোকে হেঁসেলে রেখেই মা'র'বো। কোনো কাজ করতে হলে আগে দেখতে হয় বড়রা কিভাবে করে। সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তোর নুডলস খেতে ইচ্ছে করছে এটা বললে কেউ তোকে রান্না করে দিতো না?'
মাথা নত করে ফেলে নাযীফাহ।
____________________________________________
একের পর এক দিনের সমাপ্তি ঘটিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়। কোনো কোনো দিন কাটে আনন্দমুখর আবার কোনো কোনো দিন কাটে বিষন্নতায়। হেমন্তকাল শেষে শীতের আগমন ঘটেছে। প্রকৃতি হয়েছে রুক্ষ।এক এক করে গাছের সব পাতা ঝরে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে শীতের প্রকোপ থাকলেও শহরের শীত ওই কুয়াশা আবৃত ভোর পর্যন্তই। শহরে ঋতু পরিবর্তনের তেমন একটা প্রভাব দেখা যায় না।বারোমাসই ফ্যান চালু দিয়ে ঘুমোতে হয়। নাযীফাহ'র কলেজ, কোচিং বাসা আর তাহমিদের কোচিং-এ ক্লাস নেওয়া, নিজের পড়াশোনা চালিয়ে দিনগুলো বেশ যাচ্ছে। ফাহিম ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছে ইংরেজি বিভাগে। এখান থেকে যাতায়াতের সমস্যা বলে কলেজের কাছেই একটা মেসে উঠেছে। বৃহস্পতিবার রাতে আসে আবার শুক্রবার বিকেলে চলে যায়। তাহমিদ আর নাযীফাহ'র বাবা মা দিন দশেক থাকার পরে আবার গ্রামে ফিরে গিয়েছিল। সেইদিন নাযীফাহ মায়ের শাড়ির আঁচল টেনে ছোট বাচ্চাদের ন্যায় কেঁদে ছিলো। ফাহমিদা বেগম মেয়েকে সান্ত্বনা দিলেও আড়ালে তিনিও চোখের পানি বিসর্জন দিয়েছেন। নাযীফাহ'র মনের সেই বিষন্নতার পাহাড়কে দূর করার জন্য সেইদিন দ্বিতীয়বারে ন্যায় মাঝরাত অব্দি দু'জন ছাদে বসে ছিলো। পার্থক্য হলো সেদিন পূর্ণিমা ছিলো না। ঘোর অমাবস্যা ছিলো। চারদিকে ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝে একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বসেছিলো ছাদের কিনারায়। নাযীফাহ বিষন্ন আর বেদনার্ত মন শান্ত করার জন্য আকঁড়ে ধরেছিল তাহমিদের বুক। আর তাহমিদ ভালোবেসে আগলে নিয়েছিল নাযীফাহকে। বাসায় কেউ না থাকলে আমেনা বেগমের সময় কাটে নিতুর মায়ের সাথে গল্প করে। নাযীফাহ যখন কলেজ থেকে ফিরে তখন নাযীফাহ গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসে। কাকে কিভাবে বোকা বানালো, কার সাথে কি করলো এসব বলে আর হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়। দুষ্টুমির জন্য কলেজে মোটামুটি পরিচিত সে।
নিজের ক্লাস শেষ করে ভার্সিটি থেকে মাত্রই অফিস রুমে এসে বসেছে তাহমিদ। একটা শীট চেক করার জন্য হাতে নিতেই মোবাইল বেজে উঠলো তার।মোবাইল স্ক্রিনে ফারুক স্যারের নাম্বার দেখে কপালে সূক্ষ্ণ রেখার ভাঁজ পড়ে। মনে মনে দোয়া পড়ে কল রিসিভ করলো যেন নাযীফাহ'র নামে কোনো বিচার না হয়। কল রিসিভ করে সালাম দিতে দিতেই ওপাশ থেকে বলল,
'তাহমিদ এ কাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়ে গেলে? আমি ভেবেছিলাম গ্রামের মেয়ে শান্ত প্রকৃতির হবে। এ তো সারা কলেজ মাথায় তুলে রাখে। আজ কোনো কারণে আমার মেজাজ খুব খারাপ ছিলো। মনে করেছি ক্লাসে গেলে হয়তো ছাত্রছাত্রীরা আস্তো থাকবে না । সে আমার রাগত চেহারা দেখে বলল, 'স্যার রাগলে আপনাকে বেশি সুন্দর লাগে। আপনি এখন থেকে রেগে থাকবেন। আমি সিউর ম্যাম আপনার রাগ দেখেই পাগল হয়েছিলো। শত চেষ্টা করেও নিজের মুখের গাম্ভীর্যতা ধরে রাখতে পারিনি।ফিক করে হেসে দিয়েছিলাম।'
'মা'ই'র দিবেন স্যার তাহলে পরবর্তীতে এমন দুষ্টুমি আর করবে। মা'ই'রে'র উপর আর ঔষধ নাই।'
তাহমিদের কথায় মলিন হাসলেন উনি।
'তাহমিদ তুমি নিজেও টিচিং প্রফেশনে আছো।তুমি বুঝবে। কিছু কিছু স্টুডেন্ট থাকে যারা হাজার দুষ্টুমি করলেও তাদের উপর রাগ করা যায় না। নাযীফাহ তাদের কাতারেই পড়ে। তুমি জানো কি না জানি। কয়েকদিন আগে ওর ফ্রেন্ড জান্নাত প্রেশার ফল করে সেন্সলেস হয়ে যায়। কোনো মা'ও হয়তো এভাবে কান্না করতো না সে যেভাবে বান্ধবীর জন্য কান্না করেছে। যতই দুষ্টুমি করুক না কেন সে কিন্তু একেবারে সরল।'
মৃদুস্বরে হাসলো তাহমিদ। প্রিয় মানুষের প্রশংসা সবারই শুনতে ভালো লাগে। হুট করে ইচ্ছে হলো প্রেয়সীর ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ঘর্মাক্ত আনন দেখার জন্য। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালো সে।নাযীফাহ'র কলেজ ছুটি হতে আরো পনেরো মিনিট। কেউ একজনকে ডাকল তাহমিদ।
'শাওন ভাই আমার ক্লাসটাইমে আপনি ক্লাসটা নেন।আমি আপনার ক্লাসটা আমি করবো।'
ব্যস্ত পায়ে ছুটলো বাইরে। কলেজ গেইটে পা দিতেই ছুটির ঘন্টা বাজলো। প্রায় মিনিট দশেক পরে নাযীফাহ কলেজের বাইরে পা দিলো। জান্নাতের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ তাহমিদকে দেখে কপাল কুঁজিত হলো তার। জান্নাতকে সাথে নিয়ে তাহমিদের মুখোমুখি হলো সে।ভ্রু যুগল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
'আপনার তো কোচিং সেন্টারে থাকার কথা এখানে যে?'
জান্নাতের দিকে তাকিয়ে কোনো উত্তর দিলো না তাহমিদ। নাযীফাহ'র প্রশ্নের জবাবে শুধু শব্দহীন হাসলো। হাসি দেখে যা বুঝার বুঝে নিলো নাযীফাহ। তার মনের দ্বারেও আজকাল অনুভূতিরা কড়া নাড়ে। তাহমিদের প্রকাশিত অপ্রকাশিত সকল আবেগ, অনুরাগ, গভীর প্রণয় যেন তার হৃদগহীনেও অনুভূতির অন্বেষণ ঘটাচ্ছে। মাঝে মাঝে তাহমিদের নিক্ষেপ করা শান্ত চাহনি,হুটহাট গভীর স্পর্শ তার বক্ষঃপঞ্জর শীতল থেকে শীতল করে তুলে। জান্নাত ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
'নাযু তুই তাহলে ভাইয়ার সাথে যা। আমার টেইলর্সের দোকানে গিয়ে লেইট হবে।'
নাযীফাহ বলল,
'তাহলে আমিও যাই তোর সাথে।'
'ভাইয়া যেহেতু এসেছে তাহলে তোর আর উল্টো পথে যাওয়ার দরকার নেই। তুই ভাইয়ার সাথে যা। আমি আসছি। আমার জন্য বসার জায়গা রাখবি কিন্তু।'
রিক্সায় চড়ে বসতেই নাযীফাহ পুনশ্চ প্রশ্ন করলো,
'তখন কিন্তু বলেনি হঠাৎ কেন এসেছেন।'
তাহমিদ তার অধর জোড়া প্রসারিত করে নাযীফাহ'র একটা হাত মুঠোবন্দি করলো।
'কেউ একজনের এলোমেলো কেশ, ক্লান্ত চাহনি একটা নজর দেখার জন্য হৃদগহ্বরে স্পৃহা জেগেছিল। তাই এক মুহূর্ত দেরি না ছুটে এলাম। কারো ক্লান্তি মাখা আনন দর্শন করে নিজের মানসিক ক্লান্তি দূর করার জন্য।'
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো নাযীফাহ। তাহমিদ নাযীফাহ'র সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বলল,
'বেশি ক্লান্ত লাগলে আমার কাঁধে মাথা রেখে ক্লান্তি নিবারন করতে পারিস আমি মাইন্ড করবো না।'
নাযীফাহ উষ্ণ শ্বাস ফেলে বলল,
'আপনিও ক্লান্ত আমিও ক্লান্ত। থাক দু'জনের ক্লান্তি, নিস্তেজ ভাব আর অবসন্নতা আপনার কাঁধে রেখে আপনার বোঝা আর না বাড়াই।'
তাহমিদ ভ্রু নাচিয়ে বলল,
'কেউ একজন মনে হচ্ছে খুব দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে? সে কি অতি দ্রুত পুরোপুরি মিসেস তাহমিদ হওয়ার জন্য আপ্রান প্রয়াস চালাচ্ছে নাকি? তাহলে কিন্তু আগেভাগে তাহমিদ বলে দিচ্ছে একশো তে দেড়শো পেলেও তাহমিদের কথার নড়চড় হবে না। আগে এইচএসসি পাশ করতে হবে। তারপর অন্যকিছু।'
তাহমিদের কথা শ্রবণেন্দ্রিয় হতেই সূঁচালো দৃষ্টিতে তাকালো নাযীফাহ। তাহমিদ বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল,
'তার আগে এই রাক্ষসের মতো নখ গুলো কাটতে হবে। বিকজ সেফটি ফার্স্ট। আমার অক্ষত দেহটাকে কেউ সুযোগ পেয়ে ক্ষ'ত বি'ক্ষ'ত করবে সচেতন নাগরিক হয়ে এটা আমি অন্তত চাই না।'
চোখ পাকিয়ে তাহমিদের বাহুতে চিমটি কাটে নাযীফাহ
____________________________________________
ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছে তাহমিদ। বোর্ডে টেন্সের এর স্ট্রাকচার লিখছে সে। নাযীফাহ'র পানির পিপাসা পাওয়ায় সে ফিসফিস করে জান্নাতের কাছে পানি চাইতেই সামনে থেকে আরেকটা মেয়ে বলে উঠলো,
'স্যার নাযীফাহ কথা বলছে। তার বিশৃঙ্খলার জন্য আপনি কি বলছেন কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।'
মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো তাহমিদের। ক্লাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা তার মোটেও পছন্দ না। আর নাযীফাহ'র নাম নেওয়ায় রাগের মাত্রা যেন বাড়ল। মার্কার পেনের মুখ আঁটকে পিছনে ফিরে ক্রোধান্বিত গলায় বলল,
'স্ট্যান্ড আপ নাযীফাহ।'
আকস্মিক কান্ডে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো নাযীফাহ। সবটাই যেন তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। কথাই বললো কখন আর বিশৃঙ্খলাই করলো কখন? পিপাসা পাওয়ায় ফিসফিস করে তো শুধু পানিই চাইলো। আর কিছু তো না।
তাহমিদ পুনশ্চ গর্জে উঠে বলল,
'আই সে স্ট্যান্ড আপ।'
ধমকের শব্দে কেঁপে উঠলো নাযীফাহ সহ বাকিরাও। উঠে দাঁড়ালো সে। তাহমিদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
'বলেছি না ক্লাসে বিশৃঙ্খলা আমার পছন্দ না। ক্লাস ভালো না লাগলে চলে যাবেন। অন্যকে বিরক্ত করার মানে কি?'
অভিমানেরা ভিড় জমাতে লাগলো মনের আনাচে-কানাচে। আর সেই অভিমান গুলো অশ্রু হয়ে জমতে শুরু করলো কনীনিকার কোণে। যেন পলক ফেললে বৃষ্টি হয়ে ঝরবে অভিমানের অশ্রু। রাগে, অভিমানে ব্যাগটা নিয়েই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো সে। নাযীফাহ'র যাওয়ার পানে তীক্ষ্ণধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাহমিদ। পরপর কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার প্রয়াস চালালো সে। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেলো পুরো ক্লাসরুম। এর আগে তাহমিদকে এতো রাগতে কেউ দেখিনি। জান্নাত সামনের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসছে। ক্লাসে ঘুরে ঘুরে টপিক বুঝাচ্ছে তাহমিদ। বোর্ডে গিয়ে আরেকটা স্ট্রাকচার লিখতেই আচমকা দু'কদম পিছিয়ে এলো সে। সম্মুখের আপতিত দৃষ্টিগোচর হতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো তার। ক্রোধে হাতের মার্কার পেনটা চেপে ধরলো সে।
#চলবে
প্রাইভেট থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে হাবিজাবি কি লিখেছি জানি না। ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। পেইজে যারা গল্পটা পড়েন কাইন্ডলি কমেন্ট করার চেষ্টা করবেন।