#মন_দিয়েছে_ধরা
#পর্বঃ১১
লেখনীতে#পুষ্পিতা_প্রিমা
রিপ আর ঘরে এল না দেখে নীরা এক পায়ের উপর ভর রেখে হেঁটে হেঁটে বহুকষ্টে তিনতলায় গেল। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে দারুণ পোহাতে হয়েছে তাকে। আজ একদম জ্বালিয়ে মারবে। এত তেজ কোত্থেকে আসে? ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দেবে আজকে। সে দরজার নব ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল। রিপ পিলে চমকে উঠে ডিভান থেকে মাথা তুলতেই দেখলো অন্ধকারে কোনো এক রমণীর প্রতিচ্ছবি। সে ডেকে উঠলো
নীরাহ?
নীরা ঠুসস করে লাইট জ্বালালো। সরোষে বলল
হ্যা আমি।
তুমি এখানে এলে কি করে?
গাড়িতে চড়ে।
রিপ দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল
ঘুমাতেও কি দেবে না?কি আজব! তুমি এপায়ে কেন হেঁটে এলে?
নীরা খুঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে ডিভানে গিয়ে বসলো। পা তুলে শুয়ে পড়ে বলল
উফফ কি ব্যাথা!
রিপ ব্যতিব্যস্ত হয়ে কড়া গলায় বলল
তোমাকে কে বলেছে হেঁটে হেঁটে এখানে আসতে?
নীরা জবাব দিল না। রিপ আঁড়চোখে পায়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
কোথা,,,,কোথায় ব্যাথা?
নীরা চোখা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রাগমিশ্রিত জ্বলজ্বলে কন্ঠে বলল
আমার ব্যাথা সাড়ানোর ক্ষমতা আপনার আছে নাকি? আমার ঘুম পাচ্ছে।
রিপ বলল
তুমি এখানে ঘুমাবে?
তো কোথায় ঘুমাবো?
তাহলে আমি কোথায় ঘুমাবো?
এখানেই?
এখানে কোথায়?
আমি কি জানি?
রিপ গর্জে তর্জে বলল
নীরা দেখো একদম মজা করবে না। তুমি এসেছ কেন? তুমি এখন আবার নীচে যাবে কি করে? এখানে ঘুমানোর জায়গা কোথায়? ডিভানে তো তুমি শুয়ে রয়েছ। আমি শোবো কোথায়?
নীরা চোখ বন্ধ করে বলল
উহু! আমার ব্যাথা করছে। আর আপনি আমাকে বকে যাচ্ছেন। পাষাণ মানুষ।
রিপ কৌতূহলী হয়ে তার পায়ের কাছে গিয়ে বসলো। পায়ে হাত দিয়ে বলল
দেখি কোথায় ব্যাথা হচ্ছে।
নীরা পা কুড়িয়ে নিয়ে বলল,
না দেখা লাগবে না। আমি বললেই দেখতে আসেন। আমি না বললে মরে গেলেও তো টের পাবেন না। আমাকে মরার সময়ও বলে যেতে হবে এডভোকেট সাহেব আমি মরে যাচ্ছি।
রিপ রামধমক দিয়ে বলল
চুপপ। একদম চুপ থাকো। বেশি কথা বললে একদম একা রেখে দরজা বন্ধ করে চলে যাব। তারপর মজা বুঝবে। চুপচাপ পা দেখাও। বলো কোথায় ব্যাথা হচ্ছে।
ব্যান্ডেজের ভেতরে ব্যাথা হচ্ছে।
রিপ দাঁত চেপে বলল
কেন হেঁটে এসেছ?
আসব না তো কি করব? আমার একা একা ওই ঘরে ভয় লাগে বলেছিলাম না? জেনেশুনেও ফেলে রেখে চলে এলেন।
চলে আসব না? ওরকম বাজে বাজে কথা বলছো আমার নামে।
বাজে কথা কোথায় বলেছি? সত্যি কথায় বলেছি। আপনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাননি? এমনিতো ছুঁইনা ছুঁইনা বলেন, তারপর ঘুমের মাঝে এভাবে জড়িয়ে ধরেন। এভাবে।
নীরা হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল।
রিপ বুঝতে পারলো না মেয়েটা কি ইচ্ছে করেই তাকে এরকম নাজেহাল করছে?
ফালতু কথা বলবে না। তুমি এখন কি করতে চাও সেটা বলো।
আমি ঘুমাবো।
কোথায়?
আপনার সাথে।
নীরাহ!
ধমক খেয়ে আঁতকে উঠলেও হেসে গালে হাত দিল নীরা।
রিপ শান্তস্বরে,
এতদূর হেঁটে এসেছ তাই তোমার পা ব্যাথা করছে। এখন আবার কিভাবে নীচে যাবে? আচ্ছা ওঠো। আমার হাতে ভর দিয়ে হাঁটো। ওই পায়ে ভর দেবেনা মোটেও।
নীরা দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল
আপনার জন্য এত কষ্ট করতে হচ্ছে আমার।
ভালো হয়েছে। অসভ্য কথা বলবে আর?
নীরা কিছু না বলে রিপের বাম হাতটা শক্ত করে ধরলো। বলল
আপনার ডান হাতটা ভালো থাকলে আমি হেঁটেই যেতাম না।
কিভাবে যেতে?
কোলে।
রিপ থমকে গেল। নীরা আবারও হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে পিছলে যেতেই রিপ তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে ফেলে গর্জে,
নীরা একদম চুপ থাকো। আর সোজা সামনে দেখে হাঁটো। তুমি বুঝতে পারছোনা আমাকে জ্বালাচ্ছ তুমি।
নীরা রিপের হাত ধরে ধীরে ধীরে ঘরে চলে এল। রিপ তাকে বিছানার কাছে বসিয়ে দিয়ে বলল
এবার শুয়ে পড়ো। কোনো কথা বলবে না। আমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছে।
নীরা শুয়ে পড়লো। কোনো কথা বলল না। রিপ তার পাশে সাবধানে শুয়ে পড়লো। চোখ বুঁজার আগে আরও একবার সাবধান করলো।
নীরা আমার হাতে হালকা কিছু লাগলেই ব্যাথা করে। তুমি হাত পা ছোড়াছুড়ি করবে না।
নীরা ভালো মেয়েটির মতো মাথা নাড়ালো। রিপ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো।
মাঝরাত্রিরে বুক ভার লাগতেই চোখ মেলে দেখতে পেল নীরা একেবারে তার বুকের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। ফোঁসফোঁস করে শ্বাস টানছে আর ফেলছে। কি আজব মহিলা! তাকে অসভ্য ডাকছিল এখন নিজে অসভ্যতামি করছে। সে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকলো
নীরাহ!
নীরাহ নড়লোও না। রিপ আবার ঝাঁকুনি দিয়ে বলল
নীরা সরো। আমার দম বন্ধ লাগছে।
ঘুমগ্রস্ত্র নীরা বিরক্তিতে চোখ মেললো। চোখ পাকাতেই এত কাছে রিপকে দেখে চোখগুলো বড় বড় করে পাকিয়ে বলল
এ্যাহ আবারও অসভ্যতামি করছেন? ছিঃ ছিঃ।
রিপ শান্ড অথচ ঝাঁঝালো গলায় বলল
কে করছে অসভ্যতামি?
আপনি।
আমি?
হুম।
পরক্ষণে নিজের অবস্থান দেখে লজ্জায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেল নীরা। সরতে যাবে তখন তার চুল টান পড়লো। আহ বলে শব্দ করতেই দেখলো রিপের শার্টে তার চুল পেঁচিয়ে রয়েছে। নীরার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি এল। সে বলল
ধুরর এটা ছাড়িয়ে দিন তো। আপনার শার্টের বোতামগুলো আপনার মতো।
আমার মতো মানে কি?
আপনার মতো মানে আপনার মতো ধরে রাখে।
রিপ কি বলবে কিছু বুঝে পেল না। চুলটা বোতাম থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল
নিজে যে গায়ের উপরে উঠে বসে তা বলে না।
একহাতে চুল ছাড়িয়ে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। নীরা চুপচাপ কান্ড দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। রিপ বলল
তুমি চেষ্টা করে দেখো। আমি তো পারছিনা। আজব এভাবে আর কতক্ষণ!
সারাজীবন।
রিপ চোখ তুলে চাইলো। নীরা চোখ টিপ মেরে বলল
আপনার কি আর শান্তি আছে?
রিপ এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে উঠে যেতে যাবে তখনি নীরা প্রচন্ড ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলো।
রিপ পুনরায় শুয়ে পড়ে বলল
বোতামটা ছিঁড়ে নাও। নয়ত তোমার চুল ছিঁড়ে যাবে।
নীরা চুলে হাত দিয়ে চোখ বুঁজে আছে। চুল টান পড়ায় ব্যাথা পেয়েছে সে। রিপ অনুতপ্ত হয়ে তাকালো তার মুখের দিকে। চুলের গোঁড়ায় চেপে ধরে আছে নীরা। চেহারায় ব্যাথার আঁচ ফুটে উঠেছে। রিপ ধীরে ধীরে চুলগুলো ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। অনেকক্ষণ পর সফল হলো তখন বলল
ছাড়িয়ে দিয়েছি।
নীরা চড়া গলায় কান্না জড়িয়ে বলল
ব্যাথা তো ঠিকই দিলেন। চুল ধরে মারতে পারছেন না তাই এভাবে চুল ছিঁড়ে দিলেন? কার বর এরকম করে আপনার মতো? ওদের বরগুলো চুল পর্যন্ত আঁছড়ে দেয়। আর আমারটা চুল ছিঁড়ে দেয়।
বলেই সে ফুঁপিয়ে উঠলো। রিপ কি বলবে বুঝতে পারলো না। সে ন্যায় অন্যায়, সত্যি মিথ্যা, ঠিকভুলের জন্য গলা চড়িয়ে বিপক্ষীয় দলের সাথে লড়াই করে সে স্বয়ং স্ত্রীর সাথে অন্যায় করছে?
নীরা ফুঁপিয়েই গেল। রিপ ধীরে আলতোভাবে তার চুলগুলো নিয়ে ধীরেধীরে পেঁচিয়ে দিল বোতামের সাথে। বলল
হয়েছে।
নীরা তার চোখ বরাবর তাকিয়ে বলল
কি হয়েছে?
ওই মানে আবার পেঁচিয়ে দিয়েছি।
কেন পেঁচিয়ে দিয়েছেন? আবারও টেনে চুল ছিঁড়ে ফেলার জন্য?
রিপ পড়লো মহাবিপদে। আর্ত চোখে তাকিয়ে কাতর স্বরে বলল
ওটার জন্য সরি। তোমার কি শাস্তি দিতে ইচ্ছে করছে দাও।
শাস্তির কথা শুনে নীরার চোখ খুলে গেল। সে জলভরা চোখদুটো পিটপিট করে বলল
হ্যা শাস্তি তো আছেই।
রিপ এবার একটু ভড়কালো। বলল
কি শাস্তি? এভাবে শুয়ে থাকবে? শুয়ে থাকো। কিন্তু কাঁদবে না খবরদার।
নীরা প্রশয় পেয়ে মনে মনে আনন্দিত হলো। আগের চাইতেও দুষ্টবুদ্ধি চাপলো মাথায়। বোতাম থেকে চুলগুলো ধীরেধীরে ছাড়িয়ে নিয়ে রিপের উষ্ণ ঠোঁটে টুপ করে চুমু খেয়ে দু-হাতে মুখ ঢেকে পাশ ফিরে কাঁথা দিয়ে মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে গেল। ওদিকে রিপ ঘুমালো না সারারাত। নীরা কি করে এতবড় অসভ্যতামি করলো তার সাথে? রিপ রেজওয়ান খানের সাথে?
বেচারা ভুলেই গিয়েছিল হয়ত সে নীরার ব্যক্তিগত সম্পদ। লজ্জায় সকাল থেকে আর রিপকে আর দেখা দেয়নি নীরা।
চলবে...
🙈