ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন কেমনের বৃষ্টি (সিজন ২)

১৪তম পর্ব

লেখক: প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী

#মন_কেমনের_বৃষ্টি

#পর্ব_১৪(সিজন ২)

#প্রিমা_ফারনাজ_চৌধুরী

নীরা শোয়া থেকে উঠে পড়ল। রুমটা আলোকিত। ঘুমঘুম চোখে গালি দিল ওই চেয়ারে বসে মাথা নিচু করে লিখতে থাকা মানুষটাকে। রাতের নিঃশব্দে কলমের প্যাঁচপ্যাঁচ শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে নীরা। বিরক্তি নিয়ে বলল,

' এই লোকটা নিজে ঘুমাবেনা। আমাকে ও ঘুমাতে দেবে না। সারাক্ষণ কাগজে প্যাঁচপুঁচ কি লিখে আল্লায় জানে। এসব ব্যারিস্টারির গুলিমার। একটা রিকশাওয়ালাকে বিয়ে করলে আমার এত দুর্দশা হতোনা। সারাদিন রিকশায় ঘুরতাম। আর রাতে একটু ভালো করে ঘুমাতাম।

ভেসে এল শান্ত কন্ঠস্বর নীরার কানে।

' এখনো যুবতীদের মতো সুন্দর আছ। বিয়ে দেব নাকি? পাত্র দেখব?

নীরা কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। সুন্দর বলেছে সেজন্য লজ্জা পাচ্ছে। আবার বিয়ে দেবে বলছে সেজন্য লাঠি দিয়ে বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।

রিপ বলল,

' কি হলো চুপ হয়ে গেলে কেন?

নীরা ধপ করে বিছানায় শুয়ে কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,

' লাইট জ্বালানো থাকলে আমার ঘুম আসেনা ব্যারিস্টার । আপনি কখন ঘুমোবেন? আসুন না।

রিপ বলল,

' আর ও আধঘন্টা লাগবে। তুমি ঘুমানোর চেষ্টা করো।

নীরা চোখগুলো বড় বড় করে বলল,

' ব্যারিস্টারকে ছাড়া ঘুম আসছেনা বাপ। কয়বার কইছি?

রিপ দাঁড়িয়ে গেল বসা থেকে। নীরার দিকে এগোতে এগোতে বলল,

' কি বলেছ আবার বলো। কি হলো চোখ বন্ধ করলে কেন? বলো। তুমি মাহিকে এসব শিখিয়েছ না? ও এখন সুন্দর করে কথা বলতে গিয়ে আটকে যায়। ওসব হাবিজাবি কথা বলতে বলতে। তুমি কি নীরা? সারাক্ষণ বাপ বাপ। কি শুরু করেছ?

নীরা চোখ বন্ধ করে ফেলল খিঁচে। বলল,

' ব্যারিস্টার বাবু আমাকে এই শেষবার মাফ করুন। আর বলব না। প্রমিজ। তিনবার প্রমিজ।

রিপের রাগী চোখ শান্ত হলো। নীরার করুণ অবস্থা দেখে সে মনে মনে হাসল। আওয়াজ করল না। নীরা পিটপিট করে চোখ খুলে দেখল ব্যারিস্টার বাবু তাকিয়ে আছে অন্যরকম দৃষ্টিতে। নীরা মুখ মোচড় দিয়ে বলল,

' আমি কি দেখার মতো কেউ নাকি? এভাবে কি দেখছেন?

রিপ মাথা নেড়ে বলল,

' দেখছি। তোমার ছেলে বড় হয়েছে অথচ তোমার বাচ্চামো গেলনা। আমাকে ঠিক আর কত কত বছর তোমার বাচ্চামো সামলাতে হবে নীরা?

নীরা হাসল বালিশে মুখ গুঁজে।

তারপর ব্যারিস্টারের পান্জাবীর কলার চেপে নিজের কাছে আনল। ফিসফিস করে বলল,

' মরণের আগ পর্যন্ত। পারবেন না?

রিপ নির্মল হাসল। নীরা এতকাছ থেকে কতদিন পর যে হাসিটা দেখল?

লোকটার সবকিছু এত মোহনীয় কেন? হাসি,রাগ,অভিমান, শাসন আর ভালোবাসাগুলো। এতটা ভালোবাসে কিন্তু দেখায় না। এভাবে এতটা ভালোবাসা কি লুকোনো যায়? মাঝেমাঝে তাই তো বেরিয়ে আসে নীরার সামনে। নীরা মানেই তো রিপ। তাই নীরা বুঝে ফেলে রিপ নামক কঠিন বইটার ভাষা। একদম খুব ভালোভাবে বুঝে ফেলে। বইটার পৃষ্ঠা উল্টাতে না উল্টাতে নীরা বুঝে ফেলে ভালোবাসা হারায় না। ভালোবাসা হারায় না।

মাঝেমাঝে মনে হতো এই মানুষটাকে ভালোবেসে সে ভুল করেছে। কিন্তু না! এই মানুষটাকে ভালোবেসে সে ভুল করেনি বরঞ্চ লোকটারই ভুল হয়েছে তাকে ভালোবাসার সুযোগ দেওয়ার।

লোকটা কি জানত না নীরা বড্ড অবুঝ। সারাক্ষণ বাচ্চামো আর একটুখানি ভালোবাসার জন্য তাকে জ্বালিয়ে মারবে। কেন জানল না?

লোকটার জন্য তার মায়া হয়। কতটা জ্বালায় সে আর তার ছেলে। লোকটা দেখায় সে বিরক্ত হয়। সত্যি বলতে এই বাচ্চামোগুলোকেই লোকটা এতটা ভালোবাসে। কিন্তু দেখায়না। কি লোকটা! এমন কেন? নিজে নিজে ধুঁকে ধুঁকে মরে নিজের মনের কথা কাউকে বলতে না পারায়।

মাঝেমাঝে নীরাকে তো বলেই ফেলে আর না পারতে। নীরা বলে দিও তো তোমার ছেলের মা টাকে। আমি তাকে ভালোটালো বাসিনা। সে কেন বাসে? আমি ভালো বাসিনা। সে ও বাসবে না। বাসে কেন? আমার কাছে সবকিছু সমান সমান হতে হবে। দেনাপাওনার হিসাব ও সমান সমান।

তখন নীরা ফেলে,

' সমান সমান হলে,আপনার বেলায় কেন সমান হলোনা। আপনি দিলেন কিন্তু পেলেন না কেন? দেখুন না আমি ও ঠিক আপনার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। দিয়েই গেলাম। কই পায়নি তো। কিছু মানুষের কপাল কি তাহলে এমনি পোড়া থাকে?

যে তাদের সমসময় দিয়েই যেতে হয়। পাওয়ার খাতাটা শূন্য পড়ে থাকে।

পরম আবেশে নীরা বন্ধ করল চোখ। রিপ একটি ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিল অর্ধাঙ্গিনীর ললাটে। তারপর পরই বেরিয়ে গেল রুম থেকে। হাঁটতে হাঁটতে চলে এল বারান্দার কাছে।

জীবনের হিসাবগুলো মেলাতে চেষ্টা করল । তার জীবনে তার মা বাবা পরিবারের পর সত্যি তিনটা মানুষ।

যেমন ছিল তার ইশু। আজ তেমন সত্যি নীরা আর মাহিদ। প্রথম যাকে সে ভালোবেসেছিল। দ্বিতীয় তার স্ত্রী যে তাকে দুচোখ বন্ধ করে পাগলের মতো ভালোবাসে। আর মাহিদ। তার সন্তান। মাঝেমাঝে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে তার। এতটা ভালোবাসে সে এই মানুষগুলোকে। কোনোদিন দেখাতে পারল না। বুঝাতে পারল না। কেন সে পারেনা? কেন সে পারেনি?

জীবনের এই এতগুলো বছর কাটাতে কাটাতে জীবন সম্পর্কে তার কত যে অভিজ্ঞতা হলো।

তার অভিজ্ঞতার ভাষা তাকে বলে,

ভালোবাসা হারায় না। ভালোবাসতে মানা নেই। ভালোবাসতে কোনোকিছু লাগেনা। ভালোবাসলে তা দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। নীরবে নিঃশব্দে ও ভালোবাসা যায়।

যেমন সে বাসে নীরা আর মাহিদকে। বেসেছিল তার ইশুকে। আজ ও বাসে। তার জীবনের এই তিন সত্যিটাকে সে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কিন্তু দিনশেষে নিজেকে ঋণী লাগে নীরার কাছে। নীরার মতো ভালোবাসতে রিপ কি কখনো পেরেছে? রিপ পারেনি। কিন্তু সে ভালোবাসতে জানে। হয়ত একটু কম। থাক না। নীরা এই কম নিয়েই ভালো থাকতে জানে। তার মাঝে অদ্ভুত এক শক্তি আছে। বিপরীত মানুষটার কাছ থেকে নিজের মতো করে ভালোবাসা না পেয়ে ও ভালোবেসে যেতে পারার মতো শক্তি কয়জনেরই বা আছে। নীরার তা আছে।

রিপ হয়ত বুঝল না।

এই অদম্য শক্তিটা তার ও আছে। সে ও ভালোবেসে যেতে জানে। পেরেছে ও।

___________

চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন