নিষিদ্ধ সীমানায় তুমি
লেখিকা: Faiza Noor
পর্ব: ৩
করিডোরের বিষণ্ণ, ফ্যাকাশে আর অর্ধ-অন্ধকার আলো এসে পড়েছিল হসপিটালের বরফ-ঠান্ডা মেঝের ওপর। সেই আলোর নিচে এক কাচের পুতুলের মতো থমকে দাঁড়িয়ে ছিল ফারিহা। চারপাশের স্যালাইন, অ্যালকোহল, স্পিরিট আর অ্যান্টিসেপটিকের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্রতিটা শ্বাস নিতে গিয়ে মনে হচ্ছিল ফুসফুসে বুঝি ধারালো কাচের টুকরো ঢুকে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ আগেই আইসিইউ-এর মোটা কাঁচের ওপারে সায়ানকে দেখে এসেছে সে—যে ছেলেটা গতকাল পর্যন্ত হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে কবিতার মতো কথা বলত, সেই ছেলেটি এখন একটা সাদা চাদরের নিচে নিথর হয়ে শুয়ে আছে। তার শরীরে অজস্র প্লাস্টিকের নল, মাথায় প্যাঁচানো শক্ত ব্যান্ডেজ, আর পাশে রাখা লাইফ সাপোর্ট মনিটরের একঘেয়ে, কাঁচভাঙা স্বরের মতো বিরামহীন ‘বীপ... বীপ...’ শব্দ। প্রতিটি শব্দ যেন ফারিহার বুকের ভেতরে থরথরি কম্পন সৃষ্টি করছিল। হৃদপিণ্ডে সজোরে আছাড় খাচ্ছিল অপরাধবোধের তীব্র যন্ত্রণা।
আর সেই অপরাধবোধের গভীর খাদের সামনে তাকে টেনে এনে নিঃশব্দে দাঁড় করিয়েছে যে মানুষটা, সে এখন ঠিক তার কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে দাঁড়িয়ে।
আদিয়ান চৌধুরী।
পরনে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন। একদম নিখুঁত, ইস্ত্রি করা; কাপড়ের কোথাও একফোটা ধুলো, রক্ত কিংবা কালির দাগও নেই। কিন্তু সেই পবিত্র সাদা কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মনটা যে কতটা কুচকুচে কালো, হিংস্র আর পৈশাচিক, তা আজ ফারিহার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। এই মানুষটা প্রফেশনের আড়ালে নিজের ভেতরের হিংস্র দানবটাকে লুকিয়ে রাখতে বড্ড ভালোবাসে। বাইরের পৃথিবীর মানুষের কাছে সে এক আদর্শ, চিকিৎসাসেবা দেওয়া মহান পুরুষ—কিন্তু ফারিহার কাছে সে এক রক্তচোষা পিশাচ।
আদিয়ানের গাঢ় কালচে চোখে কোনো ধরনের অপরাধবোধ নেই, নেই বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা দয়া। তার সেই নির্ভাবনা, শান্ত আর নিস্তব্ধ চাহনি যেন সায়ানের রক্তাক্ত দেহটার চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়ংকর। ফারিহার হাঁটু দুটো বুকফাটা যন্ত্রণায় আর তীব্র আতঙ্কে কেঁপে উঠছিল। বরফের মতো ঠান্ডা মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটুকুও যেন তার বিলুপ্ত হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল শরীর থেকে সমস্ত রক্ত নিমিষেই শুকিয়ে গেছে।
"তুমি... তুমি এটা কী করলে, আদিয়ান ভাইয়া?" ফারিহার কণ্ঠ স্তব্ধতা চিরে বের হলো, কিন্তু স্বরটা অত্যন্ত ক্ষীণ, কান্নার তীব্র তোড়ে ভেঙে ভেঙে আসছে।
চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জল গালে গড়িয়ে পড়ে থুতনি বেয়ে জামার কলার ভিজিয়ে দিল।
"সায়ানের এমন অবস্থা কেন? ও তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি! কেন ওর জীবনের ওপর এভাবে আঘাত হানলে তুমি? ও কেবল আমার কলেজের একজন সাধারণ সহপাঠী ছিল! কেন ওকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলে?"
আদিয়ান একচুলও নড়ল না। সে ধীরে ধীরে এক পা সামনে এগিয়ে এল। তার লম্বা, চওড়া হিংস্র ছায়াটুকু পুরোপুরি ঢেকে ফেলল ফারিহাকে। অ্যাপ্রনের পকেটে দুই হাত গুঁজে সে কয়েক সেকেন্ড নির্নিমেষ চোখে চেয়ে রইল ফারিহার দিকে। তার সেই চাহনিতে ছিল চরম আধিপত্য, অহংকার আর রক্ত হিম করা পৈশাচিকতা।
তারপর পকেট থেকে তার লম্বা, ধবধবে পরিষ্কার হাতটা বের করে অত্যন্ত নমনীয় ভঙ্গিতে ফারিহার কাঁপতে থাকা গালে স্পর্শ করল। কিন্তু সেই স্পর্শে ভালোবাসার কোনো নরম অনুভূতি ছিল না; ছিল কেবল এক অশুভ, দমবন্ধ করা অধিকারবোধ। বুড়ো আঙুলের আলতো চাপে সে ফারিহার ভিজে যাওয়া চোখের জলটুকু মুছে দিল।
"সায়ানের ক্ষতি আমি করিনি, ফারিহা," আদিয়ান নিচু, ভারী গলায় বলল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, শীতল হাসি, যা দেখলে যেকোনো সাধারণ মানুষের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যাবে। "ওর ভুল একটাই ছিল—সে এমন কিছু পাওয়ার বা ছোঁওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, যা সম্পূর্ণ আদিয়ান চৌধুরীর। যার প্রতিটি অনু-পরমাণুতে কেবল আমার নাম খোদাই করা। আর আমি আমার জিনিস অন্য কারও ছায়াকেও স্পর্শ করতে দিই না। এটা তো তুমি খুব ভালো করেই জানো, তাই না সোনা?"
"ও তোমার জিনিস নয়! আমিও তোমার কোনো সম্পত্তি নই!" ফারিহা চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু ভয়ে তার গলার রগগুলো ফুলে উঠেও আওয়াজটা বাইরে স্পষ্টভাবে বের হতে পারল না। হসপিটালের লোকজনের দৃষ্টি এড়াতে সে গলার স্বর চেপে রাখতে বাধ্য হলো।
সে আদিয়ানের হাতটা নিজের গাল থেকে সরাতে চাইল, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার কবজি ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আদিয়ান তার হাতের কবজি ধরে ফেলল এক নিমেষে। লোহার তৈরি কোনো শক্ত কামড়ের মতো চেপে বসল তার সুগঠিত আঙুলগুলো। ফারিহার ফর্সা চামড়ায় মুহূর্তেই আদিয়ানের আঙুলের লাল দাগ বসে গেল।
"সম্পত্তি?" আদিয়ান আরেক ধাপ কাছে এসে ফারিহার একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। তার গরম, মাতাল করা নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছিল ফারিহার হিম হয়ে যাওয়া ঘাড় আর কানের লতিতে। "সম্পত্তি তো হারিয়ে গেলে আবার কেনা যায়, ফারিহা। তুমি আমার রক্তে মেশা এক বিষাক্ত, মরণঘাতী নেশা। তুমি আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস। আর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কি কোনো মানুষ বেঁচে থাকতে পারে? বলো?"
ফারিহার বুকের ভেতরে হৃদপিণ্ডটা এত জোরে আছাড় খাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল পাঁজরের হাড়গুলো এখনই ভেঙে শত টুকরো হয়ে যাবে। সে চোখের কোণ দিয়ে দেখল দূরে নার্সদের ডিউটি ডেস্কে দু-একজন ব্যস্ত ভঙ্গিতে ফাইল নাড়াচাড়া করছে, কিছু দূরে একজন ওয়ার্ড বয় ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকে কারও কাছে সাহায্য চাওয়ার মানসিক জোরও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, বাইরের মানুষের কাছে আদিয়ান একজন আদর্শ, মেধাবী ডাক্তার, এক অত্যন্ত সম্মানিত চৌধুরী পরিবারের রক্ত—আর সে কেবল এক উন্মাদ, সাইকোপ্যাথ ভাইয়ের চোখ ফাঁকি দিতে না পারা এক অসহায় শিকার। তার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, উল্টো আদিয়ান তাকে পাগল প্রমাণ করে দেবে।
"ওকে বাঁচতে দাও, আদিয়ান ভাইয়া... প্লিজ," ফারিহা দুই হাত জোড় করার ভঙ্গিতে আকুতি-মিনতি করল। চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রুধারা ঝরছিল তার। "আমি কথা দিচ্ছি, আমি আর কখনো সায়ানের সাথে দেখা করব না। ওর সামনে যাব না, কোনোদিন একটা মেসেজ বা ফোনও করব না। তুমি যা বলবে আমি তা-ই শুনব। তুমি যেখানে থাকতে বলবে আমি ঠিক সেভাবেই থাকব। প্লিজ, আইসিইউ এর ভেতরে থাকা ওই অসহায় মানুষটার ওপর আর কোনো অত্যাচার কোরো না! ওকে অন্তত সুস্থ হয়ে নিজের মায়ের কোলে ফিরে যেতে দাও!"
আদিয়ানের মুখের সেই অন্ধকার, থমথমে ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, বিকৃত তৃপ্তি। ফারিহার এই ভীতি, এই হাঁটু মুড়ে বসে পড়া অসহায় আত্মসমর্পণ—এটাই তো সে দেখতে চেয়েছিল বহু দিন ধরে।
সে ফারিহার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা সোজা নিজের দিকে তুলে আনল। ফারিহার লাল হয়ে যাওয়া চোখের ভেজা মণি দুটোতে নিজের হিংস্র চোখ জোড়া রাখল সে।
"গুড গার্ল," আদিয়ান মিটিমিটি হেসে ফারিহার ভিজে থাকা কপালে একটা হালকা চুমু খেল। সেই বিষাক্ত স্পর্শে ফারিহার পুরো শরীর চরম ঘৃণায় ও বিজাতীয় অনুভূত্যে শিউরে উঠল, গা গুলিয়ে এল তার।
"এই তো আমার শান্ত, সুন্দর ফারিহা। তবে মনে রেখো সোনা, কথা দিয়ে কথা না রাখার মাশুল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটা ছোট ডেমো আজ সায়ানকে দিয়ে দেখালাম। পরের বার ভুলটা যদি আবার তোমার হয়, কিংবা আমার কথা না শুনে অন্য কারও দিকে তাকাও—তখন সেই মাশুলের শাস্তিটা কিন্তু সায়ানের গায়ে নয়, সরাসরি তোমার নিজের ওপর এসে পড়বে। তখন কিন্তু কাঁদার কিংবা ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকুও পাবে না।"
আদিয়ান ফারিহার হাতের কবজি ছেড়ে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা সুগন্ধি রেশমি রুমাল বের করে অত্যন্ত যত্ন সহকারে নিজের আঙুলগুলো মুছল, যেন ফারিহাকে স্পর্শ করার পর তার হাতে অদৃশ্যের কোনো ময়লা বা ধুলো লেগেছে।
"এখন চল, বাসায় ফিরতে হবে। চৌধুরী ভিলার সবাই নিশ্চয়ই ভাবছে আমরা কেন এত দেরি করছি। গাড়ি নিচে ওয়েট করছে। আর হ্যাঁ, বাবাকে গিয়ে কী বলতে হবে তা নিশ্চয়ই নতুন করে আর বলে দিতে হবে না? সায়ানের গাড়িটা আনকন্ট্রোলড হয়ে ব্রেক ফেল করেছিল... ব্যাস, গল্প এটুকুই।"
ফারিহা কোনো কথা বলতে পারল না। কেবল এক যান্ত্রিক পুতুলের মতো মাথা নাড়ল। সে জানে, এই মুহূর্তে আদিয়ানের আদেশের বাইরে যাওয়া মানে আইসিইউ-তে থাকা সায়ানের লাইফ সাপোর্টটা চিরতরে অফ করে দেওয়া। এই নির্দয়, হূদয়হীন মানুষটা মুখের এক পলকের ইশারায় তা করে ফেলতে পারে।
রাত তখন প্রায় পৌনে তিনটা। চৌধুরী ভিলার চারপাশ এক থমথমে, রহস্যময় নিস্তব্ধতায় নিথর হয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই যে এই বিশাল, দামি প্রাসাদের উঁচু দেওয়ালগুলোর পেছনে কত বড় একটা নরক আর অন্ধকার শক্তি রাজত্ব করছে।
ফারিহা তার ঘরের বিছানায় হাঁটু দুটো বুকের সাথে জড়িয়ে নিঃশব্দে জড়সড় হয়ে বসে ছিল। ঘরের ভেতরের বড় লাইটগুলো নেভানো, কেবল জানালার ভারী রেশমি পর্দা ভেদ করে বাইরের চাঁদের ফ্যাকাশে, রূপালী আলো এসে পড়েছে কাঠের পালিশ করা মেঝের ওপর। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের বিচ্ছুরিত, লাল হয়ে যাওয়া করুণ চোখ দুটি দেখতে পাচ্ছিল সে। কয়েক ঘণ্টা আগে হসপিটালে ঘটে যাওয়া প্রতিটা দৃশ্য, আদিয়ানের ভয়াল কণ্ঠস্বর তার মাথার ভেতর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে বারবার।
সে ভেবেছিল কলেজ শেষ করে সে নিজের মতো একটা মুক্ত, স্বাধীন জীবন গড়ে তুলবে, তার নিজস্ব একটা ভালোবাসার আকাশ থাকবে। কিন্তু আদিয়ান যে সেই আকাশের চারপাশ জুড়ে বহু আগেই এক অদৃশ্য, ধারালো কাঁটাতার বুনে রেখেছে, তা সে ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি। এই ঘর, এই পরিবার—সবই যেন তার জন্য একটা সুন্দর সাজানো জেলখানা।
হঠাৎ নীরবতা চিরে ঘরের দরজার স্টিলের হ্যান্ডেলটা একদম নিঃশব্দে ঘুরে উঠল।
ফারিহা চমকে উঠে মুহূর্তের মধ্যে বিছানায় শক্ত হয়ে বসে পড়ল। ডোর লকের কোনো শব্দ হয়নি, কেবল দরজার মেহগনি কাঠের ভারী পাল্লাটা ধীরে ধীরে ফাঁক হলো। অন্ধকার চিরে ভেতরে প্রবেশ করল একটা দীর্ঘ, সুগঠিত অবয়ব।
আদিয়ান।
চিকিৎসকের অ্যাপ্রনটা এখন আর তার গায়ে নেই। পরনে একটা আলগা কালো ক্যাজুয়াল শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা থাকায় তার চওড়া বুকের একাংশ স্পষ্ট। চুলগুলো খানিকটা উসকোখুসকো, কপালে এসে পড়েছে চঞ্চলা কটা চুল, কিন্তু চোখের সেই ভয়ংকর স্থিরতা ও পৈশাচিক হিংস্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি।
"তুমি... তুমি এই ঘরে কেন?" ফারিহা পিছাতে পিছাতে দেয়ালের কাঠামোয় গিয়ে ঠেকে গেল। তার গলার স্বর কাঁপছিল তীব্র আতঙ্কে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে আবার। "রাত অনেক হয়েছে, আদিয়ান ভাইয়া। নিচে আব্বু-আম্মু ঘুমাচ্ছে..."
"তারা ঘুমাচ্ছে, তাই তো পরিবেশটা এত সুন্দর, নীরব আর নির্জন," আদিয়ান ধীরপায়ে হেঁটে বেলকনির দরজার দিকে গেল। পর্দাগুলো টেনে কাঁচের ভারী দরজাটা ভেতর থেকে চিরতরে লক করে দিল সে, যাতে ভেতরের কোনো ক্ষীণ শব্দও বাইরের বাতাসে না পৌঁছায়। "আর তাছাড়া, আমার নিজের ঘরে আসতে কার অনুমতি লাগবে, বল তো ফারিহা?"
"এটা আমার ঘর!" ফারিহা নিজেকে সামলে নিয়ে একটু জোর গলায় প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল।
"তোমার?" আদিয়ান এক অদ্ভুত, উপহাসের ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। সে হেঁটে গিয়ে ফারিহার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ফারিহার পিঠ ততক্ষণে দেয়ালের শক্ত কংক্রিটে ঠেকে গেছে, পালানোর আর কোনো মিলিমিটার জায়গাও অবশিষ্ট নেই। আদিয়ান তার দুই হাত ফারিহার দুপাশে শক্ত দেয়ালে রাখল, তাকে পুরোপুরি নিজের চওড়া বাহু আর দীর্ঘ শরীরের খাঁচার মধ্যে বন্দি করে ফেলল।
আদিয়ানের শরীর থেকে ভেসে আসছিল উগ্র পারফিউম আর কড়া তামাকের এক দমবন্ধ করা মিশ্র গন্ধ, যা ফারিহার মাথাব্যথা বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
"এই ঘর, এই অভিজাত চৌধুরী ভিলা, এমনকি তোমার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস আর অনুভূতির ওপর কেবল আদিয়ান চৌধুরীর চিরস্থায়ী মালিকানা। আর এই চৌধুরী ভিলা একদিন পুরোপুরি আমার হবে। যার সহজ অর্থ দাঁড়ায়... তুমিও আমার। শুধুই আমার। অন্য কেউ তোমার দিকে তাকানোর সাহস করলেও সে ছাই হয়ে যাবে।"
আদিয়ান ফারিহার ঘাড়ে আর উন্মুক্ত গলায় মুখ নামিয়ে এক দীর্ঘ, গভীর নিঃশ্বাস নিল।
ফারিহার শরীর চরম ঘৃণায় ও আতঙ্কে তীব্রভাবে রি-অ্যাক্ট করে উঠল। সে আদিয়ানের বুকে দুই হাত দিয়ে তার সমস্ত শরীরি শক্তি এক করে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আদিয়ান যেন কোনো এক বিশাল পাথর খণ্ডের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক ইঞ্চিও নড়ল না, বরং তার ঠোঁটের কোণে উপহাসের হাসি আরও স্পষ্ট হলো।
"আমাকে ছোঁবে না!" ফারিহা দাঁতে দাঁত চেপে গজে উঠল। চোখের নোনা পানিতে ঢেকে ফেলল তার পুরো দৃষ্টি। "আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আদিয়ান! আমি সত্যি সত্যি তোমাকে আমার জীবনের চেয়েও বেশি ঘৃণা করি! প্রয়োজনে আমি মরে যাব, বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব, কিন্তু তোমার এই অসুস্থ, পাগল আর সাইকোপ্যাথ মানসিকতার কাছে কখনো হাঁটু নোয়াব না!"
ফারিহার মুখে 'ঘৃণা' শব্দটা শোনামাত্রই আদিয়ানের শান্ত চেহারার কৃত্রিম মোড়কটা এক সেকেন্ডের মধ্যে ছাই হয়ে গেল। তার কালো চোখে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক, দানবীয় আলো। সে এক নিমেষে হাত বাড়িয়ে ফারিহার চিবুক ও চোয়াল এত তীব্র শক্তিতে চেপে ধরল যে ফারিহার মনে হলো তার কানের পেছনের হাড়গুলো এখনই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে। যন্ত্রণায় তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
"ঘৃণা?" আদিয়ান নিচু, থমথমে আর বরফের মতো ঠান্ডা স্বরে বলল, তার কণ্ঠের গাম্ভীর্য ঘরে থাকা নিস্তব্ধ দেওয়ালগুলোকে যেন কাঁপিয়ে দিল। "তোমার এই ঘৃণাকে আমি উন্মাদ ভালোবাসায় পরিণত করব, ফারিহা। প্রয়োজনে আমি তোমার ডানাদুটো একে একে ভেঙে গুড়িয়ে দেব, যাতে তুমি কখনো আমার সীমানা ডিঙিয়ে অন্য কোথাও ডানা মেলে উড়ার দুঃস্বপ্নও দেখতে না পারো। তুমি শুধু আমার সীমানাতেই বন্দি থাকবে... তা যত নিষিদ্ধই হোক না কেন, তুমি কেবল আমার!"
কথাগুলো শেষ করেই আদিয়ান তার শার্টের পকেট থেকে একটা ভারী, চকচকে রৌপ্য রঙের মেটালিক রিং বের করল। রিংটার ওপর চমৎকার কারুকার্য করা একটা ক্ষুদ্র লকের চিহ্ন নিখুঁতভাবে খোদাই করা। সে ফারিহার হাতটা জোর করে টেনে নিজের দিকে আনল এবং ফারিহার তীব্র বাধা দেওয়া সত্ত্বে নিজের হাতের শক্তিতে তার অনামিকাতে রিংটা গলিয়ে দিল। আংটিটি ফারিহার আঙুলে এক ইঞ্চি জায়গা না রেখে একদম শক্ত হয়ে আটকে গেল, যেন চামড়ার সাথে মিশে গেছে।
"এটা... এটা কী?" ফারিহা তীব্র যন্ত্রণায় হাঁপাচ্ছিল, হাতের আঙুলটা অসাড় আর নীল হয়ে আসছিল তার।
"এটা আমার দেওয়া ভালোবাসার শিকল," আদিয়ান ফারিহার রিং পরানো আঙুলটা ঠোঁটের কাছে তুলে নিয়ে এক দীর্ঘ, বরফশীতল চুমু খেল। "আজ থেকে এই আংটি তোমার অনামিকাতেই শোভা পাবে। এটি খোলার বা হাত থেকে খুলে ফেলে দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলে... সায়ানের এক্সিডেন্টের খবরটা পরের দিন মর্গের শেষ পাতায় ছাপা হওয়া লাশের নিউজ হয়ে যাবে। মনে থাকবে তো, আমার লক্ষ্মী সোনা?"
ফারিহা আর কোনো শব্দ করতে পারল না। তার শরীরের সমস্ত জীবনীশক্তি যেন এক নিমেষে কোনো অদৃশ্য নলে শুষে নেওয়া হয়েছে। সে নির্জীব এক মাটির পুতুলের মতো দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।
আদিয়ান তার অসহায়, বিধ্বস্ত চেহারার দিকে কিছুক্ষণ এক বিকৃত তৃপ্তি আর অহংকারের সাথে তাকাল। তারপর পকেটে হাত গুঁজে ঘরের একমাত্র ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকার নেমে এল চারপাশে। ঘরের ভারী দরজা খুলে সে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে গেল এবং যাওয়ার সময় বাইরে থেকে চাবি দিয়ে নিঃশব্দে দরজাটা লক করে দিয়ে গেল।
অন্ধকার ঘরের ঠান্ডা মেঝের ওপর ফারিহা ধপাস করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তার চোখের পানির ঝরনা থামার কোনো লক্ষণ নেই। সে নিজের অনামিকার সেই ভারী, ঠান্ডা মেটালিক রিংটার দিকে হাত বাড়িয়ে তাকাল। আংটির ধাতব স্পর্শটা যেন তাকে প্রতি সেকেন্ডে মনে করিয়ে দিচ্ছে—সে আজ সত্যি সত্যি এক জ্যান্ত গোরস্তানে চিরতরে বন্দি হয়ে গেছে, যেখান থেকে পালানোর সব পথ আদিয়ান নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছে। আর এই নরকের একমাত্র ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর রক্ষক—আদিয়ান চৌধুরী!
চলবে......