ডিসেম্বরের শহরে
লেখক:সবুজ আহম্মদ মুরসালিন।
আকাশ আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে শারীরিকভাবে অনেকটাই সুস্থ তবু মনটা তার ভারী যেন কোথাও কিছু ফেলে এসেছে সে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েও মনে হচ্ছে একটা অদৃশ্য টান তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে বুকের ভেতরে অজানা শূন্যতা যেন কেউ নিঃশব্দে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে এক অজানা শূন্যতা তার বুকে বেঁধে আছে। নীলার সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। সে জানে না কেন? সেই দিনটার পর নীলা আর ছাদে আসেনি। নীলাকে যে কবিতাগুলো শোনাবে বলে সে বাছাই করে রেখেছিল সেগুলো আর শোনাতে পারেনি। আকাশ প্রতিদিন অপেক্ষা করেছে। ছাদের দোলায় বসে থেকেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু নীলা আসেনি। অবশেষে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে নীলা হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে। খবরটা শুনে আকাশ থমকে যায়। বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। নীলা কি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে? নাকি অন্য কোন কারণ আছে? হঠাৎ চলে যাওয়ার পেছনে? প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমে ওঠে তার মনে। কিন্তু কোন উত্তর নেই কোথাও। নীলার সম্পর্কে জানার জন্য আকাশ নার্সদের জিজ্ঞেস করেছে। রিসেপশনের মেয়েটির কাছেও অনেক চেষ্টা করেছে কিছু জানতে। কিন্তু কেউই বিশেষ কিছু বলতে পারেনি। শুধু জেনেছে জাহানারা হাসপাতালের মালিক নীলার বাবা। আর তার মায়ের নাম জাহানারা। দুইদিন কেটে গেছে ছাড়পত্র পাওয়ার পর। আকাশ এখন অনেকটা সুস্থ। কিন্তু মানসিকভাবে অস্থির। নীলার সঙ্গে তার আবার দেখা হবে কিনা সে জানে না। তবুও সে হাল ছাড়েনি। প্রতিদিনের মতো আজ বিকেলেও বাসা থেকে বেরিয়ে আবার হাসপাতালে যায় আকাশ। ঘুরে ঘুরে চেনা করিডর গুলো দেখে। ছাদের দিকে তাকায় রুম নম্বর 302 এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কিন্তু নীলা আর সেখানে নেই। চাহাতে অনেকক্ষণ বসে থাকে। শুধু যদি একবার নীলার দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু ভাগ্য তাকে সে সুযোগ দেয় না। হাসপাতালের দারোয়ানের সঙ্গে তার ভালো খাতির হয়ে গেছে। প্রায়ই তারা একসঙ্গে চা নাস্তা খায়। গল্প করে দারোয়ানের কাছ থেকে হাসপাতাল ডাক্তার আর মালিকের নানা খবর জেনেছে আকাশ। একদিন সাহস করে সে দারোয়ানকে বলে, ভাই হাসান সাহেবের বাসার ঠিকানাটা যদি বলতে পারেন, দারোয়ান জানায় সে এখানে নতুন এসেছে। তাই ঠিকানা জানে না। তবু আকাশ হাল ছাড়ে না। চুপচাপ পকেট থেকে একটা 1000 টাকার নোট বের করে দারোয়ানের হাতে বুঝে দিয়ে বলে, চেষ্টা করবেন ভাই প্লিজ। আমার খুব দরকার। দারোয়ান একটু অবাক হয়ে তাকায়। তারপর মাথা নেড়ে বলে ঠিক আছে ভাই দেখি কি করা যায় সন্ধ্যার পর থেকেই ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে আকাশ নিজের হাতে চা বানিয়ে গায়ে উষ্ণ চাদর জড়িয়ে চলে এলো ছাদে ছাদে পা রাখতেই তার নাকে এলো ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ সে তাকিয়ে দেখল গাছ ভর্তি ফুল ফুটে আছে মুহূর্তে তার মনটা ভালো হয়ে গেল সে ছাদের পূর্ব দিকে বসল হাতে ধোয়া ওঠা চায়ের কাপ এক চুমুক দিতেই চোখের তৃপ্তির ঝিলি নিজের কাছে বলে উঠল আকাশ আজ তুই সত্যিই দারুন চা বানিয়েছিস। কিছুক্ষণ পর আবিরও ছাদে এলো। তারও হাতে এক কাপ চা। পাশে বসে বলল, আজ তুই অস্থির চা বানিয়েছিস। এমন চা অনেকদিন পর খেলাম। আকাশ শুধু হেসে উঠল। কিছু বলল না। তার নীরবতা দেখে আবির জিজ্ঞেস করল। নীলার কথা ভাবছিস? আকাশ মৃত স্বরে উত্তর দিল। মেয়েটা এভাবে চলে গেল। আমি বিষয়টা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এখন কি করবি তুই? খুঁজে বের করব। যেভাবেই হোক নীলাকে আমি খুঁজে বের করবই। খুঁজে বের করা কি খুব জরুরি? নীলার সঙ্গে একবার হলেও দেখা করতে চাই। আকাশ বিরক্ত সুরে বলল, দেখা করে কি হবে বলতো? আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, দুইদিন ধরে কাকে কি বুঝাইলাম আমি। আকাশ কিছুটা চিন্তিত গলায় বলল, আমি জানি। একটু বেশি বেশি করছি। কিন্তু কেন করছি সেটা জানিনা। শুধু নীলার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছে। চোখ বন্ধ করলেই নীলার মুখ ভেসে ওঠে। আমার কেন জানি মনে হয় আমি নীলাকে চিনি। হয়তো নীলাকে আমি এতদিন ধরে খুঁজছি। আকাশ থেমে আবার বলে আমি শুধু নীলাকে একবার দেখতে চাই। তুই কি বলছিস তুই জানিস? একদম পাগলের মত আচরণ করছিস। আমি জানি আমি কি করছি। আকাশ থেমে আবার বলল, নীলার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে আমার আর দুঃস্বপ্ন আসে না। রাতে কেউ এসে বলে না তুমি কে? আমাকে কি ভুলে গেছো? আমার মাথা ব্যথা নিয়েও ঘুম ভাঙ্গে না। এসবের মানে কি জানিস? আমার মনে হয় আমার সব প্রশ্নের উত্তর নীলার কাছেই আছে। হারিয়ে ফেলা স্মৃতিতে নীলা কোন না কোন ভাবে আছে। আমাকে শুধু খুঁজে বের করতে হবে নীলাকে। আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তুই কেবল অবাস্তব কল্পনা করছিস আকাশ। তোর কেবল এসব মনে হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এমন না। আমি বলি এসব বাদ দে। আকাশ বাধা দিয়ে বলল, আমি জানি তুই কি বলবি। গত দুইদিন ধরে একই কথা বলছিস। এবার বিষয়টা আমার উপর ছেড়ে দে। আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা তোর যা ভালো মনে হয় তাই কর। আমি আর কিছু বলবো না। আবিরের কন্ঠে ছিল পরাজয়ের সুর। সে জানে আকাশকে আর বোঝানো যাবে না। তবু তার মনে প্রশ্ন গরবাখায়। সে কি আকাশকে সবটা বলে দেবে নাকি চুপ থাকবে? নিয়তে কেন আবার ওদের মুখোমুখি করল? আকাশের যদি সব মনে পড়ে যায় তাহলে কি হবে? ভাগ্য এত নিষ্ঠুর কেন? আবির মনে মনে বলল, রাত ঘনিয়ে এল। যাওয়ার আগে আবির বলে গেল, বেশি রাত পর্যন্ত বাইরে থাকবি না। এখন ঠান্ডাটা অনেক বেড়ে গেছে। কুয়াশায় বাইরে থাকা ভালো না। আবির চলে গেলে আকাশ একা ছাদে বসে রইল। হাসপাতালের দিকের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল সে। বাতাসে দোল খাচ্ছে পুরনো দোলনাটা। হঠাৎ তার মনে হলো সেখানে নীলা বসে আছে। চুপচাপ মৃদু হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আকাশ অচেতনভাবে শুনতে পেল। নীলা বলছে কেমন আছেন? আমি ভালো আছি। আপনার তো কোন খোঁজ নেই। মানুষ হারিয়ে যেতে ভালোবাসে। কিন্তু সে কি জানে? তার হারিয়ে যাওয়াতে অন্য কেউ কষ্ট পেতে পারে? সে জানে। তবুও মানুষ হারিয়ে যায়। কিন্তু কেন? আমরা কোন কিছুর মূল্য ততক্ষণ বুঝি না যতক্ষণ না সেটা হারিয়ে ফেলি। হারানোর ভয় পাই। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছা করে হারিয়ে যায় তাকে কিভাবে খুঁজে পাবো? যদি মন থেকে খুঁজেন তবে সারা দুনিয়া সেই মানুষটাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে। শুধু মন থেকে চাইতে হয় আর বিশ্বাস রাখতে হয়। আমি তো মন থেকেই চাই। তবুও যদি খুঁজে পেতে দেরি হয়ে যায় তখন ভেবে নেবেন আপনার চাওয়াটা যথেষ্ট ছিল না। আপনি যতটুকু চেয়েছেন হয়তো তার চেয়ে অধিক চাওয়ার দরকার ছিল। এই কথাগুলোর পর আকাশ আর নিজের সঙ্গে কথা বলে না। বাতাস একটুখানি নিস্তব্ধতা নেমে এল। দূরে কোথাও পাখির করুণ ডাক ভেসে এলো। যেন গভীর কোন বেদনা মিশে আছে তাতে। সেই শব্দ তার বুকের ভেতর ঢুকে গেল। নরম অথচ তীব্রভাবে। পাখির মত করুণ সুরে তারও এখন ডাকতে ইচ্ছে করছে। যে ডাক নীলার কাছে পৌঁছা যাবে। নীলাকে বার্তা দিবে সে ভালো নেই। সে তাকে মনে করছে। ভীষণ রকমভাবে তার কথা মনে পড়ছে। তার মন পুড়ছে। কিন্তু সে তো পাখি না। সে মানুষ। আর মানুষ যা চায় অধিকাংশ সময় তা করতে পারে না। আকাশে প্রচন্ড শীত করছে। গায়ের চাদর জড়ানো থাকলেও যেন ঠান্ডা হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে। শেষমেষ সে ছাদ থেকে উঠে রুমে ফিরে এল। রুমে পা রাখতেই বাইরের ঠান্ডা আবহাওয়া যেন মিলিয়ে গেল। হালকা উষ্ণতা স্পর্শে শরীর কিছুটা আরাম পেলেও তার চোখে ঘুম নেই। সে দুই রাত ঘুমায়নি। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সে বিছানায় গায়ে এলিয়ে দিল। ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে কম্বল জড়িয়ে নিল গায়ে। চোখ বন্ধ করলে একের পর এক ভাবনা মাথায় ভিড় জমায়। কাল তার অনেক কাজ। সবকিছু মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে। তবুও মনটা স্থির হচ্ছে না। ঘুমের আগে একটা কথাই বারবার কানে বাজছে যেন কেউ তাকে ফিসফিস করে বলছে। কোন কিছু মন থেকে চাইলে পুরো দুনিয়া সেটা পেতে সাহায্য করে। জাহানার ঘুম ভাঙলো কলিং বেলের শব্দে। সে ঘুম ঘুম ছোকে দরজা খুলে দেখে নীলা দাঁড়িয়ে আছে। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। যেন বোঝার চেষ্টা করছে এটা কোন স্বপ্ন নয় তো? নীলা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মৃদুস্বরে বলল, মা এক কাপ চা বানিয়ে দিতে পারবা? জাহানারা বিশ্বয়ের ঘোর কাটিয়ে হেসে বলল, তুই ফ্রেশ হয়ে রুমে বস। আমি চা বানিয়ে আনছি। তবু তার কৌতুহল কিছুতেই কাটছিল না। নীলার চোখ লাল। ফুল আস্পষ্ট বোঝা যায় সে কেঁদেছে। নীলা জিজ্ঞেস করল, আমার রুমটা কি পরিষ্কার আছে? জাহানারা হেসে উত্তর দিল, তুই খেলেই দেখতে পাবি। জাহানারা রান্নাঘরে এসে জানালাটা খুলে দিল। সকালে রোদ এসে ঘরে ঢুকে নরম আলো ফেলল তার মুখে। সে পানি বসিয়ে দিল চুলায়। জাল কমিয়ে দিল। তারপর হাত মুখ ধুয়ে নিল। পানি আজ একটু বেশি ঠান্ডা লাগছিল। মনে মনে ভাবলো শীত আগেই চলে এল। সে আলমারি থেকে একটা তোয়ালের পুরনো চাদর বের করে গেল নীলার ঘরে। কিন্তু রুমে গিয়ে দেখে নীলা নেই। তোয়ালেও চাদর টেবিলে রেখে সে আবার ফিরে এলো রান্নাঘরে। এদিকে পানি তখন ফুটে উঠেছে। আদা, এলাচ, দারুচিনি আর লবঙ্গ দিয়ে জাহানারা বানাতে লাগলো করা লিকারের চা। যেমনটা নীলা পছন্দ করে। চায়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো পুরো ঘরে। অনেকদিন পর সে মেয়ের জন্য এমন করে চা বানাচ্ছে। ভেবে তার মনটা হালকা হয়ে গেল। কিন্তু আনন্দের ভেতরে এক অজানা উদ্বেগ। নীলার কি হয়েছে? এভাবে বাড়ি ফিরে এলো কেন? জাহানার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন। কিন্তু সে জানে নীলার কাছ থেকে কথা বের করা যুদ্ধে জেতার চেয়েও কঠিন। এদিকে নীলা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। টেবিলে রাখা পুরনো চাদরটা চোখে পড়তে থমকে গেল সে। চাদরটা তার প্রিয়। কারণ এক ডিসেম্বরে এক প্রিয় মানুষ এই চাদরই উপহার দিয়েছিল তাকে। মুহূর্তে পুরনো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠলো। কিন্তু সে জোর করে সামনে নিল নিজেকে। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে রুমটা ঘুরে দেখল। যেভাবে রেখে গিয়েছিল এখনো ঠিক সেভাবেই আছে। কোন কিছু নড়েনি। বুকশেলফে বইগুলো সেভাবে সাজানো। মা রুমটা ঠিক আগের মতোই রেখেছে। এই ভেবে নীলার মনে একরাশ মমতা জন্ম নিল। হঠাৎ একটা বইয়ের দিকে তার দৃষ্টি আটকে গেল। বইটা তুলে প্রথম পৃষ্ঠা খুলতেই দেখা গেল কালো কালির অক্ষরে লেখা। প্রিয় নীলা তোমাকে পেলে আমার সব পাওয়া হয়ে যাবে। বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠলো নীলার। ঠিক তখনই জাহানার পায়ের শব্দ শুনে সে তাড়াতাড়ি বইটা বন্ধ করে আগের জায়গায় রেখে দিল। জাহানারা রুমে ঢুকে চায়ের কাপটা মেয়ের হাতে দিল। আমি বিস্কুট নিয়ে আসছি। একটুখানি অপেক্ষা কর। সে দ্রুত হেঁটে বের হয়ে গেল। নীলা চায়ে চুমুক দিল। চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল। আহ কি অপূর্ব স্বাদ। বহুদিন পর মায়ের হাতের চা। চায়ের উষ্ণতা যেন বুকের গভীরে নেমে গেল। চোখের কোণ ভিজে উঠলো অজান্তেই। মনে মনে সে প্রার্থনা করল। আল্লাহ আমাকে একটু সময় বাড়িয়ে দিও। এত এত মায়া ভালোবাসা ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না। আমি বাঁচতে চাই। দুঃখ পেলে কাঁদতে চাই। আনন্দে মন খুলে হাসতে চাই। ধার আপন মানুষগুলোকে ভালোবাসতে চাই। বিস্কুট হাতে ফিরে এসে জাহানারা মেয়ের চোখে জল দেখে থমকে গেল। পাশে বসে নরম গলায় বলল, তোর মন খারাপ। নীলা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল, আমাকে একবার তোমার বুকের মধ্যে চড়িয়ে নিবে মা। নীলা ভেজা কন্ঠে বলল, এক মুহূর্ত দেরি না করে জাহানারা হাত বাড়িয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিল। জাহানার চোখেও পানি। মিশে গেল দুজনার চোখের জল। টপটপ করে চোখের কান নিশ্চুয়ে পানি পড়ছে। নীলা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। হাওমাউ করে কেঁদে উঠলো। মা মেয়ে এভাবেই একে অপরের বুকের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে রইল। দীর্ঘ সময়। শেষমেষ কান্নায় ক্লান্ত নীলা মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়ল। জাহানারা কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইল। মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। নীলাকে শুইয়ে দিয়ে সে তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দুদিন আগের নীলার আজকের নীলা এক নয়। কি যেন বদলে গেছে তার ভেতরটা। মায়ের বুক ভরে উঠলো অজানা আশঙ্কায়। আলতো করে নীলার কপালে একটা চুমু দিয়ে সে চুলগুলো কানে গুছে দিল। চোখের কোনে জল জমলেও এবার সে কাঁদলো না। শুধু গভীর মমতায় তাকিয়ে রইল মেয়ের মুখের দিকে। যেন এই মুহূর্তটা চিরস্থায়ী করে রাখতে চায়। নীলার ঘুম ভাঙলো দুপুরে। অনেকদিন পর বাসায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে সে। উঠে ফ্রেশ হয়ে যখন খাবার টেবিলে এলো দেখে টেবিলটা ভরে আছে তার প্রিয় সব খাবারে। খিচুড়ি বেগুন ভাজা ইলিশ মাছের ঝোল সঙ্গে টক ডাল নিলাম মৃদু হাসলো কিন্তু খাওয়ার সময় বুঝলো তার খিদে খুব একটা নেই এখন আর কিছুই ঠিকভাবে খেতে পারে না সে খিদে নামের অনুভূতিটাই যেন হারিয়ে গেছে কেবল বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু না খেলে নয় ততটুকুই খায় এর বেশি নয় খাওয়া শেষ করে সে ধীরে ধীরে পুরো বাসাটা ঘুরে দেখল কয়েক মাসের ব্যবধানে বাসায় অনেক পরিবর্তন এসেছে নতুন পর্দা বদলে যাওয়া আসবাব দেওয়ালের কয়েকটা নতুন ছবি তবু এসব দেখে তার ভেতরে কোন উত্তেজনা কাজ করলো না। মনে মনে ভাবলো জীবন ঠিক সময়ের মতোই। কখনো থেমে থাকে না। সবসময় এগিয়ে যায়। বিকেলের দিকে নীলা ছাদে গেল। ছাদটা অনেকটা অগোছালো। টবে ডটবে আগাছা শুকিয়ে যাওয়া ফুল গাছ। একসময় ছাদই ছিল তার প্রিয় জায়গা। সে হেঁটে দক্ষিণ পাশে গিয়ে থামলো। ওখানে শিউলি গাছটা প্রায় মরে গেছে। শাখাগুলো শুকিয়ে ধুষর হয়ে আছে। নীলার বুকটা হালকা ব্যথা করল। মনে মনে বলল, অযত্নে গাছও মরে যায় মানুষের মতোই। আর ছাদে তার মন টিকলো না। ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। ড্রইং রুমে এসে দেখে মা বসে আছে সোফায়। আজ সারাদিন মায়ের সঙ্গে তেমন একটা কথা হয়নি। ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আর মন চায় না এড়িয়ে যেতে। সে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। তোমার শরীর কেমন আছে মা? জাহানারা মমতার হাসি হেসে বলল, আমি ভালো আছি। তুই এখন ঠিক আছিস? মনটা একটু ভালো হয়েছে? হুম। আমি ভালো আছি নেহা কোথায় টিউশনিতে গেছে আসবে কখন বলে যায়নি কেন না এমনি জিজ্ঞেস করলাম ছাদে শিউলি গাছটা মরে গেছে ভাবছিলাম একটা চারা নিয়ে আসতে বলব আচ্ছা আমি এখনই ফোন করে বলি না দরকার নেই আমি নিজেই একদিন গিয়ে নিয়ে আসব জাহানারা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল তোর শরীর ঠিক আছে মাথা ব্যথা আছে আমি ভালো আছি মা চিন্তা করোনা বাসায় কয়দিন থাকতে চাস যতদিন ইচ্ছে করে থাকি এটা কেমন কথা রে? আমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন? আমি তো চিরদিনই চাই তুই বাসায় থাক। দরকার হলে তোর বাবাকে বলব গেস্ট রুমটা হাসপাতালের মত করে সাজিয়ে দিক। এত বাড়াবাড়ি করতে হবে না। যদি এসব করো আমি আজই চলে যাব। আচ্ছা আচ্ছা করছি না। তুই এমন রাগ করিস না। আচ্ছা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জাহানারা বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? নীলা বুঝে গেল মা কি বলতে চায় তবু শান্ত স্বরে বলল হ্যাঁ করো তুই আজ হঠাৎ ভোরে বাসায় চলে এলি কিছু কি হয়েছে কি হবে নীলা পাল্টা প্রশ্ন করে আমি কি করে জানবো তুই জানিস তো তোর ভেতরে কি চলছে নীলা একটুখানি থেমে বলল মা তুমি চিন্তা করো না আমার কিছু হয়নি হাসপাতালে ভালো লাগছিল না অনেকদিন ঘুম হয় না গতকাল সারারাত জেগে কাটিয়েছি ভোরে ভাবলাম কয়েকদিনের জন্য বাসায় গিয়ে থাকি তোমার আদরটা পাই। নলা হেসে উঠলো কিন্তু সে হাসিতে কোন প্রাণ নেই। জাহানারা হাসির ভেতরে লুকানো ক্লান্তি চিনে ফেলল। তবু কিছু বলল না। সে জানে নলা কিছু একটা লুকাচ্ছে। কিন্তু এখন জোর করে প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। তার চেয়ে ভালো মেয়েটা যেন অন্তত কিছুদিন শান্তিতে থাকে। নীলা বাসায় এসেছে এতেই সে খুশি। নীলা হঠাৎ বলল মা গরম গরম পাকোড়া বানাও না খেতে ইচ্ছে করছে জাহানারা মৃদু হেসে বলল কি দিয়ে বানাবো তোমার যা দিয়ে ইচ্ছে তাই দাও আচ্ছা আমি এখনই বানিয়ে আনি জাহানারা রান্নাঘরে চলে গেল নীলা রুমে গিয়ে একটা বই তুলে আনলো বুকশেল থেকে জানালার পাশে বসে পড়তে শুরু করল ঘরে তখন হালকা বাতাস বইছে রান্নাঘরে মৃদু শব্দ চলছে চায়ের ফুটন্ত পানিশো আওয়াজ কিছুক্ষণ পর জাহানারা গরম গরম পাকোড়া আর চা নিয়ে এল ট্রেতে সাজিয়ে। ঠিক তখনই দরজায় কলিং বেল বাজলো। নীলা বইটা টেবিলে রেখে দরজার দিকে গেল। দরজা খুলতেই দেখে নিহা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তিনটা আইসক্রিমের প্যাকেট। নিহা হাসতে হাসতে বলল, সবার জন্য এনেছি। আজ সন্ধ্যাটা মিষ্টি করে কাটবে। নিলা হেসে ওর হাত থেকে আইসক্রিম নিয়ে ভেতরে ঢুকল। জাহানারা ইতমধ্যেই টেবিলে চা পাকড়া সাজিয়ে রেখেছে। মা মেয়ে তিনজন একসাথে বসে সন্ধ্যাটাকে ঘুরিয়ে তুললো আনন্দে। হাসি আড্ডায়। অনেকদিন পর ঘরে এমন প্রাণবন্ত হাসির শব্দ উঠল। রাতের একটু পর হাসান বাসায় ফিরল। নিহা আর নীলা তখন ওর অপেক্ষায় ছিল। চেয়েছিল সবাই মিলে একসাথে রাতের খাবার খাবে। অনেকদিন পর সত্যিই পুরো পরিবার একসাথে খেতে বসল। হাসান মেয়েদের গল্প শুনে হেসে উঠল। জাহানারা ব্যস্ত ছিল সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে। কিন্তু সুন্দর মুহূর্তগুলো কেমন করে যেন সবসময় খুব দ্রুত কেটে যায়। রাত গভীর হলে নিহা বালির সাথে নীলার রুমে এল। দরজায় উকি দিয়ে বলল, আপু আজ তোমার সঙ্গে ঘুমাবো। নীলা হেসে সম্মতি দিল। নিহা বিছানায় বসেই শুরু করল তার গল্প। সে বলল ভার্সিটি সব কথা নতুন বন্ধুরা ক্লাসের স্যারদের মজার কান্ড এমনকি কে কবে তাকে প্রপোজ করেছে তাও লুকালো না গল্প যেন শেষ হতে চায় না নীলা এক নাগারে শুনে যাচ্ছিল বোনটার চোখ মুখে আনন্দের আলো জীবনের তাজা উচ্ছ্বাস সে ভাবল নিহা সত্যিই বড় হয়ে গেছে সময় দ্রুত বদলে দেয় মানুষকে রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে নীলার মনে হঠাৎ ফিরে এল সে ভয়াবহ দিনটির কথা যেদিন সবকিছু বদলে গিয়েছিল। সেদিন নিহার ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার দিন। ঠিক সেই সময় নিলা অসুস্থ হয়ে যায়। মাথা ব্যথা, বমি, মাথা ঘোড়া। প্রথমে সবাই ভেবেছিল সাধারণ অসুখ। কিন্তু যখন ব্যথা অসচ্ছ হয়ে উঠলো ডাক্তাররা টেস্ট করালেন। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর পৃথিবী যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। নীলার ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে এবং সেটি ম্যালিগনেন্ট। টিউমারটি মস্তিষ্কের এমন এক জায়গায় যেখানে অপারেশন করা ঝুঁকিপূর্ণ। সফল হওয়ার সম্ভাবনা এতটাই কম যে জাহানার আর হাসান কেউই সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। হাসান দেশ জুড়ে ডাক্তার দেখিয়েছে। একজন দুজন নয় প্রায় সব বড় বড় হাসপাতালেই গিয়েছে। কিন্তু কোথাও আসার আলো মেলেনি। শেষ পর্যন্ত সে বিদেশ থেকে সার্জিক্যাল আনকোলজিস্ট এনে দেখায়। সেই চিকিৎসক ওকেবল বলেছিলেন, সাকসেস চান্স 30% তবু হাসান হাল ছাড়েনি। প্রতিদিন মেয়ের রিপোর্ট ইমেইলে পাঠায় বিভিন্ন বিদেশী হাসপাতালে। প্রতিদিনই অপেক্ষা করে একটা ভালো খবরের জন্য। এদিকে নীলার টিউমার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি আশেপাশের টিস্যুগুলো নষ্ট করতে থাকে। তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ওজন কমে যায়। ঘন ঘন জ্বর আসে। মাথা ব্যথা শুরু হলে নীলা অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে। সে সহ্য করতে পারে না। মানসিক চাপের কারণে নীলার অবস্থা আরো দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। রেডিওথেরাপি চলতে থাকে নিয়মিত। প্রথমে প্রতিদিন পরের সপ্তাহে চারদিন সাত সপ্তাহ পর সামান্য উন্নতি দেখা যায় কিন্তু সেটা খুবই ক্ষণস্থায়ী নীলা বুঝে যায় সে অল্পদিনের অতিথি সে আর ভয় পায়নি একসময় সে সব মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে যে যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত সেখানে হাল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই তারপর থেকে সে ঠিক করে যে কটা দিন বেঁচে আছি মন খুলে বাঁচবো জীবন যতটুকু বাকি ততটুকু সুন্দর করে কাটাবো এই আপু ঘুমিয়ে পড়েছো? নিহা আদৌ ঘুমে জিজ্ঞেস করল। জেগে আছি তুই বল। নলা উত্তর দেয়। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। হ্যাঁ কর। আকাশ ভাইকে তোমার মনে পড়ে? নলা থমকে গেল। তার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। কিন্তু মুখ থেকে কোন শব্দ বের হলো না। কি হলো? বলছো না কেন? তুই ঘুমা। তোর ঘুম পেয়েছে। নলা প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চায়। আমার ঘুম পায়নি। তুমি বলো না আকাশ ভাইকে তোমার মনে পড়ে মিথ্যা বলছো মিথ্যা কেন বলব আকাশকে আর মনে পড়েনি আমি জানি তুমি মিথ্যা বলছো তুই আর কি জানিস তুমি আকাশ ভাইকে ভীষণ ভালোবাসো নীলা আর কোন কথা বলল না নিহার ঘুম এসে গেল ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে জানালা দিয়ে আসা আবছা আলোয়ে নীলার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু চিকচিক করছিল কিন্তু সে কান্না কেউ দেখলো কেউ না। দুইদিন নীলা বাসায় শুয়ে বসে বই পড়ে কাটিয়ে দিল। তৃতীয় দিনে তার ভীষণ এক খেয়ে লাগতে শুরু করল। হাসপাতালে সবার সঙ্গে গল্প গুজব করে সময় চলে যেত। কিন্তু বাসায় চারদিক নিস্তব্ধ। একা থাকা যেন দম বন্ধ করে দিচ্ছে তাকে। সে ঠিক করল আজ বিকেলে একটু বাইরে বের হবে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো মা জাহানারা। না আমি তোকে একা যেতে দিতে পারবো না। জাহানারা দৃঢ় কন্ঠে বলল, নীলা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেও পারলো না। শেষে মন খারাপ করে নিজের রুমে ফিরে এল। জানালার ধারে বসে থাকলো অনেকক্ষণ। জাহানারা কিছুক্ষণ পর রুমে ঢুকলো। মেয়ের মুখে বিষন্নতা দেখে তার বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো। নীলা। জাহানারা কোমল সুরে ডাকল। নীলা মন ভার করে বসে রইল। সে কোন উত্তর দিল না। সে দেখালো সে মায়ের উপর রাগ করেছে। অভিমান করেছিস? আমি অভিমান করার কে? বুঝেছি। অনেক অভিমান হয়েছে মায়ের উপর। তাই না? কোন অভিমান নেই। জাহানারা মৃদু হাসলো। তারপর বলল, আচ্ছা তুই যেতে পারিস। কিন্তু দূরে কোথাও যাবি না। ঠিক আছে। নীলা লাফিয়ে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরল। সে বলল, আমি দূরে কোথাও যাবো না। বাসার আশেপাশেই থাকবো। আচ্ছা তাহলে যা। একটু হাটাহাটি করায়। কিন্তু সাবধানে যাবি। খুশিতে নীলার চোখে মুখে উজ্জ্বল আলো ফুটে উঠলো। মায়ের মুখেও হাসি এল। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল একরাশ ভয়। তুমি কিন্তু আগের মতো আবার দূর থেকে ফলো করবে না মা। আচ্ছা করবো না। তুই আমার ফোনটা সঙ্গে নিয়ে যা। খারাপ লাগলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বা তোর বাবাকে কল করবি। ঠিক আছে। আচ্ছা জানাবো। নীলা দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। মুক্ত বাতাসে বা দিতে তার বুকটা হালকা লাগলো। হাসপাতালের নিয়ম কানুন নিরন্তর নজরদারি সবকিছুর বাইরে আজ সে একদম মুক্ত। কেউ তাকে ফলো করছে না। কেউ তাকে আটকে রাখছে না। হাসপাতাল থেকেও সে সেভাবে দূরে কোথাও যেতে পারে না। তাকে দেখে রাখার জন্য তার বাবা একজন লোক ঠিক করে রেখেছে। সে হাসপাতালের মেইন গেটের বাইরে পা দিলেই সেই লোক তাকে অনুসরণ করে। সে যেখানেই যাক না কেন, তাকে লুকিয়ে ফলো করবেই। কিন্তু জরুরি মুহূর্ত ছাড়া সে কখনো সামনে আসে না এবং এমনভাবে অনুসরণ করে যেন তার কোন অস্তিত্ব নেই কিন্তু আজ সে মুক্ত তাকে অনুসরণ করার কেউ নেই সে আজ মুক্ত পাখির মতো ঘুরে বেড়াতে পারবে ভেবে মনে মনে খুব এক্সাইটেড সে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল রাস্তার পাশে কাঁঠাল চাপা ফুলের গন্ধে হালকা বাতাস ভরপুর হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবল পাশের নার্সারিটায় গিয়ে একটা শিউলি গাছ কিনবে ছাদে শিউলিটা শুকিয়ে গেছে আকাশের দেওয়া সে গাছ আকাশের শিউলি ফুল প্রিয়। একদিন আকাশ তাকে একটা শিউলির চারা এনে বলেছিল, এই গাছের প্রথম ফুল যেদিন ফুটবে সেদিন তুমি আর আমি সাদা শাড়ি পাঞ্জাবি পড়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াবো। কিন্তু সেদিন আর আসেনি। মানুষটা হারিয়ে গেছে। গাছটাও আর টিকলো না। অবশ্য যখন মানুষটা আর নেই তখন গাছ থেকেই বাকি লাভ। স্মৃতির ভারে ভারী হয়ে উঠলো তার বুক। সে হাঁটতে হাঁটতে ঘামতে শুরু করল। চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। একটু থেমে নিঃশ্বাস নিল। তারপর আবারও হাঁটা শুরু করল। নার্সারি তো বেশি দূরে নয়। নীলা না চাইতেও পুরনো কথা বারবার স্মৃতিতে ফিরে আসছে। আর সে যতই ভাবছে তার মানসিক চাপও তত বাড়ছে। সে প্রচন্ড ঘামছে। বুকের ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে। তবু সে চেষ্টা করল স্বাভাবিক থাকার। সে রাস্তার পাশ দিয়ে এক পা একপা করে হেঁটে এগিয়ে যেতে থাকলো। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সব ঝাপসা হয়ে গেল। চারপাশের দৃশ্য ঘুরপাক খেতে লাগলো চোখে নীলা এক পা পিছিয়ে গেল বাসরমও রাখতে পারছে না মাথাটা কেমন ঘুরছে বুক ধরফর করছে নীলা আর হাঁটতে পারছে না সে ভালো করে কোন কিছু দেখতে পারছে না বুঝতেও পারছে না মাথা ঘুরছে তার সে আর স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না হঠাৎ এক ঝটকায় নীলার মাথা ঘুরে আসে শরীরের ভার সামলাতে না পেরে সে এক পা পিছিয়ে যায় চোখের সামনে ঘোলাটে হয়ে আসে সবকিছু সে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু পারে সে পড়ে যাবে। ঠিক তখনই কেউ তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। নীলা কিছুটা ঘোরের মধ্যে থেকে অনুভব করল সে পড়ে যায়নি। কেউ তাকে আগলে রেখেছে। মাথা তুলে দেখল আকাশ তাকে ধরে আছে। সে তাকে পড়ে যেতে দেয়নি। বাতাসের মত শেষ মুহূর্তে সে তাকে ধরেছে। নীলা নড়াচড়া করতে পারছে না। উঠতে পারছে না। এমনকি কোন কথাও বলতে পারছে না। মুহূর্তেই নীলা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে শুধু আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশের বাদাম চোখে মিশে আছে উদ্বেগ। বহুদিন পর নীলা এতকা থেকে আকাশের বাদামী চোখগুলো দেখল। নীলা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করছে। নীলার গলা শুকিয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করছে। কথা বলতে চাইছে কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। মাথাটা এখনো একটু ঘুরছে। নীলা ভাবলো আকাশ এখানে কি করে এলো? সে তো কিছুক্ষণ আগেও ছিল না। এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি ঘটছে সব? সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তবুও আকাশের উষ্ণ স্পর্শ তার চোখে ঝুলে থাকা উদ্বেগের ছায়া এসব তো স্বপ্নে অনুভব করার মতো নয়। এই মুহূর্তে বাস্তব অবাস্তবের সব সীমানা হারিয়ে গেল নীলার। সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আকাশের মুখের দিকে। তার ভেতরটা ফিসফিস করে বলে ওঠে। আজ এতদিন পর মানুষটা আমার এত কাছে চাইলেই ছুয়ে দিতে পারি।
চলবে..