ফন্ট সাইজ:
থিম:
ডিসেম্বরের শহরে

৭ম পর্ব

লেখক: সমকালীন ও রোমান্টিক উপন্যাস

ডিসেম্বরে শহরে

লেখক: সবুজ আহম্মদ মুরসালিন।

 চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা একটা তীব্র ঠান্ডা বাতাস হঠাৎ করে আকাশের শরীর ঘেসে ছুয়ে গেল তার মনে হলো যেন কোন অদৃশ্য কিছু বুক চিড়ে পার হয়ে গেছে দূরে কোথাও এক কুকুর কাঁদছে তার কন্ঠে এমন করুণ সুর যা নিঃশব্দ রাতটাকে আরো ভারী করে তুলছে আকাশ বসে আছে একা নিশ্চুপ কুকুরটার কান্না তার ভেতর তৈরি করেছে অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে প্রশ্নে জর্জরিত করে তুলেছে সে ভাবে পশুরাও কি মানুষের মত কষ্ট পায় নাকি তাদের কষ্ট মানুষের চেয়েও গভীর মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কষ্ট ভুলে যায় কিন্তু ওরা কি পারে নাকি তারা ভুলতে পারে না শুধু কথা বলতে না পারায় বোঝাতে পারে না তাদের দুঃখ নাকি তাদের দুঃখ মানুষের চেয়েও গভীর সে এসব ভাবতে চায় না তবু ভাবনা গুলো একের পর এক ফিরে আসে। তার মনের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নগুলো পাথরের মত ভারী হয়ে উঠেছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে আকাশ বুঝতে পারে সে কিছু একটা হারিয়েছে। কিন্তু কি সেটা তার জানা নেই। শুধু মনে হয় জীবনের কোন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে সে আটকে গেছে। যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়। একটা নাম, একটা মুখ। কিছু অনুভূতি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সে জানে সে কিছু ভুলে গেছে। কিন্তু কি সেটা সে মনে করতে পারে না। গত ছয় মাস ধরে সে নিরন্তর চেষ্টা করেছে নিজেকে খুঁজে পেতে। নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে। কিন্তু প্রতিবারই সে হেরে গেছে। নিজের অক্ষমতা, নিজের বিস্মৃতির দেওয়ালে বারবার ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে। তার ভেতরে জমে গেছে হতাশা, নিজের উপর রাগ আর এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব। সব মিলিয়ে এক অসহনীয় ক্লান্তি এসে চেপে বসেছে তার মন ও শরীরের উপর। দুঃখগুলো বড়ই অদ্ভুত। তারা ঠিক তখনই কাছে আসে যখন আমরা তাদের এড়িয়ে চলতে চাই। যত দূরে পালাতে চাই ততটাই দুঃখ আমাদের কাছে ছায়ার মত লেগে থাকে। তবুও আমরা পালাতে থাকি। জীবনভর পালাতে থাকি নিজের কষ্ট অতীত স্মৃতি থেকে। মনে করি পালালে বাঁচা যাবে। কিন্তু দুঃখ কি এত সহজে পিছু হটে? না। বরং তখনই সে আরো জোরে আঁকড়ে ধরে। তার হিমশীতল স্পর্শ বুকের গভীরতায় ঢুকে যায়। যেখানে আসার ছোট্ট আলোও থাকে না। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো যে আমরা মন প্রাণ দিয়ে চাই সেটি কখনো হয় না। যেন কুয়াশায় মোড়ানো গোলকথা যতই এগিয়ে যায় ততই আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। আকাশ নিজের অবস্থান মনে করতে পারছে না। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে উঠে দাঁড়ায়। চারপাশ ঘুরে দেখে। সমানভাবে অসংখ্য গাছ সারি সারিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে মানুষের কোন চিহ্ন নেই। মনে ভয় এসে জড় হয়ে আসে। সে কোথায় এখন? হাঁটার গতি বাড়লেও পথ শেষ হচ্ছে না। আলো নেই। গাছের শাড়ি অগণিত শেষ হচ্ছে না। কুকুরের ডাক ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একবার সে ডাকটা অনুসরণ করার চিন্তা করে। কিন্তু ভয়ে তা তৎক্ষণাৎ বাদ দেয়। সে দৌড়াতে থাকে। গতি বাড়ায়। একসময় শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে। তবু কোন গন্তব্য দেখা নেই। আকাশের মনে প্রশ্ন আসে। সে কি হারিয়ে গেছে? পথ খুঁজে পাবে কি করে? হঠাৎ অনুভব করে তার পাশনে ভাসছে দ্রুত নিচে নামছে আশেপাশে তাকাতে চেষ্টা করে গাছের শিকড় সে কি কোন গর্তে পড়ে গেছে অন্ধকারে নিশ্চিত হওয়া যায় না তবু তার মনে হয় নিচে পড়ে যাচ্ছে আজ এখানে কি মৃত্যু হবে তার এমন ভেবে সে বাঁচার জন্য চেষ্টা করে কোন এক গাছের শেকড় ধরে বসে পড়ে নিচে পড়তে চায় না শেকড় ধরা মাত্রই কোটি কোটি শেকড় যেন আকাশের দিকে ছুটে আসে ছেড়ে দেবে নাকি ছেড়ে দিলে নিচে পড়ে যাবে কিন্তু ছেড়ে দিতে পারছে না। শেকর ক্রমশ তাকে আকড়ে ধরে শরীর পেছিয়ে ফেলে। নড়াচড়া অসম্ভব। নিঃশ্বাসও কষ্টসাধ্য। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার। অন্ধকার। প্রচন্ড আতঙ্কে ঘুম ভেঙে যায়। নিঃশ্বাস নিতে সময় লাগে। মনে হয় গাছের শেকর গলায় পেঁচিয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে পানির বোতল খুঁজে পায়। ঢকঢক করে পানি খেয়ে নেয়। শোয়া থেকে উঠে রুমের লাইট জ্বালায়। অন্ধকার কেটে যাওয়াতে ভয় কিছুটা কমে। সকাল হতে দেরি নেই। ঘড়ি দেখে বোঝে ঘুম আর আসে না। বসে বসে সময় কাটাচ্ছে কিন্তু সময় যেন থেমে গেছে। একটা গুমোট অনুভূতি এখনো মনের মধ্যে বিরাজ করছে। ঠিক তখনই দরজার দিকে চোখ যায়। দেখে আবির দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ চমকে ওঠে। এত সকালে আবির তার রুমের সামনে কি করছে? আবিরের চেহারায় ভয় আর অস্থিরতা। মুখে ঘাম, চোখে দিশাহারা ভাব। আকাশ তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করে, কিরে কি হয়েছে? কোন সমস্যা নাকি? তুই ঠিক আছিস? আবির এখন কিছুটা শান্ত স্বরে বলল বাবা স্ট্রোক করেছে এখন অবস্থা ভালো না আকাশের চোখ মুহূর্তেই চিন্তায় ভরে গেল আঙ্কেল এখন কোথায় মিলি কল করে জানিয়েছে বাবাকে ভোরের দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করিয়েছে কিন্তু ডাক্তার বলেছে সম্ভব হলে দ্রুত ঢাকা নিয়ে যেতে আকাশ দ্বিধা না করে বলল তাহলে নিয়ে আয় ঢাকা আমি তো আছি চিন্তা করিস না আমির অসহায় কন্ঠে বলল সমস্যা হচ্ছে আমার হাতে এখন সেরকম টাকা নাই আকাশ আকাশ তৎক্ষণ বলল, টাকা নিয়ে তোর কোন চিন্তা করতে হবে না। আমি দেখি কি করা যায়। আবির নীরব হয়ে গেল। তার কন্ঠ আটকে যাচ্ছে। মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না। আকাশ একটু গলা নামিয়ে বলল, এত কি ভাবছিস? এখন ভাবার সময় এটা না। যা করার দরকার এখনই কর। আবির নিঃশব্দে বলল, আরেকটা সমস্যা আছে। কি? মিলি বলল, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন ঠিকঠাক কাজ করছে না। আকাশ বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলল, আমি দেখি কিছু করা যায় কিনা। তুই একটা কাজ কর। মিলিকে বল আঙ্কেলকে যেন দেখে রাখে। তারপর সে দ্রুত ফোন বের করে একের পর এক নাম্বারে কল দিতে শুরু করল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সঙ্গে কথা হয়ে গেল। আবির একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তুই এত তাড়াতাড়ি করে ফেললি? আমি না মামাকে কল দিয়েছিলাম। মামাই ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ধন্যবাদ ভাই। আকাশ বিরক্ত সুরে বলল, ধুর বোকা আমাকে ধন্যবাদ দিস না। তুই আমার ভাইয়ের মতো। আমি পাশে না থাকলে কে থাকবে বল? আবির নিচে সরে বলল, তবুও আজকাল নিজের মানুষও এতটা করে না। যতটা তুই করছিস। তোর বাবা মানে আমারও বাবা। তোকে এত কথা বলতে হবে না। আঙ্কেলের সঙ্গে কে আসবে? মায়ের শরীরটাও ভালো নেই। আমি যে গিয়ে নিয়ে আসবো সেটাও সম্ভব না। আমার যেতে যেতে দেরি হয়ে যাবে। আচ্ছা মিলিকে কল দিচ্ছি দেখি কি করা যায় আচ্ছা তুই দ্রুত আমাকে জানাস আবির দ্রুত মিলিকে কল দিল মিলি রিসিভ করতে বলল হ্যালো ভাইয়া আবির তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা হয়ে গেছে কিন্তু বাবার সঙ্গে কে আসবে তুই একা বাবাকে নিয়ে আসতে পারবি নাকি মাকে পাঠাবি ওপাশ থেকে মিলি শান্ত স্বরে জবাব দিল আমি যাব মা এই অবস্থায় এতদূর জার্নি করতে পারবে না আমির একটু দুশ্চিন্তায় বলল তুই একা পারবি কেন পারবো না ভাইয়া আমি কি আর ছোট আছি মেলের আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে আবির কিছুটা ভরসা পেলেও মনে চিন্তা থেকেই গেল। আলামিন কি আসতে পারবে? আবিরের চাচাতো ভাই আলামিনের কথা উঠতেই মিলে কিছুটা থেমে গেল। আলামিন ভাইকে দরকার নেই। সেদিন বাবাকে এসে এক গাদা কথা শুনিয়ে গেছে। সেই দুঃখেই হয়তো বাবার এই অবস্থা। আমি একাই যাব। তুমি চিন্তা করো না। আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা। আমি তোকে আপডেট জানাচ্ছি। ওকে ভাইয়া। বলে মিলি কল কেটে দিল। কল শেষ করে আবির মুখ ফিরিয়ে আকাশকে বলল, বাবার সঙ্গে মিলিয়ে আসবে। আকাশ মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা। আমি এম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। সে দ্রুত পৌঁছে যাবে হাসপাতালে। তুই মিলির ফোন নাম্বারটা আমাকে দে। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি যেন হাসপাতালে পৌঁছে কল করে। আচ্ছা পাঠাচ্ছি। আর তুই দ্রুত রেডি হয়ে নে। আমরাও বের হব। আকাশ তুই না থাকলে আজ আমি সত্যিই ভেঙে পড়তাম। ভেঙে পড়ার সময় এখন না আবির। এখন আমাদের শক্ত থাকতে হবে। আঙ্কেলের জন্য মিলির জন্য তোর মায়ের জন্য সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আবির মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। আকাশকে জিজ্ঞেস করল ঢাকা পৌঁছাতে কেমন সময় লাগবে? পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা তো লাগবেই। তাহলে চিন্তা নেই। আমরা এদিকে সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখবো। এখন শুধু চাই। বাবা যেন ভালোভাবে ঢাকা পৌঁছায়। চিন্তা করিস না। আঙ্কেলে কিছু হবে না। দেখবি ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাই যেন হয়। আল্লাহ যেন এবার মুখ তুলে তাকান। এই বলে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতর ভারী একটা চাপা ব্যথা জমে রইলো। দুজনে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হলো। রাস্তায় যেতে যেতে আকাশ কাছের একটা এটিএম বুথে ঢুকে যতটা সম্ভব টাকা তুলে আবিরের হাতে দিল। আবির টাকাটা হাতে নিয়ে চুপ করে থাকলো কিছুক্ষণ। তার চোখে একরাশ দ্বিধা। ধীরে বলল, টাকাটা নিতে খারাপ লাগছে। কিন্তু এখন তো আর কোন উপায় নেই। আকাশ কাঁধে হাত রেখে বলল, এখন সময় হিসাবের নয়। সময় জীবনের আঙ্কেলের চিকিৎসা জরুরি টাকা পয়সা আজ আছে কাল থাকবে না এত ভাবতে হবে না যদি আরো লাগে আমি ব্যবস্থা করে ফেলব টাকা নিয়ে অন্তত তোর চিন্তা করতে হবে না তবুও আর কোন কথা বলিস না দুজনে সোজা ঢাকা মেডিকেলের পথে রওনা দিল হাসপাতালে পৌঁছে আকাশ ফোন বের করে পরিচিত এক সিনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করল স্যার একজন স্ট্রোকের পেশেন্ট আসছে অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল আপনি একটু দেখবেন ওপাশ থেকে ডাক্তার আশ্বাস দিলেন ঠিক আছে আমি ওয়ার্ডে খবর দিয়ে রাখছি। আবিরও আকাশ তখন হাসপাতালের সব আনুষ্ঠানিকতা সামলাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। ভর্তি ফাইল বেড সব ব্যবস্থা করে তারা অবশেষে হাসপাতালের সামনে এক কাপ চা হাতে বসল। আবিরের মনে হচ্ছিল সময় থেমে গেছে। তার মুখে ভয় আর উৎকণ্ঠা স্পষ্ট। আকাশ নিঃশব্দে তাকে সাহস দিচ্ছিল। কখনো কথায় কখনো শুধু উপস্থিতিতেই। প্রায় সাত ঘন্টা পর অ্যাম্বুলেন্স ঢাকায় এসে হাসপাতালের সামনে থামল। আবির ছুটে গিয়ে দরজা খুলল মিলি বাবার কি অবস্থা মিলির কন্ঠ কাঁপছে চোখে জল অবস্থা ভালো না ভাইয়া খুব খারাপ এক মুহূর্ত দেরি না করে তারা ইমাম হোসেনকে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে গেল ডাক্তারদের একটি টিম ছুটে এল রোগীকে অক্সিজেন দিয়ে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া হলো আবির কিছুই করতে পারলো না শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল আকাশ পাশে দাঁড়িয়ে বলল সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ এখন তুই ভেঙে পড়িস না তুই শক্ত না থাকলে মিলি আর আন্টি কিভাবে টিকবে আবির কোন উত্তর দিল না তার ঠোট শুকন চোখে একরাশ শূন্যতা মনের ভেতর শুধু একটাই প্রার্থনা ঘুরপাক খাচ্ছে আল্লাহ বাবাকে বাঁচিয়ে দিও হাসপাতালের করিডরে এখন শুধু উদ্বেগ আর অপেক্ষা আইসিইউ এর লাল বাতি জ্বলছে যেন সময়টা থেমে আছে আবির আর আকাশ বাইরে বসে পাশে শুধু ওষুধের ব্যাগ রিপোর্টের ফাইল আর কিছু বোতলজাত পানি সময়মত ডাক্তার এসে রিপোর্ট চাইছে ওষুধ চাচ্ছে আর সয়ে নিচ্ছে আবির চুপচাপ ঘুম নেই ক্ষুধা নেই শুধু দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বাবার স্মৃতি স্মরণ করছে সকাল থেকে সে এখনো কিছুই খায়নি আকাশ কয়েকবার বললেও সে খেতে চায়নি খিদে নেই বলে বারবার কথা গড়িয়ে নিয়েছে আকাশ আমি ভীষণ ভয় পাচ্ছি বাবা যদি যদি আকাশ থামিয়ে দেয় কিছু হবে না সাহস রাখ ঘন্টাখানিক পর এক জুনিয়ার ডাক্তার এসে বলে রোগী এখন স্টেবল তবে এখনই পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে না আমরা উনাকে পর্যবেক্ষণ মনে রাখছি আবির একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে স্টেবল মানে এখনই কিছু হবে না তাইতো ডাক্তার মাথা নাড়ে হ্যাঁ আপাতত না তবে 72 ঘন্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাত হয়ে আসে হাসপাতালের আলো নিস্তেজ করিডরে কম লোক আকাশ আবিরকে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে রাখে তার মাথার নিচে একটা ব্যাগ রেখে দেয় বালিশের মত করে আবির চোখ বন্ধ করে কিন্তু ঘুম আসে না এখানে আসার পর মিলি একটা কথাও বলেনি সে যেন চুপ হয়ে গেছে মিলি দিলির জন্য আকাশ খাবার নিয়ে এলেও আবিরের মতো সেও মুখে কিছু দেয়নি পানি ছাড়া তার মনে উদ্বেগ ও ভয় বাবা মা ছাড়া তাদের কেউ নেই আত্মীয় বলতে এক চাচা কিন্তু সেও ভালো মানুষ না দাদার সম্পত্তির লোভে আগে অনেকবার তাদের সঙ্গে ঝামেলা করেছে বাবা না থাকলে যে সে কি করবে সে চিন্তা এখন আপাতত মিলি করছে না তবুও একটা অজানা ভয় বারবার তার মনে উকি দিয়ে যায় তবুও সে ভেঙে পড়ে না রাত কেটে যায়নি ঘুম কারো চোখে যেন ঘুম নেই। সকালের অপেক্ষায় বসে আছে তিন তিনটা মানুষ। সবাই মনে মনে প্রার্থনা করছে। সকালে যেন ভালো খবর আসে। তাদের বাবা যেন এ যাত্রায় বেঁচে যায়। সকাল 10:00 টার দিকে এক নার্স এসে জানালো ডাক্তার ভিজিটে আসছেন আপনাদের সঙ্গে কথা বলবে। আব্রি আর আকাশ দুজনে দৌড়ে যায়। ডাক্তার বের হয়ে এসে বলেন, ভালো খবর আছে। আমরা প্রায় 24 ঘন্টা পার করেছি। রোগীর অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটা উন্নতি হয়েছে। যদি এমনই থাকে বিকেলের দিকে কেবিনে স্থানান্তর করা যাবে। তবে প্রথম 72 ঘন্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টা সাবধানে থাকতে হবে। আবিরের মুখে হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণ ভিজে গেল আনন্দে। সে ফিসফিস করে বলল, আলহামদুলিল্লাহ। আকাশ পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, দেখলি আমি বলেছিলাম ভরসা রাখ। সব ঠিক হয়ে যাবে। মিলির মনের মেঘটাও কেটে যায়। তার মুখেও হাসি। সে তার মাকে কল দিয়ে জানায় মা বাবা এখন ভালো আছে তুমি আর চিন্তা করো না আবির আকাশের দিকে তাকিয়ে নরম কন্ঠে বলল তুই না থাকলে পুরো সময়টা আমার কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে যেত আকাশ তুই না থাকলে আমি জানিনা কি করতাম আকাশ মৃদু হেসে তার কাঁধে হাত রাখলো বন্ধু মানেই তো পাশে থাকা তুইও থাকবি যখন আমার প্রয়োজন হবে সাতদিন কেটে গেছে ইমাম হোসেন এখন অনেকটাই সুস্থ গতকালই তাকে হাসপাতাল কে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। এখন ইমনের বাসায় বিশ্রামে আছেন। মিলি দুদিন আগেই গ্রামে ফিরেছে। মিলিকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আবির বলেছিল, বাবাকে নিয়ে চিন্তা করিস না মিলি। আমি আছি। বাবা একদম ভালো হয়ে গেলে আমি নিজেই নিয়ে আসবো। ইমাম হোসেনের শরীর অনেকটা সেরে উঠলেও ডান হাতটা এখনো দুর্বল। হাতটা আছে তবু যেন নিজের মতো চলছে না। ডাক্তার আশ্বস্ত করেছেন, চিন্তার কিছু নেই। নিয়মিত ব্যায়াম আর ফিজিওথেরাপি করালে মাসখানিকের মধ্যেই অবস্থার উন্নতি হবে। স্ট্রোকের পর প্রথম দুদিন ইমাম হোসেনের মুখ একপাশ বেঁকে গিয়েছিল। কথা বললে শব্দগুলো জড়িয়ে আসতো ঠোঁটের কোণে। সে যেন এক নতুন মানুষ। নিজেকে চিনতে পারতো না। এই কয়েকদিনে আবিরও যেন এক নতুন মানুষ হয়ে উঠেছে। আবির চুপচাপ বসে আছে বাবার পাশে। ইমাম হোসেন অনেকক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ আবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর মা কেমন আছে? এখানে আসার পর মানুষটার সঙ্গে আর কথা হয়নি। মা ভালো আছেন বাবা। সারাক্ষণ আপনার কথাই বলেন। সকাল বিকেল আমাকে কল দিয়ে শুধু জানতে চায় আপনি কেমন আছেন? ইমাম হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তোর মাকে একবার ফোন দিবি? আমি একটু কথা বলতে চাই। আবির সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে মা আমেনাকে কল দিল। মনে হলো আমেনা যেন ফোন হাতেই বসেছিলেন। প্রথম রিং বাজতেই তিনি রিসিভ করলেন। হ্যালো আবির তোর বাবা কেমন আছে। আবির কিছু না বলে ফোনটা বাবার কানে ধরিয়ে দিল। ইমাম হোসেন দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আমেনা বুঝা যায় ফোনের ওপাশে আবিরের বাবা তিনি যেন মুহূর্তেই চুপ হয়ে যান ইমাম হোসেন ধীরে ধীরে বলেন কেমন আছো তুমি ইমাম হোসেনের এমন নতুন কন্ঠ শুনে আমেনার গলা ভারী হয়ে ওঠে মানুষটার কন্ঠ যেন এই কয়দিনে পরিবর্তন হয়ে গেছে এত বছরের চেনা পরিচিত সে কন্ঠ আর নেই আমেনা উত্তর দেয় আমি ভালো আছি তুমি এখন কেমন আছো ডাক্তার বলেছে ভয়ের কিছু নেই ওপাশে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল চোখ মুছে আমেনা বললেন আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন আমি প্রতি ওয়াক্ত নামাজে শুধু এইটুকুই চেয়েছি তোমার যেন কিছু না হয় ইমাম হোসেন মৃদু হেসে বললেন হায়াত ফুরিয়ে গেলে কি আর থাকা যায় আমেনা তুমি এভাবে বলো না আমেনার গলা কেঁপে উঠলো আমার বুক কেঁপে ওঠে কেঁদো না ইমাম ধীরে ধীরে বললেন তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমার কি হবে আমেনা দ্রুত চোখ মুছে নিয়ে বললেন না আমি আর কাঁদছি না তুমি শুধু দ্রুত ফিরে আসো। আমি দ্রুতই তোমার কাছে চলে আসবো। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ রাখুক। তুমিও নিজের যত্ন নিও। ইমাম বললেন আর অকারণে এমন কেঁদো না। শুনছো? আচ্ছা। আমেনা মৃদু উত্তর দিলেন। ইমাম ফোনটা আবিরের হাতে দিয়ে বললেন, তোর মায়ের সঙ্গে কথা বল। আবির ফোনটা কানে তুলতে ওপাশ থেকে ভেসে এলো মায়ের কান্না ভেজা কন্ঠ। আবির তোর বাবার দিকে ভালো করে খেয়াল রাখিস। আবির শান্ত গলায় বলল মা বাবা এখন অনেকটাই ভালো আছে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো এভাবে দুশ্চিন্তা করলে তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে ফোনে দুই প্রান্তে নীরবতা নেমে এল ইমাম হোসেন হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাওয়ার পর সোজা বাড়িতে যাওয়ার জেদ ধরেছিলেন কিন্তু আবির কোনভাবেই রাজি হয়নি অনেক বুঝিয়ে অনেকটা কৌশল করে শেষমেষ তাকে ইমনের বাসায় নিয়ে আসে এখানে এসেও ইমাম হোসেন বারবার বলছেন আমি গ্রামে চলে যাব আমেনা একা আছে আবির তাকে শান্ত করে বলেছে বাবা তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হওনি। আরো দুই একদিন থাকো তারপর যাওয়া যাবে। কিন্তু তার মনে একটা ভয় কাজ করছে। সে জানে বাবাকে বেশিদিন আটকে রাখা সহজ হবে না। ইমাম হোসেন একবার কিছু ঠিক করলে তাকে আটকানো মুশকিল। রাতে আবির বাবাকে খাইয়ে দিয়ে চুপচাপ ছাদে উঠে এল। সেখানে আগে থেকেই বসেছিল আকাশ। সে যেতেই আকাশ তাকে বলল, আঙ্কেল এখন কেমন আছেন? বাবা ভালো আছে। কিন্তু এখানে আর থাকতে চাচ্ছে না। কি করবে এখন? আজ রাতটা ভেবে দেখি কি করা যায়। আচ্ছা তুই এই এক সপ্তাহে যা করলি সেটা কেউ করতো না। আবার এসব কথা তোকে তো বলেছি এগুলো নিয়ে ভাবিস না। তবুও তুই না থাকলে আমি কি করতাম ভাবতে পারি না। এত ভাবার দরকার নেই। যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। আবির একটু থেমে বলল। একটা কথা জিজ্ঞেস করি? হ্যাঁ বল। এত টাকা তুই কিভাবে জোগাড় করলি? আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল। ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়েছি। তোর ভাই এমনি এমনি টাকা দেওয়ার মানুষ না। এমনি দেয়নি তাহলে তুই এটা নিয়ে ভাবিস না। আমি সামনে নিব। আবির চোখ নামিয়ে বলল, তুই বললে হবে না। আমি ভাববই। আমি চাকরিটা পেয়ে গেলে সব টাকা তোকে ফিরিয়ে দেব। আকাশ মুচকি হেসে বলল, তুই আবার মার খেতে চাস নাকি? তুই চাইলে মারিস। কিন্তু আমি কথা রেখে ছাড়বো। আকাশ হেসে বলল আচ্ছা যখন তোর চাকরি হবে আর যখন ফেরত দিবি তখন দেখা যাবে আচ্ছা বাতাসে হালকা কুয়াশার গন্ধ আর ঠান্ডা ছড়িয়ে আছে চারপাশে রাতের শহর যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে দূরের কোন রাস্তা থেকে ভেসে আসা রিকক্সার ঘন্টা আর মাঝেমধ্যে কুকুরের ডাকে সে নীরবতা খানিকটা ভাঙ্গে আবার মিলিয়ে যায় নিস্তব্ধতার ভেতর ছাদের এক কোণে বসে আছে আকাশ আর আবির দুজনার গায়ে মোটা চাদর ঠান্ডায় হাতের আঙ্গুল জমে যাচ্ছে কিন্তু দুজনেই যেন ভাবনায় হারিয়ে আছে। আবির বলল, চা খাবি? আকাশ হেসে বলল, এত রাতে কে বানাবে শুনি? আচ্ছা আমি বানাবো। তুই খেতে চাস? শীতের মধ্যে ধোয়া ওঠা এক কাপ চা হলে একদম জমে যাবে। আচ্ছা খাবো তুই বানিয়ে আন। তুই এখানে বস আমি এখনই আসছি। আবির নিচে নেমে গেলে ছাদটা আরো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। চারপাশের বাড়ির ছাদগুলো যেন অলস ঘুমে ঢুলছে। দূরে কোথাও অল্প আলোয়, একটানা জ্বলছে কোন জানালার বাতি। বাতাসে ফুলের হালকা গন্ধ মিশে আছে। আকাশ চোখ তুলে তাকায় আকাশের দিকে। তার চোখে যেন একজনের স্মৃতি ঘুরে ফিরে আসে। সে দূরে তাকায় জাহানার লেখাটা যেন জলজল করে জ্বলছে। নীলা এখন কি করছে? এ প্রশ্নটাই বারবার ফিরে আসে তার মনে। সেদিনের পর থেকে নীলার সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। সে ইচ্ছে করেই দেখা করার চেষ্টা করেনি। সে চায়নি অযথা তাকে বিরক্ত করতে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য নীলার শেষ মুহূর্তের ছলছল করা চোখ সে ভুলতে পারেনি। সে নিশ্চিত সবাই তার থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছে। সে একবার ভেবেছিল আবিরকে আবার জিজ্ঞেস করবে নীলার ব্যাপারে। কিন্তু সে পারেনি। তার বাবার এই অবস্থায় আবির এমনিতেই অনেকটা ভেঙে আছে। তাকে আর অন্য কোন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে চায়নি আকাশ। কয়েকবার আকাশ ভেবেছে নীলার বাসার দিকে যাবে। একবার তো প্রায় চলে গিয়েও ছিল। কিন্তু অর্ধেক পথ থেকে ফিরে আসে। যেন নিজের ভেতরেই কোথাও একটা বাধা অনুভব করে সে। তার কাছে নীলার ফোন নম্বরও নেই। একবার ভেবেছিল সাহস করে চেয়ে নিবে কিন্তু সেদিন সেরকম পরিবেশ ছিল না বরে বাসায় ফিরে এসে আফসোস করেছিল চাওয়া দরকার ছিল না দিলে অন্তত চেষ্টা তো করা যেত ঠিক তখনই আবির ফিরে এলো চা নিয়ে ধোঁয়া উঠছে কাপে চায়ের মিষ্টির গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে আবির হাসতে হাসতে বলল কিরে কি ভাবিস এত মনোযোগ দিয়ে আকাশ একটু চুপ করে থেকে কাপটা হাতে নিল তারপর ধীরে বলল নীলার কথা ভাবছি ফোন নাম্বারটা না নেওয়াটা ভুল হয়ে গেছে সেদিন কি হয়েছিল? আমাকে তো ঠিক করে বললি না। আকাশ চায়ে চুমুক দিল। ধোয়া ভেসে উঠলো তার মুখের সামনে। সে চুপচাপ বলল, শোন কি হয়েছে? রাত অনেক পেরিয়ে গেছে। দুই বন্ধু এখনো গল্পে মগ্ন। ছাদের উপরে কুয়াশা ঘনিয়ে এসেছে। ঠান্ডা বাতাসের শীতলতা ক্রমে আরো বাড়ছে। আবির শেষমেষ বলল, চল রুমে যাই। এই ঠান্ডায় শরীর খারাপ হয়ে যেতে পারে। আকাশ নিঃশব্দে মাথা নাড়ে। দুজনেই উঠে নিচে নেমে আসে। আজ ইমাম হোসেন আবিরের রুমে আছে। তাই আবির সবে আকাশের রুমে। দুজনই ফ্রেশ হয়ে বিছানায় যায়। কিন্তু ঘুম কারো চোখে আসে না। ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়া। অথচ দুজনের মনে আলো জ্বলছে নিজস্ব ভাবনায়। অগোচল স্মৃতিতে। হঠাৎ আকাশ ফিসফিস করে বলে। আবির ঘুমিয়ে গেছিস? কি হয়েছে বল? আবিরও ধীর কন্ঠে উত্তর দেয়। আকাশ একটু দ্বিধায় পড়ে। তারপর বলে নলা কি আমার পূর্ব পরিচিত? তোর বারবার এটা কেন মনে হয়? আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে আমি জানিনা। কিন্তু আমার মন বারবার বলে নীলাকে আমি আগে থেকে চিনি। মনে হয় ও কোথাও আমার স্মৃতিতে আছে। যেটা আমি ভুলে গেছি। নীলাকে যখন দেখি ওকে আমার অদ্ভুতভাবে নিজের মনে হয়। ওর চোখ, নাক, মুখ, চুল, হাসির ধরণ সবকিছুই আমার চেনা লাগে। যেন আমি ওকে যুগ যুগ ধরে চিনি। আবির তাকিয়ে থাকে আকাশের মুখের দিকে। তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলে তুই কি নীলার প্রেমে পড়ে গেছিস? আকাশ চুপ করে যায়। প্রশ্নটা যেন তার ভেতর ঢেউ তোলে। সে নিজেই ভাবতে শুরু করে সে কি সত্যি নীলার প্রেমে পড়েছে? কেন সে নীলাকে এতভাবে? কেন ওর হাসি, ওর কন্ঠ, ওর চোখ তাকে এভাবে টানে। দুদিনের পরিচয় কাউকে ভালোবাসা যায়? নাকি সে আগে থেকেই নীলাকে ভালোবাসে। এ ভাবনার ভেতরেই হারিয়ে যায় আকাশ। আকাশ আবিরের ডাকে আকাশ চমকে উঠে। সে জবাব দেয় হুম। তোকে একটা কথা বলি? হ্যাঁ বল। তুই কোন ভুল করিস না। কি ভুল? আকাশ অবাক হয়। নীলাকে ভালোবেসে ফেলিস না। আকাশ হতভম্ব হয়। কেন? আবিরের কন্ঠ ভারী হয়ে যায়। নীলার হাতে বেশি সময় নেই। তুই ওর মায়ায় পড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত তুই কষ্ট পাবি। আকাশ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে, সময় নেই বলতে কি বুঝাস? তুই জানিস না? কি জানবো? আকাশের গলা কেঁপে ওঠে। নীলা তোকে বলেনি ও রোগের কথা। নীলার কি হয়েছে? আবির গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলে ব্রেন টিউমার। আর সেটাও লাস্ট জেল। কথাটা শুনে মুহূর্তেই আকাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার গলা শুখে আসে। ভারী হয়ে পড়ে চোখের কথা। কি বলিস? তুই এত কিছু জানলি কিভাবে? আবির একটু থেমে। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, আমি হাসপাতালের নার্সের কাছ থেকে শুনেছি। সে কারণেই নীলা হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ঘরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। দুজনের কেউই আর কথা বলে না। আকাশের বুকের ভেতর কেবল ঘুরপাক খায় নীলার হাসি মাখা মুখটা। যে মুখে এখন মৃত্যুর ছায়া ঘুরছে। আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলে উঠলো, আকাশ তুই এমন কোন ভুল করিস না যাতে তুই কষ্ট পাস। কারো মায়ার ভেতরে ঢুকে গেলে সেখান থেকে বের হতে পারবি না। আমি তোকে ভালো করে চিনি। আর তুই কি আমাকে দেখছিস না? কত চেষ্টা করেও মারিয়াকে ভুলতে পারছি না। আমি চাই না তুইও আমার মত করে কষ্ট পাস। তার কথার পর অনেকক্ষণ নীরবতা নেমে আসে। আকাশ কোন জবাব দেয় না। সে ধীরে অন্যদিকে ফিরে শুয়ে থাকে। তার চোখ ভিজে উঠেছে। ঠোঁট কাঁপছে। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত চাপা যন্ত্রণা। তার চোখ ভিজে উঠেছে। সে কাঁদছে। আকাশ অবাক হয়। সে কেন কাঁদছে। তাহলে কি আবিরের কথাই ঠিক? সে কি নীলার মায়ায় পড়ে গেছে। নীরবতা দীর্ঘ হয়। রুমের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন আরো স্পষ্ট শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর আকাশী প্রথম কথা বলে। নীলাকে দেখে তো আমার তেমন কিছু মনে হয়নি। আবির হালকা গলায় বলে এখন মোটামুটি সুস্থ আছে। শুনেছি প্রতিমাসে থেরাপি নিতে হয়। অপারেশন করা সম্ভব না? সম্ভব কিন্তু ঝুঁকি অনেক। ডাক্তার বলেছে অপারেশন সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। সেজন্য নীলার বাসায় কেউই সিদ্ধান্ত নেয়নি। আকাশ একটু চুপ থেকে বলে, তুই এত খবর জানিস কিভাবে? নীলাকে তুই আগে থেকেই চিনিস। আমাকে সত্যি করে বল প্লিজ। আকাশের মনে সন্দেহ। সে ধারণা করছে এখানে নিশ্চয়ই বড় কোন ঘটনা লুকানো আছে। কিন্তু তাকে কেউ বলছে না। হাবির স্তব্ধ হয়ে যায়। সে কখনো ভাবেনি নীলার সঙ্গে আকাশের আবার দেখা হবে। সবকিছুই যেন ভাগ্যের খেলা। কতবার ভেবেছে সে আকাশকে সব খুলে বলবে। কিন্তু প্রতিবারই থেমে গেছে। সে জানে। সত্যিটা বললে আকাশের ভেতরে আরো ঝড় উঠবে। আর সেই ঝড় সামলানোর মত শক্তি হয়তো তার এখন নেই। সে চায় না আবারও আকাশ এসবের মধ্য দিয়ে যাক। কিন্তু সে বুঝতে পারছে আকাশ ক্রমশ নীলার দিকে ছুটে যাচ্ছে ভাগ্য কি লিখে রেখেছে আবিরের জানা নেই চুপ করে আছিস কেন আকাশ আবার জিজ্ঞেস করে ঘুম পাচ্ছে এখন ঘুমা এত ভাবিস না আবির প্রসঙ্গ এরিয়ে যায় তুই কথা কেন ঘুরাচ্ছিস আবির উত্তর দেয় না চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে আকাশ পাশে ফিরে তাকায় তার দিকে আবিরের চোখ বন্ধ মুখে শান্ত অভিব্যক্তি হঠাৎ আকাশ তাকে কাতুকুতু দেয় কি করছিস সুরসুরি লাগছে আকাশ হেসে ওঠে কিন্তু গলায় চাপা রাখ তোকে আজ বলতেই হবে তুই কি লুকাচ্ছিস কি লুকাবো আমি সেটা তুই জানিস আজ ঘুমা পাগলামি করিস না তুই নীলাকে নিয়ে শুধু শুধু অতিরিক্ত ভাবছিস আমি অতিরিক্ত ভাবছি না সেটা তোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মজনু হয়ে গেছিস তুই কিন্তু আবারও কথা ঘুরাচ্ছিস আবির হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলে আমি কথা ঘুরাচ্ছি না আকাশ আমি শুধু চাই তুই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরায় আচ্ছা ধর তুই নলাকে আগে থেকেই চিনিস জানিস তাতে কি আসে যায় নীলা তোকে কখনো বলেছে সে তোকে চেনে বা জানে আকাশ চুপ করে থাকে আবিরের কন্ঠ একটু কঠিন হয়ে ওঠে সেদিন নীলার সঙ্গে দেখা করতে গিছিলি দেখলি না ও কেমন ব্যবহার করল তুই বুঝতে পারছিস না নীলাও চায় না তোর সঙ্গে আবার যোগাযোগ হোক তারপরও তুই কেন সবসময় নীলা নীলা করিস কেন করিস আকাশ কি এমন আছে নীলার মধ্যে যে তোর বারবার ওর কথাই মনে পড়ে শেষ কথাগুলো বলার সময় আবিরের কন্ঠে একরকম কঠোরতা এলো। নীলার চোখ যেন শান্ত কোন রদের জলের মত। নির্বিকার অথচ গভীর। সেই চোখে এক ধরনের নিঃশব্দ আকর্ষণ আছে। যা বারবার ওর দিকে টেনে নেয় আমাকে। ওর হাসি মেঘলা দিনে হঠাৎ রোদ উঠার মত সুন্দর। মিষ্টি আর উষ্ণ। আশেপাশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়। আর যখন হালকা হাওয়ায় চুল উড়ে এসে মুখ ঢেকে দেয়, তখনও চুলগুলো ধীরে কানে গুজে যায়। সেই মুহূর্ত মনে হয় ও যেন কোন কবিতার মূর্তরূপ। এতটা স্নিগ্ধ এতটা মায়াময় যে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। আকাশে কেউ থেমে গভীর নিঃশ্বাস নেয়। তারপর আবার বলে আমি বারবার চেষ্টা করি চোখে ভুলে যেতে। কিন্তু পারিনি। প্রথম দেখার মুহূর্তটা আমার মনে গেঁথে গেছে স্থায়ীভাবে। সেদিন যখন আমার এক্সিডেন্ট হয়েছিল, চারপাশটা হঠাৎ করে অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যতটুকু দেখতে পেয়েছিলাম, তার ভেতর সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল নীলার মুখটা। ওর চোখে ছিল উদ্বিগ্ন কাঁপতে থাকা চোখ দুটোতে একটা তীব্র ভয় একটা অস্থিরতা ছিল যেন পৃথিবীর সব ব্যথা একসাথে ওর চোখে জমা আছে ওর দুচোখে জল টলমল করছিল আমাকে শক্ত করে ধরে বসেছিল হাত কাঁপছিল তবুও ছাড়েনি বারবার চিৎকার করছিল কেউ আছেন উনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন প্লিজ আমার আধজ্ঞানে শুধু সেই মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল অচেনা অথচ অচেনা নয় মনে হচ্ছিল আমি ওকে চিনি স্বপ্নে কল্পনায় কোন অজানা স্মৃতিতে হয়তো ওই সেই মানুষ যাকে আমি খুঁজে ফিরছি। অন্য কাউকে দেখে এমন মনে হয়নি। কিন্তু নীলার ক্ষেত্রে কেন যেন সবকিছু আলাদা। আমার এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আবির। তবে একটা কথা বলতে পারি নীলা সামনে বসে থাকলে ওকে দেখলে আমার সব ক্লান্তি মুছে যায়। মনটা শান্ত হয়ে আসে। সব দুশ্চিন্তা অস্থিরতা উথাও হয়ে যায়। এখন চাইলেও ওর কথা ভাবা বন্ধ করতে পারি না। মনে হয় নীলা আমার জীবনের কোথাও না কোথাও মিশে আছে। আমার এই অনুভূতির নাম কি বলতো? প্রেম ভালোবাসা নাকি শুধুই মায়া। আবির চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নরম কন্ঠে বলে, এই অনুভূতিটা আমি জানি আকাশ। ঠিক তুই যেমনটা অনুভব করছিস আমিও তেমনটা অনুভব করেছি। আমি জানিনা সামনে কি হবে। কিন্তু একটা কথা জানি। তোর মন এখন যা চায় তুই সেটা কর। দুইদিনের এই দুনিয়ায় এত ভেবে লাভ নেই। চোখ বন্ধ করলে যেখানে সব শেষ সেখানে নিজের আবেগ চেপে রেখে কষ্ট পাওয়ার কোন মানে হয় না। আমরা বোকা বড্ড বোকা। তাই হয়তো এমন করে ভালোবেসে ফেলি। আকাশ মৃদু হেসে বলে তুই ঠিক বলেছিস। এখন থেকে মন যেটা চাইবে সেটাই করার চেষ্টা করব। আবির হাই তুলে বলল, এবার অন্তত ঘুমা। আমার সত্যিই ঘুম পাচ্ছে। আচ্ছা ঘুমা তুই আমি আর বিরক্ত করছি না। আমি একা না তুইও ঘুমা। এভাবে রাত জাগলে অসুস্থ হয়ে যাবি। আমার গার্জিয়ান হতে হবে না তোকে। ঘুমা তুই। তুই কবে আমার কথা শুনেছিস? আচ্ছা ঘুমালাম শুভরাত্রি।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন