পর্ব ৩
লেখিকা : মরিয়ম আক্তার সুকন্যা
সকাল বেলা।
অবন্তি রেডি হয়ে নিচে নামলো। চোখ ফোলা, মুখটা শুকনা। কাল রাতে একটুও ঘুমায়নি।
*রাবেয়া বেগম:* "মা খেয়ে যা"
*অবন্তি জোর করে হাসি দিয়ে:* "বড় মা আমি এখন খাবো না"
*রাবেয়া বেগম:* "এটা কোনো কথা? আয় বস"
জোর করে অবন্তিকে টেবিলে বসালো। অবন্তি জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বসে আছে। খাচ্ছে না, শুধু নাড়ছে।
ঠিক তখনই *আদনান* নিচে নামলো। চুল এলোমেলো, চোখে ঘুম আর রাগ দুইটাই।
আদনান এসে সোজা অবন্তির পাশের চেয়ারে বসলো।
অবন্তি সাথে ১ চেয়ার সরে গেলো।
আদনান ভুরু কুচকে তাকালো। আবার অবন্তির কাছে বসলো।
অবন্তি আবার সরে যেতে চাইলো।
*আদনান রেগে অবন্তির চেয়ার টেনে ধরলো:* "সমস্যা কি তোর?"
অবন্তি কিছু বললো না। শুধু মাথা নিচু করে উঠে চলে গেলো।
আজ ও একা ভার্সিটি চলে গেলো ওর বাবার গাড়ি দিয়ে। একটা কথাও বললো না কারো সাথে।
১০ মিনিট পর আদনানও রেডি হয়ে গাড়িতে উঠলো। ড্রাইভারকে বললো "চল"।
গাড়িতে উঠে চারপাশে তাকিয়ে দেখলো অবন্তি
নাই।
*আদনান:* "অবন্তি কই?"
*নীলিমা পেছন থেকে:* "ও তো চাচার গাড়ি নিয়ে চলে গেছে"
আদনানের রাগ উঠে গেলো। ঘুষি মারলো সিটে।
*আদনান দাঁতে দাঁত চেপে:* "আমার সাথে এক গাড়িতে যেতেও ওর প্রব্লেম হচ্ছে?"
নীলিমা কিছু বললো না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। গাড়ির ভেতরটা হঠাৎ অনেক থমথমে হয়ে গেলো।
ভার্সিটির গেটে অবন্তি নেমে সোজা ক্লাসে চলে গেলো। পেছনে একবারও তাকালো না।
ভার্সিটি। ক্লাস শেষ।
অবন্তি ব্যাগ নিয়ে সোজা গেটের দিকে হাঁটছে।
হঠাৎ পেছন থেকে শক্ত করে হাত টেনে ধরলো কেউ।
*আদনান রাগী গলায়:* "দাঁড়া"
অবন্তি চমকে উঠলো। পেছনে ঘুরে দেখলো আদনান। শার্টের ২টা বোতাম খোলা, চোখ লাল।
*অবন্তি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে:* "হাত ছাড়েন। সবাই দেখছে"
*আদনান:* "দেখুক। আমার সমস্যা নাই"
করিডোরে ২-৩ জন দাঁড়িয়ে ওদের দেখছে। আদনান ওকে টেনে একপাশে দেয়ালের কাছে নিয়ে গেলো।
*আদনান:* "কাল রাত থেকে পালাচ্ছিস কেনো? বাসায়, গাড়িতে, এখন ভার্সিটিতেও?"
*অবন্তি চোখের পানি আটকাচ্ছে:* "আমি পালাচ্ছি না। আপনি আমাকে বুঝতে চাচ্ছেন না"
*আদনান:* "তাহলে বুঝা। তুই আসিফ ভাইয়াকে পছন্দ করিস বললি কেনো? আমার সামনে?"
*অবন্তি:* "কারণ এটাই সত্যি। উনি আমার ফ্রেন্ড। হেল্প করে"
*আদনান রেগে দেয়ালে ঘুষি মারলো:* "ফ্রেন্ড?! শুধু ফ্রেন্ডের জন্য গলা কাঁপে তোর?"
অবন্তি কেঁদে ফেললো। তারপর এক নিশ্বাসে বলে দিলো-
*অবন্তি:* "দেখেন আমি আপনাদের মধ্যে 3rd person হতে চাই না। নীলিমা আপু আপনাকে ভালোবাসে। আর আমি আপনাকে ভালোবাসি না। ভালোবাসবোও না"
কথাটা শুনে আদনান ২ সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলো। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো।
*আদনান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে:* "ভালোবাসবি না? সময় বলে দিবে কে কাকে ভালোবাসে"
*আদনান নিচু গলায়:* "আর নীলিমা? ও আমার কেউ না।
বলে হাত ছেড়ে দিয়ে হনহন করে চলে গেলো।
অবন্তি দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগছে।
দূর থেকে
*তানিশা:* "এটা কি হইলো
সন্ধ্যা বেলা।
অবন্তি রুমে বসে বই পড়ছিলো। মাথা ব্যথা, তাই নিচেও যায়নি।
হঠাৎ দরজায় টোকা।
*নীলিমা:* "অবন্তি চল ছাদে। সবাই আছে"
*অবন্তি বই বন্ধ করে:* "না আপু যাবো না। শরীর ভালো লাগছে না"
*নীলিমা:* "আচ্ছা"
নীলিমা আরাবিকে নিয়ে চলে গেলো।
ছাদে সবাই বসে আছে। শান্ত, আদনান, আয়ান, নীলিমা। আরাবি
*শান্ত:* "আপু অবন্তি কই?"
*নীলিমা:* "ওর নাকি শরীর খারাপ। আসবে না"
কথাটা শুনে *আদনান* এর রাগ হলো। ও ফোন বের করে সোজা অবন্তির নাম্বারে কল দিলো।
*অবন্তি:* "হ্যালো"
*আদনান:* "ছাদে আয়"
*অবন্তি:* "না শরীর ভালো নেই"
*আদনান দাঁতে দাঁত চেপে:* "তুই আসবি নাকি আমি আসবো?"
অবন্তি ২ সেকেন্ড চুপ করে রইলো।
*অবন্তি ভয় পেয়ে:* "না না আমি আসছি"
৫ মিনিট পর অবন্তি ছাদে গেলো। মুখ শুকনা।
সবাই ওকে টেনে বসালো। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলো না।
*নীলিমা:* "আমি চা বানাই?"
বলে কিচেনে চলে গেলো। ১০ মিনিট পর ট্রে তে করে চা নিয়ে আসলো।
নীলিমা সবার আগে আদনান কে চায়ের কাপ টা দিলো।
*আদনান কাপ টা হাতে নিয়ে:* "আমি চা খাই না। কফি খাই"
*নীলিমা হেসে:* "আচ্ছা আমি বানিয়ে দিচ্ছি"
*আদনান তাকালো অবন্তির দিকে। তারপর বললো:* "আমি অবন্তির হাতের কফি ছাড়া কারো কফি খাই না"
ছাদের সবাই চুপ। নীলিমার হাতের ট্রে টা কেঁপে উঠলো।
অবন্তি আর বসে থাকতে পারলো না। চোখ নিচু করে উঠে নিচে চলে গেলো।
১০ মিনিট পর কফি বানিয়ে এনে আদনানের হাতে দিলো। একটা কথাও বললো না।
*আদনান কফিতে চুমুক দিয়ে:* "হুম। এবার ঠিক আছে"
নীলিমা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখলো। ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। চায়ের কাপ টা টেবিলে রেখে ছাদের রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।
রাত ১টা।
বাসা একদম নিস্তব্ধ। ড্রয়িং রুমে শুধু টিভির হালকা আলো।
অবন্তি সোফায় একা বসে আছে। চারপাশে কেউ নেই। বোরিং লাগছিলো তাই টিভি ছেড়ে বসে ছিলো। চোখে ঘুম নাই।
হঠাৎ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ।
*আদনান* নিচে নামলো। চুল ভেজা, পরনে কালো টি-শার্ট। ও ভাবেনি কেউ জেগে থাকবে।
নিচে নেমে দেখলো অবন্তি টিভি দেখছে।
আদনান কিছু না বলে সোজা গিয়ে অবন্তির পাশের সোফায় বসলো।
অবন্তি সাথে ১ হাত দূরে সরে গেলো। চোখ টিভির দিকে।
আদনান ভুরু কুচকালো। আবার একটু কাছে সরে বসলো।
অবন্তি আবার সরে গেলো।
*আদনান রাগী গলায়:* "এত সরে সরে বসিস কেনো? আমি কি বাঘ নাকি?"
অবন্তি উঠে চলে যেতে নিলো।
ঠিক তখনই আদনান হাত টান দিয়ে ওকে নিজের কোলে বসিয়ে দিলো।
অবন্তি ভয়ে সাথে আদনানের কলার খামচে ধরলো। হার্টবিট বেড়ে গেলো।
*অবন্তি কাঁপা গলায়:* "ছাড়েন... কি করছেন আপনি?"
*আদনান ওর কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত করে:* "সমস্যা কি তোর? আমার কাছ থেকে দূরে থাকিস কেনো? বাসায়, ভার্সিটিতে, ছাদে... সব জায়গায়?"
অবন্তি নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। উত্তর দিচ্ছে না।
আদনান এক হাত দিয়ে অবন্তির থুতনি তুলে ধরলো।
*আদনান নিচু গলায়:* "আমার চোখের দিকে তাকা"
অবন্তি তাকালো না।
*আদনান:* "তাকা বলছি"
অবন্তি এবার কাঁপতে কাঁপতে তাকালো। আদনানের চোখ লাল, কিন্তু রাগ না। ওর মধ্যে অন্য কিছু।
*আদনান অবন্তির কানের কাছে ফিসফিস করে:* "তুই যদি এরপর থেকে আমার কাছ থেকে আর একবারও দূরে থাকিস... তোর খবর আছে অবন্তি। বুঝেছিস?"
অবন্তির নিশ্বাস আটকে আসছিলো। ও ছোট করে বললো-
*অবন্তি:* "ছাড়েন প্লিজ... কেউ দেখে ফেলবে"
আদনান ৩ সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিলো। কিন্তু যাওয়ার আগে অবন্তির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো।
*আদনান:* "আমি জোর করি না অবন্তি। কিন্তু তুইও পালাবি না। ক্লিয়ার?"
বলে উঠে সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে গেলো।
অবন্তি সোফায় বসে হাঁপাচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। টিভির স্ক্রিনে কি চলছে ওর মাথায় নাই।
উপরে নিজের রুমে গিয়ে আদনান জানালার পাশে দাঁড়ালো। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
*আদনান মনে:* "দূরে থাকার চেষ্টা কর... আমি আরো কাছে আসবো
চলতেছে...."